মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ

০২. প্রাণের বৈশিষ্ট্য

মৃত্যুর ব্যাপারটা না হয় বােঝা গেল। এবার তাহলে আবারাে সেই পুরােন সমস্যায় ফিরে যাই। জীবনের বৈশিষ্ট্য তবে আমরা কাকে বলব? এটা তাে নতুন করে বলে দেওয়ার দরকার নেই যে, জীবিত দেহে সত্যই প্রাণ শক্তির এক ধরণের স্ফুরণ আছে, যার মাধ্যমে জীবদেহ অর্জন করে এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন (Autonomy); এটিই বােধ হয় জড়জগৎ থেকে জীবকে পৃথক করে দেয়। এই স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারটা মানুষ থেকে শুরু করে তিমি মাছ পর্যন্ত সকলের জন্যই প্রযােজ্য।

এমন কি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার মধ্যেও নিজের মত করে কাজ করার এক ধরণের প্রবণতা আছে, তা যতই সীমাবদ্ধ আকারে হােক না কেন। কিন্তু মুশকিল হল, ঠিক কোন মহেন্দ্রক্ষণে জীবের কাঁধে ওই ‘স্বায়ত্তশাসনের ভুত’ সওয়ার হয়ে প্রাণের স্পন্দন ঘটায় তা এখনও বিজ্ঞানীরা বের করতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক পল ডেভিস বলেন (Davies, 2003) :

This property of autonomy, or self-determination, seems to touch on the most enigmatic aspect that distinguishes living from nonliving things, but it is hard to know where it comes from. What physical properties of living organisms confer autonomy upon them? Nobody knows.

তবে সবাই যে এ ধরণের নেতিবাচক মতামতের সাথে একমত তা নয়। আসলে বহু বিজ্ঞানীই মনে করেন যে প্রাণের ‘মূহূর্ত’, ‘মহেন্দ্রক্ষণ’ এ সমস্ত ব্যাপার-স্যাপার খোঁজার চেষ্টা আসলে আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত (ধর্মীয়) বিশ্বাসের ফল। ধর্মগ্রন্থগুলােতে বর্ণিত আছে ঈশ্বর কিভাবে কোন এক শুভ ক্ষণে আমাদের পৃথিবী এবং পরবর্তীতে প্রাণ সৃষ্টি করেছিলেন। এই ধরনের বিশ্বাস আমাদের সংস্কৃতির সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, প্রাণের উৎস নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে গিয়েও অনেকে এ ধরণের বিশ্বাস থেকে বেরুতে পারেন না, ফলে চিন্তাধারা ঘুরপাক খেতে থাকে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল থেকে উঠে আসা এক বেঁধে দেওয়া ছকে।

মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্সটিটিউট ফর মলিকিউলার এন্ড সেলুলার ইভলুশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী সিডনী ফক্স (প্রয়াত) এ ধরনের আবদ্ধ চিন্তাকে অভিহিত করেছেন ‘Channeled thinking in science’ হিসেবে। তার মতে, প্রাণের উৎস নিয়ে গবেষনায় ব্রতী অনেককেই এমন সমস্ত প্রশ্ন করতে দেখা যায় যার সাথে আসলে বিজ্ঞান নয়, ধর্মীয় কাহিনীর সাযুজ্যই থাকে বেশী। পাশ্চাত্য বিশ্বে তাে বটেই, এমনকি বস্তুবাদের ধারক তৎকালীন সােভিয়েত রাশিয়াতেও এ ধরনের ভাবধারার কমতি ছিল না। তিনি বলেন (Fox, 1988) :

Much of the thinking on the subject of how life began has been channeled, for example by mythological concepts. Even scientists, including those living in an officially atheistic state, such as Oparin’s Soviet Union, appear to be influenced by thinking of the past.

প্রাণের উদ্ভব সম্বন্ধে সঠিক প্রশ্নটি করতে হলে ‘চ্যানেল্ড থিঙ্কিং’ থেকে বেরিয়ে এসে প্রাণের উদ্ভবের পেছনে রাসায়নিক বিবর্তন প্রক্রিয়াটি ভাল মত বােঝা দরকার। জানা দরকার জীবনের রসায়নের চরিত্রটি। এ নিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলােচনা করা হয়েছে। আর কি ভাবে ধাপে ধাপে চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে অজৈব পদার্থ থেকেই রাসায়নিক বিবর্তনের ক্রমধারায় এক সময় জীবনের উন্মেষ ঘটতে পারে তা আলােচিত হয়ছে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে। বিবর্তনের এই ধারাবাহিকতাটি স্পষ্ট হলেই বােঝা যাবে যে প্রাণের উন্মেষ, কিংবা ‘স্বায়ত্তশাসন’- যাই বলা হােক না কেন, এগুলাে কোনটিই আসলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কিন্তু সরাসরি সেখানে যাওয়ার আগে প্রাণের দাবীদার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলােতে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক :

প্রজনন (পুনরুৎপাদন): জীবিত সত্ত্বার প্রজনন অথবা পুনরুৎপাদন করার ক্ষমতা থাকবে- এটাই সাধারণতঃ ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু শুধু এ বৈশিষ্ট্য দিয়ে কি জীবকে সত্যই চেনা যায়? যায় না। কারণ অনেক জড় পদার্থেরই (যেমন Crystal, Bush fire) এক অর্থে পুনরুৎপাদন করার ক্ষমতা রয়েছে। অথচ, ভাইরাস (যাকে অনেকেই ‘সজীব’ হিসবে বিবেচনা করেন) কিন্তু পুনরুৎপাদন করে বিস্তৃত হতে পারে না। খচ্চর নামের প্রাণীটিকে কেউই জড় পদার্থ হিসেবে গন্য করবে না। নিঃসন্দেহে এটি সজীব, অথচ, খচ্চরের যে প্রজনন ক্ষমতা নেই তা কিন্তু আমরা জানি।

একটি সফল প্রজননের ক্ষেত্রে সন্তান পিতামাতার বৈশিষ্ট্যই শুধু পায় না, সেই সাথে অর্জন করে পুনরুৎপাদন করার উপকরণ এবং পুরাে প্রক্রিয়াটিও। পুনরুৎপাদনের প্রক্রিয়াতেই জীবের প্রতিরূপায়ন (Replication) ঘটে; আর বংশগতির বাহক জিন পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। শুধু তাই নয়, জিনগুলাের মধ্যেও প্রতিরূপায়ন ঘটে।

বিপাক ক্রিয়া: কেউ নিজেকে ‘সজীব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে তার কিন্তু অনবরত কাজ করে যেতে হয়। প্রতিটি জীবদেহই জটিল কিছু বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের রূপান্তর ঘটায় আর এর মাধ্যমে চলাফেরা, প্রজননসহ বিভিন্ন কাজ করার জন্য প্রয়ােজনীয় শক্তি ব্যয় করে থাকে। রাসায়নিক পদার্থের রূপান্তর বা প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে শক্তির এই ব্যয়কে বিপাক ক্রিয়া (Metabolism) নামে অভিহিত করা হয়।

কিন্তু স্রেফ ‘মেটাবলিজম’ মানেই জীবন নয়। কিছু অনুজীব আছে যারা দেহের অতি জরুরী কিছু কার্যপ্রণালীকে সাময়িক সময়ের জন্য একেবারে বন্ধ করে দিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাদের তাে আমরা ‘মৃত’ বলতে পারি না। কারণ প্রয়ােজন পড়লে তারা আবার বিপাক ক্রিয়া ফিরিয়ে এনে ‘জীবিত’ হয়ে উঠতে পারে।

পুষ্টির যােগান: এটা অনেকটা বিপাক ক্রিয়ার সাথেই সম্পর্কিত। না খেতে পারলে কোন জীবদেহই বেঁচে থাকতে পারে না। খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে জীবদেহ শক্তি সঞ্চয় করে যা পরে তার প্রয়ােজন অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে ব্যয় করে। মানুষের মত প্রাণীরা খাওয়ার জন্য সাহায্য নেয় হাত মুখ নখ, দাঁত, পাকস্থলীর, উদ্ভিদেরা নেয় সালােকসংশ্লেষণ নামের একটি প্রক্রিয়ার। এর ফলে পদার্থ এবং শক্তির এক নিয়ত প্রবাহ ঘটে। কিন্তু স্রেফ পদার্থ এবং শক্তির প্রবাহ দিয়েই জীবনকে কোন ভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

বৃহস্পতি গ্রহের বুকে যে লাল দাগগুলাে দেখা যায় তা কিন্তু পদার্থ এবং শক্তির নিয়ত প্রবাহের মাধ্যমে ঘটা এক ধরণের প্রবাহ-ঘূর্ণি (Fluid-vortex) ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু কেউ বলবে না যে ওগুলাে জীবিত। উপরন্তু, জীবনের জন্য শক্তি প্রয়ােজন – এ ব্যাপারটাও বােধ হয় ঢালাওভাবে সত্যি নয়; যেটি প্রয়ােজন তা হল ‘ব্যবহার উপযােগী’ বা ‘মুক্ত শক্তি’। এ নিয়ে পরে আরাে আলােচনা করা হবে।

জটিলতা: জীবন জিনিসটা যে ভয়ানক রকমের জটিল এ নিয়ে কোনই সন্দেহ নেই। এমনকি সামান্য যে ব্যাকটেরিয়া – এর মত এক কোষী জীবের গঠন আর কর্মকান্ডেও জটিলতার কোন কমতি নেই। বস্তুতঃ এই জটিলতাই জীবদেহকে করে তুলেছে জড় জগৎ থেকে আলাদা আর জীবন প্রবাহকে করে তুলেছে ‘অনিশ্চিত’। কিন্তু তারপরেও স্রেফ জটিলতা দিয়ে কি জীবনকে ব্যাখ্যা করা যাবে?

কক্সবাজারের উপকূলে ধেয়ে আসা হারিকেনের প্রকৃতিও তাে জটিল, তার চেয়েও জটিল আমাদের গ্যালাক্সি ‘আকাশ গঙ্গা’। এগুলাে কোনটিই জীবিত নয়। পদার্থবিদেরা প্রায়শঃই কোয়ান্টাম জগতের জটিলতাকে বিশৃঙ্খল (Chaotic) হিসেবে চিহ্নিত করেন; কোয়ান্টম ফ্লাকচুয়েশন, আনবিক পরিবৃত্তি কিংবা নিউক্লিয়াসের তেজস্ক্রিয় অবক্ষয়ের মত ঘটনাগুলাে এতই ‘জটিল’ যে এগুলােকে কোন নিয়ম বা কার্য-কারণের মধ্যে ফেলে আগাম কোন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। তারপরেও তাে সেগুলাে জীবিত নয়।

সংগঠন: হয়ত আলাদাভাবে জটিলতার কোন অর্থ নেই, যতক্ষণ না এটি ‘সাংগঠনিক জটিলতায়’ রূপ নেয়। জীবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-উপাঙ্গগুলাে একসাথে সমন্বিত ভাবে কাজ না করতে পারলে জীবনের কোন অর্থ হয় না। আমাদের শরীরের ভিতরে থাকা রক্তবাহী শিরা আর ধমনীগুলাে যতই প্যাঁচানাে আর জটিল হােক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলাে হৃৎপিন্ডের সাথে সংযুক্ত হয়ে রক্তসঞ্চালণে অংশ নেয়, আলাদা কোন ভূমিকা দাবী করতে তাে পারে না। আমাদের দু’পায়ের আলাদাভাবে চলাফেরা করার ক্ষমতারও কোন গুরুত্ব থাকবে না যদি না সেগুলাে একে অপরের সাথে সমন্বিত হয়ে হাঁটা চলায় সুবিধা দিতে পারে।

সমন্বিত করার পুরাে ব্যাপারগুলাে নিয়ন্ত্রণে আমাদের ‘জটিল’ মস্তিস্কের ভূমিকা তাে আছেই। এমনকি সাধারণ একেকটি কোষেও এই ধরণের সমন্বয় ও সহায়তার যে নমুনা পাওয়া যায় তা রীতিমত বিস্ময়কর। কিন্তু তারপরও এই সমন্বয়ই কিন্তু জীবন নয়। কারণ সমন্বয়ের ব্যাপারগুলাে জড়জগতেও বিরল নয়। বহু ক্ষুদ্র অণুই ছড়িয়ে ছিটিয়ে না থেকে নিজস্ব ধর্মানুযায়ী সংগঠিত হয়, এমনকি তৈরী করে জটিল নক্সার কাঠামাে পর্যন্ত। প্রকৃতিতে এ ধরণের স্ব-সংগঠন (Self  Organization)-এর বহু উদাহরণ ছড়িয়ে আছে।

বৃদ্ধি ও বিস্তার: প্রতিটি জীবেরই বৃদ্ধি ঘটে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বিস্তৃত হয়। কিন্তু তেমন বৃদ্ধি এবং বিস্তার তাে জড় পদার্থের মধ্যেও দেখ যায়। লােহার টুকরা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ফেলে রাখলে তাতে মরিচা ধরে আর সময়ের সাথে সাথে সেই মরিচার বৃদ্ধি বিস্তার সবই ঘটে। লবনের দানায় কেলাস তৈরী কিংবা সন্ধ্যার আকাশে মেঘের বিস্তার – এগুলাে তাে আমাদের চোখের সামনেই দেখা। তবে তারপরেও বলতেই হবে যে, জীবজগতে বৃদ্ধি  ও বিস্তারের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। এ পৃথিবীতে প্রাণের যে নান্দনিক বিকাশ ও বিস্তার তা ঘটেছে বিবর্তনের ক্রমধারায়।

অবশ্যই জীবজগতের ভিতর প্রকারণ (Variation) থাকাটা এর পিছনে মূল চাবিকাঠি। এই প্রকারণ বজায় রেখে প্রতিরূপায়ন (Replication) ঘটিয়ে জীবজগতে ডারউইনীয় পদ্ধতিতে বিবর্তন ঘটে চলেছে অনবরত। জীবের বৃদ্ধি আর বিকাশকে এই প্রেক্ষাপটে ফেলেই আমাদের বিচার করতে হবে। শুধু বৃদ্ধি কিংবা বিস্তার কেন জীবনের সংজ্ঞাই হয়ত এই কাঠামাের মধ্যে ফেলে ঢেলে সাজানাে সম্ভব। ‘যদি ডারউইনের দেখানাে পথে কোন কিছুর বিবর্তন ঘটে, তাকে আমরা সেটিকে জীবিত হিসেবে গণ্য করতে পারি’।

তথ্যের সমাহার : সাম্প্রতিক কালে অনেক বিজ্ঞানী কম্পিউটারের সাথে জীবনের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়ার কথা বলছেন। তাঁরা বলেন, জীবের প্রতিরূপায়ন ঘটানাের জন্য প্রয়ােজনীয় তথ্য জিনের মাধ্যমে বাবা মা থেকে সন্তান সন্ততিতে স্থানান্তরিত হয়। সে হিসেবে জীবনকে তথ্যের সমাহার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তারপরও, শুধু তথ্য থাকাটাই সব নয়। জঙ্গলে গাছ থেকে অনবরত পাতা ঝরে পড়ার মধ্যেও তাে অনেক তথ্য লুকানো আছে। তথ্য আছে বাতাসে ভেসে বেড়ানাে ধূলিকনার মধ্যেও। কিন্তু আমাদের কাছে সে সমস্ত তথ্যের কোন মানে নেই।

জীবনের গতিশীলতা সঠিক ভাবে সংগায়িত হতে হলে তথ্যকে হতে হবে ‘অর্থবহ’। আর অর্থবহ হতে হলে আলােচিত সিস্টেমের সাপেক্ষে এর একটি প্রাসঙ্গিকতা (Context) থাকতে হবে। অর্থাৎ, মােদ্দাকথা হল, তথ্যকে একটি পরিকাঠামাের মধ্যে বিশেষিত (Specified) হতে হবে। কিন্তু সেই কাঠামােগত প্রাসঙ্গিকতার ব্যাপারটি আসবে কোত্থেকে? আর কিভাবেই বা সেই অর্থবহ ভাবে বিশেষিত হওয়ার ব্যাপারটা প্রাকৃতিকভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভুত হবে?

হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার : জীবনের ভিত্তিমূল হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে মূলতঃ দুটি উপাদানকে : নিউক্লিয়িক এসিড (আরএনএ/ডিএনএ) এবং প্রােটিন। এ দুটি উপাদানই রাসায়নিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে অপরের পরিপূরক। শুধু তাই নয় জীবন গঠনে এদের ভূমিকাও খুবই ব্যাপক। নিউক্লিয়িক এসিডগুলাে যেন আক্ষরিক অর্থেই কাজ করে জীবনের ‘সফটওয়্যার’ হিসেবে।

আর অন্যদিকে প্রােটিনগুলাে যেন কর্মীবাহিনী যারা গড়ে তুলে শক্ত-পােক্ত হার্ডওয়ারের কাঠামাে। এ দুই রাসায়নিক জগতের মধ্যে সংযােগ স্থাপিত হয় এক ধরণের কোডের মাধ্যমে, যাদের আমরা ‘জেনেটিক কোড’ হিসেবে আভিহিত করি। বিজ্ঞানীরা বলেন, এদুই-ই আসলে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠা খুব ‘অগ্রসর পণ্য’; হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জটিল জীবনের নিয়ামক।

স্থায়িত্ব এবং পরিবর্তনশীলতা: জীবনের গােলকধাঁধার আরেক রহস্য হচ্ছে এটি ‘স্থায়িত্ব’ ও ‘পরিবর্তনশীলতা’র এর অভূতপূর্ব সমন্বয়। এ যেন এক পুরােন দার্শনিক সমস্যা-‘থাকা’ বনাম ‘হওয়া’ (Being versus becomming)-এর মিলন ক্ষেত্র। আমরা জানি জিনের কাজ হচ্ছে  প্রতিরূপায়ন ঘটানাে, জেনেটিক তথ্যকে সংরক্ষণ করা। কিন্তু প্রকারণ ছাড়া তাে জীবের অভিযােজন ঘটতে পারে না, আর অভিযােজিত না হলে জিনও টিকে থাকতে পারে না।

কোন কিছু টিকে থাকতে না পারলে ডারউইনীয় পদ্ধতিতেই ঘটে এর বিনাশ। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে কিভাবে তাহলে ‘সংরক্ষণ এবং পরিবর্তনশীলতা’র মত দুটি ‘পরস্পর বিরােধী’ জিনিস একই ব্যবস্থার মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে? নিঃসন্দেহে ব্যাপারটি বিস্ময়কর। এ ধরনের নানা বিস্ময়কর ব্যাপার-স্যাপার নিয়েই কিন্তু গড়ে উঠেছে ‘রহস্যময়’ প্রাণ।

জীবন নিয়ে এত জ্ঞান-গম্ভীর আলােচনার পরও জীবনের সংজ্ঞা আমাদের কাছে স্পষ্ট হল কি? দেখাই যাচ্ছে জড় থেকে জীবকে পৃথক করার পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্যগুলাে অনেক ক্ষেত্রেই খুব পরিস্কার নয়। কাজেই প্রাণের এই দুর্গম রহস্য ভেদ করা চাট্টিখানি কথা নয়! সমস্যাটি আরাে ভালভাবে বােঝা যাবে যতই আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হব আর পরবর্তী অধ্যায়গুলােতে ভাইরাস, ভিরইডস এবং প্রিয়ন সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে জানতে পারব। সত্যি বলতে কি, জড় থেকে জীবকে একটি শক্ত সীমারেখা দিয়ে পৃথক করার চেষ্টাই হচ্ছে। প্রকারন্তরে মেনে নেওয়া যে ‘প্রাণ’ জিনিসটা প্রাকৃতিক কিছু নয় বরং যাদুকরী, অপার্থিব কিংবা অলৌকিক কিছু।

কাজেই এ ধরনের পৃথকীকরণ প্রচেষ্টাও হয়ত এক ধরনের দীর্ঘদিনের ‘চ্যানেল্ড থিংকিং’ ছাড়া কিছু নয়। প্রাণ জিনিসটা কিন্তু এমন নয় যে, ওপর থেকে কিছু খােসা ছাড়িয়ে নিলেই ভিতর থেকে ‘সজীব’ কোন অণু বেড়িয়ে পড়বে – যেটি জীবনের ভিত্তিমূল। ওভাবে মাটি খুঁড়ে ‘জীবন’ পাওয়া যাবে না; কারণ এ ধরনের কোন ‘সজীব অণু’র কোন অস্তিত্বই আসলে নেই। বরং প্রাণ নামক সজীব অভিব্যক্তিটি গড়ে উঠেছে অসংখ্য নিষ্প্রাণ অণুদের বিভিন্ন সমন্বিত প্রক্রিয়া থেকেই। কিন্তু কিভাবে?


 মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

শেয়ার করুন —
5 1 vote
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা/সমালোচনা