মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ

০১. প্যানস্পারমিয়া (Panspermia)

বেশিরভাগ বিজ্ঞানীরাই অনেকদিন ধরে বিশ্বাস করে আসছিলেন যে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশ একান্তভাবেই পৃথিবীর নিজস্ব ঘটনা। প্রচলিত চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী, কয়েক বিলিয়ন বছর আগে রাসায়নিক বিবর্তনের ফলশ্রুতিতে উদ্ভব হয়েছে আদিমতম জীবন্ত কোষের। প্রাণের উৎপত্তির এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অজৈবজনি (Abiogenesis) যা এ বইয়ের প্রথম পাঁচটি অধ্যায়ে আলােচিত হয়েছে। এর বিকল্প একটি সম্ভাবনাও আছে তা হচ্ছে জীবন্ত কোষ না হলেও এদের পূর্বাবস্থা অর্থাৎ জীবনের বীজ মহাবিশ্বের অন্য কোথাও থেকে আসতে পারে। গত কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এই ধারণাকে বেশ খানিকটা বিশ্বাসযােগ্যতাও দিচ্ছে। অনেকেই এখন ধারণা পোষণ করেন যে পৃথিবীর জৈবমন্ডল মহাজাগতিক কোন বীজ থেকে উদ্ভূত হলেও হতে পারে।

বিজ্ঞানে না হলেও অন্ততঃ জনপ্রিয় ধারার কল্পবিজ্ঞানে অনেকদিন ধরেই এ ধরণের একটা ধারণা ঠাঁই করে নিয়েছিল যে, বহু আগে মহাজাগতিক কোন সভ্যতার মাধ্যমে আমাদের এই পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে। আমরা হয়তাে পৃথিবী নামক ল্যাবরেটরীতে তাদের সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা নিরীক্ষার ফসল। কিংবা বেখেয়ালে তাদের আবর্জনা আমাদের গ্রহে ছুড়ে ফেলার ফলে এখানে বিকশিত হয়েছে জীবনের। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এধরনের রং বেরং-এর কল্পকাহিনীকে খুব একটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন না। কিন্তু তারপরেও অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্কেলে হলেও মহাকাশ থেকে অন্য একটি উপায়ে পৃথিবীতে প্রাণের বীজের আগমন ঘটার সম্ভাবনাকে অনেক বিজ্ঞানী গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করেন।

মহাশূন্যের হিমশীতল পরিবেশে কিছু সাধারণ অণু দুর্বল রেডিও এনার্জি নির্গত করে চলেছে। প্রতিনিয়ত। জোতির্বিজ্ঞানীরা রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে এধরনের অণুগুলােকে পর্যবেক্ষণ করে আসছেন অনেকদিন ধরেই। খুব বেশি দিন আগে নয়, বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে, সামান্য কিছুসংখ্যক পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত সরল ধরনের অণু ছাড়া অন্য কোন অণু মহাশূন্যে থাকা অসম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের পরিসীমা রইলাে না যখন তারা মহাশূন্যে আবিষ্কার করলেন বিভিন্ন ধরনের অনেক জটিল অণু। যেহেতু জটিল অণুর অস্তিত্ব আছে কাজেই মহাশূন্যের গ্যাসীয় ক্ষেত্রে জীবনের মৌলিক অণুসমুহ যেমন অ্যামিনাে অ্যাসিড গঠিত হওয়া খুব অসম্ভব কিছু নয়। পৃথিবী পৃষ্ঠে ভূপতিত হওয়া অনেক উল্কাপিন্ডেও একই ধরনের জটিল অণু পাওয়া গেছে। মহাশূন্যে ধূলিকণাকে আশ্রয় করেও জটিল অণু থাকতে পারে এবং যদি সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক অণু থাকে তবে তাদের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাও অসম্ভব নয়। যদিও মহাশূন্যের হিম ঠান্ডার কারণে এর জন্য প্রয়ােজন হবে মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের।

প্রায় এক শতাব্দী আগে নােবেল পুরষ্কার বিজয়ী রসায়নবিদ আরহেনিয়াস (Svante Arrhenius) এবং সত্তরের দশকে ফ্রেড হােয়েল (Fred Hoyle) এবং চন্দ্র বিক্রমাসিংহে (Chandra Wickramasinghe) মত দেন যে, জীবনের মৌলিক ধরণ খুব সম্ভবত উদ্ভব হয়েছে মহাশূন্যে। উল্কাপিন্ড বা ধুমকেতুতে সওয়ার হয়ে অতঃপর ‘প্রাণ’এসে পৌঁছেছে। পৃথিবীতে। পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির এই ধারণাকেই বলা হয় প্যানস্পারমিয়া (Panspermia)। নব্বই এর দশকে Hale-Bopp এবং Hyakutake ধুমকেতু পর্যবেক্ষণরত বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে এই ধুমকেতুদ্বয় থেকে নিঃসৃত বাষ্পের মধ্যে জটিল রাসায়নিক পদার্থ মিথেন এবং ইথেন সহ আরাে অনেক আকর্ষণীয় অণু রয়েছে।

ম্যাক্স বার্নস্টেইন (Max Bernstein) এবং জ্যাসন ডর্কিন (Jason Dworkin) নব্বই এর দশকের শেষ দিকে বহির্বিশ্বে জীবনের উৎপত্তির এই সম্ভাবনা নিয়ে নাসার ক্যালিফোর্নিয়াস্থ অ্যাস্ট্রোবায়ােলজী ল্যাবরেটরীতে কাজ শুরু করেন। বরফ এবং ন্যাপথালিনের সংমিশ্রণে তারা মহাশূন্যের কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন এবং মহাশূন্যে রেডিও অ্যাস্ট্রোনােমারদের আবিষ্কৃত রাসায়নিক পদার্থ Polycyclic aramatic hydrocarbons (PAH) যােগ করেন এর সাথে। অতঃপর এর মধ্য দিয়ে ক্রমাগত চালনা করেন অতি বেগুনি রশ্মি। এর ফলে দেখা গেল যে, কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগুলাে আংটি আকৃতির Quinones অণুতে পরিণত হয়েছে যা জীবন্ত কোষে প্রাপ্ত অণুর হুবহু প্রতিরূপ। কাজেই মহাশূন্যের সুশীতল পরিবেশের মধ্যে সুদীর্ঘ সময়ে এই অণুগুলাে একত্রিত হয়ে অত্যন্ত প্রাথমিক ধরনের জীবন গড়ে তুলতে পারে।

জীবন্ত হােক বা না হােক উল্কাপিন্ড বা ধুমকেতুর মাধ্যমে পৃথিবীতে আগত রাসায়নিক পদার্থসমূহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার চাইবা (Christopher Chyba) বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবীর সাগর মহাসাগরের সমস্ত জল এবং বায়ুমন্ডলের সব বাতাসই ধুমকেতু থেকে এসেছে। কারণ পৃথিবী শীতল হওয়ার আগে এতে কোন জল বা বাতাস কিছুই ছিল না।

পঞ্চাশের দশকে রসায়নবিদ হ্যারলড উরে (Harold Urey) এবং তার ছাত্র স্ট্যানলি মিলার (Stanley Millar) শিকাগাে বিশ্বাবিদ্যালয়ের গবেষণাগারে জীবনের উৎপত্তির জন্য কোন ধরনের পরিবেশ প্রয়ােজন সে বিষয়ে তাদের সুবিখ্যাত গবেষণা পরিচালনা করেন (চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। প্রাণের উৎপত্তির আগে পৃথিবীর শৈশব অবস্থায় যে সমস্ত উপাদান বিদ্যমান ছিল তাদের একটি মিশ্রণ বায়ু নিরােধক ফ্লাস্কে তারা তৈরি করেন। তারপর এর মধ্য দিয়ে শত শত ঘন্টা ধরে ইলেক্ট্রিক চার্জ, স্পার্ক পরিচালনা করেন তারা। ফ্লাস্ক খােলার পর তারা দেখতে পান যে, রাসায়নিক বিক্রিয়া সরল ধরণের অণুগুলােকে জটিল ধরনের অণুতে যেমন এ্যামিনাে অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। এই গবেষণার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ এই কারণে যে, এ্যামিনাে অ্যাসিড প্রােটিন গঠনের উপাদান এবং প্রােটিনই মূলত পরবর্তীতে তৈরি করে ডিএনএ। মাত্র কয়েক সপ্তাহে গবেষণাগারেই যদি এই বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটতে পারে তবে প্রকৃতিতে লক্ষ কোটি বছরে কি পরিমাণ পরিবর্তন হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।

গত বিশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা উল্কাপিন্ডের অভ্যন্তরে আটকে পড়া গ্যাসের মিশ্রনকে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, পৃথিবীতে প্রাপ্ত তিরিশটির বেশি উল্কাপিন্ড মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে এসেছে। ইতােমধ্যে জীববিজ্ঞানীরা এমন কিছু জীবাণু আবিষ্কার করেছেন যে গুলাে এই উল্কাপিন্ডের অভ্যন্তরে থেকে মহাশূন্যে স্বল্প পাল্লার ভ্রমণে টিকে থাকতে সক্ষম (যদিও আপাতত কেউই দাবী করছে না যে, এই জীবাণুগুলাে সত্যি সত্যিই গ্রহান্তরে ভ্রমণ করেছে)। কিন্তু জীবাণুগুলি এই ধারণার নীতিগত ভিত্তির প্রমাণ হিসাবে কাজ করেছে। এটা অসম্ভব নয় যে, প্রাণ হয়তাে উৎপত্তি হয়েছিল মঙ্গলে। তারপর তা স্থানান্তরিত হয়েছে পৃথিবীতে। অথবা এর বিপরীতটাও হতে পারে, পৃথিবীতে উৎপত্তি হয়ে সেখান থেকে প্রাণ গেছে মঙ্গলে।

এই বিষয়ে সম্যক জ্ঞান অর্জনের জন্য গবেষকরা বর্তমানে গভীরভাবে জৈবিক বস্তুসমূহকে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে স্থানান্তরের উপায় নিয়ে গবেষণা করছেন। এই প্রচেষ্টা হয়তাে আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু অমূল্য প্রশ্ন যেমন, কোথায় এবং কেমন করে প্রাণের উৎপত্তি হলাে কিংবা পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের জৈবিক কাঠামাে ভিত্তিক প্রাণ সম্ভব কিনা অথবা এই মহাবিশ্বে প্রাণ কি অতি স্বাভাবিক ঘটনা কিনা- ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর জোগাতে সাহায্য করবে।

উনবিংশ শতাব্দীতে লুই পাস্তুর কর্তৃক স্বতঃজনন তত্ত্ব পরিত্যক্ত হবার পর দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিকদের কাছে জড় বস্তু থেকে প্রাণের উৎপত্তি এমনই অবাস্তব ছিল যে, তাদের মধ্যে অনেকেই ধারণা পােষণ করতেন যে রেডিমেড প্রাণ পৃথিবীর বাইরের অন্য কোথাও থেকে এসেছে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে ধারণাটা জোরালাে হলেও প্যানস্পারমিয়ার মূল প্রকল্পটি আসলে অনেক প্রাচীন। আড়াই হাজার বছর আগের গ্রীক দার্শনিক আনাক্সাগােরাস (Anaxagorus) প্যানস্পারমিয়া (Panspermia) নামের একটি অনুকল্প (Hypothesis) প্রস্তাব করেন। এই অনুকল্প অনুযায়ী সমস্ত প্রাণী এবং সমস্ত জড়বস্তু বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অতি ক্ষুদ্র বীজ থেকে উৎপন্ন হয়েছে।

প্যানস্পারমিয়ার আধুনিক রূপটি অবশ্য পৃথিবীতে কিভাবে প্রাণের উৎপত্তি হলাে তার চেয়ে কিভাবে জৈবিক বস্তুসমূহ তৈজস্ক্রিয়তা, শৈত্যের প্রভাব ইত্যাদির মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে ‘সজীর অবস্থায়’ এসে পৌঁছেছে তার সমাধান পেতে বেশি আগ্রহী। যেখানেই উৎপত্তি হােক না কেন প্রাণকে জড় বস্ত থেকেই উৎপত্তি হতে হয়েছে এটা নিঃসন্দেহ। এই অজৈবজনির (Abiogenesis) বাস্তবতা তাে পঞ্চাশের দশকে ইউরে-মিলার তাঁদের বিখ্যাত পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণ করেই দেখিয়েছেন। এই বাস্তবতার মঞ্চায়ন পৃথিবীতে হতে পারে, কিংবা হতে পারে দূরবর্তী কোন গ্রহে, কিংবা হয়ত মহাশূন্যে।

প্রাণ উৎপত্তির এই নবতর ধারণাই প্যানস্পারমিয়া নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিতর্ককে উস্কে দিয়েছে। সৌরজগতের প্রাথমিক বিশৃঙ্খল অবস্থায় পৃথিবীতে এসে পড়েছে সরল জৈবিক বস্তু সম্বলিত অসংখ্য উল্কাপিন্ড। তরুণ সেই পৃথিবী এনজাইম্যাটিক ফাংশন সম্বলিত জটিল ধরনের জৈবিক বস্তুও যে পায়নি তারও নিশ্চয়তা নেই। এই জৈবিক পদার্থগুলাে যদিও প্রাণহীন অবস্থায় ছিল, কিন্তু জীবনের দিকে অনেকখানি অগ্রসর অবস্থায় যে ছিল তা বলাই বাহুল্য। পৃথিবীর প্রাণ সহায়ক পরিবেশে এসে পড়ার পর এই অণুগুলাে জীবন্ত কোষে পরিণত হওয়ার বিবর্তনের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছে। অবশ্য মধ্যবর্তী একটি অবস্থাও সম্ভব। প্রাণ হয়তাে পৃথিবী এবং মহাবিশ্ব দু’জায়গাতেই উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে প্রাণ উৎপত্তির কোন পর্যায় কোথায় হয়েছে এবং উৎপত্তির পর প্রাণ কতদূর বিস্তৃত হয়েছে?

প্যানস্পারমিয়া নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানীরা প্রথম দিকে এই ধারণার যথার্থতা যাচাইয়ের দিকেই শুধুমাত্র মনযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তারা অন্য গ্রহ বা উপগ্রহ থেকে কি পরিমাণ জৈবিক বস্তু পৃথিবীতে এসেছে তা পরিমাপ করার চেষ্টা করছেন। আন্তঃগ্রহিক এই যাত্রা শুরু করার আগে বস্তু গুলােকে আগে উল্কা বা ধূমকেতুর প্রভাবে তাদের নিজস্ব গ্রহ বা উপগ্রহ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। মহাশূন্যে ভ্রমনের এই পর্যায়ে এসে প্রস্তর খন্ড বা ধূলিকণাগুলােকে অন্য গ্রহ বা উপগ্রহের মাধ্যাকর্ষণের আওতার মধ্যে পড়তে হয়েছে এবং তারপরে যথেষ্ট পতনশীল বেগ অর্জন করতে হয়েছে সেই গ্রহের বায়ুমন্ডলকে ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে এসে পড়ার জন্য।

এই ধরনের স্থানান্তর খুব ঘন ঘনই সৌরজগতে ঘটেছে। দেখা গেছে গ্রহচ্যুত বস্তুদের সূর্যের নিকটবর্তী গ্রহের তুলনায় দূরবর্তী গ্রহের দিকে এবং বৃহৎ গ্রহের উপর পতিত হওয়া সহজতর। ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার অ্যাস্ট্রোফিজিসিষ্ট ব্রেট গ্লাডম্যান (Bret Gladman) এর করা ডাইনামায়িক সিমুলেশনের ফলাফল অনুযায়ী মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে বস্তুসমূহের স্থানান্তরের হার পৃথিবী থেকে মঙ্গলে স্থানান্তরের তুলনায় অনেক বেশি। এই কারণে প্যানস্পারমিয়ার যে সম্ভাবনাটি ইদানীংকালে সবচেয়ে বেশি আলােচিত তা হচ্ছে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে অণুজীব বা এর প্রাক-অবস্থার স্থানান্তর।

মঙ্গলের উপর উল্কা বা ধুমকেতুর প্রভাব সংক্রান্ত সিমুলেশনে দেখা যায় যে, গ্রহচ্যুত বস্তুগুলাে বিভিন্ন কক্ষপথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। গ্লাডম্যান এবং তার সহকর্মীরা হিসাব করে দেখলেন যে, প্রতি কয়েক মিলিয়ন বছরেই মঙ্গল উল্কা বা ধুমকেতুর প্রভাবে বড় ধরনের ঝাঁকুনি খায়। এতে করে এর পৃষ্ঠদেশ থেকে প্রস্তরসমূহ বিচ্যুত হয়ে মহাশূন্যে রওনা দেয় এবং পরবর্তীতে এর কিছু অংশ পৃথিবীতে এসে পতিত হয়। আন্তঃগ্রহিক যাত্রা সাধারণত  খুবই সুদীর্ঘ হয়ে থাকে। মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে পতিত বেশিরভাগ ১ টনের উল্কাপিন্ডগুলাে কয়েক মিলিয়ন বছর মহাকাশে কাটিয়ে তারপর পৃথিবীতে আসে। কিন্তু অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ (প্রতি মিলিওনে ১টি) এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে এসে পড়ে। মুঠি সাইজের পাথরগুলাে বছর তিনেকের মধ্যেই পৃথিবীতে পৌঁছে যায়। ছােট ছােট নূড়িপাথর বা ধূলিকণাগুলাে আরাে দ্রুতগতিতে আন্তঃগ্রহিক যাত্রা সম্পন্ন করে।

প্রশ্ন হচ্ছে জৈবিক অস্তিত্ব এই সুদীর্ঘ মহাকাশ ভ্রমনে বেঁচে থাকতে পারবে কি না? প্রথমতঃ ধরা যাক, যে ভয়ংকর প্রভাবে উল্কাপিন্ড তার নিজস্ব গ্রহ থেক বিচ্যুত হচ্ছে তার প্রভাবে। অণুজীবগুলাে টিকে থাকতে পারবে কিনা? সাম্প্রতিক গবেষণাগার পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, কিছু ব্যাক্টেরিয়া উচ্চ চাপসম্পন্ন গ্রহচ্যুতির গতি এবং ধাক্কা সামাল দিয়ে টিকে থাকতে সক্ষম। অবশ্য যদি গ্রহচ্যুতির প্রাক প্রভাব এবং প্রচন্ড গতির কারণে যে তাপ উৎপন্ন হবে তাতে উল্কাপিন্ডের অভ্যন্তরের জৈবিক বস্তুকে একেবারেই ধ্বংস করে না দেয়।

প্লানেটারি ভূতত্ত্ববিদরা আগে বিশ্বাস করতেন যে, গ্রহচ্যুতির প্রাক-প্রভাব এবং মঙ্গলের মুক্তিবেগের চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন যে কোন বস্তু নিশ্চিতভাবেই বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার কথা বা নিদেনপক্ষে গলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। মঙ্গল বা চাঁদ থেকে আগত অগলিত এবং প্রায় অক্ষত উল্কাপিন্ড আবিষ্কৃত হওয়ার পর অবশ্য এই ধারণা পরবর্তীতে বাতিল হয়ে গেছে। ইউনিভার্সিটি অফ আরিজোনার বিজ্ঞানী এইচ জে মেলােশ (H. Jay Melosh) হিসাব করে দেখান যে, মঙ্গলের স্বল্প সংখ্যক প্রস্তরখন্ড কোন রকম উত্তপ্ত না হয়েই পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। মেলােশ বলেন যে, উল্কার বা ধুমকেতুর আঘাতে যে উর্ধ্বমুখী চাপের সৃষ্টি হয় তা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এসে ১৮০ ডিগ্রি কোণে ঘুরে যায় ফলে ভূপৃষ্ঠের পাতলা একটি আস্তরণের নীচে এই চাপ বাতিল হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘Spall zone’। ভূপৃষ্ঠের নীচের। স্তর যেখানে ভয়ংকর চাপ অনুভব করে, সেখানে এই ‘Spall zone’ খুব কম চাপই অনুভব করে। ফলে পৃষ্ঠদেশের প্রস্তর অবিকৃত অবস্থায় প্রবল গতিতে মহাশূন্যে বিচ্যুত হতে পারে।


 মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা/সমালোচনা