বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৬. ধর্মীয় সৃষ্টতত্ত্ব বা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন

৭) বিবর্তনের সাথে সাথে স্কুল কলেজের বিজ্ঞানের পাঠ্যসুচীতে ধর্মীয় সৃষ্টতত্ত্ব বা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন পড়ানাে উচিত।

অনেকেই নিরপেক্ষতার খাতিরে এ ধরনের যুক্তিকে গ্রহনযােগ্য বলে মনে করেন। সত্যি তাে, বিবর্তনবাদের পাশাপাশি সৃষ্টি তত্ত্ব স্কুল কলেজের বিজ্ঞানের ক্লাশগুলােতে পড়ালে অসুবিধাটা কি? একটু চিন্তা করলেই এ ধরনের যুক্তির নানা অসারতা ধরা পড়ে। আমাদের সমাজে ছড়িয়ে আছে হাজারাে লােক কথা, উপকথা, কুসংস্কার আর রূপকথা। সবকিছুকেই কি বিজ্ঞানের ক্লাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়? নাকি উচিৎ?

বিজ্ঞানের সংজ্ঞাই হচ্ছে – পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ ও পদ্ধতিগতভাবে লব্ধ জ্ঞান। বিজ্ঞানীরা বলেন, অলৌকিক কিংবা অপার্থিব (Supernatural) বিষয়গুলাে বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ন, কারণ ওগুলাে পরীক্ষা করে সত্যাসত্য নির্ণয় করা যায় না। ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা কিংবা কোন বুদ্ধিমান সত্ত্বা সত্যিই এ মহাবিশ্ব বানিয়েছিলেন কিনা এটি বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা কিংবা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। আর তা ছাড়া অলৌকিক কারণ খুঁজতে চাইলে সব কিছুতেই অলৌকিক কারণ খুঁজে ফেরা সম্ভব।

গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে আকর্ষণ বলকে মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে তার পেছনে কোন বুদ্ধিদীপ্ত সত্ত্বার কারসাজি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, ঠিক যেমনি ভাবে বৃষ্টিপাতেরর কারণকে জলচক্র (Water cycle) দিয়ে ব্যাখ্যা না করে কোন অশরীরী সত্ত্বার কাজ বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু এ ধরনের ব্যাখ্যাকে কি ‘বৈজ্ঞানিক’ বলা যাবে নাকি বিজ্ঞানের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক হবে?

শুধু বিজ্ঞান কেন আমরা দৈনিন্দিন জীবনের ঘটনাবলিকে প্রাকৃতিক কারণ দিয়েই ব্যাখ্যা করি। কোন উড়ােজাহাজ দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে ভূপাতিত হলে পুলিশ এবং গােয়েন্দারা এর পেছনে তার পেছনে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কিনা, কিংবা মিসাইলের কোন আঘাত লেগেছিল কিনা, কিংবা বিমানের ভিতরে কোন সন্ত্রাসবাদী বােমা বহন করছিল কিনা, এধরনের বিভিন্ন পার্থিব কারণই অনুসন্ধান করেন, অলৌকিক কিংবা অপার্থিব কারণ নয়। বাসায় ডাকাতি হলে আমরা চোর ডাকাতদের অভিযুক্ত করেই থানায় রিপাের্ট করি, কোন অশরীরী সত্ত্বাকে অভিযুক্ত করে নয়। ডগলাস ফুটুইমা বিবর্তনবাদের উপর সবার্ধিক বিক্রিত পাঠ্যপুস্তক ‘Evolution’ -এ সরাসরি বলেছেন[১]:

যেহেতু অপার্থিব বা অলৌকিক অনুকল্পগুলাে বৈজ্ঞানিক ভাবে পরীক্ষণ যােগ্য নয়, সেহেতু এ নিয়ে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণা হতে পারে না। তার মানে এই যে, এ ধরনের বিষয়গুলাে বিজ্ঞানের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত হবার যােগ্য নয়।

ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন বা সৃষ্টির বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্পকে যারা স্কুলের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করতে চান, তাদের দাবী যে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, তা দেখিয়ে দশম অধ্যায়ে (ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন অধ্যায় দ্রষ্টব্য) বিস্তারিতভাবে আলােচনা করেছি। বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্প মুলতঃ কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণারই অংশ নয়, কারণ কোন বৈজ্ঞানিক জার্নালেই তাদের কোন গবেষণার প্রতিফলন দেখা যায় না। রিচার্ড ডকিন্স এবং জেরী কয়েন ২০০৫ সালে সেপটেম্বর মাসে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ‘One side can be wrong’ প্রবন্ধে তাই লিখেছেন[১৭]:

আইডি যদি একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হত, তবে বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলােতে এ নিয়ে গবেষণার প্রতিফলণ আমরা দেখতে পেতাম। আমরা তেমন কোন কিছুই এখনাে দেখি নাই। এমন নয় যে বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলাে আই ডি সংক্রান্ত গবেষণা ছাপতে চায় না। আসলে আই ডি নিয়ে ছাপার মত কোন গবেষণারই অস্তিত্ব নেই। আইডির প্রবক্তারাও এটি বােঝেন। তাই তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ জনগণের কাছে আর সুচতুর সরকারী কর্মকর্তাদের কাছে ধর্ণা দিচ্ছেন।

 

৮) বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক থেকে বােঝা যায় যে, বিবর্তনবাদ আসলে ভুল, ডারউইনের তত্ত্বের কোন ভিত্তি নেই।

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে এ নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলােচনা করা হয়েছে। কোন বৈজ্ঞানিক জার্নালে বিবর্তনের বিরােধিতা করা হয় না। বিজ্ঞানীরা বিবর্তন কিভাবে ঘটছে অর্থাৎ বিবর্তনের বিভিন্ন ধরণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলেও বিবর্তনবাদের মূল বিষয়বস্তু অর্থাৎ ‘বিবর্তন আদৌ ঘটছে কিনা’ তা নিয়ে একবারও সন্দেহ প্রকাশ করেন না। কারণ বিবর্তনের বাস্তবতা অনেক আগেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে, এখন জার্নালগুলােতে বিতর্ক চলেছে বিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে, কিংবা বিবর্তন ঘটার হার নিয়ে কিংবা প্রজাতির উদ্ভবের পেছনে থাকা কোন কারিগরী বিষয় নিয়ে।

এ ধরনের সুস্থ বিতর্ক বিবর্তন কেন, বিজ্ঞানের সকল শাখাতেই বিদ্যমান। বিজ্ঞান যে অনবরত প্রশ্ন করে, চোখ বন্ধ করে কিছুই মেনে নেয় না, নতুন নতুন জ্ঞানের আলােকে পুরনােকে ঝালাই করে এগিয়ে চলে এটা বিজ্ঞানের শক্তিশালী দিক, একে খারাপ প্রতিপন্ন করার চেষ্টাই বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

অথচ সৃষ্টিবাদীরা বিজ্ঞানের এই শক্তিশালী দিকটি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেন। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিফেন জে গুড যখন তার বিবর্তনের ‘Punctuated-equilibrium‘ এর মডেলটি উপস্থাপন করলেন, তখন সৃষ্টিবাদীরা তাদের বিভিন্ন ওয়েব সাইটে গুডের রচনার বিভিন্ন অংশ লিপিবদ্ধ করে প্রমাণ করতে চাইলেন যে বিজ্ঞানীরা নিজেরাই বিবর্তনের মত বিতর্কিত বিষয়ে নিয়ে একমত নন।

অথচ বাস্তবতা কিন্তু ঠিক উল্টো। স্টিফেন জে গুড সারা জীবন ধরেই বিবর্তনবাদের পক্ষেই প্রচার চালিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি করতে বিবর্তন বিষয়ে বহু জনপ্রিয় ধারার প্রবন্ধও লিখেছেন। অথচ সৃষ্টিবাদীরা অসচেতন জনগণের মধ্যে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন যেন মনে হয় গুড়ে তার নতুন তত্ত্বের মাধ্যমে পুরাে বিবর্তনকেই অস্বীকার করছেন।

আর ‘অধিকাংশ বিজ্ঞানীরাই বিবর্তন তত্ত্বকে অস্বীকার করেন’- এরকম একটা ধারণা সৃষ্টিবাদীরা জনগণের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে সচেষ্ট হলেও ব্যাপারটা কিন্তু আসলে ডাহা মিথ্যা। ১৯৯৫ সালে আমেরিকার বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীদের মধ্যে চালানাে জরিপে (Gallup poll, 1995) দেখা যায় এদের মধ্যে মাত্র ৫% সৃষ্টিবাদী, বাকি সবারই আস্থা আছে বিবর্তন তত্ত্বে।

আর যারা জীববিজ্ঞান এবং প্রাণের উৎস নিয়ে গবেষণা করেন তাদের মধ্যে তাে ইদানিংকালে সৃষ্টিবাদীদের খুঁজে পাওয়াই ভার। ৪.৮০,০০০ জন জীববিজ্ঞানীদের উপর চালানাে জরিপে মাত্র ৭০০ জন জন সৃষ্টিতাত্ত্বিক পাওয়া গেছে, শতকরা হিসেবে যা ০.১৫ এরও কম[১৮]। কিন্তু এদের মধ্যে আবার অনেকেই প্রাণের প্রাথমিক সৃষ্টি কোন এক সৃষ্টিকর্তার মাধ্যমে হয়েছে মনে করলেও তারপর যে প্রাণের বিবর্তন ঘটছে প্রাকৃতিক নিয়মেই তা মেনে নেন।

এ জরিপের ফল শুধু আমেরিকার ভেতর থেকেই উঠে এসেছে, যে দেশটি আক্ষরিক অর্থেই ‘সৃষ্টিবাদীদের আখড়া’ হিসেবে পরিচিত এবং রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে অনেক বেশী রক্ষণশীল। এদিক দিয়ে অনেক বেশী প্রগতিশীল অবস্থানে থাকা ইউরােপীয় বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোন সৃষ্টিবাদী বিজ্ঞানী নেই বললেই চলে।

বহু বৈজ্ঞানিক সংগঠন বিবর্তনের সপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণকে এতই জোরালাে বলে মনে করেন যে, বিবর্তনের সমর্থনে তারা নিজস্ব Statement পর্যন্ত প্রকাশ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত National Academy of Science এর মত প্রথিতযশা সংগঠন ১৯৯৯ সালে বিবর্তনের স্বপক্ষে লিখিত বক্তব্য দিয়ে একটি ওয়েবসাইট পর্যন্ত প্রকাশ করেছে। ১৯৮৬ সালে লুজিয়ানা ট্রায়ালে বাহাত্তর জন নােবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী সুপ্রিম কোর্টে বিবর্তনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন প্রদান করেছিলেন।

জীববিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ববিজ্ঞান, জেনেটিক্স, জিনােমিক্স বা আণবিক জীববিদ্যার কোন শাখাই বিবর্তনের কোন সাক্ষ্যের বিরােধিতা করছে না; আমরা তৃতীয় অধ্যায়ে দেখেছি যে ডারউইনের পরে গত দেরশাে বছরের কিভাবে বিবর্তন তত্ত্ব পরিবর্ধিত এবং পরিমার্জিত হয়েছে। জেনেটিক্সের বিভিন্ন শাখার গবেষণা যে গতিতে এগিয়ে চলেছে তাতে আশা করা যায় আমরা আচিরেই আরও অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তর পেতে সক্ষম হব। আর বিজ্ঞানীরা সে লক্ষ্যেই নিরন্তর কাজ করে চলেছেন।


 বিবর্তনের পথ ধরে


১.↑ Futuyma DJ, 2005, Evolution, pg.523, Sinauer Associates, INC, MA, USA

১৭.↑ Dawkins R and Coyne J, 2005, One Side Can be Wrong, Guardian.

১৮.↑ CA111: Scientists reject evolution?, 2006, Talk Origin Archive

 

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা