বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৫. আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষঃ Homo-দের বিবর্তনের গল্প

‘মানুষ’ বলতে আমরা তাহলে কাদেরকে বােঝাবাে? বিবর্তনের ইতিহাসে কোন প্রজাতিগুলােকে মধ্যবর্তী ফসিল বলবাে আর কাদেরকে আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ বলবাে? পৃথিবীর এই অফুরন্ত প্রাণের মেলায় আমরাই তাে একমাত্র প্রাণী যারা নিজেদের ভূতভবিষ্যত নিয়ে মাথা ঘামাতে পারি, উৎপত্তি বা বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে পারি, বই লিখতে পারি, বক্তৃতা দিতে পারি! তাই ইতিহাসের চুলচেড়া বিশ্লেষণ করে বিবর্তনের ভাষায় ‘মানুষ’ বলতে কি বােঝায় তা বের করার দায়িত্বটাও আমাদের কাঁধেই এসে বর্তায়।

আমাদেরকেই এই প্রশ্নগুলাের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে – ঠিক কোন বৈশিষ্ট্যগুলাের বিবর্তনের কারণে আমরা আজকের আধুনিক মানুষে পরিণত হয়েছি? কোন সময় থেকে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলাের বিবর্তন ঘটতে শুরু করেছিলাে? কাদেরকে আমরা বলবাে আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ আর কাদেরকেই বা আখ্যায়িত করবাে মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মিসিং লিঙ্ক বলে?

দুই পায়ের উপর ভর করে দাঁড়াতে পারাটা অবশ্যই মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসের একটা বড় মাইলফলক। তবে আগে অনেকেই মনে করতেন যে, দ্বিপদী হয়ে ওঠাটাই মানুষের পূর্বপুরুষের মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধির পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। খাড়া হয়ে দাঁড়াতে শেখার ফলে তাদের দুই হাত মুক্ত হয়ে গিয়েছিল, তারা শ্রম করতে পেরেছে, হাত দিয়ে হাতিয়ার বানাতে শিখেছে এবং তার ফলেই ধীরে ধীরে তাদের মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে।

ধারণাটা আসলে বিভিন্ন কারণেই ভুল – আমরা আগেই দেখেছি যে কোন প্রয়ােজন থেকে জীবের বিবর্তন ঘটে না, বিবর্তন কারও ইচ্ছা নির্ভর নয়, এভাবে চিন্তা করাটা সেই ভুল ল্যমার্কীয় দৃষ্টিভঙ্গীরই (তৃতীয় অধ্যায়ে ল্যমার্কীয় দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আলােচনা করা হয়েছিল) প্রতিফলন ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে তাে শ্রম করার জন্য মস্তিষ্কের বিবর্তন ঘটতে পারেনা, শারিরীকভাবে জীবের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যটির উদ্ভব না ঘটলে কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখর তার উদ্ভব ঘটা সম্ভব নয়।

ওদিকে আবার প্রায় ২০ লক্ষ বছর ধরে আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গায় দ্বিপদী। ‘লুসি’দের যে ফসিল রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তাতে কিন্তু মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধির কোন নমুনা পাওয়া। যাচ্ছে না, তাদের মস্তিষ্ক কিন্তু শিম্পাঞ্জিদের মস্তিষ্কের সমানই রয়ে গেছে। আসলেই যদি দুই হাত মুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে বা শ্রম করার ফলেই তাদের মধ্যে মস্তিষ্কের বিবর্তন ঘটতে শুরু করতাে তাহলে তাে এই দীর্ঘ ২০ লক্ষ বছরে তার চিহ্ন দেখা যেত[১৯]!

আসলে দ্বিপদী হওয়া ছাড়া এই লম্বা সময়ের মধ্যে তাদের মধ্যে আর তেমন কোন পরিবর্তনই দেখা যায় না, হাটতে শিখলেও তারা তখনও বােধ হয় বেশ বড় একটা সময় গাছেই কাটাতাে, আধুনিক মানুষের সাথে নয় বরং শিম্পাঞ্জির সাথে তাদের মিলটাই যেন একটু বেশী ছিল। তাই বিজ্ঞানীরা এখন আর দ্বিপদী হওয়ার বৈশিষ্ট্যটিকে আধুনিক মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন না। দুই পায়ের উপর দাঁড়াতে শেখাটাই প্রথম বনমানুষ থেকে মানুষের বিবর্তনের পর্বের সুচনা করেছিল তাতে কোন সন্দেহের অবকাশই নেই; তবে তারও বেশ খানিকটা সময় পরে যখন মানব প্রজাতিগুলাের মধ্যে আধুনিক মানুষের বৈশিষ্ট্য দেখা দিতে শুরু করেছিল সেই সময়টাকেই মানুষের বিবর্তনের সন্ধিক্ষণ বলে ধরা হয়।

একসময় বিজ্ঞানীরা হাতিয়ারের ব্যবহারের শুরুকেও মানুষের বিবর্তনের এক গুরুত্বপুর্ণ পর্যায় বলে মনে করতেন। মানুষকে ‘Man the Toolmaker’ হিসেবে ভাবার পিছনে আসলে অনেকগুলাে কারণও ছিল – ভাবা হত যে, এর জন্য যে বুদ্ধি এবং হাতের কলাকৌশলের প্রয়ােজন তা একমাত্র যেন Homo

প্রজাতিগুলােরই আছে। কিন্তু পরে বােঝা গেল যে ব্যাপারটা বােধ হয় ঠিক সেরকম নাও হতে পারে। যে সময়ে এই হাতিয়ারগুলাে পাওয়া গেছে সে সময়ে তাে Hom০-সহ Australopethicus-দেরও বেশ কয়েক প্রজাতির অস্তিত্ব ছিল, তারাও তাে এই হাতিয়ারগুলাে বানিয়ে থাকতে পারে। আসলেই কারা এই হাতিয়ারগুলাে বানিয়েছিল তা এক্কেবারে দিব্যি দিয়ে কিন্তু বলা যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে দেখেছেন যে, শিম্পাঞ্জীদের বিভিন্ন দলের মধ্যেও ছােট খাটো ধরণের সরল হাতিয়ারের ব্যবহার দেখা যায়, এই হাতিয়ারগুলাে বানাতে এবং ব্যবহার করতে তাে তাহলে বড় মস্তিষ্কের প্রয়ােজন নেই। তাই অনেকেই আর হাতিয়ার তৈরির শুরুকে মানব বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় বলে মনে করেন না[৮]

তাহলে কোন বৈশিষ্ট্যগুলাে দিয়ে আমরা আধুনিক মানুষের সরাসরি পূর্বপুরুষদের আলাদা করবাে? বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের আকার এবং ভাষার উৎপত্তিকে আমাদের বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ অধ্যায় বলে মনে করেন, এর সাথে সাথে পরিবেশের পরিবর্তন এবং সেই পরিবেশে টিকে থাকার জন্য হাতিয়ারের ব্যবহার ও খাদ্যাভাসের পরিবর্তনও হয়তাে বেশ জোড়ালাে ভুমিকা রেখেছিল [১০]। এছাড়াও অনেকে মুখ বা নাকের বিশেষ গড়ন, মানব শিশুত্র অত্যন্ত অপরিণত অবস্থায় জন্ম লাভ করার মত বৈশিষ্ট্যেগুলােকেও গুরুত্ব দেন।

Biological-trends-in-human-evolution
চিত্রঃ ৯.১৫: মানুষের পুর্বপুরুষদের মধ্যে ক্রমশঃ মস্তিষ্কের আকার বড় হওয়ার রেখচিত্র

আমরা যখন মস্তিষ্কের আকারের কথা বলি তখন কিন্তু সরাসরি মস্তিষ্কের আকারটা কত বড় তা কিন্তু বােঝাইনা বরং শরীরের সাথে মস্তিষ্কের আনুপাতিক হারকেই বােঝাই। অনেক বড় কোন প্রাণীর মস্তিষ্ক আরও বড় হতে পারে, সেটা এখানে আলােচ্য বিষয় নয়, বরং একটা প্রাণীর শরীরের তুলনায় তার মস্তিষ্ক কত বড় তা দিয়েই তার বুদ্ধিমত্তা বিচার করা হয়। উপরে সময়ের সাথে সাথে মানুষের পুর্বপুরুষের মধ্যে ক্রমশঃ মস্তিষ্কের আকার বড় হওয়ার একটা সারণী দেখানাে হয়েছে।

এখানে আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার যে, এই খুবই ‘মানবসুলভ বৈশিষ্ট্যগুলাে কিন্তু একদিনে উদ্ভুত হয়নি, এরা কোন মােড়কের ভিতরে একসাথে বিবর্তিত হয়ে হঠাৎ করে দেখা দেয়নি, বরং সময়ের সাথে সাথে অত্যন্ত ধীর গতিতে একেক সময়ে হয়তাে একেক বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটেছে। তাই ঠিক কোন সময়টাতে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে আধুনিক মানুষের বৈশিষ্ট্যগুলাে দেখা দিতে শুরু করেছিল তা বলা একটু মুশকিলই বলতে হবে। প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ লক্ষ বছর আগে প্রজাতিগুলােতে একদিকে যেমন প্রথমবারের মত মস্তিষ্কের আকারে বেশ বড়সড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, তেমনি আবার তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে আধুনিক মানুষের বৈশিষ্ট্যগুলােও দেখা দিতে শুরু করে।

আগেই দেখেছিলাম যে, এ সময়টাতে মানুষের পূর্বপুরুষের বেশ কয়েকটি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়। আগেই দেখেছিলাম যে Paranthropus এবং Australopethicus এর বেশ কয়েকটি প্রজাতি এসময়ে টিকে ছিল, আর সেই সাথে প্রথম Homo H. habilis, H. rudolfensis দলের অন্তর্ভুক্ত দেরও অস্তিত্ব দেখা যায়। পঁচিশ লক্ষ বছর আগে থেকে শুরু করে তার পরবর্তী প্রায় ১০ লক্ষ বছর ধরে এত রকমের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রজাতি দেখা যায় যে এদের শ্রেণীবিন্যাস নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন।

এ সময়টাতে এত প্রজাতির বিকাশ এবং বিলুপ্তির পিছনে জলবায়ু এবং পরিবেশের দ্রুত ওঠানামা হয়তাে বিশেষ এক ভুমিকা রেখেছিল। এ প্রসঙ্গে আরেকটি সাধারণ ভুল ধারণা সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে আলােচনা। করে নিলে বােধ হয় খারাপ হয় না। অনেকেই হুট করে বলে বসেন যে, পরিবেশের এই পরিবর্তনের জন্যই আ কারণেই মানুষের বিবর্তন ঘটেছিল। আবারও একই কথা বলতে হয়, কোন কারণের জন্য কিন্তু বিবর্তন ঘটেনা। ব্যাপারটা এমন নয় যে, পরিবেশ বদলানাের সাথে সাথে নতুন নতুন প্রজাতি জন্ম লাভ করতে থাকলাে; মিউটেশন, জেনেটিক রিকম্বিনেশন ইত্যাদির ফলে যদি কোন প্রজাতির মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্যগুলাে ইতােমধ্যেই বিরাজ না করে তাহলে নতুন করে তা গজিয়ে উঠতে পারে না।

পরিবেশ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা ঘটে একইভাবে – এই পরিবেশের পরিবর্তনগুলাে ঘটার সময়ে যে প্রজাতিগুলাে ছিল তাদের মধ্যে যারা বৈশিষ্ট্যগত কারণে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল তারাই শুধু। টিকে গিয়েছিল, আর যারা পারেনি তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এ সময়ে আফ্রিকার ঘন অরণ্যগুলাে কমে আসতে শুরু করে, বিভিন্ন জায়গায় গাছবিহীন শুকনাে অঞ্চল এবং তৃনভুমি জন্ম নেয়। এমনটা তাে হতেই পারে যে, এদের মধ্যে যারা শুধু গাছের ডালে ডালে থাকার চেয়ে বেশ কিছুটা সময় মাটিতে চলাচল করতে শুরু করেছিল এবং দূর দূরান্ত থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে বয়ে নিয়ে আসার উপায় রপ্ত করতে পেরেছিলাে তারাই টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল।

এ কারণেই হয়তাে এ সময়ে দ্বিপদী নয় এমন বেশীরভাগ বনমানুষ প্রজাতির দ্রুত বিলুপ্তি ঘটে যেতে দেখা যায়, আর অন্যদিকে দ্বিপদী বনমানুষদের অর্থাৎ আমাদের পুর্বপুরুষদের দ্রুত বিকাশ ঘটতে শুরু করে। অনেক বিজ্ঞানীই এখন মনে করেন যে, পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়েই বড় মস্তিষ্কের অধিকারী বুদ্ধিমান মানুষের হাতিয়ারের ব্যবহার শুরু করেছিল এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবে জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটাতে বাধ্য হয়েছিল, আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে আমরা এত উন্নত এবং জটিল সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি।

সে যাই হােক, আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের কাহিনী শােনা যাক এবার। ২০ লক্ষ বছর আগের তানজানিয়া, কেনিয়া, ইথিওপিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে H. habilis দের যে ফসিলগুলাে পাওয়া গেছে। তাদের সাথে বিভিন্ন ধরণের পাথুড়ে হাতিয়ারও পাওয়া গেছে[৮]। এগুলােই কিন্তু মানব ইতিহাসে প্রথম হাতিয়ার! তাই মনে করা হয় যে, এরাই বােধ হয় প্রথম পাথুরে যন্ত্র তৈরি করতে শিখেছিলাে এবং নিজেরা শিকার না করলেও মাংস খেতে শিখেছিলাে। মাংসে থাকে অনেক বেশি পুষ্টি ও ক্যালােরি আর তা সহজেই হজম হয় বলে সেখান থেকেই আপেক্ষাকৃত ছােট ক্ষুদ্রান্ত্রেরও বিবর্তন ঘটেছিল।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন তার ফলে শরীরের যে শক্তি বেঁচে গেলাে তা হয়তাে ব্যবহৃত হয়েছিল বড় মস্তিষ্কের বিবর্তনে[২০]। তারা দেখতেও বেশ ছােটখাটো, দাঁতের আকারও বেশ ছােট, এদের পা দেখতে অনেকটা আধুনিক মানুষের মত হলেও হাত তখনও বনমানুষের মতই বড় রয়ে গেছে, ওদিকে আবার খুব সামান্য হলেও মস্তিষ্কের আকার কিন্তু বড় হতে শুরু করে দিয়েছে। এদের মস্তিষ্কের আকার ৫৯০ সিসি থেকে শুরু করে ৬৯০ সিসি, যা পূর্ববর্তী সব প্রজাতির চেয়ে কিছুটা হলেও বড়। তবে এতটুকু বৃদ্ধিকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত এবং তার ভিত্তিতে এদেরকে Hom০-র দলে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও কিছু বিতর্ক দেখা যায়।

homo-habilis
চিত্রঃ ৯.১৬: H. habilis দের দাঁতের এবং চোয়ালের গঠণ এবং আশেপাশের ফসিইলগুলাে দেখে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে তারা মােটামুটিভাবে যা পেত তাই খেত, সব ধরণের খাওয়াতেই তারা অভ্যস্ত ছিল।

ওদিকে আবার একই সময়ের দিকে বেশ বড় ধরণের মানুষের এক প্রজাতিরও ফসিল পাওয়া গেছে। এদের নাম দেওয়া হয়েছে H. rudolfensis, এরা H. habils দের তুলনায় বেশ বড়, এদের মস্তিষ্কের। আকার ৭০০-৮০০ সিসির কাছাকাছি। হাত পায়ের অনুপাতের দিক থেকে এরা অনেকটা আধুনিক মানুষের মত হলেও, এদের বড় এবং শক্ত ধরণের চোয়াল বা দাঁতের গঠন কিন্তু ঠিক সেরকম নয়। এই সবগুলাে প্রজাতিই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে আধুনিক মানুষের চেয়ে বরং লুসির প্রজাতির অনেক কাছাকাছি। আসলে এর পরে বিবর্তনের পদযাত্রায় আমরা যাদের দেখা পাই, সেই H. erectus প্রজাতিটিকেই বরং আমাদের সবচেয়ে কাছের পূর্বপুরুষ বলে মনে হয়।

সেই উনিশ শতকে যখন এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে H. erectus এর ফসিল পাওয়া যেতে শুরু করে তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, আফ্রিকায় মানুষের উৎপত্তি নিয়ে ডারউইন যা ভেবেছিলেন তা আসলে ভুল ছিল। আফ্রিকায় নয়, বরং এশিয়ায়ই হয়তাে প্রথম মানুষের পূর্বপুরুষের বিবর্তন ঘটেছিল। এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় এদের ফসিল পাওয়া যেতে শুরু করে, তাদের মধ্যে পিকিং ম্যান, জাভা ম্যান বেশ বিখ্যাত। চায়নায় যে ফসিলগুলাে পাওয়া যায় তাদের বয়স ১০ লক্ষ বছর থেকে শুরু করে আড়াই লক্ষ বছরের মধ্যে। এরা দেখতে অনেকটাই বােধ হয় আমাদের মত, চেহারা, কপাল এবং চোয়ালের গঠন ফ্ল্যাট হয়ে এসেছে, আগের দেখা মানব প্রজাতিদের তুলনায় মস্তিষ্কের আকারও বেশ অনেক বড়, প্রায় ১০০০ সিসির মত, পায়ের গঠনও আধুনিক মানুষের মতই লম্বা।

কিন্তু তার পরপরই আফ্রিকা জুড়ে মানুষের বিভিন্ন প্রজাতির ফসিল পাওয়া যেতে শুরু করলাে, আর তখন দেখা গেল যে আসলে ডারউইনের ধারণাই ঠিক ছিল। এশিয়ার বিভিন্ন জায়গা জুড়ে যে প্রজাতিগুলাের ফসিল পাওয়া গিয়েছিল তাদের পূর্বপুরুষ আফ্রিকাবাসী H. erectus রা ছাড়া আর কেউ নয়। প্রায় বিশ লক্ষ বছর আফ্রিকায় বিকাশ লাভ করে H. erectus প্রজাতি আর তাদেরই একটা অংশ পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া এবং ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলে। এদের আফ্রিকাবাসী পূর্বসুরীদের অনেকেই H. ergaster বলেও অভিহিত করেন। ফসিল রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে, এই প্রজাতির মানুষেরা ইতােমধ্যেই তাদের পূর্বপুরুষ প্রজাতিদের ভােতা অস্ত্রগুলােকে শান দিকে ধারালাে করতে শিখছে, শিখে গেছে আগুনের ব্যবহার!

homo-erectus
চিত্রঃ ৯.১৭: কোন এক H. erectus গােষ্ঠীর সামাজিক জীবনের কল্পিত ছবি

তারাই সম্ভবত প্রথম মানব প্রজাতি যাদের একটি অংশ আফ্রিকা ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছিল, ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়া এবং ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে ইউরােপ এবং মধ্যপ্রচ্যে পরবর্তীতে H. heidelbergensis নামে যে প্রজাতিটি দেখা যায় তারা সম্ভবত আফ্রিকা থেকে প্রথমবার বেড়িয়ে পড়া H. erectus দেরই উত্তরসুরী। তবে এরা আসলেই H. erectus দের থেকে বিবর্তিত হয়েছিল নাকি তারা আলাদা কোন প্রজাতি বলে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখন মতভেদ দেখা যায়। আর এদের থেকেই পরবর্তীতে নিয়ান্ডারথাল  প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এদের কেউই কিন্তু আমাদের অর্থাৎ H. sapiens দের সরাসরি পূর্বপুরুষ নয়।

আমাদের উৎপত্তি ঘটেছে আফ্রিকাবাসী সেই আদি H. erectus দের অংশ থেকেই প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে, যারা কখনই আফ্রিকা ত্যাগ করেনি। আর প্রায় বিশ লক্ষ বছর আফ্রিকা থেকে বের হয়ে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যে প্রজাতিগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল তারা কোন বংশধর না রেখেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে ইতিহাসের পাতা থেকে।

আমাদের নিজেদের প্রজাতি H. sapiens দের গল্প বলার সময় হয়ে এলাে বলে। কিন্তু তার আগে নিয়ান্ডারথাল মানুষের কাহিনীটাকে আলাদা করে না বলে না নিলে বােধ হয় তাদের প্রতি অবিচারই করা হবে। গত দেড়শ বছরে মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, ইরাক, ইসরাইল থেকে শুরু করে উত্তরে রাশিয়া, জার্মানি, পশ্চিমে স্পেন, ফ্রান্সসহ ইউরােপের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ান্ডারথালদের ফসিল পাওয়া গেছে ( তবে পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা বা অষ্ট্রেলিয়ায় এদের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি)।

sima-de-los-skull
চিত্রঃ ৯.১৮: স্পেনে সিমা নামের একটি গুহার ভিতরই পাওয়া গেছে ৩ লাখ বছরেরও আগের ২,৫০০ ফসিল।

ইরাকের শানিডার নামের এক জায়গায়, বিভিন্ন ধরনের ফুলের কারুকার্য করা, প্রায় ৬০ হাজার বছরের পুরনাে নিয়ান্ডারথালদের কবর পাওয়া গেছে[৭]। ফসিল রেকর্ড থেকে ৪-৫ লাখ বছর আগে H. heidelbergensis প্রজাতি থেকে H. neanderthalensis প্রজাতির বিবর্তনের ইতিহাস কিন্তু খুবই পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে[৮]। তারপর বহুদিন ধরেই রাজত্ব করেছিল তারা।

H-heidelbergensis
চিত্রঃ ৯.১৯: H. heidelbergensis প্রজাতি

৫০-৭০ হাজার বছর আগে, আধুনিক মানুষের যে প্রজাতিটি আফ্রিকা থেকে বের হয়ে এসে পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরােপে পৌঁছেছিল তাদের সাথে পাশাপাশি কিছু সময় ধরে নিয়ান্ডারথাল প্রজাতিটাও টিকে ছিলাে। ৩৫ হাজার বছর আগেও তাদের অস্তিত্ব দেখা যায় বিভিন্ন অঞ্চলে। আধুনিক মানুষের প্রজাতির সাথে এদের অনেক মিল থাকলেও অমিলও ছিলাে প্রচুর। আমাদের মতই বড় মস্তিষ্ক থাকলেও তাদের করােটির আকৃতি ছিলাে বেশ অন্যরকম, মুখের এবং সামনের দাঁতের গঠনেও ছিল বেশ পার্থক্য।

তারা আসলে আমাদের আধুনিক মানুষের প্রজাতিরই অংশ ছিল কিনা এ নিয়ে বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কের কোন অন্ত ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির ফসিল থেকে নেওয়া ডিএনএ র বিশ্লেষন থেকে দেখা গেছে যে তাদের সাথে H. sapiens দের কখনও প্রজনন ঘটেনি, তারা আসলে সম্পূর্নভাবে ভিন্ন একটি প্রজাতি। তাদের সাথে কি আমাদের আধুনিক মানুষ প্রজাতির দেখা হয়েছিলাে, কোন রকম আদান প্রদান কি ঘটেছিলাে কিংবা তাদের বিলুপ্তির পিছনে আমাদের কি কোন অবদান ছিলাে – এই প্রশ্নগুলাের উত্তর এখনও ঠিকমত জানা যায়নি।

প্রায় ৩৫-৪০ হাজার বছর আগে ইউরােপে আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষদের দেখা যেতে শুরু করে, এরা। ক্রো-ম্যগনন জাতি নামে পরিচিত। বিভিন্ন ফসিল রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে, এদের শিকার পদ্ধতি, হাতিয়ারের মান নিয়ান্ডারথালদের চেয়ে অনেক উন্নত ধরণের ছিল, অনেকে মনে করেন যে, এদের সাথে টিকে থাকার প্রতিযােগীতায় হেরে গিয়েই নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ক্রো-ম্যাগনদের সাথে আধুনিক মানুষের বংশগতীয় মিল পাওয়া গেলেও নিয়ান্ডারথালদের সাথে কিন্তু তাদের কোন বংশগতীয় মিল পাওয়া যায় না। এই ক্রো ম্যাগননরাও পরবর্তীতে ইউরােপ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

cro-magnon-and-neanderthal
চিত্রঃ ৯.২০: ক্রো-ম্যাগননদের সাথে নিয়ান্ডারথালদের গঠনগত পার্থক্য

এছাড়াও, আমরা আগে সেই প্রথম অধ্যায়েই দেখেছিলাম যে, ইন্দোনেশিয়ায় Homo floresiensis প্রজাতির যে, ক্ষুদে মানুষগুলাের ফসিল পাওয়া গেছে তারা মাত্র ১২ হাজার বছর আগেও সেখানে দিব্যি টিকে ছিল। তারা খুব সম্ভবত এশিয়ায় বিস্তার করা সেই আগের দেখা Homo erectus প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছিল। তাদের সাথেও আমাদের প্রজাতির কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই বলেই মনে হয়।

উপরের দীর্ঘ আলােচনা থেকে আমাদের সামনে এটুকু স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমরা যতই নিজেদেরকে ‘বিশেষ সৃষ্টি বলে ভাবতে পছন্দ করি না কেন আসলে আমাদের বিবর্তনও ঘটেছে বিবর্তনের সেই একই অন্ধ ‘প্রাকৃতিক নিয়ম মেনেই। এই বিবর্তনের গতি বা হার কখনই সমান ছিলাে না, এবড়াে থেবড়াে পথ পেরিয়ে, কখন দ্রুত, কখনও বা খুব ধীর গতির পরিবর্তনের মাধ্যমে, বহু প্রজাতির উদ্ভব এবং বিলুপ্তির নিষ্ঠুর পথ পেরিয়ে এগিয়ে গেছে আমাদের বিবর্তন।

ডঃ রিচার্ড ডকিন্সের মতই বলতে হয় আসলেই বিবর্তনের প্রক্রিয়াটা আচেতন এবং অন্ধ, প্রাকৃতিক নির্বাচনের কানাগলি দিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মেই ক্রমাগতভাবে এগিয়ে চলতে থাকে এই প্রাণের বিকাশ। ভাবতেও অবাক লাগে যে এত ধরণের এতরকমের বৈশিষ্ট্যের মানুষ এবং মানুষের পূর্বপুরুষের প্রজাতিগুলাে একসময় পৃথিবীর বুকে হেটে বেড়িয়েছে। এখনও অনেক কিছুই আমাদের অজানা, কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাস জুড়ে যে বহু রকমের মানব প্রজাতির অস্তিত্ব ছিল এবং তাদের প্রথম উৎপত্তি ঘটেছিল আফ্রিকায় তা নিয়ে কিন্তু আজকে সন্দেহের তেমন কোন অবকাশ নেই।

কিন্তু প্রশ্ন করতে হয়, তাহলে আজকের পৃথিবীতে আমারাই কেন একমাত্র মানব প্রজাতি যারা টিকে থাকতে সক্ষম হলাম? আসলে আমাদের প্রজাতির বয়স কিন্তু খুব বেশী নয়, মাত্র ২ লক্ষ বছর আগে আমাদের প্রজাতির উৎপত্তি, বলতে গেলে আমরা বিবর্তনের পাড়ার খুব নতুন বাসিন্দা। একদিকে আমাদের বিবর্তনের ইতিহাসটা যেমন অন্যান্য জীবের মতই কিন্তু এটা মেনে নিতেই হবে যে, আমাদের টিকে থাকার ইতিহাসটা বিবিধ কারণেই একটু ভিন্ন গতিতে এগিয়েছে।

আর তাই এ বিষয়ে গভীরভাবে জানতে হলে বােধ হয় শুধু ফসিলের গঠন এবং সময়সীমাগুলাে জানলেই হবে না, আরও কিছু বাড়তি কথাও জানতে হবে। জানতে হবে আমাদের সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিবর্তন, ভাষার উৎপত্তি কিংবা আগুনের ব্যবহারের মত ঘটনাগুলাের গুরুত্ব।

 


৭.↑  Wilson, E, 2004, On Human Nature, Presidents and Fellows of Harvard College, p 169

৮.↑  Stringer, C and Andrews, P, 2005, The complete Wrold of Human Evolution, Thames and Hudson Ltd, London.

১০.↑  The Human Origins Progam Resource Guide to Paleoanthropology, Smithsonian National Museum of Natural History http://www.mnh.si.edu/anthro/humanorigins/faq/encarta/encarta.html
(মূল লিংকটি পাওয়া যায় নি, রিলেটেড তথ্য পড়তে পারেন এখানে↑ )

১৯.↑ Mayr E, 2004, What Evolution Is,Basic Books, NY, USA. pp 231-268

২০.↑  Food For Thought – 3 Million Years Ago, BBC: Science and Nature:PreHistoric Life.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top