নারী

হুমায়ুন আজাদ

২১. ফ্ৰয়েডীয় কুসংস্কার (দ্বিতীয় পর্ব)

ফ্ৰয়েডীয় কুসংস্কার, ও মনোবিশ্লেষণাত্মক-সমাজবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়াশীলতা

(দ্বিতীয় ভাগ)

ফ্রয়েডের চমৎকার উপাত্ত ও তার শোচনীয় ভাষ্য দেখে খুব দুঃখ হয়; এমন চমৎকার উপাত্তের এমন অপব্যবহার বেশি হয় নি বিজ্ঞানের ইতিহাসে। পিতৃতান্ত্রিক পুরুষাধিপত্যবাদী সমাজ নারীর সমস্ত সম্ভাবনা রোধ করে নারীকে কতোটা অসুস্থ ক’রে তুলতে পারে, তা উদঘাটন করা সম্ভব ওই উপাত্ত থেকে; কিন্তু তিনি সেদিকে না গিয়ে গেছেন ভুল পথে। তিনি নারীর অবস্থাকে ব্যাখ্যা করেছেন অবধারিত জৈবিক সূত্ররূপে, যা সম্পূর্ণ ভুল। যে-অপরাধ সমাজের, তাকে তিনি কুৎসিত শিশ্নাসূয়া নামে চাপিয়ে দিয়েছেন নারীর ওপর। শিশ্নাসূয়া হচ্ছে পুরুষ-অসূয়া, যা অবধারিত বিশেষ সামাজিক পরিবেশে।

পৃথিবী জুড়ে মেয়েশিশুরা ভাইয়ের শিশ্ন দেখার আগেই দেখে যে পৃথিবীটা পুরুষের। তারা দেখে সব দিকে পুরুষের আধিপত্য; পরিবার তাদের শেখায় পুরুষ প্রধান, ধর্ম শেখায় পুরুষ প্রধান, সমাজ শেখায় পুরুষ প্রধান, বিদ্যালয় আর মহাবিদ্যালয়, প্রচার মাধ্যম শেখায় পুরুষ প্রধান। সমাজরাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থা পুরুষের প্রাধান্য প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের সংস্থা। ওই প্রধান্যকে একটি শিশ্নে সংহত করা মেয়েদের কাজ নয়, ফ্রয়েডের কাজ। নারীরা শিশ্নটিকে ঈর্ষা করে না, একটি শিশ্ন কী দিতে পারে তাকে ঈর্ষা করে। পুরুষকে তারা শিশ্ন বলেও ভাবে না, ভাবে পুরুষ ব’লে, যারা অধিকার করে আছে পৃথিবী। মিলেট (১৯৬৯, ১৮৭) বলেছেন, ‘ফ্রয়েড প্রধান ও নির্বোধ গোলমাল করেছেন শরীর ও সংস্কৃতি, অঙ্গসংস্থান ও মর্যাদার মধ্যে।’

ফ্ৰয়েড বিরোধী ছিলেন নারীবাদের, নারীপ্রসঙ্গে তিনি বারবার নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে কটাক্ষ করেছেন; পৃথিবীকে মুক্ত রাখতে চেয়েছেন নারীমুক্তিরোগ থেকে। সাফল্য অর্জনের জন্যে, ফ্রয়েডের বিশ্বাস, থাকতে হবে একটি ঝুলন্ত প্রত্যঙ্গ; রন্ধ থাকলে চলবে না! তাঁর বিশ্বাস মেধা আর শিশ্নের মধ্যে রয়েছে জৈবিক সম্পর্ক; পুরুষের মেধাগত শ্রেষ্ঠতার জৈবিক প্রকাশ হচ্ছে শিশ্ন। ফ্রয়েড পুরুষতন্ত্রকে দেখেছেন শিশ্নরূপে, এমনকি মস্তিষ্কের থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন ওই প্রত্যঙ্গটিকে; এবং মনোবিজ্ঞানের মুখোশে প্রকাশ করেছেন কুসংস্কার।

ফ্রয়েড নারীর দুটি একান্ত বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন : সে-দুটি হচ্ছে লজ্জা ও ঈর্ষা। তিনি দাবি করেছেন এ-দুটির মূলেও রয়েছে শিশ্নাসূয়া। নারীর লজ্জাশীলতার প্রশংসায় পিতৃতন্ত্ৰ পাগল, কিন্তু ফ্ৰয়েড জানিয়েছেন নারীদের লাজনম্রতার কারণ তাদের খোজত্বেবোধ, নিজেদের বিকলাঙ্গচেতনা। ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৭০) বলেন :

‘লজ্জাশীলতা, যাকে মনে করা হয় নারীর একান্ত ভূষণ, তাও আসলে, আমাদের মতে, নারী শুরু করেছিলো নিজের যৌনাঙ্গের ত্রুটি ঢাকার জন্যে।‘

নারী লজ্জায় ম’রে যায় একথা ভেবে যে তার রয়েছে রন্ধ, তার শিশ্ন নেই। ফ্রয়েড মনে করেন জৈবিক কারণেই নারী কোনো কিছু দান করতে পারে নি। সভ্যতায়, তার সে-শক্তি নেই; তবে নারীকে তিনি সভ্যতার দুটি আবিষ্কারের গৌরব দিয়েছেন। তাঁর মতে, নারীরাই আবিষ্কার করেছিলো কাপড় বোনা আর বেণীপাকানো। কেনো? তার ক্ষতের লজ্জা ঢাকতে! তাঁর মতে, নারী যৌনদেশ দিয়ে রন্ধ্রটিকে ঢাকতে গিয়েই আবিষ্কার করেছিলো বেণীপাকানো। নারী তার রূপের গর্বেও বিভোর থাকে; এর মূলেও আছে, ফ্রয়েডের মতে, তার যৌনাঙ্গের নিকৃষ্টতা; এ দিয়ে নারী পূরণ করে তার শিশ্ন না থাকার ঘাটতি! নারীর ঈর্ষা পুরুষতন্ত্রের প্রসিদ্ধতম কিংবদন্তি আর দূৰ্মবতম কুসংস্কারগুলোর একটি। তাঁর মতে এর জন্ম শিশ্নাসূয়া থেকে।

নারীর সহজাত নিকৃষ্টতা থেকে জন্ম নেয়া শিশ্নাসূয়ার ফলে, ফ্রয়েড বলেন, নারীর পরাসত্তা–সুপার ইগো–পুরুষের মতো সম্পূর্ণ বিকশিত হয় না, তাই নারীর বিবেক, ন্যায়-অন্যায় ও আদর্শবোধ, সমাজচেতনা খুবই কম। ফ্রয়েড বলেন : ‘নারীর ন্যায়-অন্যায় বোধ খুবই কম; নিঃসন্দেহে এর সম্পর্ক রয়েছে নারীর মানসিক জীবনে ঈর্ষার প্রাধান্যের সাথে।’ এ-কারণেই নারীর নেই সমাজচেতনা, এবং তাদের প্রবৃত্তি লাভ করে না উৎকর্ষ। ফ্রয়েডের এসব হচ্ছে বিজ্ঞানের নামে পুরুষের প্রাধান্য স্থায়ী করার সচেতন ও অবচেতন চক্রান্ত। নারীকে ঈর্ষাকাতর বলার অর্থ হচ্ছে শোষিতরা সবাই ঈর্ষাকাতর; ধনীদের সুখ দেখে গরিবদের চোখ জ্বলে ব’লেই তো গরিবেরা ঈর্ষাকাতর, এবং তাদের নেই বিবেক, ন্যায়-অন্যায় ও আদর্শবোধ আর সমাজের প্রতি দায়িত্ব! ফ্রয়েড বিজ্ঞানের নামে শুধু পুরুষতন্ত্রকেই রক্ষা করতে চেষ্টা করেন নি, টিকিয়ে রাখতে চেয়েছেন সব ধরনের শোষণতন্ত্রকেই।

ফ্রয়েডের ধ্রুববিশ্বাস নারীচরিত্রের, শিশ্নাসূয়া ও অন্যান্য রোগের, শেকড়ে রয়েছে তার বিকলাঙ্গ দেহ। তিনি ভুল বুঝেছিলেন প্রায় সবটাই। নারীমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ফ্রয়েডের ভ্ৰান্তির বড়ো কারণ হচ্ছে তিনি বোঝেন নি বা বুঝতে চান নি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপারের ভিন্নতা : তিনি বোঝেন নি যে নারীর শরীর আর অবস্থার মধ্যে কোনো জৈবিক সম্পর্ক নেই। তিনি, অনেকের মতোই, মনে করেছেন যে নারীর সামাজিক অবস্থা নারীর শরীরের মতো প্রকৃতিরই সৃষ্টি; নারী রয়েছে যে-অবস্থায়, তা-ই নারীর অবধারিত নিয়তি। নারীর অবস্থা যে সামাজের তৈরি, নারী যে শিকার সমাজের, তা তিনি বোঝে নি, কেননা সে-মানসিকতা তার ছিলো না; তিনি বিশ্বাস করেছেন। পুরুষ নারীকে যা করেছে, প্রকৃতি নারীকে করতে চেযেছে তাই! পুরুষ কাজ করেছে শাশ্বত প্রকৃতির বিশ্বস্ত প্ৰতিনিধিরূপে।

ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞানে পুরুষ সক্রিয়তা, আর নারী অক্রিয়তা। পুরুষের সক্রিয়তা আর নারীর অক্রিয়তা তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন এমন ব্যাপার ভিত্তি ক’রে, যার ভিত্তি খুবই দুর্বল। তিনি প্রমাণ হিশেবে নিয়েছেন তাঁর সমকালের নারীপুরুষের যৌন আচরণ, এবং শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর ক্রিয়াকলাপ। তিনি দেখেছেন পুরুষ নারীকে তাড়া ক’রে ফেরে, আর সঙ্গমে নারী থাকে মাটির মতো অক্রিয় আর পুরুষ থাকে বৃষের মতো সক্রিয়, এবং এরই মাঝে প্রমাণ পেয়েছেন নারীপুরুষের জৈবিক স্বভাবের। এটা যে জৈবিক নয়, সামাজিক তা বোঝেন নি তিনি; পিতৃতন্ত্র পুরুষকে শিখিয়েছে সক্রিয়, আর নারীকে অক্রিয় হতে; নারীপুরুষ অভিনয় ক’রে যাচ্ছে নির্দেশিত ভূমিকায়। এর কিছুই জৈবিক নয়; অনুমোদন পেলে নারীও হ’তে পারে চরম সক্রিয়। সামাজিক আচরণ পেরিয়ে ঢুকেছেন তিনি আরো ভেতরে, এবং বিশ্বাস করেছেন যে প্রবিষ্টকরণের কাজটি আর শুক্রাণুর চরিত্র সক্রিয়, আর যোনি ও ডিম্বাণুর আচরণ অক্রিয়। ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৪৭) বলেন :

‘পুরুষের শুক্রাণু সক্রিয় ও চলমান; এটা খুঁজে বের ক’রে নারীর অণুকে, আর ডিম্বাণু অচল এবং অপেক্ষা ক’রে থাকে অক্রিয়ভাবে। কামের অণুজীবরাশির আচরণ সঙ্গমে নারীপুরুষের আচরণের কমবেশি আদর্শ। পুরুষ সঙ্গমের জন্যে নবীকে প্ৰবোচিত করে, আবদ্ধ করে এবং ঠেলে নারীর ভেতরে নিজের পথ ক’বে নেয়।‘

ফ্রয়েড বেশ বাড়িয়ে বলেছেন শুক্রাণুর সক্রিয়তার কথা, এবং তিনি পুরোপুরি অক্রিয় ক’রে দিয়েছেন ডিম্বাণুকে, যদিও তা ঠিক নয়। ডিম্বাণুও পালন করে বেশ সক্রিয় ভূমিকা। ডিম্বাণু ফেলোপীয় নালি দিয়ে বেরিয়ে আসে, শুক্রাণুকে আবদ্ধ করে সক্রিয়ভাবে। তবে এ-অণুজীবরাশির আচরণকে আদর্শ কাঠামো হিশেবে ধরে সমাজকাঠামো ব্যাখ্যা পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক কাজ। পুরুষের তথাকথিত সক্রিয়তা আর নারীর অক্রিয়তার কোনো জৈবিক ভিত্তি নেই, রয়েছে সামাজিক ভিত্তি; পিতৃতান্ত্রিক সমাজই অনুশাসনের মাধ্যমে তাদের চরিত্রকে দিয়েছে এমন রূপ। তবে ফ্রয়েড মনে করেন সক্রিয়তা-অক্রিয়তা জৈবিক, মনে করেন সমাজও দাঁড়িয়ে আছে জৈবভিত্তির ওপর। তাঁর মতে, নারীর কাজ হচ্ছে অক্রিয় থাকা যেমন পুরুষের কাজ সক্রিয় থাকা, কেননা তাঁর প্রকৃতি তাই চেয়েছে।

ফ্রয়োড়ীয় মনোবিজ্ঞানে মানুষের প্রাণশক্তি বা কামের চালকশক্তির নাম লিবিডো। ১৯০৫-এ তিনি লিবিডোকে নির্দেশ করেছিলেন পুরুষধর্মী ব’লে, বলেছিলেন যে লিবিডো ‘নিয়মিতভাবে ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পুরুষপ্রকৃতির, তা পুরুষ বা নারীর যারই হোক’ [মিলেট (১৯৬৯, ১৯২)]। পরে, ১৯২৩-এ, তিনি কিছুটা মত বদলে বলেন যে লিবিডো লিঙ্গনিরপেক্ষা; তবুও ভেতরে ভেতরে তিনি বিশ্বাস করেন যে লিবিডো আসলে পুরুষপ্রকৃতিরই। ১৯৩৩-এ লিবিডো সম্পর্কে ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৬৮-১৬৯) বলেন :

‘কামজীবনের চালিকাশক্তিকে আমরা বলেছি ‘লিবিডো’। এ-কামজীবন নিয়ন্ত্রিত হয়। পুরুষধর্মী ও নারীধর্ম দুই বৈপবীত্য দিয়ে; তাই অনেকে লিবিডোকে এ-দুই বৈপরীত্যের সাথে সম্পর্কিত করার প্ররোচনা বোধ করতে পারেন। এটা বিস্ময়কর মনে হতো না। যদি দেখা যেতো যে কামের প্রত্যেক কপোব বয়েছে নিজ ধরনেব লিবিডো, এর ফলে এক ধরনেব লিবিডো কাজ করতো পুরুষধর্ম কামজীবনের লক্ষ্য থেকে, এবং অন্যটি নারীধর্মী লক্ষ্য থেকে। তবে এমন কিছু ঘটে না। লিবিডো রয়েছে এক ধরনেরই, যা পুরুষের কামের ভূমিকা যতোটা পালন কবে ততোটাই পালন করে নারীর কামের ভূমিকা। এর আমরা কোনো লিঙ্গ নির্দেশ করতে পারি না; যদি আমরা প্রথাগত পুরুষধর্মিতা ও সক্রিয়তার সাদৃশ্য অনুসাবে একে পুরুষধর্ম বলি, তবে আমাদের ভুললে চলবে না যে এর অক্রিয় লক্ষ্যের প্রবর্তনাও রয়েছে। তবে ‘নারীধর্মী লিবিডো’ পদটি গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের ধারণা হচ্ছে যখন লিবিডোকে লাগানো হয় নারীধর্ম কাজে, তখন তার ওপর পীড়ন করা হয় বেশি; এবং পরমকারণমূলকভাবে বলতে গেলে–প্রকৃতি পুরুষেব ভূমিকার দাবির প্রতি যতোটা মনোযোগ দিয়েছে নারীর ভূমিকার দাবির প্রতি ততোটা মনোযোগ দেয় নি। এবং আবারও পরমকারণমূলকভাবে-এর কারণ সম্ভবত এই যে জৈবিক লক্ষ্য অর্জনের ভার দেয়া হয়েছে। পুরুষের আক্রমণাত্মকতার ওপর, যা কিছু পরিমাণে নারীর সহযোগিতা বা সম্মতি নিরপেক্ষ।‘

নারীসম্পর্কে ফ্রয়েডের সবচেয়ে আপত্তিকর সিদ্ধান্তগুলোর কয়েকটি পাচ্ছি এখানে। তিনি যদিও বলেছেন লিবিডোর কোনো লিঙ্গ নেই, তবুও তিনি বিশ্বাস করেন লিবিডো আসলেই পুরুষধর্মী; তাই পুরুষেরই রয়েছে সভ্যতা সৃষ্টির শক্তি, এবং তার ওপর অর্পণ করেছে সমস্ত মানবিক দায়ভার। প্রকৃতি নারীকে দিয়েছে সামান্য লিবিডো, নারীর দাবির দিকে মনোযোগ দেয় নি, এসবই বিজ্ঞানের বেশে ভিক্টোরীয় কুসংস্কার প্রচার। তিনি বিশ্বাস করেন নারীর যেহেতু লিবিডো কম, তাই নারীর পক্ষে পুরুষের মহত্ত্ব অর্জন অসম্ভব; নারীর প্রতিভা নেই সভ্যতাকে কিছু দেয়ার।

তিনি নারীকে বাইরে রেখেছেন সভ্যতার; ‘সভ্যতা ও তার অতৃপ্তি’তে (১৯৩০) দেখিয়েছেন নারী আসলে সভ্যতার শক্ৰ। ফ্ৰয়েড শুধু সভ্যতাসংস্কৃতির ভারই পুরুষের হাতে দেন নি, তিনি মানবপ্রজাতিকে রক্ষার ভারই দিযেছেন পুরুষের ওপর। নারী ধারণ করে মানব, কিন্তু ফ্ৰয়েড একে মূল্যবান মনে করেন না; নারী ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে আধারমাত্র। প্রকৃতি নারীকে মানবপ্রজাতি টিকিয়ে রাখার ভার দেয় নি, দিয়েছে পুরুষকে! তিনি বলেছেন, জৈবিক লক্ষ্য অর্জনের ভার দেয়া হয়েছে পুরুষের আক্রমণাত্মকতার ওপর, যা কিছু পরিমাণে নারীর সহযোগিতা বা সম্মতি নিরপেক্ষ’; অৰ্থাৎ নারী চাক বা না চাক, প্রকৃতি যেহেতু পুরুষকে দিয়েছে মানবপ্রজাতি টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব, তাই পুরুষ নারীকে ফাঁক ক’রে ঠেলে ভেতরে ঢুকে রক্ষা করবে মানবপ্রজাতি। ফ্রয়েডের মানবপ্রজাতি রক্ষার প্রকল্প তাই হয়ে দাঁড়ায় বলাৎকার, যা সহ্য করতে হবে নারীকে।

ফ্রয়েডের চোখে নারীর তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য : অক্রিয়তা, মর্ষকাম, ও আত্মপ্ৰেম। বর্ণনা হিশেবে এগুলো ভুল নয়, তিনি তাঁর সময়ের নারীদের এ-বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন ঠিক মতোই, কিন্তু ব্যাখ্যা করেছেন ভুল। শিতৃতন্ত্র নারীকে দেখতে চায় অক্রিয়, তাই নারী তার স্বভাবের মধ্যে মেনে নিয়েছে অনেকখানি অক্রিয়তা, কেননা সক্রিয় হ’লেই পুরুষতন্ত্র ক্ষেপে ওঠে তার ওপর। পিতৃতন্ত্র সে-নারীকেই মহীয়সী মনে করে যে সহ্য করতে পারে চরম দুঃখযন্ত্রণা, পিতৃতন্ত্র বিরামহীন পীড়ন সহ্য করারকেই মনে করে নারীত্ব। পিতৃতন্ত্র সৃষ্টি করেছে অসংখ্য সতীচরিত্র, সীতা ও রহিমা, যারা মহত্ত্ব অর্জন করেছে শুধু অপাের পীড়ন সহ্য করে। পুরুষ, শো’পনহায়ারের মতো, মনে করে যে নারী জীবনের ঋণ কাজ দিয়ে শোধ করে না, করে দুঃখ দিয়ে। তাই নারীকে বাধ্য হয়েই হয়ে উঠতে হয়েছে মর্ষকামী। পিতৃতন্ত্র নারীকে সম্ভোগসামগ্ৰী রূপে দেখে, এজন্যে নারী আত্মপ্রেম আয়ত্ত কলে অনেকখানি।

অর্থাৎ পিতৃতন্ত্র নারীকে যে-ভূমিকা দিয়েছে, নারী তাতে অভিনয় করেছে নিজের অস্তিত্বের জন্যেই। তবে ফ্রয়েড নারীর অক্রিয়তা, মর্ষকাম, আত্মপ্রেমকে এ-চোখে দেখেন না; তিনি একে মনে করেন জৈবিক ও নারীত্ব। তিনি নারীর মধ্যে খোঁজেন এসবই। তিনি বিধান দেন যে নারীকে হতে হবে অক্রিয়, মর্ষকামী, আত্মপ্রেমিক, এসব যাদের আছে তারাই স্বাভাবিক নারী। নারীকে অক্রিয় হ’তে হবে; কী করতে হবে এর জন্যে? তিনি বলেন, নারীকে ভগাঙ্কুরের সুখ ছেড়ে যেতে হবে মাতৃত্বের দিকে, সুখ খুঁজতে হবে রন্ধে। তাঁর মতে অক্রিয়তা আর মর্ষকাম একান্ত নারীর বৈশিষ্ট্য, এবং জড়ানো একে অন্যের সাথে; তাই এ-দুটি নারীর জন্যে স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক পুরুষের জন্যে। মর্ষকাম নারীসুলভ, আর নারীত্ব মর্ষকামধর্ম। ফ্ৰয়েড বলেন (১৯৩৩, ১৪৮-১৪৯) :

‘তাদের আক্রমণাত্মকতা অবদমনের ফলে, যা নারীদের ওপর চাপিয়ে দেয় তাদের গঠন ও সমাজ, তাদের মধ্যে বিকশিত হয় তীব্র মর্ষকামবাদী প্রবর্তনা, যার ফলে তাদের ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কামগতভাবে রুদ্ধ হয়ে হযে ওঠে অন্তর্মুখি। তাই মর্ষকাম, যেমন বলা হয়ে থাকে, সত্যিকাব্যভাবেই নারী ধর্মী। তবে যখন আমরা মাঝেমাঝেই পুরুষের মধ্যে মর্ষকাম দেখতে পাই, তখন একথা ছাড়া আর কী বলতে পারি যে ওই সব লোকের মধ্যে প্রকাশ ঘটেছে সুস্পষ্ট নারীধর্মী বৈশিষ্ট্য?’

ফ্ৰয়েড মনে করেন নারী জৈবিকভাবেই তৈরি হয়েছে পীড়ন ভোগ করার জন্যে; পীড়ন নারীর জন্যে একধরনের সুখ। তাই পুরুষ যখন পীড়ন করে নারীকে, তখন পুরুষ কোনো অপরাধ করে না, বরং তাকে দেয় সুখ। ফ্রয়েডীয় মর্ষকামবাদকে তার যৌক্তিক পরিণতিতে নিলে দাঁড়ায় যে পীড়নধর্ষণ নারীর জন্যে শুধু ভালোই নয়, বরং নারী ব্যাকুল হয়ে থাকে এরই জন্যে। নারীকে ছিঁড়েফেড়ে ফেললেও, ফ্রয়েডের তত্ত্বানুসারে, পুরুষের কোনো অপরাধ হওয়ার কথা নয়, কেননা তা পরিতৃপ্ত করে নারীর সহজাত মর্ষকামকে! নারী পীড়িত হয়ে সুখ পায়, এমন একটি বাজে কথা চালু রয়েছে কয়েক হাজার বছর ধরে; পুরুষতন্ত্রের মহাপুরুষেরা এ-ধারণাকে জনপ্রিয় করেছেন নানাভাবে, আর ফ্রয়েড দিয়েছেন তাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। ফ্রয়েডীয় মর্ষকামতত্ত্ব নারীপীড়নের বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব, এবং অপবিজ্ঞান।

ফ্রয়েডের নির্দেশিত নারীর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রেম বা নার্সিসিজম। নার্সিসিজম শব্দটি যদিও জন্মেছে আত্মপ্ৰেমমত্ত এক পৌরাণিক পুরুষের নাম থেকে, তবু পুরুষতন্ত্র পৃথিবী জুড়েই আত্মপ্রেমকে মনে করে একান্ত নারীর রোগ; ফ্রয়েডও তাই মনে করেন। নারীর আত্মপ্রেম, নারীর অক্রিয়তা বা মর্ষকামের মতোই, ফ্রয়েডের মৌলিক আবিষ্কার নয়; তাঁর আগে, কয়েক হাজার বছর ধ’রে, নারীর আত্মপ্রেমের বহু উপকথা লিখেছে পুরুষ, ফ্রয়েড দিয়েছেন তার অপবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। তাঁর মতে নারীর আত্মপ্রেম বিকার, তবে খুবই স্বাভাবিক নারীর জন্যে। পুরুষও হতে পারে আত্মপ্রেমিক, স্বীকার করেন ফ্ৰয়েড; তবে পুরুষের আত্মপ্রেম বিকার নয়, তা উন্নত প্রকৃতির; পুরুষের রয়েছে আত্মপ্রেমের উৎকর্ষীয়ণের প্রতিভা।

পুরুষ, ফ্রয়েড বলেন, নিজের প্রেমে পড়ে অন্যের বা নারীর প্রেমে পড়ার মতো করে, তাই তা সুস্থ; কিন্তু স্বভাববিকৃত বিকলাঙ্গ ক্ষীণলিবিডো শিশ্নাসূয়াগ্রস্ত নারী তা পারে না; তার আত্মপ্রেম নিজের দেহকেন্দ্ৰিক। নারী নিজের প্রেমে পড়ে যেমন পুরুষ পড়ে নারীর প্রেমে, অর্থাৎ নারী নিজে পুরুষ হয়ে পড়ে নিজের শরীরের প্রেমে। এটা বিকার। নারী পারে না আত্মপ্রেমের উৎকর্ষ সাধন করতে, পুরুষ পারে। আত্মপ্রেম, ফ্রয়েডের মতে, একান্তভাবেই নারীধর্মী, এবং এর মূলে রয়েছে নারীর শাশ্বত শিশ্নাসূয়া। ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৭০) বলেন :

‘আমরা লক্ষ্য করি যে নারীর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ আত্মপ্রেম, তাই তারা অন্যের প্রেমে পড়ার আবেগের থেকে অনেক বেশি বোধ করে অন্যেরা তাদের প্রেমে পড়বে, সে-আবেগ; রূপের জন্যে গর্ববোধও আংশিকভাবে তাদের শিশ্নাসূয়ারই ফল, তারা তাদের মৌলিক কামানিকৃষ্টতার বিলম্বিত ক্ষতিপূরণ হিশেবেই নিজেদের শারীরিক সৌন্দর্যকে অতি বেশি মূল্য দিয়ে থাকে।‘

নারী যদি একটি শিশ্ন পেতো, তাহলে নিজের রূপে অন্ধ হতো না; শিশ্নের অভাব নারী মিটিয়ে নেয আত্মপ্রেমে! নারীর আত্মপ্রেমের সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফ্রয়েড; তার মতো চমৎকার পর্যবেক্ষক ও শোচনীয় অপব্যাখ্যাকার বেশি মেলে না। সমাজ নারীকে যে-রোগে রুগ্ন দেখতে পছন্দ করে, তার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় যে-রোগের বীজ, ফ্রয়েড তাকে ক’রে তুলেছেন জৈবিক। নারী নিজের রূপসচেতন, রূপের জন্যে অশেষ তার আকুলতা, নিজের রূপে সে বিভোরও হয়, এমনকি পুরুষের চোখেও সে দেখে নিজের মাংসের বিন্যাস; তার কারণ সে জানে সে কামসামগ্ৰী, তার মূল্য তার সম্ভোগযোগ্যতায়। নিজেকে নিজে সম্ভোগের জন্যে নারী আত্মপ্ৰেমমুগ্ধ নয়; পুরুষতন্ত্রের বিধান অনুসারে পুরুষের সম্ভোভযোগ্য হয়ে ওঠার জন্যেই নারী রূপসচেতন। সে জানে তার দেহ খাদ্য হবে পুরুষের, তাই নারী নিজেকে ক’রে তুলতে চায় সুস্বাদু খাদ্য।

মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্‌ট্‌ (১৭৯২) বলেছেন, ‘শিশুবেলা থেকেই শেখানো হয় যে রূপই নারীর রাজদণ্ড, তার মন বেঁকে যায় তার দেহের আদলে, এবং এর কারুখচিত খাঁচার চারদিকে ঘুরেঘুরে সাজাতে শেখে শুধু কারাগারটিকে’ [দ্র। গ্রিয়ার (১৯৭১, ৫৫)]। ফ্রয়েড এসব মনে করেছেন জৈবিক; নারী জৈবিকভাবে অক্রিয়, মর্ষকামী, আর আত্মপ্ৰেমমুগ্ধ। ফ্রয়েড তাঁর সময়ের নারীস্বভাব বর্ণনা করেছিলেন নির্ভুলভাবে, তবে প্রতিক্রিয়াশীলতাবশত তা ব্যাখ্যা করেছেন ভুলভাবে; আর বিধান দিয়েছেন সম্পূর্ণ নারীবিরোধী। যদি দেখি একদল মানুষকে ক’রে ফেলা হযেছে অক্রিয়, দুঃখযন্ত্রণাকে ক’রে তোলা হয়েছে তাদের জীবন, তাদের বাধ্য করা হয়েছে প্ৰভুদের মনোরঞ্জন ক’রে তুচ্ছ গর্বে মেতে উঠতে, তখন কি বলবো যে এসবই অবধারিত, এ-ই। তাদের জৈবস্বভাব? নিশ্চয়ই বলবো না, কিন্তু বলেন মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড। বিশশতকে ফ্রয়োউীয়বাদ দেখা দিয়েছিলো নারীবাদের প্রধান প্রতিপক্ষীরূপে।

কারেন হোরনি, ক্লারা টম্পসন, আলফ্রেড অ্যাডলার বেশ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ফ্রয়েডীয় প্রতিক্রিয়াশীল নারীমনোবিজ্ঞান, কেননা ওই মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য নারীর পুরুষাধীনতাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা। ধর্মের বিরুদ্ধে আজ কথা বলা যায়, প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে যে-কোনো নির্বোধ; কিন্তু বিশশতকে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কথা বলা অসম্ভব। বিজ্ঞানের মুখোমুখি সবাই অসহায়, তার সূত্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার শক্তি নেই সাধারণের। তাই ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞান নারীর বিরুদ্ধে কাজ করেছে প্রথাগত পুস্তকগুলোর থেকে অনেক বেশি প্রচণ্ডভাবে। মনোবিজ্ঞানীরাই প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন ফ্রয়েডীয় নারীমনোবিজ্ঞানের, যদিও তা বিশশতকের শ্রুতিতে প্রবেশ করে নি। কারেন হোরনি মনোবিশ্লেষকদের মধ্যে দেখেছিলেন পুরুষবাদী ঝোঁক; তারা মানুষ বলতে বুঝেছেন পুরুষ, এবং নারীকে দেখেছেন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে।

তিনি শিশ্নাসূয়া, পুংগূঢ়ৈষ্যা, নারীদের হীনমন্যতাবোধ প্রভৃতি ধারণা ব্যাখ্যা করে দেখান যে এগুলো জৈবিক নয়, সাংস্কৃতিক। মর্ষকামের কথা ধরা যাক। হোরনি দেখেছেন কোনোকোনো মনোব্যাধিগ্রস্ত নারী মর্ষকামী, কিন্তু তিনি একে জৈবিক ব’লে মনে করেন নি। তিনি এর দিয়েছেন ফ্রয়েডের থেকে অনেক অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা। তিনি বলেছেন, ‘কোনো জীবন্ত প্ৰাণী যখন পড়ে বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে, তখন সে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয় নিজেকে’ [দ্র উইলিয়মস (১৯৭৭, ৬৮)]। নারী পড়েছে প্ৰাণীজগতের সবচেয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায়, তাই নারী খাপ খাইয়ে নিয়েছে বিপর্যয়ের সাথে। নারীর অবস্থা ও মন ব্যাখ্যার জন্যে বিবেচনা করতে হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো; তার শরীরের বাঁকে, রন্ধে, অন্ধুরে খোঁজাখুঁজি ক’রে ওগুলোর সূত্র মিলবে না।

তিনি মর্ষকামের একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। জারের শাসনকালে রাশিয়ার চাষীনারীরা চাইতো যে তাদের স্বামীরা তাদের প্রহার করুক, ওই প্ৰহার ছিলো প্রেমের প্রমাণ। এতে যদি মনে করা হয় যে নারীরা বা রুশ নারীরা মর্ষকামী, তবে বড়ো ভুল করা হবে। ওই সমাজব্যবস্থায় প্রহারকেই মনে করা হতো প্রেমের প্রকাশ; কিন্তু আজকের রাশিয়ার নারীরা প্রেমের প্রমাণরূপে প্ৰহারের কথা ভাবতেই পারে না। ওই সমাজের বদল ঘটেছে, তাই বদল ঘটেছে নারীর বাহ্যিক আচরণেরও, তবে নারীর প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটে নি। প্রতিটি জাতির ধর্মে, সাহিত্যে, কিংবদন্তিতে নারীকে দেখানো হয়েছে মর্ষকামীরূপে, গাওয়া হয়েছে নারীর মর্ষকামের গাঁথা। আদর্শ সতী মর্ষকামী, আদর্শ মা মর্ষকামী, আদর্শ প্রেমিকা মর্ষকামী, আদর্শ কন্যা মর্ষকামী; নারী পিতৃতন্ত্রের ধর্ষকামের ধারাবাহিক ভোগ্যসামগ্ৰী।

হোরনি বলেছেন, নারীপ্রকৃতি সম্পর্কে যে-ভাবাদর্শ গড়ে তোলা হয়েছে, তা হচ্ছে নারী দুর্বল, আবেগপরায়ণ, অক্রিয়, পরনির্ভর : এ-ভাবাদর্শের জন্যেই নারীকে মনে হয় ওই সব অপবৈশিষ্ট্যের সমষ্টি। পুরুষ নারীকে এমনই দেখতে চায়। এসবের জন্যেই নারী ভূমিকা পালন করে অক্রিয়তার, হয় মর্ষকামী বা আত্মপ্ৰেমমুগ্ধ; কিন্তু একে জৈবিক মনে করার কারণ নেই। ‘প্রেমের অতিমূল্যায়ন’ (১৯৩৪) নামের একটি লেখায় তিনি দেখান যে সামাজিক অবস্থা নারীকে শেখায় যে তাকে হ’তে হবে পিতৃতন্ত্রের আদর্শ নারী; তার জীবনের লক্ষ্য হবে বিশেষ কোনো পুরুষকে ভালোবাসা ও তার ভালোবাসা পাওয়া, তার সেবা করা।

তার জীবন হবে বিশেষ পুরুষকেন্দ্রিক, সে ঘুরবে পুরুষসূর্যকে কেন্দ্ৰ ক’রে। এমন অবস্থা পুরুষের মনে বাড়িয়ে দেয় আত্মমর্যাদাবোধ, আর কমিয়ে দেয় নারীর আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মবিশ্বাস। প্রতিটি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে বারবার পাওয়া যায় এমন সব নির্দেশ, যা পুরুষকে দেবতা আর নারীকে ক’রে তোলে আত্মমর্যাদাহীন জন্তু। ইহুদিধর্মের বিধান হচ্ছে স্ত্রী স্বামীকে সম্বোধন করবে বাআল [প্ৰভু] বা আদোন [বিধাতা] বলে; সম্পূর্ণ আত্মসমৰ্পণ করবে তার কাছে। একটি হাদিসে আছে [দ্র ফজলুর রহমান (১৯৭৭, ৩৩৫)] :

‘স্বামী যদি কুষ্ঠরোগী হয় আর তাহার পুঁজ ইত্যাদি স্ত্রী নিজ জিহ্বা দ্বারা চাটিয়া পরিষ্কার করে, উহাতেও স্ত্রী স্বামীর হাক আদায় করিতে পাবিনে না।‘

হিন্দুদের কামকল্প-এ আছে [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৭১)] :

‘স্বামী ছাড়া পৃথিবীতে নারীর আর কোনো দেবতা নেই।…স্বামী হ’তে পারে বিকলাঙ্গ, বৃদ্ধ, পাপিষ্ঠ, বদমেজাজি, লম্পট, অন্ধ, বধিব বা বোবা। তবু সাবাজীবন নারী তাকে মান্য ক’রে চলবে।‘

এসব বিধানে যেমন পীড়ন করা হয়েছে নারীকে, তেমনি মুছে ফেলা হয়েছে তার আত্মমর্যাদার শেষ কণাটিকেও। নারীপীড়ন, ও তার মর্যাদা অস্বীকারের উৎকট বিধান দিয়েছে আঠারোশতকের এক জাপানি দাম্পত্যবিধিপ্রণেতা; ‘স্ত্রীর প্রতি উপদেশ’-এ সে বলেছে [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৭১)] :

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্বামীর প্রতি নারীর ভক্তি।… স্ত্রী সব সময় কল্পনা করবে সে-সব, যা তার স্বামীর আনন্দ বাড়াবে, তাকে কোনো কিছু করতে দিতে অস্বীকার করবে না। যদি সে অল্পবয়স্ক বালক পছন্দ করে, তবে স্ত্রী বালকের মতো হাঁটু গেড়ে বসবে যাতে স্বামী পেছন দিক থেকে তাকে নিতে পারে। তবে স্ত্রীকে ভুললে চলবে না যে পুরুষ নারীর পায়ুর কোমল প্রকৃতি বুঝতে পারে না, সে জোর ক’রে ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারে। তাই স্ত্রীব উচিত ধীরেধীরে নিজেকে প্রস্তুত করা এবং সিজিশুমি ক্রিম ব্যবহার করা…

এসবের পরেও নারী কী ক’রে রক্ষা করে তার আত্মমর্যাদাবোধ? যে-নারী মেনে নেয় এসব, তার জন্যে সমস্যা নেই, সে চলে যায় সব সমস্যার পরপারে; কিন্তু যে-নারী হ’তে চায় স্বাধীন, জড়িত হতে চায় কোনো পেশায়, তার জন্যে এসব তৈরি করে সংকট। এমন নারী হয়ে পড়ে অসুস্থ, সে ব্যর্থ হয় কর্মে ও প্রেমে। এর পেছনে নারীর শরীরের কোনো ভূমিকা নেই, আছে সমাজসংস্কৃতির ক্রিয়া। সমাজই ব্যর্থ ও অসুস্থ ক’রে দিচ্ছে নারীকে, কিন্তু ফ্ৰয়েড তার নিন্দা করেন পুংগূঢ়ৈষাগ্ৰস্ত ব’লে। হোরনি দেখিয়েছেন, মূলসংকট হচ্ছে প্রেমের অতিমূল্যায়ন, প্রেমকেই নারীর জীবনের সব ব’লে ভাবা; যেনো পুরুষের সাথে নারীর কামসম্পৰ্কই জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিশ। যদি নারী প্রেমেই না পড়লো, প্রেমই না পেলো, স্ত্রীই না হ’তে পারলো, তাহলেই যেনো তার জীবনের সব নষ্ট হয়ে গেল; তার জীবন হয়ে উঠলো অস্বাভাবিক। যে-নারী পিতৃতন্ত্রের বিধান মানে না, সে-ই ব্যাধিগ্রস্ত ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানে; মদিও তা রোগ নয়, তা পিতৃতন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতামনস্ক নারীর বিদ্রোহ।


 নারী

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top