ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০৫. সৌন্দর্যবোধ আর শিল্পবোধ

আমাদের সৌন্দর্যবোধ আর শিল্পবোধগুলো তৈরি হয়েছে বিবর্তনের পথ ধরে

সুদক্ষ শিল্পীর নয়নাভিরাম শিল্পকর্ম কে না ভালোবাসে! পিকাসোর গুয়েরনিকা, অগস্ত রঁদ্যার ‘থিঙ্কার’ কিংবা মাইকেল এঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ দেখে আমরা মুগ্ধ হই, ঠিক তেমনি আমরা উদ্বেলিত হই শামীম শিকদারের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’র পাশে দাঁড়িয়ে, কিংবা নিতুন কুণ্ডুর ‘সাবাস বাংলাদেশ’ প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু কেন আমাদের ভাস্কর্য দেখতে ভালো লাগে?

কখনো কি আমরা ভেবেছিকেন ভাস্করদের নিপুণ কাজ আমাদের মনোমুগ্ধকর বলে মনে হয়, তাদের ব্যক্তিত্বকে কাঙ্ক্ষিত মনে হয়? অনেক বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীই মনে করছেন ব্যাপারটির উৎস আসলে বিবর্তনমনোসঞ্জাত। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও এমনিভাবে পাথুরে হাতিয়ার, প্রবালের নেকলেস প্রভৃতি বানিয়ে জয় করতে পেরেছিল বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষণ, জাগাতে পেরেছিল অন্যদের চিত্তচাঞ্চল্য। প্রায় দেড় মিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেক্টাসরা শুরু করেছিল পাতলা পাথরের ফালি বানানো।

এগুলো দেখতে ডিম্বাকৃতির, কখনোবা ত্রিভুজাকৃতির পাতার মতোন বা ‘টিয়ার ড্রপ’ আকারের [১৭৯]। এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকাসহ পৃথিবীর যেখানেই হোমো ইরেক্টাস আর হোমো ইরগাস্টারদের যাতায়াত ছিল, সেখানেই পাওয়া গেছে হাজার হাজার একুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স। সবচেয়ে পুরনো ‘অ্যাকুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেকার ।

weapon
চিত্র : ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত তাঞ্জিনিয়ার ওল্ডুভাই গর্জে পাওয়া প্রাচীন অ্যাকুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স।

এ প্রাচীন হাতিয়ারগুলোই আমাদের মানবেতিহাসের সবচেয়ে পুরনো শিল্প। ব্যবহারিক অস্ত্রের এই বিমুগ্ধকর নান্দনিক রূপান্তর প্রাগৈতিহাসিক মানুষের কারিগরি দক্ষতা তুলে ধরে। ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘হ্যান্ড এ্যাক্স’ সভ্যতার নতুন এক ধাপের প্রতীক। দেখে মনে হয় এই হাতিয়ারগুলো তৈরিই হয়েছে একধরনের প্রচ্ছন্ন ‘ফিটনেস সিগন্যাল’ দেয়ার জন্য, যে সিগন্যালের মধ্যে প্রকাশ পায় নির্মাতার বুদ্ধি, কর্মনিপুণতা, সচেতনতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দূরদর্শিতা। অনেকটা পেখমওয়ালা ময়ূরের মতোই অস্ত্র বানানোয় দক্ষ পুরুষ আকর্ষণ করতে পেরেছিল আদিম সমাজে নারীদের অনুগ্রহ।

আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যাদের এ গুণগুলো ছিল তারা আকর্ষণ করেছিল অধিকমাত্রায় বিপরীত লিঙ্গের সান্নিধ্য, তারাই রেখে গেছে অধিক হারে উত্তরসূরী। যারা এই কারিগরিবিদ্যা রপ্ত করতে পারেনি, তারা বিপরীত লিঙ্গের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেনি, তারা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না।

নিউজিল্যান্ডের কেন্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেনিস ডাটন (৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪-২৮ ডিসেম্বর, ২০১০) একটি বই লিখেছেন ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সৌন্দর্যপ্রিয়তা এবং শিল্পের প্রতি অনুরাগ বিশ্লেষণ করে [১৮০]। তার একটি চমৎকার লেকচার আছে টেড ডট কম সাইটে এবং ইউটিউবে[১৮১]। তিনি মনে করেন, শিল্প বিষয়ক যে কোনো আধুনিক রুচি সেটা যে কোনো শিল্প মাধ্যমই হোক না কেন, উদ্ভূত হয়েছে বিবর্তনের ক্রমপ্রক্রিয়ায়, ডারউইনের তত্ত্ব দিয়ে যাকে সফলভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে পূর্বপুরুষদের চোখে পাথুরে হাতিয়ার তৈরির মতো দক্ষতাগুলো যেমন আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিয়েছিল, সেই একই ধরনের ভালোলাগাগুলো এখনও আমাদের মনে কাজ করে যায় প্রায় একইরকমভাবে। নিপুণ কারিগরি দক্ষতায় সম্পন্ন যে কোনো কাজ বা শিল্প দেখলে আমাদের মন এখনও প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, আমরা সেই শিল্পকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হই অবচেতনভাবেই। কোনো গয়নার দোকানে টিয়ার ড্রপ আকারের কোনো হীরার অলংকার দেখলে আমাদের মন উদ্বেলিত হয়ে উঠে।

এমন মনে করার কারণ নেই যে আমাদের সংস্কৃতিই হঠাৎ করে শিখিয়েছে এগুলোকে সুন্দর ভাবতে। বরং আমাদের সুদূর পূর্বপুরুষরাও ভালোবাসতো এই ধরনের শৈল্পিক আকৃতিগুলো, আর কদর করত এর নির্মাণের পেছনের কর্মকুশলতা আর দক্ষতাকে। আমাদের আধুনিক রুচিবোধগুলো মূলত তৈরি হয়েছে সেই প্লেইস্টোসিন যুগের আদিম পছন্দ অপছন্দগুলোর উপর ভর করেই।

বিজ্ঞানীরা বলেন, শিল্প, সাহিত্য, ভাস্কর্য, খেলাধুলা প্রভৃতির প্রতি অনুরাগগুলো তৈরি হয়েছে লৈঙ্গিক আবেদনের মাধ্যমে যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে। প্রাকৃতিক নির্বাচন গড়ে উঠেছে মূলত বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, আর অন্যদিকে যৌনতার নির্বাচন কাজ করেছে প্রজননগত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।

বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী জিওফ্রি মিলার মনে করেন, আমাদের এই শৈল্পিক রুচিবোধগুলো কোনো অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তার সুনিপুণ ডিজাইনের মাধ্যমে যেমন হয়নি, ঠিক তেমনি পুরোটুকু তৈরি হয়নি অন্ধ এবং নির্বিচারী এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেও। বরং আমাদের মানসপটের বিবর্তন হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের দীর্ঘদিনের চাহিদাকে মূল্য দিয়ে, তাদের বুদ্ধিবৃত্তির উপর ভর করে এবং তাদের সতর্ক সঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে।

আমরা তাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করেছি তাদের নানারকম পছন্দ উদ্যম, সৃজনশীলতা, কৌতুকপ্রিয়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পবোধসহ বিভিন্ন নৈর্ব্যক্তিক বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ।

তারা সঙ্গী নির্বাচনের সময় সচেতনভাবেই গুরুত্ব দিয়েছে কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রতি, সে সমস্ত বৈশিষ্ট্য গুলো সংরক্ষিত থেকেছে আমাদের জনপুঞ্জে। সে সমস্ত বৈশিষ্ট্য কারো মধ্যে খুঁজে পেলে আমাদের মস্তিষ্ক স্বভাবতই আমোদিত হয়, প্রলুব্ধ হয় ঠিক যেমন ময়ূরী প্রলুব্ধ হয় দীর্ঘ পেখমওয়ালা ময়ূরকে খুঁজে পেলে। আমরা মূলত আমাদের পূর্বপুরুষদের লক্ষ বছরের বংশগতীয় পরীক্ষানিরীক্ষার সফল পরিণতি।


 ভালোবাসা কারে কয়


১৭৯.↑     ডেনিস ডাটনের বক্তৃতা :  সৌন্দর্য ও ডারউইেনর থিওরি, লুনা রুশদি, ২৯ জানুয়ারি ২০১১ ↑

১৮০.↑   Denis Dutton, The Art Instinct: Beauty, Pleasure, and Human Evolution, Bloomsbury Press, 2008

১৮১.↑   ইউটিউবে দেখতেঃ Denis Dutton: A Darwinian theory of beauty

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়