বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৪. আংশিক ফসিল বা হাড়গােড়?

৩) দু’চারটি আংশিক ফসিল বা হাড়গােড় পেয়েই বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের সপক্ষে বড় বড় সিদ্ধান্ত টানেনঃ

এই ধরণের দাবী করা শুধুমাত্র বিজ্ঞানের সাথে খুব গভীর সম্পর্ক নেই এমন মানুষের পক্ষেই সম্ভব মনে হয়। বিজ্ঞান যদি বারবার প্রত্যক্ষ কিংবা পরােক্ষভাবে পরীক্ষা না করে, প্রয়ােজনীয় সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির না করেই দু একটি হাড়গােড় দেখেই বিবর্তনবাদের মত একটি যুগান্তকারী তত্ত্বে পৌঁছে যেতে পারে তাকে কিভাবে বিজ্ঞান বলা যায় তা আমার জানা নেই। বড়ই জানতে ইচ্ছে করে যারা এই ধরণের দাবীগুলাে করেন তারা কি সৃষ্টিতত্ত্ববাদী খ্রীষ্টান মৌলবাদী ওয়েব-সাইটগুলাে ছাড়া আর কিছু পড়ে দেখেছেন, তাদের কি আদৌ সময় হয়েছে বিবর্তনবাদের উপর লেখা একটাও পাঠ্য বই পড়ে দেখার?

এই বইগুলাে পড়লে তাে চোখের সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র ফুটে ওঠার কথা ছিলাে। তারা দেখতে পেতেন কেমন করে দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন অনুকল্প পড়ে আছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না পর্যাপ্ত পরিমাণে সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক কম্যুনিটি তাকে গ্রহণযােগ্য বলেই গন্য করছেন না। যে ছবিগুলাে বিজ্ঞানের বইয়ে ছাপা হচ্ছে তার পিছনে কত ফসিল রেকর্ড রয়েছে তা কি তারা হিসেব করে দেখেছেন।

তার উপর ফসিল রেকর্ডের উপরই তাে শুধু নির্ভরশীল নয় আজকের বিবর্তনবাদ, পৃথক পৃথকভাবে আণবিক জীববিদ্যা, জেনেটিক্স, এমনকি অত্যাধুনিক জিনােমিক্স শাখার গবেষণা থেকে এর পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। চলুন একটি উদাহরণের মাধ্যমে দেখা যাক, দু’একটি হাড় গােড়ের উপর ভিত্তি করে নাকি দৃঢ় বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে এই তত্ত্ব এবং সিদ্ধান্তগুলাে।

মানুষ এবং বনমানুষ বা এপ এর মধ্যবর্তী ফসিলের কথা উল্লেখ করেছিলাম আগের অধ্যায়গুলােতে। মধ্যবর্তী ফসিলের উদাহরণ হিসেবে ৩০-৪০ লক্ষ বছর আগে আমাদের পুর্বপুরুষ Australopethicus afarensis এর চেয়ে ভালাে আর কি বা হতে পারে। তাদের মুখের আদল তখনও বনমানুষেরই মত, অথচ দুই পায়ে ভর করে দাঁড়াতে শিখে গেছে, বনমানুষের চেয়ে বড় কিন্তু আধুনিক মানুষের চেয়ে বেশ খানিকটা ছােট মস্তিষ্কের আকার! ডারউইন এসব ফসিল পাওয়া যাওয়ার অনেক আগেই ধারণা করেছিলেন।

যে আফ্রিকার বনমানুষ (গরিলা, শিম্পাঞ্জীর কোন পূর্বপুরুষ) থেকেই মানুষের উৎপত্তি হতে পারে, কিন্তু এর পিছনে তখনও কোন সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকায় তা অনুকল্পে হিসেবেই থেকে যায়। তারপর বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে ইউরােপ, এশিয়া, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ের এবং বিভিন্ন ধরণের মানুষের ফসিল পাওয়া যেতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা ক্রমান্বয়ে বুঝতে শুরু করেন যে, এতদিন আমরা যা-ই ভেবে থাকি না কেনাে মানুষের প্রজাতি আসলে একটি নয়, বহু মানব প্রজাতির পদচারণায় মুখরিত ছিলাে এই পৃথিবী এক সময়।

ফসিলবিদেরা বনমানুষ এবং আধুনিক মানুষের মাঝখানের বিভিন্ন প্রজাতির মানুষের পূর্বপুরুষের ফসিল থেকে ধারণা করতে শুরু করেন যে, প্রায় ৪০-৮০ লক্ষ বছর আগে এই বিবর্তন ঘটতে শুরু করে। একের পর এক ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছে, ডিএনএ-এর পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রাইমেটদের মধ্যে অন্যরা নয় (ওরাং ওটাং বা গরিলা নয়) শুধু শিম্পাঞ্জীর সাথেই আমাদের সম্পর্ক সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। প্রাথমিকভাবে মানুষের জিনােমের সিকোয়েন্সিং করার কাজ শেষ হয়েছে সেই ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে, সেই সাথে ২০০৫ সালে শিম্পাঞ্জীর জিনােমও পড়ে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা।

গত দুই বছরে মানুষ, শিম্পাঞ্জী, বনােবাে, গরিলা এবং ওরাং ওটাং এর জীনের তুলনামুলক গবেষণা থেকেও দেখা গেছে যে, তাদের আবিষ্কারগুলাে ফসিলবিদদের আবিষ্কৃত ফসিলগুলাের সাথে প্রায়  হুবহু মিলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালের বিজ্ঞানের জার্নালগুলো খুঁজলেই এই ধরণের হাজারাে রিসার্চ পেপার পাওয়া সম্ভব। এ তাে আর হতে পারে না যে বিজ্ঞানের এতগুলাে সুপ্রতিষ্ঠিত শাখা থেকে পাওয়া পৃথক পৃথক ফলাফল ‘ঝড়ে বক পড়া’র মত করে মিলে যাচ্ছে, আর বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা সেই ভন্ড সাধুর মত তার কৃতিত্ব নিয়ে যাচ্ছেন যুগের পর যুগ ধরে!

গত ১৭ই মে ২০০৫ সালের ‘Nature’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, বিজ্ঞানীরা জিনােম পরীক্ষা করে এখন নিশ্চিত যে মানুষের এবং শিম্পাঞ্জীর পুর্বপুরুষেরা ৬৩-৫৪ লক্ষ বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাে[১২], যা আবার এখন পর্যন্ত পাওয়া রেকর্ডগুলাের সাথে মিলে যাচ্ছে প্রায় সম্পূর্ণভাবে। এখানে আরেকটি উদাহরণ হয়তাে প্রাসঙ্গিক হবে, ফসিলবিদেরা গত শতকে নিয়ান্ডারথাল মানুষের বহু ফসিল আবিষ্কার করেছেন, তারা আমাদের আধুনিক মানুষের এতােই কাছাকাছি যে প্রথমে তাদেরকে আমাদের নিজেদের প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত বলেই গন্য করা হয়েছিল।

এ নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে তর্ক বিতর্ক যেন আর শেষ হচ্ছিল না, অবশেষে ১৯৯৭ এ একদল বিজ্ঞানী ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিতর্কের অবসান ঘটালেন। তারা ১৮৫৬ সালে পাওয়া সেই নিয়ান্ডারথালের ফসিল থেকে ডিএনএ বের করে প্রমাণ করলেন যে, ফসিলটির বয়স আসলেই প্রায় ৩০,০০০ বছর এবং এর সাথে মানুষের আনেক বৈশিষ্ট্যের মিল থাকলেও তারা আসলে আমাদের প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত নয়[১৩]। এ তাে গেলাে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ক্রস পরীক্ষণের ব্যাপারটি, এবার চলুন দেখা যাক ফসিল রেকর্ডগুলাে কি ধরণের তথ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়।

৭০ দশকের প্রথম দিকে ইথিওপিয়া ও তানজেনিয়ায় Australopethicus afarensis (আফার অঞ্চল থেকে পাওয়া দক্ষিণের বনমানুষ ) প্রজাতির আংশিক ফসিল পাওয়া যায়, এর মধ্যে ছিল হাটুর জয়েন্ট এবং পায়ের হাড়ের উপরের অংশ যেখান থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে এরা দুই পায়ের উপর ভর করে হাটতে পারতাে। কিন্তু তারপরের পাঁচ বছরে আরও একই ধরণের প্রজাতির বহু ফসিল পাওয়া যেতে শুরু করে যার মধ্যে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পান সেই বিখ্যাত লুসির প্রায় সম্পূর্ণ কঙ্কালটি। শুধু তাে তাই নয় তার সাথে আরও পাওয়া গেছে ১৩টি Australopethicus afarensis এর ফসিল। অনেকেই মনে করেন যে এরা কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে একসাথে মৃত্যুবরণ করেছিলাে।

এই সবগুলাে ফসিলেরই বয়স ২৮-৪০ লক্ষ বছরের মধ্যে[১৩]। তাঞ্জেনিয়ার একটি অঞ্চলে আরও অনেকগুলাে এই প্রজাতির ফসিল পাওয়া গেছে যাদের বয়স ৩৫-৪০ লক্ষ বছরের মধ্যে। আরও অদ্ভুত যে জিনিষটি পাওয়া গেছে তা হল এই অঞ্চলে একই সময়ে ঘটা এক অগ্নৎপাতের লাভার মধ্যে সংরক্ষিত এই প্রজাতির দুটি প্রাণীর পায়ের ছাপ। এছাড়াও ৩০-৫০ লক্ষ বছরের এই প্রজাতির আরও বেশ কিছু আংশিক ফসিল পাওয়া গেছে। আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ২০ লক্ষ বছরের বেশি সময় ধরে বিবর্তিত হতে থাকা এই বিভিন্ন মাত্রার ফসিলগুলাের বিবর্তন দেখলে পরিষ্কার হয়ে ওঠে কি করে মানুষের আদি পূর্বপুরুষেরা ক্রমশঃ বনমানুষের বৈশিষ্ট্যগুলাে থেকে ক্রমান্বয়ে আরও বেশি করে মানুষের মত বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে শুরু করেছিলাে।

মানুষের বিবর্তনের উপর লেখা যে কোন ভালাে বৈজ্ঞানিক বই খুললেই এর বিস্তারিত সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া সম্ভব। আর এরকম একটি দু’টি প্রজাতির মানুষের পূর্বপুরুষের তাে নয়, অনেকগুলাে প্রজাতির ফসিলের সন্ধান পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত, যা নিয়ে মানুষের বিবর্তন অধ্যায়ে বিস্তারিত আলােচনা করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা খুব সহজে যে কোন অনুকপকে সঠিক বলে গ্রহণ করেন না, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত যে অনুকল্প অনুকল্পই থেকে যায়, তা আর তত্ত্বে রূপ নেয় না, তার প্রমাণ স্বরূপ আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।

আফ্রিকার চাদ নামক দেশ থেকে মানুষের পুর্বপুরুষের একটি সম্পূর্ণ মাথার খুলি পাওয়া গেছে যার বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০-৭০ লক্ষ বছর। খুব সম্প্রতি কেনিয়া এবং ইথিওপিয়ায় প্রায় একই সময়ের আরও দুটি ফসিলের অংশবিশেষ পাওয়া গেছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনও এদেরকে সবচেয়ে পুরােনাে মানুষের পুর্বপুরুষের ফসিল বলে স্বীকৃতি দিতে নারাজ কারণ তাদের মতে কোন সিধান্তে পৌছানাের মত পর্যাপ্ত পরিমাণ সাক্ষ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মানুষের উৎপত্তি বিভাগের প্রধাণ Chris Stringer এবং প্রাক্তন প্রধান Peter Andrews-এর লেখা খুব সাম্প্রতিক (২০০৫ সালে প্রকাশিত) বই The Complete World of Human Evolution এ তারা খুব পরিষ্কারভাবেই বলছেন যে, এ সম্পর্কে কোন শেষ সিধান্তে আসা। এখনও সম্ভব নয়, এ ব্যাপারে জুরির রায় এখনও প্রকাশ করার সময় হয়নি[১৪]

Lucy
চিত্রঃ ১০.১: লুসির ফসিল এবং তা থেকে আঁকা সম্ভাব্য প্রতিকৃতি

এখন, যারা বলেন দু’একটা হাড়গােড় থেকে বিজ্ঞানীরা এধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছান তাদের কি উত্তর  দেওয়া উচিত আসলেই বুঝতে পারি না। আরেকটু ধৈর্য নিয়ে পড়ে দেখুন বা ‘বই পড়ুন’ ধরণের উপদেশ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কি বা করার থাকতে পারে এখানে। এই ধরণের বিস্তারিত অনুসন্ধান, বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে বিজ্ঞানীরা ছবি আঁকেন বিভিন্ন প্রজাতির, মনগড়া ছবি এঁকে দেওয়ার অবকাশ কোথায় এখানে?

উপরের Australopethicus afarensis-এর ছবিটি আঁকা হয়েছে। আগে বলা সবগুলাে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে – এর পরে কেউ যদি বলেন আমরা তাে ৩০-৪০ লক্ষ বছর আগে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম না, কিংবা এটি হচ্ছে বিজ্ঞানীদের উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা, বা দু’একটি হাড় গােড়ের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন তখন এসব লােকের অজ্ঞতার পরিমান দেখে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কি বা করা যায়?

 

৪) একবার বনমানুষ থেকে যদি মানুষের বিবর্তন হয়ে থাকে তাহলে এখন কেনাে তা আর হচ্ছে না? অর্থাৎ, একই রকম বিবর্তন কেনাে বারবার ঘটতে দেখা যায় না?

অনেক বিবর্তনই মিউটেশনের মত আকষ্মিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। আবার শুধু মিউটেশন বা জেনেটিক রিকম্বিনেশনের মত ব্যাপারগুলাে তাে ঘটলেই হবে না, তাকে আবার নির্দিষ্ট কোন সময়ের পরিবেশে সেই জীবকে টিকে থাকার জন্য বাড়তি সুবিধা যােগাতে হবে যার ফলে তা সমস্ত জিন পুল বা জনসমষ্টিতে ছড়িয়ে পড়তে পারবে। যেমন ধরুন, প্রায় ৬০-৮০ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের মধ্যে যে মিউটেশন বা পরিব্যক্তিগুলাে ঘটেছিল এবং তার ফলে সেই সময়ের পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যেভাবে বিবর্তন হয়েছিলাে তা আবার একইভাবে ঘটা এবং তার সাথে সাথে পারিপার্শ্বিকতাসহ অন্যান্য সবগুলাে ফ্যাক্টরের সংযােগ বা সমন্বয় আবার একই রকমভাবে হওয়া প্রায় অসম্ভব।

বিজ্ঞানী জে, গুলড তার Wonderful Life বই তে বলেছিলেন যে, বিবর্তনের টেপটি যদি রিওয়াইন্ড করে আবার নতুন করে চালানাে হয় তাহলে ফলাফল কখনই এক হবে না[১৫] , এর কারণ আছে। বিবর্তন অনেকাংশেই একটি ইতিহাস-আশ্রয়ী বিজ্ঞান। ইতিহাসকে খুব সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু সব সময় আগেভাগেই তার নিখুতভাবে ভবিষ্যৎবাণী করা যায় না। অনেকেই জানেন, বিজ্ঞানী ন্যাপ্লাস সেই আঠারাে শতকের শেষ দিকে আস্থার সাথে ডিটারমিনিজম বা নিশ্চয়তাবাদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন; তিনি বলেছিলেন, প্রতিটি কণার অবস্থান ও গতি সংক্রান্ত তথ্য যদি জানা যায়, তবে ভবিষ্যতের দশা সম্বন্ধে আগেভাগেই ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে। কিন্তু বৈশ্বিক জটিলতার প্রকৃতি (Nature of universal complexity) তার সে উচ্চাভিলাসী স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

ইতিহাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অনাকাংক্ষিত বিশৃংখলা আর অভূতপূর্ব জটিলতা যার ফলশ্রুতিতে প্রতি মিনিটেই জন্ম নেয় নানা ধরনের নাটকীয় অনিশ্চয়তা। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর প্রকৃতি পরিবেশ যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। তার চিহ্ন আমরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই প্রকৃতির এবং জীবের বিবর্তনের ইতিহাসে, এটি সত্য, কিন্তু এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলাে যদি অন্যভাবে ঘটতাে তাহলে জীবের বিবর্তনের ধারাও যে অন্যরকম হত তাতে কোন সন্দেহই নেই। মানুষের উৎপত্তির ব্যাপারটাই ধরা যাক। এটি সৌভাগ্যপ্রসূত হাজার খানেক ঘটনার সমন্বয় ছাড়া কখনই ঘটতে পারতাে না। ঘটনাগুলাে যদি অন্যরকম ভাবে ঘটতাে, তাহলে হয়তাে শেষ পর্যন্ত এ পৃথিবীতে কোন মানবীয় সত্ত্বার উন্মেষ ঘটতাে না। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা পর্যালােচনা করা যাক[১৬]:

(ক) আমাদের পূর্বসূরী সেই আদিম বহুকোষী জীবগুলাে যদি ৫৩ কোটি বছর আগে ক্যাম্বরিয়ান বিস্ফোরণের সময় উত্তপ্ততা আর তেজস্ক্রিয়তাসহ নানা উৎপাত সহ্য করে টিকে না থাকতাে, তবে হয়তাে পরবর্তীতে কোন মেরুদণ্ডী প্রাণীর জন্ম হত না।

(খ) সেই লােব ফিন বিশিষ্ট মাছগুলাে যারা দেহের কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর নিজস্ব ওজনকে বহন করার ক্ষমতা রাখে, সেগুলাের বিবর্তন এবং বিকাশ না ঘটলে মেরুদন্ডী প্রাণীগুলাের ডাঙ্গায় উঠে আসা সম্ভব হতাে না। আবার সেই সময়ে যদি তাপমাত্রার ওঠানামার এবং বরফ যুগ শুরু হওয়ার ফলে পানির উচ্চতা কমে না যেত তাহলে হয়তাে ডাঙ্গার প্রাণীগুলাের বিকাশ এভাবে ঘটতে পারতাে না।

(গ) সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এক বিশাল উল্কাপিন্ড পৃথিবীতে আছড়ে পরে বিশালাকার ডায়নােসরগুলাের অবলুপ্তির কারণ না ঘটাতাে, তাহলে হয়ত সেই সময়ের নগন্য স্তন্যপায়ী জীবগুলাে আর বিকশিত হওয়ার সুযােগ পেত না, বরং ডায়নােসরদের প্রবল প্রতাপের সামনে কুনাে ব্যাং হয়ে রইতাে।

(ঘ) যদি আফ্রিকার গহীন অরণ্যে বিশ থেকে চল্লিশ লক্ষ বছর আগে আমাদের পুর্বপুরুষের দেহের ভিতরে পরিবর্তন না ঘটতাে এবং সেই পরিবর্তনগুলােকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা তখনকার সেই পরিবেশগত সুবিধাগুলাে না পেত, তাহলে হয়তাে তারা দু’পায়ের উপর ভর করে দাঁড়াবার আর চলবার মত সুগঠিত হতে পারত না, আজকে মানুষের বিবর্তনও ঘটতাে না, আমরাও আজকে আর এখানে থাকতাম না। কাজেই দেখা যাচ্ছে পুরাে মানব বিবর্তনটিই দাড়িয়ে আছে অনেকগুলাে আকস্মিক ঘটনার সমন্বয়ে। বিবর্তনের পুরাে প্রক্রিয়াটা আবার প্রথম থেকে চালানাে গেলেও সে দৈবাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলাে একের পর এক ঘটবেই, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা।

আবার কখনও কখনও একই রকমের বিবর্তন যে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন জীবে ঘটে না তাও কিন্তু নয়। এর ফলে দুইটি জীবের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত মিল দেখা গেলেও তাদের বিবর্তন কিন্তু ঘটেছে সম্পূর্ণভাবে দু’টো আলাদা প্রক্রিয়ায়। প্রকৃতিতে এরকম সমান্তরাল বিবর্তনের উদাহরণ রয়েছে অনেক। যেমন ধরুন, মানুষ এবং মলাষ্কের চোখের মধ্যে অনেক মিল থাকলেও (ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন অধ্যায় দেখুন) তারা যেহেতু সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়েছে তাদের মধ্যে গঠনগত পার্থক্যও রয়েছে অনেক।


 বিবর্তনের পথ ধরে


১২.↑  Human and chimp Genomes Reveal New Twist on Origin of Species, 2006, Broad Institute of MIT and Harvard, Originally published in Nature Online

১৩.↑  Stringer, C. and Andrews, P , 2005, The Complete World of Human Evolution, Thames and hudson Ltd, London, pp 178-180.

১৪.↑  Stringer, C. and Andrews, P , 2005, The Complete World of Human Evolution, Thames and hudson Ltd, London, pp 117-118.

১৫.↑  Interview with Futuyma D, 2004, Evolution in action Natural Selection: How Evolution Works, An ActionBioscience.org original interview

১৬.↑ Gould, SJ, 1994, The evolution of life on earth, Scientific American, October issue.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা