ভোলগা থেকে গঙ্গা

অনুবাদ

০৪. পুরুহুত

স্থান : বক্ষু উপত্যকা (তাজিকিস্তান) ।। কাল : ২৫০০খৃষ্টপূর্ব

 

এক

বক্ষুর কলকল ধ্বনি মুখরিত ধারা বয়ে চলছে। এর দক্ষিণতটের জলধারা থেকেই পাহাড় শুরু হয়েছে, কিন্তু বামদিকে বেশী ঢালু হওয়ার দরুণ উপত্যকা প্রশস্ত বলে মনে হচ্ছে। দূর থেকে দেখলে গাঢ়-সবুজ উত্তুঙ্গ পাইন-বৃক্ষরজির কালো ছায়া ব্যতীত আর কিছুই দেখা না। কিন্তু কাছে এলে দেখা যায় এদের সুচাগ্র পত্রবিশিষ্ট শাখাসমূহ, নীচ থেকে ক্রমশ ছোট হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। পাইন বৃক্ষশ্রেণীর নীচে অন্যান্য রকমারি বনস্পতি বিরাজ করছে। গ্রীষ্মের শেষ কিন্তু বর্ষা এখনও শুরু হয়নি।

বক্ষুর বাম-তট ধরে হেঁটে চলছিল একটি তরুণ, পরণে তার পশমের এক গাত্রাবরণ—তার ওপর কয়েক ভাঁজে জড়ানো কোমরবন্ধনী। নীচে পশমের পাজামা এবং বহুবিমুনী যুক্ত চপ্পল। মাথা থেকে টুপিটা খুলে পিঠের উপরকার ঝুড়িতে রাখল, দীর্ঘ উজ্জল পিঙ্গল কেশরাশি তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ে হাল্কা হাওয়ায় ফুরফুর করে উড়তে লাগল।তরুণের কোমরে চামড়ার খাপে মোড়া তামার তরবারি।

পিঠের ওপর বৃক্ষ-শাখা নির্মিত ঝুড়ি, তার ভিতর অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে খোলা ধনুক এবং বাণপূর্ণ তুণীর রেখে দিয়েছিল। তরুণের হাতে একটি দণ্ড, সেটাকে ঝুড়ির নীচে ঠেকিয়ে দাঁড়ানো অবস্থাতেই মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছিল। অধিকতর চড়াই আরম্ভ হয়েছে এখন। তার সামনে ছাড় মোটা মোটা ভেড়া চলছিল, এদের পিঠের উপর ঘোড়ার লোমের তৈরী ছাতুভরা বড় বড় থলি।

তরুণের পেছন পেছন আসছিল এক লাল রঙ-এর লোমশ কুকুর। বিহগকুলের মধুর স্বরে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠছিল পর্বত; তরুণের ওপর তার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল এবং শিস দিতে আরম্ভ করছিল সে। একটি খাড়াই-এর ওপর থেকে এক সূক্ষ্ম রুপালী ঝর্ণার ধারা ঝরছিল। খাড়াই-এর প্রান্তদেশ কেটে কে নয়ন কাঠের নালা তৈরী করে রেখেছিল। শ্রান্ত ভেড়ার পাল জল খেতে আসল। তরুণ দেখল কাছেই আঙ্গুর লতায় আঙ্গুরের গুচ্ছ। ঝুড়ি নামিয়ে আঙ্গুর ছিঁড়ে খেতে লাগল—কাঁচা আঙ্গুর ফলে টক একটু বেশী। পাকতে এখনও মাসখানেক দেরি, তবু তরুণ পথিকের কাছে এই-ই ভালো লাগছিল। সম্ভবত সে অত্যন্ত পিপাসার্ত ছিল এবং তাড়াতাড়ি এসেই শীতল জল পান করা ক্ষতিকর মনে করে কিছু্টা অপেক্ষা করছিল।

জলপানের পর ভেড়াগুলো চারিদিকের সবুজ ঘাসের ওপর চরে বেড়াতে লাগল। লোমস কুকুরটা অতিরিক্ত গরম বোধ করছিল, কাজেই সে তার প্রভু বা ভেড়ার পাল কারও অনুকরণ না করে ঝর্ণার জলের মধ্যে বসে পড়ল। তার পেট হাপরের মতো ওঠা-নামা করছিল। আর তার লম্বা লাল জিভ মুখ থেকে বেরিয়ে থরথর করে কাঁপছিল। ঝর্ণার নীচে মুখ রেখে এক নিঃশ্বাসে তরুণ তার পিপাসা দূর করল। তারপর চোখে জল দিয়ে সামনের চুল গোড়া পর্যন্ত ভিজিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। তার অরুণাভ গাল এবং লাল ঠোঁট দুটো ঢেকে ফেলবার জন্য সবে মাত্র পিঙ্গল রোমরাজির উদগম হতে আরম্ভ করেছে।

খুশী মনে ভেড়াগুলোকে চরতে দেখে ঝুড়ির পাশে বসে পড়ল সে। কান খাড়া করে স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকা কুকুরের চোখের ভাব পরখ করে ঝুড়ির এক পাশ দিয়ে হাত ‍ঢুকিয়ে দিল, তারপর একখণ্ড খণ্ড ভেড়ার মাংস বের করে কোমরবন্ধনী থেকে প্রলম্বিত চামড়ার খাপে মোড়া ধারালো তামার ছুরি দিয়ে কেটে কিছু নিজে খেল আর কিছুটা কুকুরকে খাওয়াতে লাগল। এমন সময় কাঠের ঘণ্টার খট্‌খট্‌আওয়াজ শোনা গেল। তরুণ দূর থেকে দেখল—ঝোপের আড়ালে অর্ধেক ঢাকা অবস্থায় এক গাধাকে আসতে। তার পিছনে পিছনে এক ষোড়শী তরুণী তারই মতো পোষাক ও পিঠে ঝুড়ি নিয়ে আসছে। হাল্কাভাবে শিস্‌দিতে লাগল তরুণ।

সে যখনই কিছু ভাবতে থাকে—তার মুখ থেকে নি:শ্বাসের মতোই স্বতঃস্ফুর্তভাবে এমনি শিসের আওয়াজ বেরিয়ে পড়ে। ষোড়শীর কানে একবার অন্তত শিসের আওয়াজ পৌছাল এবং সেইদিক লক্ষ্য করে তাকালও কিন্তু তরুণের দেহ লতাগুল্মের আড়ালে ছিল। তরুণ যদিও হাত পঞ্চাশ দূরে থেকে দেখছিল, তবু ষোড়শীর মুখের হাল্কা অথচ সুন্দর এক ছাপ তার অন্তস্থলে রেখাপাত করছিল, তাই উন্মুখ আগ্রহে জানবার প্রতীক্ষায় বসে রইল—কোথায় চলেছে ওই তরুণী।

এ-ধারে বক্ষুর ওপরে আর কোনো বসতি নেই এ কথা তরুণ জানত, কাজেই সেও যে প্রথাচারিণী তা বুঝতে পারল। অপরিচিত ষোড়শীকে দেখে কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করল, তরুণ ‘চুপ’ বলতেই সেখানে চুপ করে বসে গেল। ষোড়শীর গাধাটি জল খেতে লাগল, তরুনী তার পিঠ থেকে ঝুড়ি খুলতেই তরুণটি এগিয়ে এসে শক্ত হাতে সেটাকে নামিয়ে নিচে রেখে দিল। মৃদু হেসে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তরুণী বলল, ‘‘বড্ড গরম আজ।’’

‘‘গরম নয়, চড়ািই পেরিয়ে আসবার জন্যে এ রকম মনে হচ্ছে। একটু বিশ্রাম নিলেই ঘাম শুকিয়ে যাবে।’’

‘‘এই সময়টাতে দিনগুলো বেশ ভালো থাকে।’’

‘‘আর দশ-পনের দিনের মধ্যে বৃষ্টি হবার ভয় নেই।’’

‘‘বৃষ্টিকে আমার সত্যিই বড় ভয়। নালার জলে আর পিছল কাদায় রাস্তাগুলো এত বিশ্রী হয়ে যায়!’’

‘‘গাধাগুলোর পক্ষে পথ চলা আরও মুশকিল হয়ে পড়ে।’’

‘‘বাড়িতে আমাদের ভেড়া নেই বলে আমি গাধা নিয়ে বেরিয়েছি। আচ্ছা, বন্ধু তুমি কোথায় যাবে?’’

‘‘পাহাড়ের ওপর, আজকাল আমাদের ঘোড়া, গরু ভেড়া সব ওখানেই আছে।’’

‘‘আমিও ঐখানেই যাচ্ছি। আমি ছাতু, ফল, নুন এইসব পৌছে দিতে যাচ্ছি।’’

‘‘তোমার পশুদের কে দেখছে সেখানে?’’

‘‘আমার প্রপিতামহ, আর ভাইবোনেরাও আছে।’’

‘‘বাবার ঠাকুর্দা! সে নিশ্চয় খুবই বুড়ো?’’

‘‘খুবই বুড়ো। এত বুড়োমানুষ বোধহয় কোথাও দেখা ‍যায় না।’’

‘‘তবে পশুদের কি করে দেখাশোনা করে?’’

‘‘এখনও খুব শক্ত সমর্থ আছে। তার চুল, ভ্রু সব সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু দাঁত এখনও প্রায় নতুনের মতো রয়েছে। দেখলে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বয়স বলে মনে হয়।’’

‘‘তা‘হলে তো তাকে ঘরেই বসিয়ে রাখা উচিত।’’

‘‘রাজিই হয় না। আমার জন্মের আগে থেকে সে গাঁয়ে যায়নি কখনো।’’

‘‘গাঁয়ে যায়নি!’’

‘‘যেতে চায় না। গাঁ-কে সে ঘৃণা করে। বলে, ‘মানুষ এক জায়গায় বন্দী হয়ে থাকবার জন্যে জন্মায়নি।’ অনেক প্রাচীন কাহিনী আমাদের শোনায়। আচ্ছা তোমার নাম কি বন্ধু?’’

‘‘পুরুহুত মাদ্রীপুত্র পৌরব। আর তোমার নাম বোন?’’

‘‘রোচনা মাদ্রী।’’

‘‘তা‘হলে তুমি তো আমার মাতুলকুলের লোক! তোমরা উত্তরমাদ্র না নিম্ন?’’

‘‘উত্তরমাদ্র।’’

বক্ষু নদীর বামতটে পুরুদের গ্রাম, কিন্তু তার নিম্নভাগ—যা নীচের সমতলভূমির সঙ্গে মিশেছে—মমুদের অধিকারে ছিল। দক্ষিণতটে উপরিভাগ মাদ্র এবং নিম্নভাগ পরশুদের অধিকারে ছিল। ভূমি এবং জনসংখ্যার বিচারে পুরুরা মাদ্রদের চেয়ে ছোট ছিল না। পুরুদের নিম্নে অবস্থিত মাদ্রদের নিম্নমাদ্র বলা হত। রোচনা উচ্চমাদ্রের বংশ।

এইসব জানবার পর দু‘জনেই আরও অধিক আত্মীয়তা অনুভব করল। পুরহুত বলল, ‘‘রোচনা, আজ কিন্তু আমরা পাহাড়ের ওপর পৌছাতে পারব না। কিন্তু একলা আসবার সাহস তুমি কোত্থেকে পেলে?’’

‘‘হ্যাঁ, আমি জানতাম যে রাতে চিতাবাঘের হাত থেকে গাধাগুলোকে বাঁচানো মুশকিল, কিন্তু বুড়ো মানুষটির জন্য খাওয়ার জিনিস আনবার দরকার ছিল পুরহুত। আমার ওপর তিনি অনেকখানি ভরসা করেন। আমি ভেবেছিলাম যে রাস্তায় আরও কেউ হয়ত জুটে যাবে, আজকাল ওপরে অনেক লোকই যায়। আর এও মনে করেছিলাম রাত্রে আগুন জ্বালিয়ে নিলেই কাজ চলে যাবে।’’

‘‘রাস্তায় চলতে চলতে আগুন জ্বালানো সম্ভব নয়। তোমার কাছে কি অরণী আছে?’’

‘‘আছে।’’

‘‘থাকলেও অরনী ঘর্ষণ করে আগুন জ্বালানো সহজ কাজ নয়। যা‘হোক আমার কাছে এক পবিত্র অরণী আছে, পিতামহের আমল থেকে আমাদের ঘরে এটা ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অরণীর আগুনে বহু যজ্ঞ, বহু দেবপূজার অনুষ্ঠান হয়েছে। অগ্নিদেবতার মন্ত্রও আমার জানা আছে, কাজেই এ দিয়ে তাড়াতাড়িই আগুন জ্বলে যায়।

‘‘তা ছাড়া আমরা এখন দু‘জন পুরুহুত,কাজেই আমাদের সামনে আসবার মতো সাহস চিতাবাঘের হবে না।’’

‘‘আর আমার কুকুরও তো রয়েছে, রোচনা ।’’

‘‘কুকুর!’’

‘‘হ্যাঁ, আমার এই লাল শিকারী কুকুর।’’

কুকুরটাকে ডাকতেই সে দাঁড়িয়ে তার প্রভুর হাত চাটতে লাগল। রোচনাও আদর করে ডাকল তাকে। সে এসে তার গা শুঁকতে লাগল, তারপর রোচনা যখন তার পিঠে হাত দিল তখন লেজ নাড়তে নাড়তে সে তার পায়ের ওপর বসে পড়ল। পুরুহুত বলল, ‘‘ও খুব বুদ্ধিমান, রোচনা।’’

‘‘খুব বলিষ্ঠও বটে।’’

‘‘হ্যাঁ, ভাল্লুক, নেকড়ে, চিতা কাউকেই ভয় করে না।’’

ভেড়া এবং গাধাগুলো এতক্ষণে প্রচুর ঘাস খেয়েছে, ক্লান্তিও দূর হয়ে গেছে, তাই দুই পথিক আবার পথ চলা শুরু করল। কুকুরটা পিছন পিছন চলল। চলার পথ যদিও এঁকে-বেঁকে তেরছাভাবে ওপরে উঠেছে, তবুও চড়াই অত্যন্ত কঠিন ছিল, এ জন্য অত্যন্ত সাবধানে ধীরে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে চলছিল তারা। পুরুহুত কখনও সরস লাল স্ট্রবেরী ফল, কখনও বা করমচা ফল ছিঁড়ছিল এবং রোচনাকেও তার ভাগ দিচ্ছিল।

ভালো ভালো ফলগুলো এখনও তেমন পাকেনি, পুরুহুতকে তাই কিছুটা নিরাশ হতে হচ্ছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা এমনি আলাপ করতে করতে ওপরে উঠল। ঘন গুল্মরাজির নীচ দিয়ে কল-কল স্বরে ধাবিত এক ঝর্ণাধারা তাদের নজরে এল, তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পাশেই একটুখানি খোলা জায়গা, সেখানে পড়ে রয়েছে আধপোড়া কাঠের গুঁড়ি আর ছাই। খুব খুশী হয়ে বলল, ‘‘রোচনা রাতের বিশ্রামের জন্য এর থেকে ভালো জায়গা সামনে আর পাওয়া যাবে না। কাছেই জল রয়েছে, আর প্রচুর ঘাস এবং শুকনো কাঠ। এ ছাড়াও সকালে এখান থেকে যে সব পথিক রওনা হয়েছে, তারা ছাই চাপা দিয়ে আগুনও রেখে গেছে।’’

‘‘হ্যা পুরুহুত, এর চেয়ে ভালো জায়গা পাওয়া যাবে না। আজ এখানেই থাকা যাক। পরের ঝর্ণা পর্যন্ত পৌছাতে অন্ধকার হয়ে যাবে।’’

পুরুহুত বসে পরে তাড়াতাড়ি নিজের ঝুড়িটা নীচে নামিয়ে পাথরের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখল, তারপর রোচনার ঝুড়িটা নামাল। দু‘জনে মিলে গাধাগুলোর পিঠ থেকে বোঝা নামাল এবং তাদের জিন্‌খুলে দিল। গাধাগুলো দু‘তিনবার গড়াগড়ি খেয়ে চরতে চলে গেল। ভেড়ার বোঝা নামাতে কিছু দেরী হল, কারণ তাদের জোর করে ধরে আনতে হচ্ছিল। মশক হাতে রোচনা ঝর্ণার জল ভরতে গেল।

পুরুহুত পাতা এবং কাঠের টুকরো দিয়ে আগুল জ্বালাল, তারপর বড় বড় কাঠের খণ্ড দিয়ে বড় রকমের অগ্নিকুণ্ড তৈরী করল। রোচনা যখন জল নিয়ে ফিরল, তখন পুরুহুত এক তামার পাত্র সামনে রেখে গরুর একখণ্ড পা ছুরি দিয়ে কাটছে। রোচনাকে দেখে সে বলল, ‘‘কাল সন্ধ্যার মধ্যে আমরা ওপরে পৌছে যাব রোচনা। তোমার গোষ্ঠ তো তবে আর বেশিদূর হবে না?’’

‘‘এই পাহাড়ের মাথায় আমরা যেখানে পৌঁছাই, সেখান থেকে তিন ক্রোশ পূবে।’’

‘‘আর আমার ছ‘ক্রোশ পুবে। তা‘হলে তো তোমার প্রপিতামহের গোষ্ঠ আমার যাবার পথেই পড়বে। ‘’

‘‘তুমিও তবে তাকে দেখতে পাবে। তার সঙ্গে কি করে তোমার দেখা হবে এইটেই ভাবছিলাম।’’

‘‘আর তো মাত্র এক দিন আছে, সিকি ঠ্যাং-ই যথেষ্ট একদিনের জন্যে।’’

‘‘আমার কাছেও বাছুরের আধখানা ঠ্যাং আছে। আজকাল মাংস বেশিদিন রেখে দিলে দুর্গন্ধ হয়।’’

‘‘নুন দিয়ে মাংস রাঁধলে কি রকম হবে?’’

‘‘খুব ভালো হবে। আর আমার কাছে গুড়ের রসও রয়েছে, পুরুহুত। মাংস, গুড়ের রস আর শেষে কিছুটা ছাতু মিশিয়ে দিলেই চমৎকার সুপ তৈরী হবে। শুতে যাবার আগেই সুপ খাব আমরা।’’

‘‘আমি একলা হলে সুপ বানাতাম না রোচনা, বড় সময় লাগে ওতে। কিন্তু এখন সেই সময়টা আমি পশুগুলোকে বাঁধতে এবং কথাবার্তা বলেই কাটিয়ে দেব।’’

‘‘প্রপিতামহ আমার রান্না সুপ বড়ই পছন্দ করেন, পুরুহুত। তোমার এ তামার কড়াই কি সুন্দর!’’

‘‘হ্যাঁ, তামার, কিন্তু অনেক দাম রোচনা। এই কড়াই-এর পিছনে একটা ঘোড়ার দাম খরচ হয়েছে; কিন্তু রাস্তায় বেশ কাজে আসে এগুলো।’’

‘‘তোমার ঘরে নিশ্চয়ই তা‘হলে অনেক পশু আছে পুরুহুত?’’

‘‘হ্যাঁ রোচনা, ধানও আছে। এজন্যই তো এক ঘোড়ার মুল্যের এই কড়াই। আচ্ছা নাও এইবারে মাংস কাটা আমার শেষ হয়ে গেছে। জল আর নুন দিয়ে মাংস আগুনে চড়িয়ে দাও, আর আমি ওদিকটাতেও কাঠের আগুন তৈরী করি। তারপর কিছু ঘাস কেটে আমাদের গাধা আর ভেড়াগুলোকে তার মাঝখানে বাঁধতে হবে। জান তো আমাদের কাছে বাছুরের মাংস যেমন লাগে, চিতার কাছে গাধার মাংস তার চেয়ে মিষ্টি। ’’ তার কুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘আয় তুইও ততক্ষণ এটা চাটতে থাক। ’’ কিছুটা মাংসসুদ্ধ একটা হাড় কুকুরের সামনে ছুঁড়ে দিল পুরুহুত। কুকুরটা লেজ নাড়াতে নাড়াতে পায়ের নীচে হাড়ের টুকরো চেপে দাঁত দিয়ে ভাঙবার চেষ্টা করতে লাগল।

পুরুহুত ওপরের গাত্রবাস এবং কোমরবন্ধনী খুলে ফেলল। হাতাবিহীন জামার নীচে তার প্রশস্ত বক্ষ এবং পেশীবহুল বাহুযুগল জানিয়ে দিতে চায় এই বিশ বছর বয়স্ক তরুণের দেহে অপরিসীম শক্তি। কাজ করবার সময় পুরুহুতের লোমরাজি কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল।ঝুড়ির ভেতর থেকে কোদাল বের করে এক লহমায় একগাদা ঘাস সংগ্রহ করে ফেলল। তারপর কান ধরে গাধাগুলোকে নিয়ে এসে খুঁটো গেড়ে বাঁধল এবং তাদের সামনে ঘাস ছড়িয়ে দিল। ভেড়াগুলোর ব্যবস্থা একই হল।

কাজ শেষ করে পুরুহুতও আগুনের কাছে এসে বসল কড়াই থেকে সিদ্ধ মাংসখণ্ড তুলে চামড়ার ওপরে রাখতে যাচ্ছিল রোচনা। পুরুহুত ‍ঝুড়ির ভিতর থেকে এক টুকরো চামড়া বের করে বিছিয়ে দিল। তারপর কাঠের এক সুন্দর চষক এবং পেটের চামড়ায় তৈরী বোতল বের করে রাখল, সেই সঙ্গে বাঁশীটাও মাটিতে পড়ে গেল। যেন কোনো কোমল শিশু মাটিতে পড়ে গেছে এবং ব্যথা লাগবার ভয়ে তার মা কেঁপে উঠছে—এমনিভাবে তাড়াতাড়ি বাঁশীটাকে তুলে কাপড়ে মুছল। তারপর তাকে চুমু খেয়ে ‍ঝুড়ির ভিতর রাখতে গেল। রোচনা চেয়ে চেয়ে দেখছিল। সে বলে উঠল, ‘‘পুরুহুত, তুমি বাঁশী বাজাতে পার?’’

‘‘এই বাঁশী আমার বড়ই প্রিয় রোচনা, আমার প্রাণটাই যেন এই বাঁশীর সঙ্গে বাঁধা।’’

‘‘আমাকে বাঁশী শোনাও পুরুহুত।’’

‘‘এখন না, খাওয়ার পরে।’’

‘‘এখন একটু শোনাও, খাওয়ার পরে আবার শুনব।’’

‘‘আচ্ছা—’বলে পুরুহুত বাঁশীতে ঠোট লাগিয়ে আটটি আঙ্গুল যখন তার ছিদ্রগুলোর ওপর দিয়ে চালাতে শুরু করল, তখন বিশাল বৃক্ষরাজির ছায়া থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দ পদসঞ্চারী সন্ধ্যার অন্ধকার আর স্তব্ধতার মাঝে দিগন্ত প্রতিধ্বনিত করা মধুর ধ্বনি চারদিকে মায়াজাল বিস্তার করতে লাগল। রোচনা সমস্ত কিছু ভুলে তন্ময় হয়ে শুনতে লাগল সেই ধ্বনি। কোন উর্বশীর বিয়োগব্যথায় ব্যাকুল পুরুরবার বেদনাপূর্ণ গান বাঁশীতে বাজিয়ে চলেছিল পুরুহুত! গান শেষ হয়ে গেলে রোচনার মনে হল,যেন স্বর্গ থেকে সোজা ধরণীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাকে।

আনন্দাশ্রু পূর্ণ চোখে সে বলল, ‘‘তোমার বাঁশীর গান বড় মধুর পুরুহুত, বড়ই মধুর। আমি এমন বাঁশী কখনও শুনিনি। কি সুন্দর এই সুর!’’

‘‘লোকে এই কথাই বলে রোচনা, কিন্তু আমি বুঝতে পারি না। বাঁশীতে ঠোট লাগানো মাত্রই আমি সব ভুলে যাই। এই বাঁশী যতক্ষণ আমার কাছে থাকে ততক্ষণ পৃথিবীর কোন কোনো কিছুই আমি চাই না।’’

‘‘আচ্ছা—এস পুরু, নইলে মাংস জুড়িয়ে যাবে।’’

‘‘রোচনা, আমি যখন রওনা হই, তখন মা এই দ্রক্ষাসুরা দিয়েছিলেন, অল্পই আছে। মাংসের সঙ্গে পান করলে বেশ লাগবে।’’

‘‘সুরা তোমার খুব প্রিয়, পুরু?’’

‘‘প্রিয় বলা যায় না রোচনা। প্রিয় জিনিসে অরুচি হয় না। কিন্তু আমার চোখদুটো একটু লাল হয়ে উঠলেই আর এক ঢোকও পান করতে পারি না।’’

‘‘আমারও ঠিক এমনি মনে হয় পুরু। নেশায় চুর লোক দেখলে আমার বড় ঘৃণা হয়।’’—বলতে বলতে রোচনা নিজের কাঠের পেয়ালা বের করে নীচে রাখল।

তিনভাগের একভাগ মাংস কুকুরকে দেওয়া হয়েছিল। ওরা দু‘জন অনেক দেরীতে পানাহার শেষ করল। চারিদিকে ঘন অন্ধকারের আস্তরণ ছড়িয়ে পড়েছে। মোটা কাঠের গনগনে আগুনের লাল আভা আর তার আশেপাশের কিছু জায়গা ছাড়া আর কিছুই সেখানে দেখা যাচ্ছিল না। তবে কিছু আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল—মনে হয় পোকামাকড়ের ডাক। গল্প-গুজব এবং মাঝে মাঝে বাঁশী বাজানো চলতে লাগল।

শেষ কয়েকঘণ্টার মধ্যে ছাতু দিয়ে মাংসের সুপ তৈরী হয়ে গেল। দু‘জনেই নিজ নিজ পেয়ালা নিয়ে গরম গরম সুপ পান করল। অনেক রাত হয়ে গেলে ওরা ঠিক করল ঘুমোবে। চামড়ার বিছানা তৈরী করে রোচনা নিজের পরিচ্ছদ খুলতে লাগল। পুরুহুত আগুনের ওপর আরও কাঠ সাজিয়ে দিল, পশুগুলোর সামনে ঘাস এগিয়ে দিল, তারপর বনদেবতার কাছে প্রার্থনা শেষ করে পরিচ্ছদ খুলে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে উঠে দু‘জনেই অনুভব করল যেন একরাত্রীর ভিতরে দু‘জনের মধ্যে সহোদর ভাই-বোনের সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে গেছে। রোচনা উঠবার পর পুরুহুত নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। বলল, ‘‘তোমার মুখে আমার চুমু দিতে ইচ্ছা করছে, রোচনা বোন!’’

‘‘আমারও, পুরু! এ জগতে আমরা পরস্পর ভাইবোন।’’

রোচনা বিত্রস্ত এলোচুলের রাশি পিছনের দিকে সরিয়ে দিয়ে পুরুহুত তার গাল-দুটোতে চুমু দিল, দু‘জনের মুখমণ্ডল প্রসন্ন হয়ে উঠল এবং চোখ জলে ভরে এল। তারপর মুখ ধুয়ে সামান্য ছাতু এবং শুকনো মাংস খেয়ে পশুগুলোর পিঠে বোঝা চাপিয়ে তারা যাত্রা করল। কথাবার্তায় সময় এত তাড়াতাড়ি কেটে গিয়েছিল যে তারা বুঝতেই পারেনি কখন ওপরে এসে পৌচেছে।

রোচনা মাদ্র প্রপিতামহের কাছে পুরুহুতের পরিচয় দিলে সে পুরুদের বীরত্বের প্রশংসা করতে করতে তাকে অর্ভ্যথনা করল।

 

দুই

এই গিরিপথে মাদ্রদের একটি ছোট গ্রাম। সমস্ত ঘরই তাঁবু অথবা খড়ের ছাউনি। নীচের দিকে ঢালু এবং খাড়া পাহাড়ের ওপর কেবল ঘন পাইনের জঙ্গল কিন্তু এই পর্বতচুড়ায় বৃক্ষের চিহ্নমাত্র নেই। এখানে ভূমি সমতল, ওপরে সবুজ ঘাসের পুরু গালিচা বিস্তৃত। এই সবুজভূমির কোথাও ভেড়া, কোথাও বা ঘোড়ার দল চরে বেড়াচ্ছিল। এদেরই মধ্যে কোথাও কোথাও এদেরই ছোট ছোট বাচ্চারাও লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করছিল।

এই সমতল ভূমিকেই দেখে মাদ্রবাবা বলেছিলেন, ‘মানুষ এক জায়গায় বন্দী হয়ে থাকবার জন্য জন্মলাভ করেনি।’ মাদ্রবাবার তাঁবু এখানেই পড়েছে এ মাসে। ঘাস কমে গেলে অন্য কোথাও চলে যাবে। এখানে দুধ, দই মাখন এবং মাংসের প্রাচুর্য। তাবুর ভেতরে এইসব জিনিসই রয়েছে। পনেরো বিশ দিন অন্তর গ্রাম থেকে লোক এসে এখান থেকে মাখন ও মাংস নিয়ে যায়। শীতের দিনে এই পাহাড়ের চূড়ায় বরফ পড়তে থাকে।

প্রপিতামহ পারলে এখানেই থেকে যেত কিন্তু বরফ খেয়ে থাকতে পারে না, এ জন্য তাকে আঁকা-বাঁকা রাস্তা ধরে কিছুটা নিচে চলে আসতে হয়। আর পশুরা চলে যায় নীচের গ্রামে। বৃদ্ধকে কিন্তু গ্রামে যাওয়ার কথা বললেই তেড়ে মারতে আসে।বেলা থাকতেই দুই পথিক তাঁবুতে পৌছেছিল। জিনিসপত্র নামিয়ে নেবার পর বৃদ্ধ সফেন ঘোড়ার দুধে ভরা কাষ্ঠ পেয়ালা তাদের সামনে রাখল, তিন-চার পেয়ালাতেই পথের ক্লান্তি দূর হল।

সন্ধ্যার সময় রোচনার ভাই-বোন এবং গাঁয়ের অন্যান্য তরুণ রাখালরা ঘোড়া, গরু, বাছুর নিয়ে এসে পড়ল। এদিকে রোচনা তার সেই বুড়ো প্রপিতামহের কাছে ‍পুরুহুতের বাঁশীর প্রশংসা করছিল। তার মতো গম্ভীর লোকও পুরুহুত কে ছাড়তে রাজী নয়। সে এবং গোষ্ঠীর সমস্ত তরুণই বাঁশী অত্যন্ত ভালোবাসে। রাত্রে যখন নৃত্যানুষ্ঠান চলল, পুরুহুতও তখন বাঁশীর যাদু দেখিয়ে দিল।

সকালে উঠে পুরুহুত যাবার কথা বলল, কিন্তু প্রপিতামহ তাকে এত তাড়াতাড়ি যেতে দেবে কেন। দুপুরে খাওয়ার পরে বৃদ্ধ নিজের কথা আরম্ভ করলে এবং কথা আরম্ভ হল ঝুড়ির পাশে পড়ে থাকা তামার কড়াইকে কেন্দ্র করে। বৃদ্ধ বলল, ‘‘এই তামা এবং ক্ষেতগুলোকে দেখলে আমার সারা অন্তর জ্বলে ওঠে। যখন বক্ষুতটে এইসব জিনিসের আমদানী হয়েছে, তখন থেকে পাপ-অধর্ম ছেয়ে গেছে, দেবতারাও রুষ্ট হয়েছেন, মহামারী বেড়ে গেছে—প্রবল হয়ে উঠেছে হানাহানি।’’

‘‘তা‘হলে কি আগে এ সব জিনিস ছিল না দাদু?’’—পুরুহুত প্রশ্ন করল।

‘‘না বাবা, এইসব জিনিস আমার ছোটবেলাতেই শুরু হয়েছে একটু একটু করে। আমার ঠাকুর্দা তো এ সবের নাম পর্যন্ত শোনেনি, সে সমস্ত কিছুই পাথর, হাড়, শিং কিম্বা, কাঠ থেকে তৈরী হত।’’

‘‘কাঠ কি ‍দিয়ে কাটত দাদু?’’

পাথরের কুড়ুল দিয়ে।’’

‘‘তা‘হলে তো অনেক সময় লাগত, আর এত সুন্দর করে কাটা যেত না নিশ্চয়ই?’’

‘‘এত তাড়াহুড়োর তাগিদই তো সমস্ত কাজ মাটি করেছে, এখন তোমরা ছ‘মাসের খাবার অথবা অর্ধেক জীবন কাটাবার মতো একটা ঘোড়া দিয়ে একখানা তামার কুড়ুল নাও, তারপর জঙ্গলের পর জঙ্গল কেটে উজার কর অথবা গাঁ-এর পর গাঁ কে নিশ্চিহ্ন করে ফেল! কিন্তু গাঁগুলো জঙ্গলের গাছ-গাছালির মতো নিরস্ত্র নয়। তাদের কাছেও অমনি তীক্ষ্ম কুড়ুল রয়েছে। এ তাম্র-কুঠার যুদ্ধকে আরো ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। এর আঘাতে বিষাক্ত ক্ষতের সৃষ্টি হয়। আগে তীরের ফলা পাথরে তৈরী হত। এই তামার ফলা দিয়ে দুধের ছেলেরা বাঘ শিকার করতে চায়। এখন আর লোকে কুশলী ধনুর্ধর হতে চাইবে কেন?’’

‘‘তোমার একটা কথার সঙ্গে আমি একমত দাদু—মানুষ একজায়গায় থাকবার জন্যে জন্মায়নি।’’

‘‘হ্যাঁ বাছা, প্রথম দিনের ময়লার ওপর রোজ রোজ ময়লা ফেলা খুবই খারাপ।

আমাদের তাঁবু এখানেই রয়েছে। পশুরা এখানকার ঘাস খেয়ে ফেলবে। এর আশেপাশে মানুষ এবং পশুর মলমূত্র জমে উঠতে থাকবে, আর সেই সময় আমরা এই জায়গা ছেড়ে চলে যাব—যেখানে নতুন নতুন সবুজ ঘাস প্রচুর মিলবে, জলহাওয়া অনেক বেশী নির্মল হবে।’’

‘‘হ্যা দাদু, আমিও এমনি ভালোবাসি—এই মাটিতেই আমার বাঁশীর সুর আরো মিষ্টি হয়ে ওঠে।’’

‘‘ঠিক বলেছ বাছা! আগে আমরা এই তাঁবুর মেলাকেই গাঁ বলতাম, আর এইসব মেলা এক জায়গায় এক বছর কেন তিন মাসও থাকত না, কিন্তু এখানকার গাঁ পুত্র-পৌত্র এমন কি একশ‘ পুরুষের বলতি হিসাবে তৈরী হচ্ছে। পাথর, কাঠ আর মাটির দেওয়াল তোলা হয়, ফলে ভিতরে হাওয়া ঢুকতে পারে না। অগ্নিকে দেবতা বলা, বায়ুকে দেবতা বলা আজ শুধু মুখের কথায় দাঁড়িয়ে গেছে, আজ আর আমাদের হৃদয়ে তাদের জন্য সেই শ্রদ্ধা-সম্মান নেই। এই জন্যেই এখন বহু নতুন নতুন রোগের উৎপত্তি। হে মিত্র, হে নাত্স্য, হে অগ্নি! ‍তুমি যে এই মানবকুলের ওপর ক্রোধ বর্ষণ করছ, তা ঠিকই।’’

‘‘কিন্তু দাদু, এই তামার কুড়ুল, তামার খাঁড়া, তামার শল্য ছাড়া আমরা কি করে বেঁচে থাকব? এ সব ত্যাগ করলে শত্রুরা আমাদের একদিনেই গ্রাস করবে।’’

‘‘আমি স্বীকার করি বাছা, দু‘মাসের আহার অথবা আজীবন কাটাবার মতো ঘোড়া খুশী মনে বেচে লোকে তামার খাঁড়া কেনেনি। ঐ নিম্নমাদ্র এবং পরশুরা বক্ষু মাতার গায়ে কলঙ্কের দাগ লাগিয়েছে। বক্ষু নদী কতদূর পর্যন্ত বয়ে গেছে তা আমি জানি না, মিথ্যাবাদীরা অবশ্য বলে, পৃথিবীর প্রান্তে যে অপার জলরাশি রয়েছে সেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে। এ কথা আমরাও জানি যে, মাদ্র আর পরশুদের দেশ শেষ হতেই বক্ষু নদী পাহাড় ছেড়ে সমতলভূমিতে চলে যায়, আর তারপরেই হল মিথ্যাবাদী। দেবশত্রুদের দেশ। তারা বলে সেখানে না-কি বড় বড় ঠ্যাং ওয়ালা ছোটখাটো পাহাড় সদৃশ জন্তু আছে, কি যেন তাদের নাম বাবা?—স্মৃতিশক্তি এখন ক্ষীণ হয়ে আসছে আমার।’’

‘‘উট বলে দাদু। কিন্তু পাহাড়ের মতো উঁচু হয় না। একদিন এক নিম্নমাদ্র উটের বাচ্চা নিয়ে এসেছিল। বলল, ছ‘মাসের বাচ্চা, আকারে সে তো আমাদের ঘোড়ার মতোই ছিল।’’

‘‘হ্যাঁ বাছা, বাইরের দেশ থেকে যারা ঘুরে আসে, তারা বড় বেশী মিথ্যা বলতে শেখে। তারা বলত—কি যেন ওর নাম?’’

‘‘উট।’’

‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ উট। বল তো উটের গলা কি এত লম্বা যে, সে বক্ষুর এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের ঘাস খেতে পারে!’’

‘‘এ মিথ্যা কথা, তাই না দাদু?’’

‘‘হ্যাঁ বাবা, সেই বাচ্চার গলা ঘোড়ার থেকে সত্যিই লম্বা ছিল; কিন্তু ঘাস খাওয়ার কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা…’’

‘‘এই মিথ্যাবাদী মাদ্র এবং পরশুরাই তামার কুড়ুল, তামার খাঁড়ার জিগির তুলেছে। পরশুরা আমাদের উত্তর-মাদ্রের ওপর ওইসব অস্ত্র নিয়েই হামলা করেছিল। এ ঘটনা ঘটে আমাদের আমলে। আমাদের লোকেরাও নিম্নমাদ্রদের কাছ থেকে দুটো করে ঘোড়ার বিনিময়ে তামার কুড়ুল কিনেছিল।’’

‘‘তামার কুড়ুল-এর সামনে পাষাণ-কুঠার ‍কিছুই কাজের নয়, তাই না দাদু?’’

‘‘হ্যাঁ, একেবারে কিছুই নয় বাছা! এই জন্যই বাধ্য হয়ে আমাদের তাম্র-অস্ত্র নিতে হয়েছিল। আর যখন পুরুদের ওপর নিম্নমাদ্ররা আক্রমণ চালাল, তখন তোমাদের লোকেরা আমাদের কাছ থেকে তাম্র-অস্ত্র খরিদ করল। উত্তর-মাদ্র এবং পুরুদের মধ্যে কখনও ঝগড়ার খবর শোনা যায়নি কিন্তু পরশু এবং নিম্নমাদ্রেরা সব সময়েই দস্যুবৃত্তি চালিয়ে এসেছে, সর্বদাই পুরনো ধর্মকে ছেড়ে নতুন নতুন কথা বলেছে, আর তারই ফলে আমাদের লোকেদেরও প্রাণরক্ষার জন্য সেই একই ব্যাপার করতে হয়েছে।

আমি বুঝি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত নিম্নমাদ্র এবং পরশুগণ তামার অস্ত্রপাতি ত্যাগ না করে, ততক্ষণ আমাদের অধিবাসীদের পক্ষে সে সব ত্যাগ করা আত্মহত্যারই সামিল। কিন্তু তামার এতটা প্রসার যে খুবই খারাপ, তাতে কোন সন্দেহ নেই বাছা! আর এই পাপের প্রসারে সাহায্য করছে ঐ দুটো দল—দেবতার আর্শীবাদ এরা কোনোদিনই পাবে না। ঘোর অন্ধকারময় পাতালে প্রবেশ করতে হবে ওদের। ওদের দেখাদেখি, ওদের ভয়ে আমাদের মাটি পাথরের গ্রাম তৈরী করতে হয়েছে। কিন্তু নিম্নমাদ্র আর পরশুরা এই ব্যবস্থা নষ্ট করে দিয়ে এইসব তামার অস্ত্র দিয়ে মাটি মায়ের বুক চিরে দেবার বুদ্ধি কোত্থেকে পেল! এমন পাপ কেউ করেনি। মাটিকে আমরা মা বলি বাছা।’’

‘‘হ্যাঁ দাদু, মাটিকে মা বলি, দেবী বলি, তাকে পূজাও করি।’’

‘‘আর সেই মায়ের বুক নিজ হাতে চিরে দিয়েছে ওই সব পাপীরা। আরও কি সব করেছে—নাম ভুলে যাচ্ছি, স্মৃতিশক্তি ঠিক কাজ করছে না বাছা।’’

‘‘কৃষি, চাষ।’’

‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কৃষি আর চাষ চালু করেছে ওরা, গম বোনে, ধান বোনে এ সব শোনাই যায়নি আগে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা কখনও ধরিত্রী মায়ের বুক চেরেনি, কখনও দেবীর অপমান করেনি। ধরিত্রী মাতা আমাদের পশুকুলের আহারের জন্য ঘাস দিত। জঙ্গলে রকমারী মিষ্টি ফল ছিল, আমরা খেলেও সব ফুরাতো না। কিন্তু এই মাদ্রদের পাপ আর তার দেখা দেখি আমাদের কৃত পাপের ফলে এই এক মানুষ উচু ঘাস আজ কোথায়?

আগেকার মতো সেই পুষ্ট গরু, যা দিয়ে একটা গোটা মাদ্র-গোষ্ঠীর একদিনের পর্যাপ্ত আহার হয়ে যেত—তা এখন কোথায়? সেই গরু, সেই ঘোড়া সেই ভেড়া ‍কিছুই নেই। জঙ্গলের হরিন আর ভাল্লুকও এখন আর অত বড় হয় না। মানুষ আর আগের মতো বেশী দিন বাঁচে না। এই সবই ধরিত্রী দেবীর কোপের ফল ছাড়া আর কিছুই নয়।’’

‘‘দাদু, তুমি কতগুলো শীত দেখেছ?’’

‘‘একশ‘র ওপরে বাছা! এক সময়ে আমাদের গাঁয়ে দশটি তাঁবু ছিল, আর এখন মাটি-পাথরের দেয়ালে তৈরী এক‘শ ঘর হয়ে গেছে সেখানে। যখন ক্ষেত ছিল না, তখন আমাদের চলতি ফিরতি ঘর, চলতি-ফিরতি গাঁ হত। কিন্তু যখন ক্ষেত চালু হল, তখন হরিণের মুখ থেকে শস্য রক্ষার জন্যে ক্ষেত মানুষকে বেঁধে রাখবার খুঁটিতে পরিণত হল। কিন্তু বাছা, মানুষ এক জায়গায় বন্দী হয়ে থাকবার জন্য জন্ম নেয়নি। দেবতারা যা মানুষের জন্য সৃষ্টি করেনি, নিম্নমাদ্র আর পরশুরা সে সব তৈরী করছে।’’

‘‘কিন্তু দাদু, আমরা কি এখন ইচ্ছা করলেও এইসব চাষ-আবাদ ছেড়ে দিতে পারি? ধানই যে আমাদের অর্ধেক খাদ্য আজ।’’

‘‘সে কথা স্বীকার করি কিন্তু ধান আমাদের পূর্বপুরুষেরা খেত না; এখান থেকে পঁচিশ ক্রোশ দূরে গমের বন আছে, সেখানে আপনাআপনিই গম জন্মায়। ফসল ধরে তারপর ঝরে ‍যায়, সেগুলো গরুরা খায়, তাদের দুধ বেড়ে যায়। ঘোড়ারা খেয়ে মোটাসোটা হয়ে ওঠে। প্রতি বছর আমাদের পশুরা সব সেখানে যায়। ধরিত্রী মা মানুষের জন্য ধান সৃষ্টি করেনি—তার দানা আমাদের ক্ষেতের গম থেকে ছোট—পশুকুলের জন্যই ওগুলো।

আমার ভয় যে, কোনোরকমে এই জংলী গম নষ্ট হয়ে না যায়! আমাদের খাওয়ার জন্য এই সব গরু রয়েছে; ঘোড়া, ভেড়া, ছাগল রয়েছে; জঙ্গলের ভেতর ভাল্লুক, হরিণ, শুয়োর, নানা রকমের শিকার রয়েছে, আঙ্গুর প্রভৃতি কত রকমের ফল রয়েছে। এইসব আহার ধরিত্রী মা আমাদের খুশী মনেই দিত; কিন্তু এই সর্বনাশা নিম্নমাদ্র আর পরশু এরা পুরনো সেতু ভেঙ্গে ফেলে নতুন সড়ক তৈরী করছে। আর তাদের এই পাপ কাজে মানুষের ওপর দেবতার কোপদৃষ্টি পড়েছে।

জানি না বাছা এখন বক্ষুবাসীদের ভাগ্যে আর কী কী দূর্দশা লেখা রয়েছে। আমি তো পঁচিশ বছর থেকে পাহাড়ের চূড়ো ছেড়ে গাঁয়ে যাই নি কখনও। শীতের সময় নীচের দিকে ছাউনিতে চলে যাই। যে সব লোক পূর্বপুরুষের বাঁধা সেতুকে ভেঙে ফেলতে চাইছে তাদের মধ্যে কেন যাব! পূর্বপুরুষের মুখনিসৃত বাণীও আমি এতদিন গোপন রেখেছিলাম, এখনও যার শিখবার দরকার, সে-ই আমার কাছে চলে আসে।

কিন্তু সেইসব বাণী অমান্য করে চলবার লোক বেড়েই চলেছে। এখন শুনতে পাচ্ছি মাদ্র-পরশুদের খেতে থেকেও পেট ভরছে না। এখন এরা বক্ষুবাসীদের আহার পরিধান বয়ে নিয়ে কোথায় দিয়ে আসছে, আর তার জায়গায় কি পাওয়া যাচ্ছে?—দ্যাখ একটা ঘোড়ার বিনিময়ে কেনা এই কড়াই। ক্ষুধায় মরতে থাকলে কি এই কড়াইতে পেট ভরবে? এখন পেটের আহার এবং দেহের পোষাকের বদলে তাদের ঘরে ঘরে দেখতে পাবে এইসব কড়াই।’’

‘‘এ ছাড়া আর একটা কথা শুনেছি দাদু, নিম্নমাদ্রদের স্ত্রীলোকেরা না-কি কানে এবং গলায় হলদে আর সাদা গয়না পরতে শুরু করেছে। একটা কানের গহনার দাম না-কি একটা ঘোড়া, ওগুলো তামা নয়, সোনা বলে, আর সাদা-সাদা গুলোকে বলে রুপো।’’

‘‘কেউ মার দেয় না এইসব অধর্মীদের! সারা বক্ষুজনমণ্ডলের সর্বনাশ করে ছাড়বে! আমাদের স্ত্রীরাও ওদের দেখাদেখি দুই ঘোড়ার বিনিময়ে কর্ণকুণ্ডল পড়বে। হে দয়ালু অগ্নি! আর বেশিদিন আমাকে মানুষের মধ্যে রেখনা, পিতৃলোকে নিয়ে চল আমাকে।’’

‘‘আরও একটা গুরুতর পাপ রয়েছে দাদু! নিম্নমাদ্র আর পরশুরা কোনখান থেকে মানুষ ধরে ‍নিয়ে আসে, আর তাদের দিয়ে তামার খাঁড়া, কুড়ুল তৈরী করায়। এরা অত্যন্ত দক্ষ শিল্পী দাদু। কিন্তু নিম্নমাদ্র আর পরশুরা এদের যখন খুশি পশুর মতো বেচে দেয়, আবার দরকার মতো নিজেদের কাছে রাখে। ক্ষেতের কাজ, কম্বল বোনার কাজ, আরও অন্যান্য নানা রকমের কাজ এইসব ধরে আনা লোকদের দিয়ে করায়। এদের দাস বলা হয়।’’

‘‘মানুষ কেনা-বেচা! কিন্তু আমরা তো খাবার, পোষাক বেচাও অন্যায় মনে করতাম। আমাদের পূর্বপুরুষরা ভাবতেও পারেনি, যে এই মাদ্র কলঙ্ক এত দূর নীচে নেমে যাবে। আঙ্গুলে ‍যদি পচ ধরে তো তার ওষুধ হল তাকে কেটে ফেলা; না হলে সমস্ত শরীরটাই পচে যাবে। এই মাদ্র-পরশুদের বক্ষুতটে থাকতে দেওয়া পাপ বাছা। আমি আর বেশিদিন এ সব দেখবার জন্যে বেঁচে থাকব না।’’

মাদ্র দাদুর কথাবার্তা বড়ই মনোরঞ্জক ছিল, কিন্তু পুরুহুতের এও বোঝবার ক্ষমতা ছিল যে নতুন হাতিয়ার সৃষ্ট হয়েছে,তাকে ত্যাগ করে মানব এবং পশুর শত্রুতার মাঝে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তৃতীয় দিনে যখন পুরুহুত বিদায় নিতে গেলে তখন বৃদ্ধ তার ললাট এবং ভ্রু চুম্বন করে তাকে আর্শীবাদ করল। রোচনা বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল তাকে এবং বিদায়ের মুহুতের্ একে অপরের দুই গণ্ডকে অশ্রুসিক্ত করে দিল।

 

তিন

মাদ্র দাদুর কথাই সত্য প্রমাণিত হল, যদিও তা পঁচিশ বছর পর। নিম্নমাদ্র এবং পরশুরা দিনের পর দিন ওপরের বাসিন্দা পুরু আর উত্তর মাদ্রদের দাবিয়েই চলল। এই ওপরের বাসিন্দা জনগণের মধ্যে কাপড়, কম্বল-বোনা স্ত্রী-পুরুষ সবাই স্বাধীন; এদের খাওয়া পরায় বেশী খরচ লাগে, এবং তার ফলে তাদের হাতে বোনা দ্রব্য সুক্ষ্ম হলেও বেশী দামের হয়, কিন্তু নিচের মাদ্র আর পরশুদের কাছে ক্রীতদাস; যাদের তৈরী জিনিস ভালো না হলেও দামে সস্তা।

সেখানকার ব্যবসায়ীরা যখন এইসব জিনিস উট অথবা ঘোড়ার পিঠে বোঝাই করে দেশে দেশে নিয়ে যেত, তখন সেগুলো যথেষ্ট বিক্রী হত। ওপরের বাসিন্দাদের কাছেও এখন তামার জিনিস অধিকতর সংখ্যায় প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। একে তো ওগুলো বছর বছরই সস্তা হয়ে পড়ছিল, দ্বিতীয়ত মাটি-কাঠের জিনিস থেকে ওগুলা দীর্ঘস্থায়ী।

পঁচিশ বছর আগে যেখানে তামার কড়াই ব্যবহৃত হয় না। সোনা-রুপার ব্যবহারও অনেক বেড়েছে। আর এই সবের বিনিময়ে জনসাধারণকে তার আহার্য, কম্বল, চামড়া, ঘোড়া অথবা গরু বেচতে হচ্ছে, ফলে তাদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে পড়ছিল। ওপরের বাসিন্দা কিছু লোক নিজেরাই ব্যবসা করার চেষ্টা করছিল, কেননা তাদের সন্দেহ হচ্ছিল যে, নীচের পড়শীরা তাদের ঠকিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু বক্ষুর নীচে যাবার রাস্তা নীচের অধিবাসীদের আবাসভূমির ভিতর দিয়েই গিয়েছে এবং তারা এ রাস্তার যাতায়াত করতে দিতে চায়নি। এই নিয়ে ছোটো-খাটো ঝগড়াও হয়ে গেছে। অনেক বারই উত্তর-মাদ্র এবং পুরুরা বাইরের দেশসমুহে যাবার অন্য রাস্তা বের করতে চেয়েছে, কিন্ত ‍তাতে তারা সফল হয়নি।

ওপরের আর নীচের উপত্যকার মধ্যে এই সংঘর্ষে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যে, নীচের লোকেরা নিজেদের মধ্যে প্রয়োজনীয় একতা বজায় পারতা না; ওপরের অধিবাসীরা একতাবদ্ধ হয়ে আক্রমণ, প্রতি আক্রমণ চালাতে পারত। এইসব যুদ্ধে আপর বীরত্ব এবং বুদ্ধিমত্তার জন্যে পুরুহুত নিজ গোষ্ঠীর প্রিয়পাত্র ছিল, আর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সেই সে পুরু-গোষ্ঠী কর্তৃক গোষ্ঠী-নেতা নির্বাচিত হয়েছিল। পুরহুত পরিষ্কার বুঝেছিল যে, নিম্ন মাদ্রদের এই অন্যায় ব্যবসা যদি বন্ধ না করা যায় তো উপরবাসীদের কোনো কিছুই আশা নেই আর। তামার ব্যবহার কমে যাবার বদলে দিন দিন বেড়েই চলেছিল।

হাতিয়ার, বাসনপত্র বা গয়নাতেই শুধু নয়, লোকে এখন বিনিময়ের কাজেও মাংস বা কম্বল বয়ে নিয়ে যাবার বদলে তামার তলোয়ার বা ছুরি নিয়ে যাওয়াই বেশী পছন্দ করছে। নিজ গোষ্ঠীর বৈঠকে পুরুহুত তাদের দুঃখের কারণ বিশ্লেষণ করে দেখাল যে, তার মূলে রয়েছে নিম্ন মাদ্রদের অন্যায় ব্যবসা। সকলেই এ বিষয়ে একমত হল যে, পথের কাঁটা মাদ্রদের সরিয়ে না দিলে তাদের হাতে খেলার পুতুল হয়ে থাকতে হবে। হয়ত বা এমন দিন আসবে যখন তাদের পরশু ও নিম্নমাদ্রদের দাসে পরিণত হতে হবে—পুরু এবং উত্তর মাদ্রের নেতৃবৃন্দের মিলিত বৈঠক এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হল।

দুই গোষ্ঠী সম্মিলত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পুরুহতকে সম্মিলিত বাহিনীর সেনাপতি নির্বাচিত করল এবং তাকে ইন্দ্র উপাধীতে ভূষিত করল। এইভাবে পুরুহুতই প্রথম ইন্দ্র হল। প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে পুরুহুত সেনাবাহিনী গঠন করতে লাগল। ইন্দ্র হয়েই সে অস্ত্র নির্মান-ব্যবস্থার জন্য দু‘জন দাস লৌহ-কারিগরকে আপনার আশ্রয়ে এনে রাখল। ওপরের বাসিন্দারা তাদের সঙ্গে খুব ভালভাবে কথাবার্তা বলতে লাগল, আর তাদের সহায়তায় নিজেরা লৌহ-শিল্পী হয়ে উঠল।

তাদের প্রতিবেশীরা নিজেদের লোহার দাসদের ফিরিয়ে দেবার কথাই শুধু বলল না, লড়াইও করবে বলল। কিন্তু নীচের অধিবাসীদের মধ্যে ব্যবসায়ের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যোদ্ধা-সুলভ পরাক্রম কমে এসেছিল। লড়াইতে সফল হতে না পেরে তারা তামা দেওয়া বন্ধ করে দিল। কিন্তু শিগগিরই তারা বুঝতে পারল যে এতে করে তাদের ব্যবসা মাটি হয়ে যাচ্ছে। এদিকে উত্তর মা্দ্র আর পুরুরা আগের কেনা কড়াই এবং অন্যান্য বাসনপত্র থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় অন্য এক পুরুষ ধরে সরবরাহ করতে সক্ষম ছিল।

অবশেষে ইন্দ্র এবং তার দুই গোষ্ঠী, নিম্নমাদ্র ও পুরশুদের ধ্বংশ করার সংকল্প গ্রহণ করল, পুরুহুত স্বয়ং লৌহকারের কাজ শিখেছিল, এবং তার উপদেশ মতো খড়গ, ভল্ল এবং বাণ-ফলকের কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। বলিষ্ঠ এবং কুশলী যোদ্ধাদের শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করবার জন্য বহু তামার ঢাল তৈরী করিয়েছিল। ইন্দ্র ঠিক করল যে, প্রথমে শুধু এক শত্রুকে আত্রমণ করা হবে, আর সেই আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে পরশুদেরই বেছে নিল সে!

শীতের দিনে পরশুরা অধিক সংখ্যায় ব্যবসা উপলক্ষে বাইরে চলে যেত। ইন্দ্র এই সময়টাকেই সবচেয়ে সুবিধাজনক মনে করল। উত্তর মাদ্র এবং পুরুগণ যোদ্ধাবৃন্দকে রণকৌশল শেখাল। যদিও পরশু আর উত্তর মাদ্রদের সঙ্গে শত্রুতা বহুদিন ধরেই চলে আসছিল, কিন্তু তারা বুঝতেই পারেনি যে এমন আচম্‌কা তাদের ওপর শত্রুর এমন এক ভয়ঙ্কর আক্রমণ আরম্ভ হবে যে বক্ষু উপত্যকা থেকে তাদের নাম পর্যন্ত মুছে যাবে। ইন্দ্র স্বয়ং তার নেতৃত্বে বাছাই করা উত্তর মাদ্র আর পুরু যোদ্ধাদের নিয়ে আক্রমণ করল।

যুদ্ধের উদ্দেশ্য বুঝতে পরশুদের দেরি হল না, এবং বুঝবার পর তারা প্রাণপণ বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করল। কিন্তু সেই দ্রুত আক্রমণের মুখে তার সমস্ত পরশু গ্রাম একসঙ্গে যুদ্ধ করতে সক্ষম হল না। ইন্দ্রের সৈন্যরা একের পর এক গ্রাম অধিকার করে হাজার হাজার পরশুকে হত্যা করল—কাউকেই বন্দী করে রাখল না। এদিকে নিচের মাদ্ররা যখন সঙ্কটকে উপলব্ধি করতে পারল, তখন আর সময় নেই। পরশুদের কয়েকটি মাত্র গ্রাম অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। তাদের জন্য কিছু সৈন্য রেখে পুরুহুত কুরু-ভূমি তে চলে এল। নিম্ন মাদ্ররা পাল্টা আক্রমণ করল, কিন্তু তাদেরও পরশুদের দশা হল। নিম্নমাদ্র এবং পরশুদের যে কোনো লোক-শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ হাতের কাছে এল তাকেই ওরা মেরে ফেলল।

স্ত্রীলোকদের আপন স্ত্রীদের সঙ্গে সামিল করে নিল। অধিকৃত দাসদের মধ্যে যারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইল,তাদের ফিরে যেতে দেওয়া হল, কিছু নিম্নমাদ্র এবং পরশু স্ত্রী-পুরুষ প্রাণ বাঁচিয়ে বক্ষু-উপত্যকা ছেড়ে পশ্চিমের দিকে চলে যায়। তাদের বংশধরেরাই পরে পরশু(পার্সিয়ান) এবং মাদ্র (মিডিয়ান) নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। এদের পূর্বপুরুষদের ওপর ইন্দ্রের নেতৃত্বে যে অত্যাচার হয়েছিল, তা এরা ভুলতে পারেনি। এই জন্য ইরানীরা ইন্দ্রকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করে। সমগ্র বক্ষু উপত্যকা উত্তর মাদ্র ও পুরুদের হাতে এসেছিল। বক্ষুর দক্ষিণ এবং বাম তট আপোষে ভাগ করে নিল এই দুই দল। বক্ষুবাসীগণ প্রাণপনে চেষ্টা করছিল নতুনকে সরিয়ে পুরনো ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করবার, কিন্তু এরা তামা ছেড়ে পাথরের হাতিয়ারের প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারেনি।

তামার জন্য বক্ষুর পাহাড়ী উপত্যকার বাইরে ব্যবসা বিস্তার করা একান্ত প্রয়োজনীয় ছিল—বিজয়ী পুরু এবং উত্তর মাদ্রদের। কিন্তু দাসত্বকে তারা কখনোই মেনে নেয়নি, এবঅং বাইরের লোককে কখনও বক্ষু উপত্যকায় স্থায়ী অধিবাসী হয়ে দেয়নি। বহু শতাব্দী পরে যখন ইন্দ্র পুরুহুতকেও লোকে ভুলতে আরম্ভ করল অথবা তাকে দেবতার রুপে কল্পনা করতে লাগল, তখন এতটা বংশবৃদ্ধি হয়ে গেছে যে সকলের ভরণ-পোষণ করতে আর বক্ষু উপত্যকা সক্ষম নয়। এ জন্য তার বহু অধিবাসীকেই বাধ্য হয়ে দক্ষিণের দিকে চলে যেতে হল।

আগে এক গোষ্ঠী অপরের থেকে স্বতন্ত্র হয়ে থাকত, মহাপিতরের প্রাধান্য থাকলেও তার সব কিছুই জনতার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু বক্ষুতটের শেষ-সংঘর্ষ একাধিক গোষ্ঠীর এক সেনাপতি ইন্দ্রকে জন্ম দিয়েছিল।’’


 ভোলগা থেকে গঙ্গা

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top