বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৫. বানর থেকে মানুষের উদ্ভব?

৫) বানর থেকে মানুষের উদ্ভব ঘটলে এখনও বানরগুলাে পৃথিবীতে রয়ে গেলাে কি করে?

আমার পরিচিত বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন অনেককেই এ প্রশ্নটি করতে শুনেছি। ছােট্ট এ প্রশ্ন থেকেই আঁচ করা যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিবর্তন সম্বন্ধে অজ্ঞতার পরিমাপটুকু যে ভুলটি প্রায়শই তারা করে থাকেন, তা হল, তারা বােধ হয় ভাবেন যে জঙ্গলে গাছের ডালে বা চিড়িয়াখানার খাঁচার রড ধরে ঝুলে থাকা বাঁদর-শিম্পাঞ্জী গুলাে থেকেই বুঝি মানুষের উদ্ভব হয়েছে।

আসলে তাে ব্যাপারটা তা নয়। বিবর্তন তত্ত্ব বলছে মানুষ আর পৃথিবীর বুকে চড়ে বেড়ানাে মানুষ এবং অন্যান্য বনমানুষগুলাে অনেক অনেককাল আগে একই পূর্বপুরুষ (Common ancestor) হতে উদ্ভূত হয়ে বিবর্তিত হয়ে আলাদা আলাদা প্রজাতির ধারা (Lineage) তৈরি করেছে। এর মানে কিন্তু এই নয় পৃথিবীতে বিদ্যমান সব শিম্পাঞ্জীগুলাে মানুষ হয়ে যাবে বা সব মানুষগুলাে শিম্পাঞ্জী হয়ে যাবে।

প্রাণের বিকাশ এবং বিবর্তনকে একটা বিশাল গাছের সাথে তুলনা করা যায়। একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়ে বিবর্তনের ওই গাছটির (জাতিজনি বৃক্ষ) বিভিন্ন ডাল পালা তৈরি হয়েছে (নিচের ছবি দ্রষ্টব্য)। এর কোন ডালে হয়তাে শিম্পাঞ্জীর অবস্থান, কোন ডালে হয়ত গরিলা আবার কোন ডালে হয়ত মানুষ। অর্থাৎ, একসময় তাদের সবার এক সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিলাে, ১.৪ কোটি বছর আগে তাদের থেকে একটি অংশ বিবর্তিত হয়ে ওরাং ওটাং প্রজাতির উদ্ভব ঘটে।

monkeys-and-humans-evolution
চিত্রঃ ১০.২; সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মানুষ, শিম্পাঞ্জী, গরিলা এবং ওরাংওটাং এর বিবর্তন।

তখন, যে কারণেই হােক, এই পূর্বপুরুষের বাকি জনপুঞ্জ নতুন প্রজাতি ওরাং ওটাং এর থেকে প্রজননগতভাবে আলাদা হয়ে যায় এবং তার ফলে এই দুই প্রজাতির বিবর্তন ঘটতে শুরু করে তাদের নিজস্ব ধারায়। আবার প্রায় ৯০ লক্ষ বছর আগে সেই মুল প্রজাতির জনপুঞ্জ থেকে আরেকটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং পরবর্তিতে ভিন্ন ধারায় বিবর্তিত হয়ে গরিলা প্রজাতির উৎপত্তি ঘটায়। একইভাবে দেখা যায় যে, ৬০ লক্ষ বছর আগে এই সাধারণ পুর্বপুরুষের অংশটি থেকে ভাগ হয়ে মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির বিবর্তন ঘটে। তারপর এই দুটো প্রজাতি প্রজননগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

তখন থেকেই একদিকে স্বতন্ত্র গতিতে এবং নিয়মে মানুষের প্রজাতির বিবর্তন ঘটতে শুরু করে, আর ওদিকে আলাদা। হয়ে যাওয়া শিম্পাঞ্জীর সেই প্রজাতিটি ভিন্ন গতিতে বিবর্তিত হতে হতে আজকের শিম্পাঞ্জীতে এসে পৌঁছেছে। সুতরাং কোন এক সাধারণ পুর্বপুরুষ থেকে দুটো প্রজাতির উৎপত্তি ঘটলেই যে তাদের একটিকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে হবে বা এক প্রজাতির সবাইকে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়ে যেতে হবে এমন কোন ধরাবাঁধা নিয়ম প্রকৃতিতে নেই। বিবর্তন প্রায়শঃই কাজ করে ঝােপের মত, ক্রমাগতভাবে একই দিকে উপরে উঠতে থাকা মইয়ের মত নয়।

৬) বিবর্তন তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রকে লংঘন করেঃ

এটি যারা বলেন তাদের তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) এবং এর সূত্রগুলাে সম্বন্ধে কোন বাস্তব। ধারণা নেই। তাপগতিবিদ্যার তিনটি সুত্র আছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় সূত্রটি বলছে : তাপ কখনও নিজেcথেকে শীতল বস্তু হতে গরম বস্তুতে যেতে পারে না। সূত্রটিকে অনেক সময় এভাবেও বলা হয় : একটি বদ্ধ সিস্টেমে এনট্রপি কখনও কমতে পারে না।

এন্ট্রপি ব্যাপারটিকে অনেকসময় সাদামাটাভাবে বিশৃঙ্খলা বা Disorder হিসেবে দেখানাে হয়। এন্ট্রপি কমার অর্থ হচ্ছে সাদামাটা ভাবে বিশৃংখলা কমা। তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্র বলছে বদ্ধ সিস্টেমে এন্ট্রপি কমতে পারবে না, বাড়তে হবে। বােঝা যাচ্ছে যে, তাপগতিবিদ্যার ২য় সূত্রটি যে ভাবে বলা হচ্ছে তা শুধু বদ্ধ সিস্টেমের জন্যই প্রযােজ্য। আমাদের বাসার রেফ্রিজেটরের উদাহরণটি হাজির করি।

আমরা সবাই জানি যে, রেফ্রিজেটরে তাপকে উল্টো দিকে চালিত করা হয়, অর্থাৎ, শীতল অবস্থা থেকে গরম অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়, ফলে সেখানে পানি জমে বরফ হতে পারে। বৈজ্ঞানিকভাবে এর অর্থ হচ্ছে রেফ্রিজেটরের ভিতরে এনট্রপি কমেছে। কিন্তু তাপকে এই ‘উল্টো দিকে’ চালিত করার জন্য রেফ্রিজেটরকে বাড়তি কিছু কাজ করতে হয়। কাজ করবার শক্তিটুকু রেফ্রিজেটরটি কোথা হতে পায়?

রেফ্রিজেরটের পেছনে লাগানাে মােটর আর কিছু জ্বালানী এই শক্তিটুকু সরবরাহ করে। কিন্তু এই শক্তিটুকু সরবরাহ করতে গিয়ে তারা ঘরের এনট্রপিকে বাড়িয়ে তােলে। এবারে খাতা কলম নিয়ে হিসেব কষলে দেখা যাবে পানিকে বরফ করে রেফ্রিজেটর তার ভেতরে এন্ট্রপি যত না কমিয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশী বাড়িয়ে তুলেছে ঘরের এন্ট্রপি। কাজেই যােগ-বিয়ােগ শেষ হলে দেখা যাবে এনট্রপির নীট বৃদ্ধি ঘটেছে। কোন অনভিজ্ঞ ব্যক্তি শুধুমাত্র রেফ্রিজেটরের ভিতরটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে পারে, এটুপি তাে কমে গেছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে পুরাে সিস্টেম (ওপেন সিস্টেম) গােনায় ধরলে দেখবে যে, এন্ট্রপি আসলে কমেনি, বরং বেড়েছে।

বিবর্তনের ব্যাপারটাও তেমনি। সূর্য আমাদের এ পৃথিবীতে প্রতি নিয়ত শক্তির যােগান দিয়ে চলেছে। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জীবদেহে কোষের বৃদ্ধি ঘটে, এবং কালের পরিক্রমায় বিবর্তনও ঘটে। শুধুমাত্র জীবদেহের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হবে যে এন্ট্রপি কমেছে। কিন্তু ঠিকমত হিসেব-নিকেশ করলে তবেই বােঝা যবে যে, এই ‘আপাতঃ এনট্রপি’ কমাতে গিয়ে শক্তির যােগানটা পড়ছে অনেক বেশী। কাজেই এনট্রপির আসলে নীট বৃদ্ধিই ঘটছে।

সরল অবস্থা থেকে জটিল অবস্থার উত্তরণকে যারা ‘এনট্রপি কমার’ অজুহাত তুলে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের লংঘন ভাবেন তারাও ভুল করেন। প্রকৃতিতে সরল অবস্থা থেকে জটিল অবস্থায় উত্তরণের উদাহরণের অভাব নেই। এমনকি জড়জগতেও এধরনের ‘আপাতঃ এনট্রপি’ কমার উদাহরণ রয়েছে। বিস্তর। ঠান্ডায় জলীয়বাষ্প জমে তুষার কণিকায় পরিণত হওয়া, লবনের মধ্যে কেলাস তৈরী, কিংবা পাথুরে জায়গায় পানির ঝাপটায় তৈরী হওয়া জটিল নকসার ক্যাথেড্রালের অস্তিত্ব এ পৃথিবীতে বিরল নয়। কোনটির ক্ষেত্রেই তাপগতির সূত্র ব্যহত হয়নি। কাজেই কালের পরিক্রমায় সরল জীব থেকে বিবর্তিত হয়ে জটিল জীবের অভ্যুদয় কোন অসম্ভব ঘটনা নয়, নয় তাপগতিবিদ্যার লংঘন।


 বিবর্তনের পথ ধরে

শেয়ার করুন —
5 1 vote
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা