বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৬. ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইনের দেওয়া ‘যুক্তিগুলাে’ (দুই)

বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিদ অধ্যাপক ভিকটর স্টেংগর তার ‘The Unconscious Quantum: Metaphysics in Modern Physics and Cosmology’ বইয়ে দেখিয়েছেন চলক আর ধ্রুবকগুলাের মান পরিবর্তন করে আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মতই অসংখ্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরী করা যায়, যেখানে প্রাণের উদ্ভবের মত পরিবেশ উদ্ভব ঘটতে পারে। এর জন্য কোন সূক্ষ্ম সমন্বয় বা ‘ফাইন টিউনিং’ এর কোন প্রয়ােজন নেই। ডঃ স্টেংগর যখন বলেন, ‘সূক্ষ্ম-সমন্বয়বাদীদের দাবীর এমন কোন ভিত্তি নেই যাতে তারা অনুমান করতে পারেন যে, একমাত্র একটি সঙ্কীর্ণ সীমা ছাড়া জীবন সৃষ্টি অসম্ভব’- তখন সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে আমাদের উপায় থাকে না।

এছাড়াও Physical Review জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে অ্যান্থনি অ্যাগুরি (Anthony Aguirre) স্বতন্ত্রভাবে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্বের ছয়টি প্যারামিটার বা পরিবর্ত রাশিগুলাে বিভিন্নভাবে অদলবদল করে গ্রহ, তারা এবং পরিশেষে কোন একটি গ্রহে বুদ্ধিদীপ্ত জীবন গঠনের উপযােগী পরিবেশ তৈরী করা সম্ভব – কোন ধরনের Anthropic Argument’-এর আমদানী ছাড়াই[৩৮]

ইনফ্লেশন বা স্ফীতি তত্ত্বের[৩৯] সাম্প্রতিক ফলাফলগুলােও তথাকথিত ‘ফাইন-টিউনিং’-এর ধারণাগুলােকে প্রত্যাখান করছে। ইনফ্লেশন বা স্ফীতি তত্ত্ব নিয়ে প্রখ্যাত পদার্থবিদ আঁদ্রে লিন্ডে আর তার দলবলের সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল যদি সত্যি হয়ে থাকে, তা হলে আমাদের মহাবিশ্বের মতই বাস্তবে আরাে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব রয়েছে। একাধিক মহাবিশ্বের ধারণাটি কোন ঠাকুরমার ঝুলির রূপকথা নয়, নয় কোন স্টারট্রেক মুভি বা আসিমভের সায়েন্সফিকশন। অতি সংক্ষেপে অনন্ত মহাবিশ্বের ধারণাটিকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যক্ত করা যায় এভাবে [৪০]:

আমাদের মহাবিশ্ব যদি কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মধ্য দিয়ে স্থান-কালের শূন্যতার ভিতর দিয়ে আবির্ভূত হয়ে থাকে, তবে এই পুরাে প্রক্রিয়াটি কিন্তু একাধিকবার ঘটতে পারে, এবং হয়ত বাস্তবে ঘটেছেও। এই একাধিক মহাবিশ্বের অস্তিত্বের ব্যাপারটি প্রাথমিকভাবে ট্রিয়ন, অ্যালেন গুথ, আর পরবর্তীতে মূলতঃ আদ্রে লিন্ডের গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বলা হয়ে থাকে সৃষ্টির উষালগ্নে ইনফ্লেশনের মাধ্যমে প্রসারণশীল বুদ্বুদ (Expanding Bubbles) থেকে আমাদের মহাবিশ্বের মতই অসংখ্য মহাবিশ্ব তৈরী হয়েছে, যেগুলাে একটা অপরটা থেকে সংস্পর্শবিহীন অবস্থায় দূরে সরে গেছে। এ ধরনের অসংখ্য মহাবিশ্বের একটিতেই হয়ত আমরা অবস্থান করছি অন্য গুলাের অস্তিত্ব সম্বন্ধে একেবারেই জ্ঞাত না হয়ে।

মাল্টিভার্স বা অনন্ত মহাবিশ্বের ধারণা কিন্তু শেলের মতই আঘাত করেছে ‘ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন’-এর প্রবক্তাদের বুকে। কারণ, সাদামাটা কথায় এ তত্ত্ব বলছে যে, হাজারাে-লক্ষ-কোটি মহাবিশ্বের ভীরে আমাদের মহাবিশ্বও একটি। স্রেফ সম্ভাবনার নিরিখেই এমন একটি মহাবিশ্বে চলকগুলাের মান এমনিতেই এত সূক্ষভাবে সমন্বিত হতে পারে, অন্যগুলােতে হয়ত হয়নি। আমাদের মহাবিশ্বের চলকগুলাে আকস্মিকভাবে এই রূপে সমন্বিত হতে পেরেছে বলেই এতে প্রাণের উন্মেষ ঘটেছে; এতে এত আশ্চর্য হবার কিছু নেই! কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েল সােসাইটি রিসার্চ প্রফেসর মার্টিন রীস সেটিই খুব চমৎকারভাবে একটি উপমার মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন[১২]:

অসংখ্য মহাবিশ্বের ভীরে আমাদের মহাবিশ্বও একটি। অন্য মহাবিশ্বে বিজ্ঞানের সূত্র আর চলকগুলাে হয়ত একেবারেই অন্যরকম হবে।… কাজেই ঘড়ির কারিগরের সাদৃশ্য এখানে একেবারেই অচল। তার বদলে বরং আমাদের বিশ্বব্রহ্মান্ডকে অনেকটা পরিত্যক্ত সেকেন্ড হ্যান্ড কাপড়ের দোকানের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। দোকানের মজুদ যদি বিশাল হয় তবে দোকানের কোন একটি জামা আপনার গায়ে ঠিকমত লেগে গেলে আপনি নিশ্চয় তাতে বিস্মিত হবেন না! ঠিক একইভাবে আমাদের মহাবিশ্ব যদি ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মহাবিশ্বের একটি হয়ে থাকে, দোকানের একটি জামার মতই সূক্ষ-সমন্বয় দেখে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

image-10-5
চিত্র ১০.৫; মালটিভার্স হাইপােথিসিস অ্যাঙ্খোপিক এবং ফাইন-টিউনিং আর্তুমেন্টের একটি সহজ সমাধান দেয়।

‘ফাইন টিউনিং’ আগ্রুমেন্টের এর সমালােচনা করেছেন নােবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়েইনবার্গও। তিনি A Designer Universe? প্রবন্ধে এ ধরনের যুক্তির সমালােচনা করে বলেন :

‘কোন কোন পদার্থবিদ আছেন যারা বলেন প্রকৃতির কিছু ধ্রুবকের মানগুলাের এমন কিছু মানের সাথে খুব রহস্যময়ভাবে সূক্ষ-সমন্বয় (fine-tune) ঘটেছে যেগুলাে জীবন গঠনের সম্ভাব্যতা প্রদান করে। এ ভাবে একজন মানব দরদী সৃষ্টিকর্তাকে কল্পেণা করে বিজ্ঞানের সব রহস্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। আমি এই ধরনের সু-সমন্বয়ের ধারণায় মােটেও সন্তুষ্ট নই।

মাইকেল আইকেদা, বিল জেফ্রিস, ভিকটর স্টেংগর, রিচার্ড ডকিন্স সহ অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন এই ‘ফাইন টিউনিং’ বা ‘এনথ্রোপিক আর্গুমেন্ট’গুলাে সেই পুরােন ‘গড ইন গ্যাপস’ আগ্রুমেন্টেরই নয়া সংস্করণ। যেখানে রহস্য পাওয়া যাচ্ছে, কিংবা আধুনিক বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, সেখানেই অতিপ্রাকৃতিক কোন কিছু আমদানী করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানাে হচ্ছে। এভাবে মুক্ত-বুদ্ধি এবং বিজ্ঞান চর্চাকে উৎসাহিত না করে বরং অন্ধ বিশ্বাসের কাছে প্রকারন্তরে নতি স্বীকারে আমাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে।

আসলে অনেক বিজ্ঞানীই আজ এই মতের সাথে পুরােপুরি আস্থাশীল যে, মহাবিশ্ব মােটেও আমাদের জন্য ‘ফাইন টিউনড’ নয়, বরং আমরাই এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে টিকে থাকার সংগ্রামে ধীরে ধীরে নিজেদেরকে ‘ফাইন টিউন্ড’ করে গড়ে নিয়েছি। ব্যাপারটা হয়ত মিথ্যে নয়। আবারও আমাদের চোখের কথাই ধরা যাক। মানুষের চোখ বিবর্তিত হয়েছে এমনভাবে যে, এটি লাল থেকে বেগুনি পর্যন্ত এই সীমার তড়িচ্চুম্বক বর্ণালিতেই কেবল সংবেদনশীল।

এর কারণ হল, আমাদের বায়ুমন্ডল ভেদ করে এই সীমার আলােই বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীতে এসে পৌঁছুচ্ছে। কাজেই সেই অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে আমাদের চোখও সেভাবেই বিবর্তিত হয়েছে। এখন এই পুরাে ব্যাপারটিকে কেউ উলটোভাবেও ব্যাখ্যা করতে চাইতে পারেন। বলতে পারেন যে, কোন এক বুদ্ধিদীপ্ত সত্ত্বা আমাদের চোখকে কে লাল থেকে বেগুনী আলাের সীমায় সংবেদনশীল করে গড়বেন বলেই বায়ুমন্ডলের মাধ্যমে তিনি সেই সীমার মধ্যবর্তী পরিসরের আলাে আমাদের চোখে প্রবেশ করতে দেন। তাই আমাদের চোখ এরকম।

কিন্তু এভাবে ব্যাখ্যা করাটা কতটা যৌক্তিক? অনেকটা ঘােড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেওয়ার মতনই শােনায়। তারপরও ‘ফাইন টিউনার’রা ঠিক এভাবেই যুক্তি দিতে পছন্দ করেন। মহাজাগতিক ধ্রুবকগুলাের মান এরকম কেন, বৈজ্ঞানিকভাবে এটি না খুঁজে এর ব্যাখ্যা হিসেবে ‘না হলে পরে পৃথিবীতে প্রাণের আর মানুষের আবির্ভাব ঘটত না’ এই ধরণের যুক্তি হাজির করেন।

প্রাণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই যদি মূখ্য হয়, তবে মহাবিস্ফোরণের পর সৃষ্টিকর্তা কেন ৭০০ কোটি বছর লাগিয়েছিলেন এই পৃথিবী তৈরী করতে, আর তারপর আরাে ৬০০ কোটি বছর লাগিয়েছিলেন মানবতার উন্মেষ ঘটাতে তার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। পৃথিবী উৎপত্তির ইতিহাসের পরিক্রমায় আমরা আজ জানি, মানুষ তাে পুরাে সময়ের একশ ভাগের এক ভাগেরও কম সময় ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করছে। তারপরও মানুষকে এত বড় করে তুলে ধরে মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার কি প্রয়ােজন?

আসলে শতাব্দী প্রাচীন ‘মানবকেন্দ্রিক’ সংস্কারের ভুত মনে হয় কারাে কারাে মাথা থেকে যাচ্ছেই না। সেই টলেমীর সময় থেকেই আমরা তা দেখে এসেছি। আমাদের এই পৃথিবীটা যে মহাকাশের কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া একটা নিতান্ত সাধারণ গ্রহ মাত্র, -এটি যে কোন কিছুরই কেন্দ্রে নয় – না সৌরজগতের, না এই বিশাল মহাবিশ্বের – এ সত্যটি গ্রহণ করতে মানুষের অনেকটা সময় লেগেছে।

পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিলে এর বিশিষ্টতা ক্ষুন্ন হয় এই ভয়েই বােধ হয় টলেমীর ‘ভূ-কেন্দ্রিক’ মডেল জনমানসে রাজত্ব করেছে প্রায় দু’হাজার বছর ধরে, আর ধর্ম বিরােধী সত্য উচ্চারণের জন্য কোপার্নিকাস, ব্রুনাে, গ্যালিলিওদের সইতে হয়েছে নির্যাতন। একই দৃষ্টিভঙ্গি আমরা দেখেছি উনবিংশ শতাব্দীতে (১৮৫৯ সাল) যখন চার্লস ডারউইন এবং আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে জীবজগতের বিবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপন করলেন।

বিবর্তনের ধারণা সাধারণ মানুষ এখনও ‘মন থেকে নিতে পারে নি’ কারণ এই তত্ত্ব গ্রহণ করলে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের বিশিষ্টতা ক্ষুন্ন হয়ে যায়! এই সংস্কারের ভুত এক-দু দিনে দূর হবার নয়। তাই রহস্য দেখলেই, জটিলতা দেখলেই মানুষ আজও নিজেকে সৃষ্টির কেন্দ্রে রেখে, পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে বসিয়ে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে। ‘ফাইন-টিউনিং’ আর ‘অ্যানথ্রোপিক আগুমেন্ট’গুলাে এজন্যই মানুষের কাছে এখনও এত আকর্ষণীয় বলে মনে হয়।

অধিকাংশ বিজ্ঞানীই আজ মনে করেন মহাবিশ্বের অস্তিত্বের পেছনে সৃষ্টির ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ অনুকল্পটি (জীববিজ্ঞান এবং জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই) কিছু গোঁড়া খ্রীষ্টানদের ধর্মবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত একটি বিশ্বাস-নির্ভর ধারণার চতুর অভিব্যক্তি মাত্র এবং এটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িতও নয় যে এটির সত্যতা কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দ্বারা কখনও নির্ণীত হওয়া সম্ভব। সেজন্যই এটি কখনও বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবী করতে পারে না।

বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের সাফল্যজনক প্রয়ােগেই মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটন করতে প্রয়াসী হয়েছেন, বহু ক্ষেত্রেই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। এভাবেই ধাপে ধাপে আমরা এগুচ্ছি। তার পরেও এটি অবশ্যই স্বীকার্য যে, আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনেক জায়গাতেই এখনও ‘ফাঁক’ রয়ে গেছে; রয়ে গেছে অনেক দুয়ে রহস্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে জটিল কিছু দেখলেই বিজ্ঞান তার পেছনে কোন সৃজনশীল সজ্ঞাত সত্ত্বাকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে এত সহজেই বৈধতা দিয়ে দেবে। সরল সিস্টেম থেকে জটিল সিস্টেমের বিকাশের উদাহরণ প্রকৃতিতে খুঁজলেই অনেক পাওয়া যাবে।

ঠান্ডায় জলীয়বাষ্প জমে তুষার কণিকায় পরিণত হওয়া, কিংবা বাতাস আর পানির ঝাপটায় পাথুরে জায়গায় তৈরী হওয়া জটিল নকশার ক্যাথেড্রালের অস্তিত্ব এ পৃথিবীতেই আছে। যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে বিচিত্র নকশার হিমবাহ, কিংবা এক পশলা বৃষ্টির পর পশ্চিমাকাশে উদয় হয় বর্ণিল রংধনুর, মুগ্ধ হয় আমাদের অনেকের মন, কিন্তু আমরা কেউ এগুলাে তৈরী হওয়ার পেছনে আমরা কেউ সজ্ঞাত সত্ত্বার দাবী করি না। কারণ আমরা সবাই জানি ওগুলাে সবই তৈরী হয় কোন সজ্ঞাত সত্ত্বার হস্তক্ষেপ ছাড়াই, পদার্থবিজ্ঞানের কতকগুলাে প্রাণহীন নিয়মকে অনুসরণ করে।

ক্যালস্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এমিরিটাস অধ্যাপক মার্ক পেরাখ সম্প্রতি ‘Unintelligent Design’ নামে একটি বই লিখেছেন। বইটিতে তিনি উইলিয়াম ডেম্বস্কি, মাইকেল বিহে আর ফিলিপ জনসন সহ অন্যান্য আই.ডি প্রবক্তাদের সমস্ত যুক্তি খন্ডন করে উপসংহার টেনেছেন এই বলে যে, আই.ডি কখনই বিজ্ঞান নয়, বরং ছদ্মবেশী বিজ্ঞান, যাকে ইংরেজীতে আমরা বলি Pseudoscience. ডঃ পেরাখ তার বইয়ে নিত্যদিনের বেশ কিছু সাধারণ উদাহরণ হাজির করে দেখিয়েছেন, জটিলতা মানেই বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ নয়, অনর্থক জটিলতা বরং প্রকারন্তরে বুদ্ধিহীনতাই প্রকাশ করে। তাঁর ভাষায়, কোন যন্ত্র তা সে মেকানিকালই হােক আর বায়ােমেকানিকালই হােক, যদি অতিরিক্ত জটিল হয়, তা বরং ‘বুদ্ধিহীন উৎসের দিকেই নির্দেশ করে’ (আনইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন, মার্ক পেরাখ, ২০০৪, পৃষ্ঠা ১২৬)। কাজেই মহাবিশ্বের কিংবা জীবজগতের জটিলতাকে বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্পের প্রমাণ ভাবার কোন যৌক্তিকতা নেই।

আর তাছাড়া আই.ডির বিরুদ্ধে সবচাইতে বড় যুক্তি তাে হাতের সামনেই রয়ে গেছে। আমাদের এই ‘জটিল’ মহাবিশ্বের অস্তিত্বকে ব্যখার জন্য যদি কোন বুদ্ধিদীপ্ত সত্ত্বার সত্যই প্রয়ােজন হয়, তবে ধরেই নেওয়া যেতে পারে সেই বুদ্ধিদীপ্ত সত্ত্বাকে এই মহাবিশ্বের চেয়েও জটিল কিছু হতে হবে। তা হলে সেই জটিল বুদ্ধিদীপ্ত সত্ত্বার অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করবার জন্য ওই একি যুক্তিতে আবার ততােধিক জটিল কোন। সত্ত্বার আমদানী করতে হবে, এমনি ভাবে জটিলতর সত্ত্বার আমদানীর খেলা হয়ত চলতেই থাকবে একের পর এক।

এ ধরনের যুক্তি তাই আমাদেরকে অনর্থক অসীমত্বের দিকে ঠেলে দেয়, যা বার্ট্রান্ড রাসেল এবং ডেভিড হিউমের মত দার্শনিকেরা অনেক আগেই অগ্রহণযােগ্য বলে বাতিল করে দিয়েছেন। যতদিন পর্যন্ত না আই.ডি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যুক্তি আর সংশয়বাদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আই.ডি প্রবক্তাদের ভাগ্যের শিকে ছিড়ছে না বলেই মনে হচ্ছে।

 

সৃষ্টিবাদীদের বিবর্তনঃ এর শেষ কোথায়?

আইডি-ওয়ালাদের চেয়ে বরং প্রগতিশীল অবস্থানে আছেন ‘বিশ্বাসী বিবর্তনবাদী’ (Theistic evolutionist)-দের দল। তাঁরা মনে করেন ঈশ্বর এক সময় পৃথিবীতে প্রাণের উন্মেষ ঘটালেও পরবর্তীতে আর এতে হস্তক্ষেপ করেননি, বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাণকে বিকশিত হতে দিয়েছেন। প্রয়াত পােপ জন পল ২ এ ধরনের বিশ্বাসী বিবর্তনবাদী ছিলেন যিনি বিবর্তনকে বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

প্রতিটি যুগেই সৃষ্টিবাদীরা বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাকে ঠেকানাের নানাভাবে চেষ্টা করে এসেছে। বিশেষতঃ যখনই ধর্মগ্রন্থের সাথে বিরােধ দেখেছে বিজ্ঞানের, বিজ্ঞানকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছে আস্তাকুঁড়ে। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। বাইবেল-বিরােধী সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বকে সমর্থন করার জন্য গ্যালিলিও, ব্রুনাের মত বিজ্ঞানীকে করেছে নির্যাতন। তারপরও ঈশ্বর ও তার পুত্ররা সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর ঘােরা থামাতে পারেননি। কোপার্নিকাসের তত্ত্ব এখন সৃষ্টিবাদীরা মেনে নিলেও বাইবেলের বাণীকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করে বিবর্তন ঠেকানাের প্রচেষ্টা এখনও কোন কোন মহলে লক্ষ্যনীয়।

যেমন, ‘ইয়ং আর্থ ক্রিয়েশনিস্ট’দের দল বাইবেলীয় ধারণায় বিশ্বাস করেন পৃথিবীর বয়স মাত্র ছ’হাজার বছর। বিগত কয়েক দশকে তাদের আস্ফালনও কিন্তু কমে এসেছে, কারণ আধুনিক রেডিও অ্যাকটিভ ডেটিং এর মাধ্যমে খুব নির্ভরযােগ্যভাবে পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করা গিয়েছে, যা বাইবেল বর্ণিত বয়সের চেয়ে অনেক অনেক বেশী। শুধু তাই নয়, মিলিয়ন বছর আগেকার ফসিলও আবিস্কৃত হয়েছে। বিজ্ঞানী ডগলাস ফুটুইমা ‘সৃষ্টিবাদীদের বিবর্তনের’ একটি ধারাবাহিক ছবি তার ‘ইভলুশন’ বইতে উল্লেখ করেছেন এভাবে:

image-10-6
চিত্র : সৃষ্টিবাদীদের বিবর্তনের রূপরেখা (Ref. Evolutionary science, creationism and society, Doglas J. Futuyama, Evolution, Sinauer Associates Inc. p525)

বিজ্ঞানী ভিক্টর স্টেগের এ প্রসঙ্গে খুব তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন :

‘The species of religious thought called creationism continues to evolve by a process of natural selection. While, as National Center for Science Education executive director Eugenie Scott has pointed out, there has always been a continuum of creationist views from extreme to moderate, we can still identify a few dominant strains.’

আমরা মনে করি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই ধীরে ধীরে একটা সময় জৈব বিবর্তনকে একটি বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হবেন, এবং শেষমেষ বুঝবেন জড়জগৎ এবং জীবজগতের সবকিছুই প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপন্ন আর বিকশিত হয়েছে এবং এ সবই ঘটেছে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায়, ঠিক যেভাবে কয়েক’শ বছর লাগলেও শেষ পর্যন্ত সূর্যকেন্দ্রিক পৃথিবীর ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলাে জনসাধারণের মধ্যে।

জীববিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ববিজ্ঞান, জেনেটিক্স, আণবিক জীববিদ্যার কোন শাখাই বিবর্তনের কোন সাক্ষ্যের বিরােধিতা তাে করছেই না, বরং যত দিন যাচ্ছে বিবর্তনের ধারাটি সবার কাছে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। ফসিল ছাড়াও, জেনেটিক্স এবং আণবিক জীববিদ্যার মত নতুন শাখাগুলাে যেভাবে বিবর্তনের পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ একেবারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে শুরু করেছে, এটি এখন স্রেফ সময়ের ব্যাপার মাত্র।


 বিবর্তনের পথ ধরে


১২.↑  Shanks N, 2004, God, the Devil and Darwin: A critique of Intelligent Design theory, Oxford University Press.

৩৮.↑  Anthony A, 2001, The Cold Big-Bang Cosmology as a Counter-example to Several Anthropic Arguments, Journal of Physical Rev, D64:083508.

৩৯.↑ বিস্তারিত তথ্যের জন্য Alan H. Guth,1998, The Inflationary Universe: The Quest for a New Theory of Cosmic Origins, Perseus Books Group দেখুন।

৪০.↑  Linde A, 1998, Self Reproducing Inflationary Universe, Scientific American.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা