বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

০১. রূপকথার ফসিল!

প্রায় ৩৮০ কোটি বছর আগে প্রাণের উদ্ভবের এক ঊষালগ্নে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিলাে তা আর থমকে দাঁড়ায়নি এক মুহূর্তের জন্যও। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের পথ ধরে সরলতম প্রাণ থেকে উৎপত্তি হয়েছে আজকের এই নিরন্তর প্রাণের মেলা, বৈচিত্রে, বিস্তৃতিতে, বিন্যাসে, হাজারাে প্রাণের সমারােহে এর তুলনা পাওয়া ভার। ডারউইনের ভাষায় —

‘There is grandeur in this view of life, with its several powers, having been originally breathed into a few forms or into one; and that, whilst this planet has gone cycling on according to the fixed law of gravity, from so simple a beginning endless forms most beautiful and most wonderful have been, and are being evolved.’[১]

পথ যে খুব সুগম ছিলাে তা বললে বােধ হয় ভুল হবে, নিঃসন্দেহে অজস্র বাধা পেরােতে হয়েছে তাকে – পৃথিবীর জলবায়রু পরিবর্তন ঘটেছে অহরহ, তার ফলশ্রুতিতে প্রাকৃতিক বিন্যাসও বদলে গেছে, গণ-বিলুপ্তির পথ ধরে ইতিহাসের বুক থেকে খসে পড়েছে। প্রজাতির পর প্রজাতি। কিন্তু তার পথ চলা থেমে থাকেনি, বিবর্তনের পথ ধরে পুরনােরা আভিযােজিত হয়ে খাপ খাইয়ে নিয়েছে প্রকৃতির সাথে, একের পর এক নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হয়েছে, অন্তহীন এই মহাযাত্রা এগিয়ে গেছে স্বতঃস্ফুর্ত গতিতে, অনির্ধারিত ভবিষ্যতের দিকে। এই পথ চলার তাে কোন গন্তব্য নেই, কেউ একে পথের নির্দেশনা দিয়ে ব্লু প্রিন্ট এঁকে দেয়নি, কোন কারিগরের কেরামতি নেই এখানে। প্রাণের এই মহা আয়ােজন এগিয়ে চলেছে প্রকৃতির গতির সাথে তাল মিলিয়ে, প্রকৃতিরই অঙ্গাঅঙ্গি এক অংশ হয়ে। আর এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে সে ফেলে এসেছে তার পথ চলার বিভিন্ন ধরণের সাক্ষ্য, যদিও তার অর্থ বুঝতে আমাদের লেগে গেছে এতােগুলাে শতাব্দী।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ফসিলের অস্তিত্ব জেনে আসলেও এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হয়েছে মাত্র কয়েক শাে বছর আগে। ফসিল থেকে আমরা প্রাণের বিবর্তনের সরাসরি সাক্ষ্য খুঁজে পাই। ভূতত্ত্ববিদ এবং ফসিলবিদরা আঠারশাে শতাব্দির শেষ দিক থেকে ফসিলগুলাে আসলে কি তা বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে শুরু করলেও চার্লস ডারউইনই প্রথম একে বিবর্তনের আলােকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করেন। জেনেটিক্স, জিনােমিক্স এবং অনুজীববিদ্যার অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে আজকে জীবের ডি.এন.এ থেকেই বিবর্তনবাদের মূল তত্ত্বকে প্রমাণ করা গেলেও কয়েক দশক আগেও কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম ছিলাে না।

আমরা তাে ডিএনএ-এর খবর জানলাম মাত্র সেদিন আধা শতাব্দী আগে (১৯৫৩ সালে), জিন বলে যে একটা কিছু আছে তাও জানতে পেরেছি মাত্র এক শতাব্দী আগে (মেন্ডেলের আবিষ্কার সম্পর্কে পৃথিবী জানতে পারে ১৯০০ সালে)! তার অনেক আগেই প্রজাতি যে স্থির নয়, কিংবা ধরুন পৃথিবীর বয়স যে আসলে বাইবেলে বলে যাওয়া ছয় হাজার বছরের চেয়ে অনেক বেশী, অথবা সবগুলাে মহাদেশ যে একসময় এক সাথে যুক্ত ছিলাে- এধরণের কিছু মৌলিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পিছনে ফসিল রেকর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে।

সে সময় ফসিল রেকর্ডগুলাে না থাকলে ডারউইনের দেওয়া বিবর্তনবাদ তত্ত্ব বা আলফ্রেড ওয়েজেনারের মহাদেশীয় সঞ্চরণের মত গুরুত্ত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলাে আমরা পেতাম কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেখেছিলাম ডারউইন তার বিগেল যাত্রার সময় পৃথিবীর আনাচে কানাচে খুঁজে পাওয়া ফসিলগুলাে দেখে কিভাবেই না প্রভাবিত হয়েছিলেন।

এখন অনেক গবেষক আবার বলছেন, শুধু বিজ্ঞানের অঙ্গনেই নয়, আমাদের পূর্বপুরুষের এই ফসিলগুলাের নাকি অভুতপূর্ব অবদান রয়েছে আমাদের প্রাচীন লােককাহিনী, বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক ভুবনেও!

দানবীয় আকারের সামুদ্রিক সরীসৃপ বা ডায়নােসর জাতীয় বিভিন্ন প্রাণীর ফসিলের ধ্বংসাবশেষ দেখেই প্রাচীন আমলের মানুষেরা হয়তাে অনেক ধরণের কল্পকাহিনী বা মিথের জন্ম দিয়েছিলাে। লােককাহিনীর গবেষক আরিয়ানে মেয়র (Adrienne Mayor, 2000) এর লেখা The First Fossil Hunters বা প্রথম ফসিল শিকারীরা বইটা সম্প্রতি ভুতত্ত্ববিদ্যার অঙ্গনে সাড়া ফেলে দিয়েছে[২]। একটার পর একটা উদাহরণ টেনে, বিভিন্ন ধরণের লােকজ গল্পের অবলম্বনে তৈরি প্রাচীন ছবি বা ভাষ্কর্যের সাথে বিভিন্ন ফসিলের তুলনা করে, এডরিয়ানে অত্যন্ত চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন যে আজকে আমরা যে সব মিথের কথা শুনি তার অনেকগুলােরই ভিত্তি হয়তাে লুকিয়ে রয়েছে ফসিলের মধ্যেই।

প্রাচীন আমলের মানুষ দৈত্যাকৃতি সব আদিম প্রাণীদের হাড্ডি বা ফসিল দেখে শুধু যে আতঙ্কিত হয়েছে তাইই নয়, নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ত্রাস আর বিহ্বলতার মেলবন্ধনে সে সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন রূপকথার, এমনকি কখনও অজানা শ্রদ্ধায় তাদের স্থান করে দিয়েছে পূজার বেদীতে। ফসিল রেকর্ড নিয়ে গুরুগম্ভীর বৈজ্ঞানিক আলােচনায় ঢােকার আগে মানব সভ্যতার ইতিহাসের পাতার এই মজার অধ্যায়টিতে একটু চোখ বুলিয়ে নিলে বােধ হয় মন্দ হয় না।

বৈজ্ঞানিকভাবে বিচার করলে ফসিলবিদ্যার ইতিহাস কিন্তু খুব বেশিদিনের নয়, সাধারণভাবে মাত্র ২০০ বছর আগের ফরাসী প্রকৃতিবিদ জর্জ কুভিয়েকে (Georges Cuvier, 1769 – 1832) এর জনক বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু আরিয়ানে ফসিলবিদ্যা চর্চার সেই সময় সীমাটাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন কয়েক হাজার বছরের বিস্তৃতিতে। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জন বাের্ডম্যানের মতে, এডরিয়ানায়ই প্রথমবারের মত ধারাবাহিকভাবে ফসিলের সাথে প্রাচীন মিথগুলাের সম্পর্ক স্থাপন করে তাদেরকে নতুন করে অর্থবহ করে তুলেছেন আমাদের সামনে।

প্রাচীন গ্রীক, রােমানসহ ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সভ্যতাগুলাে প্রাচীনকাল থেকেই ফসিল সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ পর্যন্ত করেছে, আর স্বভাবতই তাদের তদানীন্তন জ্ঞানের আলােয় মিলিয়ে এগুলাের ব্যাখ্যা দেওয়ারও চেষ্টা করেছে। সেখান থেকেই হয়তাে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের মিথের, সৃষ্টি হয়েছে মহাপরাক্রমশালী মহানায়ক থেকে শুরু করে ভয়ঙ্করী সর্পরাজ কিংবা সাইক্লোপের মত এক চোখী বিশালদেহী দৈত্যের। প্রাচীন গ্রীকরা যে প্রাচীন দৈত্যাকৃতি জিরাফ, ম্যামথ বা মাসটাডােনের মত বিলুপ্ত অতিকায় হাতীর ফসিলের সংস্পর্শে এসেছিলেন ইতিহাসে তার ভুড়িভুড়ি প্রমাণ পাওয়া যায়।

আডরিয়ানা গ্রীস এবং তার আশে পাশের অঞ্চলের প্রাচীন ধ্রুপদী লােককাহিনীর চরিত্র গ্রিফিনের সাথে অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন প্রােটোসেরাটপ নামের প্রাচীন এক ডায়নােসরের ফসিলের। আসলে গ্রিফিন কোন গ্রীক বা রােমান লােককাহিনীর চরিত্র নয়। শােনা যায়, খ্রীষ্ট পূর্ব ৭০০-৬০০ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার সাইথিয়ান নামের এক যাযাবর জাতির থেকে গ্রীক পর্যটক আরিষ্টিয়াস প্রথম এই গ্রিফিনের কথা জানতে পারেন। সে অর্ধেক পাখী, অর্ধেক সিংহ, তার শরীর সিংহের মত, মুখের আকৃতি ঈগলের মত, আর তার ছড়ানাে পাঁজরের সাথে কল্পনার রং মিলিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে পাখীর ডানা। সিংহ এবং ঈগলের শক্তিতে বলীয়ান দুর্ধর্ষ এই গ্রিফিন নাকি সেখানকার সােনার খনিগুলােকে পাহারা দেয়।

পরবর্তীতে আরিষ্টিয়াসের লেখা গল্পে দেখা যায় মানুষ ঘােড়ায় চড়ে এই গ্রীফিনদের সাথে যুদ্ধ করছে। | সােনার খনিগুলাে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু এদিকে আবার ফসিল রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর বুকে চড়ে বেড়ানাে প্রােটোসেরাটপ নামের ডায়নােসরেরও মুখটা ছিলাে অনেকটা পাখির ঠোঁটের মত, পা-গুলাে ছিলাে পাখির মতই সরু সরু। অবাক না হয়ে পারা যায় না যখন শুনি ডায়নােসারেরাই ছিলাে আজকের যুগের আধুনিক পাখিদের পূর্বপুরুষ।

অনেকদিন আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা ধারণাটি করে থাকলেও সম্প্রতি চায়নায় পাওয়া বেশ কিছু মধ্যবর্তী ফসিল থেকে তারা আরও নিশ্চিতভাবে প্রমাণ পেয়েছেন যে, এক ধরণের ডায়নােসর থেকেই আসলে পাখির বিবর্তন ঘটেছে। তবে সে আলােচনা এখনকার জন্য তােলা থাক, খানিক পরে এই অধ্যায়েই এই নতুন আবিষ্কারটা নিয়ে বিস্তারিত আলােচনা করার ইচ্ছে রইলাে। এখন আপাতত আড়রিয়ানে মেয়রের লেখা The Fossil Hunter বই থেকে স্ক্যান করা একটা ছবি তুলে দেওয়া যাক পাঠকদের জন্য। প্রােটোসেরাটপের ফসিলের সাথে এই লােককাহিনীর চরিত্র গ্রিফিনের উড়ন্ত ছবি এবং পাশে রাখা প্রাচীন একটি গ্রিফিনের একটি মূর্তির মধ্যে এতাে মিল দেখে যে কেউই হয়তাে অবাক হবেন।

রূপকথার ফসিল
ছবি ৫.১; আড়রিয়ানে মেয়রের লেখা The fossil Hunters বই থেকে স্ক্যান করা ছবিটাতে প্রােটোসেরাটপের ফসিলের সাথে এই লােককাহিনীর চরিত্র গ্রিফিনের উড়ন্ত ছবি এবং পাশে রাখা প্রাচীন একটি গ্রিফিনের একটি মূর্তি

প্রাচীন লােককাহিনীতে শােনা যায়, মহাপরাক্রমশীল রােমান সেনাপতি কুইন্টাস সারটোরিয়াস মরােক্কো দেশের প্রাচীন শহর টিঙ্গিস এ পৌঁছালে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা তাকে কুখ্যাত রাক্ষস আন্টিয়াসের কবর দেখাতে নিয়ে যায়। সারটোরিয়াস নাকি ৮৫ ফুট দীর্ঘ এই কঙ্কাল দেখে এতই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাে যে সে তাকে আবার নিজের হাতে শ্রদ্ধাভরে তাকে দাফন করার ব্যবস্থা করে দেয়। আন্টিয়াস গ্রীক পুরানের একজন সহিংস রাক্ষস, যাকে পরে বিখ্যাত মহাবীর হারকিউলিস হত্যা করে মানব জাতিকে রক্ষা করেন। অনেকে মনে করেন যে বিশালাকার এক আদিম হাতী আনানকাস (Anancus) এর ফসিল ছাড়া হয়ত এটি আর কিছুই ছিলাে না। কুভিয়ের মতে, অনেক সময়ই স্থানীয় লােকেরা হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া ফসিলগুলাের আকারকে ৮-১০ গুণ হারে অতিরিঞ্জিত করে এই ধরনের বিভিন্ন রূপকাহিনীর জন্ম দিতাে।

mamoth
ছবি ৫.২ : ফ্লোরেন্স “মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে” অ্যানানকাস বা বিশালাকার সেই আদিম হাতির ফসিল
gryphin
ছবি ৫.৩ : ইওসিন যুগের সেই বিশাল তিমি মাছের ফসিল

তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই অঞ্চলেই একধরনের প্রাচীন হাতি, ম্যামথ বা দৈত্যাকার জিরাফ থেকে শুরু করে প্রাগৈতিহাসিক ইওসিন যুগের বিশাল তিমি মাছে (Eocene whales) ফসিলের ছড়াছড়ি দেখা যায়, যাদের কারো কারো হাড়ের দৈর্ঘ্য আবার ৭০ফুট পর্যন্ত লম্বা ছিল! এখান থেকে মাত্র ১৫০ মাইল দূরে অ্যাটলাস পাহাড়েই বিষ্ময়কর রকমের বড় আকারের ডাইনোসরের ফসিল পাওয়া গেছে।


 বিবর্তনের পথ ধরে


১.↑ Darwin C (1859) 1999, Origin of Species, (last line of the book) Bantam Books, USA.

২.↑ Mayor A, 2000, The First Fossil Hunter, Princton University Press, NJ, USA.

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা