বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৬. আমাদের পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকা থেকে কখন বেরিয়ে পড়েছিল?

আমাদের পূর্বপুরুষেরা আফ্রিকা থেকে কখন বেরিয়ে পড়েছিল? -“আফ্রিকা থেকে বহির্গমন’ তত্ত্বঃ

এবারের গল্পটা আমাদের পথ চলার গল্প, আমাদের পূর্বপুরুষদের আফ্রিকার সীমানা পেরিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার গল্প। এ যেনাে অনেকটা বইয়ে পড়া গােয়েন্দা কাহিনীর মত – লক্ষ লক্ষ বছরের যাত্রাপথে কোথায় কোন তিনিদর্শন ফেলে গেছে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন আজকের বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সেই সুদীর্ঘ অতীতে বিভিন্ন প্রজাতির মানুষ বিভিন্ন সময়ে যে সব পথে অজানার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল তাদের পদচিহ্নগুলাে খুঁজে বের করা তাে আর মুখের কথা নয়, তাই এ ব্যাপারে যে আমরা নানা মুনীর নানা মত শুনতে পাবাে সেটাই স্বাভাবিক।

এতদিন পর্যন্ত ভূত্বকের বিভিন্ন স্তরে পাওয়া যাওয়া ফসিল রেকর্ডগুলােই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু এখন তাে আর আমাদের শুধু ফসিল রেকর্ডের মুখ চেয়ে বসে থাকার আর কোন প্রয়ােজন নেই। অসম্ভব মনে হলেও সত্যি যে, আমাদের জিনের ভিতরই আজকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক কাফেলার পদচিহ্ন। বিজ্ঞান আজকে এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, ডিএনএ থেকেই এখন আমাদের সরাসরি পুর্বপুরুষদের ভ্রমনকাহিনী পড়ে ফেলা সম্ভব। তবে অনেক আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতিগুলাে সম্পর্কেও কি একইভাবে তা জানা সম্ভব? পরীক্ষা করে দেখার জন্য তাদের ডিএনএ ই বা কোথায় পাওয়া যাবে? তাই সেই আদি প্রজাতিগুলাের যাত্রাকাহিনী জানতে হলে বােধ হয় ফসিল রেকর্ডের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় খােলা নেই।

এখন পর্যন্ত পাওয়া ফসিল রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে যে, লুসির প্রজতিরা বােধ হয় কখনই তাদের আফ্রিকার বাস্তুভিটা ত্যাগ করে বাইরের পৃথিবীর মুখ দেখেনি। তার বেশ পরে, ২০ লক্ষ বছর আগে H. erectus-দের একটা অংশই বােধ হয় প্রথম মানব প্রজাতি যারা আফ্রিকার মায়া ত্যাগ করে বেড়িয়ে পড়েছিল। তারা ভীষণ কোন দিগ্বিজয় করার উদ্দেশ্য নিয়ে বের হয়েছিল সেটা ভাবলে বােধ হয় ভুলই হবে। সম্ভবতঃ খাদ্য এবং শিকারের সন্ধানে অল্প অল্প করে নিজেদের আবাসভূমি বিস্তৃত করতে করতে এক সময় তারা নিজের অজান্তেই আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল অন্যান্য মহাদেশগুলােতে।

এ সময়ের দিকেই যে আমাদের কোন এক পূর্বপুরুষ প্রজাতি আফ্রিকা থেকে বেড়িয়ে পড়েছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আর কোন দ্বিমত নেই। তবে এরা আসলেই H. erectus প্রজাতি ছিল নাকি সে সময়ে আফ্রিকায় বসবাস করা অন্য কোন Hom০ প্রজাতি ছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও কিছু বিতর্ক রয়েছে। মানব প্রজাতির এই প্রথম বেড়িয়ে পড়াকে ‘প্রথম আফ্রিকা থেকে বহর্গমন’ বলে চিহ্নিত করা হয়। ফসিল রেকর্ড থেকে মনে হয় যে তারা প্রথম দিকে বেশ কিছু কাল আফ্রিকার আশেপাশে গরম অঞ্চলগুলােতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

তারপর এশিয়া এবং ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজত্ব বিস্তার করতে তাদের আরও প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর লেগে গিয়েছিল। আড়াই লাখ বছর আগে এদের উত্তরসুরীদেরই আমরা দেখতে পেয়েছি চীন, জাভাসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, আর ওদিকে ইউরােপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মাত্র ৩৫ হাজার বছর এগেও দেখেছি নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির বিচরণ।

তাপমাত্রার ওঠানামার সাথে এই মানব প্রজাতিগুলাের বিস্তৃতি ও জীবনযাপন পদ্ধতি ওতপ্রােতভাবে জড়িয়ে ছিল। গরম যুগগুলােতে তাদের জনসংখ্যা ফুলে ফেঁপে উঠে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তাে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী বরফ যুগগুলােতে আবার বহু জনগােষ্ঠী বিলুপ্তও হয়ে যেত। সাম্প্রতিককালের সর্বশেষ (২০ হাজার বছর আগে) বরফ যুগের সাথে লড়াই করতে না পেরেই বােধ হয় ইউরােপের ক্রোম্যাগনন জাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল[৮]

আমাদের নিজেদের প্রজাতির আধুনিক মানুষেরা অর্থাৎ H. sapien রা যে, আফ্রিকা থেকে উদ্ভূত হয়ে খুব সাম্প্রতিককালে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে তা নিয়েও এখন আর কোন দ্বিমত নেই। তবে তারা ঠিক কোন কোন পথে আফ্রিকা থেকে বেড়িয়ে পড়েছিলাে, এবং ঠিক কোন সময়টাতে এবং কতবার তা ঘটেছিল তা নিয়ে এখনও বিতর্কের অবকাশ রয়ে গেছে। আর আমাদের এই যাত্রাকেই মানব ইতিহাসে ‘দ্বিতীয়বারের মত আফ্রিকা থেকে বহর্গমন বলে অভিহিত করা হয়।

প্রায় দুই লাখ বছর আগে আফ্রিকায় আমাদের এই আধুনিক মানুষের প্রজাতির উদ্ভব ঘটলেও প্রথম এক লক্ষ বছর তারা বােধ হয় আফ্রিকার সীমানা পেরিয়ে বাইরে বেরােয়নি। ইথিওপিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের এই পূর্বপুরুষদের ফসিল পাওয়া গেছে। আর আফ্রিকার বাইরে প্রথম যে ফসিল পাওয়া যায় তারা ৯০ হাজার বছরের চেয়ে বেশী পুরনাে নয়। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ইসরাইলে তাদের বসতি দেখা গেলেও সেখান থেকে পরবর্তীতে তারা আর কোথাও বিস্তার লাভ করতে পেরেছিল বলে মনে হয় না[২১]

এর পরের কাহিনী নিয়ে ফসিলবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে খুব অচিরেই খুব অচিরেই সেই বিতর্কেরও ইতি ঘটাতে পারবাে। বইটি লেখার সময়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় এ নিয়ে একটি চমৎকার প্রতিবেদন (২০০৬) প্রকাশিত হয়, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, আধুনিক জেনেটিক্সের আলােয় আমরা ইতােমধ্যেই বেশ পরিষ্কারভাবেই আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই মহাযাত্রার কাহিনীটা একে ফেলতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের পূর্বপুরুষদের একটা অংশ মাত্র ৫০-৭০ হাজার বছর আগে আফ্রিকা ছেড়েছিল আর আজকে পৃথিবীব্যাপী আমি বা আপনিসহ যে ছয়শাে কোটি মানুষের মুখ দেখতে পাই তারা সবাই এদের উত্তরসুরী।

The-Movement-of-Ancient-Humanity
চিত্রঃ ৯.২১; জেনেটিক্সের গবেষণা থেকে Homo sapines দের আফ্রিকা থেকে বেড়িয়ে পড়ার সময়সীমা

কিন্তু কিভাবে সম্ভব আজকে আমার বা আপনার ডিএনএ থেকে হাজার বছরের এই ইতিহাস খুঁজে বের করা? কি দেখেই বা বিজ্ঞানীরা এত আস্থা নিয়ে বলতে পারছেন সে কাহিনীর ইতিবৃত্ত? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা ডঃ রিচার্ড ডকিন্সের কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই, বিজ্ঞানী স্পেনসার ওয়েলস এর মুখে – আমাদের প্রতিটি রক্তকণাই যেনাে জিনের ভাষায় লেখা ইতিহাসের একেকটা বই[২১]

সব মানুষের দেহে যে জেনেটিক কোড রয়েছে তা প্রায় ৯৯.৯% এক। গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, আফ্রিকাবাসীদের জেনেটিক কোডের মধ্যে যে পরিমাণ বৈচিত্র দেখা যায় তার তুলনায় বাকি পৃথিবীর মানুষের মধ্যে তেমন কোন বৈচিত্র নেই বললেই চলে। আফ্রিকার যে সব জেনেটিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তারই একটা সাব-সেট বা ক্ষুদ্র অংশ দেখা যায় বাকিদের মধ্যে। তার অর্থ কি দাঁড়াচ্ছে?

আফ্রিকাবাসীদের একটা ক্ষুদ্র অংশ আফ্রিকায় উদ্ভূত হয়ে, বিকশিত হয়ে পরবর্তীতে তাদের একটা অংশ পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়লেই শুধুমাত্র এটা হওয়া সম্ভব। সে না হয় গেলাে এক কাহিনী, এবার চলুন চট করে একবার দেখে নেওয়া যাক বিজ্ঞানীরা কি করে আফ্রিকা থেকে বহির্গমনের ইতিহাস বের করলেন। আমরা জানি যে,আমাদের জিনে কখনও কখনও বিক্ষিপ্তভাবে মিউটেশন ঘটে থাকে। জেনেটিক্সের নিয়ম মেনে তারপর তা পরবর্তী বংশধরদের ডিএনএ তেও দেখা যায়।

এই মিউটেশনুলােকেই জেনেটিক মার্কার বা নির্দেশক হিসেবে। ব্যবহার করেন বিজ্ঞানীরা। বহু প্রজন্ম পরে যদি আপনার এবং আমার দুজনেরই ডিএনএ তে একই মিউটেশন দেখা যায় তাহলে বুঝে নিতে হবে যে, কোন না কোন সময়ে আমাদের একই পূর্বপুরুষ ছিল। বিভিন্ন জনপুঞ্জের মধ্যে এই সাধারণ নির্দেশকগুলােকে খুঁজে বের করে তুলনামুলক পর্যালােচনা করতে পারলেই বােঝা যাবে তারা সবাই একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়েছে কি হয়নি।

আর এই মিউটেশন বা নির্দেশকগুলাে প্রথম কখন ঘটেছিল এবং কোন জনপুঞ্জের মধ্যে কোন সাধারণ নির্দেশকগুলাের অস্তিত্ব রয়ে গেছে তা জানতে পারলেই বােঝা যাবে কখন কোন জনপুঞ্জ কখন তাদের সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। তবে এখানে আরেকটু কথা আছে, যে কোন কোষের ডিএনএ থেকে আবার এই পরীক্ষা করা যাবে না। বাবা মার জিনের জেনেটিক রিকম্বিনেশনের মাধ্যমে যেহেতু আমাদের জন্ম হয়, আমাদের বেশীরভাগ কোষেই এই মিউটেশনগুলাে আর ঠিকমত নাও দেখা যেতে পারে। তাহলে কোথা থেকে আমরা এই আদি তথ্যগুলাে অবিকৃত অবস্থায় পেতে পারি? তারও সামাধান খুঁজে পাওয়া গেছে, আমাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে আমাদের দেহকোষে এমন কয়েকটি অংশ রয়েছে যারা আবিকৃত অবস্থায় বাবা মা থেকে সন্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয়।

মেয়েদের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ মা থেকে সম্মানে প্রবাহিত হয় কোন পরিবর্তন ছাড়াই, আবার ওদিকে ছেলেদের যেY ক্রোমােজোম টি রয়েছে তাও বাবা থেকে ছেলের মধ্যে অপরিবর্তিত অবস্থায় সঞ্চালিত হয়। অর্থাৎ, এই মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ এবং Y ক্রোমােসােমের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের পুর্বপুরুষদের মধ্যে ঘটা মিউটেশনগুলাের ঐতিহাসিক তথ্য।

বিজ্ঞানীরা এদের ভিতরকার জেনেটিক মার্কারগুলাের সময়সীমা এবং সংখ্যার আপেক্ষিক পর্যালােচনা। থেকেই মােটামুটিভাবে বলতে পারেন কখন কোন জনপুঞ্জ কার থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিল।

নীচে একজন আদি আমেরিকাবাসী অর্থাৎ আমেরিকান ইন্ডিয়ানের ‘Y’ ক্রোমােসােমের ভিতরের মিউটেশনগুলাে থেকে তার পূর্বপুরুষের ইতিহাস বের করার পদ্ধতি দেখানাে হয়েছে। এখানে তার ডিএনএর ভিতরের বিভিন্ন সময়ে ঘটা মিউটেশনগুলােকে চারটি স্তরে ভেঙ্গে ক্রমানুযায়ী দেখানাে হয়েছে। আদি আফ্রিকাবাসীসহ পৃথিবীর সব পুরুষের ডিএনএ তেই একটি বেসিক মিউটেশনের প্যাটার্ণ লক্ষ্য করা যায়, যা আমাদের সামনে আজও আফ্রিকার আদি চিহ্ন বহন করে চলেছে।

mutation
চিত্রঃ ৯.২২: একজন আদি আমেরিকাবাসীর Y ক্রোমােসােমের ভিতরের বিভিন্ন সময়ে ঘটা মিউটেশনগুলাে

১ নম্বর ডিএনএর ছবিতে এই মৌলিক প্যাটার্ণটা দেখানাে হয়েছে। ২ নম্বর ডিএনএ-তে ৫০ হাজার বছরের পুরনাে M168 মিউটেশন বা নির্দেশকটি দেখা যাচ্ছে, যা শুধু আফ্রিকাবাসী পুরুষ ছাড়া পৃথিবীর বাকি সব পুরুষের মধ্যে দেখা যায়, এ থেকে বােঝা যায় যে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে পড়ার পরপরই সেই জনগােষ্ঠির মধ্যে এই মিউটেশনটা ঘটেছিল। ৩ নম্বর ডিএনএ তে দেখা যাচ্ছে যে ৪০ হাজার বছরের পুরনাে M9 নামে একটি নতুন মিউটেশন যুক্ত হয়েছে, আর এটি শুধু মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্যে এশিয়ার জনগােষ্ঠির মধ্যে দেখা যায়। এর পরে ৪ নম্বর ছবিতে যে M9 (১০ হাজার বছরের পুরনাে) নামে যে মিউটেশনটি দেখান হয়েছে তা আজকের আদিবাসী আমেরিকানদের মধ্যে দেখা যায়, আর দেখা যায় এশিয়ার সায়বেরিয়া অঞ্চলের জনগােষ্ঠির মধ্যে যাদেরই একটি অংশ আলাস্কা হয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিল[২১]

জেনেটিক তথ্য থেকে আরও দেখা যাচ্ছে যে ৫০-৭০ হাজার বছর আগে যে আফ্রিকাবাসীদের যে ছােট একটি অংশ বের হয়ে এসেছিল তারা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ব দিকে এশিয়ার উপকুল ধরে যাত্রা করে তারা কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই অষ্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যাত্রাপথের বিভিন্ন অঞ্চলে, যেমন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, মালয়েশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি এবং অস্ট্রেলিয়ায় এখনও যে আদিবাসীরা রয়ে গেছেন তাদের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএর মধ্যে এখনও সেই আদি আফ্রিকার নির্দেশকগুলাের চিহ্ন রয়ে গেছে। আর এদিকে ইউরােপে আধুনিক মানুষের খুটি গাড়ার কাহিনীতাে আরও রােমাঞ্চকর।

এতদিন পর্যন্ত ফসিলবিদেরা মনে করে এসেছেন যে, মানুষের পূর্বপুরুষেরা সম্ভবত আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ইউরােপে বিস্তার লাভ । করেছিল। কিন্তু জেনেটিক তথ্য তাে বলছে আরেক কথা! জেনেটিক নির্দেশক থেকে দেখা যাচ্ছে যে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশবাসীদের সাথেই বরং ইউরােপবাসীদের বংশগতীয় সাদৃশ্য সবচেয়ে বেশী। তাহলে কি ভারত থেকে পরবর্তীকালে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ইউরােপে পাড়ি জমিয়েছিল? ওদিকে ৪০ হাজার বছর আগেই তারা মধ্য এশিয়ার চীনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পরেছিল। আমরা আগেই দেখেছি, উত্তর এশিয়ার সাইবেরিয়া থেকে ১৫-২০ হাজার বছর আগেই মানুষ উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছিল।

আসলে আধুনিক জেনেটিক আবিষ্কারগুলাে নিয়ে লিখতে বসলে কলম থামানাে খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। মাত্রাতিরিক্ত তথ্যভারে পাঠকেরা বিরক্ত হয়ে থাকলে আশা করি নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। যাই হােক, আফ্রিকা থেকে বহির্গমনের গল্পের এখানেই ইতি টানছি। এই দুটো প্রধান বহির্গমন তত্ত্বকে মােটামুটিভাবে সব বিজ্ঞানীই সঠিক বলে মনে করেন। তবে অনেকে মনে করেন যে, এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির ছােট বা বড় অংশ হয়তাে আফ্রিকা থেকে বেড়িয়ে পড়েছিল[১১]। একবার বা দু’বার নয় বারবার আফ্রিকা থেকে বেড়িয়ে পড়া এবং তারপর কখনও কখনও আবার পড়ে সেখানে ফিরে যাওয়াও হয়তাে এমন কোন অসম্ভব ঘটনা নয়।

 

মানুষের গল্পটা কি শেষ পর্যন্ত শেষ হল?

না, হল না কিন্তু। গল্পটা ফুরােতে গিয়েও ফুরােয় না, কারণ এ গল্প তাে এত তাড়াতাড়ি শেষ হবার নয়। এখনও আরও একটা খুব বড় অংশই বাকি রয়ে গেছে, মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের আরেক অধ্যায় – তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিবর্তন, বৌদ্ধিক বিকাশ, ভাষার উৎপত্তি, কৃষিব্যবস্থার উদ্ভব, সভ্যতার সৃষ্টির মত অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয়গুলাে।

এই বিষয়গুলাে একটু গােলমেলে তাে বটেই, এদের কোনটাকেই ফসিলে পুড়ে ইতিহাসের পাতায় বন্দী করা যায় না, শরীরের হাড়গাের, দাঁত না হয় ফসিলে পরিণত হয়, কিন্তু ভাষা, গান, আচার ব্যবহার বা বুদ্ধিচর্চার মত সুকোমল বৃত্তিগুলাের তাে আর ফসিল হয় না! কিন্তু এদের সাথে মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসটা আবার জড়িয়ে গেছে ওতপ্রােতভাবে। তাই বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, দার্শনিকেরা বিভিন্ন ধরণের প্রত্যক্ষ এবং পরােক্ষ সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এ সম্পর্কে বিভিন্ন অনুকল্প দিয়েছে, এখন সেটা নিয়ে লিখতে গেলে আবার আর এক মহাভারত হয়ে যাবে।

এমনিতেই এই অধ্যায়টি অনেক বড় হয়ে গেছে, তাই ভাবছি পাঠকের বিরক্রির পরিমাণ আর না বাড়িয়ে আলাদাভাবে এর পরের অধ্যায়ে এ নিয়ে আলােচনা করা যাক। বিবর্তনের মেলায় নিজেদের সাফল্য, বিকাশ এবং এগিয়ে চলার। গল্প দিয়ে বইটার উপসংহার টানলে বােধ হয় মন্দ হবে না।

 


৮.↑  Stringer, C and Andrews, P, 2005, The complete Wrold of Human Evolution, Thames and Hudson Ltd, London.

১১.↑  Dawkins R, 2004, The Ancestor’s Tale, 2004. Houghton Mifflin Company, Boston, New York.

২১.↑  The greatest Journey, 2006, National Geographic Magazine.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top