বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০২. ভৌগােলিক বিচ্ছিন্নতা

দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নানা ধরনের প্রাণীর ফসিলও চোখে পড়েছিলাে ডারউইনের। বহুদিন আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এইসব প্রাণীদের বৈশিষ্ট্যের সাথে আজকের পৃথিবীর প্রাণীদের বৈশিষ্ট্য তুলনা করে তিনি প্রজাতির স্থায়িত্ব নিয়ে আরও সন্দিহান হয়ে পড়লেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক স্তরে কেনাে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর ফসিল পাওয়া যাচ্ছে? ভুতাত্ত্বিকভাবে যেমন অপেক্ষাকৃত পুরানাে স্তরের উপরে থাকে তার চেয়ে কম পুরানাে স্তরটি, ঠিক একইভাবে যে জীব যত প্রাচীন তার ফসিলও পাওয়া যায় ততই প্রাচীন স্তরের মধ্যেই। ডারউইন লক্ষ্য করলেন, কাছাকাছি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।

প্রজাতির প্রানী বা উদ্ভিদের ফসিলগুলােকে সময়ের ধারাবাহিকতায় তৈরি একটির উপরে আরেকটি ভূতাত্ত্বিক স্তরের মধ্যেই শুধু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে কি একটি প্রজাতির থেকে কাছকাছি আরেকটি প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে নাকি এধরনের মিলগুলােকে কেবলই কাকতালীয় ঘটনা বলে ধরে নিতে হবে? কিন্তু ফসিল রেকর্ডে তাে স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে একটি প্রাণী হাজার বছর ধরে টিকে থেকে একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কোন স্তরেই তার আর কোন ফসিল পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু ঠিক তার উপরের স্তরেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে খুবই সাদৃশ্যপুর্ণ আরেকটা নতুন ধরনের প্রজাতি।

শুধু দেড়শাে বছর আগে ডারউইনের সময়ই নয়, একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসেও এখন পর্যন্ঠ এমন একটি ফসিল পাওয়া যায়নি যা কিনা এই নিয়মের বাইরে পড়েছে। কয়েকদিন আগে, ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে বিবর্তনের বিপক্ষ শক্তির প্রচারনাকে খণ্ডন করতে গিয়ে আজকের দিনের বিখ্যাত বিবর্তনবাদী প্রফেসর রিচার্ড ডকিনস বলছেন, “.. And far telling – not a single authentic fossil has ever been found in the ‘wrong’ place in the evolutionary sequence. Such an anachronistic fossil, if one were ever unearthed, would blow evolution out of the water..” [৭]

একটি বহুল আলােচিত উদাহরণ দেওয়া যাক এ প্রসঙ্গে। উত্তর আমেরিকায় এক্কেবারে নীচের দিকের প্রাচীন স্তরে (প্রায় ৫ কোটি বছর আগের) পাওয়া গেছে খানিকটা ঘােড়ার মত দেখতে Hyracotherium নামক একটি প্রাণী, তারপর বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন সময়ে পাওয়া গেছে Orohippus , Epihippus , Mesohippus , Hipparion, Pliohippus এবং আরও অনেক ধরনের মাঝামাঝি ধরনের ঘােড়ার | ফসিল। কিন্তু প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে এদের একটি প্রজাতি ছাড়া বাকি সবাই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং এর থেকেই পরবর্তীতে উৎপত্তি হয় আজকের যুগের আধুনিক ঘােড়ার বিভিন্ন প্রজাতি।

ভৌগােলিক বিচ্ছিন্নতা
চিত্র ২.৪: ঘােড়ার বিবর্তনের বিভিন্ন স্তর

ডারউইনের সময় এতাে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্তরের ফসিল পাওয়া না গেলেও তিনি এর পিছনের সম্ভাব্য কারণটি ঠিকই খুঁজে বের করতে পেরেছিলেন।

তিনি এ ধরনের উদাহরণগুলাে থেকে ক্রমশঃ সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে থাকেন যে, ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত প্রজাতিরা বিবর্তনের মাধ্যমে একে অন্যকে প্রতিস্থাপিত করেছে। তিনি বলেন, “সমস্ত ফসিলকে দুভাগে ভাগ করা যায়, হয় তারা বর্তমান কোন গােষ্ঠীর মধ্যে পড়বে, নয় তাে তাদের জায়গা হবে দুটি গােষ্ঠির মধ্যের কোন জায়গায়”।

এই মুহুর্তে ফসিল রেকর্ড নিয়ে আর বিস্তারিত আলােচনায় যাচ্ছি না, বিবর্তন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ফসিল রেকর্ডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে, তাই পরবর্তী অধ্যায়গুলােতে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিতভাবে আলােচনা করা হয়েছে।

ভৌগােলিক বিচ্ছিন্নতার সাথে বিভিন্ন প্রজাতির মিল বা আমিলের কি কোন সম্পর্ক রয়েছে? পরবর্তীকালে ডারউইন বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং তার সংগৃহীত অসংখ্য জীবিত এবং ফসিলের নমুনা থেকে উপলব্ধি করেন যে, ভৌগােলিক বিচ্ছিন্নতার সাথে বিভিন্ন প্রজাতির সাদৃশ্য বা অসাদৃশ্যের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বললেন,

দুটি এলাকা যদি দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাদের মাঝে মহাসমুদ, খুব উচু পর্বতশ্রেনী বা এধরনের অন্য কোন প্রতিকুল বাঁধা থাকে যা অতিক্রম করে প্রাণীরা অন্য দিকে পৌঁছতে পারবে না, তাহলে তাদের স্মৃনিীয় জীবজন্তু, গাছপালাগুলাে সম্বভাবে বিবর্তিত হতে শুরু করবে এবং এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ক্রমাগতভাবে চলতে চলতে দীর্ঘকাল পর দেখা যাবে যে, এই দুই অঞ্চলের প্রাণীদের অনেকেই অন্যরকম প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে। আবার যে অঞ্চলগুলাের মধ্যে এ ধরনের কোন বাধার দেওয়াল নেই, সেখানে বিস্তীর্ণ অঞ্চল বা সমস্ত এলাকা জুড়েই একই ধরনের জীব দেখা যাবে [৮]

এ প্রসঙ্গে দুটি মজার উদাহরণ দেওয়ার লােভ সামলাতে পারছি না। আমরা সাধারণত মারসুপিয়াল (ক্যাঙ্গারু, কোয়ালা,ইত্যাদি প্রাণী) জাতীয় প্রাণীর বাসস্থান বলতে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশকেই বুঝি। কিন্তু শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, দক্ষিণ আমেরিকায় আজও গুটিকয়েক মারসুপিয়াল জাতীয় প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়। এর কারণ কি? কারণ আর কিছুই নয়, একসময় দক্ষিণ আমেরিকা আন্টারটিকার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার সাথে সংযুক্ত ছিলাে, তখন সেখান থেকে মারসুপিয়াল জাতীয় প্রাণীগুলাে আন্টারটিকা হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছায়। তারপর দক্ষিণ আমেরিকায় কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবগুলাে মারসুপিয়াল প্রাণী বিলুপ্তির পথ ধরলেও অস্ট্রেলিয়ায় তারা আধিপত্য বিস্তার করে নেয়।

আর ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আন্টারটিকা একে অপরের থেকে সম্পূর্নভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আর তার ফলে অষ্ট্রেলিয়ায় তাদের বিবর্তন ঘটতে থাকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে, নিজস্ব গতিতে, যার ফলশ্রুতিতেই আমরা আজকে অষ্ট্রেলিয়ায় এতাে বিচিত্র প্রাণীর সমাবেশ দেখতে পাই, যার নমুনা অন্যান্য অঞ্চলে দেখা যায় না বললেই চলে। আর অন্যদিকে, বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে অ্যান্টারটিকা মহাদেশের পরিবেশ ক্রমাগতভাবে খুব বেশী ঠান্ডা হয়ে যাওয়ায় সেখানকার সব স্তন্যপায়ী প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়।

আবার ঠিক এর বিপরীত ঘটনা ঘটতে দেখা যায় ঘােড়ার ইতিহাসের ক্ষেত্রে। আমরা ফসিল রেকর্ড থেকে আগেই দেখেছি যে, উত্তর আমেরিকায় প্রথম ঘােড়ার পুর্বপুরুষের উদ্ভব ঘটে। যখন উত্তর আমেরিকা, প্রায় ২০-৩০ লক্ষ বছর আগে, তার উত্তরপশ্চিম দিক থেকে রাশিয়ার মাধ্যমে এশিয়া মহাদেশের সাথে সংযুক্ত ছিলাে তখন আধুনিক ঘােড়ার একটা অংশ এশিয়া হয়ে ইউরােপ এবং আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, এবং পরবর্তীতে এই মহাদেশগুলাের সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। একসময়, উত্তর আমেরিকার সাথে এশিয়ার সংযােগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন কারণে ১০-১৫ হাজার বছর আগে উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ঘােড়াও সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কিন্তু পনেরশাে শতাব্দীতে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর আবার নতুন করে ইউরােপ থেকে আমেরিকায় ঘােড়ার আমদানী করা হয়। ডারউইন এপ্রসঙ্গে বলেছিলেন যে স্তন্যপায়ীদের ইতিহাসে নিশ্চয়ই এটি একটি চমৎকার ঘটনা, দক্ষিণ আমেরিকাতে তার নিজস্ব ঘােড়া ছিলাে, তা বিলুপ্ত হয়ে গেলাে, কিন্তু বহুকাল পরে স্পেনীয়দের আনা কয়েকটি ঘােড়ার বংশধর তাদের স্থান দখল করে নিলাে[১]। এই ভাবেই ভৌগলিকভাবে সংযুক্ত এলাকাগুলাের বিস্তীর্ন অঞ্চল জুড়ে একই প্রজাতির প্রাণী বা উদ্ভিদের অস্তিত্ব দেখা যায়। ঘােড়া যদি এশিয়া, ইউরােপে ছড়িয়ে না পড়তাে, বা তারা ছড়িয়ে পড়ার আগেই যদি উত্তর আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে সংযােগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতাে (যা পরবর্তীতে হয়েছে) তাহলে আজকে হয়তাে পৃথিবীর বুকে আর ঘােড়ার অস্তিত্বই থাকতাে না!

বিবর্তন প্রক্রিয়া যদি সত্যিই প্রকৃতিতে কাজ করে থাকে তবে যে প্রাণী যত পরে অন্য প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে, তার সাথে তার ঠিক আগের পুর্বপুরুষের শারীরিক পার্থক্য ততই কম হবে বলে আশা করা যায়। এ ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছে। বিভিন্ন প্রাণীর শারীরিক গঠনের মধ্যে এই সাদৃশ্য দেখেও ডারউইন বিস্মিত না হয়ে পারেন নি। বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রাণীর সামনের হাত বা অগ্রপদের মধ্যে কি অস্বাভাবিক মিলই না দেখা যায়! ব্যাঙ, কুমীর, পাখি, বাদুর, ঘােড়া, গরু, তিমি মাছ এবং মানুষের অগ্রপদের গঠন প্রায় একই রকম।

এখন আমরা আধুনিক জেনেটিক্স-এর জ্ঞান থেকেও জানতে পারছি যে, এরকম বিভিন্ন প্রাণীর ডিএনএর মধ্যেও লক্ষ্যণীয় মিল দেখা যায়। ডারউইনের সময় বিজ্ঞানীদের ডিএনএ-এর গঠন বা জেনেটিক্স সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলাে না, তিনি প্রাণীদের মধ্যে শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য দেখে অবাক হয়ে লেখেন, “হাত দিয়ে মানুষ কোন কিছু ধরে, আর ছুঁচো তা দিয়ে মাটি খুঁড়ে। ঘােড়ার পা, শুশুকের প্যাডেল ও বাদুরের পাখার কাজ ভিন্ন। অথচ এদের সবার হাত বা অগ্রপদের গঠন শুধু একই প্যাটনেরই নয়, তুলনামুলকভাবে একই জায়গায় আছে একই নামের অস্থিগুলাে … এর থেকে অদ্ভুত আর কি হতে পারে?[১]

বিবর্তনের আরেকটি বেশ গুরুত্বপুর্ণ সাক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে এখনও বিদ্যমান বিলুপ্তপ্রায় (Vestigeal Organs) এবং অপ্রয়ােজনীয় অংগগুলাে। তিমি মাছের সমুদ্রে বাস করার জন্য পায়ের দরকার নেই, কিন্তু এখনও পিছনের পায়ের হাড় গুলাে কেনাে রয়ে গেছে তার? সাপের পাঁচ পা হয়তাে দেখা যায় না, কিন্তু কিছু সাপের শরীরে কেনাে এখনও রয়ে গেছে পায়ের হাড়ের অংশগুলাে? উড়তে পারে না এমন অনেক পাখি, পােকা বা আরশােলার পাখা রয়ে গেছে। মানুষের তাে লেজ থাকার কথা নয়,

bone1
চিত্র ২.৫ : বিভিন্ন প্রাণীর অগ্রপদের হাড়ের মধ্যে সাদৃশ্য

তাহলে লেজের হাড়ের অংশগুলাে কি করছে আমাদের শরীরে? এ্যপেনডিক্সের প্রয়ােজন ঘাসসহ বিভিন্ন ধরনের সেলুলােজ-সমৃদ্ধ খাওয়া হজম করার জন্য, মানুষ তাে ঘাস খায় না, তাহলে এ অংগটির কি প্রয়ােজন ছিল আমাদের? তারপরে ধরুন, আক্কেল দাঁত বা ছেলেদের শরীরের স্তনবৃন্ত – এগুলােরই বা কি দরকার? প্রকৃতিতে এমন ধরনের উদাহরণের কোন শেষ নেই – বােঝাই যাচ্ছে যে,

এই বিলুপ্তপ্রায় অংগগুলাে একসময় পূর্বপুরুষদের কাজে লাগলেও, এখন বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তিত প্রাণীদের দেহে এরা আর কোন কাজে আসে না।

তবে ডারউইন দীর্ঘকাল ধরে অব্যবহারের ফলে এই অংগগুলাে একসময় ছােট এবং অকেজো হয়ে পড়ে বলে যে ধারণা করেছিলেন পরবর্তীতে বংশগতিবিদ্যার জ্ঞানের আলােকে তা ভুল বলে প্রমাণিত হয়। ডারউইনের সময় জেনেটিক্স বা বংশগতি সম্পর্কে তার নিজের এবং সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের কোন ধারণা ছিল না, তার ফলে তিনি কয়েকটি ব্যাপারে সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে বিবর্তন সম্পর্কে তার মুল ধারণার সবগুলিই প্রায় সঠিক ছিলাে। বিখ্যাত ফসিলবিদ Stephen Jay Gould এর ভাষায়, “Odd arrangements and funny solutions are the proof of evolution-paths that a sensible God would never tread but that a natural process, constrained by history follows perforce” (Gould 1980; Gould in Pennock 2001, 670).

এ ধরনের হাজারাে উদাহরণ টেনে ডারউইন প্রমাণ করেন যে, এগুলাে থেকে একদিকে যেমন বােঝা যায় আমাদের চারদিকের সৃষ্টিগুলােতে কি পরিমান খুঁত রয়ে গেছে, অন্যদিকে এটাও প্রমাণিত হয় যে আমাদেরকে আলাদা আলাদা করে কোন সৃষ্টিকর্তার হাতে যত্ন করে সৃষ্টি করা হয়নি, আমরা এসেছি কোন না কোন পুর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়ে। তিনি তার প্রজাতির উৎপত্তি’ বইটিতে এতাে রকমের উদাহরণ দিয়ে তার বিবর্তনের তত্ত্ব প্রমাণ করেছিলেন যে আজও তা বিস্ময়কর বলেই মনে হয়।

বিবর্তনের মাধ্যমেই জীবের পরিবর্তন হতে হতে একসময় নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হচ্ছে, আর এই বিরামহীন পরিবর্তনই কাজ করে চলেছে আমাদের বেঁচে থাকার চাবিকাঠি হিসেবে। ডারউইন তার সময়ের থেকে এতখানিই অগ্রগামী ছিলেন যে, তার মতবাদকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে আমাদের আরও অনেকগুলাে দশক পার করে দিতে হয়েছিলাে। বিজ্ঞান যতই এগিয়েছে ততই গভীরভাবে প্রমাণিত হয়েছে তার তত্ত্বের যথার্থতা।

আমরা আগেই দেখেছি যে, ডারউইন বীগন্ জাহাজে ওঠার সময় জীবের স্থিতিশীলতার তত্ত্বে বিশ্বাসী একজন প্রকৃতিবিদ ছিলেন, পাঁচ বছর ধরে তিনি যতই বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরলেন, খুব কাছ থেকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি দিয়ে চারদিকের প্রকৃতিকে দেখলেন ততই তার সন্দেহ বাড়তে লাগলাে। আর তারই ফলশ্রুতিই আমরা পরবর্তীতে পেলাম জীবের বিবর্তনের মতবাদ। বীগল যাত্রা থেকে ফিরে আসার সময়ই তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে সন্দেহ করতে শুরু করেন যে, জীবজগৎ স্থির নয়, বিবর্তনের ফলে এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির উৎপত্তি হয়ে আসছে অনাদিকাল থেকেই। কিন্তু তিনি খুব ভালাে ভাবেই জানতেন যে,  একথা আরও কয়েকজন প্রকৃতিবিদও বলেছেন তার আগে – তাদের সেই মতবাদ আদৌ ধােপে টেকেনি।

তাই তিনি ১৮৩৬ সালে ইংল্যন্ডে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, বিবর্তনের ধারণাটি শুধু প্রকাশ করলেই হবে না, কিভাবে ঘটে তা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে না পারলে তার মতবাদকেও অন্যদের মতই ইতিহাসের আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে। ঠিক করলেন, গােপনে তার কাজ চালিয়ে যাবেন – আর তারপরই শুরু হলাে সেই দীর্ঘ যাত্রা, প্রায় ২০ বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন তা শুধু ১৮৫৮ সালেই পৃথিবী জুড়ে হইচই ফেলে দেইনি আজও তার জের চলছে পুরােদমেই। আর এই ২০ বছরের সাধনার ফল থেকেই আমরা পেলাম ডারউইনের সেই যুগান্তকারী প্রস্তাব – প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেই ঘটে চলেছে প্রাণের বিবর্তন।


 বিবর্তনের পথ ধরে


১.↑    আখতারজ্জামান,ম, ২০০২, বিবর্তনবাদ, হাসান বুক হাউস, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃঃ ১৩-১৬।
৭.↑   One side can be wrong , Richard Dawkins and Jerry Coyne, The Guardian ↑
৮.↑    সুশান্ত মজুমদার, ২০০৩, চার্লস ডারউইন এবং বিবর্তনবাদ, প্রকাশকঃ সােমনাথ বল, কোলকাতা, ইন্ডিয়া।

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা