নারী

হুমায়ুন আজাদ

২৫. বালিকা (পর্ব – ০১)

(প্রথম ভাগ)

একটি নারী যেই গর্ভবতী হয়, শুভার্থীরা যখন পায় সে-সংবাদটি, সবাই স্বাগত জানাতে শুরু করে একটি সম্ভাব্য পুরুষকে, এবং নিষেধ জানাতে শুরু করে সম্ভাব্য একটি নারীকে। তারা জানে আসবে ছেলে, অথবা মেয়ে; কিন্তু যে আসবে তার ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই, যদি থাকতো তবে তা খাটাতে মাবাবা দুজনই, কেউ দ্বিধা বোধ করতো না। আজ এটা জানা যে জনকই নিয়ন্ত্রণ করে সন্তানের লিঙ্গ, তার Y ক্রোমোসোমাই স্থির করে দেয় যে সন্তানটি হবে ছেলে। তবে সে মেপে মেপে নারীর ভেতরে নিজের Y ক্রোমোসোম নিক্ষেপ করতে পারে না। তাই তারা নির্ভর ক’রে থাকে দৈবের ওপর। পিতামাতা চায় ছেলে, অন্যরাও তাই চায়; মেয়ে বেশি মানুষ চায় না।

যে-পুরুষের জন্মে একের পর এক মেয়ে, সে অপুরুষ হয়ে ওঠে সমাজের চোখে; যে-নারী একের পর এক মেয়ে প্রসব করে, তার জরায়ুর নিন্দার কোনো শেষ নেই। একটি ছেলে জন্ম দিতে পারলে মা কৃতিত্ব বোধ করে, তার দাম বেড়ে যায়, সে মাথা তুলে দাড়াতে পারে; সভ্যতার দাবি মেটাতে পেরেছে বলে সে নিজেকে সফল মনে করে। সন্তানটি যদি প্রথম সন্তান হয়, তাহলে কথাই নেই; সবাই প্রতীক্ষা আর দোয়াকলামা পড়তে থাকে একটি ছেলের জন্যে। সবার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত ক’রে ছেলে হ’লে সাড়া প’ড়ে যায় স্বৰ্গমর্ত্যে, মুসলমানের আজান দিয়ে আল্লা আর মহাজগতকে তা জানিয়ে দেয়, হিন্দুরা শঙ্খকাসর বাজিয়ে উৎসব করে, অন্যান্য ধর্মের মানুষেরাও তাকে নিয়ে মেতে ওঠে নানা আড়ম্বরে। একটি মেয়ে জন্ম নিলে চারদিকে পড়ে শোকের ছায়া। যেনো বাড়িতে কেউ জন্ম নেয় নি, মৃত্যু হয়েছে কারে , একটি মেয়ের জন্ম পিতৃতন্ত্রের জন্যে অন্যতম প্রধান দুঃসংবাদ; একটি মেয়ের জন্ম পুরুষতন্ত্রের প্রচণ্ড প্রত্যাশার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

এক সময় আরবে, এমনকি ভারতেও, জন্মের সাথেসাথেই তাকে পুঁতে ফেলা হতো, এখন পুঁতে ফেলা হয় না; কিন্তু জন্যেই মেয়ে দেখে বিরূপ বিশ্ব, এবং সে নিয়ত একাকী। তার বিরুদ্ধে সবাই। ধাত্রী তাকে অবহেলায় তুলে ধরে, মা চোখ ফিরিয়ে নেয়, বাবার মুখ কালো হয়ে যায়। তবে সে মেয়ে, অবহেলা আর পীড়ন সহ্য করার অপার শক্তি তার, জন্মসূত্রেই সে নিয়ে আসে টিকে থাকার শক্তি। মেয়ে মায়ের গর্ভে থাকে ছেলের থেকে কিছুটা কম সময়, কিন্তু বাড়ে অনেক বেশি; তার অস্থিও হয় ছেলের অস্থির থেকে বেশি শক্ত। তার নার্ভতন্ত্রও হয় অনেক বেশি পরিণত। মেয়েরা জন্মে ছেলেদের থেকে অনেক কম ত্রুটি নিয়ে, বেঁচে থাকার শক্তিও নিয়ে আসে বেশি। গর্ভপাতে নষ্ট হয় অনেক বেশি ছেলে, মৃত ছেলেও জন্মে অনেক বেশি। জন্মের পর ছেলের মৃত্যুর হার অনেক বেশি মেয়ের মৃত্যুর হারের থেকে। পল্লীবাঙলায় মেয়ের প্রাণকে তুলনা করা হয় কইমাছের প্রাণের সাথে, কুটলেও যে মরে না। মেয়ে, পৃথিবীতে অনভিনন্দিত, বেঁচে থাকে শুধু অদম্য প্রাণশক্তিতে।

নারীপুরুষের ডিম্বাণু আর শুক্রাণুতে x ক্রোমোসোমের পরিমাণ অনেক বেশি, তাই মেয়েই বেশি জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা, জন্মও নেয় বেশি; কিন্তু মেয়ে পৃথিবীতে স্বাগত নয়। পৃথিবীর নানা অগ্রগতি সত্ত্বেও পৃথিবী এখনো আদিম, তার আদিমতার একটি হচ্ছে মেয়ে নিয়ে বিব্রত বোধ করা। গরিব প্রথাগত পরিবারেই শুধু নয়, আধুনিক পরিবারেও পুত্ৰ ঐশ্বরিক ব্যাপার। আধুনিক পিতামাতা, যারা একটি সন্তানই যথেষ্ট শ্লোগানে দীক্ষিত, তারাও একটি ছেলের জন্যে একের পর এক মেয়ে জন্ম দিয়ে চলে, এবং একটি ছেলে জন্ম দিতে না পারার শোক সারাজীবনে ভুলতে পারে না। ‘পুত্র’ শব্দের মূল অর্থ ‘পূত-নরক-ত্ৰাতা’, যে পিতার মুখাগ্নি ক’রে পিতাকে উদ্ধার করে ওই ভয়ঙ্কর নরক থেকে; তাই পুত্রের জন্যে হিন্দুর ব্যাকুলতার শেষ নেই। পুত্র হচ্ছে ‘নন্দন’, যে আনন্দ দেয় চিত্তে।

সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ তাঁর সূত্ররচনার সাফল্যকে তুলনা করেন পুত্রলাভের সাথে; বলেন, সূত্র থেকে একটি মাত্রা কমাতে পারলে তিনি পান পুত্ৰ লাভের আনন্দ। হিন্দুশাস্ত্রে পুত্রের জন্যে বাতিল ক’রে দেয়া হয়েছে নারীর সতীত্বের ধারণা : স্বামী যদি পুত্র জন্ম দিতে না পারে তবে পুত্র উৎপাদনের জন্যে বিধান রয়েছে পুত্রবীর্যবান পুরুষ নিয়োগের! মন্ত্র তো রয়েছে সম্ভবত অসংখ্য। মেয়ে তার বিপরীত; মেয়ে অস্বাগত অযাচিত। মার্কিন নারীমুক্তি আন্দোলনের বিখ্যাত নেত্রী লুসি স্টোনের জন্মের সময় তার মা চিৎকার ক’রে উঠেছিলো, ‘হায়! আমি দুঃখিত। এটি মেয়ে। মেয়েমানুষের জীবন কী কষ্টকর।’ ঔপন্যাসিক অনুরূপা দেবী পরে আনন্দ দিয়েছিলেন অনেককে, কিন্তু তাঁর জন্মের সময় সকলের বুক থেকে যে-দীর্ঘশ্বাস বেরিয়েছিলো, তা তিনি মুছে ফেলতে পারেন নি জীবন ও মন থেকে।

তিনি বলেছেন, ‘আমি পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে কাহারও আনন্দ বর্ধন করতে সমর্থ হইনি। বরং সকলকারই আশাপ্রণোদিত চিত্তে হতাশা এবং নিরানন্দই এনে দিয়েছিলাম।‘ কারণ সবাই আকুল প্ৰতীক্ষায় ছিলো পুত্রের জন্যে, ‘গড়ের বাদ্য’ও প্রস্তুত ছিলো; কিন্তু ‘গড়ের বাদ্যি’ ছেড়ে একটি শাকও বাজল না, যদিও পুত্রসন্তানের শুভাগমন কল্পনায় সেটা আঁতুড় ঘরের দোরগোড়াতেই এনে রাখা হয়েছিলা’ [দি চিত্রা (১৯৮৪, ৩০-৩১)] ভার্জিনিয়া উলফ শেক্সপিয়রের বোনের কথা বলেছেন; এভাবেই পৃথিবীতে আসে শেক্সপিয়রের বোনেরা। বাঙলায় নারীদের মধ্যে যিনি প্রথম আত্মজীবনী লিখেছেন, সে-রাসাসুন্দরী বলেছেন, মেয়েমানুষের জন্ম নিছা। সে স্ত্রীলিঙ্গ, তবে তার লিঙ্গে এমন কোনো নির্দেশ নেই যে সে হয়ে উঠবে ‘নারী’ : পুরুষের বিপরীত, পরাধীন পর্যুদস্ত পরনির্ভর।

তার জন্মের পর পুরুষের সভ্যতা তাকে শাসন করে তাকে বানিয়ে তোলে নারী, তাকে নানা তুচ্ছ পুরস্কার দিয়ে তাকে গ’ড়ে তোলে এমন বস্তুরূপে, যার নাম নারী। সে বেড়ে ওঠে বালিকারূপে; তার ভেতরে চলতে থাকে অবিরাম ভাঙাগড়া, তার বাইরে চলে পুরুষতন্ত্রের হাতুড়ির আঘাতে নিরন্তর ধ্বংস ও নির্মাণ। যে-নারী চারপাশে দেখতে পাই, তা এক বিকৃত জিনিশ; তা সামাজিক ভাঙাগড়ার অস্বাভাবিক পরিণতি। কোনো নারীকে স্বভাব অনুসারে বাড়তে দেয় না পিতৃতন্ত্র। জন্মসূত্রে সে স্ত্রীলিঙ্গ; কিন্তু পিতৃতন্ত্রের হাতুড়ির ঘায়ে সে হয়ে ওঠে এমন এক লিঙ্গ, যাকে বোভোয়ার (১৯৪৯, ২৯৫) বলেছেন ‘পুরুষ আর খোজার মাঝামাঝি লিঙ্গ’।

পিতৃতান্ত্রিক সমোজসভ্যতা বিচিত্র ধরনের পুলিশবাহিনীর সমষ্টি; গায়ের জোরে টিকে থাকতে হ’লে পুলিশ ছাড়া উপায় নেই। পিতামাতা পরিবার পুলিশ, শোয়ার ঘর রান্নাঘর পুলিশ, রাস্তা পুলিশ, বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ, মসজিদ মন্দির গীর্জা সিনেগগ প্যাগোডা পুলিশ, সবাই পুরুষতন্ত্রের পুলিশ। এসব বাহিনীর প্রহরার মধ্যে বন্দী বালিকা বেড়ে ওঠে নারী হয়ে। এসব সংস্থা তাকে শুধু ভয় দেখায় না, তাকে পুরস্কারের লোভও দেখায়; তাকে ভয় দেখায় যাতে সে পুরুষের মতো বেড়ে উঠতে না চায়, তাকে পুরস্কারের লোভ দেখায় যাতে সে বেড়ে ওঠে। পুরুষতন্ত্রের আদর্শ নারীকাঠামো অনুসারে। একে বলা হয় বলীয়ানকরণ বা রিইনফোর্সমেন্ট। এসব সংস্থা তার সামনে উপস্থিত রাখে অনুকরণীয় আদর্শকাঠামো, নিজেকে ঢেলে তৈরি হ’তে নির্দেশ দেয় ওই কাঠামোর আদলে। এর নাম আদর্শকাঠামো অনুকরণ বা মডেলিং।

বালকের জন্যেও রাখে আদর্শকাঠামো অনুকরণের ব্যবস্থা, তবে তার আদর্শকাঠামো বিপরীত। বালিকার অনুকরণের আদর্শ মা ও চারপাশের দীক্ষিত নারীরা; তাই বালিকা হয়ে ওঠে নারী। বালকবালিকা জন্মের পরই বুঝে ওঠে না যে তারা পুরুষ বা নারী, লিঙ্গ তাদের কাছে গুরুত্বের ব্যাপার নয়। শুরুতে তারা নিজেদের মধ্যে কোনো পার্থক্যই করে না। তাদের চোখে তারা এক, তাদের জগত এক; তারা, বালিকা আর বালক, উভয়েই বিশ্বকে উপলব্ধি করে হাত দিয়ে, পা দিয়ে, চোখ কান নাসিকা দিয়ে। পৃথিবীতে এসেই তারা শিশ্ন বা যোনি দিয়ে পৃথিবীকে পরখ করে না। তারা ছোটোবেলা বাড়ে একই রকমে, একই রকমে মায়ের স্তন চোষে, জড়িয়ে ধরে একই রকমে, তারা আদর উপভোগ আর ঈর্ষা বোধ করে একই রকমে। বারো বছর বয়স পর্যন্ত বালকবালিকার দেহে থাকে সমান শক্তি, মনোবেলও থাকে একই পরিমাণে।

তবে তিন বছর বয়স থেকে, বিশেষ ক’রে বয়ঃসন্ধি থেকে বালিকার আচরণে দেখা দিতে পাকে নারীত্ব। আগে এ-নারীত্বের অভিব্যক্তি ঘটতো অত্যন্ত সমারোহের সাথে, এখন তার প্রকাশ অনেক ক’মে গেছে। ওই নারীত্ব দেখে বিস্মিত আর মুগ্ধ হয়ে পড়তো পুরুষতন্ত্র, তারা মনে করতো বালিকার মধ্যে ঘুমিয়ে আছে এক নারী, যে জেগে উঠতে শুরু করেছে। বিদ্যাসাগর (১৯৮৭, ৪১৮] ‘প্ৰভাবতীসম্ভাষণ’-এ প্ৰভাবতী নামের একটি বালিকার নারী আদর্শ অনুকরণের উল্লেখযোগ্য বিবরণ দিয়েছেন :

১। কখনও কখনও, স্নেহ ও মমতার আতিশয্যপ্রদর্শনপূৰ্ব্বক, ঐকান্তিক ভাবে, তনয়ের লালনপালনে বিলক্ষণ ব্যাপৃত হইতে।
২। কখনও কখনও, ‘তাহার কঠিন পীড়া হইয়াছে’ বলিয়া, দুর্ভাবনায় অভিভূত হইয়া, বিষন্ন বদনে, ধারাসনে শয়ন করিয়া থাকিতে।
৩। কখনও কখনও, ‘শ্বশুরালয় হইতে অশুভ সংবাদ আসিয়াছে’ বলিয়া, স্নান বদনে ও আকুল হৃদয়ে, কালব্যাপন করিতে।
৪। কখনও কখনও, ‘স্বামী আসিয়াছেন বলিয়া, ঘোমটা দিয়া, সঙ্কুচিতভাবে, এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকিতে; এবং, সেই সময়ে, কেহ কিছু জিজ্ঞাসা করিলে, লজ্জাশীলা কুলমহিলার ন্যায়, অতি মৃদু স্বরে উত্তর দিতে।
৫। কখনও কখনও, ‘পুত্রটি একলা পুকুরের ধারে গিয়াছিল, আর একটু হইলেই ডুবিয়া পড়িত’, এই বলিয়া, সাতিশয় শোকাভিভূত হইয়া, নিরতিশয় আকুলতাপ্রদর্শন করিতে।
৬। কখনও কখনও, ‘শ্বাশুড়ীর (sic) পীড়ার সংবাদ আসিয়াছে’ বলিয়া, অবিলম্বে শ্বশুরালয়ে যাইবার নিমিত্ত, সজ্জা করিতে।

তবে প্ৰভাবতী কোনো জন্মনারী নয়, সে নারীর নকল। বিদ্যাসাগর তার আচরণে মুগ্ধ হ’লেও তার আচরণকে কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার বলে মনে করেন নি, মনে করেছেন সে যদি ‘এই পাপিষ্ঠ নৃশংস নরলোকে’ আরো বেঁচে থাকতো তাহলে তার ‘যে সকল লীলা ও অনুষ্ঠান করিতে হইত’ সে তা সম্পন্ন ক’রে গেছে শৈশবেই। সে কাঠামো অনুকরণের এক অসাধারণ উদাহরণ। বালিকার মধ্যে নারীত্বের প্রকাশ রহস্যময় জৈবিক নিয়ন্ত্রণের অবধারিত ফল নয়, জিনক্রোমোসোম পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সংবাদ রাখে না। নারীত্ব হচ্ছে সমাজের অনিবাৰ্য প্রভাব ও পীড়নের পরিণতি।

সমাজে বেড়ে ওঠার অর্থ হচ্ছে সমাজের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল আয়ত্ত করা। সে টিকে থাকে, যে খাপ খায়; যে খাপ খায় না। সমাজ তাকে ধ্বংস ক’রে দেয়, বা সে বদলে দেয় সমাজকে। অধিকাংশ মানুষই নিজেদের অস্তিত্বের জন্যে খাপ খায় সমাজের সাথে, শেখে সে-সব বিধিবিধান, যা তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখবে। ভঙ্গুর বালিকার পক্ষে সমাজ বদলে দেয়া অসম্ভব, তাই শেখে সামাজিক সূত্র। বালিকা তার জীবনের দ্বিতীয় বছর থেকে চারপাশ দেখে দেখে বোঝে য়ে নারী হয়ে ওঠাই তার সামাজিক নিয়তি। প্রতিটি বালকবালিকার কাছে সমাজ একটি বিশাল আয়না, যাতে তারা দেখতে পায় নিজেদের, ও তাদের, হয়ে উঠতে হবে যাদের মতো। তারা দেখে হয়ে উঠতে হবে পিতামাতার মতো; পিতা তাদের সামনে এক আদর্শকাঠামো, মা তাদের সামনে এক আদর্শকাঠামো। ওই কাঠামো অনুসারে ছেলে হয় পুরুষ, বালিকা হয় নারী। কোনো জৈবিক কারণে তারা সামাজিক নারীপুরুষ হয়ে ওঠে না।

ছোটোবেলা থেকেই বালিকার সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করে প্রিয়জনেরা। বালিকা জন্মের সময় অভিনন্দিত হয় নি, জন্মের পরও সে পায় না ভাইয়ের সমান আদর। প্রথাগত পরিবারে, দরিদ্র পরিবারে, অনুন্নত সমাজে বালিকা অনেক কম আদর পায় ভাইয়ের থেকে। অবহেলার মধ্যে বড়ো হয় বালিকা। তার খাবার হয় কম, ও নিম্নমানের; ছেলের জন্যে তোলা থাকে মাছের মুড়োটি, দুধের সরটুকু রেখে দেয়া হয় ছেলের জন্যে, গাছের ফলটিও পাকে তারই জন্যে। বাঙালি সমাজে শৈশব থেকেই মেয়ের ভাগে জোটে এঁটোকাঁটা বাসি খাবার। সবার খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর আসে। তার খাওয়ার পালা, উচ্ছিষ্ট থেকেই মেয়েকে সংগ্ৰহ করতে হয় বেঁচে থাকার শক্তি। ওই উচ্ছিষ্ট খেয়ে কারো পক্ষে বীর হওয়া সম্ভব নয়, মেয়েও বীর হয় না; তার কাছে প্রত্যাশাও করা হয় না।

জন্মসূত্রে সে নিয়ে এসেছিলো ছেলের থেকে অনেক শক্ত অস্থি, কিন্তু অপুষ্টির ফলে তার অস্থি হয়ে পড়ে দুর্বল। পরিপূর্ণ নারীর কংকালও থেকে যায় শিশুর কংকালের মতো অসুগঠিত, শরীরবিদ্যায় যাকে বলা হয় পেডোমোফিক বা বালরোপিক, তার কারণ বালিকার আশৈশব অপুষ্টি। শিশুছেলেকে যে-যত্নে শোয়ানো হয়, পরিষ্কার করা হয় তার মলমূত্র, বালিকা সে-যত্ন পায় না। পৃথিবী জুড়ে অধিকাংশ বালিকা বড়ো হয় অনাদরে। ধীরেধীরে বালিকা জড়িয়ে পড়ে একজনের সাথে, যে বড়ো হয়েছে ও বেঁচে আছে তারই মতো অনাদরে, সে তার মা। মায়ের সাথে মেয়ের নাড়ি কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না। বাঙালি নারীদের আত্মজীবনীতে একটি শব্দ বারবার মেলে, শব্দটি ‘অভাগিনী’। এক অভাগিনী বড়ো হ’তে থাকে আরেক অভাগিনীর আঁচলের নিচে। নিয়তি নিজের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখার জন্যে জড়িয়ে দেয় মা ও মেয়েকে। বালিকা জড়িয়ে পড়ে মায়ের সাথে, আর ছেলে একটু একটু দূরে স’রে যেতে থাকে; মনে হতে পারে যে বালিকা একটু বেশি আদর পাচ্ছে আর কম আদর পাচ্ছে ছেলেটি। তবে এও এক পিতৃতান্ত্রিক প্রতিভাস।

উন্নত, এমনকি আমাদের সমাজেও একটু বড়ো হবার পর ছেলে আর মাবাবার আলিঙ্গন আদর আগের মতো পায় না, কিন্তু মেয়েটি পায়। বালিকা হয়ে ওঠে তাদের পুতুল। মায়ের শরীর ঘেষে থাকতে পারে বালিকা, ছেলে পারে না; সে নির্বাসিত হয় মায়ের আঁচলের বাহুর আলিঙ্গনের আপাতমনোরম এলাকা থেকে। বাবাও মেয়েকে বুকে জড়িয়ে রাখে, আদর করে কাজেঅকাজে, একটু দূরে সরিয়ে দেয় ছেলেকে। মেয়েকে দেয়া হয় রঙিন জামাকাপড়, তার ঠোঁটের বাকী কারুকাজে মুগ্ধ হয় মাবাবা, তার চোখে অশ্রু মুক্তো মনে হয় তাদের। তার চুল আঁচড়ে দেয়া হয় যত্নে, তার মেয়েলিপনা দেখে মুগ্ধ হয় সবাই। সে থাকে মনোরম বাগানে; আর ছেলেকে যেনো নির্বাসিত করা হয় দণ্ডকারণ্যে। তার আদুরোপনা অসহ্য মনে হয়, তার ছলাকলা নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

তাকে বার বার বলা হয় ‘পুরুষ এটা করে না’, ‘পুরুষ সেটা করে না’, ‘পুরুষ শাড়ি পরে না’, ‘পুরুষ লিপষ্টিক দেয় না’। মেয়েকেও বলা হয় ‘মেয়েরা এটা করে না’, ‘মেয়েরা ওটা করে না’, ‘মেয়েরা শার্ট পরে না’, ‘মেয়েরা এভাবে কথা বলে না”। স্থির ক’রে দেয়া হয় তাদের লিঙ্গপরিচয় ও লিঙ্গভূমিকা। ভিন্ন ক’রে দেয হয় তাদের ভূমিকা; তাদের বাধ্য করা হয় বিপরীত ভূমিকার পাত্ৰপাত্রী হয়ে উঠতে। ভিন্ন ক’রে দেয়া হয় ছেলে ও মেয়ের কাজ, আচরণ, এলাকা। ছেলেকে কাজ দেয়া হয় মুক্ত এলাকার, তাকে দেয়া হয় স্বাধীনতা; মেয়েকে দেয়া হয় অবরুদ্ধ এলাকার কাজ, তাকে দীক্ষিত করা হয় অধীনতা আর অবরোধে। মেয়ে ভয় পেলে খুশি হয় সবাই, আর ছেলে ভয় না পেলে খুশি হয় সবাই। মেয়েকে হ’তে হবে ভীত, সন্ত্রস্ত; টিকটিকি দেখেও সে কেঁপে উঠলে সবাই স্বস্তি বোধ করে যে একটি নারীর জন্ম হচ্ছে; সভ্যতা পাচ্ছে একটি বিশুদ্ধ নারী। তারা পৃথক, তারা পৃথক এলাকার; একজন অবরুদ্ধ ঘরের, আরেকজন মুক্ত বাইরের। তাদের জৈবনির্দেশের মধ্যে এসব নেই, আছে সামাজিক নির্দেশে; স্ত্রী ও পুংলিঙ্গ জৈব, নারী ও পুরুষ সামাজিক।

ছেলেকে যে থাকতে দেয়া হয় না মায়ের আঁচলের নিচে আর বাবার বুকের কাছে, স্থাতে মনে হতে পারে যে মেয়েটিকে আদর করছে। সবাই, অনাদর করছে ছেলেটিকে; মেয়েটি সকলের চোখের মণি। কিন্তু আসলে চোখের মণি ছেলেটিই। তার সাথে যে আপাতরূঢ় আচরণ করা হয়, তার কারণ তার জন্যে সামনে পড়ে আছে অসামান্য সব ব্যাপার, যা ওই আদরের থেকে অনেক মহৎ, যার ভাগ মেয়ে কখনো পাবে না। ছেলেবেলা থেকেই ছেলের কাছে প্রত্যাশা করা করা হয়। বড়ো বড়ো কাজ, কেননা সে উৎকৃষ্ট মেয়ের থেকে। সে পিতৃতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, পিতৃতন্ত্র তারই হাতে অৰ্পণ করবে সভ্যতা। সে ছেলে, তাকে করতে হবে বিশ্বের কাজ; তাই সে হবে ভিন্ন, তাকে হ’তে হবে সাহসী, হাতে হবে পুরুষ। সে সাগর পেরিয়ে যাবে, আকাশ ভেদ ক’রে ছুটবে; সে ভোগ করবে বসুন্ধরা।

সে পুরুষ, তাকে হয়ে উঠতে হবে পুরুষ। তার পুরুষত্ত্বের একটি প্রতীকও সমাজ খুঁজে পায় তার শরীরে, সেটি শিশ্ন। বালক তার শিশ্নকে সহজাত মহৎ মনে করে না, ওই প্রত্যঙ্গটির যে রয়েছে প্রতীকী ব্যঞ্জনা তাও সে জানে না; কিন্তু চারপাশের আচরণ থেকে সে বুঝতে পারে ওটির গুরুত্ব। বড়োরা তার শিশ্নটিকে নানা ডাকনামে ডাকে, ওটিকে বলে সোনা নুনু ধন, ওটিকেই ক’রে তোলে একটি ব্যক্তি। শিক্ষিত সমাজে শিশ্নের মহিমা কমেছে, কিন্তু চাষীসমাজে এর মহিমা এখনো অপ্ৰতিহত। শিশ্নটি বড়ো হয়ে একাধিক দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু শৈশবে এর দায়িত্ব প্রস্রাবের। মেয়ের শিশ্ন নেই, রয়েছে দুটি রন্ধ, যা সে দেখতে পায় না। সে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে না। এটা এক অসুবিধা। মুসলমানদের অবশ্য পুরুষনারী উভয়েরই জন্যে বিধান রয়েছে বসে প্রস্রাব করার; তবে দাঁড়িয়ে প্রস্রাবের রয়েছে বিশেষ সুবিধা। বালিকা সে-সুবিধা নিতে পারে না। বালকের শিশ্ন তাকে ক’রে তোলে বিশিষ্ট।

বালিকার যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো মা, বা অন্য কারো চোখে মর্যাদা পায় না। সে তার প্রত্যঙ্গগুলো দেখতে পায় না, তাকে বলা হয় ওগুলো লুকিয়ে রাখতে; তার মনে এমন বোধ সৃষ্টি ক’রে দেয়া হয় যে, ওগুলো লজ্জার বিষয়, ওগুলো নিষিদ্ধ, ওগুলোর কথা যতো ভুলে থাকা যায় ততোই ভালো, যেনো ওগুলো নেই। তার প্রত্যঙ্গগুলো যে আড়ালে থাকে, সে যে দেখতে পায় না। ওগুলো, এতে বালিকা কোনো অভাব বোধ করে না। তবে সে বুঝতে পারে তার অবস্থান ছেলের অবস্থানের থেকে অনেক ভিন্ন, অনেক নিম্ন। পরিবার, সমাজ, সভ্যতা বালিকার বিরুদ্ধে ও বালকের পক্ষে এমনভাবে অবিরাম কাজ করতে থাকে যে সে অসহায় বোধ করে, এমনকি বোধ করে হীনমন্যতা। সবাই যাদের উপেক্ষার বিষয় মনে করে, তাদের পক্ষে হীনমন্যতাবোধ স্বাভাবিক যুগ যুগ ধরে নিজেদের হীন অবস্থান দেখে দেখে তারা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা আসলেই হীন। বালিকাও তা বোধ করতে পারে, বালিকাও তা বোধ করে।

বালিকা বোধ করে সে নিকৃষ্ট তার ভাইয়ের থেকে। ভাইয়ের শিশ্ন আছে, তাকে ভালোটা খেতে দেয়া হয়, তার দাবি পূরণ করা হয় দ্রুত। বালিকা দেখে তার দাবি মেটে না, সে খাবার বেলা পায় মাছের বাজে টুকরোটি, মুড়ো খাওয়ার স্বপ্ন তার স্বপ্লই থেকে যায়। তাই তার জগতে পারে, এবং জাগে হীনমন্যতাবোধ। ফ্রয়েড বালিকার হীনমন্যতা দেখেছেন; তিনি মনোবিজ্ঞানী হিশেবে উৎকৃষ্ট হতে পারেন, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী হিশেবে খুবই নিকৃষ্ট। তিনি বলেছেন খোজাগূঢ়ৈষার কথা, বালিকার শিশ্নাভাবের কথা, শিশ্নাসূয়াগ্ৰস্ততার কথা। তিনি বলেছেন বালিকা ঈর্ষা করে বালকের শিশ্নকে, কেননা তার শিশ্ন নেই; বালিকা শিশ্নের অভাবে ভোগে হীনমন্যতায়। ফ্রয়েডের তথ্য নির্ভুল, তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভুল।


 নারী

শেয়ার করুন —
5 1 vote
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top