বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০১. বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

সাধারণ মানুষের মধ্যে বিবর্তন সম্পর্কে ভ্রান্তির যেন কোন শেষ নেই। একটু খেয়াল করে দেখলে তার কারণটা বুঝে ওঠাও তেমন কঠিন নয়। বিবর্তনবাদ এমন একটি তত্ত্ব যা আমাদের মানব সভ্যতার হাজার বছর ধরে লালন করা ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে চায়। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ তার এবং তার চারদিকের ‘সৃষ্টি’ নিয়ে ভেবেছে, গান বেঁধেছে, গুহার গায়ে ছবি এঁকেছে, দার্শনিক আলােচনায় লিপ্ত হয়েছে, কত রকমেরই না সৃষ্টিতত্ত্বের জন্ম দিয়েছে! মানব সভ্যতার সেই উষালগ্ন থেকে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে তৈরি হাজারাে রকমের সৃষ্টিতত্ত্বের অস্তিত্ব দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

নিজের উৎপত্তির রহস্যের কোন কূল কিনারা না পেয়ে এবং প্রকৃতির বিশালত্বের মাঝে নিজের অসহায়ত্বে দিশেহারা হয়ে মানুষ বিভিন্ন অলৌকিক সত্ত্বার কল্পনা করেছে; তেমনি আবার প্রকৃতির অন্যান্য জীবের সাথে তুলনা করে নিজের তথাকথিত ‘মহিমায়’ মুগ্ধ হয়ে সে নিজেকে বসিয়েছে সব কিছুর কেন্দ্রস্থলে, নিজেই নিজেকে ভূষিত করেছে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির সম্মানে। এতাে মহিমা, এত আয়ােজন তার নিজেকে ঘিরে! সেখান থেকে হঠাৎ করে সাধারণ এই পৃথিবীর অতি সাধারণ সব জীবের স্তরে নিজেকে নামিয়ে নিয়ে আসা তাে আর চাট্টিখানি কথা নয়!

আসলে বিবর্তনবাদ শুধু তাে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই নয় মানুষের চিন্তা ভাবনা দর্শনের ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটিয়েছে, তাকে খুব সহজে মেনে নেওয়া তাে কঠিন হওয়ারই কথা। এটা সত্যি যে, জ্ঞান যেখানে আটকে গেছে সেখানে ভীড় করেছে আলৌকিকতা, অতিপ্রাকৃতিক শক্তি, কিন্তু সেখানেই তাে সে থেমে থাকেনি। আবার যখন নতুন এবং পরিবর্ধিত জ্ঞানের আলােয় আগের অজানা বিষয়গুলােকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পেরেছে তখনই সে সব বাঁধা অতিক্রম করে পুরনাে ভুলগুলােকে ভেঙ্গেচুরে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে।

তার এই কল্পনাশক্তি, সৃজনীশক্তি এবং তার সাথে যুক্তি দিয়ে বস্তুবাদী চিন্তা দিয়ে তার চারদিকের সব কিছুকে বিশ্লেষণ করে দেখার অসীম ইচ্ছার কারণেই জ্ঞান-বিজ্ঞান আজকে এখানে এসে পৌছাতে সক্ষম হয়েছে। আজকে বিজ্ঞান এমন এক পর্যায়ে এসে পৌছেছে যে, প্রাকৃতিক নিয়ম (Natural Laws) দিয়েই সে তার পারিপার্শ্বিকতাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। এই পৃথিবীতে প্রজাতির উদ্ভব এবং বিকাশ বােঝার জন্য সাক্ষ্য প্রমাণবিহীন কোন অতিপ্রাকৃত সত্তার আশ্রয় নেওয়ার আর দরকার নেই।

বিবর্তনবাদকে মেনে নিতে হলে আমাদের সনাতন বহু অন্ধ বিশ্বাসকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হয়। খুব সহজবােধ্য কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আজ আমরা বিবর্তনবাদের বিরুদ্ধে এত বিরােধিতা ও ভুলভ্রান্তি দেখতে পাই। ছােটবেলা থেকে আমরা সৃষ্টিতত্ত্বের সব রকমের ব্যাখ্যা পড়ে-শুনে বড় হলেও বিবর্তনবাদের মত বিজ্ঞানের মূল একটি তত্ত্বকে আমাদের পাঠ্যসূচী থেকে সযতনে এড়িয়ে যাওয়া হয়। আর তার সাথে যদি যুক্ত হয় সুচিন্তিতভাবে আরােপ করা রাজনৈতিক, সামাজিক বিরােধিতা তাহলে তাে আর কথাই নেই।

আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলােতেই যে শুধু বিবর্তনবাদ পড়ানাে হয় না তা তাে নয়, আমেরিকার মত অগ্রসর দেশেও আজকে বিবর্তনবাদের মত প্রতিষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কোন শেষ নেই। আমরা আগেই দেখেছি যে, সে দেশের প্রেসিডেন্ট বুশ বিনা দ্বিধায় ঘােষণা দেন যে, “ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন” নামের এই পুরােন ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বকে যেনাে বিবর্তনবাদের বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞানের ক্লাসে পড়ানাে হয়।

আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী সরকারী স্কুল কলেজে ধর্ম বিষয়ক কোন রকম শিক্ষা নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হয়, কিন্তু তারপরও এভাবে তারা ধর্মীয় সৃষ্টিতত্ত্বকে স্কুল কলেজের পাঠ্যসূচীতে ঢুকিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করে যাচ্ছেন। এ নিয়ে সচেতন জনগােষ্ঠী স্কুল বাের্ডগুলাের এধরণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলাও করে ছাড়ছেন, এবং এখানকার বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সামাজিক সচেতনতার কারণে এখন পর্যন্ত প্রত্যেকটি মামলার ফলই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের বিপক্ষে গেছে। তাহলে বােঝাই যাচ্ছে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে বিবর্তনবাদের বিরােধীতাটা।

শুধু একটা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ব্যাপার তা নয়; এর পিছনে খুব শক্তিশালী সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভিত্তিও কাজ করছে। স্কুলের পাঠ্যসূচীতে এই সৃষ্টিতত্ত্বকে বিবর্তনের পাশাপাশি বিজ্ঞান হিসেবে সৃষ্টিতত্ত্ব পড়ানাের দাবী তাে আছেই, সেই সাথে আছে প্রচলিত পত্র পত্রিকা, ধর্ম-প্রতিষ্ঠান, প্রতিপত্তিশালী সামাজিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিবর্তন সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রচার করার অনবরত প্রচেষ্টা।

বিজ্ঞানীরাও এখন অনেকে স্বীকার করেন যে, তারা শুধু এতদিন গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, সাধারণ মানুষকে বিবর্তন সম্বন্ধে অবগত করানাের বা বােঝানাের গুরুদায়িত্ব তাঁরা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই এখন রিচার্ড ডকিন্স থেকে শুরু করে কেনেথ মিলার, টিম বেড়া, ডগলাস ফুটুইমা, আর্নেষ্ট মায়ার (প্রয়াত) মত বিখ্যাত জীববিজ্ঞানীরা কার্ল স্যাগানের পথ ধরে বিজ্ঞানকে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার কাজে লিপ্ত হয়েছেন।

এটা সত্যি যে, বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতই বিবর্তনবাদেও এখনও অনেক অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতই এখানেও বিজ্ঞানীরা বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু বিষয় নিয়ে এখনও একমত হতে পারেননি। কিন্তু গত একশ বছর ধরে বিবর্তনবাদের মুল বিষয়বস্তু অর্থাৎ সব জীবই যে সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়েছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই (Descent, with modificatiom, of all organism from common ancestors) আজকে পৃথিবীর গােলত্ব বা সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরছে – এগুলাে যেমন প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বিবর্তনবাদও ঠিক তেমনি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব।

আসলে বিবর্তনবাদের বিরােধিতাকারীদের মধ্যে আবার বিভিন্ন রকমের ভাগ এবং স্তর রয়েছে। এক্কেবারে গোঁড়ারা বিবর্তনবাদ তাে দূরের কথা, এখনও বাইবেলের সেই সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাস করেন। অনেকে এখনও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ছয় হাজার বছর আগেই পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছিলাে এবং সাড়ে ছয় কোটি বছর আগের ডায়নােসরের অস্তিত্ব আজগুবি গল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে এরকম হাজার হাজার সাইট খুঁজে পাবেন। এই ধরণের ধর্মীয় মৌলবাদীরা পুরােপুরিভাবেই বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করেন।

হারুন ইয়াহিয়া বলে তুর্কি এক স্বঘোষিত বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক তার ‘The Evolution Deceit” বইতে বিবর্তনবাদের বিরােধিতা করে বলেছেন যে বিবর্তনবাদ আজকের পৃথিবীর আধিপত্যকারী শক্তির দ্বারা তৈরী একধরণের প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে অনেকেই আছেন যারা বিজ্ঞানের এই অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ শাখাটি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, কিন্তু এখান থেকে সেখান থেকে শুনে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে ভুল ধারণা পােষণ করেন।

আমাদের দেশের স্কুল কলেজের বিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে যেহেতু পরিষ্কারভাবে বিবর্তনবাদ পড়ানাে হয় না তাই অনেকেই আবার ইন্টারনেটের সৃষ্টিতত্ত্ববাদী বিবর্তনবিরােধী সাইটগুলাে থেকে তথ্য জোগার করে বেশ জোরেসােরে বিবর্তনবাদের বিরােধিতা করতে শুরু করে দেন। আসলে বিবর্তনতত্ত্ব হচ্ছে জীববিদ্যার সব শাখার অন্যতম ভিত্তিমূল, একে ছাড়া জীববিদ্যাই অচল হয়ে পড়বে। বাজারে বিবর্তনবাদের উপর পৃথিবীর নাম করা সব বিজ্ঞানীদের লেখা হাজারাে বই রয়েছে, তাদের কোন একটি বই একটু মনােযােগ দিয়ে পড়লেই কিন্তু বেশীর ভাগ ভুল ধারণাগুলো কেটে যায়, কিন্তু এতটুকু কষ্টই বােধ হয় অনেকের আর করে ওঠা হয় না।

মজার জিনিস হচ্ছে, ডারউইন এবং ওয়ালেস বিবর্তন তত্ত্বটি প্রকাশ করার পর বেশীরভাগ মানুষই এর বিরােধিতা করেছিলেন, কিন্তু গত দেড়শ বছরে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে এখন আর পুরােপুরিভাবে কেউ একে অস্বীকার করতে পারেন না। তাই যারা এ সম্পর্কে অল্পস্বল্প খবর রাখেন তারা অনেকেই বলেন যে মাইক্রো-বিবর্তন ঘটলেও ঘটতে পারে তবে ম্যাক্রো-বিবর্তন নাকি একটি অসম্ভব ব্যাপার। চলুন তাহলে এখন বিবর্তনবাদ সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা এবং প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলােচনা করা যাক।

১) বিবর্তনবাদ শুধুই একটি তত্ত্ব (Theory) এর মধ্যে কোন বাস্তবতা বা সত্যতা (Fact) নেইঃ

এই ধরণের কথা যারা বলেন তাদের কাছে বোধহয় তত্ত্ব এবং বাস্তবতার  মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক পরিষ্কার নয়। চলুন প্রথমে না হয় সেটাই একটু পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করা যাক।

কোন পর্যবেক্ষণ যখন বারংবার বিভিন্নভাবে প্রমাণিত হয় তখন তাকে আমরা বাস্তবতা বা সত্য (Fact) বলে ধরে নেই। আর এদিকে তত্ত্ব হচ্ছে এই বাস্তবতা বা পরীক্ষিত কোন অনুকল্প কিভাবে ঘটছে সেই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা। যেমন ধরুন, আপেল কেন মাটিতে পড়ে- তা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র দিয়ে তা খুব ভালভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। এখানে আপেল পড়ার ব্যাপারটা হচ্ছে বাস্তবতা।

আর নিউটনের মহাকর্ষের সূত্র যা দিয়ে এই আপেল পড়ার প্রক্রিয়াটাকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে তা হল তত্ত্ব। দেখা গেল এই মহাকর্ষ তত্ত্ব খুব ভালভাবেই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করছে। কিন্তু আইনস্টাইন এসে দেখালেন যে নিউটনের মহাকর্ষ নিয়ম কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে সঠিক ফল দেয় না। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে কখন? যখন বস্তু কণা ছুটতে থাকে আলাের বেগের কাছাকাছি কিংবা যে সমস্ত জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব খুব বেশী (যেমন ব্ল্যাক হােলের কাছাকাছি)।

দেখা গেল যে, এ সমস্ত পরিস্থিতিতে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের চেয়ে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার ব্যাপক তত্ত্ব (General theory of relativity) আরও নিখুত ফলাফল দেয়। শুধু তাে তাই নয়, এইতাে সেইদিন বহুলভাবে স্বীকৃত বিজ্ঞানের সাময়িকী Disccover এর আগষ্ট ২০০৬ সংখ্যায় দেখলাম মাের্ডেহাই মিলগ্রম (Mordehai Milgrom) নামের এক বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের তত্ত্বকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন, কারণ মাের্ডেহাইয়ের তত্ত্বে সেই রহস্যময় ‘ডার্ক ম্যাটার’ এর ধারণা গ্রহণ করার দরকার পড়ে না।

তাহলে কি আমরা বলবাে, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিউটনের (বা আইনস্টাইনও যদি কখনও ভুল প্রমাণিত হয়) মহাকর্ষের সুত্রকে ব্যাখ্যা করেছিলেন তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে বিধায় গাছ থেকে আপেল পড়া বন্ধ হয়ে গেছে নাকি আপেলগুলাে গাছের ডাল এবং মাটির মাঝামাঝি শুন্যে ঝুলে রয়েছে?

আপেলের পতন তাে আর নিউটন বা আইনস্টাইনের তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল হয়ে বসে নেই। বিজ্ঞান তাে স্থবির নয়, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া সাক্ষ্যগুলাের চুলচেরা ক্রস-বিশ্লেষণের পরেই এরকম তত্ত্বগুলাে হাজির করা হয়। যে তত্ত্বটি সবচেয়ে ভালভাবে বাস্তবতাকে (Reality) এ মুহূর্তে ব্যাখ্যা করতে পারছে সেই তত্ত্বটিকেই গ্রহণ করা হয়। তার পরও যদি দেখা যায় যে, এর চেয়ে আরও ভালাে বিশ্লেষণ পরবর্তীতে পাওয়া যাচ্ছে, তখন বিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ীই যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ব্যাখ্যাটাকে গ্রহণ করা হয়।

বিজ্ঞান এভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যায়, নতুন নতুন এবং উন্নততর তত্ত্বের মাধ্যমে বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমের বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটতে থাকে। এদিকে আবার কিছু বাস্তবতা বা সত্য আছে যা চোখের সামনে সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু প্রতিবারই তাকে পরােক্ষভাবে প্রমাণ করা সম্ভব, যেমন ধরুন পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘােরে, বা অণু পরমাণুর গঠন ইত্যাদি, কিন্তু এরা যে বাস্তব তা নিয়ে তাে সন্দেহর কোন অবকাশ নেই।

বিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই কথাই প্রযােজ্য। এটি একটি বাস্তবতা যে, জীব স্থির নয় বরং বিবর্তনের মাধ্যমে তাদের পরিবর্তন ঘটে আসছে, তাদের কাউকেই পৃথক পৃথকভাবে তৈরী করা হয়নি, তারা সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তন বা পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়েছে। এই বাস্তবতাটি গত দেড়শাে বছর ধরে বারবার হাজারাে রকমভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আগের অধ্যায়গুলােতে এই প্রমাণগুলাে নিয়ে বিস্তারিত আলােচনা করা হয়েছে।

কিন্তু কিভাবে কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিবর্তন ঘটছে, কোন তত্ত্বের মাধ্যমে এই বিবর্তনের প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রমাণ করা যাবে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও বিতর্ক চলছে। ডারউইন নিজেও এই দুটো বিষয়কে আলাদা করে উপস্থাপন করেছিলেন। ‘The Descent Of Man‘ বইতে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেন যে, এখানে তিনি দু’টো পৃথক বিষয় নিয়ে আলােচনা করছেন। প্রথমটি হচ্ছে যে কোন প্রজাতিকেই পৃথকভাবে তৈরি করা হয়নি, প্রকৃতিতে বিবর্তনের মাধ্যমে নতুন নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে আর দ্বিতীয়তঃ প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানতঃ এই পরিবর্তনগুলাে ঘটে থাকে।

তিনি এই বলেও সাবধান করে দেন যে, যদি তিনি ভুলবশতঃ প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর অত্যাধিক জোর দিয়েও থাকেন তবু তার মাধ্যমে অন্ততপক্ষে এটুকু প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে, প্রজাতির পৃথক পৃথক সৃষ্টির মতবাদটি অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়[২]। সৃষ্টিতত্ত্ববাদীরা দাবী করেন যে, যেহেতু বিজ্ঞানীরা নিজেরাই এখনও বিবর্তন নিয়ে তর্ক বিতর্ক করে যাচ্ছেন তা থেকে নাকি প্রমাণিত হয় বিবর্তনবাদের কোন ভিত্তি নেই। আবারও, একই কথা বলতে হয় এর উত্তরে। বিজ্ঞানীরা বিবর্তন কিভাবে ঘটছে অর্থাৎ বিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলেও বিবর্তনবাদের মূল বিষয়বস্তু অর্থাৎ বিবর্তন আদৌ ঘটছে কিনা তা নিয়ে একবারও সন্দেহ প্রকাশ করেন না।

কারণ বিবর্তনের বাস্তবতা অনেক আগেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়ে গেছে, এখন বিতর্ক চলেছে। বিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে। যেমন ধরুন, প্রাকৃতিক নির্বাচন যে বিবর্তনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া তা নিয়ে কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে এটিই কি একমাত্র বা প্রধানতম কারণ নাকি এমন অনেক জেনেটিক বা বংশগতীয় পরিবর্তন থাকতে পারে যারা প্রাকৃতিক নির্বাচনের আওতাভুক্ত না হয়েই বিবর্তন ঘটাতে পারে, কিংবা আসলেই কি বিবর্তন শুধুমাত্র ধীর পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে নাকি কোন কোন সময় তার এই গতিতে উল্লম্ফনও ঘটতে পারে।

বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে বিচার করলে এই বিতর্কগুলােকে অত্যন্ত সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিক বলেই ধরে নিতে হবে। এর মাধ্যমেই হয়তাে একদিন আমরা সুস্পষ্টভাবে বলতে পারবাে ঠিক কোন কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবর্তন ঘটছে। কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্ববাদীরা যখন একে পুঁজি করে বিবর্তনবাদের দুর্বলতা খুঁজতে থাকেন তখন তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান না হয়ে পারা যায় না।


 বিবর্তনের পথ ধরে


২.↑  Gould SJ, 1994, Evolution as Fact and Theory.

শেয়ার করুন —
5 1 vote
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা