বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৫. ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইনের দেওয়া ‘যুক্তিগুলাে’ (এক)

‘ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন’ বা বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্পের দুটি ভাষ্য পাওয়া যায়। একটি ভাষ্য পাওয়া যায়  জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যেটি বলে আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মান্ড এমন কিছু চলক বা ভ্যারিয়েবলের সূক্ষ সমন্বয়ের (Fine Tuning) সাহায্যে তৈরী হয়েছে যে এর একচুল হের ফের হলে আর আমাদের এ পৃথিবীতে কখনই প্রাণ সৃষ্টি হত না। অর্থাৎ, পরবর্তীতে প্রাণ সৃষ্টি করবেন এই ইচ্ছাটি মাথায় রেখে ঈশ্বর (কিংবা হয়ত অন্য কোন বুদ্ধিমান সত্ত্বা) বিশ্বব্রহ্মান্ড তৈরী করেছিলেন, আর সে জন্যই আমাদের মহাবিশ্বঠিক এরকম; এত নিখুঁত, এত সুসংবদ্ধ।

আর ওদিকে ‘ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন’এর জীববিজ্ঞানের ভাষ্যটি বলছে ঠিক তার উলটো কথা। জীববিজ্ঞানের আইডি প্রবক্তা ‘ফাইন টিউনার’রা যে ভাবে যুক্তি সাজিয়ে থাকেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ‘ফাইন টিউনার’রা দেন ঠিক উলটো যুক্তি। জীববিজ্ঞানের আইডির প্রবক্তারা বলেন আমাদের বিশ্বব্রহ্মান্ড প্রাণ সৃষ্টির পক্ষে এতটাই অনুপযুক্ত যে প্রাকৃতিক নিয়মে এখানে এমনি এমনি প্রাণ সৃষ্টি হতে পারে না। আবার জ্যোর্তিবিজ্ঞানের আইডি ওয়ালারা উলটো ভাবে বলেন, এই বিশ্বব্রহ্মান্ড প্রাণ সৃষ্টির পক্ষে এতটাই উপযুক্ত যে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড প্রাকৃতিক নিয়মে কোনভাবে সৃষ্টি হতে পারে না। একসাথে দুই বিপরীতধর্মী কথা তাে সত্য হতে পারে না। বুদ্ধিদীপ্ত অনুকপের এই দুটি ভাষ্য নিয়েই তাহলে আলাদা আলাদাভাবে আলােচনা করা যাক।

আমরা জীববিজ্ঞানের ‘বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্প’গুলােই বিবেচনায় আনব আগে। কারণ, দুনিয়া জুড়ে এদের প্রাবল্য আর জোয়ারই বেশী। তারাই ডারউইনীয় বিবর্তনবাদকে পাঠ্যপুস্তক থেকে হটিয়ে ‘ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন’কে তার স্থলাভিষিক্ত করতে চান। এ প্রসঙ্গে দার্শনিক ডেনিয়েল ডেনেট বলেন[২৭]:

‘সৌভাগ্যক্রমে অযথা কলহ-বিবাদ সৃষ্টি করার জন্য আজকের দিনে পদার্থবিদদের খুব বেশী প্রণােদনা নেই। কারণ পদার্থবিদদের আর সাধারণ মানুষদের কাছে গিয়ে গিয়ে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা আর আপেক্ষিক তত্ত্ব বুঝানাের চেষ্টা করে সময় নষ্ট করতে হয় না। কারণ ওগুলাে ইতিমধ্যেই বৈজ্ঞানিক মহলে এবং তার বাইরে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে।

কিন্তু বিবর্তনের ব্যাপারটা আলাদা। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের মৌলিক ধারণাটি শুধু মাত্র চিন্তার উদ্রোকারকই নয়, এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘ডিজাইন আর্তুমেন্ট’কে বাতিল করে দেয়, যেটি দীর্ঘদিন ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে প্রধানতম যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হত। সে জন্যই যত প্রণােদনা আজও দেখা যায় তার প্রায় সবই জীববিজ্ঞানীদের ঠেকানাের ক্ষেত্রে।’

আইডির জীববিজ্ঞানীরা সেই পুরােন চোখকে আবারাে তাদের তত্ত্বের এক প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। আসলে ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’-এর ব্যানারে, প্যালের সেই সৃষ্টতত্ত্বের যুক্তিই যে বিগত কয়েক দশকে আবার নতুন মােড়কে ফিরে এসেছে তা চোখ নিয়ে আইডি প্রবক্তাদের নতুন করে গজিয়ে ওঠা ‘বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তি’গুলাে আলােচনা করলেই বােঝা যাবে। আবারও চোখের গঠন নিয়ে তারা অনেক হৈ চৈ শুরু করছেন, তাদের মতে আমাদের চোখের গঠন এত জটিল, সূক্ষ্ম এবং নিখুঁত যে বুদ্ধিমান কোন স্রষ্টার ডিজাইন ছাড়া তা সৃষ্টিই হতে পারে না। ৫%, ১০%, সিকিভাগ বা অর্ধেক চোখ নাকি জীবের কোন কাজে আসতে পারে না। ডঃ রিচার্ড ডকিন্স, ডঃ ইউজিন স্কট, ডঃ জেরি কয়েন, ডঃ কেনেথ মিলার সহ অনেক বিজ্ঞানী ইতিমধ্যেই তাদের এই দাবিগুলােকে ভুল বলে প্রমাণিত করেছেন।

অনেকেই মনে করেন যে চোখের (কিংবা কান, পাখা, ফুসফুস ইত্যাদি) মত একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে সৃষ্টি হতে পারে না, কারণ মধ্যবর্তী পর্যায়গুলাে স্বতন্ত্রভাবে ঠিকমত কাজ করতে পারবে না, এবং তার ফলে তাদের কোন উপযােগিতাই থাকতে পারে না। তারা আসলে এখানে বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ দিকটিই বুঝতে পারেন না বা এড়িয়ে যেতে চান। আমরা আগেই দেখছি যে, জীবের কোন অংশকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের দৃষ্টিকোন থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আসার জন্য পূর্ণাঙ্গভাবে বিকাশিত হতে হয় না।

অন্ধ হওয়ার থেকে আংশিক দৃষ্টিশক্তি থাকা অনেক ভালাে। আমাদের মধ্যে অনেকেরই দৃষ্টিক্ষীণতার (myopia) বা দুরের বা কাছের দৃষ্টিহীনতার সমস্যা আছে, তার ফলে আমরা। দুরে বা কাছে অস্পষ্ট দেখি। কিন্তু আমরা যদি আদিম কালের মত বন্য জীবন যাপন করতাম এই সীমাবদ্ধতাসহ চোখই আমাদেরকে অনেকখানি সুবিধা এনে দিতে পারতাে। আমরা খাওয়া, আশ্রয়, সঙ্গী বা শিকারী পশুদের দেখতে পেতাম, তাদের নড়াচড়া বুঝতে পারতাম। যে জনসমষ্টির মধ্যে কোন দৃষ্টিশক্তিই নেই বা খুবই সীমিত দৃষ্টিশক্তি আছে তাদের জন্য চোখের উদ্ভব বা চোখের মত যে কোন অঙ্গের বিন্দুমাত্র উন্নতিই অনেক বাড়তি সুবিধা এনে দেবে।

একেবারেই দর্শনশক্তি না থাকা মানে হচ্ছে সে পুরােপুরিই অন্ধ, এখন প্রাণীটির মধ্যে যদি অর্ধেক বা সিকিভাগ দৃষ্টিক্ষমতাও বিকাশ লাভ করে তাহলেই সে কিছু হলেও তার শিকারীর গতিবিধি দেখতে পাবে বা বুঝতে পারবে। চোখের এইটুকু আংশিক বিকাশই প্রাণীটির বেঁচে থাকা বা না থাকার মধ্যে বিশাল একটি ভুমিকা রাখতে পারে। একই যুক্তি খাটে পাখার ক্ষেত্রেও, আমরা চারপাশে আংশিক পাখাসহ প্রচুর প্রাণী দেখতে পাই।

টিকটিকি, ব্যাঙ, শামুক জাতীয় গ্লাইড করে চলে এমন অনেক প্রাণীর মধ্যেও আংশিক পাখার মত অংশ দেখতে পাওয়া যায়। গাছে থাকে এমন অনেক প্রাণীর দুই জয়েন্টের মাঝখানে পাখার মত একধরনের চামড়ার অস্তিত্ব দেখা যায় যেটা আংশিকভাবে বিকশিত পাখা বৈ আর কিছু নয়। পাখাটি কত ছােট বা বড় তা এখানে ব্যাপার নয়, প্রাণীটি যদি কখনও গাছ থেকে পড়ে যায় তাহলে ওইটুকু পাখা ব্যবহার করেই সে তার জীবন বাঁচাতে পারবে যা কিনা তাকে টিকে থাকতে বাড়তি সুবিধা জোগাবে।

আইডি প্রবক্তাদের আরেকটি অতিপ্রিয় যুক্তি হচ্ছে চোখের নিখুঁত গঠন যা তাদের মতে কোন বুদ্ধিদীপ্ত সৃষ্টিকর্তার হস্তক্ষেপ ছাড়া সৃষ্টিই হতে পারে না। আর অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা বলেন, বিবর্তন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন যেহেতু শুধুমাত্র বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলির উপর ভিত্তি করে দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত এবং পরিবর্ধিত হতে হতে আরও উন্নততর রূপে পরিণত হয়, তাই খুব যুক্তিসঙ্গত কারণেই প্রাণীর মধ্যে অনেক ত্রুটিপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখা যায়।

এ প্রেক্ষিতে এখন দেখা যাক আইডি-ওয়ালারা যেমনটি দাবী করছেন, মানুষের চোখ আসলেই সেরকম ত্রুটিহীন বা নিখুঁত কিনা। চোখের অক্ষিপটের (Retina) ভিতরে একধরনের আলাে-গ্রহনকারী (Photoreceptor or photo cells) কোষ আছে যারা বাইরের আলাে গ্রহন করে এবং তারপর একগুচ্ছ দর্শন স্নায়ুর (Optic nerve or ganglion cells) মাধ্যমে তাকে মস্তিষ্কে পৌঁছানাের ব্যবস্থা করে, যার ফলে আমরা দেখতে পাই। কোন বুদ্ধিমান স্রষ্টা নিশ্চয়ই জালের মত করে ছড়িয়ে থাকা এই স্নায়ুগুলােকে আলাে গ্রহনকারী কোষগুলাের সামনের দিকে বসিয়ে দেবেন না!

কারণ তাহলে তাে বেশ কিছু আলাে বাঁধা পাবে, আমরা এই বাধাটুকু না থাকলে যতখানি দেখতে পেতাম তার থেকে কম দেখতে পাবাে এবং এর ফলে আমাদের দৃষ্টির মান অনেক কমে যাবে! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, বাস্তবেই আমাদের চোখ ওরকম। আমাদের অক্ষিপটের ঠিক সামনে এই স্নায়ুগুলাে জালের মত ছড়ানাে থাকে, শুধু তাই না, এই স্নায়ুগুলােকে যে রক্তনালীগুলাে রক্ত সরবরাহ করে তারাও আমাদের অক্ষিপটের সামনেই বিস্তৃত থাকে, এর ফলে আলাে বাধা পায় এবং আমাদের দৃষ্টশক্তি কিছুটা হলেও কমে যায়।

স্নায়ুগুলাের এই অসুবিধাজনক অবস্থানের কারনে আমাদের চোখে আরেকটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে । এই স্নায়বিক জালটি মস্তিষ্কে পৌছানাের জন্য অক্ষিপটকে ফুটো করে তার ভিতর দিয়ে পথ করে নেয়। এর ফলে একটি অন্ধবিন্দু (blind spot)-এর সৃষ্টি হয়। আমাদের প্রত্যেকের চোখেই এক মিলিমিটারের মত জায়গা জুড়ে এই অন্ধবিন্দুটি রয়েছে, আমরা আপাতভাবে বুঝতে না পারলেও ওই জায়গাটিতে আসলে আমাদের দৃষ্টি সাদা হয়ে যায়।

তাহলে কি চোখ সৃষ্টির সময় এই সীমাবদ্ধতাগুলাে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় খােলা ছিলাে না? তাও তাে ঠিক নয়। আমাদের সামনেই এরকম প্রাণীরও উদাহরণ তাে রয়েছে যাদের স্নায়ুগুলাে খুব নিখুঁতভাবে আলাে-গ্রহনকারী কোষগুলাের পিছনে বসানাে আছে। স্কুইড এবং অকটোপাসেরও আমাদের মতই একধরনের লেন্স-এবং-অক্ষিপটসহ চোখ আছে, যার প্রয়ােজনীয় স্নায়ুগুলাে অক্ষিপটের পিছনে অবস্থান করে এবং তার ফলে তাদের চোখে কোন অন্ধবিন্দু-এর সৃষ্টি হয়নি।

আসলে বিবর্তন তত্ত্বের মাধ্যমে আমাদের চোখের এই সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটিকে কে খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। বিবর্তন কাজ করে শুধুমাত্র ইতিমধ্যে তৈরী বা বিদ্যমান গঠনকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে, সে নতুন করে কিছু সৃষ্টি বা বদল করতে পারে না। মেরদন্ডী প্রাণীর চোখ সৃষ্টি হয়েছে মস্তিষ্কের বাইরের দিকের অংশকে পরিবর্তন করে যা অনেক আগেই সৃষ্টি হয়েছিলাে, বহুকাল ধরে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের এই অংশটি পরিবর্তিত হতে হতে আলাের প্রতি সংবেদনশীলতা লাভ করেছে। মস্তিষ্কের এই সংবেদনশীল কোষগুলাে অক্ষিপটের আকার ধারণ করলেও মস্তিষ্কের পুরােনাে মূল গঠনটি তাে আর বদলে যেতে পারেনি, তার ফলে এই জালের মত ছড়িয়ে থাকা স্নায়ুগুলােও তাদের আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে।

কিন্তু অন্যদিকে মলাস্ক (স্কুইড বা অকটোপাস) জাতীয় প্রাণীর চোখ বিবর্তিত হয়েছে তাদের চামড়ার অংশ থেকে, মস্তিষ্কের অংশ থেকে নয়। এক্ষেত্রে ত্বকের স্নায়ুগুলাে মস্তিষ্কের মত ঠিক বাইরের স্তরে না থেকে ভিতরের স্তরে সাজানাে থাকে, আর এ কারণেই স্নায়ুগুলাে মলাঙ্কের চোখের অক্ষিপটের সামনে নয় বরং পিছনেই রয়ে গেছে। আমাদের চোখ যদি এভাবে লাখ লাখ বছর ধরে প্রাকৃতিকভাবে বিবর্তিত না হয়ে কোন পূর্বপরিকল্পিত ডিজাইন থেকে তৈরী হত তাহলে হয়তাে চোখের এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিজ্ঞানীদেরও আর মাথা ঘামাতে হত না।

আণবিক জীববিজ্ঞানের কথা না উল্লেখ করলে চোখ নিয়ে আলােচনা তাে সম্পূর্ণই হবে না। বিগত কয়েক দশকে জীববিজ্ঞানের এই শাখাটি রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। জীববিজ্ঞানের মূল গবেষণা এখন চোখের মত বড় কাঠামাে থেকে সরে এসে তার কোষে এসে ঠেকেছে। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে পাওয়া ফলাফলগুলাে রীতিমত বিস্ময়কর। দেখা গেছে, কীট-পতঙ্গের চোখের সাথে মানুষের চোখের কাঠামােগত যত বৈসাদৃশ্যই থাকুক না কেন, এরা একই ধরনের বংশানুসৃত দ্রব্য দিয়ে তৈরী।

আলাের প্রতি সংবেদনশীল প্রােটিন Opsins এবং Pax6 নামে একটি প্রধান নিয়ামক জিন (master controll gene) খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা যা দিয়ে তারা ইঁদুর থেকে শুরু করে ফুট ফ্লাই এবং ফুট ফ্লাই থেকে। শুরু করে মানুষ পর্যন্ত সকল প্রজাতির চোখের উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করতে পারেন[৩৫]। শুধু তাই নয় অন্ধ ড্রসােফিলার মধ্যে এ জিনটি প্রবেশ করিয়ে কৃত্রিমভাবে চোখের উদ্ভবও ঘটানাে হয়েছে [৩৫][৩৬]। এই জিনের আবিস্কার চোখের বিবর্তনের ধারাটিকে আরাে স্পষ্ট ভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। এ কারণেই নেইল শ্যাঙ্কস তার ‘গড দ্য ডেভিল এন্ড ডারউইন’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন – চোখের ব্যাপারটা। বিবর্তনবাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠার বদলে বরং আজ বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ হিসেবেই বরং আবির্ভূত হয়েছে[১২]

লিহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়নবিদ ডঃ মাইকেল বিহে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের একজন অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর ‘Darwins Black Box: The Biochemical Challenge to Evolution’ (১৯৯৬) বইটয়া নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক কালে ইনটেলিজেন্ট ডিজাইনের সমর্থনে সবচেয়ে শক্তিশালী বই। এ বইয়ে। ডঃ বিহে হ্রাস-অযােগ্য জটিলতা (Irreducible complexity) নামে একটি নতুন শাব্দিক পরিভাষা সৃষ্টি করেছেন এবং দেখাতে চেয়েছেন, সরল অবস্থা হতে জটিল জীবজগতের সৃষ্টি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্টি হতে পারেনা। কিন্তু হাস-অযােগ্য জটিলতা’- জিনিসটা কি? ডঃ বিহে তার বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন[৩২]:

যে সমস্ত জৈব তন্ত্র (Biological system) নানা ধরনের, পর্যায়ক্রমিক, কিংবা সামান্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কোনভাবেই গঠিত হতে পারে না, তাদের আমি হাস-অযােগ্য জটিল’ (Irreducible complex) নামে অভিহিত করি। হাস-অযােগ্য জটিলতা’ আমার দেওয়া এক বর্ণাঢ্য শব্দমালা যার মাধ্যমে আমি পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় (interaction) অংশ নেওয়া একাধিক যন্ত্রাংশের একটি সিস্টেমকে বােঝাই – যার মধ্য থেকে একটি অংশ খুলে নিলেই সিস্টেমটি আর কাজ করবে না।

বিহে পুরাে ব্যাপারটি বােঝাতে মানুষের ডিজাইন করা ইঁদুর ধরার কলের (mouse trap) উদাহরণ হাজির করেছেন। এ সাধারণ যন্ত্রটির মধ্যে থাকে ১) কাঠের পাটতন, (২) ধাতব হাতড়ি যার সাহায্যে ইদুর মারা হয়, (৩) স্প্রিং যার শেষ মাথাটি হাতুড়ির সাথে আটকানাে থাকে, (৪) একটি ফাঁদ যা স্প্রিংটিকে বিমুক্ত করে (৫) এবং একটি ধাতব দন্ড যা ফাঁদের সাথে যুক্ত থাকে এবং হাতুরীটিকে ধরে রাখে। বিহের যুক্তি হল শুধু প্ল্যাটফর্ম বা স্প্রিং এর সাহায্যে ইঁদুর ধরা যায় না। ইঁদুর তখনই কলে ধরা যাবে যখন পুরাে সিস্টেমের সকল যন্ত্রাংশগুলাে এক সাথে কাজ করবে। যেকোন একটি যন্ত্রাংশকে খুলে ফেললেই ইঁদুর ধরার কলের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। কাজেই বিহের মতে, এটি একটি হ্রাস-অযােগ্য জটিল সিস্টেমের ভাল উদাহরণ।

ঠিক একইভাবে বিহে মনে করেন প্রকৃতিতে ব্যকটেরিয়ার ফ্ল্যাজেলামগুলাে ‘হ্রাস-অযােগ্য’ জটিল। এ ফ্ল্যাজেলামগুলাের প্রান্তদেশে এক ধরনের জৈব-মােটর আছে যেগুলােকে ব্যাকটেরিয়ার কোষগুলাে স্ব-প্রচালনের (self-propulsion) কাজে ব্যবহার করে। তার সাথে চাবুকের মত দেখতে এক রকমের প্রপেলারও আছে, যেগুলাে ওই আনবিক মােটরের সাহায্যে ঘুরতে পারে। প্রােপেলারগুলাে একটি ইউনিভার্সাল জয়েন্টের মাধ্যমে মােটরের সাহায্যে লাগানাে থাকে। মােটরটি আবার এক ধরনের প্রােটিনের মাধ্যমে জায়গামত রাখা থাকে, যেগুলাে বিহের মতে স্ট্যাটরের ভূমিকা পালন করে।

আরেক ধরনের প্রােটিন বুশিং পদার্থের ভূমিকা পালন করে যার ফলে চালকস্তম্ভন্ড (drive shaft)টি ব্যাকটেরিয়ার মেমব্রেনকে বিদ্ধ করতে পারে। বিহে বলেন, ব্যাকটেরিয়ার ফ্ল্যাজেলামকে ঠিকমত কর্মক্ষম রাখতে ডজনখানেক ভিন্ন ভিন্ন প্রােটিন সম্মিলিত ভাবে কাজ করে। যে কোন একটি প্রােটিনের অভাবে ফ্ল্যাজেলাম কাজ করবে না, এমন কি কোষ গুলােও ভেঙ্গে পড়বে।

জীববিজ্ঞানীরা বিহের সবগুলাে যুক্তিকেই খন্ডন করেছেন। বিহের উদাহরণে বর্ণিত ওই ইদুর ধরার কলটির কথাই ধরুন। কলটি ড্রাইভার দিয়ে খুলে এর ফাঁদ এবং ধাতব দন্ডটি সরিয়ে নিন। এবার আপনার হাতে যেটি থাকবে সেটি আর ইঁদুরের কল নয়; বরং অবশিষ্ট তিনটি যন্ত্রাংশ দিয়ে গঠিত মেশিনটিকে আপনি সহজেই টাই ক্লিপ কিংবা পেপার ক্লিপ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। এবারে স্প্রিংটিকে সরিয়ে নিন। এবারে আপনার হাতে থাকবে দুই-যন্ত্রাংশের এক চাবির চেইন। আবার প্রথমে সরিয়ে নেওয়া ফাঁদটিকে মাছ ধরার ছিপ হিসেবেও আপনি ব্যবহার করতে পারেন, ঠিক যেমনিভাবে কাঠের পাটাতনটিকে ব্যবহার করতে পারেন ‘পেপার-ওয়েট’ হিসেবে। অর্থাৎ যে সিস্টেমটিকে এতক্ষণ ‘হাস-অযােগ্য জটিল’ বলে ভাবা হচ্ছিল, তাকে আরাে ছােট ছােট ভাগে ভেঙ্গে ফেলে অন্যান্য অনেক প্রয়ােজনীয় কাজে লাগানাে যায়।

ব্যকটেরিয়ার ফ্ল্যাজেলাম গুলাের ক্ষেত্রে আসা যাক। বিহে যেমন ভেবেছিলেন কোন প্রােটিন সরিয়ে ফেললে। ফ্ল্যাজেলাম আর কাজ করবে না, অর্থাৎ পুরাে সিস্টেমটিই অকেজো হয়ে পড়বে, তা মােটেও সত্যি নয়। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কেনেথ মিলার পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন কিছু গুরুত্বপুর্ণ প্রােটিন সরিয়ে ফেলার পরও ফ্ল্যাজেলামগুলাে কাজ করেছে; বহু ব্যাকটেরিয়া এটিকে অন্য কোষের ভিতরে বিষ ঢেলে দেওয়ার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে।

অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, ফ্ল্যাজেলামের বিভিন্ন অংশগুলাের আলাদা ভাবে ভিন্ন ভিন্ন কাজ থাকলেও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সুবিধা পেতে পারে। জীববিজ্ঞানে এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যায় যে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলাে এক সময় এক উদ্দেশ্য ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখযােগ্য উদাহরণ হচ্ছে সরীসৃপের চোয়ালের হাড় থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণীর কানের উৎপত্তি।

আজকে আমাদের কানের দিকে তাকালে ওটাকে হ্রাস-অযােগ্য জটিল বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আদিতে তা ছিল না। এমন নয় যে, হঠাৎ করেই একদিন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের কজাবিহীন চোয়ালের আলাে ঠিক করল তারা কানের হাড়ে পরিণত হয়ে যাবে; বরং এর জন্য বিবর্তনের পথ ধরে ধীর পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক চড়াই উত্রাই পেরিয়েই তারা আজকের রূপ ধারণ করেছে। কাজেই উৎপত্তির সামগ্রিক ইতিহাস না জেনে শুধুমাত্র চোখ, কান কিংবা ফ্ল্যাজেলামের দিকে তাকালে ওগুলােকে ‘হ্রাস-অযােগ্য জটিল’ বলে মনে হতে পারে বৈকি।

এ যুগের প্রথিতযশা সংশয়বাদী, টেনিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মাসিমাে ‘Forfatta Ots Design yes, intelligent no: a critique of intelligent design theory and neo-creationism’ প্রবন্ধে বলেন, জীবজগতে হয়ত বেশ কিছু উদাহরণ থাকতে পারে যেগুলােকে জীববিজ্ঞানীরা বিবর্তন তত্ত্বের আলােকে এ মুহূর্তে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না; কারণ জীববিজ্ঞানীদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য নেই।

কাজেই এটি মূলতঃ অজ্ঞতা সূচক যুক্তি (Argument from ignorance), কখনই বিহের তথাকথিত Irreducible complexityর প্রমাণ নয়। আমরা এ প্রবন্ধে আগেই উল্লেখ করেছি যে, উইলিয়াম প্যালে যখন প্রথম আঠারাে শতকে ‘আর্গুমেন্ট অব ডিজাইন’ বা সৃষ্টির অনুকপের অবতারণা করেছিলেন, তখন তিনি চোখের গঠন দেখে যার পর নাই বিস্মিত হয়েছিলেন। প্যালে ভেবেছিলেন চোখের মত একটি জটিল প্রত্যঙ্গ কোন ভাবেই প্রাকৃতিক উপায়ে বিবর্তিত হতে পারে না। কিন্তু আজকের দিনের জীববিজ্ঞানীরা পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক নিয়মে চোখের বিবর্তনের ধাপগুলাে সম্বন্ধে পুরােপুরি নিশ্চিত হয়েছেন।

ম্যাট ইয়ং তার ‘Grand Designs and Facile Analogies: Exposing Behe’s Mousetrap and Dembski’s Arrow’ প্রবন্ধে বলেন:

“আধা-চোখের যুক্তি গ্রহণযােগ্য হচ্ছে না দেখে ডঃ বিহে এখন আধা ফ্ল্যাজেলামের যুক্তি হাজির করেছেন; আর একটা গালভরা নামও খুঁজে বের করেছেন -‘ইরিডিউসিবল কম্পলেক্সিটি। কিন্তু এটি ওই পুরােনাে আধা চোখের যুক্তিই। আর গালভরা পরিভাষা বাদ দিলে এটি শেষ পর্যন্ত ওই অজ্ঞতাসূচক যুক্তি বা God in gaps।[৩৩]

এবারে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘সৃষ্টির বুদ্ধিদীপ্ত অনুকল্প’ এর ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক[৩৪]। ধরা যাক মাধ্যাকর্ষণের কথা। নিউটন তার মাধ্যাকর্ষণ সূত্রে একটি ধ্রুবক ব্যবহার করেছিলেন যাকে আমরা বলি নিউটনীয় ধ্রুবক, বা গ্র্যাভিটেশনাল কনস্ট্যান্ট। নিউটন তার সেই বিখ্যাত সূত্রে দেখিয়েছিলেন, দুটো বস্তুর মধ্যে আকর্ষণবলের পরিমান ঠিক কতটা হবে সেটা নির্ণয়ে এই গ্র্যাভিটেশনাল কনস্ট্যান্ট নামের রাশিটি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি ওই ধ্রুবকটির মান এখন যা আছে তা না হয়ে অন্যরকম হত আকর্ষণ বলের পরিমাণও যেত বদলে।

সাদা চোখে মনে হবে যে ব্যাপারটা সামান্যই, আকর্ষণ বল বদলালেও বােধ হয় তেমন কিছু যাবে আসবে না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেন, ওই ধ্রুবকের মান আসলে আমাদের এই পরিচিত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি নির্ধারণ করছে। ওটার মান এখন যা আছে তা না হয়ে যদি অন্য ধরণের কিছু হত তা হলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটাই হত অন্যরকম। ওই ধ্রুবকের মান ভিন্ন হলে তারাদের মধ্যে হাইড্রোজেন নিঃশেষিত হয়ে হিলিয়াম উৎপাদনের মাত্রাকে দিত বদলে। হাইড্রোজেন-হিলিয়ামের পর্যাপ্ততা শুধু এই গ্র্যাভিটেশনাল কনস্ট্যান্ট এর উপরই নয়, মহাকর্ষ এবং দুর্বল পারমাণবিক বলের মধ্যকার শক্তির ভারসাম্যের উপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল।

যেমন, তাঁরা দেখিয়েছেন, দুর্বল পারমাণবিক বলের শক্তি যদি একটু বেশী হত, এই মহাবিশ্বে পুরােটাই মানে শতকরা একশ ভাগ হাইড্রোজেনে পূর্ণ থাকত, কারণ ডিউটেরিয়াম (এটি হাইড্রোজেনের একটি মাসতুত ভাই, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘আইসােটোপ’) আর হিলিয়ামে পরিণত হবার আগেই সমস্ত নিউট্রন নিঃশেষ হয়ে যেত। আবার দুর্বল পারমানবিক বলের শক্তিমত্তা আরেকটু কম হলে সারা মহাবিশ্বে শতকরা একশ ভাগই হত হিলিয়াম। কারণ সেক্ষেত্রে নিউট্রন নিঃশেষিত না হয়ে তা উৎপন্ন প্রটোনের সাথে যােগ দিয়ে হাইড্রোজেন তৈরীতে বাঁধা দিত।

কাজেই এ দু’চরম অবস্থার যে কোন একটি সঠিক হলে মহাবিশ্বে কোন নক্ষত্ররাজি তৈরী হওয়ার মত অবস্থাই কখনও তৈরী হত না, ঘটত না আমাদের এই মলয়শীতলা ধরণীতে কার্বন-ভিত্তিক প্রাণের নান্দনিক বিকাশ। আবার,বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রনের ভর মাপতে গিয়ে দেখেছেন এই ভর নিউট্রনপ্রােটনের ভরের পার্থক্যের চেয়ে কিছুটা কম যার ফলে তারা মনে করেন, একটি মুক্ত-নিউট্রন সহজেই প্রােটন, ইলেকট্রন ও অ্যান্টি-নিউট্রিনােতে পরিনত হতে পেরেছে।

image-10-4
চিত্র ১০,৪; অনেক বিজ্ঞানী বলেন মহাবিশ্বের খুব সীমিত পরিসরের মধ্যে জীবনের বিকাশ ঘটেছে; এমন কেন হয়েছে তার উত্তর পেতে হলে ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে পৃথিবীতে প্রাণ এবং মানুষের উপস্থিতির দিকে তাকিয়ে।

যদি ইলেকট্রনের ভর সামান্য বেশী হত, নিউট্রন তাহলে সুস্থিত হয়ে যেত, আর উৎপন্ন সমস্ত ইলেকট্রন আর প্রােটন সব একসাথে মিলে-মিশে নিউট্রনে পরিণত হয়ে যেত। এর ফলে যেটা ঘটত সেটা আমাদের জন্য খুব একটা সুখপ্রদ কিছু নয়। সে ক্ষেত্রে খুব কম পরিমানে হাইড্রোজেনই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকত আর তা হলে নক্ষত্রের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানীই হয়ত খুঁজে পাওয়া যেত না।

জন ডি, ব্যরাে এবং ফ্রাঙ্ক জে. টিপলার এ ধরনের নানা ধরনের রহস্যময় যােগাযােগ তুলে ধরে একটি। বই লিখেছেন ১৯৮৬ সালে, নাম- The Anthropic Cosmological Principle। তাঁদের বক্তব্য হল, আমাদের মহাবিশ্বে গ্র্যাভিটেশনাল অথবা কমলজিকাল ধ্রুবকগুলাের মান এমন কেন, কিংবা মহাবিশ্বের চেহারাটাই বা এমন কেন হয়েছে তার উত্তর পেতে হলে ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে পৃথিবীতে প্রাণ এবং মানুষের উপস্থিতির দিকে তাকিয়ে।

পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির জন্য সর্বোপরি মানুষের আবির্ভাবের জন্য এই মৌলিক ধ্রুবক আর চলকগুলাের মান ঠিক এমনই হওয়া দরকার ছিল – সে জন্যই ওগুলাে ওরকম। দৈবক্রমে ওগুলাে ঘটে নি, ররং এর পেছনে এক বুদ্ধিদীপ্ত সত্ত্বার (বিধাতার) একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। মানুষকে কেন্দ্রে রেখে বিশ্বব্রহ্মান্ডের নিয়ম-নীতিগুলােকে ব্যাখ্যা করবার এই যুক্তিকে বলা হয়। ‘অ্যানথ্রোপিক আগ্রুমেন্ট’ বা নরত্ববাচক যুক্তি। গণিতবিদ এবং দার্শনিক ডঃ উইলিয়াম ডেম্বস্কি ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর- ‘Intelligent Design: The Bridge Between Science & Theology’ বইয়ে তথ্য বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, আমাদের এই মহাবিশ্বের ভিতর যে ধরনের বিমূর্ত তথ্য লুকানাে আছে তা কোনভাবেই প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্ট হতে পারে না।

এধরনের যুক্তিগুলাে প্রথম দৃষ্টিতে খুব আকর্ষণীয় দেখালেও, অনুসন্ধিৎসু সংশয়বাদী চোখ দিয়ে দেখলে কিন্তু নানা দুর্বলতা প্রকাশ পায়। প্রথমতঃ ব্যারাে এবং টিপালার যে যুক্তি দিয়েছেন সে ক্ষেত্রে এটি ধরেই নেওয়া হয়েছে আমাদের পৃথিবীতে যে ভাবে কার্বন ভিত্তিক প্রাণের বিকাশ ঘটেছে সেভাবে ছাড়া আর অন্য কোনভাবে প্রাণ সৃষ্ট হতে পারবে না। এই সজ্ঞাত ধারণাটি কখনই সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। যেমন, বিজ্ঞানীরা। কিন্তু কার্বনের পাশাপাশি সিলিকন ভিত্তিক প্রাণের বিকাশকেও ইদানিং কালে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন।

প্রকৃতিতে পাওয়া ডায়াটমগুলাে (জীববিজ্ঞানের ভাষায় এগুলাে এক ধরনের Eukaryotic algae) এমনি একটি উদাহরণ। আবার আমরা প্রায়শঃই শুনি যে, আমাদের পৃথিবীতে তাপ, চাপ সবকিছু যদি সঠিক অনুপাতে না থাকত, তবে নাকি প্রাণের বিকাশ ঘটত না। এই যে পৃথিবীটা ২৩.৫ ডিগ্রীতে হেলে আছে, তার এক চুল এদিক ওদিক হলে তাপ আর চাপের এমন বৈষম্য তৈরী হত যে, প্রাণ সৃষ্টিই অসম্ভব একটি ব্যাপারে পরিণত হত। কিন্তু অনেকেই প্রাণের এই ধরনের ‘সঙ্কীর্ণ’ সংজ্ঞার সাথে একমত পােষণ করেন না।

তারা বলেন, আমরা ওই ধরণের সর্বোত্তম পরিবেশে বিকশিত হয়েছি বলে আমরা মনে করি প্রাণের উৎপত্তির জন্য ঠিক ওধরণের পরিবেশই লাগবে। যেমন, বাতাসে সঠিক অনুপাতে অক্সিজেন, চাপ, তাপ ইত্যাদি। এগুলাে ঠিক ঠিক অনুপাতে না থাকলে নাকি জীবনের বিকাশ ঘটবে না। এটি একটি সজ্ঞাত ধারণা, প্রামাণিত সত্য নয়। অক্সিজেনকে জীবন বিকাশের অন্যতম উপাদান বলে মনে করা হয়, কিন্তু মাটির নীচে এমন অনেক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া গেছে যাদের জন্য অক্সিজেন শুধু অপ্রয়ােজনীয়ই নয়, রীতিমত ক্ষতিকর।

ষাটের দশকে আমেরিকান জীববিজ্ঞানী টমাস ব্ৰক (Thomas Brock) এবং তার সহকর্মীরা ওয়াইওমিং এর ইয়েলােস্টোন ন্যাশনাল পার্কের ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উষ্ণ প্রস্রবনে এক ধরনের সরলাকৃতির অণুজীব (Microbes) আবিষ্কার করেন[৩৭]। কোন বহুকোষী জীবই সাধারণতঃ এই তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে না।

সমুদ্রের গভীর তলদেশে এমনকি কেরসিন তেলের ভিতরের বৈরী পরিবেশেও প্রাণের বিকাশ ঘটেছে এমন প্রমাণ বিজ্ঞানীদের কাছে আছে – যে পরিবেশের সাথে আসলে আমাদের সংজ্ঞায়িত সর্বোত্তম পরিবেশের কোনই মিল নেই। যে সমস্ত প্রাণ এই ধরনের ভয়ংকর বৈরী পরিবেশে টিকে থাকতে পারে তাদেরকে বলা হয় চরমজীবী (Extremophile)। পৃথিবীতে বেশ কয়েক ডজন চরমজীবীর অস্তিত্ব রয়েছে। কাজেই হলফ করে বলা যায় না যে, মহাজাগতিক ধ্রুবক আর চলকগুলাের মান অন্যরকম হলে এই মহাবিশ্বে প্রাণের বিকাশ ঘটত না।


 বিবর্তনের পথ ধরে


১২.↑  Shanks N, 2004, God, the Devil and Darwin: A critique of Intelligent Design theory, Oxford University Press.

২৭.↑  Dennett DC, 2006, The Hoax of Intelligent Design and How It was Prepared, from Intelligent Thought: Science versus the Intelligent Design Movement, Brockman J (Editor), Vintage.

৩২.↑  Behe MJ, 1996, Darwin’s Black Box : The Biochemical Challenge to Evolution, Free Press, USA.

৩৩.↑  Young M and Edis T [editors],( 2004) 2006, Why Intelligent Design Fails: A Scientific Critique of the New Creationism, Rutgers University Press, London.

৩৪.↑  অভিজিৎ রায়, ২০০৫, আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, অঙ্কুর প্রকাশনী।

৩৫.↑  Halder G, Callaerts P, Gehring WJ, 1995, Induction of Ectopic Eyes by Targeted Expression of the eyeless Gene in Drosophila. Science, vol. 267, pp 1788-1792.

৩৬.↑  Gerhart J and Kirschner M, 1997, Embryos, and Evolution: Toward a Cellular and Developmental Understanding of Phenotypic Variation and Evolutionary Adaptability, Cells.

৩৭.↑  Brock TD, Life at High Temperature, History and Education, Inc, Yellowstone National Park, Wyoming.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা