মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ

০৩. মহাকাশে প্রাণের সন্ধান

মঙ্গলের কক্ষপথের পর থেকে সূর্যের আলাের তীব্রতা কমে গেছে বেশ খানিকটা। এখান থেকেই বিশালাকৃতির গ্যাসীয় গ্রহগুলাের সুত্রপাত। বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুন এই চারটি গ্রহের কোনটিরই শক্ত ভূ-পৃষ্ঠ নেই। কিন্তু ভেনাসের মতােই এখানেও বায়ুমন্ডলের Goldilock effect এলাকায় জীবনের জন্য সহায়ক পরিবেশ রয়েছে। জোতির্বিজ্ঞানী ই ই স্যালপিটার (E.E. Salpeter) এবং কার্ল স্যাগান (Carl Sagan) প্রস্তাব দেন যে, পৃথিবীতে প্রথম বিলিয়ন বছরে যে প্রক্রিয়ায় প্রাণের বিকাশ হয়েছিল সেই একই রকমভাবে এই সমস্ত গ্যাসীয় দৈত্যাকার গ্রহের বায়ুমন্ডলেও প্রাণের বিকাশ ঘটে থাকতে পারে।

১৯৯৫ সালে গ্যালিলিও মহাকাশযান যখন বৃহস্পতির বায়ুমন্ডলে ঢুকেছিল তখন সেখানে কোন প্রাণের অস্তিত্ব উদঘাটন করতে পারেনি। এর আগের বছর ধুমকেতু শুমেখার লেভি যখন বৃহস্পতির উপর আছড়ে পড়ে তখনও কোন জৈবিক বস্তুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু বৃহস্পতির বায়ুমন্ডল এতােই সুবিশাল যে এক জায়গায় না পাওয়া গেলেও অন্য কোথাও জীবনের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বৃহস্পতি অবশ্য আরাে একটি কারণে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে থেকে যাচ্ছে। বৃহস্পতির মতাে একই ধরনের গ্রহ মহাকাশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন। সেই সমস্ত গ্রহের বায়ুমন্ডলের রাসায়নিক গঠন বৃহস্পতির বায়ুমন্ডলের মতােই জটিল হওয়ার কথা। এই ধরনের গ্রহ যত বেশি মহাবিশ্বে আবিষ্কৃত হবে তত বেশি সেই সমস্ত গ্রহে জীবন বিকাশের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হবে।

Titan
চিত্র: শনির চাঁদ টাইটানের বিভিন্ন এঙ্গেলের ছবি

শনির দৈত্যাকৃতির উপগ্রহ টাইটানের (এটা প্রায় বুধ গ্রহের সমান আয়তনের) প্রাণ-পূর্ব জৈব রসায়ন বিজ্ঞানীদেরকে আগ্রহী করে তুলেছে এই উপগ্রহটির প্রতি। আমাদের চোখের সামনেই এখানে জটিল অণুর সংশ্লেষ ঘটে চলেছে প্রতিমুহুর্তে। প্রধানত নাইট্রোজেন অণু এবং সামান্য কিছু পরিমানে (১০ শতাংশ) মিথেন সমন্বয়ে গঠিত টাইটানের বায়ুমন্ডল পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তুলনায় প্রায় দশগুণ বড়। ১৯৮১ সালে ভয়েজার-২ টাইটানের কাছাকাছি যাওয়া সত্ত্বেও এর চারপাশের লালচে গােলাপী অস্বচ্ছ কুয়াশার কারণে এর ভূপৃষ্ঠের হদিস পায়নি।

টাইটানের ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা খুবই কম, মাত্র ৯৪ কেলভিন বা মাইনাস ১৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টাইটানের স্বল্প ঘনত্ব এবং এর আশেপাশের গ্রহ উপগ্রহের সাথে তুলনা করে অনুমান করা যায় যে, এর ভূ-পৃষ্ঠ বা তার কাছাকাছি কোথাও বিপুল পরিমাণে বরফ রয়েছে। সেই সাথে সামান্য কিছু সংখ্যক সরল অণু যেমন হাইড্রোকার্বন এবং Nitriles ও পাওয়া গেছে টাইটানের বায়ুমন্ডলে। সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মি, শনির চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে আটকে পড়া আয়নিত অণু এবং কসমিক রশ্মি সব একসাথে টাইটানের বায়ুমন্ডলে ঝাপিয়ে পড়ে সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটিয়েছে।

titan-weather-experiments
চিত্র ৬.৪: টাইটানের নাইট্রোজেন-মিথেন বায়ুমন্ডলের ল্যাবরেটরী সিমুলেশন

কার্ল সাগান এবং তার সহকর্মী বিষুন এন খারে (Bishun N. Khare) গবেষণাগারে কৃত্রিম ফ্লাস্কের মধ্যে টাইটানের বায়ুমন্ডল এবং এর চাপকে সিমুলেট করেন এবং এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ক্ষরণ ঘটান। এর ফলশ্রুতিতে গাঢ় বর্ণের ঘন কাদার মতাে জৈবিক পদার্থ তৈরি হয়। তারা এর নামকরণ করেন টাইটান থােলিন (Titan Tholin)। এই টাইটান থােলিনের অপটিক্যাল কনস্ট্যান্ট পরিমাপ করে বিজ্ঞানীদ্বয় দেখেন যে এটা টাইটানের বায়ুমন্ডলের অপটিক্যাল কনস্ট্যান্টের সাথে হুবহু মিলে যায়।

টাইটানের বায়ুমন্ডলের উচ্চস্তরে প্রতি মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে জৈব অণু এবং তা ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে নতুন থােলিন তৈরি হওয়ার সাথে সাথে । গত চার মিলিয়ন বছর ধরে যদি এই প্রক্রিয়া অনবরত চলতে থাকে তবে টাইটানের পৃষ্ঠ কয়েক’শ মিটার থােলিন এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ দিয়ে আবৃত হয়ে যাওয়ার কথা। স্যাগান এবং খেয়ার তাদের ল্যাবে তৈরি টাইটানের থােলিনের সাথে পানি মেশানাের ফলে এমিনাে এসিডও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শুধু এমিনাে এসিডই নয়, এর মধ্যে ছিল নিউক্লিওটাইড বেজ, পলিসাইক্লিক এরােম্যাটিক হাইড্রোকার্বন এবং আরাে কিছু জৈব পদার্থের সমাহার।

অতি সম্প্রতি নাসার মহাকাশযান ক্যাসিনির (Cassini) পাঠানাে রাডার ইমেজ টাইটানের  সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ জানাডুতে (Xanadu) পৃথিবীর মতাে ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছে। এই রাডার ইমেজ থেকে দেখা যাচ্ছে যে জানাডুর পশ্চিম প্রান্তে গাঢ় বর্ণের বালিয়াড়ীর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য শাখা প্রশাখা সম্বলিত নদী, পাহাড় এবং উপত্যকা। এই নদীগুলাে আরাে কৃষ্ণ এলাকার দিকে চলে গেছে যাকে মনে করা হচ্ছে লেক বলে। এই ইমেজ থেকে গ্রহাণু আঘাত বা আগ্নেয়গিরির কারণে একটি জ্বালামুখও (Crater) দৃশ্যমান।

ক্যাসিনি ইন্টারপ্লানেটারি বিজ্ঞানী ডঃ জোনাথান লুনাইন (Dr. Jonathan Lunine) বলেন যে –

টাইটান পৃথিবী থেকে এতাে দূরে যে পৃথিবীতে বা মহাকাশে অবস্থিত টেলিস্কোপের মাধ্যমে এর সব কিছু দৃশ্যমান ছিল না। ফলে আমাদেরকে এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সব কিছুই অনুমান করে নিতে হয়েছে। কিন্তু এখন ক্যাসিনির শক্তিশালী রাডার চোখের কারণে আর আমাদেরকে অনুমানের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। আশ্চর্যজনক যে, পৃথিবী থেকে বহু দূরের এই উপগ্রহে পৃথিবীর মতােই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

১৯৮৪ সালে নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ প্রথম টাইটানের জানাডু এলাকা আবিষ্কার করে। এ বছরের (২০০৬) এপ্রিল মাসে যখন ক্যাসিনির রাডার সিস্টেম জানাডুকে পর্যবেক্ষণ করে তখনই দেখা যায় যে, এর ভূ-পৃষ্ঠ বায়ু, বৃষ্টি এবং তরল পদার্থের কারণে পরিবর্তিত হয়েছে।

cassini
চিত্রঃ ক্যাসিনি

গত ফেব্রুয়ারী মাসে ক্যাসিনির বয়ে নিয়ে যাওয়া প্রােব হাইজেন্স (Huygens) অবতরণ করে টাইটানের পৃষ্ঠের কাদামাটিতে। পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে টাইটানে জলীয় পদার্থ রয়েছে। টাইটানের আবিষ্কারক ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হাইজেন্স (Christian Huygens) আজ বেঁচে থাকলে টাইটানে জলীয় পদার্থের উপস্থিতির ঘটনায় হয়তাে খুব একটা অবাক হতেন না। হাইজেন ১৬৫৫ সালে টাইটান আবিষ্কার করেন। তার সম্মানার্থেই ক্যাসিনির প্রােবের নামকরণ করা হয়েছে হাইজেন্স। এখন থেকে তিনশ বছরেরও বেশি সময় আগে ১৬৯৮ সালে হাইজেন্স টাইটানে পানি থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে লিখেছিলেনঃ

“Since ’tis certain that Earth and Jupiter have their Water and Clouds, there is no reason why the other Planets should be without them. I can’t say that they are exactly of the same nature with our Water; but that they should be liquid their use requires, as their beauty does that they be clear. This Water of ours, in Jupiter or Saturn, would be frozen up instantly by reason of the vast distance of the Sun. Every Planet therefore must have its own Waters of such a temper not liable to Frost.”

তবে টাইটানে জলীয় পদার্থ পাওয়া গেলেও এটি সম্ভবত পানি নয়। মােটামুটি নিশ্চিত যে জলীয় এই পদার্থ হয় মিথেন না হয় ইথেন। হয়তাে এই তরলই বৃষ্টি আকারে ঝরে পড়ে জানাডুতে কিংবা ভূগর্ভস্থ ঝরনা থেকে নির্গত হয় তরল পদার্থ। মিথেনের নদী ধূলিকণা বহন করে করেই তৈরি করেছে জানাডুতে ওইসব বালিয়াড়ী।

আমাদের সৌরজগতের বাইরে আন্তর্নক্ষত্রিক মহাশূন্যের গ্যাস এবং ধূলিকণার মধ্যেও জৈবিক পদার্থ খুঁজে পাওয়া গেছে। বিভিন্ন অণুদের ভিন্ন ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে নির্গত এবং আত্মস্থ করা মাইক্রোওয়েভ বিশ্লেষণ করে জোতির্বিদরা চার ডজনেরও বেশি সরল ধরনের জৈবিক পদার্থ সনাক্ত করতে পেরেছেন। এদের মধ্যে কিছু কিছু জৈবিক পদার্থ যেমন হাইড্রোকার্বন, এমাইনস, এ্যালকোহল এবং নাইট্রাইলের HC11N এর মতাে সােজা কার্বন শৃংখল রয়েছে।

অতি বেগুনি এবং মহাজাগতিক রশ্মিতে উন্মুক্ত আন্তর্নক্ষত্রিক ধূলিকণার জৈবিক পদার্থে। প্রাণের উৎপত্তির আশা করাটা বােকামি। কেননা আমরা যে জীবনকে জানি তা গঠনের জন্য প্রয়ােজন পানি আর পানি থাকার জন্য প্রয়ােজন গ্রহ বা উপগ্রহ। জোতির্বিজ্ঞানীয় পর্যবেক্ষণ দিন দিন এই ধারণার ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে যে এই মহাবিশ্বে গ্রহজগৎ বিরাজ করাটা অতি স্বাভাবিক ঘটনা। বিস্ময়করভাবে খুব কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত বেশ কিছু সংখ্যক নব্য গঠিত নক্ষত্রের চারপাশে যে গ্যাসীয় ও ধূলিকণার বৃত্ত রয়েছে তা গ্রহজগত উদ্ভবের জন্য প্রয়ােজনীয় উপাদান।

কার্নেগি ইনস্টিটিউটের জর্জ ডব্লিউ ওয়েদারিল (George W. Wetherill) একটি মডেল তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে ঐ সমস্ত গ্যাসীয় ধূলিকণা থেকে উৎপন্ন গ্রহদের বিন্যাস সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করা যায়। ইতােমধ্যে পেনসালভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির জেমস ক্যাস্টিং (James F. Casting) নক্ষত্র থেকে কত দুরত্বে থাকলে একটি গ্রহের ভূ-পৃষ্ঠে তরল পানি। থাকতে পারে তা হিসাব করে দেখিয়েছেন। এই দুই গবেষণাকে একত্রিত করলে দেখা যায় যে, সৌরজগতে নক্ষত্র থেকে একটি বা দু’টি গ্রহ কমপক্ষে এমন দুরত্বে থাকবে যেখানে তাদের পৃষ্ঠে পানি থাকা সম্ভবপর।

কার্ল স্যাগানের মতে আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই মহাবিশ্বে আমাদের পৃথিবীর মতাে পানিসমৃদ্ধ অসংখ্য গ্রহ রয়েছে যেখানে বিপুল পরিমাণে জটিল জৈবিক পদার্থ বিদ্যমান। সূর্যের মতাে নক্ষত্রকে পরিভ্রমণরত ওই সমস্ত গ্রহগুলােতে এমন পরিবেশ রয়েছে যেখানে বিলিয়ন বছরে প্রাণের উদ্ভব এবং বিকাশ ঘটা বিচিত্র কিছু নয়।


 মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

শেয়ার করুন —
5 1 vote
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা/সমালোচনা