ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০৩. বিবর্তন ও প্রেম

কুদ্দুসের এই কোকেইন মার্কা প্রেমানুভূতির মূল উৎস বা কারণ কী তাহলে? উত্তরটা কিন্তু খুব সোজা। ঘুরে ফিরে সেই একই ব্যাপার, যা বিবর্তনের একেবারে গোড়ার কথা বংশাণু রক্ষার তাগিদ বা নিজের জিনকে টিকিয়ে রাখার অবচেতন প্রয়াস। আসলে প্রতিলিপি, পরিব্যক্তি এবং প্রকারণের সমন্বয়ে গঠিত প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটা বিবর্তন শুধু প্রেমানুভূতিই নয়, বস্তুত এটি ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কামনা, বাসনা, প্রণয়, আকাঙ্ক্ষাসহ মানুষের সব ধরনের অনুভূতি ও আচরণেরই জন্ম দেয়।

আসলে বংশাণু রক্ষার জন্য যে কোনো প্রাণী অন্তত দুটি কাজ সুচারুভাবে করতে চায়। এক প্রজননক্ষম বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চায়, আর দুই সঠিক যৌনসঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের বংশাণু পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে চায়। সঠিক সঙ্গী নির্বাচন করাটা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটিই প্রধানত প্রণয়াকাঙ্ক্ষার মূল উপলক্ষ্য হিসেবে কাজ করে। ডারউইন নিজেও ব্যাপারগুলো নিয়ে অনেক চিন্তা করেছিলেন এবং তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের (Natural Selection) পাশাপাশি যৌনতার নির্বাচন (Sexual Selection)কেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

না দিয়ে তো উপায় ছিল না। ডারউইন লক্ষ্য করেছিলেন যে, প্রাণী জগতে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাচ্ছে যা কেবল প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কারণ এ বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে টিকে থাকার কথা নয়। এগুলো টিকে আছে, কারণ এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিপরীত লিঙ্গের যৌনসঙ্গীর দ্বারা বংশ পরম্পরায় দিনের পর দিন আদৃত হয়েছে।

একটি ক্লাসিক উদাহরণ হচ্ছে পুরুষ ময়ূরের দীর্ঘ পেখম থাকার উদাহরণ। এমন নয় যে দীর্ঘ পেখম পুরুষ ময়ূরকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে কোনো বাড়তি উপযোগিতা দিয়েছিল। বরং দীর্ঘ পেখম স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহতই করার কথা, এবং করেছেও। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাহায্যে ময়ূরের দীর্ঘ পেখমকে ব্যাখ্যা করা যায় না। দীর্ঘ পেখম ময়ূরদের জন্য চরম অসুবিধাজনক। দীর্ঘ পেখম থাকলে দৌঁড়াতে অসুবিধা হয়, শিকারিদের চোখে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে বেশি মাত্রায়।

কাজেই টিকে থাকার কথা বিবেচনা করলে দীর্ঘ পেখম ময়ূরের জন্য কোনো বাড়তি উপযোগিতা দেয়নি বিবর্তনের পথ পরিক্রমায়। দীর্ঘ পেখম টিকে গেছে মূলত নারী ময়ূর বা ময়ূরীর পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে। পুরুষ ময়ূরের লম্বা পেখমকে ভালো বংশাণুর নির্দেশক হিসেবে দেখত ময়ূরীরা । কাজেই দীর্ঘ পেখমের ঢেউ তোলা সুশ্রী ময়ূরেরা যৌনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচিত হতে পেরেছিল,কারণ বিপরীত লিঙ্গের যৌনসঙ্গীদের কাছে তারা ছিল একেকজন ‘ব্রাড পিট’ কিংবা টম ক্রুজ! তারাই শেষপর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছিল ময়ূরীদের যৌনাকর্ষণের ভিত্তিতে[৭৩]

peacock
চিত্র : ময়ূরের দীর্ঘ পেখম টিকে আছে মূলত নারী ময়ূর বা ময়ূরীর পছন্দ তথা যৌনতার নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে।

মোটা দাগে, যৌনতার নির্বাচন কোনো বাড়তি সুবিধা দেয় না প্রজাতির বেঁচে থাকায়। এগুলো কেবলই গয়নাগাটির মতো ‘অর্নামেন্টাল প্রোডাক্ট’। ময়ূরের পেখমের মতো মানব সমাজেও অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো অর্নামেন্টাল বা অলংকারিক। কবিতা লেখা, গান করা থেকে শুরু করে গল্প বলা, আড্ডা মারা, গসিপ করা, ভাস্কর্য বানানো প্রভৃতি হাজারো বৈশিষ্ট্য মানবসমাজে দেখা যায় যেগুলো শ্রেফ অলংকারিক এগুলো বেঁচে থাকায় কোনো বাড়তি উপাদান যোগ করেনি, কিন্তু এগুলো টিকে গেছে যৌন নির্বাচনের প্রেক্ষিতে পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে।

এই ‘মেটিং সিলেকশনের’ মায়াবী খেলা চলে কম-বেশি সব প্রাণীর মধ্যেই। স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রায় সব প্রজাতিতেই দেখা যায় পুরুষেরা সাধারণত অনেক বড় এবং বলশালী হয়, সেই সাথে দেখা যায় অনেক আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের সমাহার (যেমন, উজ্জ্বল রঙ, শিং, কেশর, দ্রুতগামিতা, ক্ষিপ্রতা, নৃত্য এবং সঙ্গীতে পারদর্শিতা ইত্যাদি)। মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। বড় চুল রাখা, দামি সানগ্লাস, কেতাদুরস্ত কাপড় পরা থেকে শুরু করে দামি গাড়ি, বাড়ি, শিক্ষা, বাকচাতুর্য, প্রতিভা, নাচ, গান, বুদ্ধিমত্তা সবকিছুই মানুষ কাজে লাগায় বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণের কাজে। মানবসমাজের নারীপুরুষের বহু বৈশিষ্ট্য এবং অভিব্যক্তিই মোটাদাগে সম্ভবত যৌনতার নির্বাচনের ফল।

আমি মুক্তমনা ব্লগে বেশ কিছু যৌনতার নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে বেশ কিছু লেখা আগে লিখেছি[৭৪], [৭৫];  সংশপ্তক কিছুদিন আগে মেটিং সিলেকশনে পুরুষের নাচের গুরুত্ব তুলে ধরে একটি চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছিলেন মুক্তমনায় ‘পুরুষের নৃত্য এবং নারী’ শিরোনামে[৭৬]। এগুলো সবই মানবসমাজে যৌনতার নির্বাচনের গুরুত্বকে সুচারুভাবে তুলে ধরে। অপার্থিব তার ‘ভালোবাসা ও বিবর্তন’ (পূর্বোক্ত) লেখায় লীন মার্গুলিস ও ডরিয়ান সেগান “Mystery Dance: On the Evolution of Human Sexuality”  বই থেকে একটি চমৎকার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন —

“প্রযুক্তি কিংবা সভ্যতা আমাদেরকে আমাদের পশুত্ব থেকে খুব দূরে সরাতে পারেনি, বরং তা আরও জোরালভাবে সেটা অধিষ্ঠিত করেছে। সৌখিন চশমা, স্কন্ধালঙ্কার ইত্যাদি যেন অনেকটা ময়ূরের পুচ্ছের মতোই। ”

যৌনতার নির্বাচন আমাদের মানসপটে কাজ করে বলেই কারো সুন্দর চেহারা কিংবা মনোহারী ব্যক্তিত্ব দেখলে আমরা সবাই মনের অজান্তেই আন্দোলিত হয়ে উঠি। বঙ্কিমচন্দ্র যে একসময় বলেছিলেন, ‘সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র’ ব্যাপারটা কিন্তু মিথ্যে নয় একেবারে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা সংস্কৃতিভেদে সবাই বিপরীত লিঙ্গের যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে ‘আকর্ষণীয়’ বলে মনে করে সেগুলো হলো পরিষ্কার চামড়া এবং প্রতিসাম্যময় মুখ, পরিষ্কার চোখ, সুন্দর এবং সুগঠিত দাঁত, সতেজ এবং সুকেশী চুল এবং চেহারার গড়পড়তা।

সুন্দর চামড়া[৭৭] (Unblemished skin), স্বচ্ছ চোখ (Clear eyes), সুন্দর এবং সুগঠিত দাঁত (Intact teeth), সতেজ এবং সুকেশী চুল (Luxuriant hair) কেন পছন্দনীয় তা বোঝা কঠিন কিছু নয়। এগুলো তারুণ্য, সুস্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি প্রজনন ক্ষমতার বাহ্যিক প্রকাশ ছিল আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের কাছে। একই ব্যাপার খাটে প্রতিসাম্যময় মুখের (Symmetrical face) ক্ষেত্রেও। এ ধরনের সুগঠিত চেহারা বিপরীত লিঙ্গের কাছে প্রমাণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল যে তার পছন্দনীয় মানুষটি অপুষ্টির শিকার নয়, কিংবা জীবাণু কিংবা পরজীবীদের আবাসস্থল নয়। অর্থাৎ এ বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল বংশাণু টিকিয়ে রাখার প্রয়াসে সঠিক যৌনসঙ্গী নির্বাচনের একধরনের ‘সফল মার্কার’।

চেহারার গড়পড়তা ব্যাপারটা সাদা দৃষ্টিতে বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। কেন গড়পড়তা চেহারাকে ‘আকর্ষণীয়’ বলে মনে হবে? এটা মনে হয় কারণ, ‘গড়পড়তা চেহারা’ একটা বিশেষ ব্যাপারকে তুলে ধরে। সেটা হচ্ছে ‘জেনেটিক ডাইভার্সিটি’ বা বংশাণুক্রমিক বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য বজায় থাকা মানে বাহক অধিকতর রোগ প্রতিরোধে সক্ষম এবং প্রতিকূল পরিবেশে সহজে অভিযোজিত হবার ক্ষমতা সম্পন্ন বলে ধরে নেওয়া হয়। আসলে আমরা যে গড়পড়তা চেহারাকে ‘সুন্দর’ বলে রায় দেই, তা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন একটি ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে।

নির্বিচারে ১০ টি চেহারা নিয়ে ফটোশপ কিংবা কোনো প্রফেশনাল সফটওয়্যারে চেহারাগুলো মিশ্রিত (Blend) করে উপস্থাপন করলে সেটিকে অধিকতর আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। নীচের ছবিটি লক্ষ করুন। প্রথম দুটো ছবিকে মিশ্রিত করে তৃতীয় ছবিটি তৈরি করা হয়ছে। মনঃস্তাত্বিক জরিপে অধিকাংশ লোকই তৃতীয় ছবিটিকে অন্য দুটো ছবির চেয়ে অধিকতর আকর্ষণীয় বলে রায় দেয়!

mixed
চিত্র : যখন একাধিক আসল চেহারাকে মিশ্রিত করে গরপরতা চেহারাতে পরিণত করা হয়, সেটি অধিকাংশ মানুষের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে।

তবে যৌনতার নির্বাচন শুধু অভিন্ন মানবপ্রকৃতি গঠন করেছে ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। বহুক্ষেত্রেই এটি পার্থক্য সূচিত করেছে নারী পুরুষের পছন্দ-অপছন্দে। অভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি যৌনতার নির্বাচন আবার কাজ করেছে নারী-পুরুষের পার্থক্যসূচক মানস জগৎ তৈরীতেও পলে পলে একটু একটু করে। আসলে সত্যি বলতে কি যৌনতার নির্বাচনকে পুঁজি করে পুরুষ যেমন গড়েছে নারীকে, তেমনি নারীও গড়েছে পুরুষের মানসপটকে। এক লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলোর আবেদন তৈরি করেছে আরেক লিঙ্গের চাহিদা। তৈরি এবং ত্বরান্বিত হয়েছে বিভিন্ন লিঙ্গ-ভিত্তিক নানা পছন্দ অপছন্দ।

পুরুষ দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধবিগ্রহের মধ্য দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছে বলে স্বভাবে হয়ে উঠেছে অনেক সহিংস। আবার নারীরাও একটা সময় পুরুষদের এই সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, কারণ এ ধরনের পুরুষেরা নিজ নিজ ট্রাইবকে রক্ষা করতে পারত বহিঃশত্রুর হাত থেকে। এ ধরনের সমর দক্ষ পুরুষেরা ছিল সবার হার্টথ্রব এরা দিয়েছিল নিজের এবং পরিবারের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা। এ ধরনের সাহসী পুরুষেরা নিজেদের জিন ছড়াতে পেরেছে অনেক সহজে, আমার মতো কাপুরুষদের তুলনায়! ফলে নারীরাও চেয়েছে তার সঙ্গীটি কাপুরুষ না হয়ে সাহসী হোক, হোক বীরপুরুষ! এই ধরনের চাহিদার প্রভাব এখনও সমাজে দৃশ্যমান।

ডেট করতে যাওয়ার সময় কোনো নারীই চায় না তার সঙ্গী পুরুষটি উচ্চতায় তার চেয়ে খাটো হোক। সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে এ যেন এক অলিখিত নিয়ম, শুধু আমেরিকায় নয়, সব দেশেই! বাংলাদেশে বিয়ে করতে গেলে পাত্রের উচ্চতা বউয়ের উচ্চতার চেয়ে কম দেখা গেলেই আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে গাইগুঁই শুরু হয়ে যায় মুহূর্তেই। খাটো স্বামীকে বিয়ে করতে হলে স্ত্রীরও মনোকষ্টের সীমা থাকে না। হাই হিল জুতো আর তার পরা হয়ে ওঠে না। আসলে দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় প্রভাব মানসপটে রাজত্ব করার কারণেই এটি ঘটে। লম্বা চওড়া জামাই সবার আদরনীয়, কারণ একটা সময় লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান এই সব পূর্বপুরুষেরা রক্ষা করতে পেরেছিল স্বীয় গোত্রকে, রক্ষা করেছিল উত্তরপুরুষের জিনকে অন্যদের তুলনায় অনেকে ভালোভাবে। সেই আদিম মানসপট আধুনিক মেয়েদের মনে রাজত্ব করে তাদের অজান্তেই!

আবার পুরুষদের মানসজগতেও নারীদেহের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে উদগ্র আগ্রহ দেখা যায় সম্ভবত বিবর্তনীয় তথা যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে মানসপট তৈরী হবার কারণেই। যে কোনো দেশের সাহিত্যের পাতা উল্টালেই দেখা যাবে – নারীর পিনোন্নত স্তন, সুডৌল নিতম্ব আর ক্ষীণ কটিদেশ নিয়ে যুগের পর যুগ কাব্য করেছে পুরুষ সকল সংস্কৃতিতেই। কারণ নারীদেহের এই বৈশিষ্ট্যগুলোই সকল পুরুষের কাছে মহার্ঘ্য বস্তু। কিন্তু কেন? কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলেন, আদিম সমাজে পুরুষদের কাছে বৃহৎ স্তন এবং নিতম্বের মেয়েরা অধিকতর সমাদৃত ছিল প্রাকৃতিক কারণেই। বিপদসঙ্কুল জঙ্গুলে পরিবেশে মেয়েদের বাচ্চা কোলে নিয়ে পুরুষদের সাথে ঘুরতে হতো। এলাকায় খাদ্য স্বল্পতা দেখা দিলে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাইয়ে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে হতো।

অতি আধুনিক কালের কৃষিবিপ্লবের কথা বাদ দিলে মানুষকে আসলেই শতকরা নব্বই ভাগ সময় যুদ্ধ করতে হয়েছে খাদ্য স্বল্পতার বিরুদ্ধে। যে নারী দীর্ঘদিন খাদ্য স্বল্পতার প্রকোপ এড়িয়ে বুকের দুধ খাইয়ে বাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে, তারা টিকে গেছে অনেক বেশি হারে। কাজেই কোনো নারীর বৃহৎ স্তন পুরুষদের কাছে প্রতিভাত হয়েছে ভবিষ্যত-প্রজন্মের জন্য ‘অফুরন্ত খ্যাদ্যের ভাণ্ডার’ হিসেবে। এ এক অদ্ভুত বিভ্রম যেন। এই বিভ্রম দীর্ঘদিন ধরে পুরুষকে করে তুলেছে পৃথুল স্তনের প্রতি আকর্ষিত। তারা লালায়িত হয়েছে, লুব্ধ হয়েছে এ ধরনের দৈহিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নারীর সাথে সম্পর্ক করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে জৈবিক তাড়নায়।

ঠিক একইভাবে, বহিঃশত্রু যখন আক্রমণ করেছে তখন যে নারী বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে বাঁচতে পেরেছে, তাদের জিন রক্ষা পেয়ছে অনেক সহজে। এই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলাতে গিয়ে নারীর কোমড় হয়েছে ক্ষীণ, আর নিতম্ব হয়েছে সুদৃঢ়। আর এ বৈশিষ্ট্যগুলো পুরুষদের কাছে হয়ে উঠেছে অনেক বেশি আদরণীয়।

নারীর সুদৃঢ় নিতম্বের প্রতি পুরুষদের আগ্রহের অবশ্য আরও একটি বড় কারণ আছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন বিগত পাঁচ মিলিয়ন বছরে মানুষের মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। ফলে এটি বাচ্চার জন্মের সময় তৈরি করেছে জন্মসংক্রান্ত জটিলতার। এই কিছুদিন আগেও সারা পৃথিবীতেই বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়া মায়েদের সংখ্যা ছিল খুবই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। আজকের দিনের সি-সেক অপারেশন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এই জটিলতা থেকে নারীকে অনেকটাই মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু আদিম সমাজে তো আর সি-সেকশন বলে কিছু ছিল না। ধারণা করা হয়, সভ্যতার উষালগ্নে ক্ষীণ নিতম্ববিশিষ্ট নারীদের মৃত্যু অনেক বেশি হয়েছে বড় মাথাওয়ালা বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে। টিকে থাকতে পেরেছে সুডৌল এবং সুদৃঢ় নিতম্ব-বিশিষ্ট মেয়েরাই। কারণ তারা অধিক হারে জন্ম দিতে পেরেছে স্বাস্থ্যবান শিশুর। ফলে দীর্ঘদিনের এই নির্বাচনীয় চাপ তৈরি করেছে নারী দেহের সুদৃঢ় নিতম্বের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক উদগ্র কামনা!

hip
চিত্রঃ অধ্যাপক দেবেন্দ্র সিংহ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত মোটামুটি ০.৭ এর মধ্যে থাকলে তা তৈরি করে মেয়েদের ‘Classic Hourglass Figure’, এবং এটি পুরুষদের মনে তৈরি করে আদি অকৃত্রিম যৌনবাসনা।

পুরুষের চোখে নারীর দেহগত সৌন্দর্যের ব্যাপারটাকে এতদিন পুরোপুরি ‘সাংস্কৃতি’ ব্যাপার বলে মনে করা হলেও আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক দেবেন্দ্র সিংহ তার গবেষণা থেকে দেখিয়েছেন যে, সংস্কৃতি নির্বিশেষে নারীর কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত ০.৬ থেকে ০.৮ মধ্যে থাকলে সার্বজনীনভাবে আকর্ষণীয় বলে মনে করে পুরুষেরা। অধ্যাপক সিংহের মতে মোটামুটি কোমর : নিতম্ব = ০.৭ এই অনুপাতই তৈরী করে মেয়েদের ‘Classic Hourglass Figure’, যা পুরুষদের মনে তৈরি করেছে আদি অকৃত্রিম যৌনবাসনা ।

সংস্কৃতি নির্বিশেষে এই উপাত্তের পেছনে সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়[৭৮] । সম্প্রতি পোলিশ একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, সুডৌল স্তন, সরু কোমড় এবং হৃষ্ট নিতম্ব মেয়েদের সর্বচ্চ উর্বরতা প্রকাশ করে, যার পরিমাপ পাওয়া গেছে দুটো প্রধান যৌনোদ্দীপক হরমোনের (17-β-estradiol & progesterone) আধিক্য বিশ্লেষণ করে[৭৯]

পুরুষের মনে প্রথিত হওয়া যৌনোদ্দীপক কোমর/নিতম্বের অনুপাত আসলে তারুণ্য, গর্ভধারণ ক্ষমতা (Fertility) এবং সাধারণভাবে সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। কাজেই এটিও পুরুষের কাছে প্রতিভাত হয় এক ধরনের ‘ফিটনেস মার্কার’ হিসেবে। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর জন্সটন তাঁর ‘Why We Feel? The Science of Emotions’ বইয়ে বলেন যে মেয়েদের কোমর ও নিতম্বের অনুপাত ০.৭ হলে এন্ড্রোজেন ও এস্ট্রোজেন হরমোনের যে অনুপাত গর্ভধারণের জন্য সবচেয়ে অনুকুল সেই অনুপাতকে প্রকাশ করে। এরকম আরেকটি নিদর্শক হলো সুডৌল ওষ্ঠ।

সেজন্যই গড়পড়তা পুরুষেরা এঞ্জেলিনা জোলি কিংবা ঐশ্বরিয়া রাইয়ের পুরুষ্টু ওষ্ঠ ছবিতে দেখে লালায়িত হয়ে ওঠে। কাজেই দেখা যাচ্ছে সৌন্দর্যের উপলব্ধি কোনো বিমূর্ত ব্যাপার নয়। এর সাথে যৌন আকর্ষণ এবং সর্বোপরি গর্ভধারণ ক্ষমতার একটা গভীর সম্পর্ক আছে, আর আছে আমাদের দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় পথপরিক্রমার সুস্পষ্ট ছাপ।


 ভালোবাসা কারে কয়


৭৩.↑    যৌনতার নির্বাচন

৭৪.↑   সহিংসতা, নির্যাতন এবং ‘লুল পুরুষ’ উপাখ্যান – একটি বিবর্তনীয় অনুসন্ধান↑

৭৫.↑   পুরুষ মানুষ দুই প্রকারের – জীবিত আর বিবাহিত↑

৭৬.↑   পুরুষের নৃত্য এবং নারী↑

৭৭.↑    পরিষ্কার চামড়া

৭৮.↑   Singh, D. (2002) Female Mate Value at a Glance: Relationship of Waist-to-Hip Ratio to Health, Fecundity, and Attractiveness. Neuroendocrinology Letters. Special Issue, 23, 81-91.

৭৯.↑   Jasienska, G., Ziomkiewicz, A., Ellison, P.T., Lipson, S.F., Thune, I. (2004)“Large breasts and narrow waists indicate high reproductive potential in women.” Proceedings of the Royal Society of London “B”, 271: 1213-1217

শেয়ার করুন —
5 2 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়