বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০১. ছয় হাজার বছর বনাম কোটি কোটি বছর!

ছয় হাজার বছর বনাম কোটি কোটি বছর! মানুষের সীমিত ৭০-৮০ বছরের জীবনের সামনে দাড়িয়ে কয়েকশাে কোটি বছর হাতে পাওয়াকে অনন্ত কাল বলেই তাে মনে হওয়ার কথা। আগের অধ্যায়ে আমরা জেমস হাটন আর চার্লস লায়েলের কথা শুনেছি, তারাই দিয়েছিলেন ডারউইনকে এই মূল্যবান ‘সুদীর্ঘ সময়ের’ উপহার। অনেকে মনে করেন ডারউইন এদের কাছ থেকে এই অমুল্য উপহারটা না পেলে তিনি তার বিবর্তন তত্ত্বটা এত সহজে প্রমাণ করতে পারতেন না! প্রাণের বিবর্তন ঘটতে, এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতি তৈরি হতে লাগে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি বছর!

ডারউইন কিভাবে বিবর্তন এবং তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসতেন যদি তার মাথাটা বাইবেলের এই ছয় হাজার বছরের গন্ডিতেই আটকে থাকতাে? একটা বৈজ্ঞানিক মতের পূর্ব শর্তটাই যদি পূরণ করা না যায় তাহলে তত্ত্ব হিসেবে তাকে উপস্থাপন করা হবে কি করে? আদম হাওয়াকে না হয় আল্লাহ বা ঈশ্বর চোখের পলকে তৈরি করে টুপ করে পৃথিবীর বুকে ফেলে দিতে পারে; কাল্পনিক গল্প ফাঁদতে তাে আর সাক্ষ্য প্রমাণের দায়ভার থাকে না! কিন্তু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে মানুষের সামনে হাজির করতে হলে তাে লাগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, প্রমাণ এবং যুক্তির সমন্বয়!

ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের বুড়াে পৃথিবী কখন এই কাল্পনিক ছয় হাজার বছরের বেড়াজালে বাঁধা পড়ে গেলাে; কখন তার অসীম ব্যাপ্তি বিলীন হয়ে গেলাে মানুষ নামের এই দ্বিপদী প্রজাতিটার কল্পণা, কুসংস্কার আর ক্ষুদ্রতার মাঝে? খুব বেশীদিন আগে কিন্তু নয়, ১৬৫৪ সালে আইরিশ ধর্মযাজক জেমস আসার (James Ussher, 1581-1656) বাইবেলের সব জন্মতালিকা হিসেব কষে বের করেছিলেন যে আমাদের পৃথিবীর বয়স নাকি ছয় হাজার বছর!

অবশ্য মনে করা হয় যে এই ধরনের একটা গল্প ইউরােপীয় সমাজে হয়তাে আরও আগে থেকেই প্রচলিত ছিলাে, কারণ এর বেশ কিছুদিন আগে লেখা শেক্সপীয়ারের As You Like It নাটকে ছয় হাজার বছর বয়সের পৃথিবীর উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। তবে জেমস আসারই এই ধারণাটাকে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলেন, এবং তার ফলাফল হলাে ভয়াবহ – বিশেষ করে ভুতত্ত্ববিদ্যার ভবিষ্যৎ মুখ থুবড়ে পড়লাে আরও কয়েকশাে বছরের জন্য। আর তার হাত ধরে পিছিয়ে পড়লাে বিবর্তনবাদসহ জীববিজ্ঞানের অন্যান্য অগ্রগতি।

আসলে তাে বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের এই সংঘাত কোন নতুন ঘটনা নয়। ধর্ম কোন যুক্তি মানে না, ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে মানুষের মনের বিশ্বাস; আর এদিকে বিজ্ঞান হচ্ছে ঠিক তার উলটো, তাকে নির্ভর করতে হয় যুক্তির পরীক্ষালব্ধ প্রমাণের উপর। কোন অনুকল্পকে (Hypothesis) বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের (Theory) জায়গায় উঠে আসতে হলে তাকে কতগুলাে সুনির্দিষ্ট স্তর পার হয়ে আসতে হয় – প্রথমে গভীর পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, সমস্যার বিবরণ, সম্ভাব্য কারণ, ফলাফল ইত্যাদির উপর নির্ভর করে প্রকল্পটা প্রস্তাব করা হয়, তারপর তাকে প্রমাণ করার জন্য চলতে থাকে ক্রমাগত পরীক্ষা নিরীক্ষা।

বিভিন্ন পরীক্ষার থেকে পাওয়া ফলাফল এবং তথ্যের মাধ্যমে যদি প্রকল্পটাকে প্রমাণ করা না যায় তাহলে তাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। আর যদি দীর্ঘ দিন ধরে বারবার করে বিভিন্ন রকমের পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে প্রমাণ করা যায় এবং অন্য কোন বিজ্ঞানী এই প্রমাণের বিরুদ্ধে কোন তথ্য হাজির না করেন তবেই তাকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মর্যাদা দেওয়া হয়। এখানেই কিন্তু শেষ নয়, তার সাক্ষ্য প্রমানের দায় কখনই শেষ হয় না, বিজ্ঞানে বিমূর্ত বা অনাদি সত্য বলে কোন কথা নেই। এই প্রক্রিয়ায় একটা প্রচলিত এবং প্রমাণিত তত্ত্বকেও যে কোন সময় তথ্য হাজির না করেন তবে হয়। এখানেই কিন্তু শেষ আংশিক বা সম্পূর্ণ ভুল বলে প্রমাণ করা যেতে পারে, আজকে একটা তত্ত্বকে সঠিক বলে ধরে নিলে কালকেই তাকে ভুল প্রমাণ করা যাবে না এমন কোন কথা নেই।

তাই আমরা দেখি, নিউটনের তত্ত্ব পদার্থবিদ্যার জগতে কয়েকশাে বছর ধরে রাজত্ব করার পরও আইনস্টাইন এসে বিশেষ কোন কোন ক্ষেত্রে তার অসারতা প্রমাণ করে দিতে পারেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এরকম উদাহরণের কোন শেষ নেই, কারণ —

বিজ্ঞান কোন তত্ত্বকে পবিত্র বা অপরিবর্তনীয় বলে মনে করে না, বিজ্ঞান ধর্মের মত স্থবির নয়, সে গতিশীল। এখানেই তার সাথে ধর্মের পার্থক্য। ধর্ম মানুষকে প্রশ্ন করতে বারণ করে, হাজার বছরের পুরনাে ধ্যান ধারণাগুলােকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়াই ধার্মিকের দায়িত্ব।

প্রশ্ন করা যাবে না সৃষ্টিকর্তা কিভাবে সৃষ্টি হল, পৃথিবী আসলেই সমতল কিনা, ধর্মগ্রন্থগুলাের কথা মত আসলেই সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘােরে কিনা! চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে হবে যে একজন সৃষ্টিকর্তার হাতে মাত্র ছয় হাজার বছর আগে সমস্ত জীবের সৃষ্টি হয়েছিলাে, আর তারা অপরিবর্তিত অবস্থায়ই রয়ে যাবে অনাদিকাল ধরে। হাজারাে সাক্ষ্য প্রমান চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এর সবই ভুল, সবই মানুষের আদিম অজ্ঞানতার ফসল, কিন্তু তবুও এই মিথ্যাকেই যেনাে মেনে নিতে হবে।

আশার কথা হচ্ছে, কিছু সচেতন এবং সাহসী মানুষ বহু অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েও মিথ্যা এবং অন্যায়ের বিরদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন, আর তারই ফলশ্রুতিতেই এগিয়ে গেছে মানব সভ্যতা। তাই আমাদের এই সভ্যতার ইতিহাস হাজারাে রক্তাক্ত সংঘাতে ভরা – কোপার্নিকাস তাে মরে গিয়ে বাঁচলেন চার্চের রােষানল থেকে, মৃত্যুশয্যায় শােয়ার আগে তিনিও সাহস করেননি সৌরকেন্দ্রিক মতামতটি প্রকাশ করতে! বৃদ্ধ গ্যলিলিও হাটু গেড়ে ক্ষমা চেয়ে প্রাণ ভিক্ষা পেলেন, সাহসী ব্রুনােকে তাে প্রায়শ্চিত্ত করতে হলাে আগুনে আত্মাহুতি দিয়ে ….

সে যাই হােক, এখন তাহলে দেখা যাক, এই যাত্রায় মানব সভ্যতা কি করে বেড়িয়ে এসেছিল ছয় হাজার বছরের ভয়াবহ চক্রাবর্ত থেকে। চট করে একবার ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে নিলেই আমরা দেখতে পাবাে এখানেও সেই একই কাহিনী, ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মধ্যে সেই সংঘাতময় দ্বন্দ্বের ইতিহাস। সতেরশাে শতাব্দীতে ধর্মভীরু জেমস আসার যখন জেনেসিস (বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ক অংশ) থেকে হিসেব কষে পৃথিবীর বয়স বের করলেন তখন কিন্তু তার মনে সংশয়ের সৃষ্টি হল না। তিনি প্রশ্ন করলেন না – যে তথ্যের ভিত্তিতে তিনি গণনা করছেন তা কি করে বা কোথা থেকে আসলাে – দেড় হাজার বছর ধরে বাইবেলে স্রষ্টার বচন বলে যা বলা আছে তাকেই তিনি পরম সত্য বলে মেনে নিলেন।

এর বেশ আগেই অন্ধকার মধ্যযুগের ইতি ঘটে গেছে ইউরােপে, রেনেসাঁর যুগ মােটে শেষ হয়েছে, আর বিজ্ঞান হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কোপার্নিকাস, গ্যলিলিওর মত কিছু সাহসী বিজ্ঞানীর হাত ধরে পদার্থবিদ্যা এগিয়ে যেতে শুরু করলেও, জীববিজ্ঞান এবং ভুতত্ত্ববিদ্যা তখনও ধর্মের অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারপুর্ণ ব্যাখ্যার কারাগারেই জিম্মি থেকে গিয়েছিল। পৃথিবীর বয়স, প্রাণের সৃষ্টি, বিকাশ, প্রজাতির সৃষ্টি বা বিলুপ্তির ব্যাখ্যার জন্য মানুষ তখন বাইবেল, কোরান বা অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থে বলা কাল্পনিক গল্পগুলােরই স্মরণাপন্ন হত।

ষােলশ শতাব্দীর ইউরােপে যে কোন মানুষকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে আপনি জেনেসিসের গল্প ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেতেন না। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষিত ইউরােপীয়ানদের জিজ্ঞেস করলেই হয়তাে পেতেন বেশ অন্য ধরণের একটা উত্তর – পৃথিবীর বয়স আসলে অনেক অনেক বেশি, বাইবেলের কথাগুলােকে রূপক হিসেবেই নেওয়া উচিত, বিজ্ঞানের সাথে একে গুলিয়ে ফেলার
কোন দরকার নেই, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

চিন্তার এই উত্তরােণ কিন্তু একদিনে ঘটেনি। আসলে, বিজ্ঞানমনষ্ক কিছু মানুষ আরও অনেক আগে থেকেই এ সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে সেই ১৫১০ সালেই লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি (Leonardo Da Vinci, 1452 – 1519) সামুদ্রিক প্রাণী এবং ভূত্বকের বিভিন্ন স্তরের শীলাস্তুপ পরীক্ষা করে তার ডাইরি তে লিখেছিলেন, পৃথিবী মােটেও ছয় হাজার বছরে বা নুহের প্লাবন থেকে তৈরি হয়নি, এর তৈরি হতে লেগেছে তার চেয়ে ঢের বেশি সময়[৯]

তারপর সতেরশাে এবং আঠারশ শতাব্দীতে বেঁনে দেকার্তে (Rene Descartes, 1596 – 1650) থেকে শুরু করে বুফো (Comte de Buffon, 1707 – 1788 ), কান্ট (Imanuel Kant, 1724 – 1804) পর্যন্ত অনেকেই তখনকার দিনের সীমিত জ্ঞানের আলােকে পৃথিবীর বয়স নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন[৩]। তাদের মধ্যে অনেকেই ভুপৃষ্ঠ কিংবা পাহাড়ের গঠণ, ক্ষয়, শীলাস্তর, ভূত্বকের বিভিন্ন স্তরে পাওয়া ফসিল ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, পৃথিবীর বয়স ছয় হাজার বছরের চেয়ে অনেক অনেক বেশী। এত বড় বড় পরিবর্তন এত কম সময়ে ঘটা সম্ভব নয় – পৃথিবীর মাটি এবং জলের মধ্যে বহুবার স্থান বদল হয়েছে, আজকে যে পাহাড়গুলাে মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে তারা অনেকেই হয়তাে একসময় সমুদ্রের নীচে ছিলাে! বুফো ১৭৭৪ সালে উত্তপ্ত অবস্থা থেকে পৃথিবীর ঠান্ডা হয়ে এই অবস্থায় আসতে কত সময় লাগতে পারে তার হিসেব করে প্রস্তাব করেন যে, পৃথিবীর বয়স ৭৫ হাজার বছর বা তারও বেশী হবে [১০]

তার পরপরই ১৮০০ শতব্দীর বিজ্ঞানের রঙ্গমঞ্চে পা রাখেন ভূতত্ত্ববিদ জেমস হাটন (James Hutton, 1726-1797), তিনি তার সারা জীবনের ভূতাত্ত্বিক গবেষণার জ্ঞান থেকে ১৭৮৫ সালে বললেন – পৃথিবীর বয়স আসলে অনেক অনেক বেশী, পৃথিবী পৃষ্ঠের বিভিন্ন স্তরে যে রকমের ব্যাপক পরিবর্তন এবং বিবর্তন দেখা যাচ্ছে তা কোন মতেই কয়েক হাজার বছরের সৃষ্টি হতে পারে না, বহু কোটি বছর ধরে ধীর গতিতে এই পরিবর্তন ঘটে আসছে।

অনেকে মনে করেন জেমস হাটনই হচ্ছেন ভূতস্তুবিদ্যার জনক এবং তিনিই প্রথম বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাইবেলের বিপর্যয়বাদ বা প্রলয়বাদের বিরােধিতা করে deep time বা সুদীর্ঘ সময়ের ধারণার প্রচলন ঘটান। তিনি বললেন, আরম্ভের যেমন কোন চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না তেমনি শেষ হওয়ারও কোন ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। সে সময় পৃথিবীর বয়স হিসেব করে বের করার মত প্রযুক্তি হাতে না থাকায় তিনি ধরে নেন যে এর বয়স অসীম।

নারায়ণ সেন তার লেখা ‘ডারউইন থেকে ডিএনএ বইটিতে (২০০৪) চমৎকার কিছু পরিসংখ্যান এবং উদাহরণ দিয়েছেন – ‘বিশদ ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের সূত্রে হাটন বুঝেছিলেন প্রকৃতি আদতে ধীর গতিতে পৃথিবীর চেহারা পালটায়, যতই আমরা ঝড়, ঝঞ্চা, তুফানে কাতর হই না কেন। এই ধীর গতির রূপটি কয়েকটি আধুনিক পরিসংখ্যান থেকে বােঝা যাবে। জমির ক্ষয়ের কারণে, গড়পড়তায় প্রতি হাজার বছরে, নিচু জমিতে আনুমানিক মাত্র এক থেকে তিন সেন্টিমিটার এবং পাহাড়ি এলাকায় কুড়ি থেকে নব্বই সেন্টিমিটার মতাে উত্তোলিত হচ্ছে।

পৌরাণিক কাল থেকে হিমালয়ের সম্ভবত তিনশাে থেকে চারশাে মিটারের মত উচ্চতা বেড়েছে। বস্তুত ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ বলছে ছয় কোটি বছর আগে হিমালয়ের তখনকার মাটি ও স্তর সমষ্টি সমুদ্রের তলদেশে ছিল[১]। কিন্তু এসব পরিসংখ্যাণ তাে তখন হাটনের হাতের সামনে ছিলাে না, সে সময়ের রক্ষণশীল ইউরােপীয় সমাজ তাই হাটনের মতবাদের তীব্র বিরােধিতা করে এবং এক সময় দেখা যায় তার নাম ইতিহাসের পাতা থেকে প্রায় মুছেই দেওয়া হয়েছে।

প্রায় এক প্রজন্ম পর যথাযােগ্য মর্যাদায় তাঁকে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন লায়েল। ১৮৩০ সালে লায়েল বললেন, পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরের পরিবর্তনগুলাে ক্রমাগতভাবে ধীর প্রক্রিয়ায় অসীম সময় ধরে ঘটেছে, বাইবেলের পথ ধরে শুধুমাত্র নুহের মহাপ্লাবনের প্রলয়বাদ দিয়ে এদেরকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তিনি অবশ্য শুধু এই ধীর এবং ক্রমাগত প্রক্রিয়াকেই ভূস্তরের পরিবর্তণের একমাত্র কারণ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন যা পরে ভুল বলে প্রমানিত হয়; আসলে ধীর এবং আকস্মিক – দুই পদ্ধতিতেই কোটি কোটি বছর ধরে এই পরিবর্তন ঘটে আসছে। লায়েল সে সময় অত্যন্ত সুচারুভাবে তখনকার রক্ষণশীল ধার্মিক সমাজে তার এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

সে সময় চার্চের মধ্যযুগীয় প্রবল প্রতাপ যেহেতু দুর্বল হয়ে আসতে শুরু করেছিলাে তাই তাকে ব্রুনাে বা গ্যালিলিওর মত অবস্থার শিকার হতে হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞান তাে আর সেখানে থেমে থাকেনি। ১৮৬২ সালে লর্ড কেলভিন তাপগতি বিদ্যার (Thermo dynamics) সূত্র ব্যবহার করে পৃথিবীর বয়স ৯৮ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৮০ লক্ষ বছর বলে ঘােষণা করলেও পরে ১৮৯৭ সালে তাকে সংশােধন করে ২০ -৪০ মিলিয়ন বছরে নামিয়ে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে রাদারফোর্ড (Ernest Rutherford) প্রথমবারের মত রেডিও আ্যকটিভ পদ্ধতিতে পৃথিবীর বয়স মাপার কথা প্রস্তাব করেন। তার কয়েক দশকের মধ্যেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে প্রমাণ করেন যে, পৃথিবীর বয়স আসলে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বা সাড়ে চারশাে কোটি বছর [১০]

সে যাই হােক, এবার আবার ফিরে আসা যাক ডারউইনের গল্পে। হাটন এবং লায়েলের এই অবদানের হাত ধরেই চার্লস ডারউইন প্রকৃতিবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞানকে নিয়ে গেলেন এক নতুন স্তরে। তারাই উন্মুক্ত করে দিলেন অসীম সময় নিয়ে কাজ করার বহু শতাব্দীর বন্ধ দুয়ারটি। আমরা আগের অধ্যায়ে দেখেছি যে বীগেল যাত্রা থেকে ফিরে আসার সময়েই ডারউইন ক্রমশঃ জীবজগতের বিবর্তন বা ক্রমবিকাশ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে উঠছেন। তিনি নিশ্চিতভাবেই বুঝতে শুরু করেছেন যে, জীবজগৎ স্থির নয়, কোন দিন ছিলােও না, সৃষ্টির আদি থেকেই এর বিবর্তন ঘটে আসছে। ইংল্যান্ডে ফিরে এসেই তিনি সারা পৃথিবী ঘুড়ে সংগ্রহ করা নমুনাগুলাে নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজে লেগে যান। ১৮৩৮ সালে, আমরা দেখি, প্রথমবারের মত ডারউইন এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে লিখছেন[২],

‘এভাবেই মূল প্রজাতি থেকে প্রকারীরা (variation) বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ঠ নতুন প্রজাতির জন্ম হয়, আর মূল প্রজাতিটি ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায়, এবং তার ফলে টিকে যাওয়া প্রজাতির মধ্য বিচ্ছিন্নতার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় … তিনি নিঃসংশয় হয়ে বললেন প্রজাতি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়, একযুগ থেকে আরেক যুগে অভিযােজনের (adaptation) মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়।

কিন্তু এখন সমস্যা হল কিভাবে সবাইকে তিনি বােঝাবেন যে এতাে দিন ধরে তােমরা যা বিশ্বাস করে এসেছে তা সবই ভুল! তােমাদের ধর্মগ্রন্থগুলােতে বর্ণিত কাহিনীগুলাে শুধু কল্পনাপ্রসুতই নয়, চরম মিথ্যা আর ধোঁকায় ভরা! তিনি কি জানেন না বাইবেলের কোন কথাকে চ্যালেঞ্জ করার পরিণতি, তিনি কি ভুলে গেছেন তার পূর্বসূরী কোপার্নিকাস, বৃদ্ধ গ্যলিলিও বা সাহসী ব্রুনাের কথা! তাহলে ডারউইন এখন কি করবেন?


 বিবর্তনের পথ ধরে


১.↑     সেন না, ২০০৪, ডারউইন থেকে ডি এন এ এবং চারশাে কোটি বছর, আনন্দ পাবলিশার্স, কোলকাতা, ভারত।

২.↑     মজুমদার সু, ২০০৩, চার্লস ডারউইন এবং বিবর্তনবাদ, প্রকাশকঃ সােমনাথ বল, কোলকাতা, ভারত।

৩.↑      আখতারজ্জামান ম, ২০০২, বিবর্তনবাদ। হাসান বুক হাউস, ঢাকা, বাংলাদেশ।

৯.↑      Historic Figures: Leonardo Da Vinci, BBC History Archive ↑

১০.↑   Harter R, Changing Views of the History of the Earth, The Talk.Origins Archive ↑

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা