ভোলগা থেকে গঙ্গা

অনুবাদ

১২. প্রভা (পর্বঃ ০২)

 কালঃ ৫০ খৃষ্টপূর্ব

 

পাঁচ

রঙ্গমঞ্চে অশ্বঘোষের অভিনয় এবং যবন কন্যার সঙ্গে তার প্রেমের ব্যাপার অশ্বঘোষের পিতা-মাতার কাছে অজানা থাকবার কথা নয়। কথাটা শুনে অশ্বঘোষের পিতা রীতিমতো চিন্তিত হলেন এবং সুবর্ণক্ষীকেও বুঝিয়ে বললেন। মাতা যখন পুত্রকে বললেন যে, আমাদের ব্রাহ্মণকুলের পক্ষে এমন সম্বন্ধ করা অধর্ম, তখন ব্রাহ্মণ্যধর্মের সমগ্র শাস্ত্রে সুপণ্ডিত অশ্বঘোষ মাতাকে পুরাণ থেকের ঋষিদের আচরণের শত শত প্রমাণ দিল (যার থেকে কিছু অংশ পরে সে নিজের ‘বজ্রচ্ছেদিকা’র লিপিবদ্ধ করেছে—যা বজ্রদিকোপনিষদ্‌নামে উপনিষদগুলির মধ্যে অঙ্গীভূত হয়ে রয়েছে)।

সব শুনে মা বললেন, “এ সব ঠিকই বাবা, কিন্তু আজকের ব্রাহ্মণেরা এই পুরাণোক্ত আচরণকে মানতে চায় না।”

“তা’হলে ব্রাহ্মীপদের জন্য আমি এক নতুন সদাচার উপস্থিত করব।”

মা অশ্বঘোষের যুক্তিসমূহতের সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না, কিন্তু যখন সে বলে বসল যে, প্রভার আর আমার জীবন কখনও স্বতন্ত্র হয়ে থাকতে পারে না, তখন তিনি পুত্রের পক্ষে মত দিয়ে বললেন, “তুইই আমার যথাসর্বঙ্গ বাবা।”

অশ্বঘোষ একদিন প্রভাকে মা’র কাছে পাঠিয়ে দিল। মার তার রূপ আর গুণের পরিচয় পেয়ে এবং তার বিনম্র স্বভাবে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে আশীর্বাদ করলেন। কিন্তু অশ্বঘোষের পিতা একে স্বীকার করে নিতে পারছিলেন না।

তিনি একদিন অশ্বঘোষকে ডেকে বললেন, ‘পুত্র, আমাদের শ্রোত্রিয়দের শ্রেষ্ঠ হল ব্রাহ্মণকুল। পঞ্চাশ পুরুষ থেকে শুধু কুলীন ব্রাহ্মণ কন্যারাই আমাদের ঘরে বধূ রূপে আসছে। আজ যদি তুমি প্রভাকে বিবাহ কর তো আমরা এবং পরবর্তী বংশধরেরা চিরকালের জন্য সমাজে জাতিভ্রষ্ট হয়ে থাকব।”

অশ্বঘোষের পক্ষে প্রভাকে ত্যাগ করা একেবারেই অচিস্ত্যনীয় ব্যাপার বুঝে অশ্বঘোষের পিতা প্রভার পিতামাতার কাছে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করলেন, কিন্তু তাঁদের কিছুই করবার ছিল না। পরিশেষে তিনি প্রভার কাছেই তাঁদ নিবেদন পেশ করলেন। প্রভা বলল,“আমি অশ্বঘোষের কাছে আপনার কথা বলব।”

 

ছয়

প্রভা আর অশ্বঘোষ পরস্পরের অভিন্ন সাথী। কি সরযূতীর, কি পুষ্পোদ্যান, কি নৃত্যশালা-নাট্যশালা, কিম্বা অপর কোনো জায়গায় একজন থাকলে আর একজনও থাকবেই। সূর্যের প্রভার মতোই প্রভা অশ্বঘোষের হৃদয়-পদ্মকে বিকাশিত কররে রেখেছে। রূপালী চাঁদের আলোয় প্রায়ই তারা সরষূতীরে যেত। সেকানে তারা জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করত।

এমনি এক জ্যোৎস্নালোকে একদিন সরষুর কালো জলের ধারে শ্বেত শিলাসনে বসে অশ্বঘোষ আপন আনসপটে প্রভার চিত্র অঙ্কন করছিল। তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “প্রভা তুমিই আমার কবিতা, তোমারই প্রেরণা পেয়ে আমি ‘উর্বশী-বিয়োগ’ লিখেছি। তোমার রূপরাশি আমাকে বহু সুন্দর কাব্য রচানায় উদ্বদ্বু করবে। কবিতা হল অন্তরের অভিব্যক্তি, বাইরের জিনিস নয়; কিন্তু বাইরের অভিব্যক্তিই যে অন্তরে বিকাশিত হয় এ তত্ত্ব তুমিই আমাকে শিখিয়েছ।”

অশ্বঘোষের কথা শুনতে শুনতে প্রভা সেই শীতল শিলাসনের ওপর শুয়ে পড়ল। অশ্বঘোষ সযন্তে তার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। ওপর দিকে তাকিয়ে আয়ত দৃষ্টি মেলে প্রভা অশ্বঘোষের শ্রীমণ্ডিত মুখখানা দেখতে লাগল। অশ্বঘোষের কথা শেষ হলে প্রভা বলল,“তোমার সব কথাই আমি মেনে নিতে রাজি। সাকার-সৌন্দর্য থেকে প্রেরণা না পেলে কাব্য কখনও পূর্ণ রূপে বিকাশিত হতে পারে না।

আমি তোমার কাব্যের মূর্তিময় প্রকাশ, আবার আমিই বিকাশিত করছি তোমার অন্তরের কাব্যরূপকে। কিন্তু কবিতা তো শুধু আমার সৌন্দর্যের কথা নয়। সে দিন আমি বলেছিলাম, তোমার ভিতরে দু’জন অশ্বঘোষকেই উপলিদ্ধ করতে হবে। আবার দুয়ের মধ্যে মহান যুগকবি অশ্বঘোষকেই মূখ্য হয়ে উঠতে হবে। কারণ, সে শুধু একটি ব্যক্তির নয়, সমগ্র বিশ্বজনের সে প্রতিনিধি। কালকারামের সেই বিদ্বান ভিক্ষুর কথা মনে আছে? পরশু যাঁকে’ আমরা দু’জনে দেখতে গিয়েছিলাম?”

“অদ্ভুত মেধাবী মনে হয় তাঁকে।”

“ঠিকই, আর বহু দেশও ঘুরেছেন। তাঁর জম্ম মিশরের সেকেন্দ্রিয়া নগরে।”

“তা আমি শুনেছি; কিন্তু একটা কথা আমি বুঝতে পারি না প্রভা, যবনরা কেন বৌদ্ধধর্মকে মেনে চলে!

“কারণ, ব্যেদ্ধধর্ম যবনদের স্বতন্ত্র প্রকৃতি এবং স্বাধীন মনোবৃত্তির অনুকূল।”

“কিন্তু বৌদ্ধধর্ম তো সকলকেই বৈরাগী, তপস্বী এবং ভিক্ষুতে পরিণত করে!”

“বৌদ্ধদের মধ্যে গৃহী অপেক্ষা ভিক্ষুর সংখ্যা অনেক কম এবং বৌদ্ধ গৃহী গার্হস্থ্য জীবরনর রসগ্রহণে কারও অপেক্ষাই পশ্চাৎপদ নয়।”

“এই দেশে আরও কত ধর্ম প্রচলিত রয়েছে, বৌদ্ধধর্মের প্রতিই যবনদের এত পক্ষপাতিত্ব কেন? এ কথাও ঠিক বুঝতে পারি না।”

“এখানে বৌদ্ধর্মই সবচেয়ে উদার। আমাদের পূর্বজগণ যখন ভারতে এল, তখন সকলেই ম্লেচ্ছ বলে তাদের ঘৃণা করত। আমি কিন্তু আক্রমণকারী যবনদের কথা বলছি না, এখানে যারা বসতি স্থাপনকল্পে এসেছিল বা ব্যব্সার সূত্রে যাতায়াত করত, তাদের সম্বদ্ধেও এই মনোভাব ছিল। কিন্তু বৌদ্ধরা তাদের মোটেই ঘৃণা করত না। যবনেরা বস্তুত নিজ দেশেও বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পৌত্র অশোকের সময় বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু যবনদের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের ধর্মরক্ষিত এ দেশে এসে ভিক্ষু হননি, মিশরের বিহারেই তিনি ভিক্ষু হয়েছিলেন।”

“আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই প্রভা।”

“নিশ্চয়ই দেখা করবে। তিনি তোমাকে আরও গভীর দার্শনিক তত্ত্ব বলতে পারবেন শুধু বৌদ্ধধর্মের সম্বন্ধেই নয়, যবন-দর্শন সম্বন্ধেও।”

“যবনদের ভিতরও দার্শনিক রয়েছেন?”

“অনেক মহান দার্শনিক আছেন, যাঁদের বিষয়ে ভদন্ত ধর্মরক্ষিত তোমাকে বলতে পারবেন। কিন্তু বৌদ্ধ-দর্শনের কথা শুনে প্রভার প্রতি যেন তোমার বৈরাগ্য না আসে প্রিয়তম।” –এই বলে প্রভা আপনর বাহুপাশে অশ্বঘোষকে বেধেঁ ফেলল।

“কালকারামের কিচু কিছু কথা আমার কাছেও খুব আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। ভাবছিলাম , যদি আমাদের সমগ্র দেশ কালকারামের মতো হত?”

প্রভা বলল, “না প্রিয়তম, আমাকে ছেড়ে তুমি কালকারামে চলে যেও না।”

“প্রাণ থাকতে তোমাকে ছেড়ে যবন ধর্মরক্ষিত, পারশী সুমনের দেশ-দেশান্তরের বিদ্বান ভিক্ষু বাস করেন আর আমাদের দেশের ব্রাক্ষণ থেকে চন্ডাল পর্যন্ত সমস্ত কুলের ভিক্ষুরাও বাস করেন। সবাই এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া । করেন, এক সঙ্গেই জ্ঞানার্জনে সমাবিষ্ট হন। কালকারামের সেই কৃষ্ণবর্ণ বৃদ্ধ ভিক্ষুর নাম কি প্রভা?”

“মহাস্থবির ধর্মসেন। সাকেতের সমস্ত বিহারবাসী ভিক্ষুদের প্রধান।”

“শুনেছি, চন্ডাল কুলে তাঁর জম্ম। অথচ আমার আপন কাকা ভিক্ষু শুভগুপ্ত তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁকে প্রণাম করেন। ভেবে দেখ, কোথায় এক শ্রোত্রিয় ব্রাক্ষণ কুলজাত বিদ্ধা্ন শুভগুপ্ত , আর কোথায় চন্ডালপুত্র ধর্মসেন?”

“কিন্তু মহাস্থবির ধর্মসেনও প্রগাঢ় পান্ডিত্যের অধিকারী।”

“আমি প্রাক্ষণ্যধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি, প্রভা?……….”

“বৃদ্ধ তাঁর ভিক্ষু-সঙ্গকে সমুদ্র আখ্যা দিয়েছেন , যিনিই এই সঙ্গে যোগ দেন তিনিই তাঁর নাম-রুপ ছেড়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যান।”

“বৌদ্ধ গৃহীরাও কেন এমনি করে না?”

“বৌদ্ধ গৃহীরা দেশের অন্যান্য গৃহী লোকদের থেকে স্বতস্ত্র হয়ে থাকতে পারে না। তা’ছাড়া তাদের ঘাড়ে পারিবারিক বোঝাও থাকে।”

“আমার তো মনে হয় কালকারামের ভিক্ষুদের মতো নগর এবং গ্রামের সমস্থ লোক ‍যদি জাতিভেদ শূন্য, বর্ণভেদ শূন্য হয় হবে খুবই ভালো।”

“একটা কথা তোমাকে আমি বলিনি প্রিয়তম। তোমার পিতা একদিন আমার সামনে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, আপনার কথা আমি অশ্বঘোষের তুমি মুক্তি দাও।”

“যেন তুমি মুক্তি দিলেই তিনি তাঁর পুত্রকে ফিরে পাবেন! তুমি কি বললে?”

“আমি বলেছিলাম, আপনার কথা আমি অশ্বঘোষের কাছে বলব।”

“আর তাই আজ বললে তুমি। ব্রাক্ষণদের পাষশুতাকে আমি অসীম ঘৃণা করি- ঘৃণায় আমার সর্বাঙ্গ জলতে থাকে । তাঁরা বলে বেড়ায়, আমরা বেদ-শাস্ত্রকে অনুসরণ করি, কিন্তু বহু পরিশ্রম এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে সমগ্র ব্রাক্ষণ্য-বিদ্যা অধ্যয়ন করেও কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না, কি তারা অনুসরণ করে।পুরাণের্ কোনো ঋষিবাক্য উদ্বৃত করলে বলবে-আজকাল এ সবের প্রচলন নেই। হয় ‍যুক্তির পথে চল, নয় তো ঋষিবাক্য অনুসরণ কর! পুরাতন বেদনীতি যদি কউ ভঙ্গ করে ,তবেই না নতুন রীতি প্রবর্তিত হয়। ভশু, কাপুরুষ , স্বার্থপররা পুষ্ট বাছুরের মাংস আর মোটা দক্ষিণা পেলেই খুশী। আশ্রয়দাতা রাজা এবং সামন্তগণ যাতে প্রসন্ন হয় সেই কাজেই এরা সদা প্রস্তুত।”

“দরিদ্র হলে কাউকেও নিজেদের ধর্মে স্থান দেয় না এরা…”

“হ্যাঁ, অন্যান্য দেশ থেকে আগত যবন, শক, আভীর ইত্যাদি জাতিসমূহকে এরা ক্ষত্রিয় বলে রাজপুত্র বলে স্বীকার করে নিয়েছে, করাণ, তাদের হাতে ক্ষমতা এবং অর্থ ছিল। তাদের কাছে থেকে এরা মোটা-মোটা দক্ষিণা পেত। কিন্তু স্বদেশের শুদ্র, চণ্ডালদের চিরতরে দাস করেই রেখেছে এরা। যে ধর্ম মানুষের হৃদয়কে উদার করে তুলতে পারে না, যে ধর্মের বিকাশ শুধু টাকার থলি বা শাসন-ক্ষমতার অপেক্ষায় পড়ে থাকে, আমি তাকে মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কলঙ্কজনক মনে করি।

জগৎ পরিবর্তনশীল, ব্রাহ্মণদের প্রাচীন ধর্মগ্রস্থ থেকে আজকের গ্রন্থাবলী পর্যন্ত সমস্ত পড়ে তাদের আচার ব্যবহারেও পরিষ্কার পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি! কিন্তু এদের সঙ্গে কথা বল, দেখবে এরা সমস্ত কিছুকেই শাশ্বত সনাতন প্রতিপন্ন করতে চাইছে। একে এক ধরনের জড়তাই আখ্যা দেওয়া যায় প্রভা।”

“তোমার এই সমস্ত বিষোদগারের কারণ আমি নই তো!”

“কারণ হওয়া তো প্রশংসারই কথা প্রভা! তুমি আমার কবিতায় নতুন প্রাণ, নতুন প্রেরণার সঞ্চার করেছ। আমার অন্তদৃষ্টিতেও নতুন প্রাণ, নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করে তুমি আমার উপকার করেছ। এতদিন ভাবতাম যে, জ্ঞানের সর্বোচ্ছ শিখরে আমি আরোহণ করেছি, এই মিথ্যা দম্ভের সহজ স্বীকৃতি হল ব্রাহ্মণকুল। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি, জ্ঞানসমুদ্রের পরিধি ব্রাহ্মণদের শ্রুতি আর তাদের তাল এবং ভূর্জপত্রের পুথিতেই সীমাবদ্ধ নয়, সে এ সবের চেয়ে অনেক বিশাল।”

“আমি সামান্য এক নারী মাত্র।”

“সামান্য নারী বলেই যদি কেউ তাকে নীচ বলে, তবে সে আমার ঘৃণার পাত্র।”

“যবনকুলে নারীদের সম্মান অন্যদের চেয়ে বেশী। যদি কেউ নিঃসন্তান থেকে মরেও যায় তবু এক স্ত্রী বর্তমানে সে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে না।”

“আর এই ব্রাহ্মণেরা শত শত বিবাহ করে বেড়ায় শুধু দক্ষিণা লাভের আশায়, ছিঃ! কোনো যবন যে ব্রাহ্মণ্যধর্মকে মানে না এতে আমি খুব খুশী।”

“বৌদ্ধ হলেও পূজাপাঠের জন্য আমাদের মধ্যে ব্রাহ্মণেরা আসে।”

“স্বার্থরক্ষার জন্য যবনদের যখন ক্ষত্রিয় বলে অভিহিত করেছে,তখন দক্ষিণার আশায় এটুকুই বা করবে না কেন!”

“আমি কি তোমার ব্রাহ্মণত্বের অহঙ্কার ভেঙ্গে দেবার কারণ হয়ে দাঁড়ালাম?”

“তাতে মন্দ কিছু হয়নি। ব্রাহ্মণত্বের দম্ভ যদি তোমার আমার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায় তো সে দম্ভ আমার কাছে ঘৃণার বস্তু।”

“তুমি আমাকে এত ভালোবাসো জেনে বড় সুখী হলাম।”

“তোমার প্রেমে বঞ্চিত থাকলে অশ্বঘোষ এক নিষ্প্রাণ জড়পিণ্ডে পরিণত হবে।”

“তা’হলে আমার প্রেমের পুরষ্কার, বরদান করতে পার তুমি?”

“ঐ প্রেমটুকু বাদে আর সব কিছু ছেড়ে দিতে পারি।”

“আমার প্রেম যদি অমর অশ্বঘোষ, মহান যুগকবি অশ্বঘোষকে এতটুকুও নীচে নামিয়ে এনে থাকে, তবে ধিক্‌আমার সে প্রেম।”

“পরিষ্কার করে বল প্রিয়!”

“প্রেমের পথে আমি বাধা সৃষ্টি করতে চাই না, কিন্তু আমি তাকে তোমার অমর প্রতিভার সহায়ক রূপে দেখতে চাই। তাই বলছিলাম আমি যদি না থাকি….”

তড়িতাহিত মতো উঠে অশ্বঘোষ প্রভাকে দৃঢ়ভাবে বুকে চেপে ধরল, তার কণ্ঠলয় হয়ে প্রভা দেখল যে, সে কাঁদছে। কিছুটা শান্ত হলে প্রভা বলল,“শোন আমার প্রেম তোমার কাছে বড় জিনিসের প্রত্যাশা রাখে, সেটা তোমাকে দিতে হবে।”

“তোমাকে অদেয় আমা কিছুই নেই প্রিয়ে।”

“কিন্তু তুমি আমার কথা শেষ করতে দাওনি….”

“তুমি যে বস্ত্রবাক্য উচ্চারণ করতে যাচ্ছিলে!”

“কিন্তু এই বজ্রবাক্য শাশ্বত অশ্বঘোষের হিতকল্পে উচ্চারণ তো করতেই হবে। আমার প্রেম চায়, মহান কবি অশ্বঘোষের আপন অমর কবি-প্রতিভার মতো প্রভার প্রেমকেও যেন অমর বলে মনে করে, তাকে যেন শুধু প্রভার রক্ত-মাংসের দেহ দিয়ে বিচার না করে। অমর অশ্বঘোষের প্রভা শাশ্বত তরুণী, শাশ্বত সুন্দরী। শুধু এইটুকুই আমি তোমাকে দিয়ে উপলদ্ধি করাতে চাই।”

“তা’হলে মূর্তিময়ী প্রভার বদলে কল্পলোকের প্রভা আমার সামনে থাকবে?”

“আমি উভয়কেই মূর্তিময়ী মনে করি, পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, দু’জনের মধ্যে একজন এক শ’ অথবা পঞ্চাচ বছর বেঁচে থাকবে আর অন্যজন থাকবে চিরজীবী হয়ে। তোমার প্রভা তোমার ‘উর্বশী-বিয়োগ’-এ অমর হয়ে থাকবে কিন্তু আমার প্রেমকে অমর করে রাখতে হলে তোমাকে অমর অশ্বঘোষের দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। রাত অনেক হয়ে গেছে, সরষূর-জল যেন ঘুমিয়ে পড়েছে, আমাদেরও ঘরে ফেরা উচিত।”

“অমর প্রভার একটি চিত্র আমি আমার মানসপটে অঙ্কিত করে নিলাম।”

“শুধু এইটুকুই আমি চাই প্রিয়তম”—এই বলে রেশমের মতো কোমল কেশপাশ অশ্বঘোষের কপোলতলে বুলিয়ে দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল প্রভা।

 

সাত

প্রশন্ত এক অঙ্গনের চারিদিকে বারান্দা এবং পিছনে চারতলা এক অট্টালিকা। বারান্দায় ভিজে কাপড় শুকোচ্ছে। অঙ্গনের এক কোণে একটি কুয়া এবং স্নানের ঘর। অঙ্গনের অন্যান্য স্থানে বহু রকমের গাছপালা, তার মধ্যে একটি অশ্বথ গাছ। গাছের মূলে বাঁধানো বেদী আর একটু দুর পাথরের দেওয়াল। দেওয়ালের ওপর সহস্র দীপ রাখবার স্থান। হাঁটু গেড়ে বসে এই সুন্দর বৃক্ষ বন্দনা করে প্রভা বলল, “প্রিয়, এ হচ্ছে সেই জাতে বৃক্ষ যার নীচে বসে সিদ্ধার্থ গৌতম আপন সাধনা, আপন চিন্তায় দ্বারা মনকে ভ্রান্তিমুক্ত করে বোধপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং সেই থেকে এ গাছ বুদ্ধের নামে খ্যাত হয়েছে । সেই পবিত্র স্মৃতি স্মরণ করে আমি এই বৃক্ষের সামনে মাথা নত করি।”

“আপন সাধনা, আপন চিন্তায় দ্বারা সমনে ভ্রান্তিমুক্ত করে বৌধিক মার্গ অর্জনের প্রতীক! এ রকম প্রতীককে পূজা করা উচিত প্রিয়ে! এ রকম প্রতীকের পূজা আপন সাধনায় আত্ম-বিজয়েরই পূজা।”

এরপর দু’জনেই ভদন্ত ধর্মরক্ষিতের কাছে গেল। তিনি অঙ্গনের এক বকুল বৃক্ষের নীচে উপবিষ্ট ছিলেন। নবপুষ্পিত ফুলের মধুর সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছিল। বৌদ্ধ উপাসিকার ন্যায় প্রভা পঙ্কপ্রতিষ্ঠিত হয়ে (হাঁটু গেড়ে বসে, হাতের পাতা এবং কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে) তাঁকে বন্দনা করল। অশ্বঘোষ দণ্ডায়মান অবস্থাতেই শ্রদ্ধা নিবেদন করল। তারপর দু’জনে মাটির ওপর রক্ষিত চর্মাসনে বসে পড়ল। সাধারণ শিষ্টাচারের কথাবার্তার পর অশ্বঘোষ দর্শনের কথা তুলল। ধর্মরক্ষিত বললেন, “ব্রাহ্মণকুমার, বৌদ্ধধর্মে দর্শনকেও বন্ধন এবং দৃঢ়বন্ধন (দৃষ্টিসংযোজন) বলা হয়েছে।”

“তবে কি বৌদ্ধধর্মে দর্শনের কোনো স্থান নেই, ভদন্ত?”

“বুদ্ধের ধর্মই দর্শনময়, কিন্তু বুদ্ধ একে নদী পার হবার ভেলা মনে করতেন।”

“কি বললেন, ভেলা মনে করতেন?”

“হ্যাঁ, খেয়াবিহীন নদী পার হতে হলে লোক ভেলার সাহায্যে পার হয়। কিন্তু পার হবার পর সেই ভেলা মাথায় করে নিয়ে যায় না।”

“আপন ধর্মের সপক্ষে যে পুরুষ উচ্চকণ্ঠে এত বড় কথা বলবার স্পর্ধা রাখেন, তিনি নিশ্চয়ই সত্যের অন্তর্নিহিত শক্তিকে উপলদ্ধি করেছেন। ভদন্ত, বুদ্ধের দর্শন থেকে এমন কিছু বলুন যাতে আমরা নিজেদের চলার সঠিক পথ খুঁজে নিতে পারি।”

“অনাত্মবাদ, কুমার! ব্রাহ্মণেরা আত্মাকেই নিত্য, ধ্রুব, এবং শাশ্বত তত্ত্বকে স্বীকার করেন না। এ জন্যেই তাঁর দর্শনকে অনাত্মবাদ, অর্থাৎ অবিরাম উৎপত্তি আর বিনাশের সংঘর্ষে যে অনিত্যতা তারই দর্শন বলা হয়।”

“এই একটা বাণীই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট ভদন্ত! ধর্ম এবং অনাত্মবাদ ভেলার ন্যায়, এই বাণী প্রচার করেছেন যে বু্দ্ধ—তাঁকে শত শত অশ্বঘোষ প্রণাম জানাচ্ছে। অশ্বঘোষ যা খুঁজে মরছিল তা সে পেয়ে গেছে। আমি নিজের ভিতরে এমনই এক চিন্তালহরী অনুভব করছিলাম কিন্তু রূপ দেবার মতো ভাষা এর আগে আমি খুঁজে পাইনি। লোকে বুদ্ধের শিক্ষাকে যথাযথ পালন করলে পৃথিবীর রূপ আজ বদলে যেত।”

“ঠিকই বলছে কুমার! আমাদের যবন দেশগুলোতে মহান দার্শনিকগণ জন্মগ্রহণ করেছেন যাঁদের ভিতর পিথাগোরাস এবং হেরাক্লিটাস ছিলেন ভগবান বুদ্ধের সমসাময়িক আর সক্রেটিস, প্লেটো, দেমোক্রেটাস, আরিস্টোটল—এরাঁ জন্মগ্রহণ করেন কিছুকাল পরে। এইসব যবন দার্শনিকদের সকলেই ছিলেন অত্যন্ত চিন্তাশীল ব্যক্তি। কিন্তু একমাত্র হেরাক্লিটাস ছাড়া আর কেউেই শাশ্বতবাদ, নিত্যবাদের উর্ধ্বে উঠতে পারেননি।বর্তমান সম্বন্ধে তাদের মোহ ছিল বড় বেশী।

তার কারণ , ভবিষ্যৎকে তাঁরা বর্তমানের নাগপাশে বেঁধে রাখতে চাইতনে। হেরাক্লিটাস অবশ্য বুদ্ধের মতোই, জগৎকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির, অঞ্চল বলে স্বীকার করতেন না, বুদ্ধের মতোই চির-চলমান বলে তিনি জগৎকে মনে করতেন—কিন্তু এর পেছনে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থ।”

“দর্শন-বিচারে ব্যক্তিগত স্বার্থ!”

“উদর নামক জিনিসটি সকলেরই আছে কুমার! হেরাক্লিটাসের সময়ে আমাদের এথেন্স নগরে গণ-শাসন ছিল, অর্থাৎ এথেন্স কোনো রাজার অধীন রাজ্য ছিল না। প্রথমে হেরাক্লিটাসদের পরিবারের মতো বড় বড় সামন্ত পরিবারেরা গণ-শাসনের কর্ণধার ছিলেন। পরে তাঁদের হটিয়ে দিয়ে ব্যবসায়ী-শেঠরা শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়। হেরাক্লিটাস এতে মোটেই খুশী হননি, তিনি পরিবর্তন চেয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু এগিয়ে চলার পথে নয়, পিছনে ফিরিবার জন্যে।”

“পরিবর্তন আমাদের চাই, কিন্তু সেটা এগিয়ে যাবার জন্য, পিছিয়ে পড়ার জন্য নয়—আমার মনে হয় ভদন্ত, অতীত চিরকালই মৃত।”

“খুবই খাঁটি কথা! বুদ্ধ পরিবর্তন চাইতেন উন্নততর জগৎ প্রতিষ্ঠার জন্য। এই ভবিষ্যৎ জগতের প্রতীক হিসাবে তিনি ভিক্ষুসঙ্ঘকে সংগঠিত করেছেন। যেখানে জাতিভেদে, শ্রেণীভেদ নেই, উঁচু-নীচুর ভেদ নেই। যেখানে সকলেই সমান, যেখানে সবাইকেই সমান শ্রম করতে হবে। তুমি আমাদের মহাস্থবির ধর্মসেনকে বাইরে ঝাড়ু হাতে কাজ করতে দেখেছ?”

“ঐ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বৃদ্ধটি?”

“হ্যাঁ, উনিই আমাদের ভেতরে শ্রেষ্ঠ, আমরা প্রতিদিন পঙ্ক-প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাঁকে বন্দনা করি। সমগ্র কোশল দেশের ভিক্ষসঙ্ঘগুলির উনিই নায়ক।”

“শুনেছি, উনি না-কি চণ্ডাল কুলজাত?”

“ভিক্ষুসঙ্ঘ কুলবিচার করে না, কুমার। তারা বিচার করে গুণের। নিজ বিদ্যা এবং গুণের জোরেই আজ উনি আমাদের নায়ক, আমাদের পিতা। শুধু নিজের পেট ভরানোর মতো সামান্য ভিক্ষাও যদি তিনি লাভ করেন, তবু সঙ্গীদের ভাগ না দিয়ে কখনই তা গ্রহণ করেন না তিনি এবং এই হল বুদ্ধের শিক্ষা।

পরিধেয় তিন খণ্ড কাপড়, মাটির তৈরী এক ভিক্ষাপাত্র, একটি সূচ, জল পান করবার একটি পাত্র, একটি চিরুণী আর এক কোমর বন্ধনী—এই কয়টি জিনিস ছাড়া আমাদের আর সব কিছু সঙ্ঘের সাধারণ সম্পত্তি। আমাদের কোনো বিহারে যে জমি রয়েছে, তাও সঙ্ঘেরই। কাউকে ভিক্ষুসঙ্ঘে গ্রহণ করতে হলে সঙ্ঘ বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তা করে, কিন্তু একবার যে সঙ্ঘে প্রবিষ্ট হয়েছে, ভিক্ষুতে পরিণত হয়েছে, সে সঙ্ঘের আর সবারই সমান।”

“সারা দেশটাই যদি এমনই এক সঙ্ঘে পরিণত হত!”

“সে কি করে হবে কুমার? রাজা বা ধনীর দল কেন অন্যকে তাদের সমান হতে দেবে! ভিক্ষুরা একাবর একজন দাসকে সঙ্ঘে ঢুকিয়েছিল। সঙ্ঘে আসবার পরই সে আর দাস রইল না, হয়ে গেল সকলের সমান। কিন্তু এরপরই তার প্রভু এসে হল্লা সুরু করে দেয়। রাজা নিজে হাজার হাজার দাসের প্রভু। তিনিই বা তাঁর সম্পত্তির ওপর এ ধরনের হস্তক্ষেপ সহ্য করবেন কেন?

এ সবের বিরুদ্ধে কি আর করতে পারি, কাজেই নির্দেশ দিতে হল, কোনো দাসকে আর সঙ্ঘের ভিতর নেওয়া হবে না। অসাম্যের বিশাল সমুদ্রের মাঝে আমাদের সঙ্ঘ এক ক্ষুদ্র দ্বীপমাত্র। দারিদ্র্য এবং দাসত্ব যতদিন অটুট থাকবে, ততদিন আমাদের সঙ্ঘগুলিকে নিরাপদ মনে করা চলে না।”

 


 ভোলগা থেকে গঙ্গা

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top