ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০৪. ইট-পাটকেল এবং পিঠ চুলকোচুলকির খেলা

জীবজগতে গেম থিওরি এবং বিবর্তনীয় স্থিতিশীল তত্ত্ব কীভাবে কাজ করে তা না হয় জানা গেল। কিন্তু একটি জীব কী করে বুঝবে কখন তাকে স্বার্থপর হতে হবে, আর কখন পরার্থ? কীভাবে বুঝবে কখন সত্যবাদী যুধিষ্ঠির সাজতে হবে, আর কখন হতে হবে বিশ্বাসঘাতক বিভীষণ? এর উত্তর পাওয়া গেছে দুই প্রতিভাবান বিজ্ঞানী রবার্ট এক্সেলরড (Robert Axelrod) এবং রবার্ট ট্রাইভার্স (Robert Trivers)-এর পৃথক দুটি গবেষণায়। দুজন বিজ্ঞানী আলাদা দুটি তত্ত্ব দিয়েছেন। নামে আলাদা হলেও তত্ত্বের বিষয়বস্তু মোটামুটি একই। তুমি আমার পিঠটি চুলকালে আমিও এক সময় তোমার পিঠটি চুলকে দিব। আর তুমি ইট মারলে আমিও দেব পাটকেলটি মেরে। কাজেই বাপু যা করবে বুঝে করো। এই হলো তত্ত্ব দুটির মোদ্দা কথা।

ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হবে-এই তত্ত্বের ইংরেজি ‘টিট ফর ট্যাট’ (Tit for tat)। এটি দিয়েছেন এক্সেলরড। আর রবার্ট ট্রাইভার্সের ‘পিঠ চুলকোচুলকি’ সংক্রান্ত তত্ত্বের নাম-বিনিময়ী পরার্থিতা (Reciprocal Altruism)। দুটি তত্ত্বই ইঙ্গিত করছে অতীতে আমার প্রতি তুমি কী আচরণ করেছ সেটা মনে করে আমি তোমার প্রতি আচরণ করব। ভালো আচরণ করে থাকলে আমার থেকেও ভালো আচরণ পাবে, আর ঝামেলা করে থাকলে আমার দিক থেকেও তাই পাবে। কাজ কর্মে এক হলেও তত্ত্ব দুটিতে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য থেকে গেছে।

টিট ফর ট্যাট ঘটে একই প্রজাতিতে। এক ভার্ভেট বানর ক্ষিদার সময় আরেক বানরকে কলা দিলে, সেই বানরও পরবর্তীতে কলা দিয়ে প্রথম বানরকে সাহায্য করবে। শিকারিদের দ্বারা আক্রান্ত হবার মুহূর্তে কোনো পরোপকারী বানর বন্ধু যদি চিৎকার করে সতর্ক করে দেয়, তবে পরোপকারী বানরটি কখনো বিপদে পড়লেও ঠিক একইভাবে সেই আক্রান্ত বানরটি চিৎকার করে তাকে বিপদে সাহায্য করবে। টিট ফর ট্যাট বিদ্যমান থাকে একই প্রজাতির মধ্যে। বানর কেবল চিৎকার করে সতর্ক করবে আরেকটি বানর বিপদে পড়লেই, কোনো খরগোশ বিপদে পড়লে নয়। আর তাদের সাহায্যের ধরনও একই ধরনের হবে। কলার বিনিময়ে কলা, কিংবা চীৎকারের বিনিময়ে চিৎকার। অন্য কিছু নয়।

কিন্তু অন্য দিকে রেসিপ্রোকাল অলট্রুইজম বা বিনিময়ী পরার্থিতার ক্ষেত্রে পরার্থিতা প্রজাতির স্তর অতিক্রম করে যায়। এক প্রজাতি অন্য প্রজাতিকে সহায়তা করে। আমরা আগে আমরা আগে ক্লাউন মাছ আর এনিমোন, হামিং বার্ডের সাথে অর্নিথোপথিলাস ফুলের, কিংবা এংরাকোয়িড অর্কিডের সাথে আফ্রিকান মথের সহবিবর্তনের উদাহরণের সাথে পরিচিত হয়েছি যেগুলো প্রজাতির স্তর অতিক্রম করে পরার্থিতার বিকাশ ঘটিয়েছে। সাহায্যের ধরনও ভিন্ন হতে পারে। আমি পূজা উপলক্ষ্যে প্রতিবেশীকে পায়েশ পাঠালে, প্রতিবেশীও যে পায়েশই পাঠাবে তা নয়, হয়তো ঈদের দিন পাঠাবে কোরমা এই ধরনের!

ইট-পাটকেল তথা টিট ফর ট্যাট তত্ত্বের উদ্ভবটা বেশ মজার। আশির দশকের প্রথমভাগে কম্পিউটারের শক্তি বাড়তে শুরু করেছে হু-হু করে। পার্সোনাল কম্পিউটারও বাজারে আসতে শুরু করেছে। এই সময় রবার্ট এক্সেলরড নামের এক তরুণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর শখ হলো কম্পিউটারের সাহায্যে আসামির সঙ্কটের একটা সিমুলেশন পরীক্ষা করবেন। তিনি একটি মজার প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন যেখানে প্রতিযোগীরা আসামির সংকট সমাধানের জন্য একটা ভালো এলগরিদম সাবমিট করবে। প্রায় দুশবার একে অপরের মধ্যে ক্রমান্বয়ে খেলা চলবে। এর মধ্যে যার পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি হবে সেই এলগোরিদমই বিবেচিত হবে শ্রেষ্ঠ হিসেবে।

চৌদ্দজন প্রতিযোগী সেই প্রোগ্রামিংয়ের খেলায় অংশ নেন, তারা সহজ সরল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জটিল জটিল এলগোরিদম সাবমিট করলেন। এনাতল র‍্যাপোর্ট (Anatol Rapoport) নামে এক তরুণ প্রোগ্রামারের এলগোরিদম সর্বোচ্চ পয়েন্ট পেয়ে জয়লাভ করর আর সেই প্রোগ্রামের স্ট্র্যাটিজি ছিল সবচেয়ে সরল – সেই টিট ফর ট্যাট। প্রথমে সহযোগিতা করে সে খেলা শুরু করবে, আর মনে রাখবে তার প্রতিপক্ষ ঠিক কি করেছিল তার সাথে সহযোগিতা নাকি বিরোধিতা। প্রতিপক্ষ সহযোগিতা করে থাকলে সেও সহযোগিতা করবে, আর বিরোধিতা করলে সেও করবে বিরোধিতা। এভাবেই এগুতে থাকবে। এভাবেই সে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট অর্জন করে প্রথম স্থানে পৌঁছে গেল। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই বেরিয়ে এল যে, টিট ফর ট্যাট বা ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয় এটিই আসামির সংকট মোকাবেলার জন্য সর্বোত্তম সমাধান।

কয়েক বছর পরে রবার্ট এক্সেলরড আবারো আরেকটি টুর্নামেন্টের আয়োজন করলেন টিট ফর ট্যাট আলগোরিদমকে কেউ হারাতে পারে কি না সেটা পুনর্বার পরীক্ষা করার জন্য। এবারেও শীর্ষস্থান অধিকার করে বসে রইলো সেই আদি অকৃত্রিম টিট ফর ট্যাট! তিনি ১৯৮১ সালে বিষয়টি ফোকাস করে হ্যামিলটনের সাথে মিলে সায়েন্স পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লেখেন ‘দ্য ইভোলুশন অব কোঅপারেশন’ নামে[২৯৫], এবং বছরখানেক পরে একটি বই লেখেন সেই একই শিরোনামে[২৯৬]। এভাবেই টিট ফর ট্যাট অ্যালগরিদম বিবর্তনীয় গেম থিওরির এক রাজকীয় স্থান অধিকার করে নিল

 

রক্তচোষা বাদুড়দের কথা
খাতায় কলমে আর কম্পিউটার সিমুলেশনে না হয় ইট-পাটকেল তথা টিট ফর ট্যাট এক বাস্তব সমাধান হিসেবে হাজির হলো, কিন্তু কথা হচ্ছে প্রকৃতিতে কি আসলেই ইট-পাটকেল কিংবা বিনিময়ী পরার্থিতার প্রয়োগ দেখা যায়, নাকি এগুলো কেবলই কিছু আঁতেলেকচুয়াল বিজ্ঞানীদের অলস মস্তিষ্কের প্যাচপ্যাচানি?

এর উত্তর পাওয়া গেল ১৯৮৩ সালে ভ্যাম্পায়ার বাদুড় নিয়ে জীববিজ্ঞানী গেরাল্ড উইলকিনসনের (Gerald Wilkinson) একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায়। ভদ্রলোক কোস্টারিকায় এই বাদুড়দের নিয়ে অনেকদিন ধরেই রিসার্চ করছিলেন। এই সমস্ত বাদুড়েরা খুবই অদ্ভুত। বাদুড়দের অন্য প্রজাতিদের মতো এদের ফলমূলে কোনো রুচি নেই। এদের আহার হলো কেবল তাজা রক্ত। এরা গাছের ডালে ঝুলে থাকে আর অপেক্ষা করে থাকে কোনো ঘুমন্ত স্তন্যপায়ী জীবের গা থেকে রক্তপানের জন্য। তারপর গভীর রাত্রিতে বের হয় শিকারের সন্ধানে।

নিঃসন্দেহে এভাবে খাদ্য সংগ্রহের ব্যাপারটি বাদুড়দের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর বহুসময়ই তারা পর্যাপ্ত আহার যোগাড় করতে পারে না। কারণটি বোঝা কঠিন কিছু নয়। খাবার মানে রক্ত সংগ্রহের জন্য শিকারকে জায়গা মতো পেতে তো হবে, আর যার দেহ থেকে রক্ত যোগাড় করতে যাচ্ছে, সেই বা রাজি থাকবে কেন। টের পেয়ে বাধা দিলে তো আর রক্ত খাবার উপায় নেই। জান নিয়ে পালানোটাই তখন বুদ্ধিমানের কাজ। সেজন্য দেখা যায় এই বাদুড়েরা অনেক সময়ই দুই তিন দিন পর্যন্ত অভুক্ত থেকে যায় কোনো কিছু যোগাড় না করতে পেরে। পঞ্চাশ-ষাট ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পর তাদের বাদুড়দের কী অবস্থা হয় তা বোধহয় সহজেই অনুমেয়।

সৌভাগ্যক্রমে এই দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণের একটা রাস্তা তারা নিজেরাই বাতলে নিয়েছে। তারা যখন খাবার পায় তখন তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেয়ে নেয়। রক্ত খেয়ে একেবারে পেট ফুলিয়ে বসে থাকে। কিন্তু পেট ফুলায় এমনি এমনি না। তারা গোত্রের অভুক্ত বাদুড়দের রক্ত খাইয়ে সাহায্য করে। তারা পরার্থতা প্রদর্শন করে সমগোত্রীয়দের প্রতি। তারা এই পরার্থতাপরায়ণ সামাজিক আচরণের মাধ্যমেই সফলভাবে টিকে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো বাদুড়দের সবাই যে নিঃস্বার্থ তা কিন্তু নয়।

তাদের মধ্যে অনেকে পেট ফুলিয়ে রক্ত খাওয়ার পরেও এমন ভান করে যে সে খায়নি। পরার্থপরায়ণ এই বাদুড় সমাজে কোনো বাদুড়কে যদি বিপদের সময় কাউকে রক্তপান না করাতে হয়, কিন্তু নিজে বিপদে পড়লে যদি কেউ না কেউ তাকে খেতে দেয়, তাহলে সে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। আবার অন্যদিকে এমন যদি হয় যে কোনো বাদুড় কারো বিপদের সময় অন্যকে রক্ত খাইয়ে সাহায্য করছে, কিন্তু নিজের বিপদে কেউ তাকে খাওয়াতে এগিয়ে আসছে নাতা হলে সে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

vampier-bat
চিত্র : ভ্যাম্পায়ার বাদুড় নিয়ে জীববিজ্ঞানী গেরাল্ড উইলকিনসনের গবেষণায় দেখা গেছে যে, তারা ইট-পাটকেল আর বিনিময়ী পরার্থতাপরায়ণতা প্রদর্শন করে একে অন্যকে সাহায্য করে।

এই ডাইনামিক্স এর ধরনটা আসামির সংকটের আলোকে বুঝার চেষ্টা করা যাক। নিঃসন্দেহে কোনো বাদুড়ই চাইবে না ক্ষতির বোঝা বাড়াতে, বরং বাদুড় সমাজে ‘অতি চালাক’ এমন কেউ না কেউ থাকবে যে ধোঁকাবাজি করে সবচেয়ে বেশি লাভবান থাকতে চাইবে। অর্থাৎ এ সমস্ত বাদুড়েরা রক্ত খেয়ে এসে মুখ টুখ মুছে এমনভাবে চলাফেরা করবে যে তারা রক্ত খায়নি; ফলে অন্য কাউকে তার রক্ত খাওয়াতে হবে না।

সত্যই এরকম কিছু বাদুড় দেখা যায় গোত্রে। যারা চালাকি করে প্রতারণার পথ নেয়। কিন্তু অতি চালাকের গলায় দড়ি পড়তে সময় লাগে না। তার ফোলা পেটের ধরন দেখেই অন্য অভিজ্ঞ বাদুড় সদস্যদের কেউ কেউ বুঝে ফেলে ব্যাটা ‘সাধু বেশে পাকা চোর অতিশয়’। ফলে তাকে একঘরে করে ফেলা হয়, কেউ তাকে তার বিপদের সময় রক্ত খেতে দিয়ে সাহায্য করে না।

মূলত বাদুড়েরা তাদের নিজেদের মধ্যে খেলতে থাকে ‘ইট-পাটকেল’ বা ‘টিট-ফর ট্যাট’-এর মায়াবি খেলা কেউ তাকে রক্ত খেতে দিলে সেও তার বিপদে নিজের ভাগের রক্ত খেতে দেয়। কিন্তু কেউ প্রত্যাখ্যান করলে সেও প্রত্যাখ্যান করে। এভাবেই ইট-পাটকেল এবং বিনিময়ী পরার্থিতা নীতি বাদুড় সমাজে রাজত্ব করে চলে অত্যন্ত সফলভাবে[২৯৭]

এই সমস্ত রক্তচোষা বাদুড়দের মতো আফ্রিকান ভার্ভেট বানরদের মধ্যেও কিন্তু বিনিময়ী পরার্থতা দেখতে পাওয়া যায়। সেখানেও বানর সদস্যরা টিট ফর ট্যাটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয় অপর বানরকে সাহায্য করা হবে নাকি প্রতাখ্যান করা হবে। যদি অতীতে সাহায্য পেয়ে থাকে কারো কাছ থেকে, বিপদের সময় তাকে সাহায্য করে। আর যদি উল্টোভাবে সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে বিপদের সময় তাকেও কাঁচকলা দেখিয়ে দেয়া হয়।

এই ইট-পাটকেলের পাশাপাশি স্বজাতি নির্বাচনও খুব জোড়ালোভাবে কাজ করে ভার্ভেট বানরদের মধ্যে। শুধু জোড়ালো বললে ভুল হবে, স্বজাতি নির্বাচনের সম্পর্ক অনেক সময় ছাপিয়ে যায় ইট-পাটকেল এবং বিনিময়ী পরার্থপরায়ণতাকেও। যেমন, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দুই বানরের মধ্যে যদি রক্তের সম্পর্ক থাকে তাহলে অতীতে সাহায্য পাক না পাক, তার বিপদে অন্য সদস্য সাহায্য করে। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্ক ছাড়িয়ে যায় ইট-পাটকেলের খেলাকে।

মা বানর তার শিশু বিপদে পড়লে এমনিতেই সাহায্য করে, কোনো কিছুর বিনিময়ের দাবিতে নয়। ঠিক একই ব্যাপার ঘটে ভাই বোনদের মধ্যেও। কিন্তু রক্তের সম্পর্কের বাইরে কাউকে সাহায্য সহযোগিতার প্রশ্ন আসলে সেই ইট-পাটকেলেরই শরণাপন্ন হয় সবাই। সাধে কি আর বলে—Blood is thicker than water!

ভ্যাম্পায়ার বাদুড় আর ভার্ভেট বানরের ক্ষেত্রে যা দেখা গেল সেরকম ব্যাপার তো মানুষের জন্যও খাটে, তাই না? বিপদের সময় কারো কাছ থেকে সাহায্য পেয়ে থাকলে আমরাও প্রাণপণে সেটা শোধ করে দিতে চেষ্টা করি। আর বিশ্বাসঘাতক কিংবা কৃতঘ্ন লোকজনকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি। এ ধরনের লোককে অনেকসময় সামাজিকভাবেও একঘরে করে ফেলা হয়। এটা কিন্তু ঘুরেফিরে উপরের টিট ফর ট্যাট আর রেসিপ্রোকাল অল্ট্রুইজমেরই প্রতিফলন।

আবার, ভার্ভেট বানরদের মতো মানবসমাজেও দেখা যায় এই টিট ফর ট্যাট নীতিকে বহু সময়ই অতিক্রম করে যায় স্বজাতি নির্বাচন তথা রক্তের সম্পর্ক। ছেলে মেয়ে বিপদে পড়লে ‘রক্তের টান’ই মুখ্য হয়ে উঠে ইট-পাটকেলের চেয়ে। বিপদ থেকে সন্তানকে রক্ষার চিন্তাই প্রাধান্য পায় তখন। অর্থাৎ, বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভার্ভেট বানরের মধ্যে স্বজাতি নির্বাচনের সম্পর্ক যেভাবে অনেক সময় ছাপিয়ে যায় ইট-পাটকেল এবং বিনিময়ী পরার্থপরায়ণতাকে, ঠিক সে ধরনের প্যাটার্ন কাজ করে মানবসমাজেও।

বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, ইট-পাটকেল আর বিনিময়ী পরার্থতার খেলা ভালো জমে যদি সদস্যরা খুব ‘ক্লোজড কমিউনিটি’তে বাস করে। ভার্ভেট বানরেরা আর ভ্যাম্পায়ার বাদুড়েরা দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় বাস করে একই সম্প্রদায়ের মধ্যে। তাই তাদের মধ্যে সহজাতভাবেই এক ধরনের সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠে। ব্যাপারটা মানবসমাজের জন্যও ঠিক একইভাবে প্রযোজ্য। আমরা প্রায় সময়ই অনেকের মুখেই বলতে শুনি যে, শহরের লোকেরা অনেক বাটপার, তার তুলনায় গ্রামের লোকেরা অনেক ভালো সহজ-সরল। আসলে এটার কারণ হলো, গ্রামের লোকেরা একটা ক্লোজড কমিউনিটিতে বাস করে। সেখানে সবাই সবাইকে চেনে, আর প্রায়ই হাটে-মাঠে একে অপরের সাথে দেখা হয়ে যায়।

ফলে কারো পক্ষে বাটপারি কিংবা চুরিচামারি করে খুব বেশি সুবিধা সেখানে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ঢাকা শহরের মতো জায়গায় যেখানে লক্ষ লোকের বাস, সেখানে একজন বাটপার জানে যে, আজকে বাসে একটি অপরিচিত লোকের পকেট মেরে দিলে পরের দিন তার সাথে দেখা হবার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তাই গ্রামের চেয়ে শহরে ছিনতাইকারী, পকেটমার, চোর ছ্যাচর বেশি দেখা যায়, মানুষ আক্রান্তও হয় তুলনামুলক বেশি। এটাও ক্রীড়াতত্ত্বের সিমুলেশনেরই একটি বাস্তব ফলাফল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট এক্সেলরড তার ‘সহযোগিতার বিবর্তন’ বইয়ে টিট ফর ট্যাটের একটি বাস্তব উদাহরণ হাজির করছেন। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সৈন্যরা বেলজিয়াম দখল করে নেয়। স্বভাবতই পশ্চিমা শক্তি (Western Front) আর মধ্যশক্তির (Central Powers) মধ্যে শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ আর সংঘাত। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতেও একটা সময় পরে দেখা গেল, রেলজিয়ামের একটি পরিখার দুই পাশে জার্মান সৈন্য আর পশ্চিমা শক্তির (ফ্রান্স এবং বেলজিয়াম) কিছু ট্রুপের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

আমরা আগের কিছু উদাহরণে দেখেছি যে, দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় বাস করতে থাকলে সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতার পাশাপাশি সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠে। আসামির সংকট থেকে উদ্ভূত টিট ফর ট্যাটের কারণেই এটি ঘটে। রবার্ট এক্সেলর্ডের মতে, ঠিক একই কারণে বেলজিয়ামের একটি পরিখার দুই পাশে অবস্থিত দুই বিরোধীপক্ষের সৈন্যদের মধ্যে এক ধরনের সহমর্মিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কারণ একই জায়গায় দুই দলের সৈন্যদের একই ট্রুপকে বেশ কয়েকবার একে অপরের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

প্রাথমিক সময়গুলোতে সংঘাত আর সংঘর্ষ চললেও একটা সময় পরে গেম থিওরির নিয়মেই ‘আসামির সংকটের’ মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। তারা পারতপক্ষে শত্রুদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতো না, অতর্কিতে পেছন থেকে আক্রমণ করে জয়লাভের চেষ্টা করত না, কিংবা যত কম হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নিজেদের নিয়োজিত রাখা যায়, তার সর্বাত্মক চেষ্টা করত। বিনিময়ে তারা প্রত্যাশা করত যে শত্রুপক্ষও প্রতিদানে তাদের প্রতি অনুরূপ ব্যবহার করবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছিল যে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছিল।

এমনি শত্রুপক্ষ খুব সহজ নিশানায় কাউকে পাওয়ার পরেও গুলি করেনি কিংবা ভুল দিকে গুলি ছুঁড়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। টনি এশওয়ার্থ সহ অনেক ইতিহাসবিদই ব্যতিক্রমী ব্যপারটি উল্লেখ করে বই লিখেছেন। স্বার্থের কারণে ঘোর শত্রুদের মধ্যে আপাত সমঝোতার ব্যাপার কিন্তু রণক্ষেত্রের ইতিহাসে অনেক পাওয়া যায়। এমনি একটি উদাহরণ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘটা ‘মলোটোভ-রিবেন্ট্রোপ’ চুক্তি (কমিউনাৎসি চুক্তি হিসেবে কুখ্যাত), যার ফলশ্রুতিতে হিটলারের নাৎসি জার্মানি আর স্ট্যালিনিস্ট রাশিয়ার মধ্যে একধরনের সমঝোতা স্থাপিত হয়।

এই সমঝোতার ফলশ্রুতিতে নাৎসি জার্মান সৈন্যরা পোল্যান্ডের একাংশ নিরাপদে অধিকার করে নেয়, আর অন্য অংশ স্ট্যালিনিস্ট রাশিয়া দ্বারা অধিকৃত হয়। পিসা, নারেভ, ভিস্টুলা আর সান নদীর অববাহিকার কিয়দংশ রাশিয়ার ভাগে পড়ে, আর পশ্চিমাংশ থাকে জার্মানির পদতলে। জার্মানি ফ্রান্স অধিকার করে নেয়, লিথুনিয়া এবং পশ্চিম প্রুসিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার করতে থাকে, আর অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া থাবা বসায় পূর্ব ফিনিল্যান্ড, এস্টোনিয়া আর লাটভিয়ার উপর। নিঃসন্দেহে মানবেতিহাসের প্রেক্ষাপটে স্বার্থপর সহযোগিতার (কিংবা সঠিকভাবে বললে দুই স্বার্থপর রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যকার সহযোগিতা) নির্জলা সত্য এটি।

মানুষের জন্য ‘স্বার্থপর সহযোগিতার’ ব্যাপারটি আমাদের অনেকের মধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করলেও জীবজগতে এ ধরনের সহযোগিতার উদাহরণই দৃশ্যমান। বেবুনদের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, দুই পুরুষ বেবুনের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠে নারী বেবুনের দখল নিতে গিয়ে অপর কোনো শক্তিশালী বেবুনকে বিতাড়িত করতে[২৯৮]। এই সহযোগিতার চুক্তি অনেকটা ‘মলোটোভ-রিবেন্ট্রোপ’ চুক্তির মতোই হয় সাময়িক[২৯৯]

হিটলার যেমন চুক্তি ভেঙে এক সময় সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ঠিক তেমনি বেবুন সমাজেও শক্তিশালী বেবুনটি বিতারিত হবার পরে চুক্তি ভেঙে শুরু হয় সহযোগী দুই বেবুনের মধ্যে প্রতিযোগিতা-কে সবার আগে নারী বেবুনটির দখল নিতে পারে! একই ধরনের স্ট্র্যাটিজি বিজ্ঞানীরা প্রবলভাবেই প্রত্যক্ষ করেছেন বটলনেক ডলফিনদের মধ্যেও[৩০০]

চুক্তির কথা না হয় বাদ দেই, আমরা যে সহবিবর্তন এবং মিথোজীবীতার উদাহরণগুলো জানিযেমন, শিকারি মাছদের থেকে বাঁচার জন্য ক্লাউন মাছদের সাথে এনিমোনের সহবিবর্তন, হামিং বার্ডের সাথে অর্নিথোপথিলাস ফুলের সহবিবর্তন, এংরাকোয়িড অর্কিডের সাথে আফ্রিকান মথের সহবিবর্তন সেগুলো কিন্তু সবই প্রকারন্তরে স্বার্থপর সহযোগিতারই উদাহরণ।

আসলে এ ব্যাপারগুলো প্রকৃতিতে এতোই স্পষ্ট যে অধ্যাপক রিচার্ড ডকিন্স তার ‘আনউইভিং দ্য রেইনবো’বইয়ের নবম অধ্যায়ের শিরোনামই দিয়েছেন স্বার্থপর সহযোগী (The selfish cooperator)। তিনি পুরো ব্যাপারটিকে দেখেছেন অনেকটা এভাবে[৩০১]

আমি বরাবরই মনে করেছি যে, জীবজগতের প্রকৃতি বহুলাংশেই পরার্থপরায়ণ, সহযোগিতাপ্রবণ, এমনি অনেক-সময় আবেগপ্রবণও। এগুলো কিন্তু তাদের স্বার্থপর জেনেটিক স্তর থেকেই উদ্ভূত হয়। প্রাণীরা কখনো খুব ভালো (পরার্থ), আবার কখনো খুবই খারাপ (স্বার্থপর)আচরণ করে, আর কখন কোনটা করবে তা নির্ধারিত হয় জেনেটিক স্তরে সর্বোচ্চ হিস্যা আদায়ের নিরিখে। …প্রাণিজগতে পরার্থতা আসলে একটি সুচারু মাধ্যম যার ফলশ্রুতিতে অতলস্পর্শী জিনগুলো নিজ নিজ স্বার্থ সর্বোত্তম উপায়ে চরিতার্থ করতে পারে।


 ভালোবাসা কারে কয়


২৯৫.↑   Axelrod, Robert; Hamilton, William D, “The Evolution of Cooperation”, Science 211: 1390–96, 1981

২৯৬.↑   Axelrod, Robert, The Evolution of Cooperation, Basic Books, 1984

২৯৭.↑   Gerald S. Wilkinson, Reciprocal food sharing in the vampire bat, Nature, 308, 181 – 184, 1984

২৯৮.↑   Craig Packer, Reciprocal Altruism In Olive Baboon, Nature, 265: 441-3

২৯৯.↑   R Noë, Alliance formation among male baboons: shopping for profitable partners. In: Harcourt AH, de Waal FBM, editors. Coalitions and alliances in humans and other animals. Oxford: Oxford University Press. pp. 285–321, 1992

৩০০.↑   R.C. Connor, R.A. Smolker, and A.F. Richards, Dolphin alliances and coalitions. In A.H. Harcourt and F.B.M. de Waal (Eds.), Coalitions and alliances in animals and humans (pp. 415-443). New York: Oxford University Press, 1992.

৩০১.↑   Richard dawkins, Unweaving the Rainbow: Science, Delusion and the Appetite for Wonder, Mariner Books; First Edition edition, 2000

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়