বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০৩. আণবিক জীববিদ্যা ও জেনেটিক্স জিনােমিক্স

এবার চোখ ফেরানাে যাক জীববিজ্ঞানের অত্যাধুনিক শাখাগুলাে যেমন, আণবিক জীববিদ্যা, জেনেটিক্স জিনােমিক্স থেকে ম্যাক্রো-বিবর্তনের পক্ষে পাওয়া প্রমাণগুলাের দিকে। আজকে মানুষসহ বিভিন্ন প্রাণীর সম্পূর্ণ জিনােম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ‘The great tree of life‘-এর ধারণা কোন মনগড়া ক্ষ্যাপা বিজ্ঞানীর উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত গল্প নয়। ডারউইন তার সময়ের থেকে বেশ অনেকটা এগিয়ে থেকে সমস্ত জীবকুল যে একই আদি জীব থেকে বিবর্তিত হয়েছে বলে অনুকল্প দিয়েছিলেন তা আজকে জেনেটিক্স এবং জিনােমিক্সের কল্যাণে সুপ্রিতিষ্ঠত একটি তত্ত্ব।

আগে ফসিল রেকর্ড এবং জীবের বাহ্যিক  বৈশিষ্ট্যগুলাে দেখে প্রাণের শ্রেণিবিভাগ করতে হত, এখন তা ক্রস পরীক্ষা করে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া স্বতন্ত্র তথ্যের মাধ্যমে। এটা এখন প্রমাণিত যে, বিবর্তনের সম্পর্কে এবং ধারাবাহিকতায় যে জীব যত অন্য জীবের কাছের সময়ের ততই তাদের মধ্যে ডিএনএ, আরএনএ বা প্রােটিনের সাদৃশ্য বেশী। কয়েকশাে বছর ধরে পাওয়া ফসিল রেকর্ডের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের এই তথ্য প্রায় হুবহু মিলে যাচ্ছে।

আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ঘাস, উদ্ভিদ থেকে শুরু করে কৃমি, পাখি, মাছ, মানুষ পর্যন্ত সবাই একই জটিল আণবিক মেশিন বা গঠন বহণ করে চলেছে, জীবনের ডিএনএ, আর এন এ কোড, প্রােটিন সিন্থেসিস-এর প্রক্রিয়া এবং শক্তি সঞ্চলনের এটিপি (ATP) ব্যবস্থাও তাদের এক। মানুষ, শিম্পাঞ্জী, ইদুর, সহ বিভিন্ন প্রাণীর জিনােম সিকোয়েন্সিং করা হয়েছে, আরও অনেক প্রাণীর জিন পড়ার কাজ এগিয়ে চলেছে।

খুব সাম্প্রতিককালের আধুনিক জেনেটিক গবেষণা [১০] থেকে দেখা যাচ্ছে যে, শিম্পাঞ্জীর জিনের সাথে আমাদের জিন ৯৯%  মিলে যাচ্ছে আর ডিএনএ-এর সন্নিবেশ এবং মুছে যাওয়া (DNA insertion and deletion) ধরলে এই মিলের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৬%। মানুষের সাথে শিম্পাঞ্জীর যে পার্থক্য তার চেয়ে মানুষের সাথে ইদুরের পার্থক্য ৬০% বেশী।

একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের ডিএনএ-এর গড়পরতা যে মিল তার চেয়ে একটা শিম্পাঞ্জীর সাথে একটা মানুষের মিলের পরিমাণ মাত্র ১০% কম। এমনি পার্থক্য একই প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন ভ্যারাইটিদের মধ্যেও দেখা যায়। তাই মানুষকে অনেকে বলেন ‘তৃতীয় শিম্পাঞ্জী’। মানুষ এবং শিম্পাঞ্জী যে প্রায় ৬০ লক্ষ বছর আগে একই পূর্বপুরুষ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাে তা নিয়ে এখন আর সন্দেহের অবকাশ নেই [১১]

শুধু তাই নয়, বিভিন্ন জীবের বংশানুসৃত দ্রব্য ডিএনএ এবং আরএনএ এবং প্রােটিনের অনুগুলাের আনবিক গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে তাদের আণবিক গঠনও একই রকমের। যেমন প্রকৃতিতে ৩২০ রকমের এমাইনাে এসিড পাওয়া গেলেও দেখা গেছে প্রতিটি জীব গঠিত হয়েছে মাত্র ২০টি এমাইনাে এসিডের রকমফেরে। অর্থাৎ একই রকমের (২০টি) এমাইনাে এসিড দিয়ে সকল জীবের প্রােটিন গঠিত। প্রােটিন অণুতে এমাইনাে এসিডের আবশেষগুলাের পর্যায়ক্রমিক বিন্যাসকে বলে এমাইনাে এসিড অনুক্রম। ঠিক একইরকমভাবে দেখা গেছে যে, সকল জীবের ডিএনএ অনুর গঠন একক বেসও একই ধরনের। মাত্র চার প্রকার বেস (এডেনিন, গুয়ানিন, থাইমিন ও সাইটোসিন) দিয়ে সকল জীবের ডিএনএ গঠিত।

প্রতি বছরই প্রকৃতিতে প্রায় হাজার খানেক করে নতুন প্রজাতির সন্ধান পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। প্রতিদিনই নতুন নতুন ডিএনএ এবং প্রােটিন সংশ্লেষণ করছেন তারা ল্যাবরেটরীতে বসে। একটি ক্ষেত্রেও তারা ব্যতিক্রম পাননি। এখান থেকে বােঝা যায় যে, সকল জীবের উৎপত্তি যদি একই উৎস থেকে বিবর্তিত না হয়ে থাকে তবে আধুনিক জীববিদ্যার এ সমস্ত তথ্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। কাজেই সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই যে, জীবের উৎপত্তি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় – তা সে মানুষই হােক অথবা বিশাল বপু হিপােপটেমাসই হােক – সকলেই একই উৎসের ধারাবাহিক বিবর্তনের ফসল।

ওদিকে আবার আনবিক জীববিদ্যা খুব ভালভাবে দেখিয়েছে যে প্রােটিনে এমাইনাে এসিডের অনুক্রমে পরিবর্তনের কারণ ডিএনএ জেনেটিক কোডে মিউটেশন। মিউটেশনের হারও নানাভাবে নির্ণয় করা হয়েছে। যেমন প্রােটিনের এমাইনাে এসিড অনুক্রম ও নিউক্লিয়িক এসিডে পলিনিউক্লিয়ােটাইড অনুক্রম বিশ্লেষণ করে যথাক্রমে এমাইনাে এসিড আর বেসের প্রতিস্থাপন হিসেব করে মিউটেশনের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। দেখা গেছে সমগ্র জীব জগতে গড়ে ১৭.৬ মিলিয়ন বছরে একটি এমাইনাে এসিড প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

এর ভিত্তিতে হিসেব করলে দেখা যায় প্রাণী ও উদ্ভিদ একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে ৭৯২ মিলিয়ন বছর আগে। এ হিসেবটি প্রত্নতাত্ত্বিকদের হিসেবের সাথে অবিকল মিলে যায়। সরিসৃপ এবং স্তন্যপায়ীদের ‘সাইটোক্রোম সি’ অণুর মধ্যে এমাইনাে এসিডের গড় পার্থক্য থেকে হিসেব করে বের করা হয়েছে যে এ দুটি গ্রুপের পৃথক হতে সময় লেগেছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর। ঠিক একইভাবে শিম্পাঞ্জী, ওরাংওটাং ও মানুষ বিবর্তনের ধারায় কখন একে অন্য থেকে স্বতন্ত্র হয়েছে তাও খুব নির্ভরযােগ্যভাবে নির্ণয় করা হয়েছে।

ম্যাক্রোবিবর্তনের পক্ষে আরও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে রক্তরস বিজ্ঞান থেকে। রক্তকে জমাটবদ্ধ হতে দিলে যে তরল পদার্থ পৃথক হয়ে আসে তার নাম সিরাম (Serum)। এতে থাকে এন্টিজেন। এ সিরাম এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে প্রবেশ করালে উৎপন্ন হয় এন্টিবডি (Antibodies)। যেমন মানুষের সিরাম খরগােশের দেহে প্রবেশ করালে উৎপন্ন হয় এন্টি হিউম্যান সিরাম। এতে থাকে এন্টি হিউম্যান এন্টিজেন।

এ এন্টিহিউম্যান সিরাম অন্য মানুষের সিরামের সাথে মেশালে এন্টিজেন এবং এন্টিবডি বিক্রিয়া করে অধঃক্ষেপ বা তলানি উৎপন্ন হয়। এই অ্যান্টি হিউম্যান সিরাম নরবানর, পুরনাে পৃথিবীর বানর, লেমুর প্রভৃতির সিরামের সাথে বিক্রিয়া করালে দেখা যাবে, যে প্রাণীগুলাের সাথে মানুষের সম্পর্কের নৈকট্য যত বেশি তলানির পরিমাণ তত বেশি হয়। পুর্বোক্ত প্রাণীগুলাের মধ্যে বিক্রিয়ার অনুক্রম হল :

মানুষ –> নরবানর -> পুরােন পৃথিবীর বানর -> লেমুর

অঙ্গসংস্থানবিদদের মতে উল্লিখিত প্রাণীদের মধ্যে সর্বাধিক আদিম হচ্ছে লেমুর, আর সবচেয়ে নতুন প্রজাতি হচ্ছে মানুষ। তাই মানুষের ক্ষেত্রে তলানির পরিমাণ পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি আর লেমুরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম। দেখা যাচ্ছে বিবর্তন যে অনুক্রমে ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়েছে রক্তরস বিজ্ঞানের অ্যান্টিজেন এন্টিবডি বিক্রিয়াও সে ধারাবাহিকতাকেই সমর্থন করে।

এখানেই গল্পের কিন্তু শেষ নয়, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান থেকে পাওয়া বিবর্তনবাদের সমর্থনগুলাে লিপিবদ্ধ করতে গেলে মহাভারত লিখতে হবে। যেমন ধরুন UBX জিনের আবিষ্কারের পর (এডয়ার্ড লুইস এই জিনটি আবিষ্কার করে ১৯৯৫ সালে নােবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন) আমরা জানতে পারছি যে, এই জিনগুলাে দিয়ে জীবের শরীরের গঠনের পরিকল্পনা, এবং বিভিন্ন জীবের গঠনের মধ্যে পার্থক্যগুলাে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

এই UBX জিনগুলাে HOX জিনের অংশ এবং তাদেরকে স্পঞ্জ থেকে শুরু করে ফুট ফ্লাই বা স্তন্যপায়ী প্রাণী পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাণীর দেহে পাওয়া যায়। তারা ‘অন’ না ‘অফ’ হয়ে আছে তার উপর নির্ভর করছে প্রাণীর শরীরের বিভক্তিকরণ থেকে শুর করে পা, এন্টেনা বা পাখার গঠন। এই জিনগুলাের মিউটেশন থেকেই সাপ তার পা হারিয়েছে, মাছের লােব ফিন থেকে হাতের উৎপত্তি ঘটেছে বা মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে চোয়ালের বিবর্তন ঘটেছে।

এখান থেকে এখন বিবর্তনের বিভিন্ন বড় বড় ধাপের ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব, বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে ইতিমধ্যেই এমন অনেক পরীক্ষা চালিয়েছেন এবং আরও চালিয়ে যাচ্ছেন।

Drosophila-melanogaster
চিত্র : গবেষণাগারে ইউবি একস (UBX) জিনের মধ্যে হােমিওটিক মিউটেশনের সার্থক প্রয়ােগঃ দুই পাখা বিশিষ্ট Drosophila melanogaster ফ্লাই থেকে চার পাখা বিশিষ্ট ফ্লাইয়ের উৎপত্তি। (Ref. Evolution and Development, Doglas J. Futuyama, Evolution, Sinauer Associates Inc. p.475)

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ফুট ফ্লাই-এর পা এর সংখ্যা অদল বদল করে তাদের বাহ্যিক গঠন বদলে দিতে পেরেছেন। তারা আরও দেখেছেন ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে যে প্রজাতিটি থেকে ছ’ পা ওয়ালা ফুট ফ্লাইগুলাে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়েছে, তাদের দৈহিক কাঠামাে একেবারেই ভিন্ন ছিল। তাদের পেটের নীচের দিকে শুরের মত অসংখ্য পা সদৃশ উপাংগ ছিল। হােক্স জিনগুলাের প্রভাবে ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে ছয় পায়ে এসে ঠেকে।

First-Genetic-Evidence

যা হােক, হােক্স জিন আর এধরণের জেনেটিক মেকানিজম সংক্রান্ত গবেষণা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ম্যাক্রোবিবর্তনের সপক্ষে গবেষণাগার থেকেই এমন সমস্ত প্রমাণ হয়তাে আমরা পেতে শুরু করব যে ম্যাক্রো-ইভলুশন স্রেফ বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে’ – সৃষ্টিবাদীদের এ ধরনের অভিযােগগুলাে সাধারণ মানুষের কাছে নিতান্তই হাস্যকর হয়ে উঠবে।


 বিবর্তনের পথ ধরে


১০.↑  New Genome Comaprison Finds chimps, humans very similar at DNA level, 2005, NII/National Human Genome Reserach Institute, Originally published in journal ‘Nature’, September 1, 2005.

১১.↑  Benton M, 2001, Evidence of Evolutionary Transitions. Originally published in American Institute of Biological Sciences.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা