বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৩. সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তন

ভিক্টোরিয়ান যুগের শেষ নাগাদ ব্রিটেনসহ সারা ইউরােপের শিক্ষিত মহলেই ডারউইনীয় বিবর্তনবাদ গ্রহনযােগ্য হয়ে ওঠে, বিজ্ঞানীদের মধ্যে তাে বটেই, এমনকি চার্চের পাদ্রীদের মধ্যেও[১৬]। কিন্তু ইউরােপের অবস্থা যতখানি না ভাল হতে থাকল, আমেরিকার অবস্থা হতে লাগলাে পাল্লা দিয়ে ততটাই খারাপ। তার কারণ, সেখানে বিবর্তনের ব্যাপারটি শিক্ষাঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তা কোনরকম সচেতনতা জাগাতে ব্যর্থ হয়। আর মানুষকে অসচেতন রাখতে পুরােমাত্রায় ইন্ধন যুগিয়ে চলে সেখানকার খ্রীষ্টিয় চার্চ এবং আমেরিকার রক্ষণশীল সরকারগুলাে। ফলে দেখা গেল, জামানা পাল্টে গেলেও বেশিরভাগ আমেরিকানই বাইবেল বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বকেই ‘শিরােধার্য’ করে বসে আছেন* দ্য ক্রিয়েশনিস্টস

সারা দুনিয়া জুড়ে শিক্ষাঙ্গনে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে তার ছোঁয়া যেন আমেরিকানরা লাগাতেই চাইলেন না গায়ে। ধীরে ধীরে আমেরিকার প্রেস এবং মিডিয়ারও চোখেও বিবর্তন বনাম সৃষ্টিতত্ত্বের অলিখিত দ্বন্দ্বের ব্যাপারটা নজরে পড়ল এবং তাদের দৌলতেই ১৮৯০ সালের পর থেকে এই বিতর্ককে ‘জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হল। এখনও আমেরিকায় জনগণের মধ্যে বিবর্তন এবং সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে বিতর্কের কোন শেষ নেই। অনেকেই হয়ত জানেন না যে, আমেরিকা পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান ধর্মপ্রাণ দেশ (ভারতের পরই)। অথচ ইউরােপে কিন্তু পরিস্থিতি একদমই অন্যরকম, সেখানে ইউরােপের বেশীরভাগ মানুষই আজকে বিবর্তনবাদকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

একটি জিনিস এখানে পরিস্কার করা দরকার। আমেরিকার সাধারণ মানুষ বা রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যাই বিশ্বাস করুক না কেন আজকের দিনে জীববিজ্ঞানীদের সকলেই কিন্তু বিবর্তনবাদী। বিবর্তনবাদের সীকৃতি ছাড়া আজকে জীববিজ্ঞানের সব শাখাই অচল। কোন বৈজ্ঞানিক  জার্নালেই বিবর্তনের মুল বিষয়টির সমালােচনা বা বিরােধিতা করা হয় না; সেখানে হয়তাে বিবর্তনটা কিভাবে ঘটছে তার পদ্ধতি নিয়ে (যেমন ধীর গতিতে ঘটছে নাকি উল্লম্ফন ঘটছে) মতানৈক্য হতে পারে, বিতর্ক হতে পারে বিবর্তনের পদ্ধতি কি ফাইলেটিক (phyletic), স্যালটেশন (saltation) নাকি কোয়ান্টাম (quantum) এ নিয়ে; কিন্তু বিবর্তন যে ঘটছেই সে ব্যাপারে জীববিজ্ঞানী এবং প্রাণরসায়নবিদদের মধ্যে এখন কোনাে সংশয়ই নেই।

প্রায় অর্ধ শতকেরও বেশী হতে চললাে শিক্ষায়তনে (academia) বিবর্তন নিয়ে কোন বিতর্ক নেই, যা বিতর্ক সবই ওই রাজনৈতিক মহলে, আইন-আদালতে, মিডিয়া, স্কুল বাের্ডে কিংবা ইন্টারনেটের বিভিন্ন ফোরাম এবং ওয়েব সাইটে। বােঝা কষ্টকর নয় ‘সীতার অগ্নিপরীক্ষার’ মত ডারউইনীয় বিবর্তন তত্ত্বকে কেন বার বার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কেন টেনে হিচড়ে এমনকি আদালতের কাঠগড়াতেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বারবার; কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডারউইনবাদ অত্যন্ত সাফল্যের সাথেই বিপদকে সামাল দিতে পেরেছে। ইতিহাসের যে আইনী লড়াইগুলাে বিগত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত আমেরিকার জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়েছে সেগুলাে হল : টেনিসির

স্কোপস ‘মাঙ্গি’ ট্রায়াল (Scopes Trial, 1925), আরকানসাসের ভারসাম্যমূলক বিচারের ধারা (Arkansas Balanced Treatment Act, 1981), লুইজিয়ানার সৃষ্টিবাদী ধারা (The Louisiana Creationism Act, 1987)[২৩]। এর মধ্যে স্কোপস ট্রায়ালের রায় বিবর্তনবাদীদের বিপক্ষে গেলেও এতে তাদের ‘নৈতিক বিজয়’ অর্জিত হয়, আর বাকিগুলাের ক্ষেত্রে সৃষ্টিতাত্ত্বিকদের শােচনীয় পরাজয় ঘটে। লুজিয়ানার আইনী লড়াই তাে একেবারে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। শেষপর্যন্ত আরকানসাস এবং লুজিয়ানা -দু জায়গার আদালতই তথাকথিত ‘সৃষ্টিবিজ্ঞান’ (Creation science)-কে ‘বিজ্ঞানের ছদ্মবেশধারী এক ধর্মীয় মতবাদ (Religious dogma) হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘অসাংবিধানিক হিসেবে বাতিল করে দেয়।

স্কোপস ট্রায়ালের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ১৯২৫ সালে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক জন স্কোপসকে টেনেসীর ডেটন থেকে গ্রেফতার করা হয় স্কুলের ছাত্রদের ‘বিবর্তন পড়ানাের অজুহাতে’। আজকের দিনের পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা শুনতে খুব অদ্ভুত শােনাবে, কিন্তু সেসময় সেটাই ছিল রূঢ় বাস্তবতা। মুলতঃ ১৮৯৫ সালে নাইজেরিয়ায় বাইবেল বিশ্বাসীদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাকে ‘নাইজেরিয়া বাইবেল কনফারেন্স’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকেই আমেরিকার ‘মৌলবাদীরা’ (fundamentalists) বিভিন্ন প্রদেশে ‘বিবর্তন-বিরােধী আইন’ বলবৎ করার জন্য সরকারের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে। সৃষ্টিবাদীদের দৌরাত্ম সে সময় এতােই বেশি ছিল যে টেনিসি, মিসিসিপি এবং আরকানসাসের মত প্রদেশগুলোতে স্কুল কলেজে বিবর্তন পড়ানােই ছিল অপরাধ।

ওকলাহামার পাঠ্যপুস্তক থেকে বিবর্তন উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর ফ্লোরিডায় ডারউইনবাদকে ‘ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে চিহ্নিত করে হেয় করা হয়েছিল[২৪]। এমন এক পরিস্থিতিতে ছাত্রদের মধ্যে। বিজ্ঞানমনস্কতা সৃষ্টি করবার লক্ষ্যে জন টি স্কোপস নামের টেনিসির এক হাইস্কুল শিক্ষক ছাত্রদের বিবর্তন পড়িয়ে সেখানকার বিবর্তন-বিরােধী আইনের বলি হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। যথারীতি স্কোপসকে গ্রেফতার | করা হল এবং আদালতের হাতে সােপর্দ করা হল। স্কোপসের পক্ষে লড়েছিলেন বিখ্যাত আইনবিদ ক্লেরেন্স ড্যারাে (Clarence Darrow)।

আর উল্টো পক্ষে ছিলেন তিন তিনবার (ব্যর্থ) প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এবং তার্কিক উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান (Willium Jennings Bryan)। দুর্ভাগ্যক্রমে আদালত বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের সাক্ষ্য গ্রহণে অপারগতা দেখায়, যা চার্লস ড্যারােকে হতাশ করে দেয়। তারপরও চার্লস ড্যারাের জেরায় জর্জরিত হয়ে ব্রায়ান জেনিংস একটা সময় স্বীকার করতে বাধ্য হন যে পৃথিবীর বয়স বাইবেল বর্ণিত ৬০০০ বছরের ঢের বেশি[২৩]। পুরাে কোর্ট পরিণত হয় যেন এক জলজ্যান্ত সার্কাসে।

যা হােক, শেষ পর্যন্ত স্কোপসকে বিবর্তন পড়িয়ে টেনেসির আইন ভাঙার অপরাধে (যা তিনি সত্যই করেছিলেন) একশ ডলার জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে অবশ্য স্কোপস আপিল করায় সে দন্ডও মওকুফ হয়ে যায়। কিন্তু এখানে পুরাে ব্যাপারটিতে আসলে বিবর্তনবাদীদের নৈতিক বিজয় ঘটে। টেনিসির আদালত সারা আমেরিকাতেই এক ঠাট্টা তামাসার পাত্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে এইচ এল মেনকেন (H.L. Mencken) নামের এক পত্রিকার রিপাের্টার তার ক্ষুরধার লেখনীতে মৌলবাদী সৃষ্টিতাত্ত্বিকদের একেবারে তুলােধুনাে করে ছাড়েন।

দীর্ঘদিন ধরে মামলা মােকদ্দমার চাপ আর দেশ জুড়ে ঠাট্টা তামাসা। সহ্য করতে না পেরে রায় প্রদানের দিন কয়েকের মধ্যেই ব্রায়ান জেনিংসের অকাল মৃত্যু ঘটে। ১৯৬০ সালে স্কোপস ট্রায়ালকে ভিত্তি করে স্ট্যানলি ক্রামারের (Stanley Kramer) নির্দেশনায় একটি বিখ্যাত চলচিত্র নির্মিত হয় – ‘Inherit the wind↑’। সেটিতে ড্যারাের ভূমিকায় অভিনয় করেন বিখ্যাত অভিনেতা স্পেনসার ট্রেসি (Spencer Tracy),  ব্রায়ান জেনিংসের ভূমিকায় ছিলেন ফ্রেডরিক মার্চ (Fredric March), আর মেনকেনের ভুমিকায় ছিলেন জীন কেলি (Gene Kelley)। ছবিটি সে সময় দর্শকদের মধ্যে দারুন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং এখন পর্যন্ত তা ইতিহাসের অন্যতম ‘ক্লাসিক’ ছবি হিসেবে বিবেচিত।

সৃষ্টিবাদীরা স্কোপস ট্রায়ালের পর থেকে নতুন উদ্যমে এবং নতুন ধারায় নিজেদের মতবাদ প্রচারে তৎপর হয়ে ওঠে। বাইবেলে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বের কোন কিছুই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাথে মিলছে না দেখে, ১৯৬১ সালে জন হুইটকম্ব (John Whitcomb) এবং হেনরী মরিস (Henry Moris) The Genesis Flood’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। লেখকেরা দাবী করেন যে সাদা চোখে যতই বেমানান লাগুক না কেন, বাইবেলের সৃষ্টি তত্ত্ব আসলে বিজ্ঞানের সাথে সংগতিপূর্ণ।

বৈজ্ঞানিক মহলে বইটি কোন গ্রহনযােগ্যতা না পেলেও ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা এই বইটির মধ্যে ডারউইনীয় বিবর্তনবাদকে ঠেকানাের অভিনব কিছু পন্থা খুঁজে পায়। ১৯৬৩ সালে হেনরী মরিস Creation Research Society (CRS) এবং সত্তর দশকের দিকে Institute of Creation Research (ICR) প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল স্কুল কলেজগুলােতে এ নতুন সৃষ্টিতত্ত্বকে ‘বৈজ্ঞানিকভাবে’ পড়ানাের জন্য চাপ সৃষ্টি করা। মরিস এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা পরিস্কার করেই বলেন [২৪]:

আমরা যে চেষ্টাকে মহিমান্বিত করি তা হল প্রথমে এটি বােঝা যে ঈশ্বরের বাণী হচ্ছে। ঈশ্বরের বাণী; এবং ঈশ্বরের অভিপ্রায় ঈশ্বর পরিস্কার করেই বলতে সক্ষম, এবং যা বলেন তা সঠিকভাবেই নির্দেশ করেন। বাইবেলে ঠিক তাই রয়েছে, যা আমাদের মূলমন্ত্র। এটা আমরা মেনে নেই, আর তারপর বৈজ্ঞানিক উপাত্তগুলােকে সেই (বাইবেলীয়) কাঠামাের ভিতরে ফেলে ব্যাখ্যা করি।

ICR এর ওয়েব সাইটেও লেখা আছে[২৫]:

‘The Bible is the written word of God … To the student of nature this means that the account of origins in Genesis is a factual presentation of simple historical truth.’

এ ধরনের ‘রিসার্চ’ কতটা ‘বৈজ্ঞানিক’ তা নিয়ে সব সময়ই সংশয় তাে থেকেছেই, তা হাসিরও খােরাক হয়েছে পুরােমাত্রায়। গবেষণা করার সময় বিজ্ঞানীরা খােলা মনে “রিসার্চ করবেন’ এটাই ধরে নেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নেন নিরপেক্ষভাবে করা পরীক্ষণের ফলাফলের ভিত্তিতে। কিন্তু বাইবেল বিশ্বাসী ‘বিজ্ঞানীরা’ তা করেন না। তারা বাইবেল যে ‘অভ্রান্ত’ সে সিদ্ধান্তেই সব সময় অটল থাকেন। আর আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্যের আলােকে বাইবেলকে পুনর্ব্যাখ্যা করেন।

যখন পুনর্ব্যাখ্যা করতে পারেন না, কিংবা ধর্মগ্রন্থের সাথে তাদের সৃষ্টির গল্পগুলাের এতটাই পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, তখন তারা খােদ বিজ্ঞানের সাক্ষ্য-প্রমাণগুলােকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকেন। নীচের কার্টুনটি দেখলেই বােঝা যাবে সৃষ্টিবাদীদের বিজ্ঞান ‘Creation Sceince’ কিভাবে কাজ করে। বলা বাহুল্য, কোন বৈজ্ঞানিক জার্নালে কখনই এই ‘সৃষ্টি-বিজ্ঞানীদের কোন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়নি। ডঃ ইউজিন স্কট (Eugenie Scott) এবং ডঃ হেনরী কোল (Henry Cole) একবার একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছিলেন যে, এই সৃষ্টিবিজ্ঞানীরা আটষট্টিটি জার্নালে তাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল পাঠাতে পারতেন, কিন্তু নিজেরাই বুঝেছিলেন যে সেগুলাে এতই নিম্নমানের যে পাঠানাের উপযুক্ত নয়, কিংবা যদিও বা কিছু পাঠিয়েছিলেন, সঙ্গত কারণেই সেগুলাে প্রত্যাখ্যাতও হয়েছিলাে[২৬]

 সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তন
চিত্র ১০.৩; কার্টুন : প্রকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বনাম সৃষ্টি বিজ্ঞানের পদ্ধতি

মরিসের পাশাপাশি সৃষ্টিতত্ত্বের আরেক মহারথি ছিলেন দুয়েন গিশ (Duane Gish)। বায়ােকেমিস্ট্রিতে ডক্টরেট করা এ ভদ্রলােক, অত্যন্ত দক্ষ তার্কিক। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে এ ভদ্রলােক সারা আমেরিকার উপকূল জুড়ে ভ্রমণ করতেন আর বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীদের সাথে মুখােমুখি বিতর্কে লিপ্ত হতেন। জীববিজ্ঞানীদের অধিকাংশই যেহেতু ল্যাব-রিসার্চ নিয়েই পড়ে থাকতেন, তাদের অনেকেই বাকপটু ছিলেন না, অনেকে প্রকাশ্য বিতর্কে অভ্যস্ত ছিলেন না। গিশ বেছে বেছে এ ধরনের জীববিজ্ঞানীদের নিজের সহজ শিকারে পরিণত করতেন।

আর সাধারণ মানুষদের যেহেতু বিবর্তনের জটিল টেকনিকাল বিষয়গুলাে নিয়ে কোন সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না, সুযােগটি পুরােমাত্রায় ব্যবহার করতেন গিশ। প্রকাশ্য সভায় বিভিন্ন চটকদার বক্তব্য আউড়ে তিনি প্রতিপক্ষ জীববিজ্ঞানীদের ধরাশায়ী করার ভঙ্গী করে দর্শকদের বাহবা কুড়াতেন। আর দর্শক সারির একটা বড় অংশই ছিল আবার চার্চগামী খ্রীষ্টান। তারা। গিশের প্রতিটি বিতর্ক সভায় দলবল নিয়ে যােগদান করতেন আর গিশের প্রতিটি কথার পরই হাত তালির বন্যা বইয়ে দিতেন। ফলে প্রথম থেকেই তারা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতেন যে, বিতর্ক শুরুর | আগেই মনে হত গিশ বুঝি জয়ী হয়ে গিয়েছেন।

নিঃসন্দেহে এ সমস্ত চমকবাজীর প্রভাব আমেরিকায় পড়েছিল। অচিরেই রক্ষণশীলদের চাপে আর্কানসাস এবং লুজিয়ানায় বিবর্তনের পাশাপাশি সৃষ্টিতত্ত্বকেও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ভারসাম্যমুলক আইন প্রবর্তন করা হল। এই আইনকে অসাংবিধানিক হিসেবে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করলেন আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (ACLU)। ফলে বিবর্তন-সৃষ্টিতত্ত্বের দ্বন্দ্ব আবারও আদালতের কাঠগড়ায় উঠে এল। এবার আর্কানসাসের আদালত পরিণত হল সৃষ্টি বিজ্ঞানীদের তামাসায়।

সেখানে একেক ‘সৃষ্টি বিজ্ঞানী’ একেকভাবে নিজেদের বিশ্বাস উপস্থাপন করতে থাকেন, যুক্তি এবং বুদ্ধির লেশ ছাড়াই। যেমন, ডালাসের ধর্মতাত্ত্বিক নর্মান গেইসলার (Norman Geisler) ঘােষনা করলেন – “ঈশ্বরে অবিশ্বাস করেও ঈশ্বর যে আছে তাতে নিজের বিশ্বাস আনা সম্ভব’। তিনি আরাে বললেন, আকাশে দেখা ইউএফও বা উড়ন্ত চাকীগুলাে নাকি শয়তানের চর! আরেক মৌলবাদী সৃষ্টি তাত্ত্বিক ও কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হেনরী ভস (Henry Voss)-কে তাে ফিরিয়েই নেওয়া হল কারণ তিনি বিচার শুরুর ঠিক আগে শয়তানের আরাধনা করতে শুরু করেছিলেন।

সৃষ্টি-বিজ্ঞানীদের অনেকেই আদালতে স্বীকার করলেন যে তারা গবেষণার নামে যা করছেন তা আসলে বিজ্ঞান নয়। লােমা লিন্ডা বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যারল্ড কফিন (Harold Coffin) বললেন, ‘না, সৃষ্টি-বিজ্ঞান বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষণযােগ্য নয়’। লােমা লিন্ডার আরেক ‘বিজ্ঞানী এরিয়েল রথ’ (Ariel Roth)কে যখন জিজ্ঞাসা করা হল সৃষ্টিবিজ্ঞান আসলেই বিজ্ঞান কিনা তিনি বললেন – ‘যদি আপনি বিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করেন পরীক্ষণযােগ্যতা আর পূর্বাভাসযােগ্যতার নিরিখে, তবে আমার উত্তর, না!’। হ্যারল্ড কফিন (Harold Coffin) ক্যাম্বরিয়ান বিস্ফোরন, মধ্যবর্তী ফসিলের অভাব ইত্যাদি নানা অভিযােগে বিবর্তনকে অভিযুক্ত করলেন। কিন্তু কোঁসুলীর জেরার সামনে আসল গােমড় ফাঁস হয়ে গেল।

জেরার নমুনা :

প্রঃ ১৯৫৫ সালে আপনার পি এইচ ডি-র পর তাে কেবলমাত্র দুটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আছে। স্ট্যান্ডার্ড সায়েন্টিফিক জার্নালে, না?

উঃ হ্যা, ঠিক।

প্রঃ বলা হয় যে ক্যানাডার বার্জেস শেল (Burgess shale) তাে ৫০০ মিলিয়ন বছরের বেশী পুরােন, কিন্তু আপনার তাে ধারণা এটির বয়স মাত্র ৫০০০ বছর, তাই না?

উঃ হ্যা।

প্রঃ বাইবেল না থাকলে তাে পৃথিবী যে মিলিয়ন বছরের পুরােন তা মানতে আপনার কোন অসুবিধা ছিল না, তাই না?

উঃ হ্যা, যদি বাইবেল না থাকত।

দেখা গেল যে পাঁচজন বিজ্ঞানীকে সৃষ্টি-বিজ্ঞান সমর্থন করার জন্য আদালতে আনা হয়েছে তারা সবাই Creation Research Society (CRS)-এর সদস্য। তারা সকলেই একটি শপথনামায় সাক্ষর করেছিলেন এই মর্মে যে তারা বাইবেলের বাণীকে আক্ষরিক (literal interpretation) অর্থেই গ্রহণ করেন। CRS এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্গারেট হেলডার (Margatet Helder) আদালতে স্বীকার করলেন যে বিশেষ সৃষ্টিবাদের (special creation) পক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য প্রমাণ নেই।

ফেডারেল জজ উইলিয়াম ওভার্টনের সামনে আরকানসাসের ভারসাম্যমূলক বিচারের ধারাকে ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে ঘােষণা করা ছাড়া আর কোন পথ খােলা থাকলাে না। তিনি ১৯৮২ সালের ৫ই জানুয়ারী বিচারের রায়ে ঘােষণা করলেন এই তথাকথিত ‘সৃষ্টি বিজ্ঞান’ আসলে সৃষ্টির বাইবেলীয় ভাষ্যকে সরকারী স্কুলের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করার সুচতুর প্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয়। এ ধরনের প্রচেষ্টা আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশােধনীকে লংঘন করে।

একইভাবে ১৯৮৫ সালে লুইজিয়ানাতেও ফেডারেল জজ অ্যাড্রিয়ান ডুপ্লান্টিয়ার (Adrian Duplantier) ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে তথাকথিত সৃষ্টিবিজ্ঞানকে বাতিল করে দেন। পরবর্তীতে আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৭ সালের রায়ে সৃষ্টিতত্ত্বকে বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে ‘ধর্মীয় প্রােপাগান্ডা ছড়ানাের অভিযােগে অভিযুক্ত করে স্কুল কলেজে এর অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়[২৪]


 বিবর্তনের পথ ধরে


১৬.↑  স্টেংগর ভি, ডারউইনিজমের আতংক, (অনুবাদ :বন্যা আহমেদ), জুন ২, ২০০৫, একুশ শতক বিভাগ, দৈনিক ভােরের কাগজ

২৩.↑  Berra TM, 1988, Evolution and Myth of Creationism, Stanford University Press, USA

২৪.↑  Stenger V, 2003, Has Science Found God? The Latest Results in the Search for the Purpose in the Universe, Prometheus Books, USA

২৫.↑  Creation Research Society [online]

২৬.↑  Scott EC and Cole HP, 1985, The Elusive Basis of Creation ‘Science’, Quarterly Review of Biology, vol. 60, no. 1.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা