ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০১. ভূমিকা

ভালোবাসা কারে কয়কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যখন তার গানে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সখি, ভালবাসা কারে কয়?’ তখন কি তিনি একটি বারের জন্যও ভাবতে পেরেছিলেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার সমসাময়িক একজন শখের প্রকৃতিবিদদের গবেষণার ভিতর?[১]  হ্যাঁ, প্রেম ভালবাসা, রাগ, অভিমান, ঈর্ষা কিংবা সৌন্দর্যের অস্তিত্বের সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্বগুলোর জন্য আমরা যার কাছে ঋণী, তিনি প্রেম-পিরীতি বা মান অভিমান নিয়ে গবেষণা করা কোন কেউকেটা দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী বা আর্ট কালচারের বিশাল বোদ্ধা বা পোস্ট মডার্নিস্ট সমালোচক নন, তিনি ছিলেন এক নিবিড় প্রকৃতি প্রেমিক, যিনি বিশাল আকারের পারিবারিক বাগানে ঘন্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতেন- চরম আগ্রহ আর পরম বিস্ময় নিয়ে অবলোকন করতেন যত রাজ্যের ফুল,পাখি, ছোট বড় উদ্ভিদ আর পোকামাকড়, যত্ন করে পালতেন গুবরে পোকা, কেঁচো আর কবুতর। তিনি চার্লস ডারউইন।

বলতে দ্বিধা নেই, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আর দর্শনের টুকিটাকি বিষয় আমার আগ্রহের এবং লেখালিখির কেন্দ্রবিন্দু হলেও আমি বহুদিন ধরেই চার্লস ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের বিশেষ করে যৌনতার নির্বাচনের এক বিশাল অনুরাগী। এ অনুরাগ এক দিনে জন্মেনি, গড়ে উঠেছে পলে পলে একটু একটু করে। আর এ অনুরাগ কেবল আমার একার নয়, আমার মত এই জামানার বিজ্ঞান লেখকদের অনেকরই। এ প্রসঙ্গে একটি ব্যাপার মনে পড়ছে। আমার জীবনসঙ্গিনী বন্যা আহমেদ  তার বহুল প্রচারিত ‘বিবর্তনের পথ ধরে’ বইটি লেখার সময় বইয়ের একদম প্রথমেই একটি উক্তি ব্যবহার করেছিল[২] । উক্তিটি প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী ও বংশগতিবিদ থিওডসিয়াস ডবঝানস্কির

‘বিবর্তনের আলোকে না দেখলে জীববিজ্ঞানের কোন কিছুরই আর অর্থ থাকে না’।

ডবঝানস্কির এ উক্তিটি মূলতঃ জীবজগতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল। এটি নিঃসন্দেহ বিবর্তনের আলোকে না দেখতে পারলে সত্যই জীবজগতকে বোঝা আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ডবঝানস্কি এই মহামূল্যবান কথাটা বলেছিলেন তার ১৯৭৩ সালে লেখা একটি গবেষণাপত্রের শিরোনামে। ডবঝানস্কি যে কথাটা আমাদের চারপাশের জীবজগতের জন্য সঠিক বলে মনে করেছিলেন, আমি তার প্রায় চল্লিশ বছর পরে আমার এ বইটি লিখতে গিয়ে দেখছি সেটা মানব সমাজকে ব্যখ্যা করার জন্যও সমানভাবে কার্যকর। সত্যি কথা বলতে কী মানব সমাজের বিভিন্ন প্যাটার্ণ ব্যাখ্যা করতে গেলে বিবর্তনতত্ত্বকে আর বাইরে রেখে আমাদের পক্ষে এগুনো সম্ভব নয়। এতোদিন ধরে সমাজবিজ্ঞানী আর মনোবিজ্ঞানীরা বিবর্তনতত্ত্বকে বাইরে রেখে মানব সমাজের নানা সামাজিক ব্যাখ্যা প্রতিব্যাখ্যা জাহির করে চলেছিলেন। তাদের ব্যাখ্যায় ডারউইনীয় বিশ্লেষণ অনুপস্থিত থাকায় সেগুলো থেকে গেছে অনেকাংশেই অসম্পূর্ণ নয়তো হয়ে উঠেছে বৈজ্ঞানিক দিক দিয়ে একেবারেই অপাংক্তেয়। সেই সমস্যাগুলোর অসম্পূর্ণ সমাধানের পূর্ণতা দিতে বিবর্তন তত্ত্ব কীভাবে অগ্রসর বিশ্লেষণ হাজির করতে পারে তার বেশ কিছু নমুনা হাজির করেছি আমার এ বইয়ে।

ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে সমাজ ব্যাখ্যার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারটা সহজে হয়তো অনেকেই মেনে নেবেন না। যদিও অন্য সকল প্রাণীকে জীবজগতের অংশ হিসেবে মানতে তাদের আপত্তি নেই, এমনকি ডারউইনীয় বিবর্তনের প্রয়োগ ছাড়া যে পিঁপড়েদের সমাজ থেকে শুরু করে শিম্পাঞ্জিদের সমাজ পর্যন্ত কোন কিছুরই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয় সেটিও অনেকেই মানেন, কিন্তু মানুষকে ডারউইনীয় বিশ্লেষণের বাইরে রাখতেই অনেকে পছন্দ করেন। হয়তো তারা ভাবেন, হাতি, গণ্ডার, শিম্পাঞ্জি কিংবা গরিলা এ সকল প্রাণীরা যতই উন্নত হোক না কেন, তারা তো আর মানুষের মতো কবিতা লিখতে পারে না, পারেনা গলা ছেড়ে গান গাইতে, কিংবা পারেনা স্থাপত্যকর্ম বা কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে পড়াশুনা করতে, তাই মানুষ বোধ হয় অন্য প্রাণীদের থেকে একেবারে আলাদা, অনন্য। এ থেকে তারা সিদ্ধান্ত টানেন যে, ডারউইনীয় বিশ্লেষণ মানব সমাজের জন্য প্রযোজ্য নয়।

আমি আমার এ বইয়ে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছি। আমি দেখিয়েছি, অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকাটা ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে বাতিল করে না। আসলে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সব প্রাণীরই কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যার নিরিখে মনে হতে পারে যে তারা হয়তো অনন্য। যেমন, বাদুড়ের আল্ট্রাসনিক বা অতিশব্দ তৈরি করে শিকার ধরার এবং পথ চলার ক্ষমতা আছে, যা অনেক প্রাণীরই নেই। মৌমাছির আবার পোলারাইজড বা সমবর্তিত আলোতে দেখার বিরল ক্ষমতা আছে, যা আমাদের নেই। এধরনের অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকার পরেও কেউ কিন্তু বলছে না যে বাদুড় বা মৌমাছিকে জীববিজ্ঞানের বাইরে রাখতে হবে। তাহলে মানুষের ক্ষেত্রেই বা অযাচিত ব্যতিক্রম হবে কেন? আসলে আমরা অনেকে নিজেদের ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ ভেবে নিয়ে অন্য প্রাণীদের থেকে একেবারেই আলাদা ভেবে প্রবল আত্মতৃপ্তি অনুভব করি।

এই অযাচিত আত্মতৃপ্তিই অনেক সময় যৌক্তিক চিন্তায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। হয়ে উঠে অচলায়তন বৈজ্ঞানিক ভাবনার বিকাশে। আমি এ বইয়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করে বলেছি মানব সমাজের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য কিংবা জটিলতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আমরা মানুষেরা শেষ পর্যন্ত জীবজগতেরই অংশ। মানব সমাজে প্রেম, ভালবাসা, আত্মত্যাগ, ঘৃণা,সঙ্ঘাত, পরার্থপরায়ণতা, সৃজনশীলতা এমনকি নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের মত উপাদানগুলোও বিবর্তনের পথ ধরেই সৃষ্ট হয়েছে, কখনো প্রাকৃতিক নির্বাচনকে পুঁজি করে, কখনোবা যৌনতার নির্বাচনের কাঁধে ভর করে।

যৌনতা শুনলেই আমাদের অনেকের মাথায় ফ্রয়েড চলে আসে। আসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক হলেও সব সময় সঠিক নয়। যৌনতার মাধ্যমে ফ্রয়েড একসময় আমাদের মানসজগতের কিছু ব্যাখ্যা দিতে উদ্যত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু ফ্রয়েডের যৌনতার ব্যাখ্যা আর ডারউইনের যৌনতার নির্বাচন কিন্তু একই ইমারতে দাঁড়িয়ে নেই। বরং, ফ্রয়েডের সাথে ডারউইনের ধারণা এবং তত্ত্বের পার্থক্য বিস্তর। ফ্রয়েড তার ব্যাখ্যায় প্রাণিজগতের বিবর্তন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া গোনায় ধরেননি, অনেক ক্ষেত্রেই নিজের মনোমত ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেন লিবিডো, অহম, শিশ্নাসূয়া খোজাগূঢেষা, ইদিপাস-ইলেক্ট্রা গূঢ়েষার নানা রসালো তত্ত্ব আর ধারণার মাধ্যমে যার অনেকগুলোই আবার পরবর্তীতে অবৈজ্ঞানিক এবং বাতিল হিসেবে গণ্য হয়েছিল। কিছু কিছু আবার পরিগণিত হয়েছিল চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা হিসেবেও।

ডারউইন বর্ণিত যৌনতার নির্বাচন কিন্তু ফ্রয়েডীয় এ সমস্ত কুসংস্কার থেকে একদমই আলাদা। ডারউইনের এ তত্ত্বের একটি বৈজ্ঞানিক ইতিহাস আছে, আছে তত্ত্বের সপক্ষে জোরালো প্রমাণ। ডারউইন প্রকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটা বিবর্তন নিয়ে নিশ্চিত হলেও প্রকৃতি জগত পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছিলেন, প্রাণিজগতে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাচ্ছে যা কেবল প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কারণ এ বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে টিকে থাকার কথা নয়। এগুলো টিকে আছে, কারণ এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিপরীত লিঙ্গের যৌনসঙ্গীর দ্বারা বংশপরম্পরায় দিনের পর দিন আদৃত হয়েছে বলেই। একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে পুরুষ ময়ূরের দীর্ঘ পেখম। এমন নয় যে দীর্ঘ পেখম পুরুষ ময়ূরকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে কোন বাড়তি উপযোগিতা দিয়েছিল। বরং দীর্ঘ পেখম স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যহতই করেছে পদে পদে। দীর্ঘ পেখম থাকলে দৌঁড়াতে অসুবিধা হয়, শিকারীদের হাতে মারা পড়ার সম্ভাবনাও থাকে বেশিমাত্রায়।

কাজেই টিকে থাকার কথা বিবেচনা করলে দীর্ঘ পেখম ময়ূরের জন্য কোন বাড়তি উপযোগিতা দেয়নি বিবর্তনের পথ পরিক্রমায়। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাহায্যে ময়ূরের দীর্ঘ পেখমকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভবই বলা যায়। তাহলে ময়ূরের দীর্ঘ পেখম তৈরি হবার পেছনে রহস্যটা কি? এখানেই চলে আসে যৌনতার নির্বাচনের ব্যাপারটি। দীর্ঘ পেখম টিকে গেছে মূলতঃ নারী ময়ূর বা ময়ূরীর পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে। এই বৈশিষ্ট্য স্রেফ অলংকারিক। আসলে পুরুষ ময়ূরের লম্বা পেখমকে ভাল বংশাণুর নির্দেশক হিসেবে দেখত ময়ূরীরা। কাজেই দীর্ঘ পেখমের ঢেউ তোলা সুশ্রী ময়ূরেরা যৌনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচিত হতে পেরেছিল। এভাবেই দীর্ঘ পেখমের বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় টিকে থেকেছে। ঠিক একইভাবে কোকিলের সুরেলা গলা, বাবুই পাখির বাসা বানানোর ক্ষমতা, ফ্রুট ফ্লাইয়ের নাচ, উইডোবার্ডের দীর্ঘ লেজ কিংবা হরিণের শিং -এগুলোও উদ্ভূত হয়েছে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নয়, বরং বিপরীতলিঙ্গের বিভিন্ন পছন্দ অপছন্দ তথা যৌনতার নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে।

আমি আমার এ বইয়ে দেখিয়েছি, ময়ূরের পেখমের মতই মানবসমাজেও অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো অর্নামেন্টাল বা অলংকারিক। কবিতা লেখা, গান করা থেকে শুরু করে গল্প বলা, আড্ডা মারা, কৌতুক করা, ভাস্কর্য বানানো প্রভৃতি হাজারো বৈশিষ্ট্য মানব সমাজে দেখা যায় যেগুলো স্রেফ অলংকারিক এগুলো বেঁচে থাকায় কোন বাড়তি উপাদান যোগ করেনি, কিন্তু এগুলো টিকে গেছে যৌন নির্বাচনের প্রেক্ষিতে পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে। ময়ূর দীর্ঘ পেখমের যাদুতে বিমোহিত করে সঙ্গীদের প্রলুব্ধ করে, হরিণ যেটা আবার করে থাকে তার বর্ণাঢ্য শিং এর যাদুতে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, শুধু ময়ূর বা হরিণ নয়, মানব সমাজেও অলংকারিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু একেবারে কম নেই। বড় চুল রাখা, দামি সানগ্লাস পরা, কেতাদুরস্ত কাপড়ের ফ্যাশন করা থেকে শুরু করে দামি গাড়ি, বাড়ি, শিক্ষা, বাক্চাতুর্য, প্রতিভা, নাচ, গান, বুদ্ধিমত্তা সবকিছুই মানুষ কাজে লাগায় বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণের কাজে। আসলে মানব সমাজের নারীপুরুষের বহু বৈশিষ্ট্য এবং অভিব্যক্তিই মোটাদাগে সম্ভবত যৌনতার নির্বাচনের ফলাফল হিসেবেই উদ্ভূত আশা করছি পাঠকেরা বহুভাবে এই সত্যের উন্মোচন অবোলকন করবেন এই বইয়ে।

যৌনতার নির্বাচন এই বইটির বড় অংশ অধিকার করে থাকলেও সেটাই বইয়ের একমাত্র উপজীব্য নয়। বইটির মূল লক্ষ্য ডারউইনীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জীবন, জগৎ এবং সমাজকে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা; আর সেই সাথে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আধুনিক গবেষণার সাথে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। সাড়া বিশ্ব জুড়ে জন টুবি, লিডা কসমাইডস, স্টিভেন পিঙ্কার, রিচার্ড ডকিন্স, ডেভিড বাস, ম্যাট রিডলী, জিওফ্রি মিলার, র‍্যান্ডি থর্ন হিল, রবার্ট টিভার্স, মার্গো উইলসন, সারাহ ব্ল্যাফার হার্ডি, হেলেন ফিশার, রবিন বেকার সহ বহু গবেষকদের বিবর্তন মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণা আজ বিজ্ঞানের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং গবেষণার সজীব ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। তাদের সেই কষ্টার্জিত আধুনিক গবেষণাগুলোকেই সহজ ভাষায় বাঙালি পাঠাকদের কাছে তুলে ধরার ঐকান্তিক প্রয়াস নিয়েছি আমি আমার এই বইয়ের মাধ্যমে।

এই বইয়ের বেশ কিছু অংশ ধারাবাহিকভাবে মুক্তমনা ব্লগে এবং কিছু কিছু মুক্তান্বেষা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পাঠকদের গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রাঞ্জল তর্ক বিতর্ক নতুন জ্ঞানের দুয়ার উন্মোচন করেছিল। আমি এক্ষেত্রে মুক্তমনায় সংশপ্তক, আল্লাচালাইনা, বিপ্লব পাল, ফরিদ আহমেদ, জওশন আরা, গীতা দাস, ইরতিশাদ আহমদ, অপার্থিব সহ বহু ব্লগারদের অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। ফেসবুকেও পেয়েছি অসংখ্য মন্তব্য। আমার লেখাকে কেন্দ্র করে তাদের গঠনমূলক আলোচনা আমার বইটিকে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করেছে বহু ক্ষেত্রেই। পাশাপাশি আমার জীবনসঙ্গিনী বন্যা আহমেদের তীক্ষ্ম সমালোচনাগুলোও আমার পাণ্ডুলিপির পরিবর্তন পরিবর্ধনে অবদান রেখেছে অনেক। বন্যা নিজে বিবর্তনের অনুরাগী পাঠক এবং লেখক হওয়া সত্ত্বেও বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের বহু ধারণার ব্যাপারে নিরন্তর সংশয়ী শুধু নয়, তীব্র সমালোচকও।

তবে, এ ব্যাপারটা আমার জন্য যেন ‘শাপে বর’ হিসেবেই দেখা দিয়েছে। আমার মনে আছে, যখন আমি বইটির বিভিন্ন অংশ লিখছিলাম, বহু ক্ষেত্রেই আমার লেখালেখি এমনকি নাওয়া খাওয়া সরিয়ে রেখে আর সাথে তর্কযুদ্ধে নামতে হয়েছে। আমার চৌদ্দ বছর বয়সী কন্যা তৃষা আমাদের এই তর্ক বিতর্ক দেখতে দেখতে হতাশ হয়ে বলেছে ‘তোমরা এত অর্থহীন বিষয় নিয়ে এভাবে দিনের পর দিন ঝগড়া কর, যে অবাক লাগে’! বন্যা আর আমি দু’জনই তখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি ‘আরে আমরা তো ঝগড়া করছি না, এটা এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল ডিসএগ্রিমেন্ট অ্যান্ড ডিস্কাশন’। তাতে অবশ্য আমার কন্যার অবাক হবার মাত্রা কমে না, আমরাই বরং শেষ পর্যন্ত তর্কে ক্ষান্ত দেই।

যা হোক, লেখাগুলো শেষ পর্যন্ত বন্যার সংশয়ী দৃষ্টি পার হয়েই যেতে হয়েছে বলে এর মান নিয়ে আমার কোনই সন্দেহ নেই। তারপরেও একটা বিষয় আমিও মাথায় রেখেছি। একেবারে প্রান্তিক গবেষণালব্ধ জিনিস গ্রন্থাকারে হাজির করলে একটা ভয় সবসময়ই থাকে যে, পরবর্তীতে অনেক কিছুই মিথ্যা হয়ে যেতে পারে। তারপরও এই প্রান্তিক জ্ঞানগুলো আমাদের জন্য,এবং আমার বইয়ের পাঠকদের জন্য জরুরী বলে আমি মনে করেছি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন পিঙ্কার তার ‘মন কিভাবে কাজ করে?’ বইয়ের ভূমিকায় বলেছিলেন[৩]

‘এই বইয়ের প্রতিটি ধারণা সময়ের সাথে সাথে ভুল প্রমাণিত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেটাই হবে আমাদের জন্য অগ্রগতি। কারণ পুরোন ধ্যান ধারণা গুলো এতোই নিরস যে ভুল হবারও যোগ্য নয়।’

আমিও সেকথাই বলার চেষ্টা করব। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানের নতুন শাখা। নতুন জিনিস নিয়ে গবেষনার ক্ষেত্রে – এর কিছু প্রান্তিক অনুমান যদি ভুলও হয়, সেটাই হবে পরবর্তী বিজ্ঞানীদের জন্য প্রগতির সূচক। সে কথা মাথায় রেখেই আমার এ বইটি লেখা।

আমার শেষ ক’টি বইয়ের প্রকাশক ছিলেন শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুল। তার হাতে বই তুলে দেওয়ার আলাদা আনন্দ আছে। ‘বিজয় অধ্যুষিত’ ছাপার বাজারে আহমেদুর রশীদ টুটুলই একমাত্র প্রকাশক যিনি অভ্রতে কম্পোজ-কৃত (ইউনিকোডে লেখা) পাণ্ডুলিপি অবলীলায় প্রকাশ করে চলেছেন। ইমেইল, ফেসবুক এবং যোগাযোগের আধুনিক কারিগরী উপকরণগুলো তার নখদর্পণে থাকায় বাংলাদেশ থেকে প্রায় অর্ধগোলার্ধ দূরত্বে অবস্থান করেও তার সাথে যোগাযোগে কখনোই খুব একটা বেগ পেতে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আমি আমার বইয়ে ছাইপাশ যাই লিখি না কেন, টুটুলের মনোরম প্রচ্ছদ, বাঁধাই, ভাল কাগজ এবং যত্ন নিয়ে ছাপানোর গুণে তার প্রকাশিত বইগুলো হাতে নিলেই একধরনের আলাদা আনন্দ হয়, তৈরি করে অনাবিল মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতাটুকুর রেশ এখনো না কাটায় এই বইটিও তার বিশ্বস্ত হাতেই তুলে দেয়া হল। বইটি পাঠকদের ভাল লাগলে এর সামগ্রিক কৃতিত্বটুকু কার লেখকের নাকি এই তরুণ প্রকাশকের এ ব্যাপারে আমি মোটেই নিশ্চিত নই।

অভিজিৎ রায়

ফেব্রুয়ারি, ২০১২

 


 ভালোবাসা কারে কয়


১.↑   ১৮৮২ সালে চার্লস ডারউইন যখন মারা যান, তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র একুশ বছর।
২.↑   বন্যা আহমেদ, বিবর্তনের পথ ধরে, অবসর প্রকাশনী,২০০৭,পুনর্মূদ্রণ ২০০৮।
৩.↑   Steven Pinker, How the Mind Works, W. W. Norton & Company; Reissue edition, 2009

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়