ভালোবাসা কারে কয়

অভিজিৎ রায়

০২. মার্গারেট মীড

মার্গারেট মীডের মতোই শান্তিপূর্ণ এক জাতির সন্ধান করতে গিয়ে সত্তুরের দশকে লেজে গোবরে করেছেন ম্যানুয়েল এলিজাল্ডে জুনিয়র (Manuel Elizalde Jr)। তিনি দেখাতে গিয়েছিলেন ঢালাওভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সহিংসতা, যুদ্ধবাজির কথা ঢালাওভাবে উল্লেখ করা থাকলেও ফিলিপাইনের এক জঙ্গলে টেসাডে (Tasaday) নামে এমন এক ট্রাইব আছে যারা নাকি আক্ষরিক অর্থেই এখনও সেই আদিম প্রস্তর যুগে বাস করছে।

তারা ছাল বাকল পড়ে ঘুরে বেড়ায়, গুহায় বসবাস করে আর তারা নাকি এমনই শান্তিপ্রিয় যে তাদের ভাষাতে সহিংসতা, আগ্রাসন কিংবা সংঘর্ষ সূচক কোনো শব্দই নেই। তাদের সংস্কৃতি একেবারে শান্তিতে শান্তিময়। এই মহা ব্যতিক্রমী শান্তিপূর্ণ মানব প্রজাতি নিয়ে ১৯৭৫ সালে একটি বইও বের হয়েছিল ‘শান্ত টেসাডে’ নামে[৬০]

কিন্তু থলের বেড়াল বেরিয়ে আসতে সময় লাগেনি। আশির দশকের শেষদিকে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল যে ম্যানুয়েল এলিজাল্ডের আগেকার কাজকর্ম আসলে ছিল পুরোটাই সাজানো[৬১]। আশে পাশের গ্রাম থেকে জিন্স আর টিশার্ট পরা সুশিক্ষিত ছেলেপিলেদের ছাল বাকল পরিয়ে শান্ত টেসাডে সাজানো হয়েছিল। টেসাডের শান্তিময় ধরনের কোনো ট্রাইবই আসলে ফিলিপাইনে নেই, ছিলও না কখনোই। সত্তুরের দশকে ফিলিপাইনের একনায়ক ক্ষমতাশীন মার্কোস সরকারের পরিকল্পনায় ম্যানুয়েল এলিজাল্ডের কুকর্মে ইন্ধন যোগানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল শান্ত টেসাডেকে পুঁজি করে বহির্বিশ্বে ফিলিপাইনের ইমেজ বাড়ানো।

আসলে সংস্কৃতির বিভাজনের কথা ঢালাওভাবে সাহিত্য, সংস্কৃতিতে আর নৃতত্ত্বে উল্লিখিত হয় বটে, কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় এই বিভাজন মোটেই বস্তুনিষ্ঠতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয় না। ব্যাপারটা নৃতত্ত্ববিদ আর সমাজবিদদের জন্য এক নিদারূণ লজ্জার ব্যাপার। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, সংস্কৃতির যত বিভাজনই থাকুক না কেন, প্রত্যেক সংস্কৃতিতেই দেখা যায়, মানুষেরা অনেকটা একইভাবে রাগ অনুরাগ, হিংসা, ক্রোধ প্রকাশ করে থাকে।

পশ্চিমা বিশ্বের আলো ঝলমলে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা থেকে শুরু করে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে যত গহীন অরণ্যের যত নাম না জানা গোত্রের মধ্যেই অনুসন্ধান করা হোক না কেন দেখা যাবে নাচ, গান, ছবি আঁকার ব্যাপারগুলো সব সংস্কৃতিতেই কম বেশি বিদ্যমান। কেউ হয়তো গুহার পাথরে হরিণ শিকারের ছবি আঁকছে, কেউ পাথরে খোদাই করে মূর্তি বানাচ্ছে, কেউ নদীর ধারে বসে পাল তোলা নৌকাকে ক্যানভাসে উঠিয়ে আনছে, কেউবা আবার মাটির পটে গড়ে তুলছে অনবদ্য শিল্পকর্ম।

সংস্কৃতির বিবিধ উপাদান যোগ হবার কারণে ব্যক্তি কিংবা সংস্কৃতিভেদে চিত্রকল্পের প্রকাশ ভঙ্গিতে হয়তো পার্থক্য আছে কিন্তু চিত্র প্রকাশের বিমূর্ত স্পৃহাটি সেই একই রকম থেকে যাচ্ছে। শুধু ছবি আঁকা নয়, নাঁচ-গানের ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখব। এক দেশে কেউ একতারা হাতে বাউল গান গেয়ে চলছে তো আরেকজন অন্য দেশে নিবিষ্ট মনে পিয়ানো বাজিয়ে চলছে। কেউবা চোখ মুদে সেতার বাজাচ্ছে তো কেউবা গিটার কিংবা কেউ সন্তুর। যে একেবারেই আলসে সে হয়তো পড়াশুনা করার টেবিলকেই ঢোল বানিয়ে তাল ঠুকছে রবীন্দ্র সংগীতের সাথে।

এক সংস্কৃতিতে কেউ হয়তো ডিস্কো নাঁচ নাচছে, অন্য জায়গায় সেরকমই একজন কেউ ভরত নাট্যম, আরেক জায়গায় কেউ ল্যাটিন ফিউশন, কেউবা কোনো অচেনা ট্রাইবাল ড্যান্স। নাচের রকমফেরে কিংবা মুদ্রায় পার্থক্য থাকলেও সংস্কৃতি নির্বিশেষে নাচ-গানের অদম্য স্পৃহাটি কিন্তু এক সার্বজনীন মানব প্রকৃতিকেই উর্ধ্বে তুলে ধরছে। যুদ্ধের এবং যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের ব্যাপারটিও অনেকটা তাইকম হোক বেশি হোকপ্রতিটি সংস্কৃতিতেই যুদ্ধের উপাদান কম বেশি আছে। কেউ বা যুদ্ধ করেছে লাঠি-সোটা দিয়ে, কেউ বা বল্লম দিয়ে, কেউ বা তীর ধনুক দিয়ে কিংবা কেউ বুমেরাং ব্যবহার করে, কেউবা কামান বন্দুক ব্যবহার করে, কেউবা পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়ে।

আদিম গুহাচিত্রগুলোতেও দেখা যায় তীক্ষ্ণ সেসব অস্ত্র ব্যবহার করে আমাদের পূর্বপুরুষেরা পশু শিকার করেছে, কখনো বা হানাহানি মারামারি করেছে নিজেদের মধ্যেই। কাজেই কেউ যদি হঠাৎ এসে দাবি করে কোনো এক দেশের বিচিত্র সংস্কৃতিতে মানুষ এতোই শান্তিপ্রিয় যে তাদের ভাষাতে কিংবা সংস্কৃতিতে সহিংসতা, আগ্রাসন কিংবা সংঘর্ষ সূচক কোনো শব্দই নেই, তাহলে নিঃসন্দেহে সেটা সার্বজনীনতার বিরুদ্ধে যাবে।

কিন্তু সেরকম কিছু আদৌ পাওয়া যায়নি। বরং যারা বিভিন্ন সময়ে সেরকম এক্সোটিক কিছু দাবি করেছিলেন, তাদের দাবিই শেষ পর্যন্ত মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। উপরের শান্তিময় টেসাডে কিংবা স্যামোয়ার উদাহরণগুলো কিন্তু তারই প্রমাণ। এই ব্যাপারটির তাৎপর্য উপলব্ধি করেই ডোনাল্ড ব্রাউন তার Human Universals গ্রন্থে বলেছেন[৬২]    

It is the human universals not the differences that are truly intriguing

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সংস্কৃতি ব্যাপারটা মানবসমাজের অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হলেও এটি কোনো গায়েবি পথে নয়, বরং অন্য সব কিছুর মতো জৈব বিবর্তনের পথ ধরেই উদ্ভূত হয়েছে (Evolved biologically)[৬৩]। আমরা উপরে যে নাঁচ, গান, ছবি আঁকা, যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছি (যেগুলো মানব সভ্যতার যে কোনো সংস্কৃতিতেই খুঁজে পাওয়া যাবে ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তিতে), সেরকম অন্তত ৪০০টি বৈশিষ্ট্য স্টিভেন পিঙ্কার লিপিবদ্ধ করেছেন তার ব্ল্যাঙ্ক স্লেট বইয়ের পরিশিষ্টে[৬৪]। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন এগুলো সবগুলোই অভিন্ন মানব প্রকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

বাহ্যিকভাবে যত পার্থক্যই আমরা দেখি না কেন, আসলে আমরা মানুষেরা এক অভিন্ন সংস্কৃতির অংশ। কারণ, আমাদের দেহ কাঠামোর মতো সংস্কৃতিও মোটা দাগে মানব বিবর্তনের অভিযোজনগত ফসল। ঠিক যেমন আমাদের হাত পা কিংবা অগ্ন্যাশয় তৈরি হয়েছে বংশাণু বা জিনের নিয়ন্ত্রণে, ঠিক তেমনি মানব সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে বংশাণুর দ্বারাই (বংশাণুর দ্বারা বলা হচ্ছে কারণ, দীর্ঘকালের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়েছে মানব বংশাণু যা আবার মস্তিষ্কের গঠনের অবিচ্ছেদ্য নিয়ামক, আর সংস্কৃতি হচ্ছে সেই মানব মস্তিষ্কেরই সম্মিলিত অভিব্যক্তি)।

বাঘের যেমন নখর বিশিষ্ট থাবা আছে, ক্যাঙ্গারুর পেটে আছে থলি, ঠিক তেমনি মেরুভল্লুকের গায়ে আছে পুরু পশম। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন স্ব-স্ব প্রজাতির ক্ষেত্রে অনন্য বৈশিষ্টের দিকে নির্দেশ করে; ঠিক তেমনি মানবসমাজের জন্য অনন্য বৈশিষ্টের নিয়ামক হয়ে আছে মানব সংস্কৃতি। বাঘে বাঘে নখরের আকার আকৃতিতে পার্থক্য থাকলেও সেটা যেমন শেষ পর্যন্ত বাঘের নখরই, ঠিক তেমনি সংস্কৃতিতে কিছু বাহ্যিক ছোটখাট ভেদাভেদ থাকলেও সেটা শেষ পর্যন্ত অভিন্ন মানব সংস্কৃতিই। হ্যাঁ, শতধা বিভক্তি সত্ত্বেও মানব কালচারগুলো আসলে সম্মিলিতভাবে সার্বজনীন সংস্কৃতি বা কালচারাল ইউনিভার্সাল (Cultural Universal)-কেই উর্ধ্বে তুলে ধরে, অন্তত বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের তাই অভিমত।

২০১০ সালের আগস্ট মাসে মুক্তমনা ব্লগে যখন আমার লেখাটা ‘সংস্কৃতির ভূত‘ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল, ঠিক একই সময় ড. নৃপেন্দ্র সরকারও একটি চমৎকার লেখা লিখেছিলেন- ‘বিবর্তনের চোখে চোখের জল’ শিরোনামে। সেখানে তিনি ব্যথা বেদনা আর চোখের জলের বিবর্তনীয় উৎস খুঁজতে সচেষ্ট হয়েছিলেন[৬৫]। লেখায় সংস্কৃতিভেদে কান্নার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, প্রিয়জনের মৃত্যুতে কান্নাকাটিতে হিন্দুদের জুড়ি নেই। কান্না চলবে দিনের পর দিন। কোনো কোনো হিন্দু সমাজে এই কান্না এক মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়।

মাস শেষে শ্রাদ্ধ করে অফিসিয়ালি কান্নার ইতি দেওয়া হয়। হিন্দু কান্না এখানেও শেষ হয় না। গয়াতে পিণ্ড দেওয়ার সময় একবার। কাশীতেও একবার। সেই পিণ্ডদান একবছর পরেই হোক আর বার বছর পরেই হোক। বুক ভাঙবে, চোখে বৃষ্টির ধারা বইবে। কিন্তু ড. সরকার তার লেখাটিতে তিব্বতীদের মধ্যে এক গোত্রের উল্লেখ করেছিলেন যারা প্রিয়জনের মৃত্যুতে কাঁদে না, দেবতা রুষ্ট হবে এই ভয়ে। তারা নাকি চোখের জল শুকিয়ে ফেলে।

অনেকের মনে হতে পারে, তিব্বতীদের এই ব্যাপারটা (যদি না ব্যাপারটা মার্গারেট মীড কিংবা ম্যানুয়েল এলিজাল্ডে জুনিয়রের মতো হোক্স কিছু হয়) সার্বজনীন সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আসলে কিন্তু তা নয়। তারাও আমার আপনার মতো স্বজন হারার দুঃখে ব্যথিত হয়। হয়তো কল্পিত দেবতার শাস্তির ভয়ে প্রকাশ করে না, কিন্তু ব্যথা অনুভবের ব্যাপারটা থেকেই যায়। আমি লেখাটি মুক্তমনায় দেওয়ার পর ‘আবেগ বিশ্বজনীন, কিন্তু প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে’ বলে সেটাই স্পষ্ট করেছেন মুক্তমনা ব্লগার জওশন আরা তার একটি মন্তব্যে[৬৬]

আমাদের স্বাতন্ত্র্য পরিমাপ করি, পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে আমরা কতটুকু ভিন্ন ভাবে চিন্তা করি, কাজ করি, সেইটুকু বিচার করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমরা ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান কালচারের’ বাইরে যাই না। কেবল বহুল প্রচলিতর চেয়ে ভিন্ন পন্থা অনুসরণ করি। স্বজন হারানোয় কে চল্লিশ দিন কাঁদল আর কে চোখ শুষ্ক করে রেখেছিল, সেগুলো কেবল মাত্র মানদণ্ড থেকে ভিন্নতার উদাহরণ। ভিত্তিভূমি হলো, স্বজন হারানোতে বিচ্ছেদ ব্যথা বা কষ্ট অনুভব করা। এইখানেই সার্বজনীনতা।

মানব সংস্কৃতি কোনো উদ্ভট কিংবা বিচিত্র সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন সমাবেশের জোড়াতালি দেয়া ফসল নয়, বরং, জৈবিক পথেই উদ্ভূত একটি অভিন্ন এবং সার্বজনীন মানব উপাদানের অংশ।


 

 ভালোবাসা কারে কয়

 


৬০.↑   John Nance, The gentle Tasaday: A Stone Age people in the Philippine rain forest, Harcourt Brace
Jovanovich, 1975

৬১.↑   The Gentle Tasaday Are Merely a Persistent Hoax, The Newyork Times, January 9, 1988.

৬২.↑   Donald Brown, Human Universals, McGraw-Hill Humanities/Social Sciences/Languages, 1991

৬৩.↑   Pierre van den Berghe, a pioneer sociobiologist at the University of Washington, puts it best when he says,

Certainly we are unique, but we are not unique in being unique. Every species is unique and evolved its uniqueness in adaptation to its environment. Culture is the uniquely human way of adapting, but culture too evolved biologically.

৬৪.↑   Steven Pinker, The Blank Slate: The Modern Denial of Human Nature, Viking, 2002, p 435-9, appendix

৬৫.↑   নৃপেন্দ্র সরকার, বিবর্তনের চোখে চোখের জল, মুক্তমনা, আগস্ট ১২, ২০১০

৬৬.↑   জওশন আরা, অভিজিৎ রায়ের প্রাসঙ্গিক মন্তব্য, মুক্তমনা, আগস্ট ১৪, ২০১০ | ১২:৫৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়