বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০২. প্লেট টেকটোনিক্স তত্ত্ব

খুব সংক্ষেপে প্লেট টেকটোনিক্স তত্ত্বটাকে ব্যাখ্যা করতে হলে, ব্যাপারটা অনেকটা এরকম দাঁড়ায় —

ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় প্লেট বলতে বিশাল সলিড শীলার পাত বা ফলককে বােঝায় আর গ্রীক শব্দ টেকটনিক্স এর অর্থ হচ্ছে ‘তৈরি করা’ অর্থাৎ পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ বিভিন্ন ধরনের প্লেট দিয়ে তৈরি। লিথােস্ফেয়ার বলে যে উপরের স্তরটা মহাদেশগুলােকে এবং সমুদ্রের নীচের ক্রাস্ট বা ভূত্বককে ধারণ করে আছে, তা আসলে ৮টি প্রধান এবং বেশ কয়েকটা আরও ছােট ছােট প্লেটের সমন্বয়ে গঠিত[৫]

এই প্লেটগুলাে অনবরত তাদের নীচের আরও ঘন এবং প্লাষ্টিকের মত স্তর  অ্যাস্থেনস্ফেয়ারের দিকে সরে যাচ্ছে। এদের এই সঞ্চালনের গতি বছরে গড়পড়তা ৫-১০ সেন্টিমিটারের মত। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের মত কঠিন একটা জিনিসের এই নিত্য গতিময়তার কারণটা কি হতে পারে? আসলে পৃথিবীর গভীরে আটকে থাকা তাপ এবং তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের কারণে অনবরত যে তাপের সৃষ্টি হচ্ছে তা থেকেই সব কিছু গলে গিয়ে তৈরি হয় গলিত শীলার ধারা বা ম্যাগমা। এই গলিত শিলাগুলাে ধীরে ধীরে মধ্য-সামুদ্রিক ভূশিরার (Mid-Ocean Ridge, নীচের ছবিতে দেখুন; আটলান্টিক মহাসমুদ্রে লম্বালম্বিভাবে এধরণের একটি রিজ রয়েছে) মধ্য দিয়ে উলটো পথে উপরের দিকে চাপ দিতে থাকে।

প্লেট টেকটোনিক্স
প্লেট টেকটনিক্স প্রক্রিয়া

এর ফলে একদিকে যেমন সমুদ্রের তলদেশ বিস্তৃত হতে শুরু করে অন্যদিকে তার ফলশ্রুতিতে মধ্য-সামুদ্রিক ভূশিরার মধ্যে ফাটল বাড়তে থাকে। এই ম্যাগমাগুলাে সমুদ্রের তলদেশ থেকে উপরে উঠে এসে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আবার নতুন ক্রাষ্ট তৈরি করে (এই ম্যাগমা থেকেই সৃষ্টি হয় ইগনিয়াস শিলাস্তর) আর তাদের দুপাশের প্লেটগুলােকে বিপরীত দিকে ঠেলতে শুরু করে। এভাবে সরতে সরতে যখন কোন দু’টো প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে তখন প্লেটগুলাের একটা আরেকটার নীচে চলে গিয়ে তাদের নীচের স্তর অ্যাস্থেনস্ফেয়ারের সাথে মিশে যেতে বাধ্য হয়।

কিন্তু ভেবে দেখুন কি বিশাল এই সংঘর্ষ, ভূপৃষ্ঠের মত কঠিন একটা জিনিসের এক স্তর আরেক স্তরের মধ্যে ঢুকে গলে যাচ্ছে। এই সংঘর্ষের চাপে যে বিভিন্ন ধরনের প্রলয়ঙ্করী ঘটনার সুত্রপাত ঘটবে তাতে আর আবাক হওয়ার কি আছে? আর এ থেকেই সৃষ্টি হয় পর্বতমালার, ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পৃথিবী, কিংবা কোন মহাদেশ ভেঙ্গে পরে। এরকম এক প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটের সংঘর্ষ থেকে জেগে উঠেছে হাওয়াই-দ্বীপপুঞ্জ। প্রায় ৮ কোটি বছর ধরে দক্ষিন দিক থেকে ক্রমাগতভাবে উত্তরের দিকে সরে আসতে থাকা ইন্ডিয়ান মহাসামুদ্রিক প্লেটের দক্ষিণ এশিয়ার সাথে সংঘর্ষের ফলেই সৃষ্টি হয়েছিলাে।

আমাদের এই বিশাল হিমালয় পর্বতমালার। প্রায় এক কোটি বছর আগে বহুদুরের আচেনা প্রতিবেশী ইন্ডিয়া মহাদেশ তার সব দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় এশিয়ার মহাদেশের সাথে । হ্যা, ঠিকই ধরেছেন- হিমালয় মহাদেশের কোন অস্তিত্বই ছিলাে না আজ থেকে কোটি বছর আগে! আমরা। যতই বলি না কেন ‘পাহাড়ের মত স্থির’ আসলে পাহাড় কোনদিনও স্থির ছিলাে না, আমাদের চারপাশের প্রকৃতি থেকে শুরু করে, পাহাড় পর্বত, মহাদেশ, মহাসমুদ্র এমনকি আমরা নিজেরাই কখনও স্থির ছিলাম না! অনবরত পরিবর্তন ঘটে চলেছে সব কিছুর। উপরের মহাদেশীয় সঞ্চরণের ছবিতেই খেয়াল করলে দেখতে পাবেন কিভাবে সময়ের সাথে সাথে পুরনাে ইন্ডিয়া মহাদেশ সরতে সরতে এসে এশিয়া মহাদেশের সাথে মিলে গিয়েছিলাে।

সে যাই হােক, চলুন আবার ফিরে যাওয়া যাক আমাদের সেই ফসিলের গল্পে। আসলে ফসিলের সাথে ভূতত্ত্ববিদ্যা এবং বিবর্তনবিদ্যার মৌলিক কিছু আবিষ্কার এত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে, তাদেরকে বাদ দিয়ে পুরো গল্পটা বলা একরকম অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। গত কয়েক শতাব্দীর বিভিন্ন ধরণের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পিছনেই ফসিল রেকর্ড অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। আবার ঠিক উল্টোভাবে ফসিলের উৎপত্তি, গঠন এবং তাদের কালনির্ণয়ের কথা জানতে হলে প্লেট টেকটোনিক্স বা মহাদেশীয় সঞ্চরন বা কার্বন ডেটিং এর মত ব্যাপারগুলাে না বুঝলেও তাে আর চলছে না, তাই ফসিলের কথা বলতে গেলেই বারবার চলে আসে ওই প্রসঙ্গগুলো।

কিন্তু এদিকে আবার সৃষ্টিতত্ত্ববাদীরা প্রায়ই আভিযােগ করে থাকেন যে, এত কম সংখ্যায় পাওয়া ফসিল দিয়ে নাকি বিবর্তনের তত্ত্ব কোনভাবেই প্রমাণিত হয় না। প্রমাণ হয় কি হয় না, সে প্রসঙ্গে না হয় একটু পরে আসছি; তবে ফসিলের অপ্রতুলতার কথাটা কিন্তু নিছক মনগড়া নয়। সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাসীদের বিশ্বাসগুলাে কল্পনাপ্রসুত হলেও তাদের এই অভিযােগটা কিন্তু বৈজ্ঞানিকই বলতে হবে। তারা ঠিকই বলেন যে ফসিলের সংখ্যা পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া বিভিন্ন প্রজাতির জীবের সংখ্যার তুলনায় সত্যিই তাে খুবই কম। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা যে, প্রায় আড়াই লাখ প্রজাতির ফসিলের সন্ধান পেয়েছেন তা অতীত এবং বর্তমানের সমস্ত জীবের শতকরা একভাগেরও প্রতিনিধিত্ব করে কিনা সন্দেহ আছে[৪]

কিন্তু এই ফসিলগুলাে আসলে কী? কিভাবেই বা মাটি বা পাথরের ভাঁজে ভাঁজে তারা সংরক্ষিত হয়ে যায়, লক্ষ কোটি বছর পরেও তারা কিভাবে প্রমাণ দিয়ে যায় সেই সময়ের জীবনের অস্তিত্বের? অতীতের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক সময়ের জীবের দেহাবশেষ বা চিহ্নগুলাে যখন পাললিক শিলার স্তরে স্তরে সংরক্ষিত হয়ে যায় তাকেই বিজ্ঞানীরা ফসিল বলেন। যদিও ফসিলে পরিণত হতে হাজার হাজার বছর লেগে যায়, ঠিক কতদিন পরে কোন জীবের দেহাবশেষকে ফসিল বলে ধরা হবে তা নিয়ে কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন ধরণের শিলা থাকলেও শুধুমাত্র পাললিক শীলার বিভিন্ন স্তরেই ফসিল তৈরি হতে পারে, ইগনিয়াস বা মেটামরফিক শীলার মধ্যে জীবদেহ ফসিল হিসেবে সংরক্ষিত হতে পারে না।

গাছের কষের মধ্যে সংরক্ষিত বিলুপ্ত একধরনের বিছার ফসিল
গাছের কষের মধ্যে সংরক্ষিত বিলুপ্ত একধরনের বিছার ফসিল

ফসিল কিভাবে তৈরি হয় তা বুঝলে হয়তাে এই সমস্যাটার অর্থপূর্ণ একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। একটা জীবের দেহের মৃত্যু বরণ করা থেকে শুরু করে তার ফসিলে পরিণত হওয়া এবং একজন বিজ্ঞানীর তা আবিষ্কার করা পর্যন্ত ধাপে ধাপে যে পদ্ধতিগুলাের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়, তা শুধু দীর্ঘই নয়, অত্যন্ত আকস্মিকও বটে। ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা এই ঘটনাগুলাে ঘটাটাই যেনাে এক অস্বাভাবিক ঘটনা! কিন্তু তারপরও আমরা কিভাবে যে হাজার হাজার ফসিলের সন্ধান পেয়েছি এবং এখনও পেয়ে যাচ্ছি তা ভেবেই অবাক না হয়ে পারা যায় না।

মৃত প্রাণীদেহের নরম অংশগুলাে খুব সহজেই পচে গলে নষ্ট হয়ে যায় বা অন্য কোন প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয়। তাই যে সব প্রাণীদের দেহে শক্ত হাড়, দাঁত, শেল বা কাঁটা নেই সেগুলাের ফসিলও খুব সহজে পাওয়া যায় না। তবে মাঝে মাঝে দু’একটা যে পাওয়া যায় না তাও কিন্তু নয়, সেগুলাে হয়তাে বিশেষ কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সংরক্ষিত হয়ে গেছে। যেমন ধরুন গাছের কষের মধ্যে বেশ কিছু পিপড়া বা পােকা মাকড়ের ফসিল পাওয়া গেছে যারা বেশ ভালােভাবেই সংরক্ষিত হয়ে ছিলাে, আবার উত্তর বা দক্ষিণ মেরুর হিমশীতল তুষারস্তুপের মধ্যে জমে গেছে এমন কিছু অতিকায় ম্যামথেরও ফসিল পাওয়া গেছে।

অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের লতাপাতা বা গাছের ফসিলগুলাে শিলাস্তরের চাপের ফলে চ্যাপ্টা হয়ে গিয়ে পাথরের উপর একধরনের প্রিন্ট বা ছাপের মত তৈরি করে। কয়লার খনিতে এরকমের প্রচুর ফসিল দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি কোন কোন সময় বিভিন্ন প্রাণীর পায়ের ছাপ বা মলও ফসিলে পরিণত হয়ে যায়। যেমন ধরুন প্রায় ৩৬ লক্ষ বছর আগে তানজেনিয়ার কোন বিস্তীর্ণ জনপদে আগ্নেয়গিরি থেকে ছড়িয়ে পড়া ভষ্মের মধ্যে হঠাৎ করে সংরক্ষিত হয়ে যাওয়া Australopithecus afarensis প্রজাতির পায়ের ছাপগুলাে এখনও আমাদের পূর্বপুরুষের দু’পায়ে চলে বেড়ানাের সাক্ষ্যবহন করে চলেছে।

জুরাসিক পিরিয়ডের (২০০ মিলিয়ন বছর আগের) ডাইনােসর এর পায়ের ছাপের ফসিল।
জুরাসিক পিরিয়ডের (২০০ মিলিয়ন বছর আগের) ডাইনােসর এর পায়ের ছাপের ফসিল।
প্রায় ৩৬ লক্ষ বছর আগের মানুষের পূর্বপুরুষ প্রজাতি Australopithecus afarensis এর পায়ের ছাপ।
প্রায় ৩৬ লক্ষ বছর আগের মানুষের পূর্বপুরুষ প্রজাতি Australopithecus afarensis এর পায়ের ছাপ।

ফসিল হয়ে যাওয়া মল বা বিষ্ঠা থেকেও আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারি, যেমন কি ধরণের খাদ্য খেতাে তারা, সেই অঞ্চলে কি ধরণের গাছপালা বা পশু পাখি জন্ম নিত সে সময়ে, সেই রকমের গাছপালার জন্য কি রকম জলবায়ুর প্রয়ােজন, ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সাধারণত প্রাণী বা উদ্ভিদের এই নরম অংশগুলাে নয়, বরং দাঁত, হাড়, শক্ত খােলস বা শেল, শক্ত বীজ বা বীজগুটি জাতীয় অংশগুলােই ফসিলে পরিণত হয়। কিন্তু এই শক্ত অংশগুলাের ফসিল হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশী থাকলেও তাদের বেশীরভাগই তাে পাথরের চাপে, শক্ত কিছুর আঘাতে বা পানির স্রোতের ঘষায় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে ভেঙ্গেচুড়ে একাকার হয়ে যায়!

এ তাে না হয় গেলাে জীবের দেহের কোন অংশ ফসিল হতে পারবে আর কোন অংশ পারবে না তার বর্ণনা। কিন্তু সমস্যার তাে আর এখানেই শেষ নয়, বরং যেনাে অনেকটা শুরুই বলা চলে। ফসিল তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ার মাঝেও যেনাে লুকিয়ে রয়েছে একের পর এক আকস্মিকতার বেড়াজাল ডিঙোনাের প্রতিযােগীতা! একটা জীবের দেহকে ফসিল হিসেবে সংরক্ষিত হতে হলে ধাপে ধাপে কতগুলাে বিশেষ অবস্থা এবং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পলি মাটির দেশের মানুষ হওয়ার কারণে আমরা সবাই হয়তাে জানি পলি বলতে কি বােঝায়।

পানি বা বাতাসের ফলে বড় বড় শীলা ক্ষয় হয়ে হয়ে ছােট ছােট কণায় পরিণত হয়ে পলি মাটির সৃষ্টি করে। এর বিভিন্ন অংশ, বালু, মাটি, কাঁদা ইত্যাদি ধীরে ধীরে জমতে থাকে এবং কালের বিস্তৃতিতে এক সময় পাললিক শীলায় পরিণত হয়। আর শুধুমাত্র এই পাললিক শিলার মধ্যেই ফসিলের সংরক্ষণ ঘটতে পারে, তাই পলি অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গাগুলােতে বাস করা জীবদের দেহ খুব সহজেই ফসিলে পরিণত হয়ে যেতে পারে। আর স্বাভাবিক কারণেই এরকম অঞ্চল থেকে যত দূরে সরে যেতে থাকবেন ততই কমতে থাকবে ফসিলের পরিমাণ[৬]

অর্থাৎ, এইসব পলি অঞ্চলে যে সব জীব বাস করতাে সেইসব প্রজাতির হয়ত ভুরিভুরি ফসিল পাওয়া যাবে, কিন্তু অন্যান্য প্রজাতির অস্তিত্বই কখনও হয়তাে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখন ধরুন, কোন জীবের দেহ প্রাথমিক এই বাঁধাগুলাে পেরিয়ে ফসিল তৈরির জন্য মােক্ষম কোন পরিবেশে সঠিকভাবেই সংরক্ষিত হলাে। এর পরেও কিন্তু তাকে আবার ভুমিকম্প, অগ্নুৎপাত বা প্লেট টেকটোনিক্সের কারণে পৃথিবীর বুকে যে ভাঙ্গা গড়ার অবিরাম খেলা চলছে তার ধাক্কা এড়িয়ে হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকতে হবে যাতে করে আমাদের প্রজন্মের কোন বিজ্ঞানী তা খুঁজে বের করতে পারেন। এখন পৃথিবীর ভিতরে লুকিয়ে থাকা এই শিলা স্তরটি টেকটোনিক সঞ্চালনের মাধ্যমে যদি অনাবৃত বা প্রকাশিত হয়ে না পড়ে বা বিশেষ কোন কারণে বিজ্ঞানীরা যদি সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন না করেন তাহলে হয়তাে সেই ফসিলগুলাে অচেনাই থেকে যাবে আমাদের কাছে। চিরতরে।

চলুন, কঠিন বৈজ্ঞানিক পরিভাষাগুলােকে বাদ দিয়ে, খুব সহজ একটা উদাহরণের মাধ্যমে দেখা যাক ফসিল কিভাবে তৈরি হয়ঃ লন্ডনের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টরির ওয়েব সাইটে বিলুপ্ত এক সামুদ্রিক সুইডের ফসিলে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াটাকে বেশ সহজ করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ধরুন জুরাসিক যুগের এক স্কুইড বিশাল সমুদ্রে ঘুরে ফিরে বেড়াতে বেড়াতে বুড়ো হয়ে একদিন মরে গেলাে, তারপর তার মৃতদেহটা গিয়ে পড়লাে সমুদ্রের তলদেশে। বড় কোন মাছ বা হাঙ্গরের শিকার হল না সে, ছােট ছােট মাছগুলাে ঠুকড়ে ঠুকড়ে তার শরীরের নরম অংশগুলাে খেয়ে শক্ত কঙ্কালটাকে ফেলে চলে গেলাে। এ সময়েই বেশ বড়সড় একটা ঝড় উঠলাে আর এই স্কুইডের কঙ্কালটা পঁচে গলে মিশে যাওয়ার আগেই কাঁদামাটি বালি এসে একরাশ পলির স্তর তৈরি করে ফেললাে তার উপর।

এভাবে হাজার, লক্ষ, এমনকি কোটি বছর ধরে যত পলির স্তর বাড়তে থাকলাে ক্রমশঃ ততই সে মাটির আরও গভীরে ঢুকে যেতে থাকলাে। এদিকে আবার পলি মাটির ভিতরের স্তরের সব পানি ধীরে ধীরে নিংড়ে বের হয়ে গিয়ে তা সিমেন্টের মত শক্ত হয়ে যেতে থাকে এবং একসময় তা পাললিক শিলায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর দেখা গেলাে, আমাদের সেই ভাগ্যবান (ভাগ্যবতী) স্কুইডটি আবারও এই শিলা তৈরির প্রক্রিয়ায় ধ্বংস হয়ে না গিয়ে দিব্যি ফসিলে পরিণত হয়ে গেছে। তার হাড়ের অপেক্ষাকৃত ভঙ্গুর অংশগুলাে গুড়িয়ে গেলেও, দ্রবীভুত হয়ে যেতে পারে এমন অংশগুলাে পানিতে মিশে গেলেও, ক্যালসাইট নামক অত্যন্ত শক্ত খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি চারপাশের আবরণটি কিন্তু ঠিকই ফসিল হিসেবে টিকে গেছে!

ফসিল তৈরির বিভিন্ন পর্যায়
ফসিল তৈরির বিভিন্ন পর্যায়

তাহলে দেখা যাচ্ছে ফসিল তৈরির পদ্ধতিটা নিতান্তই আকস্মিক, এবং বহু চড়াই উৎড়াই পেড়িয়ে এই ফসিল রেকর্ডগুলােকে টিকে থাকতে হয়। আসলেই এটা আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞান সভ্যতার জন্য একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার যে এত ঝক্কি ঝামেলা পেরিয়েও কোন না কোনভাবে কিছু জীবের ফসিল সংরক্ষিত হয়ে যাচ্ছে আর আমরা প্রতিদিনই হাজার হাজার ফসিলের সন্ধান পেয়ে যাচ্ছি। আর বিজ্ঞানীরা যেরকম নিয়মিতভাবে একটার পর একটা নতুন নতুন ফসিল আবিষ্কার করে চলেছেন তাতে করে এটাও তাে আর বুঝতে বাকি থাকে না যে নিশ্চয়ই আরও অসংখ্য প্রজাতির জীবের ফসিল মাটির বুকে বা গাছের কষে বা হিম শীতল তুষার স্তুপে লুকিয়ে রয়েছে।

আমি যখন এই অধ্যায়টা নিয়ে লিখতে বসেছি তখনই বিজ্ঞানীরা কানাডার উত্তর মেরুতে খুঁজে পেয়েছেন আরেকটি গুরুত্ত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী ফসিল বা মিসিং লিঙ্ক↑। প্রায় ৩৮ কোটি বছর আগের চারপায়ী এই মাছটি জলের মাছ এবং জল থেকে চার পায়ে ভর করে ডাঙ্গায় উঠে আসা প্রাণীগুলাের মধ্যে পরিষ্কার যােগসূত্র স্থাপণ করেছে। বিজ্ঞানীরা জল থেকে ডাঙ্গায় বিবর্তনের এই তত্ত্ব আনেক আগেই দিয়েছিলেন, কিন্তু এত পরিষ্কারভাবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানাে প্রমাণ বােধ হয় পেলেন এই প্রথম। এ ধরণের গুরুত্বপুর্ণ মিসিং লিঙ্কগুলাে নিয়ে এর পরে বিস্তারিত আলােচনা করার ইচ্ছে আছে।

tetrapods
জল থেকে ডাঙা উঠে আসা ট্রেট্রাপড মাছের ফসিল

ডাইনােসর থেকে পাখির রূপান্তরই বলুন আর তিমি মাছের ডাঙ্গা থেকে আপাতদৃষ্টিতে উলটো পথে জল-গমনের বিবর্তনের উপাখ্যানই বলুন – এই মিসিং লিঙ্কগুলাে কিন্তু বিবর্তনের গল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি অধ্যায়, এদের বাদ দিয়ে বিবর্তনের কোন গল্পই সম্পূর্ণ হতে পারে না। আর এ ধরণের আবিষ্কারগুলাের পিছনে রয়েছে আমাদের সেই প্রাচীন ফসিল রেকর্ডগুলাে। এরা যেন সেই বহুকল্পিত টাইম মেশিন, যার মাধ্যমে আমরা অতীতের কোটি কোটি বছরের প্রাণের মহাযাত্রায় শরীক হতে পারি, পৌঁছে যেতে পারি বিবর্তনের ইতিহাসের সেই অজানা প্রাগৈতিহাসিক অধ্যায়গুলােতে। হ্যা, পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া লক্ষ লক্ষ জীবের তুলনায় খুঁজে পাওয়া ফসিলের সংখ্যা নিতান্তই কম, কিন্তু ঘুড়ে দাঁড়িয়ে উলটো করে প্রশ্ন করতে হলে বলতে হয়, তারা জীবের বিবর্তনের পক্ষে কতটুকু দৃঢ় সাক্ষ্য বহন করে চলেছে?

এই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা চোখ বন্ধ করে বলবেন যে, ফসিল রেকর্ডগুলাের মাধ্যমে আমরা বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপগুলােকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনও না পাওয়া গেলেও এর থেকে আমরা প্রাণের বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কে যে একটা ব্যাপক ধারণা আমরা লাভ করি তাকে কোনভাবেই নগন্য বলে ফেলে দেওয়া যায় না। এ যেনাে অনেকটা যাদুঘরে সংরক্ষিত হাজার বছরের পুরনাে অতিকায় সেই প্রাচীন পুঁথিটা – তার অনেক পৃষ্ঠা ছিড়ে গেছে, কখনও কখনও অধ্যায় ধরেই হয়তাে হারিয়ে গেছে, কিন্তু তারপরও বাকি হাজারও পৃষ্ঠায় যে কাহিনী এবং জোড়ালাে প্রমাণগুলাে লিপিবদ্ধ করা আছে তা দিয়ে আমরা দিব্যি সে সময়টা সম্পর্কে অত্যন্ত স্বচ্ছ একটা ধারণা লাভ করতে পারি, দৃঢ় আস্থা নিয়ে উপসংহারটাও টানতেও পারি। আর প্রতিদিনই আমরা যত নতুন নতুন ফসিল খুঁজে পাচ্ছি ততই যেনাে একটা একটা করে সেই ছেঁড়া পৃষ্ঠাগুলাে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বইটার ভিতর আর ক্রমশঃ জ্বলজ্বল করে পরিষ্কার হয়ে উঠছে ইতিহাসের রং তুলিতে আঁকা প্রাণের বিবর্তনের ছবিটা।

চার্লস ডারউইন যখন তার ‘অরিজিন অফ স্পিশিজ’ বইটাতে বিবর্তনের সাক্ষ্য হিসেবে ফসিল রেকর্ডগুলাে সম্পর্কে বিস্তারিত লিখছিলেন তার অনেক আগেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেছিলেন যে, এই বুড়ো পৃথিবী ধাপে ধাপে সৃষ্টি হয়েছে[৭]। ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন শীলার স্তরে স্তরে ক্রমান্বয়িকভাবে খুঁজে পাওয়া ফসিলগুলাে তাদের এই সন্দেহকে আরও সুদৃঢ় করে তুলেছিলাে। আর তারপর গত শতাব্দীতে যে অসংখ্য পরিমাণ ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছে তা দিয়ে আমরা বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে অত্যন্ত জোড়ালাে প্রমাণ পাই।

আর আজকে তাে বিজ্ঞান আর সেখানেই আটকে নেই, বিবর্তনের পক্ষে প্রমাণ দিয়ে চলেছে বিজ্ঞানের আরও বিভিন্ন শাখা। জেনেটিক্সের আলােয় আমরা এই ফসিল রেকর্ডগুলােকে আবার নতুন করে খতিয়ে দেখার সুযােগ পেয়েছি। এটা তাে আর কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না যে, ফসিল রেকর্ডগুলাে আমাদেরকে শত শত বছর ধরে যা বলে আসছে, বিজ্ঞানীরা তাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তার সাথে গত কয়েক দশকের অনু জীববিদ্যা এবং জেনেটিক্সের আবিষ্কারগুলাে হুবহু মিলে গেলাে! বিভিন্ন জীবের ডি.এন.এ থেকেই আজকে আমাদের পক্ষে সম্ভব তার বিবর্তনের ইতিহাসটা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা, আর ফসিল রেকর্ডগুলাে তাে আছেই তার পাশাপাশি সম্যক প্রমাণ হিসেবে।

এর পরে ভূতাত্ত্বিক বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন স্তরে বিবর্তনের সাক্ষী হিসেবে ব্যাপক পরিমাণে যে সব ফসিল পাওয়া গেছে এবং তার সাথে ভূতাত্ত্বিক সময় ও কার্বন ডেটিং এর পদ্ধতি নিয়ে আলােচনা করার ইচ্ছে রইলাে।


 বিবর্তনের পথ ধরে


৪.↑  Futuyma DJ (2005), Evolution, p.71 Sinauer Associates, INC, MA, USA

৫.↑  Futuyma DJ (2005), Evolution, p.68 Sinauer Associates, INC, MA, USA

৬.↑  Ridley, Mark (2004), Evolution, p 384; BlackwellPublishing, Oxford, UK

৭.↑  Berra, TM (1990), Evolution and the Myth of Creationism. Stanford p. 52

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা