মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ

০৩. সম্ভাবনার জগৎ ও প্রাকৃতিক নির্বাচন

অনেকেই মনে করেন, আমাদের এই পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি স্রেফ একটা দুর্ঘটনা বা চান্স।। ঘটনাচক্রে দৈবাৎ (By Chance) প্রাণের উল্লম্ফন ঘটেছে। এ যেন অনেকটা হঠাৎ লটারী জিতে কোটিপতি হওয়ার মতই একটা ব্যাপার। বিজ্ঞানী মুলার এ ধরনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করতেন। কম সম্ভাবনার ঘটনা যে ঘটে না তা নয়। অহরহই তাে ঘটছে। ভূমিকম্পে বাড়ী-ঘর ধসে পড়ার পরও অনেক সময়ই দেখা গেছে প্রায় অলৌকিকভাবেই ভগ্নস্তূপের নীচে কেউ বেঁচে আছেন।

নিউইয়র্ক টাইমস-এ একবার এক মহিলাকে নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল যিনি দু দুবার নিউজার্সি লটারির টিকেট জিতেছিলেন। তারা সম্ভাবনা হিসেব করে দেখেছিলেন ১৭ ট্রিলিয়নে ১। এত কম সম্ভাবনার ব্যাপারও ঘটছে। কাজেই প্রাণের আবির্ভাব যত কম সম্ভাবনার ঘটনাই হােক না কেন, ঘটতে পারেই।

কিন্তু জীববিজ্ঞানীদের কাছে স্রেফ সম্ভাবনার মারপ্যাঁচ থেকেও ভাল উত্তর আছে, প্রাণের আবির্ভাবের পেছনে। সেটি কী, তা বলবার আগে আমাদের প্রাণের উন্মেষের সম্ভাবনাটি হিসেব করা যাক। ধরা যাক, আমাদের গ্যালাক্সিতে ১০১১ টি তারা আর ১০৬০ টি ইলেকট্রন আছে। দৈবাৎ এ ইলেকট্রনগুলাে একত্রিত হয়ে আমাদের গ্যালাক্সি, কোটি কোটি তারা, আমাদের পৃথিবী এবং শেষ পর্যন্ত এই একটি মাত্র গ্রহে উপযুক্ত পরিবেশে প্রথম কোষটি গঠনের সম্ভাবনা কত?

আমাদের গ্যালাক্সি এবং পৃথিবীর যে বয়স, তা কি ওই সম্ভাবনা সফল করার জন্য যথেষ্ট? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। কারণ এই সম্ভাবনা মাপতে গেলে যে হাজারটা চলক নিয়ে কাজ করতে হয়, তার অনেকগুলাে সম্বন্ধে আমরা এখনও অনেক কিছু ঠিকমত জানি না। তবে কৃত্রিম একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটিকে সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। কেয়রেন্স-স্মিথ (Cairns-Smith, 1970) এমনি একটি কৃত্রিম উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ধরা যাক একটা বানরকে জঙ্গল থেকে ধরে নিয়ে এসে টাইপরাইটারের সামনে বসিয়ে দেয়া হল।

তারপর তার সামনে ডারউইনের ‘প্রজাতির উৎপত্তি’ নামক বইটি খুলে এর প্রথম বাক্যটি টাইপ। করতে দেয়া হল। বাক্যটি এরকম:

When on board HMS Beagle, as a naturalist, I was much struck with certain facts in the distribution of the inhabitants of South America, and in the geological relations of the present to the past inhabitants of that continent.

এই লাইনটিতে ১৮২টি অক্ষর আছে। বানরটিকে বলা হল এই লাইনটিকে সঠিকভাবে কাগজে ফুটিয়ে তুলতে। এখন বানর যেহেতু অক্ষর চিনে না, সেহেতু সে টাইপ রাইটারের চাবি অন্ধভাবে টিপে যাবে। টিপতে টিপতে দৈবাৎ একটি শব্দ সঠিক ভাবে টাইপ হতেও পারে। কিন্তু একটা শব্দ টাইপ হলে চলবে না, পুরাে বাক্যটি সঠিকভাবে যেমনিভাবে লেখা আছে – ঠিক তেমনিভাবে টাইপ হতে হবে। মানে শুধু সবগুলাে শব্দ সঠিকভাবে টাইপ নয়, এর ধারাবাহিকতাও রাখতে হবে। এখন এই বানরটির এই বাক্যটি সঠিকভাবে টাইপ করার সম্ভাবনা কত? কত বছরের মধ্যে অন্ততঃ একবার হলেও বানরটি সঠিকভাবে বাক্যটি টাইপ করতে পারবে? সম্ভাবনার নিরিখে একটু বিচার-বিশ্লেষণ করা যাক।

মনে করা যাক যে, টাইপরাইটারটিতে ৩০টি অক্ষর আছে এবং বানরটি প্রতি মিনিটে ৬০টি অক্ষর টাইপ করতে পারে। শব্দের মধ্যে ফাঁক-ফোকর গুলাে আর বড় হাত-ছােট হাতের অক্ষরের পার্থক্য এই গণনায় না আনলেও, দেখা গেছে পুরাে বাক্যটি সঠিকভাবে টাইপ করতে সময় লাগবে ১০৮০ বছর, মানে প্রায় অনন্তকাল। কিন্তু যদি এমন হয় যে, একটি সঠিক শব্দ লেখা হবার সাথে সাথে সেটিকে আলাদা করে রাখা হয়, আর বাকী অক্ষরগুলাে থেকে আবার নির্বাচন করা হয় বানরের সেই অন্ধ টাইপিং এর মাধ্যমে, তবে কিন্তু সময় অনেক কম লাগবে, তারপর ১৭০ বছরের কম নয়।

কিন্তু যদি এই নির্বাচন শব্দের উপর না হয়ে অক্ষরের উপর হয়ে থাকে (অর্থাৎ, সঠিক অক্ষরটি টাইপ হওয়ার সাথে সাথে এটিকে আলাদা করে রেখে দেয়া হয়); তবে কিন্তু সময় লাগবে মাত্র ১ ঘন্টা, ৩৩ মিনিট, ৩০ সেকেন্ড। ১৯৮০’র দিকে গ্লেনডেল কলেজের রিচার্ড হার্ডিসন একই ধরনের একটি কৃত্রিম বাক্যাংশ নির্বাচনের কম্পিউটর প্রােগ্রাম তৈরী করে তাতে দেখান যে র‍্যান্ডমলি বাক্যাংশ নির্বাচন করে শেক্সপিয়রের গােটা হ্যামলেট নাটিকাটি সারে চার দিনে একেবারে অগােছালাে অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ সঠিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করা সম্ভব।

অনেকেরই হয়ত জানা নেই জীবজগতেও এই অক্ষর নির্বাচনের মতই একধরনের নির্বাচন সৃষ্টির শুরু থেকেই চলে আসছে, এটাকে বলে প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রাকৃতিক নির্বাচনের ব্যাপারটা কিন্তু ভারী মজার। রােমান্টিক ব্যক্তিরা হয়ত এর মধ্যে রােমান্সের গন্ধ পাবেন। জীব জগতে স্ত্রীই হােক আর পুরুষই হােক কেউ হেলাফেলা করে মেশে না। মন-মানসিকতায় না বনলে, প্রকৃতি পাত্তা দেবে না মােটেই। প্রকৃতির চোখে আসলে লড়াকু স্ত্রী-পুরুষের কদর বেশী।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃতি যােগ্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে বেছে নেয় আর অযােগ্য প্রতিদ্বন্দীকে বাতিল করে দেয়, ফলে একটি বিশেষ পথে ধীর গতিতে জীবজন্তুর পরিবর্তন ঘটতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড ডকিন্স, এই ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’ বা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে ‘ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি তার ‘ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার’ বইয়ে বলেন (Dawkins, 1996) :

“Natural selection, the unconscious, automatic, blind yet essentially non-random process that Darwin discovered, has no purpose in mind. If it can be said to play the role of watchmaker in nature, it is the blind watchmaker.”

অধ্যাপক ডকিন্সসহ অনেক জীববিজ্ঞানীই মনে করেন, স্রেফ ‘চান্স’ নয়, পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব আর বিকাশ ঘটেছে আসলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবে। তাই সময় লেগেছে অনেক কম। প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়া বিবর্তন হলে জীবজগৎ এত কম সময়ে এভাবে বিবর্তিত হত না।

স্বতঃজননবাদ বনাম জৈব রাসায়নিক তত্ত্বঃ

জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি তত্ত্বকে কিন্তু লুই পাস্তুর কর্তৃক পরিত্যক্ত স্বতঃজনন তত্ত্বের সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। রাসায়নিক উৎপত্তি তত্ত্বটি কাজ করে ধাপে ধাপে রাসায়নিক পরিবর্তন এবং জটিলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। প্রাক-জীবনপূর্ব সময়ে আনবিক স্তরেও হয়ত চলেছিল ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের খেলা’ যাকে এখন ‘আণবিক নির্বাচন’ (Molecular Selection) নামে অভিহিত করা হয় (Fox, 1998)।

বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে বহু ‘সিমুলেশন পরীক্ষা’ করেছেন, যার মাধ্যমে এ তত্নের বাস্তবতা ইতােমধ্যেই নানাভাবে প্রমাণিত হয়েছে (Spiegelman, 1967; Eigen and Schuster, 1979; Julius Rebek, 1994, Cohen, 1996)। অথচ সৃষ্টিবাদীরা(Creationists) এ বিষয়টিকে পুরােপুরি অস্বীকার করেন এবং সােজা সাপটা বলতে চান যে রাসায়নিক বিবর্তন তত্ত্ব সরাসরি ওই ঘরের কোনায় ফেলে রাখা ঘর্মাক্ত কাপড় চোপর থেকে। ইঁদুর কিংবা লবনাক্ত পানিতে ফেলে রাখা ফার থেকে রাজহাঁস উৎপন্ন হবার কথা বলছে, যা উনবিংশ শতাব্দীতে লুই পাস্তুর ভুল প্রমাণ করেছেন (তৃতীয় অধ্যায় দ্রঃ)।

প্রশ্ন উঠতেই পারে আদি পৃথিবীতে যদি জড় থেকে জীবের উদ্ভব ঘটে থাকে, তাহলে এ ধরণের ঘটনা আজ ঘটছে না কেন? এর উত্তর হচ্ছে আদিমকালে পৃথিবীর অবহমন্ডলের অবস্থা আজকের পৃথিবীর মত ছিল না। তাই এখন যে বাঁধা অনতিক্রম্য বলে মনে হয়, তখন হয়ত তা ছিল না। যেমন আজকের পৃথিবীতে রয়েছে প্রচুর অক্সিজেন, অথচ আদিম কালের পৃথিবীর আবহমন্ডলে অক্সিজেন প্রায় ছিল না বললেই চলে। শুধু একারণেই ঘটতে পারে বিশাল পার্থক্য (আসিমভ, ২০০৬)।

আর তা ছাড়া যদি ধরেও নেই এখনাে রাসায়নিক বিবর্তনে জীবনের উদ্ভব ঘটছে সেগুলােকে প্রথমতঃ বিদ্যমান প্রাণ থেকে পৃথক করা কঠিনই হবে (Berra, 1990)। আর দ্বিতীয়তঃ এর ফলে প্রাক-জীবনধারী যে সমস্ত জিনিস এ পৃথিবীতে তৈরী হবে, সেগুলাে অজস্র জীবের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে নিমেষের মধ্যেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। ফলে প্রাকৃতিক নিবার্চনে এগুলাের টিকে থাকার কথা নয়। অথচ আদিম পৃথিবীতে অন্য প্রাণী যখন ছিল না, তখন এই প্রাক জীবনধারীরা বিকশিত হতে পারতাে অবাধে।

আমরা অগামী পর্বে একটা কৌতুহােদ্দীপক বিষয় নিয়ে আলােচনা করব। জীববিজ্ঞানের এক অদ্ভুত শাখা আছে, এর নাম ‘Exobiology’, যার বাংলা করলে বলতে পারি মহাকাশ জীববিদ্যা। আমাদের এ পৃথিবী ছাড়াও অন্য কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা, কিংবা এর সম্ভাব্যতা কতটুক এটি হবে আগামী অধ্যায়গুলাের আলােচ্য বিষয়।


 মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা/সমালোচনা