ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০৩. কেন সিন্ডারেলার গল্প কম বেশি সব সংস্কৃতিতেই ছড়িয়ে আছে?

শিশু নির্যাতন বিষয়টাকে অভিভাবকদের ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা বড়জোর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক কারণ হিসেবে এ পর্যন্ত চিত্রিত করা হলেও, এর সার্বজনীন রূপটি আসলে ব্যাখ্যাহীন ছিল। কিন্তু ব্যাখ্যাহীন থাকলেও অজানা ছিল না। সবাই কম বেশি জানত যে, প্রতিটি সংস্কৃতিতেই সিন্ডারেলা কিংবা স্নো হোয়াইটের মতো লোককথা কিংবা গল্পকাহিনি প্রচলিত, যেখানে সৎবাবা কিংবা সৎমা কর্তৃক শিশুর উপর নির্যাতন থাকে মূল উপজীব্য হিসেবে।

Sinderella
চিত্র : পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই সিন্ডারেলা বা স্নো হোয়াইটের মতো লোককাহিনি বা রূপকথা প্রচলিত আছে, যেখানে বিবৃত থাকে সৎ মার অত্যাচারের বেদনাঘন কাহিনি ।

ছোটবেলায় রুশদেশীয় উপকথার খুব মজার মজার বই পড়তাম। আশি আর নব্বই দশকের সময়গুলোতে চিকন মলাটে বাংলায় রাশিয়ান গল্পের (অনুবাদ) অনেক বই পাওয়া যেত। আমি সবসময়ই তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতাম নতুন নতুন গল্পের বই পড়ার আশায়। প্রতি বছর জন্মদিনের সময়টাতে তৃষ্ণা যেন বেড়ে যেত হাজারগুণে। কারণ, জানতাম কেউ না কেউ রুশদেশীয় উপকথার বই নিয়ে আসবে উপহার হিসেবে। অবধারিতভাবে তাই হতো। এমনি একটি জন্মদিনে একটা বই পেয়েছিলাম ‘বাবা ইয়াগা’ (Baba Yaga) নামে।

গল্পটা এরকম- এক লোকের স্ত্রী মারা গেলে লোকটি আবার বিয়ে করে। তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ছিল এক ফুটফুটে মেয়ে। কিন্তু সৎ মা এসেই মেয়েটির উপর নানা ধরনের অত্যাচার শুরু করে। মারধোর তো ছিলই, কীভাবে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া যায় সেটারও পাঁয়তারা চলছিল। শুধু তাই নয়, মেয়েটিকে ছলচাতুরি করে সৎমা তার বোনের বাসায় পাঠানোর নানা ফন্দি-ফিকির করে যাচ্ছিল। সৎমার বোন আসলে ছিল এক নরখাদক ডাইনি। যাহোক, গল্পে শেষ পর্যন্ত দেখা যায় কোনো রকমে মেয়েটি নিজেকে ঘোর দুর্দৈব থেকে বাঁচাতে পেরেছিল, আর মেয়েটির বাবাও বুঝে গিয়েছিল তার নতুন স্ত্রীর প্রকৃত রূপ। শেষমেশ গুলি করে তার স্ত্রীকে হত্যা করে মেয়েকে ডাইনির খপ্পর থেকে রক্ষা করে তার বাবা।

আমি জার্মান ভাষাতেও এ ধরনের একটি গল্প পেয়েছি যার ইংরেজি অনুবাদ বাজারে পাওয়া যায় ‘জুপিটার ট্রি’ নামে। সেখানে ঘটনা আরও ভয়ানক। সৎমা তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে সৎ ছেলেকে জবাই করে হত্যা করার পর দেহটা হাঁড়িতে জ্বাল দিয়ে রেঁধে খেয়ে ফেলে। আর হাড়গোড়গুলো পুঁতে ফেলে বাসার পাশে এক জুপিটার গাছের নীচে। তারপর সৎমা নির্বিঘ্নে ঘুমাতে যায় সব ঝামেলা চুকিয়ে। কিন্তু জুপিটার গাছের নীচে পুঁতে রাখা ছেলেটার হাড়গোড় থেকে গভীর রাতে জন্ম হয় এক মিষ্টি গলার গায়ক পাখির। সেই পাখি তার কণ্ঠের জাদুতে সৎমাকে সম্মোহিত করে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে আর শেষ পর্যন্ত উপর থেকে পাথর ফেলে মেরে ফেলে। এখানেই শেষ নয়। পাখিটি তারপর অলৌকিকভাবে সেই আগেকার ছেলেতে রূপান্তরিত হয়ে যায় আর তার বাবার সাথে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে থাকে।

রুশ দেশের কিংবা জার্মান দেশের উপকথা স্রেফ উদাহরণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। আসলে এধরনের গল্প কিংবা উপকথা সব সংস্কৃতিতেই কমবেশি পাওয়া যায়। এমনকি আমাদের সংস্কৃতিতেও রূপকথাগুলোতে অসংখ্য সুয়োরানি, দুয়োরানির গল্প আছে, এমনকি বড় হয়েও দেখেছি বহু নাটক সিনেমার সাজানো প্লট যেখানে সৎমা জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে একটি ছোট্ট মেয়ের বা ছেলের। নিশ্চয় মনের কোণে প্রশ্ন উঁকি মারতে শুরু করেছে কেন সব দেশের উপকথাতেই এ ধরনের গল্প ছড়িয়ে আছে?

আসলেই কী এ ধরনের গল্পগুলো বাস্তব সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে, নাকি সেগুলো সবই উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা? পশ্চিমে ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকানো যাক। আমেরিকার মতো জায়গায় বিবাহবিচ্ছেদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, স্টেপ বাবা কিংবা স্টেপ মা’র ব্যাপারটা একেবারেই গা সওয়া হয়ে গেছে, দত্তক নেওয়ার ব্যাপারটাও এখানে খুব সাধারণ। কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে, এই সমস্ত অগ্রসর সমাজে সৎ অভিভাবক কর্তৃক শিশু নির্যাতনের মাত্রা কম হবে। সত্যিই তা কম, অন্তত আমাদের মতো দেশগুলোর তুলনায় তো বটেই।

কিন্তু ড্যালি এবং উইলসন তাদের গবেষণায় দেখালেন, এমনকি পশ্চিমেও সৎ অভিভাবক (Step Parents) কর্তৃক শিশু নির্যাতনের মাত্রার চেয়ে জৈব-অভিভাবক (Biological Parent)-দের দ্বারা শিশু নির্যাতনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ, এমনকি অগ্রসর সমাজে সৎ অভিভাবকদের দ্বারা শিশু নির্যাতন কম হলেও জৈব অভিভাবকদের তুলনায় তা আসলে এখনও অনেক বেশিই। যেমন, পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আমেরিকার আধুনিক সমাজেও জৈব অভিভাবকদের দ্বারা শিশু নির্যাতনের চেয়ে সৎ অভিভাবক কর্তৃক শিশু নির্যাতন অন্তত ১০০ গুণ বেশি। কানাডায় জরিপ চালিয়েও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে। সেখানে স্বাভাবিক অভিভাবকের তুলনায় সৎ অভিভাবকদের নির্যাতনের মাত্রা ৭০ গুণ বেশি পাওয়া গেল।

Step-parents-abuse
চিত্র : মার্টিন ড্যালি এবং মার্গো উইলসন তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সৎ অভিভাবক কর্তৃক শিশু নির্যাতনের মাত্রার চেয়ে জৈব অভিভাবকদের দ্বারা শিশু নির্যাতনের মাত্রা সবসময়ই তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।

আসলে বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে তাই পাওয়ার কথা। জৈব অভিভাবকেরা তাদের জেনেটিক সন্তানকে খুব কমই নির্যাতন বা হত্যা করে, কারণ তারা সহজাত কারণেই নিজস্ব জিনপুল তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের চেয়ে রক্ষায় সচেষ্ট হয় বেশি, কিন্তু সৎ অভিভাবকদের ক্ষেত্রে যেহেতু সেই ব্যাপারটি ‘জেনেটিকভাবে’ সেভাবে নেই, অনেকাংশেই সামাজিকভাবে আরোপিত, সেখানে নির্যাতনের মাত্রা অধিকতর বেশি পাওয়া যায়।

ব্যাপারটা শুধু মানুষ নয়, অন্য প্রাণিজগতের ক্ষেত্রেও খুব প্রবলভাবে দৃশ্যমান। আফ্রিকার বনভূমিতে সিংহদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন, সেখানে একটি পুরুষ সিংহ যখন অন্য সিংহকে লড়াইয়ে পরাজিত করে গোত্রের সিংহীর দখল নেয়, তখন প্রথমেই যে কাজটি করে তা হলো সে সিংহীর আগের বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলে।

আফ্রিকার সেরেঙ্গিটি প্লেইনে গবেষকদের হিসেব অনুযায়ী প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ সিংহসাবক তার বৈপিত্রের খপ্পরে পড়ে মারা যায়[২০৪]। একই ধরনের ব্যবহার দৃশ্যমান গরিলা, বাঘ, চিতাবাঘ, বেবুন প্রভৃতি প্রাণীর মধ্যেও। এখন মানুষও যেহেতু অন্য প্রাণীদের মতো বিবর্তনের বন্ধুর পথেই উদ্ভূত হয়েছে, তাই তার মধ্যেও সেই ‘পশুবৃত্তি’র কিছুটা ছিটেফোঁটা থাকার কথা। অনেক গবেষকই মনে করেন, প্রচ্ছন্নভাবে হলেও তা পাওয়া যাচ্ছে।

মার্টিন ড্যালি এবং মার্গো উইলসনের উপরের পরিসংখ্যানগুলো তারই প্রমাণ। ডেভিড বাস তার ‘দ্য মার্ডারার নেক্সট ডোর’ বইয়ে সেজন্যই বলেন[২০৫]

Put bluntly, a stepparent has little reproductive incentive to care for a stepchild. In fact, a stepparent has strong incentives to want the stepchild out of the way. A stepfather who kills a stepchild prevents that child’s mother from investing valuable resources in a rival’s offspring. He simultaneously frees up the mother’s resources for investigating in his own offspring with her.

এই ব্যাখ্যা থেকে অনেকের মনে হতে পারে যে বৈপিত্রের হাতে শিশু হত্যাটাই বুঝি ‘প্রাকৃতিক’ কিংবা অনেকের এও মনে হতে পারে যে, সৎ অবিভাবকদের কুকর্মের বৈধতা অবচেতন মনেই আরোপের চেষ্টা হচ্ছে বুঝি। আসলে তা নয়। সিংহর ক্ষেত্রে যেটা বাস্তবতা, মানবসমাজের ক্ষেত্রেও সেটা হবে তা ঢালাওভাবে বলে দেওয়াটা কিন্তু বোকামি।

আর মানবসমাজ এমনিতেই অনেক জটিল। জৈব তাড়নার বিপরীতে কাজ করতে পারার বহু দৃষ্টান্তই মানবসমাজে বিদ্যমান; যেমন পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে সন্তান না নেওয়া, অনেকের সমকামী প্রবণতা প্রদর্শন, দেশের জন্য আত্মত্যাগ, কিংবা আত্মহত্যার দৃষ্টান্ত, সন্তানদের পাশাপাশি মা বাবার প্রতি ভালোবাসা, পরকীয়ার কারণে নিজ সন্তানকে হত্যা, সন্তান থাকার পরেও আরও সন্তান দত্তক দেয়া, আবার পরের ছেলে কেষ্টর মায়ায় কাদম্বিনীর গৃহত্যাগ (শরৎচন্দ্রের মেজদিদি গল্প দ্র.) সহ বহু দৃষ্টান্তই সমাজে আমরা দেখি যেগুলোকে কেবল জীববিজ্ঞানের ছাঁচে ফেলে বিচার করতে পারি না।

মনে রাখতে হবে, আধুনিক বিশ্ব আর সিন্ডারেলা আর সুয়োরানির যুগে পড়ে নেই; নারীরা আজ বাইরে কাজ করছে, ভিক্টোরীয় সমাজের তুলনায় তাদের ক্ষমতায়ন এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামাজিক সম্পর্কগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য বিশ্বে বিবাহবিচ্ছেদ যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠছে ‘স্টেপ ড্যাড’ আর ‘স্টেপ মম’-এর মতো ধারণাগুলো। এমনকি সমকামী দম্পতিদের দত্তক নেওয়ার দৃষ্টান্তও বিরল নয়। বহু পরিবারেই দেখা যায় জৈব অভিভাবক না হওয়া সত্ত্বেও সন্তানের সাথে অভিভাবকদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠাতে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি।

আর বৈপিত্রের দ্বারা সন্তান হত্যার পেছনে আদি জৈবিক প্রভাব যদি কিছু মানবসমাজে থেকেও থাকে, সেটার বিপরীত প্রভাবগুলোও ‘প্রাকৃতিক’ভাবে অঙ্কুরিত হতে হবে জিনপুলের টিকে থাকার প্রয়োজনেই। সেজন্যই দেখা যায় বিবাহবিচ্ছিন্ন একাকী মা (Single Mother) যখন আরেকটি নতুন সম্পর্কে জড়ান, তখন তার প্রাধান্যই থাকে তার সন্তানের প্রতি তার প্রেমিকের মনোভাবটি কী রকম সেটি বুঝার চেষ্টা করা। কোনো ধরনের বিরূপতা লক্ষ করলে কিংবা অস্বস্তি অনুভব করলে সম্পর্কের চেয়ে সন্তানের মঙ্গলটাই মুখ্য হয়ে উঠে অধিকাংশ ক্ষেত্রে।

আবার অনেক ক্ষেত্রে তার নতুন পুরুষটি প্রাথমিকভাবে ততটা বাঞ্ছিত না হলেও যদি কোনো কারণে সন্তানের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে, তবে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে মার কাছে অগ্রগামিতা পেতে বাড়তি দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলেন তিনি। আবার সম্পর্ক তৈরির পরে কখনো সখনো ঝগড়াঝাঁটি হলে স্থায়ীভাবে অযাচিত টেনশনের দিকে যেন ব্যাপারটা চলে না যায়, সেটিও থাকে সম্পর্কের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এগুলো সবকিছুই তৈরি হয় টিকে থাকার জন্য বিবর্তনীয় টানাপোড়নের নিরিখে।


 ভালোবাসা কারে কয়


২০৪.↑     Martin Daly and Margo Wilson, The Truth about Cinderella: A Darwinian View of Parental Love, Yale University Press.

২০৫.↑     David M. Buss, The Murderer Next Door, Why the Mind is Designed to Kill, Penguin Books, 2005, p 177.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়