বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৪. প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় শিল্প বিপ্লবের আগে এবং পরে পেপারড মথের (Biston betularia) বিবর্তন থেকে। বিজ্ঞানীরা গত ১৪০ বছর ধরে বিভিন্ন পরিবেশের মধ্যে পেপারড মথের এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। এই ইংলিশ মথ প্রজাতিটিকে হাল্কা এবং গাঢ় – দুটি রং এই দেখতে পাওয়া যায় এবং যেহেতু তারা একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত, তাদের মথের মধ্যে নিয়মিতভাবে প্রজননও ঘটতে দেখা যায়। শুধুমাত্র এক জোড়া জিন দিয়ে এদের গায়ের রং নিয়ন্ত্রিত হয়। এদেরকে সাধারণত লাইকেন (Lichen) নামের এক ধরনের পরজীবি ছত্রাক দিয়ে ঢাকা গাছের ডালের উপর দেখা যায়।

১৮৪৮ সালের যাদুঘরের এক সংগ্রহ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যাণ থেকে জানা যায় যে, ইংল্যান্ডের মঞ্চেস্টার শহরে সে সময়ে গাঢ় রঙের মথের সংখ্যা ছিল ১% এরও কম, আর বাকি প্রায় ৯৯% মথই ছিলাে হাল্কা রঙের [৬]। এই পােকাগুলাে পাখিদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য। হাল্কা রঙের লাইকেন দিয়ে ঘেড়া গাছের ডালগুলােতে বসে থাকা গাঢ় রং মথগুলাে খুব সহজেই পাখিদের চোখে পড়তাে এবং তাদের শিকারে পরিণত হত। অন্যদিকে হাল্কা রঙের পােকাগুলাে গাছের ডালের রঙের সাথে মিশে থাকায় তাদেরকে পাখিরা সহজে আর দেখতে পেত না, এবং তার ফলে তারা শিকারি পাখিদের হাতে ধরাও পরতাে কম।

এর ফলশ্রুতিতে দেখা গেল যে, প্রতি প্রজন্মে হাল্কা রঙের জিন ধারণকারী মথের সংখ্যা সমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে শিল্প বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডে প্রাকৃতিক পরিবেশের অনেক পরিবর্তন ঘটে, কারখানা থেকে আসা ঝুল, ময়লা দিয়ে বাতাস অনেক বেশী দুষিত হয়ে পরতে থাকে। এই পরিবেশ দূষণের কারণে গাছের ডালের উপরের লাইকেনগুলাে হয় মারা যায় অথবা তাদের উপর এক ধরনের গাঢ় রঙের প্রলেপ পরে যায়। তার ফলে দেখা গেলাে যে, এই মথগুলাের চারপাশের পরিবেশই ক্রমশঃ বদলে যাচ্ছে, এখন গাঢ় রঙের প্রলেপ পরা লাইকেন এর উপর বসে থাকা হাল্কা রঙের মথগুলাে আগের থেকে অনেক বেশী করে পাখিগুলাের চোখে পরছে।

আর তার ফলে যা হবার তাই হল – এবার হাল্কা রঙের মথের সংখ্যা ক্রমশ কমে গেলাে এবং গাঢ় রঙের মথের সংখ্যা বেড়ে যেতে শুরু করলাে। কিছুদিন পরে আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেলাে যে, পেপারড মথের জনসংখ্যার ৯৫%-ই গাঢ় রঙের মথে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এখানেই কিন্তু গল্পের শেষ নয়, এর পরপরই ইংল্যান্ডে বাতাসের দূষণ রােধের জন্য আইন পাশ করা হয় এবং দ্রুত বাতাসের দুষণও কমতে শুরু করে। আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে আবারও ঠিকই দেখা গেল যে, হাল্কা রঙের মথের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। পাখিদের দিয়ে আরােপিত প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে আমরা দেখলাম যে কি করে একটা জিন পুলের মধ্যে জিনের ফ্রিকোয়েন্সি বদলে যেতে পারে, এবং তার ফলে সেই জনপুঞ্জে কি করে বিবর্তন ঘটে।

গত একশ বছরে জেনেটিক্স এবং মাইক্রোবায়ােলজী বা অনু-জীববিদ্যা এগিয়ে গেছে অকল্পনীয় গতিতে, ক্রোমােসােম, ডিএনএ এবং মিউটেশন থেকে শুরু করে মানুষের জিনােমের পর্যন্ত হিসাব বের করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। এখন তাে জীববিজ্ঞানীরা রীতিমত দাবী করছেন যে, যদি একটা ফসিলের চিহ্নও পৃথিবীর বুকে কোনদিন না পাওয়া যেতাে তাহলেও আজকের জেনেটিক্সের জ্ঞান এবং আমাদের ডিএনএ-এর মধ্যে লেখা পুর্ববর্তী প্রজন্মগুলাের হাজার বছরের ইতিহাস থেকেই বিবর্তনের তত্ত্ব প্রমাণ করে ফেলা যেতাে। এখন খুব সংক্ষেপে দেখা যাক, জেনেটিক্স এবং গত দেরশাে বছরে বৈজ্ঞানীক আবিষ্কারের আলােকে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বটি কিভাবে পরিবর্ধিত হয়ে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত রূপ ধারণ করলাে।

ডারউইনের অবদানের পর থেকে বিজ্ঞানীরা কিন্তু বসে ছিলেন না, তারা বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং বিবর্তনের নানা প্রক্রিয়া এবং ধাপকে সনাক্ত করেছেন। আসলে সত্যি কথা বলতে কি , ডারউইনের তত্ত্বটি এতােই গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক যে বিজ্ঞানীরা বিংশ শতাব্দীর প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত এ নিয়ে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা নীরিক্ষা এবং বিতর্ক চালিয়ে যান। তবে মেন্ডেলের তত্ত্ব, ডিএনএর আবিষ্কারসহ বংশগতিবদ্যা, জনপুঞ্জ বংশগতবিদ্যা (Population Genetics), বা জিনােমিক্সসহ জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যত এগিয়ে গেছে ততই আরও বিস্তারিতভাবে বিবর্তন তত্ত্বের সঠিকতা প্রমাণিত হয়েছে।

জনসাধারণের কাছে না হলেও, গত অর্ধ-শতকেরও বেশী সময় ধরে বিজ্ঞানীমহলে বিবর্তনত্ত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কি কি প্রক্রিয়ায় বিবর্তন ঘটে, তা শুধুই কি ধীর গতিতে ঘটে নাকি মাঝে মাঝে উল্লম্ফণও ঘটে, এধরণের বিষয়গুলাে নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক হয়ে থাকলেও বিবর্তনবাদের সঠিকতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আর কোন সন্দেহ নেই।

আগেই দেখেছি, জীবন সংগ্রামে যে সব প্রকারণ (Variation) জীবকে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকতে বেশী সুবিধা করে দেয় সেই সব জিনের অধিকারী জীবই বড় হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকে এবং যারা পরিবেশের সাথে কম খাপ খাওয়াতে পারে তাদের তুলনায় তারা অনেক বেশী সন্তান রেখে যেতে সক্ষম হয়। ডারউইন বিবর্তনকে দেখেছিলেন ব্যক্তিগত প্রাণী বা উদ্ভিদ এবং প্রজাতি লেভেলে, এখন বােঝা যাচ্ছে যে, বিবর্তন ঘটছে জিন, বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য এবং জনপুঞ্জে [৭]। একটি প্রজাতির কতগুলাে জীব যখন নিজেদের মধ্যে যৌন প্রজননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে তখন তাদের জনপুঞ্জের সবার জিনের সমষ্টিকে একসঙ্গে বলে জিন সম্ভার (Gene Pool)।

একদিকে যৌন প্রজননের মাধ্যমে ছেলে মেয়ের মধ্যে বাবা মার জিনের যে জেনেটিক রিকম্বিনেশন হয় তার ফলে পরবর্তী প্রজন্মে জিনের অদলবদল ঘটে, আবার অন্য দিকে, জিনের মধ্যে আকস্মিকভাবে পরিবর্তন ঘটার ফলে কখনও কখনও তার ডিএনএর গঠন বা সংখ্যায়ও পরিবর্তন ঘটে, যাকে বলা হয় পরিব্যাক্তি (Mutation)।

মিউটেশনের মাধ্যমেই প্রকারণের সৃষ্টি হচ্ছে আর তারপর যৌন প্রজননের মাধ্যমে তা সমগ্র জিন পুলে মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে একটা জনপুঞ্জের মধ্যে শুধুমাত্র একটি বা দুটি জীবের জীনগত পরিবর্তনকেই বিবর্তন বলে ধরে নেওয়া যাবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না সমগ্র জনপুঞ্জের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বলা যাবে না যে বিবর্তন ঘটছে। তার মানে ঘটনাটা দাঁড়াচ্ছে এরকম —

বেশী উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীব বেশী দিন বেঁচে থাকে এবং বেশী বংশবৃদ্ধি করতে পারে, তার ফলে তাদের জিন অনেক বেশী পরিমানে প্রবাহিত হয় সন্তানদের মধ্যে। এর ফলে সময়ের সাথে সাথে একটি জীবের জনসংখ্যায় জিনের ফ্রিকোয়েন্সি বা মাত্রা বদলাতে থাকে – পরবর্তী প্রজন্মে কিছু জিন বেশী প্রবাহিত হয় আর কিছু জিনের সংখ্যা কমে যেতে থাকে। এইভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনপুঞ্জে জিনের পরিবর্তন ঘটতে থাকাকেই বিবর্তন বলে। জেনেটিক্সের সংজ্ঞা অনুযায়ী, বংশগত প্রকারগুলাের প্রভেদমুলক প্রজননকে (Differential Reproduction) বলে প্রাকৃতিক নির্বাচনঃ আর, প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া মাধ্যমে কোন প্রজাতির জনসংখ্যায় জিন ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তন বলে বিবর্তন[৬]

প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবের অভিযােজন (Adaptation) ক্ষমতা বাড়তে থাকে, আর তারই ফলশ্রুতিতে সে তার পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার জন্য আরও যােগ্যতর হয়ে গড়ে ওঠে। তবে এখন আমরা জানি যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়াও আরও অন্যান্য পদ্ধতির মাধ্যমেও বিবর্তন ঘটতে পারে। ডারউইন বিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার কথা বলে থাকলেও আজকের দিনের বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা অবশ্য প্রজাতির উৎপত্তির পেছনে প্রাকৃতিক নির্বাচনের পাশাপাশি বিবর্তনের জন্য অন্য বেশ কিছু ফ্যাক্টরকেও গন্য করে থাকেন, ফ্যাক্টরগুলাে হল এই হল —

  • জিন মিউটেশন
  • ক্রোমজম মিউটেশন
  • জেনেটিক রিকম্বিনেশন
  • জিনের পুনরাগমন বা জিন প্রবাহ
  • জেনেটিক ড্রিফট
  • এবং অন্তরণ বা Isolation

বিবর্তনের এই আধুনিক সংশ্লেষণী তত্ত্ব (Synthetic theory of Evolution) অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে, জনপুঞ্জে জিনের প্রকারণ রয়েছে এবং এই প্রকারণগুলাে তৈরি হচ্ছে আকস্মিক মিউটেশন এবং জেনেটিক রিকম্বিনেশন থেকে, এদের পিছনে কোন নিয়ম, উদ্দেশ্য বা অভিযােজন কাজ করছে না। কোন জনপুঞ্জে এই মিউটেশন এবং জেনেটিক রিকম্বিনেশনের হারের উপর জিনের ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তন নির্ভর করবে। কোন জনপুঞ্জে যদি মিউটেশনের হার বিরল হয় তবে জিনের ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তনে এর ভুমিকাও হবে অত্যন্ত নগন্য।

এখন কোন জনপুঞ্জে এই জিনের ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তনের মাধ্যমে বিবর্তন ঘটার পিছনে প্রধাণ কারণগুলাে হচ্ছে: জিন প্রবাহ, জেনেটিক ড্রিফট, অন্তরণ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রাকৃতিক নির্বাচন কাকে বলে তা তাে আমরা উপরে বিস্তারিতভাবে দেখেছিই, চলুন তাহলে খুব সংক্ষপে দেখে নেওয়া যাক বিজ্ঞানীরা জিন প্রবাহ, জেনেটিক ড্রিফট বা অন্তরণ বলতে কি বােঝাচ্ছেন। কোন জনপুঞ্জে বাইরে থেকে কেউ এসে বা চলে গিয়ে অর্থাৎ জিনের পুনরাগমনের মাধ্যমে নতুন জিনের প্রবাহ ঘটাতে পারে।

জিনের প্রবাহজনিত ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন নির্ভর করবে স্থানীয় বাসিন্দা এবং নতুন অতিথিদের জিনের বিভিন্ন কপি বা আলেল (Alleles, অর্থাৎ কোন জিনের বিভিন্ন রূপ, যেমন ধরুন রক্তের টিপের মধ্যে ‘এ’ ‘বি’ বা ‘ও টিপগুলােকে একই জিনের বিভিন্ন আলেল বলা হবে ) মধ্যে তারতম্যের হার এবং পুনরাগমনের হারের উপর। আবার ধরুন, অনেক সময় সময়ের সাথে সাথে আকস্মিকভাবে জনপুঞ্জে জিনের ফ্রিকোয়েন্সিতে পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে, এর পিছনে অভিযােজন বা টিকে থাকার যােগ্যতা বা প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন ভুমিকা পালন করে না আর তাকেই বলে জেনেটিক ড্রিফট বা বাংলায় বললে বলতে হয় বংশানুসৃত সম্প্রবাহ।

একটি উদাহরণ দিয়ে বােঝা যাক ব্যাপারটা। ধরুন, কোন এক হলুদ ব্যাঙের জনপুঞ্জ রয়েছে, সেখানে মাত্র দুইটি ব্যাঙের মধ্যে সবুজ গায়ের রং এর বিরল জিনের আলেল বিদ্যমান ছিলাে। কিন্তু প্রজননের আগেই তারা দুজনেই গাড়ি চাপা পরে মরে গেলাে। তখন সেই জনপুঞ্জ থেকে এই সবুজ রং এর আলেলটি কিন্তু চিরতরে হারিয়ে গেলাে, এই জনপুঞ্জে এই বৈশিষ্ট্যটি আর দেখা যাবে না, – এর পিছনে কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচনের কোন ভুমিকাই ছিলাে না। বিবর্তনের মাধ্যমে প্রজাতির তৈরির ক্ষেত্রে আবার অন্তরণও খুব গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারে। আরেকটি মজার উদাহরণ দেওয়া যাক এ প্রসঙ্গে —

ধরুন, একটি শামুকের জনপুঞ্জে হাল্কা , গাঢ় সব রঙের শামুক আছে। একবার এক ঘূর্ণিঝড়ে দুই একটি গাঢ় রঙের শামুক উড়ে গিয়ে পড়লাে আরেক দ্বীপে। এখন এখান থেকে নতুন এক প্রজন্মের শামুকের উৎপত্তি ঘটলাে যাদের মধ্যে শুধুই গাঢ় রঙের জিন বিদ্যমান। এছাড়াও এই নতুন জনপুঞ্জে শুধুমাত্র সেইসব জিনই উপস্থিত থাকবে যা তাদের ওই দুই একজন পূর্বপুরুষের মধ্যে বিদ্যমান ছিলাে, পুরনাে সেই আসল জনপুঞ্জের জিন পুলে বহু কালের বিবর্তনের ফলশ্রুতিতে যে বহু রকমের জিনের উদ্ভব ঘটেছিলাে তা কিন্তু এই জনপুঞ্জে আর থাকবে না, তার ফলে তাদের বিবর্তন ঘটতে শুরু করবে এক নতুন নিয়মে এবং গতিতে।

আসলে জনপুঞ্জের মধ্যে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা ঘটলে নতুন প্রজাতি তৈরির পথ সুগম হয়ে ওঠে। কারণ এর ফলে দুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া জনপুঞ্জের মধ্যে জিনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং নতুন এই জনপুঞ্জের জিনপুলে নতুন ধরণের মিউটেশন, জিন প্রবাহ বা জেনেটিক রিকম্বিনেশনের মাধ্যমে নতুন নতুন পরিবর্তন ঘটতে থাকে। প্রাকৃতিক নির্বাচন বা জেনেটিক ডিফটের ফলে ধীরে ধীরে এতই পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে যে, তাদের পক্ষে আর পুরনাে সেই জনপুঞ্জের সাথে প্রজনন সক্ষম হবে না। আর তখনই উৎপত্তি ঘটে নতুন প্রজাতির।

অনেকেই অনেক রকমের সংজ্ঞা দিয়েছেন প্রজাতির, কিন্তু ১৯৬৩ সালে বিজ্ঞানী আর্নেষ্ট মায়ার যে সংজ্ঞাটি দেন তাকেই জীবিবিদ্যায় এখন সবচেয়ে গ্রহণযােগ্য সংজ্ঞা বলে ধরে নেওয়া হয়। তার সংজ্ঞা মতে, ‘প্রজাতি হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক জনপুঞ্জ যার সদস্যরা নিজেদের মধ্যে অবাধভাবে জননরত অথবা জনন করার ক্ষমতা রাখে, তাদের একটি সাধারণ জিন পুল আছে তবে তারা এ ধরণের অন্যান্য দল সাথে যৌনজননের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন। অর্থাৎ, এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতি উৎপত্তির পিছনে মুল বিষয়টি হল এক জনপুঞ্জ ভেঙ্গে আরেক জনপুঞ্জের উদ্ভব অথবা এক জিন পুল ভেঙ্গে একাধিক জিন পুলের উৎপত্তি।

ডারউইন তার সময় উপরে বর্ণিত সবগুলাে প্রক্রিয়ার কথা না জানলেও বিবর্তনবাদের মুল বিষয়টিকে সঠিকভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন: প্রথমতঃ প্রজাতির উদ্ভবের কারণ বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সংগ্রাম নয় বরং একই প্রজাতির ভিতরে আন্ত-প্রজাতি সংগ্রাম, দ্বিতীয়তঃ নতুন নতুন প্রজাতির যেমন উৎপত্তি ঘটছে তেমনি অগুন্তি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে এবং তৃতীয়তঃ বিবর্তন ল্যমাৰ্কীয় ধারায় সরলরেখায় ঘটেনা বরং তা ঘটে গাছের শাখা প্রশাখার মত বিস্তৃত হয়ে [২]। প্রাকৃতিকভাবে, প্রাণের উৎপত্তির সেই আদি থেকেই জীবের বিবর্তন ঘটে চলেছে বলেই আমাদের চারপাশে প্রাণের এত বৈচিত্র।

পরিবেশ এখানে নির্বাচনী শক্তি (Selection agent) হিসেবে কাজ করে, এবং যেহেতু সময় এবং অঞ্চল বিশেষে পরিবেশ বদলে যায় তাই বিভিন্ন পরিবেশে জীবের বিভিন্ন প্রকারণ নির্বাচিত হয়। আর তাই, কোন জায়গার জীবকে, সেখানকার সব প্রজাতিকে বিচার করতে হবে তার চারপাশের পরিবেশের আপেক্ষিকতায়।

আজকে প্রাণীবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান থেকে শুরু করে জেনেটিক্স, জিনােমিক্স, অনুজীববিজ্ঞান কিংবা ওষুধ বা কিটনাশক তৈরি, এমনকি চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্ত শাখা অচল হয়ে পড়বে বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করলে। ডারউইন প্রায় দেড়শাে বছর আগে যা বলে গেলেন তার সারকথা প্রমাণ করতে আমাদের এতদিন লেগে গেলাে। আর জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যতই চাঞ্চল্যকর এবং আধুনিক আবিষ্কার দিয়ে ভরে উঠতে থাকলাে ততই নতুন করে প্রমাণ হতে থাকলাে বিবর্তনের যথার্থতা।

এই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রজাতির জীবসহ দ্বিপদী এই মানব প্রজাতিরও সেই আদি এক কোষী প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়ে এখানে এসে পৌছানাের জন্য কোন পরিকল্পনা বা ডিজাইন বা অতিপ্রাকৃত স্রষ্টার প্রয়ােজন হয়নি, কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় উদ্ভব ঘটেছে তাদের। মানুষ যতই সে নিজেকে ঘিরে শ্রেষ্ঠত্বের মায়াজাল তৈরি করুক না কেনাে, সে আর সব প্রাণীর মত এই প্রকৃতিরই একটি অংশমাত্র।


 বিবর্তনের পথ ধরে


২.↑  মজুমদার সু, ২০০৩, চার্লস ডারউইন এবং বিবর্তনবাদ, প্রকাশকঃ সােমনাথ বল, কোলকাতা, ভারত।
৬.↑  Berra, TM, 1990, Evolution and the Myth of Creationism. Stanford
.↑  Laurence M, 1993, The Modern Synthesis of Genetics and Evolution, The Talk.Origins Archive↑

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা