অপ্সরা থিয়েটারের মামলা

সত্যজিৎ রায়

০৩. মতি মিস্ত্রি লেন

মতি মিস্ত্রি লেনে তিনজনের বেশি লোক পাশাপাশি হাঁটতে পারে না। আমরা গাড়ি বড় রাস্তায় দাঁড় করিয়ে গলির দিকে এগোলাম। মোড়ে একটা পান বিড়ির দোকান। মালিককে জিজ্ঞেস করতে বলে দিল শশধর চাটুজ্যে তিন নম্বর বাড়িতে থাকেন।

তিন নম্বরের দরজায় টাকা মারতে একজন ভদ্রলোক দরজাটা খুললেন।

কাকে চাই?

আমরা শশধর চাটুজ্যের খোঁজ করছিলাম।

আমিই সেই লোক। আপনাদের প্রয়োজন?

লালমোহনবাবু একটা কার্ড বার করে দিতে ভদ্রলোকের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। আপনিই কি সেই বিখ্যাত রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনীর লেখক?

লালমোহনবাবু একটু বিনয় করলেন।

বিখ্যাত কিনা জানি না, তবে আমিই সেই লোক?

আরে বাবা। আপনার সব বই যে আমার পড়া। তা হঠাৎ এ-গরিবের বাড়িতে কী মনে করে?

আমি এসেছি আমার বন্ধু গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্রের তরফ থেকে।

তাঁর নামও তো শুনিচি! আপনারা ভেতরে আসুন, ভেতরে আসুন!

এতক্ষণে ঘরের ভিতর ঢুকলাম আমরা। একটা তক্তপোশেই প্রায় ঘরটা ভরে আছে, তবে তার সঙ্গে দুটো কাঠের চেয়ার রয়েছে।

লালমোহনবাবু চেয়ারে বসে বললেন, আপনার বন্ধুর খুনের ব্যাপারে আমরা তদন্ত করছি। সে সম্বন্ধে আপনি যদি কিছু বলেন।

আমি আর কী বলব। সে আমার বাড়িতে ঢোকার আগেই খুন হয়। পাড়ার একটি ছেলে আমাকে খবর দেয়। বাইশ বছর হল আমাদের বন্ধুত্ব, যদিও রাইভ্যাল থিয়েটারে আমরা অভিনয় করতাম।

ওঁর কোনও শত্রু ছিল বলে জানেন?

নেপালের শত্রু থাকবে না? সে এত বড় একটা হিরো-অন্য সব অভিনেতার সে ঈর্ষার পাত্ৰ। তার তো শত্ৰু থাকবেই।

বিশেষ কারুর নাম মনে পড়ছে না?

না। তা পড়ছে না। সেরকম কোনও নাম নেপাল করেনি। আমার কাছে। সে কাউকে বিশেষ তোয়াক্কা করত না। একটু বেপরোয়া গোছের লোক ছিল। তার পেশায় তার সমকক্ষ খুব কমই ছিল। অন্য বহু থিয়েটার তাকে অনেক টাকার লোভ দেখিয়েছে। কিন্তু অপ্সরায় তার অভিনয় জীবনের শুরু বলে সে আর কোথাও যায়নি।

তিনি যে হুমকি চিঠি পাচ্ছিলেন সে কথা আপনাকে বলেছিলেন?

বলেছিল বইকী, কিন্তু সে পাত্তাই দেয়নি। এক নাম করা জ্যোতিষী তাকে বলেছিল। সে বিরাশি বছর বাঁচবে। সেটা সে বিশ্বাস করত। বলত ওই বয়স অবধি সে অভিনয় চালিয়ে যাবে, আর মঞ্চের উপর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে।

শশধর বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

এর বেশি আমার আর কিছু বলার নেই, জানেন। আর আমার মন মেজাজও ভাল নেই। আপনারা বরং আসুন।

আমরা উঠে পড়লাম।

এক সকালের পক্ষে অনেক কাজ হয়েছে মনে করে আমরা বাড়ির দিকেই রওনা দিলাম। ফেলুদাকে সব রিপোর্ট করতে হবে।

ফেলুদা সব শুনোটুনে লালমোহনবাবুর খুব তারিফ করল। বলল, আপনি তো একেবারে পেশাদারি গোয়েন্দার মতো কাজ করেছেন। যেটা বাকি রইল সেটা হচ্ছে অপ্সরা থিয়েটারের অন্য প্রধান অভিনেতাদের জেরা করা। বিশেষ করে টপ অভিনেতা-যাদের সঙ্গে নেপাল লাহিড়ীর হৃদ্যতাও ছিল, রেষারেষিও ছিল।

তোমার পা কী বলে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

এখনও নষ্ট নড়ন-চড়ন। আরও দুদিন অন্তত লাগবে সারিতে। ভাল কথা অভিনেতাদের সঙ্গে যখন কথা বলবেন তখন নতুনটিকেও বাদ দেবেন না।

না না, তা তো নয়ই।

।লালমোহনবাবু ফেলুদার কাজটা করে খুব খোশমেজাজে ছিলেন। বললেন, এ এক নতুন অভিজ্ঞতা হল। আসলে আপনার কাজটা যত কঠিন বলে মনে হয় তত কঠিন নয়।

কঠিন কেবল রহস্যোদঘাটন।

তা বটে, তা বটে। সেটা এখনও পারব না নিশ্চয়ই। আর সেরকম দাবিও করছি না। তবে একটা কথা বলতে পারি।–আজ ওখানে আমাকে দেখলে আপনি চিনতেই পারতেন না।

বটে?

সেন্ট পারসেন্ট।

ওখানে কি মহড়া চলছে?

আমি বললাম, চলছে বোধহয়। কয়েক’দিনের মধ্যেই তো আলমগীর শুরু হবে।

তা হলে ম্যানেজারকে টেলিফোন করে কোন সময় গেলে সকলের সঙ্গে দেখা হবে। আর কথা বলা যাবে সেটা জেনে নিবি।

ভেরি গুড।

পুলিশ দেখলি?

কইনা তো।

আছে নিশ্চয়ই। কাগজে তো লিখেছে তারা তদন্ত চালাচ্ছে। একবার ইনস্পেক্টর ভৌমিককে ফোন করব। তার আন্ডারেই কেসটা পড়বে বলে মনে হচ্ছে।

ইনস্পেক্টর ভৌমিকের সঙ্গে কথা বলে ফেলুদা জানল যে পুলিশ একটা গুণ্ডার দলকে সন্দেহ করছে। নেপালবাবুর নাকি একটা সোনার ঘড়ি ছিল সেটা খুনের পর পাওয়া যায়নি। খুবই দামি ঘড়ি, এবং সেটাই হয়তো খুনের কারণ হতে পারে। ফেলুদা বলল, তা হলে থিয়েটারের সঙ্গে এ-খুনের কোনও সম্পর্ক নেই বলছেন। তাতে ভৌমিক বললেন ওঁর। তাই ধারণা। একটা গুণ্ডার দল কিছুদিন থেকেই নাকি ওই অঞ্চলে উৎপাত করছে। তারা প্ৰায় সকলেই দাগি আসামি। ছুরিটা নেপালবাবুর গায়েই বিঁধে ছিল, কিন্তু তাতে কোনও আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। সব শেষে ভৌমিক বললেন, তিনি আশা করছেন দিন তিনেকের মধ্যেই কেসটার নিম্পত্তি হয়ে যাবে; এবার আর আপনাকে কোনও ভূমিকা নিতে হবে না, বললেন ভদ্রলোক।

ফেলুদা টেলিফোনটা রেখে বলল, ম্যানেজারকে ওই ফোনটা করে নে। অভিনেতাদের একবার জেরা করা দরকার।

আমি তখনই অন্সর থিয়েটারে ফোন করলাম। বার তিনেক ডায়াল করবার পর লাইন পেলাম! ম্যানেজার বললেন, পুলিশ এক দফা জেরা করে গেছে সকলকে। তবে আপনারা যদি আবার করতে চান তা হলে বিযুদবার সকাল সাড়ে দশটায় আসুন। সেদিন এগারোটায় রিহার্সাল আছে; আপনাদের আধা ঘণ্টায় কাজ শেষ করতে হবে।

আমি ফোনটা নামিয়ে রাখার পর ফেলুদা বলল, টপ তিনজন আর ওই নতুন অ্যাকটরটিকে জেরা করলেই হবে।

বিষ্যুদবার সাড়ে দশটার পাঁচ মিনিট আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম অন্সর থিয়েটারে। ফেলুদাকে দেখে এসেছি তার আজও পায়ে ব্যথা রয়েছে। লালমোহনবাবু আজ আরও স্মার্ট, তার হাঁটা চলা এবং কথা বলার ঢংই বদলে গেছে।

আমরা প্রথমে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে বললাম যে আমরা তিনজন টপ অভিনেতা আর নতুন অভিনেতাটিকে প্রশ্ন করতে চাই।

তা হলে ধরণীকে দিয়ে শুরু করুন। ধরণী সান্যাল। সে এখানের সিনিয়ারমোস্ট আর্টিস্ট; ছাব্বিশ বছর হল কাজ করছে।

আমাদের জেরার জন্য ম্যানেজারের পাশের ঘরটা খালি করে দেওয়া হল। ঘরে একটা সোফা আর তিনটে চেয়ার রয়েছে।

একজন বছর পঞ্চাশের ভদ্রলোক এসে ঢুকলেন। সিংহের কেশরের মতো চুল-তার বেশির ভাগই সাদা-ঢুলু ঢুলু চোখ, গায়ের রং মাঝারি।

আমার নাম ধরণী, সান্যাল, বললেন ভদ্রলোক, আপনারা গোয়েন্দা?

আজ্ঞে হ্যাঁ, সোজাসুজি বললেন লালমোহনবাবু। আমরা নেপাল লাহিড়ীর ব্যাপারে তদন্ত করছি।

নেপাল হুমকি চিঠি পাচ্ছিল, বললেন ধারণীবাবু। তাকে বললুম সাবধান হতে, সে কথা কানেই তুললে না। এর মধ্যে গেছে মতি মিন্ত্রি লেনে। আরে বাবা, বন্ধুর সঙ্গে ক’দিন না হয় নাই দেখা করলে। আমি তো ওকে পুলিশে খবর দিতে বলেছিলাম, কিন্তু ও গা-ই করেনি। ঠিক এরকম হয়েছিল আমাদের আরেক অভিনেতার—মহীতোষ রায়। অবিশ্যি মহীতোষের মৃত্যুটা থিয়েটারের পক্ষে তত বড় লস নয়।

নেপালবাবুর কোনও শত্রু ছিল বলে জানেন?

থিয়েটারের টপ পোজিশনে বসে থাকলে তার শত্রু থাকবেই। মানুষের ছয় রিপুর মধ্যে একটি হল মাৎসৰ্য। নেপালের শত্রু থাকবে না? তবে যদি জিজ্ঞেস করেন কোন শত্রু এই কুকীর্তি করেছে, বা শত্ৰু ছাড়া অন্য কেউ করেছে কিনা, তা বলতে পারব না।

আজ্ঞে না। এমনিই থিয়েটারে হগুপ্তায় তিন দিন দেখা হচ্ছে, তার উপর সে আমার এমন বন্ধু ছিল না যে অন্যদিনও দেখা করব।

যে দিন খুন হয় সেদিন সন্ধ্যাবেল আপনি কী করছিলেন?

কালিকিঙ্কর ঘোষের বাড়ি কোত্তন শুনছিলুম! ইচ্ছে করলে যাচাই করে নিতে পারেন।

ঠিক আছে; আপনাকে আর কোনও প্রশ্ন করার নেই।

এবার এলেন দীপেন বোস। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স, মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল, ঠোঁটের কোণে একটা সিগারেট, দাড়ি-গোঁফ নেই।

ভদ্রলোক প্রথমেই বললেন, আমি আর নেপাল প্রায় এক সঙ্গেই অপ্সরা থিয়েটারে জয়েন করি। সে ছিল জাত অভিনেতা। আমারও অ্যাম্বিশন ছিল, কিন্তু দেখলাম নেপালের সঙ্গে পেরে উঠব না।

তাতে আপনার মনে ঈর্ষা জাগেনি?

তা জেগেছে বইকী। বিলক্ষণ জেগেছে। অনেকদিন মনে মনে ভেবেছি-এই লোকটা আমার পথে কাঁটা হয়ে রয়েছে—এটাকে সরানো যায় না?

এই চিন্তাকে কার্যে পরিণত করার ইচ্ছা হয়নি কোনওদিন?

পাগল! আমরা ছাপোষা লোক। আমাদের দিয়ে কি খুনখারাপি হয়? নাটক করি, তাই নানারকম নাটকীয় চিন্তা মাথায় আসে—ব্যাস, ওই পর্যন্ত।

যেদিন খুনটা হয় সেদিন সন্ধ্যাবেলা আপনি কী করছিলেন?

বায়স্কোপ দেখছিলাম। তবে প্রমাণ দিতে পারব না। টিকিটের অর্ধাংশ আমি কখনও রাখি না।

কী ছবি দেখলেন?

মনের মানুষ।

কেমন লাগল?

থার্ড ক্লাস।

ঠিক আছে, আপনি আসতে পারেন।

তৃতীয় অভিনেতার নাম ভুজঙ্গ রায়। এঁর বয়স পঞ্চাশের উপর, চোখা নাক, চোখ কোটরে বসা, গাল তোবড়ানো, মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে।

আপনার সঙ্গে নেপালবাবুর সদ্ভাব ছিল?

এই থিয়েটারে নেপালই ছিল আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু।

তাঁর মৃত্যু সম্বন্ধে আপনার কিছু বলার আছে?

এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি থিয়েটার-মহলে অনেকদিন হয়নি। নেপাল ছিল আশ্চর্য অভিনেতা। আমার সঙ্গে কোনওদিন ক্ল্যাশ হয়নি, কারণ ও করত নায়কের রোল আর আমি করতুম ক্যারেকটার পার্ট।

উনি হুমকি চিঠি পাচ্ছিলেন সেটা আপনাকে বলেছিলেন?

প্রথম দিনই। আমি ওকে ওয়ার্নিং দিই—এসব চিঠি উড়িয়ে দিয়ে না, আর বিশেষ করে মতি মিস্ত্রি লেনে কিছুদিন যাওয়া বন্ধ করে। ও পাড়াটা নটারিয়াস। কে কার কথা শোনে? নেপালের বিশ্বাস ছিল তার আয়ু বিরাশি বছর—সেটা কেউ খণ্ডাতে পারবে না।

তা হলে আপনার ধারণা গুণ্ডার হাতেই তাঁর মৃত্যু হয়?

তাই তো মনে হয়, কারণ তার দামি ঘড়িটাও তো পাওয়া যায়নি। সোনার ওমেগা ঘড়ি, দাম ছিল সাত হাজার টাকা।

ভুজঙ্গবাবুকে ছেড়ে দিলাম। উনি আমাদের ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলেন।

এবার এলেন নতুন অভিনেতা, নাম সুধেন্দু চক্রবর্তী। প্রথম দেখে একটু হকচাকিয়ে যেতে হয়, কারণ মোগলাই দাড়ি আর গোঁফ দেখে মনে হয়। উনি মেক-আপ নিয়ে রয়েছেন। বললেন, অপ্সরা থিয়েটারে আলমগীর হচ্ছে শুনেই তিনি দাড়ি রাখতে আরম্ভ করেন। আগে শুধু গোঁফ। छिन।

আপনি এর আগে কোথায় অভিনয় করতেন? লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন।

কোথাও না। দু-একটা আপিস ক্লাবে করেছি। আমার প্লাইউডের ব্যবসা ছিল। তবে অভিনয় আমার নেশা। আর কিছু না করার থাকলে আমি নাটকের বই খুলে পার্ট মুখস্থ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতাম। এখন অবশ্য তার আর দরকার হবে না।

আপনি কি আলমগীরে পার্ট পেয়ে গেছেন?

সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, তবে কোন পার্ট সেটা এখনও স্থির হয়নি। মেন পার্টও হতে পারে।

আপনি থাকেন কোথায়?

অ্যামহাস্ট রো।

ব্যবসা কি এখন ছেড়ে দেবেন?

হ্যাঁ। অ্যাকটিংই আমার ধ্যান ছিল; সুযোগ পাইনি বলে ব্যবসা চালাচ্ছিলাম।

ফেলুদাকে যাতে ঠিকভাবে রিপোর্ট দিতে পারি। তাই আমি কথোপকথনটা টেপ রেকর্ভারে রেকর্ড করে নিচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম লালমোহনবাবু প্রশ্নগুলো করছিলেন নিজেকে ফেলুদা হিসেবে কল্পনা করেই। এটা আমাদের কাছে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।

সুধেন্দুবাবুকে আর একটাই প্রশ্ন করার ছিল।

আপনার সঙ্গে নেপালবাবুর আলাপ হয়েছিল?

সামান্যই। তবে ওঁর অভিনয় আমি আগে অনেক দেখেছি। খুব ভাল লাগত।

ফেলুদা খুব মন দিয়ে আমাদের রিপোর্ট শুনল। তারপর বলল, আমার অ্যাবসেন্সে তো তোরা বেশ চালিয়ে নিতে পারছিস।।

লালমোহনবাবু বললেন, প্রশ্ন করাটাতে খুব একটা বুদ্ধি লাগে না, আসল কথা হচ্ছে উত্তরগুলো থেকে কী বোঝা গেল। আমি তো মশাই এখনও যেই তিমিরে সেই তিমিরে। আর গুণ্ডা। যদি মেরে থাকে লাহিড়ীকে তাহলে তো পুলিশ তার কিনারা করবেই।

গুণ্ডারা হুমকি চিঠি দিয়ে খুন করে না।

তা বটে। তা আপনার কি মনে হয় নেপাল লাহিড়ী আর মহীতোষ রায়কে একজন লোকই খুন করেছে?

একজন বা একই দল। সেটাই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু মোটিভটা–?

ধরুন যদি অন্য থিয়েটারের লোক খুনটা করে থাকে, সেখানে তো স্পষ্ট মোটিভ রয়েছে। অপ্সরা থিয়েটারে এখন টুপ দুজন অভিনেতাই চলে গেল। ওদের আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে কি কম সময় লাগবে?

ফেলুদার পায়ে এখনও বেশ ব্যথা। বোধ হয় এক্স-রে করাতে হবে। ব্যান্ডেজ-বাঁধা পা কফি টেবিলের উপর তুলে ও সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিল। বলল, তোরা তো অনেক কাজ করলি, এবার আমায় একটু নিরিবিলি কাজ করতে দে।

কী কাজ করবে তুমি?

চিন্তা করব। একটা আলোর আভাস দেখতে পাচ্ছি। অন্ধকারের মধ্যে। সেইটে আরও উজ্জ্বল হওয়া দরকার।

লালমোহনবাবু বললেন, আপনি ভাবুন, আমি আপনাকে কোনওরকম ডিসটার্ব না করে এক কাপ চা খাব। তপেশ ভাই, ভেতরে একটু বলে দিয়ে এসো না!

ফেলুদা দেখলাম ভ্রূকুটি করে চোখ বুজে ফেলেছে। শেষটায় কি ও ঘরে বসেই রহস্যের সমাধান করে ফেলবে নাকি?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ও একটা প্রশ্ন করল।

এইসব অভিনেতাদের সঙ্গে যে কথা বললি, এদের কারুর মধ্যে কোনও বাতিক লক্ষ করলি?

আমি বললাম, ভুজঙ্গ রায় নস্যি নেন; ধরণী সান্যাল বিড়ি খান আর সুধেন্দু চক্রবর্তী মশলা খান।

গুড।

আবার কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। ইতিমধ্যে শ্ৰীনাথ লালমোহনবাবুকে চা এনে দিয়েছে, ভদ্রলোক বেশ তৃপ্তিসহকারে পান করছেন। আমি একটা পত্রিকার পাতা উলটে যেতে লাগলাম। ফেলুদার কাছে নানারকম পত্রিকা আসে, তার বেশির ভাগই অবিশ্যি ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে চলে যায়।

মিনিট পাঁচেক নিস্তব্ধতার পর ফেলুদার দিকে চেয়ে দেখি ও চোখ খুলেছে, আর সেই চোখ জ্বলজ্বল করছে।

লালমোহনবাবু, চাপা স্বরে বলল ফেলুদা।

আজ্ঞে?

এই যে সুধেন্দু চক্রবর্তী-ইনি কি মাঝারি হাইটের ভদ্রলোক?

হ্যাঁ।

ফরসা রং?

হ্যাঁ।

বছর চল্লিশ-পায়তাল্লিশ বয়স?

হ্যাঁ–কিন্তু আপনি ঐকে চেনেন নাকি?

শুধু আমি নয়, আপনারাও চেনেন।

ঘলেন। কী? এবার বোধহয় ঘরে বসেই রহস্যোদঘাটন হয়ে গেল।

অ্যাঁ!

দাঁড়ান, আগে ইনস্পেক্টর ভৌমিককে একটা ফোন করি।

আমি ফেলুদার হয়ে নম্বরটা ডায়াল করে ফোনটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। ফেলুদা বলল, কে, হরিদাসবাবু? আমি প্রদোষ মিত্ৰ কথা বলছি।–শুনুন, ওই অপ্সরা থিয়েটারের মামলাটা— আমার মনে হয় গুণ্ডাদের পিছনে সময় নষ্ট না করাই ভাল, কারণ আমি জেনে গেছি কে খুনটা করেছেঃ আমি তো চলৎশক্তিরহিত। কাজেই আপনাকেই আসতে হবে। আমার কাছে। আমি নাইনটি নাইন পার্সেন্ট সিওর, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে এলেই হবে।

ফেলুদা ফোন রেখে দিল। আমরা ওর মুখের দিকে চেয়ে রয়েছি।

খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তাই না? ঠিক আছে। তোদের আর সাসপেন্সে রাখব না। ব্যাপারটা জলের মতো সোজা, অথচ জিলিপির মতো পাঁচালো। একটা কথা বলতেই হবে।–হ্যাঁটস অফ ঢুঁ দ্য মার্ডারার! আশ্চৰ্য ফন্দি এঁটেছিল। ফেলু মিত্তিরের পর্যন্ত ধোঁকা লেগে গিয়েছিল। আসলে এটা স্রেফ ঈর্ষার ব্যাপার। নেপাল লাহিড়ীকে সরিয়ে প্রধান অভিনেতার স্থান দখল করার চেষ্টা; তার জন্যেই খুন।

কিন্তু মহীতোষ রায়?

তিনি খুন হননি।

অ্যাঁ!

না। তিনি এমনভাবে ঘটনাটাকে সাজিয়েছিলেন–হুমকি চিঠি থেকে আরম্ভ করে–যাতে মনে হয় তিনি খুন হয়েছেন। আসলে তিনি এখনও জীবিত এবং বহাল তবিয়াতে রয়েছেন ছদ্মবেশে এবং নতুন ঠিকানায়। লেকে গিয়েছিলেন তিনি শুধু মশলার কৌটোটা ফেলে আসতে। তারপর গা ঢাকা দিলেই লোকের সন্দেহ হবে যে তিনি খুন হয়েছেন এবং তাঁর মৃতদেহ লেকের জলে ডুবে রয়েছে।

আশ্চৰ্য মাথা বটে লোকটার।

তারপর তিন মাসে দাড়ি গোঁফ গজিয়ে অপ্সরা থিয়েটারে আগমন। দাড়ি-গোঁফে মানুষের চেহারা একদম বদলে যায়। তাই আপনারা চিনতে পারেননি। অপ্সরাতে অভিনেতা দরকার।–সুতরাং ওঁকে না নেওয়ার কোনও কারণ নেই, বিশেষত যখন সুপুরুষ চেহারা আর কণ্ঠস্বর ভাল।

সুধেন্দু চক্রবর্তী!

ইয়েস স্যার। মশলার অভ্যাস এখনও যায়নি—যদিও আপনাদের সামনে খেয়ে লোকটা কাঁচা কাজ করেছে। যাই হাক, তাঁর প্ল্যান একেবারে ষোলো আনা সফল হত, যদি না আপনারা আমাকে সাহায্য করতেন। লোকটা একটা পাকা খুনি বনে গিয়েছিল স্রেফ উচ্চাভিলাষের বশে। আংটি চুরিটা অবশ্য স্রেফ ভাঁওতা। কিন্তু ফেলুমিত্তিরকে তো সে চেনে না। আমার কাছে এসে যে কত বড় ভুল করেছে এবার সে বুঝতে পারবে।

ফেলুদা যে ব্যাপারটা ঠিকই ধরেছিল সেটা অবিশ্যি পরদিনই ইনস্পেক্টর ভৌমিকের টেলিফোনে জানা গেল।

লালমোহনবাবু আমাকে আলাদা পেয়ে বললেন, তোমার দাদার সঙ্গে আমাদের তফাতটা কোথায় সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

কোথায় তফাত?

লালমোহনবাবু তাঁর টাকের উপর ডান হাতের তর্জনীর ডগা দিয়ে টোকা মেরে বললেন— মাথায়!

 


অপ্সরা থিয়েটারের মামলা

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top