ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০২. কেন মানুষ নিঃসন্তান থাকতে চায়?

কেন মানুষ নিঃসন্তান থাকতে চায়? কেন মানুষ আত্মহত্যা করে?
রাইসের তৃতীয় এবং চতুর্থ প্রশ্নটি অবশ্য বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এখনও অমীমাংসিত রহস্য। মানুষ কেন অনেক ক্ষেত্রে নিঃসন্তান থাকতে চায় কিছু ক্ষেত্রে বংশাণুগত আচরণ, কিছু ক্ষেত্রে গেম থিওরির আলোকে সম্পদ বনাম সন্তানের রেখচিত্রের মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব করা হলেও আমার কাছে কোনোটিকেই খুব একটা যুৎসই কিছু মনে হয়নি। এটা ঠিক, অনেক সময়ই ‘সন্তান মানুষ করার’ বিশাল খরচের কথা ভেবে পিতা মাতারা অনেক সময়ই সন্তান নেন না, কিন্তু এটাকে নিঃসন্তান থাকার সঠিক কারণ মনে করা ভুল হবে।

পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যাবে, যে সমস্ত দেশে প্রাচুর্য তুলনামূলকভাবে বেশি যেমন পশ্চিমের দেশগুলোতে সেখানেই বরং জন্মহার কম, কোনো কোনো দেশে একেবারেই ঋণাত্মক। সে সব দেশেই নিঃসন্তান দম্পতির সংখ্যা বেশি। তুলনামূলকভাবে দরিদ্র দেশেই শিশু জন্মহার অত্যধিক। সম্পদ এবং খরচের ব্যাপারটা মুখ্য হলে ব্যাপারটা উলটো হবার কথা ছিল। অঢেল প্রতিপত্তি থাকার পরেও কেন মানুষ নিঃসন্তান থাকতে ভালোবাসে, কিংবা কেন ক্ষেত্র বিশেষে নিজ সন্তানকে হত্যা করে, কিংবা কখনো নিজেও আত্মহত্যা করে এগুলোর কোনো বিবর্তনীয় সমাধান নেই, কিংবা থাকলেও আমাদের জানা নেই।

তবে এটুকু বলা যায় যে, এগুলো সবই খুব চরম কিছু নমুনার উদাহরণ, জনপুঞ্জ টিকে থাকতে হলে এগুলো কখনোই মূল স্রোতধারা হয়ে উঠবে না। আর আমরা তো দেখেছিই বিবর্তনে সমকামিতার ট্রেন্ডসহ নানা ধরনের প্রকারণগত ভিন্নতা থাকেই, এগুলো কিছু না কিছু থাকবেই, তবে কম হারে।

কেন মানুষ তার সন্তানকে হত্যা করে?
রাইসের পঞ্চম প্রশ্নটি কেন তিনি তার বইয়ে রেখেছিলেন, সেটা আমার কাছে খুব একটা পরিষ্কার নয়। মার্টিন ড্যালি এবং মার্গো উইলসন ১৯৮৮ সালে তাদের লেখা ‘হোমিসাইড’ বইয়ে এর সমাধান হাজির করেছিলেন[৩২১]। আমি সেটা নিয়ে আলোচনা করেছি বইয়ের ষষ্ঠ (জীবন মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা) অধ্যায়ের ‘কেন সিন্ডারেলার গল্প কম বেশি সব সংস্কৃতিতেই ছড়িয়ে আছে?’ অংশে। ‘কেন মানুষ তার সন্তানকে হত্যা করে?’ এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হচ্ছে ‘খুব বেশি আসলে করে না’।

শিশু অত্যাচার এবং হত্যা আসলে জৈব অভিভাবকের চেয়ে সৎ অভিভাবকদের দ্বারাই বেশি হয়। অনগ্রসর সমাজে তো বটেই এমনকি আমেরিকা, ক্যানাডার মতো দেশেও স্টেপ প্যারেন্টদের অত্যাচার জৈব অভিভাবকদের অত্যাচারের চেয়ে বহুগুণ বেশি পাওয়া গেছে। আসলে বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে তাই পাওয়ার কথা। জৈব অভিভাবকেরা তাদের জেনেটিক সন্তানকে খুব কমই নির্যাতন বা হত্যা করে, কারণ তারা সহজাত কারণেই নিজস্ব জিনপুল তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের চেয়ে রক্ষায় সচেষ্ট হয় বেশি, কিন্তু সৎঅভিভাবকদের ক্ষেত্রে যেহেতু সেটি জেনেটিক নয়, বরং অনেকাংশেই সামাজিকভাবে আরোপিত, সেখানে নির্যাতনের মাত্রা অধিকতর বেশি পাওয়া যায়।

তারপরেও কিছু ক্ষেত্রে জৈবিক অভিভাবকেরা যে নিজ সন্তানকে হত্যা করে । সেটা ড্যালি এবং উইলসন ব্যাখ্যা করেছেন, ‘পার্থক্যসূচক অবিভাবকত্বীয় উৎকণ্ঠা’র (Discriminative Parental Solicitude) নিরিখে। কেবল পুরুষেরাই শিশু সন্তানকে হত্যা করে তা নয়, সারা বাফার হার্ডি তার ‘প্রকৃতি মাতা’ বইয়ে দেখিয়েছেন বর্ধিত প্রজননগত কৌশলের (Greater Reproductive Strategy) কারণে একটি নারীও আপন সন্তানকে হত্যা করতে পারে[৩২২]। পরকীয়া এমনি একটি বর্ধিত প্রজননগত কৌশল, যার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যাবে অনেক নারীর মধ্যেই।

পরকীয়ার কারণে আয়শা হুমায়রা তার নিজের সন্তান সামিউলকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে কিছুদিন আগে বাংলাদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি এবং তার প্রেমিক আরিফ মিলে হত্যা করেছিলেন তার শিশুপুত্রকে। সম্প্রতি আমেরিকায় কেলি অ্যান্থনিকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল তার মা কেসি অ্যান্থনিকে। প্রমাণের অভাবে কেসি খুনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলেও এ নিয়ে সাড়া আমেরিকায় বিতর্কের ঝড় বয়ে যায়। নিজের প্রজননগত সফলতা বজায় রাখতে বহু পিতা মাতাই শিশু সন্তানকে হত্যা করেছেন, ইতিহাসে তার প্রমাণ অজস্র। ঠিক একই কারণে সামাজিক কাঠামো বজায় রাখতে সঠিক শাস্তির ব্যবস্থাও উদ্ভাবন করতে হয়েছে মানুষকেই।

কেন সৈন্যরা দেশের জন্য প্রাণ দেয়?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণোৎসর্গ করেছিল, বাংলাদেশ নামের আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে। যে কোনো দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ হয়ে উঠে স্বাভাবিক ঘটনা, দেশের মানুষ তখন প্রিয় মাতৃভূমির জন্য জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। সামগ্রিকভাবে জনগণের অংশগ্রহণের কথা না হয় বাদই দেই, একটি দেশের সৈন্যবাহিনীকে তৈরিই করা হয় এভাবে যেন তারা দেশের প্রয়োজনে যে কোনো সময় যুদ্ধ করতে পারে, দরকার হলে প্রাণ দিতে পারে।

আমেরিকার সৈন্যরা কেবল নিজের দেশ রক্ষায় প্রাণ দেয় না, প্রাণ দেয় রাষ্ট্রপতির হুকুম তামিল করে অন্যদেশ আক্রমণ করেও। ইরাক, আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠিয়ে কম সৈন্যহানি ঘটেনি আমেরিকার। কেন সৈন্যরা দেশের জন্য প্রাণ দেয়? কেন মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তারা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে? এগুলো সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো বিবর্তনীয় অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসবে না; সে আশা করাও হয়তো বোকামি। তারপরেও সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় বেশ কিছু তাৎপর্যময় দিক উঠে এসেছে যেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত সৈন্যদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই খুব উঁচু মূল্য দেয়া হয়, সেটা যে কোনো দেশেই। যুদ্ধের ময়দানে সাহসের সাথে প্রাণোৎসর্গ করে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব বাংলাদেশে যারা পেয়েছেন সে রকম খেতাব বেসরকারীভাবে আর কেউ পাননি, পাবেনও না আর কখনো। যুদ্ধে যে সৈন্যরা নিহত হন, তাদের পরিবারের ভরণপোষণের দায় দায়িত্ব অনেকাংশেই রাষ্ট্র থেকে নেওয়া হয়।

আমেরিকাতেও যুদ্ধফেরত সৈন্যদের সম্মান দিয়ে বরণ করা হয়, যুদ্ধাহত সৈনিকদের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয় রাষ্ট্র, আর যুদ্ধে কোনো সৈন্য নিহত হলে প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে তার পরিবার অর্জন করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব, বিধবা স্ত্রী এবং শিশুদের জন্য থাকে রাষ্ট্রীয় ভরণপোষণের সার্বিক ব্যবস্থা। আমরা এমন কোনো সভ্য রাষ্ট্রের কথা জানি না, যেখানে দেশের জন্য প্রাণ দেয়া মানুষকে সম্মান করা হয় না।

মানুষ যখন শিকারি-সংগ্রাহক পরিস্থিতিতে বাস করত, তখন যে সকল সুদক্ষ সৈন্যরা গোত্রে বাড়তি নিরাপত্তা দিতে পারত, কিংবা সাহসের সাথে যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাস্ত করতে পারত, তারা অবধারিতভাবে পেত গোত্রাধিপতির তরফ থেকে পুরস্কার, এবং অধিক নারীর দখল। আজকের দিনে পরিস্থিতি বদলালেও বীর সৈন্যদের পুরস্কৃত করার সেই একই মানসিকতার প্রতিফলন একটু চেষ্টা করলেই লক্ষ করা যাবে।

আরও একটা জিনিস লক্ষ করা গেছে। দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকার ফলে এ ব্যাপারটা আমার কাছে আরও স্পষ্ট করে ধরা পড়েছে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে আমেরিকান সৈন্যরা ঠিক যুদ্ধে যাওয়ার বছরখানেক আগে বিয়ে করে ফেলে; আর যুদ্ধরত অবস্থায় পায় সন্তান জন্মের খবর। স্ত্রী সন্তানদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের হাতে সঁপে দিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হয়তো আদিম মনোসঞ্জাত স্ট্র্যাটিজি। পরিবারের নিরাপত্তা একবার নিশ্চিত হয়ে গেলে বহুনারীর দখলদারিত্বের সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে দাঁড়ায় স্রেফ সময়ের ব্যাপার।

সেজন্যই দেখা যায় প্রতিটি যুদ্ধেই আগ্রাসী সৈন্যরা ভিন দেশ আক্রমণের মাধ্যমে হত্যা এবং ধ্বংসের পাশাপাশি বহু সময়ই মেতে উঠে ধর্ষণে। শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্ষণ প্রায় প্রতিটি যুদ্ধেরই অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যরা নয় মাসে দুই লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করেছিল, বসনিয়ায় সার্ব সৈন্যরা ধর্ষণ করেছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার নারীকে, রুয়ান্ডা গণহত্যায় দুই লক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।

শিম্পাঞ্জিরা যখন অন্য শিম্পাজির এলাকা দখল করে, তখন প্রথম কাজটিই যেটা করে সেটা হলো সেই এলাকার নারী শিম্পাঞ্জিদের পালা করে ধর্ষণ করা[৩২৩]। আমরা নিজেদের ‘সভ্য এবং আধুনিক’ মানুষ দাবি করলেও আমরা যে বন্য স্বভাব থেকে মুক্ত হতে পারিনি, তা যুদ্ধের সময়গুলোতে উৎকটভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন শিম্পাঞ্জিদের মতোই এভাবে অধিক নারীর দখল নিয়ে প্রজননগত সফলতা বৃদ্ধি করা মানবসমাজেও সৈন্যদের গুপ্ত স্ট্র্যাটিজি।

যুদ্ধের ময়দানে একাধিক নারীর দখল, আর যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার এবং পাশাপাশি পরিবারের সুদৃঢ় নিরাপত্তা এগুলো মানবসমাজে যে কোনো রাষ্ট্রেই নির্জলা সত্য। আরও একটা ব্যাপার এখানে লক্ষণীয়; বিভিন্ন দেশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, সাধারণত আর্থিক দিক থেকে অসচ্ছ্ল পরিবার থেকেই মূলত সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়। তারা যুদ্ধের মাধ্যমে সম্মান বয়ে এনে যে প্রজননগত সফলতা প্রদর্শন করতে পারে, যুদ্ধ না করলে সেটা তাদের মতো অবস্থার মানুষদের পক্ষে সম্ভব হতো না অনেক ক্ষেত্রেই। এগুলো সবগুলোই হয়তো দেশের জন্য সৈন্যদের যুদ্ধ করার উজ্জীবনী শক্তি। তবে বলা বাহুল্য এগুলো সবই জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেওয়া কতকগুলো ধারণা, সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নয়। কেন মানুষ দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়, কেন সৈন্যরা দেশের জন্য অকাতরে প্রাণ দেয় তার অনেক কিছুই এই মুহূর্তে জৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অজানা।


 ভালোবাসা কারে কয়


৩২১.↑   Margo Wilson and Martin Daly, Homicide, Aldine Transaction, 1988

৩২২.↑   S. B. Hrdy, Mother Nature: A History of Mothers, Infants and Natural Selection, Pantheon/Random House, New York, 1999

৩২৩.↑   Akiko Matsumoto-Oda, Miya Hamai, Hitosige Hayaki, Kazuhiko Hosaka, Kevin D. Hunt, Eiiti Kasuya, Kenji Kawanaka, John C. Mitani, Hiroyuki Takasaki and Yukio Takahata. 2007. Estrus Cycle Asynchrony in Wild Female Chimpanzees, Pan troglodytes schweinfurthii. 

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়