ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০১. ডারউইনের ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন’

আধুনিক বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা আরও বলেন, ডারউইনের ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন’ বা ‘যৌনতার নির্বাচন’ বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা রেখে থাকে তবে এর একটি প্রভাব আমাদের দীর্ঘদিনের মানসপট নির্মাণেও অবশ্যম্ভাবীরূপে পড়বে। যৌনতার উদ্ভবের কারণে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে নারী-পুরুষ একই মানব প্রকৃতির অংশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের মনোদৈহিক পার্থক্য জৈববৈজ্ঞানিক পথেই। নারীদের জননতন্ত্রের প্রকৃতি পুরুষদের জননতন্ত্র থেকে আলাদা। মেয়েদেরকে যে ঋতুচক্র, নয় মাসব্যাপী গর্ভধারণসহ হাজারো ঝুট-ঝামেলা পোহাতে- হয় পুরুষদের সেগুলো কোনোটিই করতে হয় না।

একটি পুরুষ, তাত্ত্বিকভাবে হলেও যে কোনো সময়ে এই পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নারীর গর্ভে অসংখ্য সন্তানের জন্ম দিতে পারে (কুখ্যাত চেঙ্গিস খানের মতো কেউ কেউ সেটা করে দেখিয়েছেও)। কিন্তু একটি মেয়ে এক বছরে শুধু একটি পুরুষের শুক্রাণু দিয়েই গর্ভ নিশ্চিত করতে পারে এর বেশি নয়। আসলে কেউ যদি বলেন, জৈববৈজ্ঞানিক দিক থেকে বিচার করলে যৌনতার উদ্ভবই হয়েছে আসলে নারী-পুরুষে পার্থক্য করার জন্য এটা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। এই পার্থক্যের প্রভাব ছেলে মেয়েদের মানস জগতেও পড়েছে, পড়েছে সমাজেও। কোনো গবেষকই এখন অস্বীকার করেন না যে যৌনতার বিভাজন নারী পুরুষে গড়ে দিয়েছে বিস্তর পার্থক্য শুধু দেহ কাঠামোতে নয়, তার অর্জিত ব্যবহারেও। সেজন্যই গবেষক ডোনাল্ড সিমন্স বলেন,

‘Men and women differ in sexual natures because throughout the immensely long haunting and gathering phase of evolutionary history of sexual desires and dispositions that were adaptive for either sex were for either sex were for the other tickets to reproductive oblivion.’।

মানব সভ্যতার যে কোনো জায়গায় খোঁজ নিলে দেখা যায় ছেলেরা সংস্কৃতি নির্বিশেষে মেয়েদের চেয়ে চরিত্রে বেশি ‘ভায়োলেন্ট’ বা সহিংস হয়ে থাকে, মেয়েরা বাচনিক যোগাযোগে (ভার্বাল কমিউনিকেশন) ছেলেদের চেয়ে বেশি পরিপক্ক হয়। ‘পলিগামি’ বা বহুগামিত্বের ব্যাপারটা মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে অধিকতর প্রবলভাবে দৃশ্যমান। সম্পর্কের মধ্যে প্রতারণা বা ‘চিট্‌’ ব্যাপারটাও কিন্তু মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা বেশি করে থাকে। আবার মেয়েরা প্রতারণা ধরতে অধিকতর দক্ষ।

আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু কিন্তু আলাদা। পুরুষের স্পার্ম বা শুক্রাণু উৎপন্ন হয় হাজার হাজার, আর সে তুলনায় ডিম্বাণু উৎপন্ন হয় কম। ডিম্বাণুর আকার শুক্রাণুর চেয়ে বড় হয় অনেক অর্থাৎ, জৈব বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে স্পার্ম সহজলভ্য, তাই কম দামি, আর সে তুলনায় ডিম্বাণু অনেক মূল্যবান। ‘স্পার্ম অনেক চিপ’ বলেই (সাধারণভাবে) পুরুষদের একটা সহজাত প্রবণতা থাকে বহু সংখ্যক জায়গায় তার প্রতিলিপি ছড়ানোর।

সেজন্য তথাকথিত আধুনিক একগামী সমাজেও দেখা যায় পুরুষেরাই বেশি প্রতারণা করে সম্পর্কে, আর আগেকার সময়ে রাজা বাদশাহদের হারেম রাখার কিংবা শক্তিশালী সেনাপতিদের যুদ্ধ জয়ের পর নারী অধিকারের উদাহরণগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। অপর দিকে ‘এগ ভালুয়েবল’ বলেই প্রকৃতিতে নারীরা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে থাকে অপেক্ষাকৃত খুঁতখুঁতে, কারণ তারা নিশ্চিত করতে চায় কেবল উৎকৃষ্ট জিনের দ্বারাই যেন তার ডিম্বাণুর নিষেক ঘটে। এ ছাড়া এর আগের অধ্যায়ে আমরা রবার্ট ট্রাইভার্সের ‘অভিভাবকীয় বিনিয়োগ’ (Parental Investment) অনুকল্পের সাথেও পরিচিত হয়েছি। যেহেতু নারীরা অভিভাবকীয় বিনিয়োগের সিংহভাগে জড়িত থাকে, তারা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে হয়ে উঠে অধিকতর হিসেবি এবং সাবধানী।

সেজন্যই প্রকৃতিতে দেখা যায়, পুরুষ ময়ূর পেখম তুলে দাঁড়িয়ে থাকে, ‘খুঁতখুঁতে’ ময়ূরী হিসেব নিকেশ করে নির্বাচন করে যোগ্যতম ময়ূরকেই তার সৌন্দর্যের ভিত্তিতে। পুরুষ কোকিল গান গাইতে থাকে তাদের সুমধুর গলায়, ফ্রুট ফ্লাইরা নাচতে থাকে স্ত্রী মাছিদের প্রণয় লাভের জন্য, পুরুষ চিত্রল হরিণেরা সম্মোহিত করতে চায় তাদের বর্ণাঢ্য শিং এর যাদুতে, আর স্ত্রীরা নির্বাচন করে তাদের মধ্যে যোগ্য পুরুষটিকে।

মানবসমাজের দিকে তাকানো যাক। সাধারণভাবে বললে, একজন পুরুষ তার সারা জীবনে অসংখ্য নারীর গর্ভে সন্তানের জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসে একজন পুরুষের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সন্তানের হিসেব পাওয়া যায় ব্লাড থার্স্টি মৌলে ইসমাইল-এর (১০৪২ জন সন্তান) । তাত্ত্বিকভাবে একজন পুরুষ গর্ভ সঞ্চার করতে পারে প্রতি মুহূর্তেই। অপরদিকে একজন নারী বছরে কেবল একটি সন্তানেরই জন্ম দিতে পারে। সে হিসেবে সাড়া জীবনে তার সন্তান সর্বোচ্চ ২০-২২টির বেশি হবার সম্ভাবনা নেই (যমজ সন্তানের হিসেব গোনায় আনছি না)।

বিবর্তনীয় পটভূমিকায় দেখা গেছে নারীরা যদি ক্রমাগত সঙ্গী বদল করতে থাকলে তা আসলে কোনো প্রজননগত উপযোগিতা (Reproductive Benefit) প্রদান করে না। তার চেয়ে বরং সন্তানের দেখাশোনায় শক্তি বেশি নিয়োজিত করলেই বরং ভবিষ্যৎ জিন টিকে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত এই কারণেই নারীদের মধ্যে বহুগামিতা থাকে পুরুষদের তুলনায় কম। সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, আদিম কিছু ট্রাইবে ভ্রাতৃয় বহুভ্রাতৃত্ব (Fraternal Polyandry), যেখানে সহোদর ভাইয়েরা মহাভারতের দ্রৌপদীর মতো একজন পত্নীর অংশীদার – দুচারটি জায়গায় দৃশ্যমান হলেও অভ্রাতৃয় বহুভ্রাতৃত্ব (Nonfraternal Polyandry) পৃথিবীর কোথাওই সেভাবে দৃশ্যমান নয়।

পর্নোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে বেশি, সেটা বোধ হয় না বলে দিলেও চলবে। কিন্তু মেয়েরা আবার ছেলেদের তুলনায় ‘লাভ স্টোরি’র বেশি ভক্ত। সিরিয়াল কিলারের সংখ্যা ছেলেদের মধ্যে বেশি, মেয়েদের মধ্যে খুবই কম। সংস্কৃতি নির্বিশেষে পুরুষদের টাকা পয়সা, স্ট্যাটাস ইত্যাদির মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, আর মেয়েদের সৌন্দর্যের। নৃতত্ত্ববিদ মেলভিন কনোর খুব পরিষ্কার করেই বলেন —

ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি সহিংস আর মেয়েরা অনেক বেশি সংবেদনশীল অন্তত শিশু এবং নাবালকদের প্রতি। এই ব্যাপারটা উল্লেখ করলে একে যদি ‘গতানুগতিক কথাবার্তা’ (Cliché) বলে কেউ উড়িয়ে দিতে চান সেটা এ সত্যকে কিছুমাত্র দমন করবে না।

ব্যাপারগুলো সঠিক নাকি ভুল, কিংবা ‘উচিত’ নাকি ‘অনুচিত’ সেটি এখানে বিচার্য নয়, বিচার্য হচ্ছে আমাদের সমাজ কেন এইভাবে গড়ে উঠেছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মন-মানসিকতা একটি নির্দিষ্ট ছকে সব সময় আবদ্ধ থাকে? এখানেই মানবপ্রকৃতি বিশ্লেষণে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান যতটা সফল, সমাজবিজ্ঞান ততটা নয়।

কেন সংস্কৃতি-নির্বিশেষে ছেলেরা সম্পর্কের মধ্যে থাকা অবস্থায় তার সঙ্গীর সাথে বেশি প্রতারণা করে কিংবা কেন পর্নোগ্রাফির বেশি ভক্ত এটি জিজ্ঞাসা করলে সমাজবিজ্ঞানী কিংবা নারীবাদীদের কাছ থেকে নির্ঘাত উত্তর পাওয়া যাবে যে, যুগ যুগ ধরে মেয়েদের সম্পত্তি বানিয়ে রাখা হয়েছে, তারা শোষিত এই মনোবৃত্তি তারই প্রতিফলন। কিন্তু যে সমস্ত সমাজে ছেলেমেয়েদের পার্থক্যসূচক মনোভাবের মাত্রা কম সেখানে কী তাহলে এ ধরনের ঝোঁক নেই?

না তা মোটেও নয়। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে ইসরায়েলের কিবুৎজ (Kibbutz) শহরের একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায়। সমাজে বিদ্যমান সমস্ত রীতি বা ট্যাবু আসলে জন্মগত নয়, বরং সংস্কৃতি থেকেই উদ্ভূত এই ধারণা থেকে সেখানকার অধিবাসীরা ঠিক করেছিল সমস্ত যৌনতার প্রভেদ মূলক পার্থক্যকে ওই শহর থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হবে। তার প্রক্রিয়া হিসেবে সেখানকার মেয়েদেরকে ছেলেদের মতো ছোট ছোট চুল রাখতে উৎসাহিত করা হলো, আর ছেলেদেরকে শেখানো হলো সহিংসতা ত্যাগ করে কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা যায়! যে সমস্ত মেয়েরা ‘টম বয়’ হয়ে জীবন কাটাতে চায়, তাদের পিঠ চাপড়ে সাধুবাদ জানানো হলো, ছেলেরা যেন ঘরের কাজ আর মেয়েরা যেন বাইরের কাজে দক্ষ হয়ে ওঠে সেজন্য যথাযথ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হলো।

অর্থাৎ সব মিলিয়ে কিবুৎজ সে সময় গণ্য হয়েছিল আদর্শবাদীদের স্বর্গ হিসেবে যেখানে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। কিন্তু তিন প্রজন্ম পরে দেখা গেল সেই ‘আদর্শ’ কিবুৎজ পরিণত হয়েছে সবচেয়ে সেক্সিস্ট বা যৌন বৈষম্যবাদী শহর হিসেবে। সেখানকার মানুষজন আদর্শবাদীদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে ফিরে গিয়েছিল সেই চিরন্তন গৎবাঁধা জীবনে। অভিভাবকদের আদর্শবাদী নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানেরা। ছেলেরা দেখা গেল, অভিভাবকদের দেখিয়ে দেয়া পথ অস্বীকার করে বেশি পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গণিত পড়তে শুরু করেছে, মেয়েরা বেশি যাচ্ছে মেডিকেলে।

তারা নার্সিং-এ কিংবা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশি। ছেলেদের ঘরের কাজ করার যে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল মেয়েরাই শেষপর্যন্ত ঘরদোর গোছানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। দায়িত্ব তুলে নেওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে তারা বলল, ‘আরে ছেলেরা ঠিকমত বাসা-বাড়ি পরিষ্কার রাখতে পারে না’। আর অন্যদিকে ছেলেরা বলল, ‘আরে যত ভালোভাবেই করি না কেন বউয়ের মর্জিমাফিক কিছুতেই হয় না’। ব্যাপারটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এ ধরনের বিভক্তিগুলোকে যতই অস্বীকার করে সাম্যের পথে সমাজকে ঠেলে দেয়া হয়, বিদ্যমান জৈববৈজ্ঞানিক পার্থক্যগুলো সে সমাজে তত প্রকট হয়ে উঠে। ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দেয়।


 ভালোবাসা কারে কয়

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়