কেন আমি ধর্মবিশ্বাসী নই

বার্ট্রান্ড রাসেল

০৩. ধার্মিক বুর্জোয়া এবং অধার্মিক সর্বহারা

[তৃতীয় খন্ড]

নৈতিক সমস্যা

এবার আপনি নৈতিক প্রশ্নে আসুন। খ্রীষ্টের নৈতিক চরিত্রকে নিয়ে আমার মনে একটি গভীর সন্দেহ আছে এবং সেটি হল যে তিনি নরকে বিশ্বাস করতেন। আমি নিজে এই ব্যাপারটিকে কিছুতেই মেনে উঠতে পারি না যে খ্রীষ্টের মতো একজন পূর্ণমানব এইরকম চিরশাস্তিকে বিশ্বাস করতে পারেন। সুসমাচারগুলোতে খ্রীষ্টের এমন অনেক ছবি আঁকা হয়েছে যেখানে তাকে চিরশাস্তিকে বিশ্বাসীরূপে দেখা যাচ্ছে এবং যে-কেউ এই ব্যাপারটি দেখতে পাবেন যে যারা খ্রীষ্টের বাণী প্রচারে কান দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে তার সমর্থনকারীদের উন্মত্ততা।

বাণী প্রচারকদের কাছে এই রকম ঘটনা কোন নতুন ঘটনা নয়, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা তাদের গুরুগিরির গুরুত্বকে বেশ কিছুটা হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে আপনি সক্রেটুসের আচরণ লক্ষ্য করেননি। যে-সব মানুষ সক্রেটসের কথা শুনতো না তাদের কাছে তিনি ছিলেন অতিশয় নম্র ও ভদ্র। আমার মত অনুযায়ী এই ধরনের আচরণই একজন সাধু ব্যক্তির পক্ষে অধিকতর উপযুক্ত আচরণ। উপরোক্ত প্রচারক গুরুদের কর্কশ আচরণ কখনই উপযুক্ত আচরণ হতে পারে না। সম্ভবত আপনারা সবাই মনে রেখেছেন সেইসব কথাগুলোকে যা সক্রেটস তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে বলেছিলেন এবং সেই কথাগুলোও নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে যে কথাগুলো তিনি তাদের বলতেন যারা তার কথা শুনতে না।

আপনারা দেখতে পাবেন যে তিনি তার সুসমাচারগুলোতে বলেছেন, ‘ওরে শয়তানগ্রস্ত, ওরে বিষধর সর্পের বংশধর, তোরা কি নরকের করাল গ্রাস থেকে কোনভাবে উদ্ধার পাবি?’ এই ধরনের কথা তাদের বিরুদ্ধেই বলা হয়েছে যারা তাঁর প্রচারে কান দেয়নি। এই ধরনের কথাগুলিকে আমার মন কিছুতেই উত্তম বলে মেনে নিতে পারেনি। নরক সম্পর্কে এ ধরনের অনেক উদাহরণ আপনি সুসমাচারগুলোতে দেখতে পাবেন। পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে পাপ সম্পর্কিত জনপ্রিয় একটি গ্রন্থের কথা আমরা জানি, যেখানে বলা হয়েছে, যারা পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে কোন কথা বলবে তারা এ-জগতেও যেমন স্থান পাবে না, তেমনি আগত জগতেও কোন স্থান পাবে না।

এই জনপ্রিয় গ্রন্থটিতে সেইসব মানুষদের জন্য এই জগতে অব্যক্ত সব নিদারুণ যন্ত্রণার উল্লেখ করা হয়েছে যারা কল্পনাতেও পবিত্র আত্মার বিরুদ্ধে কোনরকম পাপ করে ফেলেছে এবং এটা চিন্তা করা হয়ে থাকে যে তারা ইহজগৎ বা পরজগৎ কোন জায়গাতেই ক্ষমা পাবে না। আমি সত্যই একথা চিন্তাও করতে পারি না যে চরিত্রের দিক থেকে খ্রীষ্টের মতো এমন একজন কোমল হৃদয়সম্পন্ন মানুষের পক্ষে জগতে এইরকম ভয় এবং প্রচণ্ড ভীতির সঞ্চার সম্ভব হয়ে থাকতে পারে।

এখানেই খ্রীষ্ট থেমে থাকলেন না। তিনি আরও বললেন, মানবের সন্তান তার দেবদূত পাঠাবেন এবং তারা তাঁর রাজত্বে যা কিছু বিরক্তিকর সেইসব কিছুকে বার করে এক জায়গায় একত্রিত করবে, এবং শুধু তাদেরই নয়, যারা পাপ করেছে। তাদেরও তারা এক জায়গায় করবে। তারপর তাদের জ্বলন্ত আগুনের চুল্লীতে নিক্ষেপ করবে। সেখানে শোনা যাবে দাঁত কিড়মিড় ও আর্তনাদের শব্দ। তিনি সেই আর্তনাদ ও দাঁত কিড়মিড়ের দিকেই এগিয়ে চলেছেন।

তাঁর সুসমাচারগুলোতে এই ধরনের কথা বার বারই এসেছে। এটা পাঠকদের কাছে স্পষ্ট যে এই ধরনের দাঁত কিড়মিড় ও আর্তনাদের সম্পর্কে অনুতাপ করে এক ধরনের সুখ লাভ করা যায়। এই ধরনের অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন আপনাদের অবশ্যই মনে আছে সেই ভেড়া ও ছাগলের উপাখ্যানের কথা। ভেড়া ও ছাগলদের দ্বিতীয়বার ভাগ করতে এসে তিনি ছাগলদের বলেন, ‘ওরে অভিশপ্তর দল, দূর হ আমার সামনে থেকে, এবং অনন্ত আগুনে পুড়ে মর।’

এরপর তিনি আরও বলেন, যদি তোমার হাত তোমাকে বিরক্ত করে তবে তাকে কেটে ফেল, দু’হাত থেকে যদি সেই নরকে যেতে হয় যে নরকের আগুন কখনও নেভে না, উষ্ণতা কখনও হ্রাস পায় না তপ্ততা কখনও ঠাণ্ডা হয় না, তার থেকে অনেক ভালো দু’হাত কেটে অঙ্গহীনতার জীবন কাটানো, বার বার তিনি এই কথা বলেছেন। আমি অবশ্যই বলব যে এই ধরনের নীতি, যা পাপ করার জন্য নারকীয় আগুনের শাস্তি দেয়, তা নিষ্ঠুর নীতি। এই ধরনের নীতি জগতে নিষ্ঠুরতাকে বৃদ্ধি করেছে এবং যুগের পর যুগ ধরে নিষ্ঠুর অত্যাচারের রাজত্ব চালিয়েছে। সুসমাচারের খ্রীষ্টকে যদি আপনারা তার যুগের সময় থেকে পর্যবেক্ষণ করেন তবে দেখবেন যে তিনি এরজন্য আংশিক হলেও দায়ী।

এধরনের আরও অন্যরকম গল্প পাওয়া যায় যেগুলো অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। গাদারেনের শূকরের উপাখ্যান আর একটি দৃষ্টান্ত। সেখানে ছোট শূকরদের মধ্যে শয়তানকে স্থাপন করে তাদের পাহাড় থেকে ছুটিয়ে নামিয়ে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যাওয়াটা মোটেই কোন সহৃদয়তার পরিচয় নয়। আপনারা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন যে তিনি সর্বশক্তিমান এবং তিনি ইচ্ছে করলে শয়তানকে তাড়িয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে ছোট্ট শূকরদের মধ্যে শয়তানকে পাঠালেন।

এছাড়াও ডুমুরগাছ নিয়েও একটি কৌতূহলোদ্দীপক গল্প আছে, যে গল্পটা আমাকে সর্বদাই বিমূঢ় করে রাখে : ‘সে ছিল ক্ষুধার্ত এবং দূরে পাতায় ভরা একটি ডুমুরগাছ দেখে খুশী হয়ে সেখানে এলো এই আশায় যদি সেখানে কিছু পাওয়া যায়।  গাছের কাছে এসে সে দেখলো গাছের পাতা ছাড়া আর কিছুই নেই, কেননা সেই সময়টা ডুমুর ফলার সময় ছিল না। এই জন্য যীশু ডুমুরগাছকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, “কোন মানুষ এবার থেকে তোমার ফল খাবে না কখনও।”… পিটার তাঁকে বললেন, “প্রভু দেখুন, ঐ যে ডুমুরগাছ, তোমাদের মধ্যে যারা অভিশপ্ত তারা দূর হও।”

এই গল্পটি সত্যই একটি কৌতূহলোদ্দীপক গল্প, কেননা বছরের সেই সময় ডুমুর ফলার সময় ছিল না, এই কারণে কোনভাবেই আপনারা ডুমুরগাছকে দোষারোপ করতে পারেন না। আমি নিজে ভাবতে পারি না যে যীশু ইতিহাসে পরিচিত তিনি কিছু মানুষের থেকে জ্ঞানে অথবা ধর্মে সবচেয়ে বড় ছিলেন। আমি মনে করি বুদ্ধ ও সক্রেটস এই ব্যাপারে তার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন।

 

আবেগের কারণ

আমি আগেই বলেছি, মানুষ কেন ধর্মকে গ্রহণ করে তার প্রকৃত কোন কারণ না থাকার ফলে যুক্তি-তর্কের দ্বারা কিছু করা যাবে বলে আমি মনে করি না। তারা কেবলমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে ধর্মকে গ্রহণ করে। কোন একজনকে প্রায়ই বলা হত যে ধর্মকে আক্রমণ করাটা একটা বিরাট ভুল, কেননা ধর্ম মানুষকে পুণ্যবান করে তোলে। এরকমই আমাকে বলা হয়, কেননা আমি ধর্মকে লক্ষ্যই করি না।

আপনারা অবশ্যই জানেন, উক্ত বিষয়ের উপর যুক্তিকে নিয়ে ব্যঙ্গকাব্যে রচিত স্যামুয়েল বাটলারের গ্রন্থ এরিউহন রিভিজিটেড-এর কথা। আপনারা মনে রাখবেন যে এরিউহনে (Erewhon) হিগ্‌স নামে একটি চরিত্র আছে যে একটি দূরবর্তী দেশে পৌঁছলো। সেখানে কিছুদিন কাটাবার পর সে সেই দেশ থেকে বেলুনে চড়ে পালালো। কুড়ি বছর পর সে সেই দেশে ফিরে এলো এবং একটি নতুন ধর্মকে দেখলো, যে ধর্মে সেই পূজিত হচ্ছে সূর্যপুত্রের নামে এবং এই প্রবাদবাক্য সেখানে প্রচলিত ছিল যে সে স্বর্গে আরোহণ করেছে।

সে দেখলো তার সেই আরোহণের দিনটিকে সেখানে উৎসব হিসাবে পালিত হতে। সে শুনলো দুজন অধ্যাপক হ্যাঁঙ্কি ও প্যাঙ্কি বলছে যে তারা মানুষ হিগসের উপর কখনও তাদের চোখ রাখতে পারে না এবং কোনদিন পারবেও না বলে তারা আশা করে। কিন্তু সূর্যপুত্রের ধর্মে তারাই ছিলেন উচ্চ পুরোহিত। এতে হিগস্ খুব রেগে গেল। সে তাদের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমি তোমাদের সমস্ত প্রবঞ্চনার কথা জানাতে যাচ্ছি এবং এরিউহনের সব মানুষদের আমি বলে দেব যে দেখ আমাকে, আমি সেই মানুষ হিগস এবং আমি বেলুনে চড়ে চলে গিয়েছিলাম। তখন তাকে বলা হল, তুমি এরকম কাজ অবশ্যই কোর না। এদেশের সব নৈতিক আদর্শগুলো এই পৌরাণিক গাথার উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। একবার যদি তারা জানে যে তুমি স্বর্গে আরোহণ করনি তবে তারা বদমাস হয়ে যাবে।’ সে তাদের সেই কথা শুনলো এবং শান্তভাবে চলে গেল।

এটাই হল ব্যাপার যে আমরা যদি খ্রীষ্টান ধর্মকে আঁকড়ে না ধরি তবে আমরা সবাই খারাপ হয়ে যাবো। আমার কাছে মনে হয়, যে মানুষেরা এই ধর্মটাকে আঁকড়ে ধরেছে তাদের বেশিরভাগই ভীষণ বদমাস। আপনারা একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা দেখতে পাবেন, যে কোন যুগে ধর্ম যত তীব্র হয়েছে এবং ধর্মশাস্ত্রের প্রতি বিশ্বাস মানুষের যত দৃঢ় হয়েছে, ততই সেখানে নিষ্ঠুরতা বেড়েছে এবং সামাজিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনের অবস্থা ততই খারাপ হয়ে উঠেছে। বিশ্বাসের সেই সব যুগগুলোতে, যখন মানুষ সত্যই খ্রীষ্টধর্মকে উক্ত ধর্মের সব কিছু সমেত বিশ্বাস করত, তখন সেই প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধ মতো দমনের জন্য স্থাপিত বিচারালয় যেমন ছিল, তেমন ছিল তার অত্যাচার। সেই সময় বহু হতভাগী মহিলাদের ডাইনি সন্দেহে আগুনে পুড়ে মরতে হয়েছিল। ধর্মের নামে মানুষের উপর সমস্ত রকমের অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা হয়েছিল।

জগতের দিকে তাকিয়ে দেখলে আপনারা দেখতে পাবেন, যখনই মানুষের অনুভবে যৎকিঞ্চিত অগ্রগতি ঘটেছে, অপরাধের আইনে যখনই কোন উন্নতি ঘটেছে, যখনই যুদ্ধ হ্রাস করার কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, বা যখনই বর্ণ বৈষম্যকে দূর করার কোন চেষ্টা করা হয়েছে, যখনই দাসত্বকে হ্রাস করবার চেষ্টা করা হয়েছে বা জগতে প্রতিটি নৈতিক অগ্রগতি যখনই ঘটেছে, তখনই জগতের সমস্ত সংগঠিত গীর্জা সর্বদা তার বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছে। আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ কথাই বলব যে খ্রীষ্টধর্ম, যা তার গীর্জাগুলোকে ভিত্তি করে সংগঠিত, তা সর্বদা ও এখনো পর্যন্ত জগতের নৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান শত্রু।

 

কেমনভাবে গীর্জাগুলো অগ্রগতিকে বাধা দিয়েছে

আপনারা হয়ত ভাবছেন যে এখনো গীর্জাগুলো অগ্রগতিকে বাধা দিয়ে যাচ্ছে বলে আমি খুব বাড়াবাড়ি করছি। কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছি বলে আমি মনে করি না। আচ্ছা, একটা ঘটনার কথা বলা যাক। যদি আমি ঘটনাটার কথা উল্লেখ করি তা হলে আপনারা আমার সঙ্গে অবশ্যই তা সহ্য করবেন, কেননা ঘটনাটা খুব আনন্দদায়ক নয়। গীর্জা কোন একজনকে সত্য বলতে বাধ্য করেছিল যেটা খুব একটা আনন্দদায়ক ছিল না। ধরুন আজকের যে জগতে আমরা বাস করছি। সেখানে একটি অভিজ্ঞ মেয়ে একজন সিফিলিটিক (যৌনরোগাক্রান্ত) মানুষকে বিবাহ করেছিল।

এই ঘটনায় ক্যাথলিক গীর্জা বলেছিল, এটা খ্রীষ্টধর্মের একটা অচ্ছেদ্য আদর্শ। তোমাদের অবশ্যই সারা জীবনের জন্য একসঙ্গে থাকতে হবে। সেই মহিলাকে একটি সিফিলিটিক শিশুকে জন্ম দেওয়ার থেকে বিরত হবার জন্য কোনরকম ব্যবস্থা নিতে দেওয়া হয়নি। এই ঘটনাটা ঘটেছিল গীর্জার ঐ কথার জেরেই। আমি মনে করি এই ঘটনাটা ছিল জঘন্য নিষ্ঠুরতা এবং যাদের প্রাকৃতিক সহানুভূতি শাস্ত্রের নিয়মের দ্বারা আবদ্ধ নয়, সমস্ত দুঃখ-কষ্টের প্রতি যাদের নৈতিক চরিত্র একেবারেই মরে যায়নি, তারা এই ধরনের ঘটনাকে সঠিক ও যথার্থ ভেবে চলতে দেওয়া উচিত বলে মনে করবে না।

এটা কেবলমাত্র একটি উদাহরণ। এখনো, বর্তমানে অনেক পথেই গীর্জাগুলো নৈতিক আদর্শের নামে সমস্ত রকমের মানুষকে নানারকম অনুচিত ও অপ্রয়োজনীয় কষ্টের দিকে ঠেলে দেয়। এ বিষয়ে আরও বলতে গেলে, আমাদের পূর্বের আলোচনাকে টেনে এনে আবার বলতে হয়, যে-কোন পথের অগ্রগতি এবং উন্নতির যা জগতের দুঃখ-কষ্টকে হ্রাস করতে পারে, তারই বিরুদ্ধাচরণ করে আসছে এই গীর্জাগুলো। কারণ এরা তাদের ইচ্ছামত কিছু নৈতিক আদর্শকে গড়ে নিয়েছে। এই আদর্শগুলোকে তারা তাদের সংকীর্ণ শাসনের দ্বারা পরিচালিত করে থাকে, যা কোনভাবেই মানুষকে সুখী করে তুলতে পারে না। যখন আপনারা বলে থাকেন এটা বা ওটা অবশ্যই করা উচিত, কেননা তা মানুষের সুখের জন্যই বলা হয়েছে, তখন তারা মনে করে যে সেগুলো করে কোন লাভই নেই। নীতিকথার সঙ্গে মানুষের সুখের সম্পর্কটা কী? নীতিকথার বিষয়গুলি মানুষকে কখনই সুখী করতে পারে না।

 

ধর্মের ভিত্তিকে ভয় করুন

আমি মনে করি প্রাথমিকভাবে ধর্ম প্রধানত ভয়ের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এটা আংশিকভাবে অজানার ভয় এবং আংশিকভাবে আপনার সেই অনুভব প্রবণতা যার দ্বারা আপনি এমন ভাবেন যে আপনার কিছু দরদী ভাই আছে যারা আপনার যে কোন বিপদে ও সমস্যায় আপনার পেছনে দাঁড়াবে। ভয়টাই হল আসল ভিত্তি- রহস্যের ভয়, পরাজয়ের ভয়, মৃত্যুর ভয়। ভয় হল নিষ্ঠুরতার জনক-জননী। এই জন্যেই এটা বললে খুব একটা আশ্চর্য শোনাবে না যে ধর্ম এবং নিষ্ঠুরতা পরস্পরের হাত ধরে চলে। এটার কারণ, ভয়ই হল নিষ্ঠুরতা ও ধর্ম এই দুই বস্তুর আসল ভিত্তি।

এই জগতের বস্তুকে বুঝতে আমরা এখন অল্প চেষ্টা করতে পারি, এবং সেই বিজ্ঞানের সাহায্যে উক্ত বস্তুর উপর অল্প-স্বল্প প্রভুত্বও করতে পারি, যে বিজ্ঞান খ্রীষ্টধর্ম, গীর্জা ও সব পুরোনো ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে প্রতি পদক্ষেপে লড়াই করে এগিয়ে এসেছে। বিজ্ঞান এই অতি নীচ ভীতি থেকে মনুষ্যজাতিকে উদ্ধার করে আমাদের সাহায্য করতে পারে যে ভীতির অধীনে সে যুগের পর যুগ ধরে বেঁচে এসেছে। বিজ্ঞান আমাদের শিক্ষা দিতে পারে এবং আমি মনে করি, আমাদের হৃদয়ও আমাদের এই শিক্ষা দিতে পারে, যাতে আমরা আর বেশি দিন কাল্পনিক সহযোগিতার আশায় বসে না থাকি, যাতে আর আমরা আকাশে কানাগলি খুঁজে না মরি, ববং আমরা আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা দিয়ে জগৎকে বাসযোগ্য করে তুলবো সেই জায়গার পরিবর্তে যে জায়গায় গীর্জাগুলো শত শত বছর ধরে জগৎকে পৌঁছে দিয়েছে।

 

আমাদের অবশ্যই কী করা উচিত

আমাদের অবশ্যই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে এবং জগৎকে ভোলা চোখে দেখতে হবে। ভোলা চোখে দেখতে হবে জগতের ভালো দিক, মন্দ দিক, জগতের সৌন্দর্য এবং কুৎসিত দিকসমূহ। জগৎকে জগতের মতোই দেখতে হবে এবং তার জন্য ভয় পেলে চলবে না। বুদ্ধিব দ্বারা জগৎকে জয় করতে হবে। জগৎ থেকে উঠে আসা ভয়গুলোর দৌরাত্মে দাসতুকে মেনে নিলে আর চলবে না। ঈশ্বর সম্পর্কে সমগ্র ধারণাটি জগৎজোড়া প্রাচীন স্বৈরাচারী কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মুক্ত মানুষের ক্ষেত্রে এই ধরনের কল্পনা নিছক বাতুলতা মাত্র। যখন আপনারা শোনেন, যে মানুষ গীর্জায় গিয়ে নিজেদের শোচনীয় পাপী বলে ছোট করে, বা এ ধরনের সব রকমের কাজ শুধু নিন্দনীয়ই নয়, তা মানুষের মতো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতির পক্ষে উপযুক্তও নয়। আমাদের উঠে দাঁড়ানো উচিত এবং সম্মুখ জগৎকে উন্মুক্তভাবে দেখা উচিত। জগতের ভালো সম্পর্কে আমরা যতটা করতে পারি ততটাই আমাদের করা উচিত। যদি যতটা ভালো চাইলাম ততটা ভালো না-ও হয়, তবুও যুগের পর যুগ ধরে ওরা যা করে এসেছে তার থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো হবে বলে আশা করা যায়।

একটি মঙ্গলময় জগৎ সৃষ্টি করতে চাই জ্ঞান, দয়া এবং সাহস। ঘৃণ্য অতীতের ধ্বজা আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকলে আর চলবে না, অথবা বহু যুগ আগের অজ্ঞ মানুষদের মুক্তবুদ্ধি প্রসূত কথার জালে আটকে থাকলেও চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন ভয়হীন দৃষ্টিভঙ্গি এবং মুক্তবুদ্ধি। এর জন্য দরকার ভবিষ্যৎ গঠনের আশা, যে অতীত মৃত তার দিকে মুখ করে বসে থাকলে আর চলবে না, যে অতীতকে আমরা বিশ্বাস করি তাকে অতিক্রম করে চলে যাবে ভবিষ্যৎ কেননা আমাদের বুদ্ধি সৃষ্টি করতে পারে।


কেন আমি ধর্মবিশ্বাসী নই

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top