ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০৭. আছে ভালোবাসা আছে ঈর্ষা

সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা :
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে আরও দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর।
কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে! …

‘আকাশলীনা’ নামের কবিতায় ঈর্ষাপরায়ণ চরিত্রের এক অসাধারণ চিত্রায়ণ করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ, যে কবিতায় ঈর্ষাকাতর প্রেমিক অন্য যুবকের সাথে সুরঞ্জনার কথা বলা নিয়ে চিন্তিত, ঈর্ষান্বিত। হ্যাঁ প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে ঈর্ষাপরায়ণতা। প্রেমের মতো ঈর্ষাপরায়ণতার ব্যাপারটাও বোধ হয় মানুষের মজ্জাগত। একতরফাভাবে প্রেম কখনোই কোথাওই হয় না, প্রেমে ছলনা আছে, আছে প্রতারণা। আর ছলনা বা প্রতারণা থাকলে থাকবে ঈর্ষা, থাকবে ঘৃণা, এবং ক্ষেত্রবিশেষে জিঘাংসাও। শুনতে যতই খারাপ লাগুক না কেন ছলনা, বিশ্বাসঘাতকতা, ঈর্ষা বা জিঘাংসার মতো বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্মও হয়েছে প্রেমের মতোই একই বিবর্তনীয় যাত্রাপথে।

বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের এগুলো নিয়েও সঙ্গত কারণেই গবেষণা করতে হয়। ডেভিড বাস তাঁর বই— ভয়ঙ্কর আবেগ:  প্রেম এবং যৌনতার মধ্যে ঈর্ষাও জড়িত থাকে কেন? নামের বইয়ে দেখিয়েছেন, কেউ প্রেমে প্রতারণা করলে আমরা ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠি। ঈর্ষা আসলে একটি সারভাইভাল স্ট্র্যাটিজি বেঁচে থাকার এক সুচতুর পরিকল্পনা। আসলে বিবর্তনের ধারাবাহিকতাতেই ভালোবাসার মতো ঈর্ষার বীজও মানুষের মনে তৈরি হয়েছে, এর পরিস্ফূটন ঘটেছে।

আমাদের বর্তমান মানসিকতার মধ্যে ঈর্ষার বীজ দেখে বোঝা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ঈর্ষা যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল। যাদের মধ্যে ঈর্ষা ছিল না তাঁরা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না, তারা কোনো উত্তরসূরী রেখে যান নি[১১৪]। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের সবাইকে ঈর্ষাপরায়ণ হিসেবে বড় হতে হবে, আর কাউকে দেখলেই ঈর্ষান্বিত হতে হবে। ঈর্ষার ব্যাপারটা বহুলাংশেই সময় এবং পরিস্থিতি নির্ভর। বিবর্তনের কৌশল সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, এছাড়া বিবর্তনের কৌশলজনিত যে কোনো মানবিক বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে পারিসাংখ্যিক সীমায় বিস্তৃত, কারও ক্ষেত্রে কম, কারও ক্ষেত্রে বেশি।

sci-jealous
চিত্র : আমাদের পূর্বপুরুষেদের মধ্যেও ঈর্ষা যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল। যাদের মধ্যে ঈর্ষা ছিল না তাঁরা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না, তারা কোনো উত্তরসূরী রেখে যান নি।

তবে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন ঈর্ষা এবং প্রতারণার রকমফের নারী-পুরুষে ভিন্ন হয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অনুকল্প অনুযায়ী যৌনতা সংক্রান্ত হিংসা কিংবা ঈর্ষার ব্যাপারটি আসলে জৈবিকভাবে অনেকটাই পুরুষদের একচেটিয়া, যাকে বলে ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ বা যৌন-ঈর্ষা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে – কেবল পুরুষদেরই যৌন-ঈর্ষা থাকবে কেন? কারণ হচ্ছে, সঙ্গমের পর গর্ভধারণ এবং বাচ্চা প্রসবের পুরো প্রক্রিয়াটা নারীরা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে, পুরুষদের আর কোনো ভূমিকা থাকে না। ফলে পুরুষরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে কখনোই ‘পুরোপুরি’ নিশ্চিত হতে পারে না।

সত্যি কথা বলতে কী আধুনিক ‘ডিএনএ’ টেস্ট আসার আগ পর্যন্ত আসলে কোনো পুরুষের পক্ষে একশত ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা সম্ভব ছিল না যে সেই তার সন্তানের পিতা। কিন্তু মাতৃত্বের ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। মাকে যেহেতু গর্ভধারণ করতে হয়, প্রত্যেক মা-ই জানে যে সেই তার সন্তানের মা। অর্থাৎ, পিতৃত্বের ব্যাপারটা শতভাগ নিশ্চিত না হলেও মাতৃত্বের ব্যাপারটা নিশ্চিত। এখন চিন্তা করে দেখি আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন বনে জঙ্গলে ছিল অর্থাৎ শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে জীবন চালাতো, তখন কোনো সুনিয়ন্ত্রিত একগামী পরিবার ছিল না। ফলে পুরুষদের আরও সমস্যা হতো নিজেদের ‘পিতৃত্ব’ নিয়ে। পিতৃত্বের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, কারণ বিবর্তনের স্বার্থপর জিনের (Selfish Gene) ধারকেরা স্বার্থপরভাবেই চাইবে কেবল তার দেহেরই প্রতিলিপি তৈরি হোক।

কিন্তু চাইলেই যে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে তা তো নয়। সম্পর্কে প্রতারণা হয়। তার স্ত্রী যে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি করে গর্ভধারণ করবে না, তা সে কীভাবে নিশ্চিত করবে? আদিম বন-জঙ্গলের কথা বাদ দেই, আধুনিক জীবনেও কিন্তু প্রতারণার ব্যাপারটা অজানা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় শতকরা প্রায় ১৩ থেকে ২০ ভাগ পুরুষ অন্যের সন্তানকে ‘নিজ সন্তান’ ভেবে পরিবারে বড় করে। জার্মানিতে সেই সংখ্যা ৯ থেকে ১৭ ভাগ। সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার শতকরা ৯ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়[১১৫]। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় অন্যের (অর্থাৎ নন- জেনেটিক) সন্তানকে নিজ সন্তান ভেবে বড় করার এই প্রতারণাকে বলা হয় কাকোল্ড্রি (Cuckoldry), যার বাংলা আমরা করতে পারি কোকিলাচরণ[১১৬]

non-genetic-graph
চিত্র : সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার (কোকিলাচরণ) শতকরা ৪ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়। যে সমস্ত পুরুষেরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান ( উপরের গ্রাফে লো কনফিডেন্স গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত) , তাদের পরিবারে নন-জেনেটিক সন্তান বেশি পাওয়া গেছে, প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ[১১৭]
এখন কথা হচ্ছে, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রভাব কী? প্রভাব হচ্ছে, কাকোল্ড্রি বা কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা পুরুষের জন্য এক ধরনের অপচয়। কারণ সে ভুলভাবে অন্যের জিনের প্রতিলিপি নিজের প্রতিলিপি হিসেবে পালন করে শক্তি বিনষ্ট করবে। এর ফলে নিজের জিন জনপুঞ্জে না ছড়িয়ে সুবিধা করে দেয় অন্যের জিন সঞ্চালনের, যেটা ‘সেলফিশ জিন’ পারতপক্ষে চাইবে না ঘটতে দিতে। ফলাফল? ফলাফল হচ্ছে, পুরুষেরা মূলত ‘সেক্সুয়ালি জেলাস’ হিসেবে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বেড়ে উঠে।

তারা নিশ্চিত করতে চায় যে, তার যৌনসঙ্গী বা স্ত্রী, কেবল তার সাথেই সম্পর্ক রাখুক, অন্য পুরুষের সম্পর্ক এড়িয়ে কেবল তার সাথেই চলুক। এইটা বজায় রাখতে পারলেই সে শতভাগ না হোক, অন্তত কিছুটা হলেও নিশ্চয়তা পাবে যে, তার এই সম্পর্কের মধ্যে কোকিলাচরণ ঘটার সম্ভাবনা কম। এজন্যই ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ ট্রেডিশনাল সমাজগুলোতে মেয়েদের হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয়, কিংবা বাইরে কাজ করতে দেয়া হয় না – এগুলো আসলে প্রকারান্তরে পুরুষতান্ত্রিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’-রই বহিঃপ্রকাশ।

hijab
চিত্র : ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ সনাতন সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের যে হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয় এগুলো আসলে প্রকারন্তরে পুরুষতান্ত্রিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’রই বহিঃপ্রকাশ।

আসলে নারীকে অন্তরীণ করে, তাদের অধিকার এবং মেলামেশা সীমিত করার মাধ্যমে সে সব দেশে পুরুষেরা নিশ্চিত করতে চায় যে, কেবল তার জিনের প্রতিলিপিই তার স্ত্রীর শরীরে তৈরি হোক, অন্য কারো নয়। কারণ স্ত্রীর কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা তার জন্য হয়ে উঠে ‘সময় এবং অর্থের অপচয়’। পুরুষালি ঈর্ষার মূল উৎস এখানেই। ডেভিড বাস তার ‘Human Mating Strategies’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে সেজন্যই লিখেছেন[১১৮]

যেহেতু মানব শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণুর নিষেকের পুরো প্রক্রিয়াটিই নারীর দেহাভ্যন্তরে ঘটে, পুরুষের মধ্যে নিজের সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। অপর পক্ষে মাতৃত্ব নিয়ে একটি নারীর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, এখানে নিশ্চয়তা শতভাগ, তা সেটা যে শুক্রাণু দিয়েই নিষিক্ত হোক না কেন! কাজেই যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততা কেবল একটি পুরুষের (জেনেটিক) পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারে, নারীর মাতৃত্ব থেকে নয়। … এ সকল কারণে, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, যৌনতার অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোনো আলামত পাওয়া গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই অধিকতর বেশি মনক্ষুণ্ণ হবে।

sexual-jealousy-comparison
চিত্র: অধ্যাপক ডেভিড বাস সহ অন্যান্য গবেষকেরা তাদের গবেষণায় দেখেছেন পুরুষেরা নারীদের চেয়ে অনেক বেশি ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’তে ভোগে। যৌনতার অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোন আলামত পাওয়া গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই অধিকতর বেশি মণক্ষুন্ন হয়।

পুরুষেরা বেশি মনঃক্ষুণ্ণ হবে কারণ, বিবর্তনীয় পরিভাষায় প্রতারিত পুরুষের সঙ্গী গর্ভধারণ করলে তাকে অর্থনৈতিক এবং মানসিকভাবে অন্যের সন্তানের পেছনে অভিভাবকত্বীয় বিনিয়োগ করতে হবে, যার মূল্যমান জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বলে মনে করা হয়। মূলত তার অভিভাবকত্বের পুরোটুকুই বিনিয়োগ করতে হবে এমন সন্তানের পেছনে যার মধ্যে নিজের কোনো বংশাণুর ধারা বহমান নেই। স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা এক ধরনের অপচয়ই বটে। নিজের পিতৃত্বের ব্যাপারে সংশয়ী থাকতে হওয়ায় বিবর্তনীয় যাত্রাপথে পুরুষের মানসপট যৌনতার ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত হয়ে গড়ে উঠেছে, কিন্তু নারীরা মাতৃত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকায়, তা হয়নি[১১৯]

অবশ্য স্বার্থপরভাবে নিজের জেনেটিক ধারা তার সঙ্গীর মাধ্যমে যেন বাহিত হয়, তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। যেমন, পুরুষ ভেলিড মাকড়শা (Veliidae Water Spider) তার সঙ্গীকে কব্জা করার পর কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত শুয়ে থাকে, যাতে সঙ্গম করুক আর নাই করুক, অন্তত অন্য পুরুষ মাকড়শা যেন তার সঙ্গীর দখল নিতে চেষ্টা না পারে। Plecia nearcticas নামের এক ধরনের পতঙ্গের (জনপ্রিয়ভাবে ‘লাভ বাগ’ হিসেবে পরিচিত) নিষেকের ক্ষেত্রেও পুরুষ পতঙ্গটি বেশ কয়েকদিন ধরে স্ত্রী পতঙ্গটিকে জড়িয়ে ধরে রাখে, যাতে অন্য কোনো পতঙ্গ এসে এর নিষেক ঘটাতে না পারে।

আবার, এক ধরনের ফলের মাছি আছে যাদের শুক্ররসের মধ্যে একধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা স্ত্রী-যোনিতে গিয়ে পূর্বাপর সকল শুক্রাণুকে ধ্বংস করে দেয়, এবং প্রকারান্তরে নিশ্চিত করতে চায় যে, কেবল তার শুক্রাণু দিয়েই নিষেক ঘটুক[১২০]। কিছু মথ এবং প্রজাপতির ক্ষেত্রে শুক্ররসের মধ্যে বিদ্যমান কিছু রাসায়নিক পদার্থ ‘সঙ্গম রোধনী’ (Copulatory plug) হিসেবে কাজ করে। এর ফলে যোনির মধ্যে শুক্রাণু ঢুকে ডিম্বাণুর প্রবেশপথে অনেকটা আঁঠার মতো আটকে থাকে যেন পরে অন্য কোনো কোনো পুরুষের শুক্রাণু সেঁধিয়ে গিয়ে ঝোপ বুঝে কোপ মারতে না পারে!

তবে সবচেয়ে চরম উদাহরণ আমি পেয়েছি Johannseniella nitida নামের এক ধরনের মাছির ক্ষেত্রে , সঙ্গম শেষে যাদের পুরুষের লিঙ্গ ভেঙে ভিতরে রয়ে যায়। এ যেন অনেকটা সঙ্গমান্তে নারীর যোনি ছিপি দিয়ে আটকে দেয়া যেন অন্য প্রতিযোগীরা এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে না পারে। যদিও কীট পতঙ্গের সাথে মানুষের পার্থক্য উল্লেখ করার মতোই বিশাল, কিন্তু তারপরেও সঙ্গীকে নিজের অধিকারে রাখার ব্যাপারে স্ট্র্যাটিজিগতভাবে মিল লক্ষণীয়[১২১]। দুর্ভাগ্যবশত অন্য পতঙ্গের মতো মানুষের শুক্রাণুতে সঙ্গমরোধনী আঁঠাও নেই, কিংবা পুরুষাঙ্গ ভেঙে যোনিতেও থেকে যায় না, তবে বিভিন্ন সমাজে পর্দা, বোরখা আর হিজাবের বেপরোয়া প্রয়োগ দেখা যায় বৈকি। এগুলো তো এক ধরনের ছিপিই বলা চলে, কারণ এর মাধ্যমে পুরুষেরা নিশ্চিত করতে চায় যে, এ নারী অন্যের কামুক দৃষ্টি এড়িয়ে কেবল তারই অধিকারভুক্ত হয়ে থাকুক।

পুরুষদের ঈর্ষার ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু মেয়েদেরটা? মেয়েদেরও ঈর্ষা হয়, প্রবলভাবেই হয় তবে, বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত হলো সেটা ঠিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ নয়। মেয়েরা বিবর্তনীয় পটভূমিকায় একজন পুরুষকে রিসোর্স বা সম্পদ হিসেবে দেখে এসেছে। কাজেই একজন পুরুষ একজন দেহাপসারিণীর সাথে যৌনসম্পর্ক করলে মেয়েরা যত না ঈর্ষান্বিত হয়, তার চেয়ে বেশি হয় তার স্বামী বা পার্টনার কারো সাথে রোমান্টিক কিংবা ‘ইমোশনাল’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে।

ডেভিড বাস, ওয়েসেন এবং লারসেনের নানা গবেষণায় এর সত্যতা মিলেছে [১২২]। এখানে আমি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার উল্লেখ করব। প্রাথমিক একটি গবেষণার সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৭৮ সালের একটি গবেষণাপত্রে[১২৩]। ২০ জন পুরুষ এবং ২০ জন নারীকে নিয়ে পরিচালিত সেই গবেষণায় ঈর্ষাপরায়ণ হওয়ার বিভিন্ন উপলক্ষ্য থেকে যে কোনো একটি বেছে নিতে বলা হয়। অপশনগুলোর মধ্যে তার সঙ্গীর অন্য কারো সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন থেকে শুরু করে সঙ্গীর সময় এবং সম্পদ অন্য কারো জন্য বরাদ্দ করার মতো সব পথই খোলা ছিল।

দেখা গেল বিশ জন নারীর মধ্যে সতের জনই সেই অপশন বাছাই করেছে যেখানে তার সঙ্গী অন্য কারো জন্য নিজের সময় এবং সম্পদ ব্যয় করছে। কিন্তু অন্য দিকে বিশ জন পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ষোল জনই অভিমত দিয়েছে তার সঙ্গী অন্য কারো সাথে যৌনসম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষাপরায়ণ করে তুলবে। এধরনের আরেকটি গবেষণা সত্তুরের দশকে চালানো হয়েছিল পনেরোটি দম্পতির মধ্যে[১২৪]। সে গবেষণা থেকেও একইভাবে উঠে এসেছিল যে, পুরুষেরা ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠে যদি তার সঙ্গীর সাথে কোনো তৃতীয়পক্ষের যৌনসম্পর্কের কোনো আলামত পাওয়া যায়। কিন্তু মেয়েদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তারা বেশি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠে যদি তার সঙ্গী অন্য কোনো মেয়ের সাথে আবেগী কিছু করলে যেমন টাংকি মারা, রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ানো, চুমু খাওয়া, এমনকি এগুলো কিছু না করে তার সঙ্গী পুরুষটি অন্য নারীর সাথে কেবল দীর্ঘক্ষণ ধরে কথাবার্তা বললেও সে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে।

এ গবেষণাগুলো থেকে বোঝা যায়, ছেলেরা তার সঙ্গী কার সাথে কতটুকু কথা বলল না বলল তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকে না, যতটা থাকে সঙ্গীর যৌনতার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে। কিন্তু অন্যদিকে মেয়েদেরটা একটু ভিন্ন। তাদের সঙ্গী অন্য কোনো মেয়ের জন্য কতটুকু সময় এবং সম্পদ ব্যয় করল, তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলে।

এ ব্যাপারে বড়সড় গবেষণা করেছেন অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড বাস। ৫১১ জন কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চালানো এ গবেষণায় তাদের কল্পনা করতে বলা হয় যে, তার সঙ্গী কারো সাথে যৌনসঙ্গমে প্রবৃত্ত হয়েছে কিংবা কারো সাথে মানসিক আবেগময় এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি করেছে। কোন ব্যাপারটা তাকে বেশি ঈর্ষাকাতর করে তুলবে? প্রায় ৮৩ শতাংশ নারী মনে করেছে তার সঙ্গী তাকে না জানিয়ে অন্য কোনো মেয়ের সাথে আবেগময় সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে ঈর্ষাপরায়ণ করে তুলবে, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটি মাত্র শতকরা ৪০ ভাগ। অন্যদিকে শতকরা ৬০ ভাগ ছেলে মত দিয়েছে তার সঙ্গী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে চরম ঈর্ষাকাতর করে ফেলবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা পাওয়া গেছে মাত্র ১৭ ভাগ[১২৫]

বাসের এই ফলাফল কেবল আমেরিকার গবেষণা থেকে পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে কোরিয়া, জাপান, চীন, সুইডেনসহ অনেকে দেশেই একই ফলাফল পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে[১২৬]। একই ধরনের ফলাফলের দাবি এসেছে হাঙ্গেরি, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, সোভিয়েত রাশিয়া এবং যুগোস্লাভিয়াতে চালানো সমীক্ষা থেকেও[১২৭]। তাই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন নারী-পুরুষে এই ঈর্ষাগত পার্থক্য সমগ্র মানবজাতির মধ্যেই পারিসাংখ্যিক পরিসীমায় বিস্তৃত।

ধারণা করা হয় বিবর্তনের দীর্ঘদিনের যাত্রাপথে নিজের সঙ্গীকে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে ঈর্ষা প্রদর্শন করে প্রজননগত সফলতা পেয়েছিল, তার বিবিধ ছাপই দেখা যায় আজকের নারী-পুরুষদের মানসপটে। বলাবাহুল্য, নারী এবং পুরুষেরা ভিন্নভাবে সঙ্গী নিজেদের আয়ত্বে রাখার কৌশল করায়ত্ব করেছিল, সেই পার্থক্যসূচক অভিব্যক্তিগুলোই স্পষ্ট হয় নারী পুরুষের ঈর্ষাকেন্দ্রিক মনোভাব ঠিকমতো বিশ্লেষণ করলে।

তবে সবাই যে অধ্যাপক বাসের এ উপসংহারগুলোর সাথে একমত পোষণ করেছেন তা নয়। যেমন করেননি নর্দার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ডেভিড বুলার। তিনি তার বই ‘অভিযোজনরত মনন’ (Adapting Minds) বইয়ে[১২৮] এবং বেশ কিছু প্রবন্ধে অধ্যাপক বাসের ঈর্ষা সংক্রান্ত গবেষণাগুলোর পদ্ধতিগত সমালোচনা হাজির করেছেন[১২৯]। পুরুষেরা কেবল সঙ্গীর যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার সন্ধান পেলেই কেবল ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেন, অন্য কিছুতে তেমন নয় বলে বাস যে অভিমত দিয়েছেন, তা সঠিক নয় বলে বুলার মনে করেন।

আমরা জীবনানন্দ দাশের আকাশলীনা কবিতায় যুবককে দেখেছি সুরঞ্জনা এক অচেনা যুবকের সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন নয়, কেবল কথা বলাতেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। এ ধরনের অনেক পুরুষই আমাদের চারপাশে আছে। আবার যৌনতার ব্যাপারেও উদার পুরুষের সংখ্যাও কম নয়। যেমন, অধ্যাপক বাসের গবেষণা থেকেই উঠে এসেছে যে, জার্মানি কিংবা নেদারল্যান্ডের মতো দেশে যেখানে যৌনতার ব্যাপারগুলো অনেক শিথিল, সেখানে পুরুষেরা সঙ্গীর যৌনতার ব্যাপারে অনেক কম ঈর্ষাপরায়ণ থাকেন। কোরিয়া এবং চীনের মানুষদের উপর গবেষণা করেও দেখা গেছে সেখানকার পুরুষেরা সঙ্গীর যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পেলে অন্য অনেক দেশের পুরুষদের মতো খুব বেশি মনঃক্ষুণ্ণ হন না।

আবার নারীদের ক্ষেত্রেও তারা কেবল সঙ্গীর রোমান্টিক কিংবা ‘ইমোশনাল’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়, সঙ্গীর রোমান্সবিহীন যৌন সম্পর্ককে নয় বলে ঢালাওভাবে উপসংহার টানা হয়েছে সেটাও কতটুকু নিশ্চিত সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি ক্যালিফোর্নিয়ার ভূতপূর্ব গভর্নর এবং খ্যাতিমান অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার এবং তার স্ত্রী মারিয়া শ্রাইভারের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যেতে। আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে তার বাসার গৃহপরিচারিকার সাথে যৌনসম্পর্ক রেখেছিলেন। এমন নয় যে, শোয়ার্সনেগার পরিচারিকার সাথে কোনো ‘রোমান্টিক সম্পর্কে’ জড়িয়েছিলেন।

যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পাওয়াতেই মারিয়া শ্রাইভার শোয়ার্সনেগারকে ছেড়ে চলে গেছেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা সঙ্গীর যৌন-অবিশ্বস্ততাকে খুব গুরুত্ব দিয়েই গ্রহণ করে, অধিকাংশ পুরুষের মতোই। তাই অধ্যাপক বুলারের মতে বিবর্তন পুরুষ নারীতে ঈর্ষার কোনো ‘আলাদা মেকানিজম’ তৈরি করেনি, বরং নারী পুরুষ উভয়ই ঈর্ষাকেন্দ্রিক একই মেকানিজমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কেবল এর পরিস্ফুটন পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হয়।


 ভালোবাসা কারে কয়


১১৪.↑  David M. Buss , The Dangerous Passion: Why Jealousy Is As Necessary As Love and Sex, Free Press, 2000

১১৫.↑  (i)  Who’s your Daddy? Is it true 10-15% of children in modern society were not sired by their putative fathers?↑ (ii) Also see – MacIntyre S., A. Sooman, Non paternity and prenatal genetic screening. Lancet 338:869-871, 1991; R.R. Baker & M.A. Bellis, Human Sperm Competition: Copulation, Masturbation and Infidelity, Springer,1999

১১৬.↑   কোকোন্ড্রি বা কোকিলাচরণ

১১৭.↑  Kermyt G. Anderson, Reports : How Well Does Paternity Confidence Match Actual Paternity? Evidence from Worldwide Nonpaternity Rates, Current Anthropology 48(3):511-518.

১১৮.↑  David Buss, Human Mating Strategies. Samfundsokonomen, 4, 47-58, 2002.

১১৯.↑  Alan S. Miller and Satoshi Kanazawa, Why Beautiful People Have More Daughters: From Dating, Shopping, and Praying to Going to War and Becoming a Billionaire– Two

১২০.↑  T.R. Birkhead, and F.M. Hunter, Mechanisms of sperm competition. Trends in Ecology and Evolution. 5:48-52,1990.

১২১.↑  David M. Buss, The Evolution Of Desire – Revised 4th Edition, Basic Books, 2003

১২২.↑  Buss, D.M., Larsen, R.J., Westen, D., & Semmelroth, J. (1992). Sex differences in jealousy: Evolution, physiology, and psychology. Psychological Science , 3:251-5 দ্রষ্টব্য।

১২৩.↑  M W Teismann, D L Mosher, Jealous conflict in dating couples, Psychol Rep. 1978 Jun;42(3 Pt 2):1211-6

১২৪.↑  J. L. Francis, Toward the management of hetosexual jealousy, Journal of Marriage and Family, 10, 61-69, 1977

১২৫.↑  David M. Buss , The Dangerous Passion: Why Jealousy Is As Necessary As Love and Sex, Free Press, 2000

১২৬.↑ উদাহরণ হিসাবে দ্রষ্টব্য নীচের গবেষণাপত্রগুলি —

  • D.C. Geary, M. Rumsey, C.C. Bow-Thomas, & Hoard, M.K. Sexual jealousy as a facultative trait: Evidence from the pattern of sex differences in adults from China and the United States. Ethology and Sociobiology, 16, 355-383, 1995
  • M.W Wiederman,., & E. Kendall, Evolution, gender, and sexual jealousy: Investigation with a sample from Sweden. Evolution and Human Behavior, 20, 121-128, 1999.

১২৭.↑ David M. Buss, The Evolution Of Desire – Revised 4th Edition, Basic Books, 2003

১২৮.↑ David J. Buller, Adapting Minds: Evolutionary Psychology and the Persistent Quest for Human Nature, The MIT Press; 2005.

১২৯.↑ David J. Buller, Sex, Jealousy & Violence: A Skeptical Look at Evolutionary Psychology, Skeptic, volume 12 number 1 ↑

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়