মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ

০১. ড্রেকের সমীকরণ (Drake’s Equation)

পোস্ট টপিক

বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে সৌর জগতের বাইরে বুদ্ধিমান প্রাণী খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলােচনার জন্য একদল বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলী ১৯৬১ সালে জড়াে হয়েছিলেন ওয়েষ্ট ভার্জিনিয়ার গ্রীনব্যাংক মানমন্দিরে। সম্মেলনে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সবাই মহাবিশ্বে বুদ্ধিমত্তা অনুসন্ধানে অগ্রণী কর্মী। তিন দিনের সম্মেলন শেষে জন লিলির (John Lilly) ডলফিনের বুদ্ধিমত্তার গল্প শুনে তারা নিজেদের নামকরণ করেন The Order of the Dolphin হিসাবে।

এই সম্মেলনেই জোতির্বিদ ফ্রাঙ্ক ড্রেক (Frank Drake) সুবিশাল এই মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান সভ্যতা পরিমাপ করার একটি পদ্ধতি প্রস্তাব করেন। তিনি তার এই পদ্ধতি একটি সমীকরণ আকারে উপস্থাপন করেছিলেন। সমীকরণটি নিম্নরূপ,

N = R*. Fp . Ne . F1. Fi . Fc . L

যেখানে,

N = সভ্যতার সংখ্যা
R* = প্রতি বছর আমাদের ছায়াপথে জন্ম নেওয়া জীবন সহায়ক নক্ষত্রের সংখ্যা
Fp = এই নক্ষত্র গুলাের মধ্যে যে গুলােতে গ্রহজগত আছে তার সংখ্যা
Ne = প্রতিটি নক্ষত্রের গ্রহজগতের মধ্যে প্রাণ সহায়ক গ্রহের সংখ্যা
F1 = প্রাণের বিকাশ সম্ভব এমন গ্রহসমূহের মধ্যে সত্যিকারভাবে প্রাণের বিকাশ হয়েছে এমন গ্রহের সংখ্যা
Fi = প্রাণের বিকাশ হওয়া গ্রহসমূহের মধ্যে আবার যে গুলােতে বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ হয়েছে তার সংখ্যা।
Fc = বুদ্ধিমান প্রাণী যারা যােগাযােগের মাধ্যম হিসাবে বেতার প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে।
L = ঐ সমস্ত সভ্যতার গড়পড়তা আয়ুষ্কাল।

 

ড্রেকের সমীকরণে, আমাদের ছায়াপথে প্রতিবছর জন্ম নেওয়া নক্ষত্রের সংখ্যাকে, এই নক্ষত্র গুলাের মধ্যে যে গুলােতে গ্রহজগত আছে তার সংখ্যা, যেগুলােতে প্রাণের বিকাশ সম্ভব এমন গ্রহজগতের গড় সংখ্যা, প্রাণের বিকাশ সম্ভব এমন গ্রহসমূহের মধ্যে সত্যিকারভাবে প্রাণের বিকাশ হয়েছে এমন গ্রহের সংখ্যা, প্রাণের বিকাশ হওয়া গ্রহসমূহের মধ্যে আবার যে গুলােতে বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ হয়েছে তার সংখ্যা, বুদ্ধিমান প্রাণী মহাবৈশ্বিক যােগাযােগের উপায় বের করেছে এমন গ্রহের সংখ্যা এবং ঐ সমস্ত সভ্যতার গড়পড়তা আয়ুষ্কালের ভগ্নাংশ দিয়ে গুণ করে N বা মহাজাগতিক সভ্যতার সংখ্যা বের করা হয়।

ড্রেকের সমীকরণ
চিত্র ৮.১: ফ্রাঙ্ক ড্রেক এবং তার বিখ্যাত সমীকরণ।

উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বােঝা যাক। ধরা যাক, কোন একটি কোন স্কুলের একটি নির্দিষ্ট বছরে পাশ করা ছাত্রদের মধ্যে কতজন জোতির্বিজ্ঞানী হবে তার একটি ধারণা করা হচ্ছে। মনে করা যাক, এই স্কুল থেকে প্রতিবছর এক হাজার ছাত্র পাশ করে বের হচ্ছে। এই সংখ্যাকে গুন করতে হবে এই ছাত্রদের মধ্যে যারা একদিন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট হয়ে বের হবে সেই ভগ্নাংশ দিয়ে। ধরা যাক, ৬০ শতাংশ (০.৬) ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছাত্রদের থেকে প্রতি দশজনের মধ্যে তিনজন বা ৩০ শতাংশ (০.৩) বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশােনা করবে। এদের মধ্যে হয়তাে মাত্র ১১ শতাংশ (০.১১) জোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য আবেদন করবে। ধরে নিই নাসা (NASA) প্রতি পাঁচ বছরে একবার করে জোতির্বিজ্ঞানী নিয়ােগ প্রদান করে এবং আবেদনকৃত বিজ্ঞানীদের মধ্য থেকে মাত্র এক শতাংশকে কাজে যােগানের সুযােগ দেয়। এখন, সমস্ত সংখ্যাগুলােকে একত্রে গুন করলে পাওয়া যাচ্ছে ১ (১০০০ × ০.৬ × 0.৩ × ০.১১ × ০.০১ = ১)। অর্থাৎ এই স্কুলের পাসকৃত ছাত্রদের মধ্যে মাত্র একজনের জোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে।

Order of the Dolphin এর সদস্যরা এই সমীকরণের মানগুলির জ্ঞানভিত্তিক অনুমান (Educated Quess) করার চেষ্টা করেন এবং প্রতিটি মানের বাস্তবভিত্তিক উচ্চসীমা এবং নিম্নসীমা নির্ধারণ করে দেন। যেহেতু তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দেওয়ার মতাে সরাসরি পর্যবেক্ষণমূলক যথেষ্ট তথ্য প্রমানাদি হাতে ছিল না, কাজেই মূলতঃ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন জোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানে তাদের ব্যাপক অভিজ্ঞতার উপর তারা নির্ভর করেছিলেন।

যদিও এই মানগুলাে তাত্ত্বিক যুক্তির উপরেই মূলতঃ নির্ভরশীল ছিল, তা সত্ত্বেও আজ এতদিন পর তাদের দেওয়া মানগুলােই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান কাল পর্যন্ত যত ধরনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়েছে তার কোনটিই বড় ধরনের কোন মতানৈক্য তৈরি করতে পারেনি সেই মানগুলাে সম্পর্কে।

R*- প্রতি বছর আমাদের ছায়াপথে জন্ম নেয়া জীবন সহায়ক নক্ষত্রের সংখ্যা

ড্রেক যখন তার সমীকরণটি দাঁড় করান তখন এই একটমাত্র ফ্যাক্টর যা প্রকৃত তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। ১৯৬১ সালে বিজ্ঞানীরা জানতেন যে মিল্কিওয়ে ছায়াপথ (যাকে আমরা অনেকে ‘আকাশ গঙ্গা’ নামে ডাকি) প্রায় দশ থেকে বিশ বিলিয়ন বছর আগে জন্ম নিয়েছে এবং প্রায়। কয়েক বিলিয়ন নক্ষত্রের সমাহারে গড়ে উঠেছে এই ছায়াপথ। যদি ছায়াপথ তার জন্মের পর থেকে একই হারে নক্ষত্রের জন্ম দিয়ে থাকে তবে প্রতি বছর প্রায় বিশটি করে নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে। গ্রীনব্যাংকের বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন যে এদের মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক নক্ষত্রই পৃথিবীর মত গ্রহ থাকার জন্য যথেষ্ট স্থিতিশীল এবং দীর্ঘজীবি হওয়ার কথা। কাজেই তারা R*-এর মান নির্ধারণ করলেন প্রতি বছরে ১০।

আজকে আমরা দূরবর্তী ছায়াপথের গবেষণা থেকে জানি যে ছায়াপথে নক্ষত্রের জন্মহার সময়ের সাথে সাথে কমে যেতে থাকে। আমরা যেহেতু এই মুহূর্তে সভ্যতা খুঁজছি কাজেই আমরা অনেক বেশি আগ্রহী সেই সব নক্ষত্রের প্রতি যেগুলাে পাঁচ থেকে দশ বিলিয়ন বছর আগে সূর্যের কাছাকাছি সময়ে জন্ম নিয়েছে। তখন থেকে নক্ষত্রের জন্মহার প্রতি বছরে দশ থেকে পাঁচে নেমে গেছে যা ড্রেকের অনুমানের চেয়ে অনেক কম। তবে এখানেই কাহিনীর শেষ নয়।

এদের মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে অত্যন্ত অনুজ্জ্বল, স্বল্প ভরের নক্ষত্র যা লাল বামন (Red Dwarf) নামে পরিচিত। জীবন সহায়ক গ্রহের উপস্থিতির সম্ভাবনা হিসাবে লাল বামন তারাগুলােকে অনেক আগেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই ধরনের নক্ষত্রগুলােকে পরিভ্রমণরত গ্রহগুলােকে পর্যাপ্ত উষ্ণতা পেতে হলে নক্ষত্রের এতখানি কাছাকাছি থাকতে হয় যে এতে করে গ্রহগুলাে সমকালীন ঘূর্ণনে (Synchronous rotation) আবদ্ধ হয়ে যেতে হয়।

‘সমকালীন ঘূর্ণন’ হচ্ছে এমন অবস্থা যেখানে গ্রহের এক গােলার্ধ চিরকাল নক্ষত্রের দিকে মুখ করে থাকে ফলে সেই গােলার্ধের তাপমাত্রা হয় অসম্ভব রকমের বেশি। অন্যদিকে অন্য গােলার্ধ যা আজীবনের জন্য অবস্থান করে নক্ষত্রের বিপরীত দিকে তা পরিনত হয় এমনই ঠান্ডায় যে এই গােলার্ধের গ্যাসীয় মন্ডল পর্যন্ত জমাট হয়ে পৃষ্ঠদেশে জমা হয়ে যায়। এই ভয়ংকর চরম তাপমাত্রায় প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করাই দুরূহ।

অবশ্য বর্তমানে লাল বামন তারাদের গ্রহদের এই ভয়ংকর পরিবেশের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান গবেষনাসমূহ থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে, বাতাস উষ্ণ গােলার্ধ থেকে তাপ বহন করে শীতল অংশে নিয়ে যায়। এতে করে উষ্ণ এবং শীতল অংশের সঙ্গমস্থলে এমন একটি সহনীয় পর্যায়ের তাপমাত্রার অঞ্চল তৈরি হয় যে সেখানে জীবনের উদ্ভব হওয়া বিচিত্র কিছু নয়।

কাজেই সব লাল বামন তারাকে হিসাবের মধ্যে নিলে বর্তমানে R* এর মান বছরে ৫ থেকে ১০ আসে যা ১৯৬১ সালের হিসাবের অনুরূপ।

Fp – এই নক্ষত্র গুলাের মধ্যে যে গুলােতে গ্রহজগত আছে তার সংখ্যা

১৯৬১ সালে জোতির্বিদরা সূর্য ছাড়া এমন একটাও নক্ষত্র খুঁজে পাননি যেটাতে গ্রহমণ্ডল আছে। তা সত্ত্বেও Order of the Dolphin এর সদস্যরা সেই সময়কার প্রচলিত তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ধরে নিয়েছিলেন যে, এই মহাবিশ্বে গ্রহের উপস্থিতি অতি স্বাভাবিক ঘটনা এবং মহাবিশ্বের অর্ধেক সংখ্যক নক্ষত্রেরই গ্রহমণ্ডল থাকবে বলে তারা মত দিয়েছিলেন।

আজকে আমাদের জ্ঞানের যে পর্যায় তাতে আমরা গ্রীন ব্যাংকের বিজ্ঞানীদের চেয়ে আরাে ভালভাবে এই হিসাব করতে পারি। ১৯৯৫ সাল থেকে বিজ্ঞানীদের বেশ কয়েকটি দল ১৭০ টিরও বেশি নক্ষত্র খুঁজে পেয়েছেন যাদের আমাদের সৌরজগতের মতই গ্রহজগত রয়েছে। যে সমস্ত নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে কমপক্ষে দশ শতাংশেরই গ্রহজগত আছে। তবে এ সংখ্যাও যে পুরােপুরি সঠিক তা বলা যায় না। বর্তমান প্রচলিত প্রযুক্তি নেপচুনের চেয়ে ছােট এবং অপেক্ষাকৃত ধীরগতিতে কক্ষপথে ভ্রাম্যমান গ্রহদেরকে চিহ্নিত করতে পারে না।

এরমধ্যে আবার বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের এমন সব জায়গায় গ্রহ আবিষ্কার করছেন যেখানে গ্রহ থাকার সম্ভাবনাকে একসময় নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল। উদাহরণ হিসাবে দ্বৈত নক্ষত্রের (Double Stars) কথা বলা যেতে পারে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের জিওফ মার্সির (Geoff Marcy) মতে মহাবিশ্বে গ্রহসহ নক্ষত্রের সংখ্যা সম্ভবত নব্বই শতাংশের মতাে।

Ne – প্রতিটি নক্ষত্রের গ্রহজগতের মধ্যে প্রাণ সহায়ক গ্রহের সংখ্যা

একসময় বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতে ভেনাস থেকে মঙ্গল পর্যন্ত একটি কাল্পনিক এলাকাকে প্রাণের সহায়ক অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন যদিও ভেনাস এবং মঙ্গলকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আমাদের সৌরজগতে একটিমাত্র গ্রহ পৃথিবীতেই শুধুমাত্র প্রাণসহায়ক পরিবেশ আছে বা প্রাণের বিকাশ ঘটেছে। কাজেই এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞানীরা ওই সময় Ne এর মান হিসাবে ১ কে ধরে নিয়েছিলেন।

গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বিস্ময়কর উপলব্ধি হচ্ছে যে প্রাণকে একসময় যতটা নাজুক মনে করা হতাে আসলে তা নয়। প্রাণ অনেক কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। আমাদের সৌরজগতের অনেক গ্রহকেই আগে যতখানি রুদ্রমুর্তির মনে করা হতাে তারা আসলে ততখানি নিষ্ঠুর নয়। কিছু চরমজীবী (Extremophiles) পাওয়া গেছে সাগরের তলদেশে যেখানকার তাপমাত্রা ফুটন্ত পানির চেয়েও বেশি, পাওয়া গেছে হিমশীতল মেরুর বরফের মধ্যে, পাওয়া গেছে মাটির অনেক গভীর তলদেশে (ষষ্ঠ অধ্যায় দ্রষ্টব্য)।

এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এমনই শক্তপােক্ত যে তাদের টিকে থাকার জন্য কোন অক্সিজেনেরই প্রয়ােজন হয় না। এই ধরনের প্রাণীদের পক্ষে মঙ্গলের ভূগর্ভস্থ সাগরে, কিম্বা বৃহস্পতির তিন বরফে আচ্ছাদিত উপগ্রহের জমাট বরফের নিচের জলীয় অংশে বা শনির উপগ্রহ টাইটানের হাইড্রোকার্বন আচ্ছাদিত পৃষ্ঠদেশের নিচে অবস্থিত পানিতে খুব অনায়াসেই টিকে থাকা সম্ভব। কাজেই দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞানীদের প্রাণ-সহায়ক এলাকার ধারণা আগে ছিল অনেক বেশি সীমাবদ্ধ। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্রত্যেকটা গ্রহমণ্ডলেই একাধিক গ্রহ থাকতে পারে যেখানে প্রাণের জন্য সহায়ক পরিবেশ বিদ্যমান।

F1 – প্রাণের বিকাশ সম্ভব এমন গ্রহসমূহের মধ্যে সত্যিকারভাবে প্রাণের বিকাশ হয়েছে এমন গ্রহের সংখ্যা

ড্রেকের সমীকরণের ভিতরে যতই অগ্রসর হওয়া যায় ততই এর রাশিগুলাের মান অনিশ্চিত হতে থাকে। আমরা এখন পর্যন্ত পৃথিবী ছাড়া অন্য কোন গ্রহ বা উপগ্রহতে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি। কাজেই আমাদের কাছে কোন বস্তুনিষ্ঠ তথ্য নেই যার ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি যে জীবনের বিকাশ হঠাৎ করে একবারই ঘটেছে নাকি এর উৎপত্তি মহাবিশ্বে অনিবার্য ছিল।

দিন দিন অবশ্য যে সমস্ত তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে তাতে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটার ক্ষেত্রই উজ্জ্বল হচ্ছে। পৃথিবীতে প্রাণের মৌলিক উপাদান হচ্ছে পানিসহ মাত্র ডজন দু’য়েক অণু। আর এ সমস্ত অণু নক্ষত্রের জন্মস্থান নাক্ষত্রিক মেঘে বিপুল পরিমানে বিদ্যমান। সাম্প্রতিক পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে যে গ্রহসমূহে জমাট আকারে থাকা কার্বন কনিকা গুলাে প্রােটিন গঠনের উপাদান এমিনাে এসিড তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। এ ব্যাপারটি সত্যি হলে ছায়াপথের যে কোন নক্ষত্রেই গ্রহ জন্মের সময়ই এতে জীবন গঠনের উপাদানসমূহ থেকে যাওয়ার কথা।

ড্রেক এবং তার সহকর্মীরা খুব পরিমিতভাবেই F1 এর মান ধরেছিলেন দশ শতাংশ যা এখনকার পরিপ্রেক্ষিতেও যুক্তিসঙ্গত। অবশ্য এই মান লাফ দিয়ে বেড়ে যেতাে যদি পৃথিবীর বাইরে অন্য কোথাও জীবনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেতাে।

Fi – প্রাণের বিকাশ হওয়া গ্রহসমূহের মধ্যে আবার যে গুলােতে বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ হয়েছে তার সংখ্যা

স্টিফেন জে গুল্ড (Stephen Jay Gould) মানুষকে ‘বিবর্তনের দুর্ঘটনা’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং যুক্তি দিয়েছিলেন যে পৃথিবীর ইতিহাসের সামান্যতম হেরফের হলেই হয়তাে আমরা এই ধরণীতে অবতীর্ণ হতাম না। কিন্তু কথা হচ্ছে মানুষ না থাকলেও বিবর্তন কি অন্য কোন চিন্তাশীল বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ ঘটতাে? অন্য কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, বুদ্ধিমত্তা কি এতই অত্যাবশ্যকীয় যে তা আজ হােক বা কাল হােক আত্মপ্রকাশ করবেই?

একটা উপায়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়, তা হচ্ছে পৃথিবীতে অন্য কোন প্রাণী বুদ্ধিমত্তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে কিনা? ডলফিনের ফসিলের খুলি পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, গত পঞ্চাশ মিলিয়ন বছরে এর মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। আরাে অসংখ্য প্রাণী বিশেষ করে কিছু তিমি এবং পাখি গত দশ মিলিয়ন বছরে তাদের শরীরের তুলনায় ক্রমবর্ধমানহারে মগজের আকৃতি বৃদ্ধি করে চলেছে। কয়েক দশক আগে ড্রেক এবং তার সহযােগীরা Fi -এর মান ধরে নিয়েছিলেন ১ এর কাছাকাছি। বর্তমানে আমাদের হাতে প্রমাণ রয়েছে যে, বিবর্তনের যাত্রাপথ বুদ্ধিমত্তার উন্নতির দিকে ইঙ্গিত করে।

Fc = বুদ্ধিমান প্রাণী যারা যােগাযােগের মাধ্যম হিসাবে বেতার প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে।

কোন একটা প্রাণী বুদ্ধিমান হলেই যে মহাকাশে বেতার তরঙ্গ পাঠাবে তা নাও হতে পারে। কারণ হতে পারে এ মহাবিশ্বে অসংখ্য গ্রহ আছে যার অধিবাসীরা হয়তাে দক্ষ ভাষাবিদ, অসাধারণ কবি, সুরকার কিন্তু বেতার জ্যোতির্বিদ্যায় অক্ষম। ফলে তাদের পক্ষে বেতার তরঙ্গ প্রেরণ বা শ্রবণ হয়ত সম্ভব নয়। এমনকি আমাদের পৃথিবীতেও খুব কম সংখ্যক জাতিই বিজ্ঞানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। প্রাচীন গ্রীস বা ভারতবর্ষের কথা বলা যায়। এখানে দার্শনিক উন্নয়ন যতটা হয়েছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। সব জাতিকেই যে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটাতে হবে তা কিন্তু নয়।

তারপরও এটা মােটামুটি নিশ্চিত যে কোন একটি প্রজাতির যদি কথা বলার মতাে বুদ্ধিমত্তা থাকে এবং সেই সাথে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি যেমন হাতুড়ি বাটালের ব্যবহার করতে জানে তবে সেই প্রজাতি বিজ্ঞান, যান্ত্রিক প্রযুক্তি এবং পরবর্তীতে বেতার প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হবেই। বৈজ্ঞানিক কোন আবিষ্কার ঘটবার পর পরই এটি এতােই প্রয়ােজনীয় হয়ে পড়ে যে তা বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। কোন কোন সমাজ হয়তাে আদিম চাকা পর্যায়ে আটকে যেতে পারে, কিন্তু মাত্র একজন বিজ্ঞানীই হয়তাে সেই অবস্থা থেকে উত্তোরণ ঘটিয়ে দিতে পারেন।

যেমন করেছিলেন ম্যাক্সওয়েল ১৮৬৪ সালে, বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্বের মিথস্ক্রিয় কিভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করে। এরপর মাত্র এক প্রজন্মের মধ্যেই অসংখ্য ব্যক্তি আদিম ধরনের বেতার যন্ত্র নিয়ে কাজ করেছেন। দুই প্রজন্ম পরেই ড্রেক এমন একটি বেতার ডিশ ব্যবহার করেছেন যা কয়েক আলােকবর্ষ দূরের সঙ্কেত গ্রহণ করতে সক্ষম ছিল। কাজেই Fc -এর মান আগের মতােই একশ শতাংশের কাছাকাছি বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।

L-ঐ সমস্ত সভ্যতার গড়পড়তা আয়ুষ্কাল

মহাবিশ্বে প্রতি মুহূর্তে জন্ম নেওয়া সত্ত্বে যদি প্রযুক্তিগত সভ্যতাগুলাে নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলে তবে আমরা তাদেরকে খুঁজে পাবাে না। ঠান্ডা যুদ্ধের যুগে অনেক গবেষকই দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন এই ভেবে যে প্রযুক্তিগত সভ্যতার আয়ুষ্কাল হয়তাে অস্বাভাবিক রকমের স্বল্প দৈর্ঘের- মাত্র শ’ দুয়েক বছর বা তারও কম। বেতার প্রযুক্তি উদ্ভবের দক্ষতার জন্য যে ধরনের সময়ের প্রয়ােজন তা পারমানবিক প্রযুক্তির দক্ষতার জন্য প্রয়ােজনীয় সময়ের প্রায় কাছাকাছি। কাজেই বিজ্ঞানীদের যুক্তি ছিল যে, বেতার সম্প্রচার শুরু করার পরপরই হয়তাে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ব্যবহৃত পারমানবিক অস্ত্রে কারণে সেই সভ্যতা ও ধ্বংস হয়ে যায়।

আত্মধ্বংস ছাড়াও স্রেফ প্রাকৃতিক কারণেও কোন সভ্যতা বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে। যেমন, এটি হতে পারে কাছাকাছি কোন নক্ষত্রে সুপারনােভা বিস্ফোরণের কারণে। এ ধরণের সুপারনােভা বিস্ফোরণ ঘটে কোন কোন তারার একেবারে ‘মরণ দশায়’, যখন তারাটি তার সমস্ত জ্বালানী একেবারে নিঃশেষ করে ফেলে। এদের অনেকগুলােই তখন আভ্যন্তরীণ প্রচন্ড মহাকর্ষের চাপ আর বিপরীতমুখী তাপীয় চাপের টানাপড়েন সইতে না পেরে নিজের বাইরের খােলনলচে উপরে ফেলে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যায় আর মহাকাশে প্রচন্ড শক্তি নির্গত করে।

সে শক্তির এমনই তেজ যে শত সহস্র আলােক বর্ষ দূরের গ্রহ থেকেও আলাের ঝলকানি টের পাওয়া যায়। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহান কেপলার এমনি এক সুপারনােভা বিস্ফোরণ দেখেছিলেন ১৬০৪ সালের ৯ ই অক্টোবর, যেটি ঘটেছিল পৃথিবী থেকে ২০ হাজার আলােক বর্ষ দূরের কোন এক নক্ষত্রে (চিত্র : ৮.২)। ওই নক্ষত্রটি যদি এত দুরে না থেকে পৃথিবীর কাছাকাছি থাকত তবে তবে পৃথিবীর ‘জীবন লীলা’ যে তখনই সাঙ্গ হত তা বলাই বাহুল্য। কাজেই মহাবিশ্বের কোথাও বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটলেও তার কাছাকাছি সুপারনােভা বিস্ফোরণ কিংবা অন্য কোন প্রাকৃতিক কারণে তা বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে আমাদের সাথে কোন রকম যােগাযােগ করার আগেই।

Kepler's-Supernova
চিত্র ৮.২: সুপারনােভা এসএন ১৬০৪ এর ভগ্নাবশেষের ছবি (চন্দ্র এক্স রে মানমন্দির থেকে প্রাপ্ত)

গত দশকে এই হতাশাজনক চিন্তাভাবনার বেশ কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। যেমন বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুপারনােভা বিস্ফোরণের ফলে কোন দূরবর্তী গ্রহে গণবিলুপ্তি ঘটলেও প্রাণের বিকাশ পুরােপুরি রুদ্ধ নাও হতে পারে, কিংবা পুনর্বার সেখানে প্রাণের বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে পারে। যেমন, আমাদের পৃথিবীতেই চার থেকে সাড়ে চার কোটি বছর আগে যে গণবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছিল, যাকে ‘অর্ডোভিসিয়ান-সিলুরিয়ান এক্সটিংকশন’ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে, তার পেছনে সম্ভবতঃ সুপারনােভা বিস্ফোরণই ছিল দায়ী। তারপরও দেখা গেছে গণবিলুপ্তির কাছে পুরােপুরি আত্মসমর্পন না করে সর্বংসহা পৃথিবী প্রাণে প্রাণে স্পন্দিত হয়েছে পুনর্বার।

আবার প্রাযুক্তিক অগ্রগতির অনিবার্যতাকে যদি মানুষের মত কোন উন্নত সভ্যতা আত্মধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তা হলেও সে গ্রহে কিছু প্রজাতি, বিশেষ করে ‘নিম্ন প্রজাতির’ অণুজীবেরা টিকে থাকতে পারে। এরপর কি সে গ্রহে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আবারাে আরেক বুদ্ধিমান প্রজাতির অভ্যুদয় ঘটবে? এটা জানার কোন উপায় নেই। তবে পৃথিবীর অতীত ইতিহাস পর্যালােচনা করলে ব্যাপারটি অসম্ভব নয় বলেই মনে হয়।

আমরা জানি জুরাসিক যুগে ডায়নােসরেরা অন্য প্রাণীদের তুলনায় জৈবিকভাবে অনেক অগ্রসর ছিল। তারপরও পৃথিবীর বুকে এক বিশাল উল্কাপাতের ফলে আজ থেকে সাড়ে ছ’কোটি বছর আগে তারা সার্বিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সে সময় টিকে ছিল কিছু তুচ্ছ স্তন্যপায়ী প্রাণী। সেই স্তন্যপায়ী জীবদের থেকেই সাড়ে ছ’কোটি বছরের বিবর্তনের ফল আমরা- আজকের মানুষেরা। আজকের মানুষেরা যদি এ মুহূর্তে বিলুপ্ত হয়ে যায়, হয়ত আরাে সাড়ে ছ’কোটি বছর পর এ ধরণীতে আরেক বুদ্ধিমান প্রজাতির অভিব্যক্তি ঘটবে। তারাও যদি কোন আন্তঃ কলহ, পারমানবিক যুদ্ধ কিংবা স্টার ওয়ারের ভিতর দিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আরাে সাড়ে ছ’কোটি বছর পর আরাে এক বুদ্ধিমান এবং উন্নত সভ্যতার উদ্ভব হতে পারে।

এবং এই প্রক্রিয়া হয়ত অব্যাহত থাকবে। সূর্যের মত মাঝারি গোছের নক্ষত্রের আয়ু ধরা হয় পাঁচশ কোটি বছর। আর বুদ্ধিমান প্রজাতির বিলুপ্তি আর অভ্যুদয়ের প্রতিটি পর্ব যদি সাড়ে ছয় কোটি বছর হয়, তবে ওই পাঁচশ কোটি বছরে সাতাত্তর বার বুদ্ধিমান প্রজাতির উদ্ভব ঘটতে পারে। এটি একটি সুযোগ বটে, পৃথিবীর জন্য এবং মহাকাশের অন্যান্য গ্রহের জন্যও। হয়ত এমনও হতে পারে, সর্বশেষ বুদ্ধিমান প্রজাতিটি তাদের পূর্ববর্তী বুদ্ধিমান প্রজাতিগুলাের নির্বুদ্ধিতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আত্মধ্বংস পরিহার করার উপায় বের করে ফেলবে, নিজেদের সভ্যতাকে মহাকাশের অন্য নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত করে ফেলবে।

আত্মধ্বংস ছাড়াও বিজ্ঞানীদের উপর ভিন্ন ধরনের অন্য এক দুঃশ্চিন্তা এসে ভর করেছে। বর্তমানকালে টেলিভিশন সম্প্রচারের জায়গা অতি দ্রুত দখল করে নিচ্ছে ফাইবার অপটিক কেবল এবং সরাসরি সম্প্রচারের স্যাটেলাইট। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই হয়তাে পৃথিবীতে আর কোন বেতার সঙ্কেত থকবে না। এই ধরনের প্রযুক্তিগত বিবর্তন ভিনগ্রহের সভ্যতার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে L এর মান ছােট হতে বাধ্য। প্রযুক্তিগত সভ্যতার আত্মধ্বংস বা যােগাযােগের মাধ্যমের উন্নতির ফলে বেতার-প্রযুক্তিগত যােগাযােগ নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া সম্ভব, তা সে যে কোন কারণেই হােক না কেন। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত মানব সভ্যতার মাত্র গত ষাট বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা। নাটকীয়ভাবে এই পরিস্থিতি পালটেও যেতে পারে। যখন কোন প্রযুক্তিগত সভ্যতা রকেট আবিষ্কার করে তখন সেই সভ্যতা আশেপাশের এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করবে এটা ধরে নেওয়াই স্বাভাবিক। আর এর জন্য তারা হয়তাে তৈরি করবে তাদের সৌরজগত বিস্তৃত GPS, যা থেকে প্রতিনিয়ত বিচ্ছুরিত হবে বেতার সঙ্কেত।

ড্রেক L-এর মান নির্ধারণ করেছিলেন ১০,০০০ বছর। অন্যরা কেউ এর মান ধরেছেন ড্রেকের চেয়ে অনেক কম, আবার কেউ কেউ এর মান ধরেছেন ড্রেকের চেয়ে অনেক বেশি। এটাই এই সমীকরণের একমাত্র রাশি যেখানে অনুমান করা ছাড়া আর কোন গতি নেই।

N: এবং উত্তর হচ্ছে ……….

ড্রেক এবং তার অনুগামীরা যখন তাদের সর্বোত্তম অনুমানগুলো সমীকরণে প্রয়ােগ করেছিলেন তখন এর মান বের হয়েছিল কয়েক হাজার। অর্থাৎ এই মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব এতােই স্বাভাবিক যে পৃথিবী থেকে একহাজার আলােকবর্ষ দূরেই ভিনগ্রহের সভ্যতা থাকার কথা।

ড্রেক এবং তার অনুগামীদেরকে ভবিষ্যত বক্তা হিসাবে আখ্যায়িত করলেও খুব একটা ভুল হবে না। বর্তমান সময়ের সমস্ত তথ্য প্রমাণ অনুযায়ী ড্রেকের সমীকরণ এখনাে শক্ত ভিতের উপর দাড়িয়ে আছে। ড্রেক নিজেই বলেন,

আমাদের ওই সময়কার অনেক অনুমানই বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়েছে।

অবশ্য এর বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারতাে। জোতির্বিজ্ঞানীরা হয়তাে আবিস্কার করতে পারতেন যে, এই মহাবিশ্বে গ্রহ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন, অথবা প্রাণের বিকাশের মত উপযােগী অঞ্চল খুবই কম। কিন্তু তার পরিবর্তে বিশ্বজগৎ সম্পর্কে আমাদের ক্রম অগ্রসরমান জ্ঞান ড্রেকের সমীকরণের যথার্থতাই শুধু প্রমাণই করছে না বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তা একে ছাড়িয়েও যাচ্ছে। যার কারণে গত ছেচল্লিশ বছরের ফলাফলহীন সন্ধানের পরও অনেক বিজ্ঞানীই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে এই বিপুল মহাবিশ্বে আমরা হয়তাে একা নই।

মাইকেল ক্রিসটন (John Michael Crichton) ড্রেকের সমীকরণকে ‘ফালতু’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। যেহেতু ড্রেকের সমীকরণ পরীক্ষা করা যায় না কাজেই এটি বিজ্ঞান নয় বলে তিনি দাবী করেন। তার মতে, ড্রেকের সমীকরণ বিজ্ঞানের নামে “ক্ষতিকর আবর্জনা’ তৈরির দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। যেহেতু ড্রেকের সমীকরণে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাশির মানগুলােকে বস্তুনিষ্ঠভাবে যাচাই করা সম্ভবপর নয়, কাজেই ড্রেকের সমীকরণের উত্তরও মােটামুটি অনুমান ছাড়া আর কিছু নয়।

তবে ক্রিচটনের এই সমীকরণকে একেবারেই ‘ফালতু’ বলাটা পুরােপুরি ঠিক হয়নি। ড্রেকের সমীকরণ বিভিন্ন সমস্যাগুলাে কিভাবে যৌক্তিকভাবে সম্পর্কযুক্ত তাই ব্যাখ্যা করে, এদের সংখ্যাগত মান আমরা জানি কিনা সেটা মুখ্য বিষয় নয়। জোতির্বিজ্ঞানীরা খুব ভাল করেই জানেন যে, ড্রেকের সমীকরণ কোন কিছুই এই মুহূর্তে হাতে নাতে প্রমাণ করতে পারে না। এই সমীকরণকে তারা দেখে থাকেন জটিল কোন বিষয়কে খন্ড খন্ড অংশে ভেঙ্গে সমাধানের উপায় হিসাবে। এ ধরনের বিশ্লেষণ বৈজ্ঞানিক চিন্তার জগতে হরহামেশাই হচ্ছে। নতুন পর্যবেক্ষণ এবং অন্তর্দষ্টি তৈরি হওয়ার সাথে সাথে প্রয়ােজনে ড্রেকের সমীকরণকে পরিবর্তন করা যেতে পারে বা সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপনও করা যেতে পারে। তবে বিষয়টির সুত্রপাত হিসাবে এই সমীকরণের ভূমিকা কিন্তু থেকেই যাবে।

প্রাচীনকালের ইতিহাস থেকে আমরা জানি, এরিস্টারকাস (Aristarchus) সর্বপ্রথম সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব (Helicentric View) এবং ডেমােক্রিটাস (Democritus) বস্তুর ‘পারমানবিক তত্ত্ব’ প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে তাদের এই ধারণা পরীক্ষা করা তাদের পক্ষে বা অন্য কারাে পক্ষেই সম্ভব ছিল না। সেই সময় ক্রিচটনের মতাে কিছু ব্যক্তিও নিশ্চয়ই ছিল যারা ওই সমস্ত ধারণাকে ক্ষতিকর হিসাবে মত দিতে দ্বিধাবােধ করেননি।

কিন্তু এই ধারণাগুলাে নীরবে শতাব্দীর পর শতাব্দী অপেক্ষা করে থেকেছে কোপার্নিকাস এবং গ্যালিলিওকে অনুপ্রাণিত করার জন্য। আধুনিক এটমিক থিওরীর পথিকৃৎ এই বিজ্ঞানীরা প্রাচীন সেই ধারণাগুলাে পরীক্ষা করার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। হয়তাে কয়েক শতাব্দী লেগে যেতে পারে কিন্তু একদিন যে ড্রেকের সমীকরণ এবং এর সকল উপাদান পরীক্ষনযােগ্য (Testable) হয়ে উঠবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।


 মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা/সমালোচনা