ভোলগা থেকে গঙ্গা

অনুবাদ

১৩. প্রভা (পর্বঃ ০৩)

 কালঃ ৫০ খৃষ্টপূর্ব

 

আট

শরতের পূর্ণিমা। সন্ধ্যা থেকেই চাঁদের আলো পূর্ব দিগন্ত থেকে উঠে আসছে। অন্তমিত সূর্যের লাল আভা যেমন নীল দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে, চাঁদের শীতল রূপালী আলোও তেমনি নীল আকাশকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। আজকাল অশ্বঘোষ বেশীরভাগ সময়ই প্রভাদের বাড়ি থাকে। দু’জনে ছাদের ওপর বসেছিল, প্রভা বলে উঠল, “সরষুর তরঙ্গ-লহরী আমাকে ডাকছে প্রিয়তম!

সেই লহরী, যা তোমাকে প্রথম আমার কাছে টেনে এনেছিল এবং প্রথম প্রেমডোরে আমরা বাঁধা পড়েছিলাম। সে দিনটি দু’বছর আগের, কিন্তু আজও মনে হয় যেন গতকালে গটনা। কত চাঁদনী-রাতই না আমরা সরযুতীরে কাটিয়েছি, কি মুধর ছিল সেইসব রাতগুলো! আজও তেমনি মধুযামিনী প্রিয়ে! চল, আমরা সরষুতীরে যাই।” দু’জনে চলতে লাগল।

নদী এখান থেকে দুরে। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত বালুকারাশির ওপর দিয়ে অনেক দুর হাঁটল তারা। প্রভা তার চটি জোড়া আগেই তাহে তুলে নিয়েছে, পায়ে নীচে কোমল বালুকারাশির সুখস্পর্শ অনুভব করতে লাগল। দু’হাতে অশ্বঘোষের কটি বেষ্টন করে প্রভা বলল, “সরযু-সৈকতে এই বায়ুর স্পর্শ কি অপূর্ব, না প্রিয়তম?”

“হ্যাঁ, পায়ের নীচে বেশ চমৎকার সুড়সুড়ি দেয়!”

“এক অদ্ভুত অনুভতি না? রোমাঞ্চ লাগে যেন!”

“আমি কতবার ভেবেছি, আমরা দু’জনে পালিয়ে যাই! চলে যাই সেই দেশে যেখানে আমাদের প্রেমকে ঈর্ষা করার কেউ থাকবে না। যেখানে তুমি আমাকে প্রেরণা জোগাবে আর আমি রচনা করব সুন্দর গীত। তারপর বীণা বাজিয়ে সেই গীত এক সঙ্গে গাইব দু’জনে। এখানে এমন রাত্রে আমার বীণা তো সঙ্গে আনতে পারি না প্রভা, লোক জমে যাবে। আর তাদের মধ্যে হয়ত দেখব বহু ঈর্ষাকলষিত নয়ন!”

“মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, যদি আমি না থকি…”

প্রভাকে দৃঢ়ভাবে বুকে চেপে ধরে অশ্বঘোষ বলল, “ না না প্রিয়ে, কখনেই তা হতে পারে না, আমরা এমই এক সঙ্গে চিরদিন থাকব।”

“অন্য কিছু ভেবে আমি এ কথা বলছিলাম প্রিয়তম। ধর, তুমি মারা গেলে আমি একা হয়ে গেলাম। জগতে এ রকম ঘটনা ঘটে তো নিশ্চয়ই।”

“ঘটে!”

“তোমার মৃত্যুর কথায় তো অধীর হয়ে উঠলে না তুমি! তোমার অবর্তমানে আমার ওপরেই শুধু শোকের পাহাড় ভেঙ্গে পড়বে—এই ভেবে, না?”

“তুমি নিষ্ঠুর কথা শোনাচ্ছ কেন প্রভা!”

অশ্বঘোষের অধর চুম্বন করে প্রভা বলল, “জীবনে পূর্ণিমাই শুধু নয়, জীবনে অমানিশারও আগমন হয। আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাইছিলাম, একের অবর্তমানে অপরের কর্তব্য কি। তুমি না থাকলে আমি কি করব জানো?”

মাথা নীচু করে দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে অশ্বঘোষ বলল,“বল।”

“নিজের জীবনকে কিছুতেই শেষ করে দেব না আমি। ভগবান বুদ্ধ আত্মহত্যাকে পাপপূর্ণ মূর্খের কাজ বলে অভিহিত করেছেন। তুমি তো দেখেছ, ইতিমধ্যেই বীণার ওপর কতটা দখল আামার এসে গেছে।”

“অনেকখানি প্রভা! কতবার তোমার হাতে বীণা ‍তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গান গেয়েছি আমি।”

“হ্যাঁ, কোনোদিনি হয়ত নশ্বর অশ্বঘোষ বিলীন হয়ে যাবে আমার দৃষ্টি থেকে, কিন্তু আমি যুগ-যুগান্তরের অমর কবি অশ্বঘোষের আরাধানা করে চলব। তোমারই বীণায় তোমার রচিত গান গাইব। জীবনভোর গান গেয়ে ফিরব দেশে-বিদেশে, যতদিন না আমাদের যুগ্ম জীবনপ্রবাহ অন্য কোনো দেশকালে এসে সাকার-সম্মিলনের ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমি না থাকলে তুমি কি করবে?”

কথাগুলো শুনে অশ্বঘোষের অন্তস্থল থেকে সুরু করে সারা দেহ কেঁপে উঠল খরখর করে, প্রভা অনুভব করল সে কম্পন। কথা বলবার চেষ্টা করল অশ্বঘোষ, কিন্তু কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে তার, চোখে জল। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ক্ষীণকণ্ঠে বলল,“জীবনে এমন দিন সত্যই বড় সাংঘাতিক, কিন্তু আমিও আত্মহত্যা করব না প্রভা। তোমার প্রেমের প্রেরণা আমার হৃদয়ে যে গানের সঞ্চার করবে, তাই আমি গেয়ে চলব জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। আমি যে তোমারই অমর অশ্বঘোষ।”

“সরষুর-ধারা ঘুমিয়ে পড়েছে প্রিয়তম, চল আমরা এবারঘরে ফিরি।”

 

নয়

গ্রীষ্মকাল । মাতা সুবর্ণাক্ষী রোগে পড়লেন। অশ্বঘোষ দিনরাত মায়ের কাছে থাকে। দিনের বেলা প্রভাও থাকে। চিকিৎসায় কোনো ফল হল না, সুবর্ণাক্ষীর অবস্থা সস্কটজনক হয়ে উঠল। আর এক পূর্ণিমার রাত এসে গেল, রুপালী চাঁদের আলো ছড়িয়ে চারিদিকে। এই চাঁদের আলোতেই সুবর্ণাক্ষী ছাদের ওপর যেতে চাইলেন। তাঁর পালস্ক উঠল সেখানে। তাঁর কস্কালসার শরীর দেখে অশ্বঘোষের হৃদয় ব্যথায় ভরে উঠতে লাগল। ধীরে স্পষ্ট কণ্ঠে মা বললেন, “কি সুন্দর জ্যোৎস্না!”

অশ্বঘোষের কানে প্রভার কথা বেজে উঠল,‘সিরযুর তরঙ্গ-লহরী আমাকে ডাকছে।’বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল অশ্বঘোষের । মা আবার বললেন,“প্রভা কোথায় বাবা?”

“তাদের বাড়িতে মা, সন্ধ্যা পর্যন্ত তো এখানেই ছিল।”

“প্রভা !মা আমার !ওকে তুই কখনও ভুলিস না বাবা…..” কথা হবার আগেই একটা কাশির দমকে সুবর্ণাক্ষীর দেহ নিশ্চল হয়ে গেল। সুবর্ণাক্ষী গত হলেন। সুবর্ণাক্ষী পুত্রের বুক ফেটে হাহাকার উঠল। রাত দিন সমানে কাঁদল সে।

পরদিন মধ্যাহ্ন পর্যন্ত মায়ের দাহকর্মেই কেটে গেল। তারপর প্রভার কথা মনে পড়ল। সে দত্তমিত্রের বাড়িতে গেল। প্রভার মা-বাবা ভেবেছিলেন, সে অশ্বঘোষের কাছেই গেছে। গত রাত্রের আঘাতেই অশ্বঘোষের হৃদয় জর্জরিত হয়ে উঠেছিল, এখন সে আরও অধরি হয়ে পড়ল। অশ্বগোষ প্রভার শয়নকক্ষে ঢুকল । সব জিনিসই ঠিকমতো সাজানো রয়েছে।

শয্যার ওপর থেকে সাদা চাদরটা টেনে তুলল সে, সেখানে দেখতে পেল নিজের একখানা ছবি। ছবিখানা তৈরী করিয়েছিল প্রভা এক নবাগত যবন চিত্রকরকে দিয়ে। এই ছবির জন্য অনিচ্ছসত্ত্বেও অশ্বঘোষকে বহু সময় স্থির হয়ে বসে থাকতে হয়েছিল। ছবির ওপর একটি স্নান জুঁই ফুলের মালা । ছবির নীচে প্রভার মুদ্রাস্কিত তালপত্র-লেখ রয়েছে। অশ্বঘোষ চিঠিখানা তুলে নিল। সুতো ‍দিয়ে বাঁধা ছিল সেটা।

সুতোর বাঁধুনি আটুকাবার জন্য যে কালো মাটি লাগানো হয়েছিল তা তখনও ভালো করে শুকোয়নি। সুতো কেটে চিঠি খুলতেই প্রভার সুন্দর হস্তাক্ষরে লম্বা পাতার ওপর লেখা পাঁচটি পংত্তি জলজল করে উঠল-

“প্রিয়তম, প্রভা বিদায় নিয়ে যাচ্ছে, সরষুর জলরাশি আমার ডাক দিয়েছে, তাই আমি চলেছি। আমার প্রেমের প্রতিদারে তুমি একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলে মনে আছে?প্রভার চির-তারুণ্য, শাশ্বত সৌন্দর্য আমি রেখে যাচ্ছি তোমার কাছে। পাকাচুল, ভাঙাদাঁত লোলচর্ম প্রভাকে আর তোমায় দেখতে হবে না। আমার প্রেম, আমার এই অবিনশ্বর যৌবন তোমাকে প্রেরণা জুগিয়ে চলবে। এই প্রেরণাকে তুমি হেলায় নষ্ট কর না, প্রিয়তম।

এ কথা ভেব না, আমি তোমার আত্নীয়-স্বজনের তিরস্কারের ভয়ে আম্নহত্যা করছি। শুধু তোমাকে কাব্য-প্রেরণা জোগাবার জন্যেই আমি এই পথে আমার অক্ষুন্ন যৌবনকে তোমার কাছে রেখে গেলাম। প্রিয়তম, প্রভা তার কল্পনায় তোমাকে শেষ আলিঙ্গন আর চুম্বন দিয়ে যাচ্ছে।”

বারে বারে চোখের জল মুছে চিঠিখানা পড়ল অশ্বঘোষ। শেষে চিঠিখানা তার হাত থেকে পড়ে গেল। খাটের ওপর বসে পড়ল সে। সব কিছুই যেন শূন্য হয়ে গেছে তার। তম্নয় হয়ে সে যেন হুদস্পন্দন স্তব্ধ হবার প্রতীক্ষা করতে লাগল। মর্মর মুতির মতো শূন্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রিইল। বহুক্ষণ পর প্রভার বাবা-মা ঘরে এসে ঢুকলেন। অশ্বঘোষের এই অবস্থা দেখে বড়ই শস্কিত হয়ে পড়লেন তাঁরা ।

তারপর চিঠিখানা তুলে পাঠ করলেন। প্রভার মা তীব্র আর্তনাত করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। দত্তমিত্রের চোখ থেকে নীরব অশ্রুধারা নেমে এল। অশ্বঘোষ তাকিয়ে রইল তেমনি স্থির শূন্য দৃষ্টি মেলে। বহুক্ষণ পর্যন্ত তাকে এই অবস্থায় দেখার পর প্রভার মা-বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন । সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এল, অশ্বঘোষ বসে রয়েছে সেই একই অবস্থায়। চোখের জল শুকিয়ে গেল। তার হৃদয়ের ভিতরটাও পাথর হয়ে গেছে যেন। এইভাবে বসে থাকতে থাকতে অনেক রাতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

সকলে প্রভার মা এসে দেখলেন , অশ্বঘোষ প্রকৃতিস্থ হয়ে কি যেন চিন্তা করছে বসে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছ?”

“সম্পুর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছি মা। প্রভা যে কাজ আমাকে সঁপে দিয়ে গেছে এ বারে আমি তাই সম্পন্ন করব। আমি বুঝতাম না, কিন্তু প্রভা জানত , সে আমার কর্তব্য বলে দিয়ে গেছে।–আম্নহত্যা নয় মা, প্রভা আত্নদান করে গেছে। এ কথা ঠিকই যে, এই আত্নদানকে আমি আম্নহত্যা বলে প্রচার করতে পারি, কিন্তু এত অকৃতজ্ঞ আমি হতে পারব না।”

প্রভার মা তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় যাচ্ছ বাবা?”

“ভদন্ত ধর্মরক্ষিতের সঙ্গে দেখা করতে, আর সরধুকে দেখতেও বটে।”

“ভদন্ত ধর্মরক্ষিত নীচেই বসে আছেন । আর সরধু দেখতে আমিও যাব তোমার সঙ্গে।” কথা বলতে বলতে গলা ধরে গেল তাঁর

নীচে গিয়ে ধর্মরক্ষিতকে পস্কপ্রতিষ্ঠিত হয়ে বন্দনা করে অশ্বঘোষ বলল, “ভদন্ত, এ-বারে আমাকে সঙ্গে গ্রহণ করুণ।”

“বৎস, তোমার শোক নিদারুণ।”

“শোকের তাড়নায় আমি বলছি না, প্রভা…..জম্ন্য আমাকে তৈরী করে গিয়েছে।”

“ত’হলেও তোমাকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে, সঙ্গ এত তাড়াতাড়ি তোমাকে গ্রহণ করবে না।”

“প্রতীক্ষা আমি করব ভদন্ত, কিন্তু সঙ্গের আশ্রয়ে থেকে।”

“প্রথমে তোমার পিতার কাছ থেকে সম্মতি আনতে হব। মাতা-পিতার সম্মতি ছাড়া সঙ্গ কাউকে ভিক্ষু হিসাবে গ্রহণ করে না।”

“তা’হলে আমি অনুমতি নিয়েই আসব।”

ঘর থেকে বেরিয়ে এল অশ্বঘোষ। প্রভার মা তার সুস্থ মস্তিকের কথাবার্তা শোনার পরও শস্কিত হয়েই ছিলেন, তাই তিনিও পিছে পিছে এলেন । নৌকা করে সরযুর জলে সারা দিন দু;জনে খোঁজার পরও কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না প্রভার
। পরের দিন আরও এগিয়ে গিয়ে খোঁজ হল, কিন্তু কোথাও কিছু নেই।

বাড়ি গিয়ে অশ্বঘোষ পিতার কাছে ভিক্ষু হওয়ার জন্য অনুমতি চাইল, কিন্তু একমাত্র পুত্রকে কি করে তিনি অনুমতি দেবেন এ পথে যাবার জন্য ! অশ্বঘোষ বলল, “মা আর প্রভার শোকে অস্থির হয়ে আমি এ পথ করতে ‍যাচ্ছি না বাবা। নিজের জীবনে আমি যে কর্মধারা গ্রহণ করছি, এইট তার রাস্তা । তুমি দেখছ না আমার কন্ঠস্বরে, আমার আচরণে কোথাও চিত্তবিকারের এতটুকু লক্ষণ নেই। আমি আর একটা কথাই শুধু বলব-যদি আমাকে জীবিত দেখতে চাও তবে সম্মতি দাও পিতা।”

“কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাববার সময় দাও……”

“আমি সাতদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজী পিতা ।”

পরের দিন চোখের জলে ভেসে অশ্বঘোষকে ভিক্ষু হবার সম্মতি দিলেন তিনি।

সাকেতের আর্ষ সর্বান্তিবাদ সঙ্গ অশ্বঘোষকে ভিক্ষুরুপে গ্রহণ করল। মহাস্থবির ধর্মসেন হলেন অশ্বঘোষের উপাধ্যায় এবং ভদন্ত ধর্মরক্ষিত হলেন তার আচার্য । নৌকাযোগে ভদন্ত ধর্মরক্শিতের পাটলিপুত্র যাবার কথা ছিল , তাঁর সঙ্গে অশ্বঘোষও সাকেত ত্যাগ করল।

পাটলিপুত্রস্ত অশোকারামে (মঠ) ভিক্ষু অশ্বঘোষের দশ বছর কেটে গেল । ‘বৌদ্ধধর্ম, বৌদ্ধদর্শন এবং যবন-দর্শন সম্পকে গভীর অধ্যায়ন করল সে। মগধের মহাসঙ্গের বিদ্বান মশুলীতে অশ্বঘোষের স্থান ছিল অনেক উঁচুতে । এই সময় পশ্চিম থেকে শক সম্রাট কণিক পূর্বাষ্ণল জয় করবার জন্য পাটলিপুত্রে এসে উপস্থিত হল। পাটলিপুত্র এবং মগধ এই সময় বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল্ বৌদ্ধধর্মের প্রতি কণিকের ছিল প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। গাদ্দারে নিয়ে যাবার জন্য ভিক্ষুসঙ্ঘ থেকে একজন বিদ্ধান ব্যক্তিকে চেয়ে পাঠাল কণিক। সঙ্ঘ অশ্বঘোষকে পাঠিয়ে দিল।

রাজধানী পুরুষপুর (পেশোয়ার) গিয়ে অশ্বঘোষ দেখল, সেখানে শক, যবন, তুসস্ক, পারশী তথা ভারতীয় সংস্কৃতির একত্র সমাবেশ। যবন নাট্যকলাকে অশ্বঘোষ আগেই ভারতীয় সাহিত্যে স্থান দিয়েছিল। যবন-দর্শনের গভীর অনুশীলনের পর, তার বহু বিশেষত্ব, বিশ্লেষণ-শৈলী এবং অনুকূল তত্ত্বসমূহকে নিয়ে ভারতীয় দর্শন, বিশেষ করে বৌদ্ধদর্শনকে সে সমৃদ্ধ করে তোলে। বৌদ্ধদের যবন-দর্শন গ্রহণ করবার পথও প্রশন্ত করে দেয় অশ্বঘোষ। তার পরে অপরাপর ভারতীয় দার্শনিকেরাও এই চেষ্টা করেছে এবং বৈশেষিক আর ন্যায়ের পথে সকলের আগে আগে চলেছে। পরমাণু , সামান্য দ্রব্যগুণ, অবয়বী ইত্যাদি তত্ত্ব এরা যবনদের নিকট থেকেই গ্রহণ করেছে।

অশ্বঘোষের হৃদয়কে বিশাল করে দিয়েছিল প্রভা, কাজেই তার কাছে আম্নপর ভেদ ছিল না। প্রভার প্রেরণায় সে বহু কাব্য আর নাটক লেখে। তার অনেক কিছুই আজ লুপ্ত হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও প্রকৃতি তার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন ছিল, তাই উনিশ শত বছর পরে মধ্য এশিযার মহাবালুাকরাশি গোবী অশ্বঘোষের ‘সারিপুত্ত’প্রকরণকে (নাটক) মানুষের হাতে তুলে দেয় [জর্মন ভারত-তাত্ত্বিক অধ্যাপক লুডার্স ১৯১১ খৃষ্টব্দে সারিপুত্ত প্রকরণ নাটকের তালপত্রে লিখিত খন্ডিত পুতি আবিষ্কার করেন]। অশ্বঘোষের ‘বুদ্দ-চরিত্র;আর‘সৌন্দরান্দ’দুই অমর কাব্য।

প্রভার কাছে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল তাকে যথাযথভাবেই পালন করেছিল সে এবং প্রভার অম্লান সৌন্দর্যরাশি তার কাব্যকে সুন্দরতম করে তুলেছিল। জম্মভূমি সাকেত এবং মাতা সুবর্ণাক্ষীকে কখনও সে বিষ্মত হয়নি। আপন গ্রস্থসমূহে সর্বদাই নিজের নাম লিখত ‘সাকেতবাসী আর্ষ-সুবর্নাক্ষী পুত্র অশ্বঘোষ’।

আমার ভাগ্যচক্ত যেন কেমন! কখনও এক জায়গায় স্থির থাকতে পারিনি। সংসার মরঙ্গ আমাকে সর্বদা চষ্ণল এবং বিহবল করে রেখেছে। জীবনে মধুর দিনও এসেছে যদিও তিক্ত দিনগুলোর তুলনায় সংখ্যায় কম আর পরিবর্তন তো যেন বর্ষাশেষে বাদলা দিনের মতো, বৃষ্টি আর রৌদ্রে লুকোচুরি । জানি না, এই পরিবর্তনের চক্ত কেন ঘুরছে।

পশ্চিম উত্তরাপথ গাদ্ধারে এখনও মধুপর্কে বাছুরের মাংস দেওয়া হয়। কিন্তু মধ্যদেশে (উত্তপ্রদেশ, বিহার) গোমাংসের নাম করা পাপ, এখানে গো-ব্রাক্ষণ রক্ষা করাই শ্রেষ্ট ধর্ম। আমি বুঝে উঠতে পারি না, একই ধর্মে এত বৈপরীত্য কেন! এক জায়গার অধর্ম কি অপর জায়গায় ধর্ম রুপে চলতে থাকবে; অথবা এক জায়গার পরিবর্তন আগে সাধিত হয়েছে, অন্যত্র পরে তার অনুকরণ করবে?

অবন্তীর (মালবা) এক গ্রামে ক্ষিপ্রা নদীতটে আমি জম্মগ্রহণ করেছি। আমার কুলের লোকের নিজেদের পরিব্রাজক বলে, যদিও এদের আপন ক্ষেত-খামার , ঘর-বাড়ি বয়ে গেছে এবং সেগুলো আপন স্বন্ধে বহন করে স্থানান্তরে নিয়ে যাওয়া চলে না । আমাদের কুলের লোকেদের দেহের গড়ন এবং রঙ ও রুপ গ্রামের অন্যান্য লোকজন থেকে কিছুটা পৃথক। আমরা অধিকতর দীর্ঘ, গৌর এবং সেই সঙ্গে আমাদের উৎকর্ষ অন্যদের কাছে ছিল অসহ্য।

 


 ভোলগা থেকে গঙ্গা

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top