বিবর্তনের পথ ধরে

বন্যা আহমেদ

ভূমিকা

এবছর আমার বিশেষ আনন্দের কারণ হয়ে উঠে মানব প্রযুক্তির নবীনতম উদ্ভাবন ই-মেইল। এর মাধ্যমে সুদূর আমেরিকার আটলান্টা থেকে একটি বার্তা আসে অপরিচিত লেখিকা বন্যা আহমেদ-এর কাছ থেকে। বার্তাটির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল “বিবর্তনের পথ ধরে”- শীর্ষক বইয়ের কয়েকটি অধ্যায়। বইটি সম্পর্কে মতামত প্রদানের জন্য আমাকে অনুরোধ করেন তিনি।

আকস্মিক এ ঘটনায় আমি যারপর নাই বিস্মিত হই। কিন্তু অধ্যায়গুলাে পড়ে আমি হই ততােধিক আনন্দিত। কারণ অনেক। প্রথমত, বইটি বিবর্তনবিদ্যা সংক্রান্ত। আর বহু বছর যাবৎ আমার অ্যাকাডেমিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বিবর্তনবিদ্যা। দ্বিতীয়ত, বইটি আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলায় লেখা। এদেশে বাংলা ভাষায় উঁচু মানের বিবর্তনবিদ্যার বইতাে দূরের কথা, বিজ্ঞানের যেকোনো শাখার বই-ই দুষ্প্রাপ্য। তৃতীয়ত, এর রচনাশৈলী বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত একাডেমিক রীতির বদলে জনপ্রিয় ও সহজবােধ্য রীতি। চতুর্থত, বইটি আধুনিক তথ্যে সমৃদ্ধ। পঞ্চমত, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে প্রচলিত সৃষ্টিবাদী (Creationist) বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির (Paradigm, Worldview) বদলে আধুনিক বিবর্তনবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গঠনে বিবর্তনবিদ্যার প্রভাব নিয়ে প্রগতিশীল আলােচনা রয়েছে বইটিতে।

কিছুদিন আগে বন্যা ঢাকায় আমার বাসায় এসেছিল। সঙ্গে আরাে অনেকগুলাে অধ্যায়। তাকে দেখে ও তার সাথে কথা বলে বুঝলাম আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আরাে কিছু বিস্ময়। এক, বয়স তার বেশ কম। দুই, তার প্রথাগত শিক্ষা বিবর্তনবিদ্যায় নয়, এমনকি প্রত্যক্ষভাবে জীববিদ্যায়ও নয়। লেখিকা জৈবপ্রযুক্তির পটভূমিতে সুশিক্ষিত একজন কম্পিউটার প্রযুক্তিবিদ। সবার ওপর, তিনি বিবর্তনবিদ্যায় অত্যন্ত আগ্রহী একজন প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষ।

ক্রমান্বয়ে অবশিষ্ট অধ্যায়গুলাে পেয়ে যাই ই-মেইলে। এভাবে পুরাে পান্ডুলিপিটি পড়ে বইটি সম্পর্কে ইতােপূর্বে গড়ে উঠা আমার ধারণা আরাে সুদৃঢ় হলাে। আর আমি দেখতে পেলাম যে বইটিতে রয়েছে সৃষ্টিবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির সর্বশেষ রূপ বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা (Intelligent Design) বা আইডি সম্পর্কে মনােজ্ঞ ও বিশদ আলােচনা। এটি বােধ হয় বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম। আমার বলতে কোন দ্বিধা নেই যে, বিবর্তনের পথ ধরে হচ্ছে আদ্যোপান্ত প্রাঞ্জল ও ঋদ্ধ আলােচনা-সমৃদ্ধ। আধুনিক বিবর্তনবিদ্যার একটি অতি প্রয়ােজনীয় জনবােধ্য গ্রন্থ।

আমাদের দেশের জন্য দারুণভাবে প্রয়ােজনীয় বন্যা আহমেদের এ বইটি। কারণ বােধ হয় সবিস্তারে ব্যাখ্যার প্রয়ােজন নেই। সংক্ষেপে এই রকম। তথাকথিত মুক্ত বাজারের খােলা হাওয়াতেও নানা কারণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে বাকি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে আমাদের দেশ। বলতে গেলে, বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারের বদলে এ দেশে ঘটছে সংকোচন। এর অন্যতম কারণ এই যে, বেশ কয়েক বছর থেকে দেশে বিজ্ঞানবিরােধী সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ মৌলবাদের চলছে রমরমা ব্যবসা।

এক শ্রেণির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তকচ্চ প্রসার ঘটছে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার। জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা প্রতিষ্ঠা করার একটি সচেতন ও সংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে এসব স্থানকে কেন্দ্র করে। তাই বলা যায় এগুলাে হয়ে পড়ছে মধ্যযুগীয় মুর্খতা প্রচার কেন্দ্র। এর ঢেউ এসে লাগছে আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সেকুলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। এ পরিমণ্ডলেই কয়েক বছর আগে আমাদের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের জীববিজ্ঞানের পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ পড়েছে বিবর্তন তত্ত্ব। অথচ সেই বৃটিশ আমল থেকে উক্ত স্তরের পাঠ্য পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টির জন্য নির্দিষ্ট থাকত একটি অধ্যায়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী একটি ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ্য চাপে পড়ে বিবর্তনবিদ্যা পড়ানাে বন্ধ করা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রথমে মাস্টার্স শ্রেণি থেকে বিবর্তনবিদ্যার কোর্স বাদ দিয়ে এবং পরে সম্মান শ্রেণির সিলেবাস সঙ্কোচন করে বিষয়টির যথেষ্ট গুরুত্ব হ্রাস করা হয়েছে। অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজগুলােতে পড়ে দেশের সিংহভাগ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। একাডেমিক জগতের বাইরেও নানাভাবে বিজ্ঞানবিমুখ প্রচারণা বেশ শক্তিশালী হয়ে চলেছে। এসবের প্রভাব পড়ছে জনমানসে, আমাদের সমাজে।

আমার বিশ্বাস, বিজ্ঞানবিমুখ পশ্চাদগামিতার এই আত্মঘাতি শক্তিকে প্রতিরােধ করতে পারে একমাত্র শতভাগ বিজ্ঞানমনস্ক বিবর্তনবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি। জীববিজ্ঞানের সব শাখার ভিত্তিমূল হিসেবে বিবেচিত আধুনিক বিজ্ঞানের প্রত্যয়টির নাম বিবর্তনবাদ; আমার বিশ্বাস সেটি বাংলাদেশের মানুষদের কাছে সহজবােধ্যভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে বন্যা আহমেদের বিবর্তনের পথ ধরে  বইটি। আমি বইটির বহুল প্রচার কামনা করি।


ড. ম. আখতারুজ্জামান
সাইটোজেনেটিক্স গবেষণাগার,
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
১১ ডিসেম্বর, ২০০৬।


 বিবর্তনের পথ ধরে

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

১০ম অধ্যায়

১১ম অধ্যায়

পরিশিষ্ট
রঙ্গীন প্লেট

বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো

গ্রন্থ আলোচনা