মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ

০২. ফার্মির গােলকধাঁধা : তারা সবাই কোথায়?

ড্রেকের আগেও অনেকেই মহাজাগতিক সভ্যতার অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম একজন হচ্ছেন বিখ্যাত পদার্থিবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি (Enrico Fermi)।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময় ফার্মি কাটিয়েছেন লস অ্যালামস-এ ম্যানহাটন প্রজেক্টে পারমানবিক বােমা তৈরিতে সাহায্য করার জন্য। তবে সব খারাপ দিকেরই আবার দু’ একটি ভাল দিক থাকে। মানব বিধ্বংসী এই প্রজেক্টের সবচেয়ে আলােকিত’ দিক ছিল যে, সভ্যতার কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেশ কিছু সংখ্যক অসম্ভব প্রতিভাবান বিজ্ঞানী বেশ কিছুটা অবসর সময় পেয়েছিলেন। এই অবসর সময়কে তারা কাজে লাগিয়েছেন জ্ঞানগর্ভ আলােচনায়। এরকমই এক আলােচনায় লাঞ্চ টেবিলে ফার্মি যুগান্তকারী এক মন্তব্য করেন যা নিয়ে এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক মহলে আলােচনার কমতি নেই।

ফার্মি চিন্তা করে দেখলেন যে, আমাদের এই মহাবিশ্বে যদি অসংখ্য সভ্যতা থাকে তাদের অনেকেরই হাজারখানেক বছরের মধ্যেই আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিভ্রমণে পারদর্শী হয়ে উঠবার কথা। আলাের গতিতে না চলুক, তার চেয়ে অনেক কম গতিসম্পন্ন (যেমন, আলাের বেগের এক থেকে দশ শতাংশ বেগে) যানবাহনে করেই এই আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণ সম্ভব। আর সেক্ষেত্রে আরাে বেশী কারিগরী জ্ঞান সম্পন্ন যে কোন সভ্যতারই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পুরাে গ্যালাক্সী দখল করে নেওয়ার কথা।

৩৭.৫ লক্ষ বছরের মধ্যেই প্রতিটি নক্ষত্রজগত সেই সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে যাওয়ার কথা (চিত্র ৮.৩)। কিন্তু আমাদের চারপাশে এ ঘটনার কোন প্রমাণ আমরা দেখতে পাইনা। ফলে অবশ্যম্ভাবীভাবেই ফার্মি প্রশ্ন ছুড়ে দেন যে, তারা কোথায়? (Where are they?) এটাই ফার্মি প্যারাডক্স (Fermi Paradox) বা ফার্মির গােলকধাঁধা নামে বিখ্যাত।

ফার্মির গােলকধাঁধা

ফার্মির গােলকধাঁধার প্রত্যুত্তর হিসেবে এখন পর্যন্ত অসংখ্য সমাধান প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন, ইংল্যান্ডের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিফেন ওয়েব নিজেই গােটা পঞ্চাশেক সমাধানকে আলােচনায় এনেছেন (Webb, 2002)। স্থান সঙ্কুলানের অভাবে এর সবগুলাে নিয়ে আলােচনা সম্ভব নয়। আমরা প্রধান কয়েকটি নিয়ে এখানে আলােচনা করবাে।

হয়ত মহাজাগতিক সভ্যতা বলে কিছু নেই

ফার্মি প্যারাডক্সের সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হচ্ছে যে, এই মহাবিশ্বে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। বুদ্ধিমান প্রাণিসত্তা এই মহাবিশ্বে কেন অপ্রতুল বা স্বল্পস্থায়ী যে বিষয়ে বেশ কিছু তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে এক্ষেত্রে।

যারা বিশ্বাস করেন যে, আমরা ছাড়া অন্য কোন বুদ্ধিমান প্রাণী এই মহাবিশ্বে নেই, তারা যুক্তি দেন যে প্রাণের জন্য প্রয়ােজনীয় পরিবেশ বা জটিল জীবন উদ্ভব খুবই দুর্লভ বা বলা যেতে পারে পৃথিবীতেই শুধুমাত্র ঘটেছে। একে বলা হয় ‘বিরল পৃথিবী অনুকল্প’ (Rare Earth Hypothesis)। পৃথিবীতে প্রাণ বিকাশের সুদীর্ঘ ইতিহাসে মাত্র একটাই প্রজাতি মহাকাশযান কিংবা বেতার প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিষয়টিকে সামনে। এনে এর প্রবক্তারা যুক্তি দেন যে প্রযুক্তিগত সভ্যতা মহাবিশ্বে বিরল হতে বাধ্য।

এ বিষয়ে অন্য একটি যুক্তি হচ্ছে যে, মহাবিশ্বে প্রাণ বিকাশের পরিবেশ হয়তাে সর্বত্রই বিদ্যমান, কিন্তু জীবন তৈরি হওয়া, জটিল অণুসমুহের একই সাথে সমপ্রতিরূপ তৈরি করা, এমনভাবে শক্তি গ্রহণ করা যাতে রাসায়নিক বিক্রিয়াসমূহ ঘটানাে সম্ভব ইত্যাকার বিষয় সমূহ প্রাণের জন্য প্রাক-পরিবেশ বিদ্যমানকারী গ্রহে নাও ঘটতে পারে।

অন্য একটি সম্ভাবনা হচ্ছে, প্রাণ হয়তাে প্রতি মুহূর্তেই মহাবিশ্বের সর্বত্র তৈরি হচ্ছে, কিন্তু বরফ যুগ বা অন্য কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ জটিল প্রাণ বিকাশে বাঁধা দিচ্ছে। প্রাণ বিকাশের পরিবেশ পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিকার না হলেও এই সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতি মুহূর্তে ঘটে সেই সমস্ত গ্রহে প্রাণকে ধ্বংস করে দিয়েছে বা দিচ্ছে।

মহাজাগতিক সভ্যতা আছে তবে….

প্রযুক্তিগত সভ্যতা হয়তাে এই মহাবিশ্বে আছে তবে তারা এতাে দূরে যে কার্যকর কোন যােগাযােগ তাদের সাথে গড়ে তােলা সম্ভব নয়। দু’টো সভ্যতা যদি কয়েক হাজার আলােকবর্ষ দূরে অবস্থিত হয় তবে এটা খুবই সম্ভব যে, তারা পরস্পরের সাথে যােগাযােগ করার আগেই নিজেরাই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। মানবীয় অনুসন্ধানে তাদেরকে হয়তাে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে তবে দূরত্বের কারণে যােগাযােগ করাটা আসলেই অসম্ভব হয়ে থাকবে।

অন্য একটি সম্ভাবনা হচ্ছে যে যেহেতু আন্তঃনক্ষত্রিক পরিভ্রমণ খুবই ব্যয়বহুল কাজেই কোন মহাজাগতিক সভ্যতাই উপনিবেশ তৈরির ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয়। আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণ প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব, এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই মহাজাগতিক সভ্যতার বিভিন্ন নক্ষত্রজগতে উপনিবেশ তৈরির অনুমানসমূহ গড়ে উঠেছে। যদিও পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান সূত্রসমূহ আলাের চেয়ে গতিশীল কোন মহাকাশযানের সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়, কিন্তু এর চেয়ে কম গতিশীল নভােযান পদার্থবিজ্ঞানের কোন সূত্রকেই লংঘন না করে তৈরি করা সম্ভব। অবশ্য এটা সম্ভব যে, আমাদের বর্তমান বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আন্তঃনাক্ষত্রিক উপনিবেশ গড়ার সম্ভাবনা এবং ব্যয় সম্পর্কে এখনাে পর্যাপ্ত নয়।

১৯৩৭ সালে বেতার টেলিস্কোপ আবিষ্কারকে বিভক্তি রেখা হিসাবে ধরলে মানুষের বহির্জাগতিক সভ্যতার অস্তিত্ব সনাক্ত করার সময়সীমা কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। ভূতাত্ত্বিকভাবেও এই পৃথিবীতে মানুষের আগমন খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের উদ্ভব ঘটেছে দুই লাখ বছর আগে। মাত্র দুই লাখ বছর মহাজাগতিক সময়ের মাপকাঠিতে একেবারেই নগণ্য। কাজেই এটা সম্ভব যে মানুষ খুব বেশি দিন আগে থেকে অনুসন্ধান শুরু করে নি এবং মহাজাগতিক সভ্যতার নজরে পড়ার মতাে খুব বেশি দিন। আগেও এই ধরায় আগমন ঘটেনি।

কৃত্রিম বেতার তরঙ্গ পৃথিবী থেকে বিচ্ছুরিত হওয়া শুরু হয়েছে ১৮৯৫ সালে পপভ (Popov), মার্কনি (Markoni) এবং টেসলা (Tesla) প্রথম বেতার সম্প্রচার শুরু করার পর থেকে। এর মানে হচ্ছে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৫ আলােকবর্ষ দূরের কোন সভ্যতার পক্ষেই শুধুমাত্র পৃথিবী থেকে পাঠানাে বেতার সঙ্কেত রিসিভ করে আবার প্রতি উত্তর পাঠানাে সম্ভব। অথবা এমনও হতে পারে প্রথম দিকের সঙ্কেতগুলাে এতােই দূর্বল ছিল যে সেগুলােকে সনাক্ত করাও সম্ভব নয়।

১৯৫৭ সালের পর থেকে মহাকাশ যুগ শুরু হওয়ার পর থেকে যে বেতার সঙ্কেতগুলাে পাঠানাে হয়েছে সেগুলাে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল বিধায় সনাক্ত করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে মাত্র ২৪ আলােকবর্ষ দূরের মহাজাগতিক সভ্যতাই মানুষের যােগাযােগের আওতায় আছে। সময়ের সাথে সাথে এই যােগাযােগের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। কিংবা এমন হতে পারে আমাদের গ্রাহক যন্ত্রপাতিই যথেষ্ট উন্নত নয় বিধায় আমরা তাদের সঙ্কেত গ্রহণ করতে পারছি না।

পৃথিবীকে ইচ্ছা করেই বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে (The Zoo Hypothesis)

মহাজাগতিক সভ্যতা মানুষের সাথে যােগাযােগ করবে এই বিশ্বাস একধরনের ভ্রমাত্মক যুক্তি বা হেত্বাভাস (Fallacy) হতে পারে। যােগাযােগের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মহাজাগতিক সভ্যতা যােগাযােগের জন্য ইচ্ছুক নাও হতে পারে। মহাজাগতিক উন্নত সভ্যতা হয়তাে তাদের গবেষণার জন্য আমাদেরকে চিড়িয়াখানার মত আলাদা করে রেখেছে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধার্থে।

কিংবা তারা হয়ত কোন গ্যালাক্টিক আইন মেনে চলে যা পৃথিবীতে বা অন্য কোন গ্রহে উদ্ভূত প্রাণের স্বাধীন বিকাশকে বাঁধাগ্রস্থ করার বিরুদ্ধে। এটা নীতিগত (মানব সভ্যতাকে স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য) বা কৌশলগত (মহাজাগতিক সভ্যতা হয়তাে চিহ্নিত হতে চায় না অন্য কোন সভ্যতার দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার ভয়ে) কারণে হতে পারে।

যদি পৃথিবী থেকে যােগাযােগের সীমানায় একটি মাত্র সভ্যতা থাকে বা সমভাবাপন্ন সভ্যতাসমূহ থাকে অথবা যদি এমন কোন আইন বিভিন্ন সভ্যতাসমূহের মধ্যে থাকে যে পৃথিবীকে আলাদা করে রাখবে সেক্ষত্রেই ‘জু হাইপােথেসিস’ বেশ কার্যকর। কিন্তু যদি এই মহাবিশ্বে একাধিক মহাজাগতিক সভ্যতা থেকে থাকে তবে এই অনুকল্পকে পুরােপুরি ব্যর্থ বলা যেতে পারে।

মহাজাগতিক অন্তরীণ অনুকল্প (Cosmic Quarantine Hypothesis)

১৯৮১ সালে ফার্মি প্যারাডক্সের সমাধান হিসাবে মহাকাশ বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড হ্যারিসন (Edward Harrision) শক্তিশালী আত্ম-নিয়ন্ত্রণ মেকানিজমের কথা উল্লেখ করেন। অন্য গ্রহে ব্যাপক উপনিবেশ গড়ে তােলার আগ্রহী সভ্যতা অঞ্চল বৃদ্ধিকারক তাড়না দিয়ে তাড়িত হবে। কিন্তু আন্তঃনক্ষত্রিক পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য যে বিপুল পরিমান প্রযুক্তিগত ক্ষমতার প্রয়ােজন তা এই আগ্রাসী আচরণকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। ফলশ্রুতিতে, ভিন্ন নক্ষত্রে পৌঁছানাের অনেক আগেই ওই ধরনের সভ্যতা নিজেদেরকে ধ্বংস করে তুলবে।

অদম্য অঞ্চল বিকাশের তাড়না যা একসময় লক্ষ লক্ষ বছরের জৈবিক বিবর্তনবাদে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, সেটাই একসময় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রজাতির উপর যখন কোন প্রজাতি তার আত্ম-ধংসের চেয়ে বেশি ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে। মিল্কিওয়ে ছায়াপথে হয়তাে আমাদের চেয়েও অনেক বুদ্ধিমান সভ্যতা থাকতে পারে, কিন্তু তাদেরকেও অবশ্যই আমাদের মতাে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকুনির মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে।

তারপরও, ধরা যাক কোন একটা সভ্যতা আত্ম-ধ্বংস এড়িয়ে উপনিবেশ গঠন শুরু করে দিল। সেক্ষেত্রে সমস্ত সৌরজগতে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উপনিবেশ ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু হ্যারিসন আত্ম-নিয়ন্ত্রনের মেকানিজম ব্যর্থ হলেও অন্য একটা মেকানিজম এর কথা উল্লেখ করেছেন যা এই ক্ষেত্রে কাজ করতে এগিয়ে আসবে। হ্যারিসন মতে, এ ধরনের কোন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বিকশিত সভ্যতা তা খেয়াল করবে এবং এ ধরনের প্রচেষ্টাকে অংকুরেই বিনষ্ট করে দেবে।

উড়ন্ত চাকী (UFO)

উপরের অনুকল্পগুলাে ছাড়াও ফার্মির গােলক ধাঁধার আরাে অনেক সমাধান থাকতে পারে। ‘তারা সবাই কোথায়? ফার্মির এ প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর অনেকে ভাবেন বিভিন্ন সময় আকাশে দেখা ওই রহস্যময় উড়ন্ত চাকী বা ইউএফও (UFO) গুলােকে। সাধারণ মানুষ কল্পণাপ্রবণ : তারা ভাবেন মহাজাগতিক প্রাণীরা আমাদের পর্যবেক্ষণ করার জন্য নিয়ম করে পৃথিবীর আকাশে চক্কর খাচ্ছে! উড়ন্ত চাকী বা ইউএফওগুলাে তারই নমুনা। ইউএফও গুলােকে আকাশে দেখেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, অনেকে আবার এমন দাবীও করেছেন যে, তাদের কাউকে কাউকে মহাজাগতিক প্রাণীরা করায়ত্ব করে তাদের মহাকাশযানে পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরিক্ষায় অধিকাংশ দাবীগুলােরই অসারতা প্রমাণিত হয়। এর পেছনে কারণ হিসেবে মহাকাশ সম্পর্কে অজ্ঞতা, মতিভ্রম, প্রচারের আলােয় আসার প্রবণতা, গন-সম্মােহন, হ্যালুশিনেশন কিংবা স্রেফ মিথ্যাচার বা জোচ্চুরীকে উল্লেখ করা যায়।

আকাশের যে সব বস্তুকে উড়ন্ত চাকী ভেবে প্রায়শঃই ভুল করা হয় সেগুলাের একটি তালিকা করেছিলেন আমেরিকার জ্যোতির্বিদ ডােনাল্ড মেনজেল; তাদের মধ্যে আছে :

বিচিত্র চেহারার বিমান, অস্বাভাবিক আবহাওয়ায় দুর্ঘটনা কবলিত বিমান, কৃত্রিম উপগ্রহ, পাখির ঝাঁক, মেঘের স্তর থেকে প্রতিফলিত সার্চ লাইটের আলাে, উজ্জ্বল কোন বস্তু থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলাে, প্রতিভ প্রাণীদেহ, উল্কা, শুক্রের মত উজ্জ্বল গ্রহ, উজ্জ্বল নক্ষত্র, মেরুজ্যোতি এবং আরাে কিছু বস্তু।

কোলােরাডাে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের প্রধান এডওয়ার্ড ইউ কনডন ২১ বছর ধরে এউএফও’র উপর গবেষণা করে যে রিপাের্ট দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে :

২১ বছরের গবেষণায় এমন কিছুই বেরিয়ে আসেনি যা আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে ত্বরান্বিত করেছে। ভবিষ্যতের আরাে গবেষণাও যে কোন আলাে দেখাবে তারও কোন সম্ভাবনা নেই। আমেরিকার বিমান বাহিনীর ‘প্রােজেক্ট ব্লু বুক’ রিপাের্টে বলা হয়েছে – ‘আমাদের ২২ বছরের অনুসন্ধানে ইউএফও সংক্রান্ত রিপাের্টগুলাের একটিকেও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ মনে হয়নি

তারপরেও কিন্তু মানুষের প্রত্যাশা কখনই থমকে থাকে নি, সেজন্যই কার্ল স্যাগান আর ড্রেকের মত স্বাপ্লিকেরা গবেষণা চলিয়ে গেছেন বহির্জাগতিক প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণের প্রত্যাশায়, এক আন্তঃনাক্ষত্রিক সংস্কৃতির সন্ধানে। মহাবিশ্বে প্রাণ-সন্ধানী বিজ্ঞানী ব্রু জ্যাকোস্কি মনে করেন, যে বিল্পবের সূচনা একদিন কোপার্নিকাস করেছিলেন পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়ে, আর ডারউইন এগিয়ে দিয়েছিলেন বিবর্তন তত্ত্বের মাধ্যমে মানবজাতিকে শিম্পাঞ্জীকূলের কাছাকাছি ঠেলে দিয়ে, সে অসমাপ্ত বিপ্লবই পূর্ণতা পাবে মহাবিশ্বের আর কোথাও প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেলে।

কোপার্নিকাস যেমন প্রমাণ করেছিলেন পৃথিবী কোন বিশিষ্ট গ্রহ নয়, কিংবা ডারউইন যেমন বুঝেছিলেন মানুষ ঈশ্বরের অনুগ্রহপ্রাপ্ত কোন বিশেষ সৃষ্টি’ নয়, তেমনি মহাবিশ্বের আর কোথাও প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেলে বােঝা যাবে যে, পৃথিবীতে প্রাণের অভ্যুদয়ও কোন বিশেষ ঘটনা নয়, বরং মহাজগতের বিভিন্ন এলােপাথারি ঘটনার মধ্যে ঘটে যাওয়া স্রেফ এক প্রাকৃতিক অনিবার্যতা।

কে জানে, হয়ত বিজ্ঞানীদের স্বপ্নকে সত্যি প্রমাণ করে মানব সভ্যতা একদিন পৌঁছে যাবে আন্তঃনাক্ষত্রিক সভ্যতার মিলন মেলায়, পূর্ণতা পাবে কোপার্নিকাসের ‘অসমাপ্ত বিপ্লব। কবে সেটা? কয়ক’শ কিংবা কয়েক হাজার বছরে? নাকি তারও বেশী? আমরা কেউ তা জানি না। আপনি বা আমি কেউ হয়ত বেঁচে থাকব না সে সময়, বেঁচে রবে আমাদের স্বপ্ন তখন।


 মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা/সমালোচনা