নারী

হুমায়ুন আজাদ

৩৮. পুরুষতন্ত্র ও রোকেয়ার নারীবাদ (২য় পর্ব)

[দ্বিতীয় পর্ব]

পদ্মরাগ-এর সকিনা- লতিফকে বিদ্রুপ করে বলেছে, ‘খোদাতালার সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব পুরুষ হইয়াছেন, ইহা অপেক্ষা আর কি বাঞ্ছনীয়’ (রোর, ৩৫২)? এক বাক্যে তিনি কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরুষ ও তার স্রষ্টাকে। পুরুষকে বলেছেন প্রতারক : বহুকাল হইতে পুরুষ নারীকে প্রতারণা করিয়া আসিতেছে, আর নারী কেবল নীরবে সহ্য করিয়া আসিতেছে’ (রোর, ২৭৮)। বলেছেন, ‘কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য। (‘ডেলিশিয়া-হত্যা’, রোর, ১৬২); যদি স্বার্থপরতা, ধূর্ততা ও কপটাচারকে সদগুণ বলা যায়, তবে অবশ্য পুরুষজাতি কুকুরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ’ (রোর, ১৭০)! পুরুষ তাঁর চোখে অলস, বলেছেন : ‘অলসেরা অতিশয় বাকপটু হয়’ (‘সুলতানার স্বপ্ন’, রোর, ১৩৫)।

রোকেয়া তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে পুরুষদের রেখেছেন, তাদের সম্পূর্ণ বহিষ্কার করেন নি; হয়তো তিনি ভেবেছেন। পুরুষদের অন্তত একটি উপযোগিতা রয়েছে; কিন্তু সাম্প্রতিক প্ৰজননবিজ্ঞানের কথা যদি তিনি কল্পনা করতে পারতেন, ভাবতে পারতেন যদি কোনো ‘সাহসী নতুন বিশ্ব’-এর কথা, তাহলে হয়তো তিনি পুরুষ প্ৰজাতিটিকেই বাতিল ক’রে দিতেন। তিনি আদর্শ রাষ্ট্রে পুরুষ রেখেছেন, কিন্তু তাদের বন্দী করেছেন অবরোধে। নারীস্থানে রাস্তায় কেনো পুরুষ নেই, জানতে চায় সুলতানা। সারা তাকে জানায়, ‘এ দেশে পুরুষজাতি গৃহাভ্যন্তরে অবরুদ্ধ থাকে’ (‘সুলতানার স্বপ্ন’, রোর, ১৩৬); এতে পরম তৃপ্তি পেয়েছে সুলতানা : ‘আমি প্রাণে বড় আরাম পাইলাম;-পৃথিবীতে অন্ততঃ এমন একটি দেশও আছে, যেখানে পুরুষজাতি অন্তঃপুরে আবদ্ধ থাকে’ (রোর, ১৩৬)!

তাদের জন্যে তিনি তৈরি করেছেন ‘জেনানা’র প্রতিরূপ মর্দানা’। সেখানকার ভাষা বিপরীত ধরনের লিঙ্গবাদী, বাঙলায় ‘নারীভাবাপন্ন বলতে যা বোঝায়, নারীস্থানে তা বোঝায় ‘পুরুষভাবাপন্ন’ শব্দে, যার অর্থ ‘পুরুষের মত ভীরু ও লজ্জানম্র’ (রোর, ১৩৪)। তার কাছে পুরুষ বন্য জন্তু, বদ্ধ পাগল; তাই নারী ‘নিরাপদ নহে,-যতদিন পুরুষজাতি বাহিরে থাকে’ (রোর, ১৩৬)! সারা বলেছে, তাহারা (পুরুষেরা) কোন ভাল কাজের উপযুক্ত নহে (রোর, ১৩৮)।

তিনি পুরুষদের নিয়োগ করেছেন নিম্নপদ ও পেশায় : ‘তাহারা (পুরুষেরা) কেরানী মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন’ (রোর, ১৪৯)। নারীস্থান যে কল্যাণময়, তার কারণ পুরুষ-শয়তানেরা সেখানে অবরুদ্ধ; সুলতানা বলেছে, আপনার স্বয়ং শয়তানকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, আর দেশে শয়তানী থাকিবে কিরূপে (রোর, ১৪৭)। রোকেয়া চান না যে তাঁর একটি তীরও ব্যৰ্থ হোক; তাই তিনি পাদটীকায় ‘শয়তানকে’ কথাটি ব্যাখ্যা ক’রে দিয়েছেন ‘পুরুষ জাতিকে’ বলে।

কিন্তু রোকেয়া নারীর জন্যে চেয়েছেন অপদাৰ্থ নির্বোধি দুশ্চরিত্র পাপিষ্ঠ শয়তান পাশবিক পুরুষেরই সমকক্ষতা। এটা কোনো শিশ্নাসূয়াগ্ৰস্ততা বা পুংগূঢ়ৈষ্যা নয়, এটা একটি হারানো শিশ্ন ফিরে পাওয়ার ফ্রয়োড়ীয় রোগ নয়; এটা নারীর পূর্ণ অধিকার লাভ। তিনি পুরুষকে ঈর্ষা করেন নি, ঈৰ্ষা করেছেন। পুরুষের স্বাধীনতা ও অধিকারকে; বলেছেন, ‘একই সঙ্গে সকলে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হও…।

স্বাধীনতা অর্থে পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা বুঝিতে হইবে …পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব’ (স্ত্রীজাতির অবনতি’, রোর, ২৯)। পুরুষের সাথে সমকক্ষতার ব্যাপারটি তিনি ব্যাখ্যা ক’রে দিয়ে কোনো ফ্রয়েডীয় অপবিজ্ঞানের অপব্যাখ্যার সম্ভাবনা নষ্ট করে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমাদের উন্নতির ভাব বুঝাইবার জন্য পুরুষের সমকক্ষতা বলিতেছি। নচেৎ কিসের সহিত এ উন্নতির তুলনা দিব? পুরুষের অবস্থাই আমাদের উন্নতির আদর্শ (রোর, পাদটীকা, ২৯)।

রোকেয়া চেয়েছেন পুরুষের সাথে সম্পূর্ণ সাম্য; তাঁর কাছে নারীপুরুষ লিঙ্গগতভাবে ভিন্ন, কিন্তু উভয়ই মানুষ, এবং উভয়ের জীবনেরই লক্ষ্য ও সার্থকতা এক : ‘পুরুষদের স্বাৰ্থ এবং আমাদের স্বাৰ্থ ভিন্ন নহে- একই। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাই’ (রোর, ৩১)। তিনি নারীর অধীনতার মূল কারণ হিশেবে, প্রাচীন থেকে আধুনিক কালের অন্যান্যের মতোই, ধরেছেন শারীরিক দুর্বলতাকে : শারীরিক দুর্বলতাবশতঃ নারীজাতি অপর জাতির সাহায্যে নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ ‘প্ৰভু!’ হইতে পারে না’ (অর্ধাঙ্গী’, রোর, ৪৩)।

‘অপর জাতি’ কথাটি লক্ষ্য করার মতো; পুরুষ যেনো একটি ভিন্ন ও বিরোধী জাতি নারীর থেকে। তিনি শারীরিক শক্তির উপকারিতা বুঝেছেন, কিন্তু তাকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড ব’লে স্বীকার করেন নি; তার কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড মানসিক শক্তি। তিনি নারীর জন্যে চেয়েছেন মানসিক শক্তি, যা অর্জনের উপায় হচ্ছে শিক্ষা : ‘আমরা পুরুষের ন্যায় সুশিক্ষা অনুশীলনের সম্যক সুবিধা না পাওয়ায় পশ্চাতে পড়িয়া আছি। সমান সুবিধা পাইলে আমরাও কি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে পারিতাম না? আশৈশব আত্মনিন্দ শুনিতেছি, তাই এখন আমরা অন্ধভাবে পুরুষের শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করি এবং নিজেকে অতি তুচ্ছ মনে করি (রোর, ৪৩-৪৪)।

পুরুষতন্ত্রের তৈরি এক ঐশী ভাবাদর্শ স্বামী, যা পুরুষকে উত্তীর্ণ করেছে নারীর বিধাতার স্তরে। হিন্দু নারীরা স্বামীকে পুজো করে, হিন্দু নারীর জন্যে স্বামী ছাড়া আর কোনো প্ৰভু নেই; মুসলমান নারীর বেহেস্তও স্বামীর পদতলে, এবং হাদিসে আছে আল্লা ছাড়া আর কাউকে সেজদা করার বিধান যদি থাকতো, তাহলে নারীকে নির্দেশ দেয়া হতো স্বামীকে সেজদা করার।  বাঙলায় ‘স্বামী’ শব্দ ও ধারণাটি এখন অশ্লীল হয়ে উঠেছে, এটা এখন পরিহার্য শব্দগুলোর একটি; রোকেয়া অনেক আগেই বাতিল করেছিলেন ‘স্বামী’ ধারণাটি।

এটিকে বাতিল করার অর্থ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের একটি বড়ো মন্দির ধ্বংস করা। রোকেয়া বলেছেন, ‘তাঁহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্ৰমে আমাদের স্বামী হইয়া উঠিলেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশুপক্ষীর অন্তর্গত অথবা মূল্যবান সম্পত্তি বিশেষ হই। পড়িয়াছি (রোর, ১৮-১৯)! তিনি দাবি করেছেন নারী দাসীত্ব করে, তবে পুরুষও প্রেমবশত একধরনের দাসত্ব করে, কিন্তু পুরুষকে ‘দাস’ বলা হয় না।

তিনি প্রশ্ন করেছেন, সমাজ তবু বিবাহিত পুরুষকে ‘প্রেম-দাস’ না বলিয়া স্বামী বলে কেন’ (রোর, পাদটীকা, ১৯)? ‘স্বামী’ তাঁর কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দ; প্রশ্ন করেছেন, শ্ৰীমতীগণ জীবনের চিরসঙ্গী শ্ৰীমানদিগকে ‘স্বামী’ ভাববেন কেন’ (রোর, ৪৩)? তিনি এ-শব্দটি বাতিল ক’রে প্রস্তাব করেছেন একটি নতুন শব্দ : ‘আশা করি এখন ‘স্বামী’ স্থলে ‘অর্ধাঙ্গ’ শব্দ প্রচলিত হইবে’ (রোর, ৪৪)।

রোকেয়া প্রথাগত ছকবাঁধা ‘নারীভাবমূর্তি বা ‘স্টেরিঅটাইপ’ স্বীকার করেন নি; তিনি ওই ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে তা বর্জন করেছেন। নারী হবে সীতা বা রহিমা, হবে মর্ষকামিতার উদাহরণ, পুরুষতন্ত্র তৈরি করেছে এমন ধারণা; তিনি তা বাতিল করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, ‘এ দেশের গ্রন্থকারেরা নারী চরিত্রকে নানা গুণ ভূষায় সজ্জিত করেন বটে; বেশীর ভাগে অবলা হৃদয়ের সহিষ্ণুতা বর্ণনা করা হয় (কারণ রমণী পাষাণ প্ৰায় সহিষ্ণু না হইলে তাহার প্রতি অত্যাচারের সুবিধা হইত না যে!)’ (‘ডেলিশিয়া-হত্যা’, রোর, ১৫৫)। পুরুষতন্ত্র নারীকে ক’রে তুলেছে মর্ষকামিতার উদাহরণ, সে-নারীই পুরুষতন্ত্রের প্রশংসিত যে সহ্য করে অসহ্য পীড়ন; কিন্তু রোকেয়া তা মানেন নি। তিনি (রোর, ৩৬-৩৭) বলেছেন :

‘নারীকে শিক্ষা দিবার জন্য গুরুলোকে সীতা দেবীকে আদর্শরূপে দেখাইয়া থাকেন।… পুতুলের সঙ্গে কোন বালকের যে-সম্বন্ধ, সীতার সঙ্গে রামের সম্বন্ধও প্রায় সেইরূপ।… রামচন্দ্ৰ ‘স্বামিত্বের’ ষোল আনা পরিচয় দিয়াছেন!! আর সীতা?–কেবল প্ৰভু রামের সহিত বনযাত্রার ইচ্ছা প্ৰকাশ কবিয়া দেখাইয়াছেন যে, তাহারও ইচ্ছা প্ৰকাশের শক্তি আছে।‘

তিনি সীতার এক প্রতিরূপ তৈরি করেছেন পদ্মরাগ-এ, যার নাম সিদ্দিকা। রামায়ণ-এ রাম ত্যাগ করেছিলো সীতাকে, পদ্মরাগ-এ নেয়া হয় তার প্রতিশোধ : সিদিকা ত্যাগ করে স্বামীকে। সমগ্ৰ নারীসমাজের পক্ষে প্ৰতিশোধ নেয়ার জন্যে কয়েক হাজার বছরের প্রস্তুতি নেয় একটি নারী, তাকে সৃষ্টি করেন রোকেয়া, তার নাম সিদ্দিকা। রোকেয়ার পদ্মরাগ, অসাধারণ উপন্যাস নয়, কিন্তু এতেই ঘটে এক অসাধারণ ঘটনা : এই প্রথম পূর্ব দেশের এক নারী পরিত্যাগ করে পুরুষকে, তার স্বামীকে। সিদ্দিকা বলেছে (রোর, ৪৫৩) :

‘আমি যদি উপেক্ষা লাঞ্ছনার কথা ভুলিয়া গিয়া সংসারের নিকট ধরা দিই, তাহা হইলে ভবিষ্যতে এই আদর্শ দেখাইয়া দিদিমা ঠাকুমাগণ উদীয়মানা তেজস্বিনী রমণীদের বলিবেন, ‘আর রােখ তোমার পণ ও তেজ- ঐ দেখ না, এতখানি বিড়ম্বনার পরে জয়নব আবার স্বামী-সেবাই জীবনের সার করিয়াছিল।’

 

আর পুরুষ-সমাজ সগৰ্বে বলিবেন, ‘নারী যতই উচ্চশিক্ষিতা, উন্নতমনা, তেজস্বিনী, মহীয়সী, গবীয়সী হউক না কেন,- ঘুরিয়া ফিরিয়া আবার আমাদের পদতলে পড়িবেই পড়িবে!’ আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। পক্ষান্তরে আমার এই আত্মত্যাগ। ভবিষ্যতে নারীজাতির কল্যাণের কারণ হইবে বলিয়া আশা করি।‘

সিদ্দিকা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তার অতীতের, বর্তমানের, ভবিষ্যতের সমস্ত সমস্ত নারীর পক্ষে। সে দেখিয়েছে ‘একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহেঃ সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে।’ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ ও পদক্ষেপ সমগ্র বাঙলা সাহিত্যে দুর্লভ; সিদ্দিকা শুধু মনে করিয়ে দেয় ইবসেনের নোরাকে। লতিফ জানতে চেয়েছে, ‘সিদ্দিকী, স্পষ্ট বল, তুমি আমার গৃহিণী হইবে কি না?’

সিদিক বলেছে, ‘না। তুমি তোমার পথ দেখ, আমি আমার পথ দেখি’ (রোর, ৪৫৯)। সিদ্দিকা নিষ্ঠুর নয়, সে যেমন বিবাহবিচ্ছেদ চায় নি, তেমনই চায় নি স্বামীর পায়ের নিচে বেহেস্তও। সিদ্দিকা হয়ে উঠেছে বিশ্বপুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীতন্ত্রের কণ্ঠস্বর, এবং সে শুধু কথা বলে নি, বাস্তবায়িত করেছে নিজের লক্ষ্য। সমগ্ৰ নারীজাতির দায়ভার সে তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে।

রোকেয়া কোনো মধুর মোহ জাগিয়ে রাখতে চান নি, পাঠকের মনে এমন কোনো রোম্যানটিক ভাববিলাস লালনের সুযোগ রাখেন নি যে পরে কোনো দিন মিলন ঘটবে সিদ্দিকা আর লতিফের। উপন্যাসের শেষবাক্য দুটি যেমন মানবিকতায় কোমল, তেমনই বিদ্রোহে নির্মম; লতীফ সিদ্দিকার হাত ধরিয়া গাড়ি হইতে নামাইলেন। এই তাহাদের শেষ দেখা’ (‘রোর, ৪৬৮)। সিদ্দিকা নোরার থেকেও কঠোর।

নারীর পুরুষাধীনতার দুটি প্রধান কারণ : শরীর ও অর্থনীতি। রোকেয়া বিশ্বাস করেছেন। পুরুষ নারীকে প্রথমে শারীরিক শক্তিতে পরাভূত ক’রেই বন্দী করেছে, শেষে নারীকে আর্থনীতিক এলাকা থেকে বের করে দিয়ে ক’রে তুলেছে অসহায়। শারীরিক শক্তিতে নারী কখনো পুরুষের সমান হবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেছেন, তার দরকার আছে ব’লেও মনে করেন নি। কিন্তু যদি প্রতিষ্ঠিত হয় আর্থনীতিক সাম্য, তাহলে ঘুচিবে নারীর পুরুষাধীনতা।

তাই তিনি দাবি করেছেন নারীর আর্থ স্বাধিকার। তিনি বলেছেন, ‘পুরুষের উপার্জিত ধন ভোগ করে বলিয়া নারী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করে। কথাটা অনেক পরিমাণে ঠিক। বোধ হয়, স্ত্রীজাতি প্ৰথমে শারীরিক শ্ৰমে অক্ষম হইয়া পরের উপার্জিত ধনভোগে বাধ্য হয় এবং সেইজন্য তাহাকে মস্তক নত করিতে হয়’ (রোর, ২৮)। নারীর মুক্তির উপায় আর্থ স্বনির্ভরতা লাভ : ‘যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব।’ (রোর, ২৯-৩০)। তিনি জানেন যে নারী কম পরিশ্রম করে না, তবে তার পরিশ্রমের কোনো আর্থ মূল্য নেই। স্বামীর সংসারে নারী বেতনাহীন দাসী।

তিনি বলেছেন, ‘উপার্জন করিব না কেন?…যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামী’র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না’ (রোর, ৩০)? কোনো পেশাই তার কাছে উপেক্ষণীয় নয়; বলেছেন, ‘আমরা যদি রাজকীয় কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব। ভারতে বর দুর্লভ হইয়াছে বলিয়া কন্যাদায়ে কাদিয়া মারি কেন’ (রোর, ৩০)? তিনি উচ্চারণ করেছেন নারীমুক্তির এক চরম বাণী (রোর, ৩০) :

কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কাৰ্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের অন্নবস্ত্ৰ উপাৰ্জন করুক।

কিন্তু আজো কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিত করা হয় নি; আর যাদের করা হয়েছে তারা কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতার থেকে পছন্দ করে শুভবিবাহেম শেকল। পুরুষতন্ত্রকে বহুমুখি আক্রমণে বিপর্যস্ত করে রোকেয়া প্ৰতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর নারীতন্ত্র। নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন নারীস্থান, এবং পুরুষকে অবরুদ্ধ করেছেন গৃহের ভেতরে (পুরুষের প্রয়োজন কেনো তা তিনি স্পষ্ট করে বলেন নি), বদলে দিয়েছেন পুংলিঙ্গবাদী ভাষার স্বভাব, বার বার লিখেছেন ইউটোপিয়াঅ্যান্টি-ইউটোপিয়া (বা ডিস্টোপিয়া)।

নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সার্বিক উদ্যোগ নিয়েছেন রোকেয়া Sultana’s Dream (১৯০৫) বা সুলতানার স্বপ্ন’-এ।  ইউটোপীয়  ভাবনাকল্পনার মূলে থাকে বিশেষ ধরনের সমাজ, ওই বিকৃত সমাজের চরম সংশোধন সম্পন্ন করা হয় ইউটোপিয়ায়। অরওয়েল বলেছেন, ‘ন্যায়সঙ্গত সমাজের স্বপ্ন মানুষের কল্পনাকে যুগে যুগে দুৰ্মরভাবে আলোড়িত করেছে, তাকে আমরা স্বৰ্গরাজ্য বলতে পারি বা বলতে পারি শ্রেণীহীন সমাজ, বা তাকে মনে করতে পারি অতীতের কোনো স্বর্ণযুগ, যা থেকে অধঃপতিত হয়েছি আমরা ‘ [দ্র কৃষাণ কুমার (১৯৮৭, ২)]।

ইউটোপিয়ার উদ্ভববিকাশ ঘটেছে পশ্চিমে, পূর্বাঞ্চলে কেউ। ইউটোপিয়া লেখেন নি; এর একমাত্র ব্যতিক্রম রোকেয়া। অনেকে মনে করেন। পশ্চিমে যতো ইউটোপিয়া লেখা হয়েছে, তার সবই কোনো-না-কোনোরূপে প্লাতোর রিপাবলিক থেকে উৎসারিত, ওগুলো রিপাবলিক-এর পাদটীকা। তবে প্লাতোর অনেক আগেই ইউটোপীয় ভাবনার বিকাশ ঘটেছে ইউরোপে, যার পরিচয় মেলে খ্রিপূ সপ্তম শতকের হেসি-অব্দের ও অর্কস অ্যান্ড ডেইজ-এ।

তিনিই প্রথম কল্পনা করেছিলেন এক স্বর্ণযুগের, যখন মানুষেরা বাস করতো দেবতার মতো, যাদের মন মুক্ত ছিলো সমস্ত দুঃখকষ্ট থেকে, যখন কোনো কাজ ছিলো না, যখন গাছে গাছে ধ’রে থাকতো সুমিষ্ট ফল। অসংখ্য ইউটোপিয়া লেখা হয়েছে, তবে সাহিত্যের এ-আঙ্গিকটি নাম পেয়েছে টমাস মুরের ইউটোপিয়া (১৫১৬) থেকে। মুরের বই থেকে ইউটোপিয়ার চরিত্র বদলে যায়; তিনি একটি শুদ্ধ সমাজের বিধান না দিয়ে তা বাস্তবায়িত করেন তাঁর বইতে।

ইউটোপিয়ায় চিত্রিত হয় উৎকৃষ্টতম সমাজব্যবস্থা, তাকে বিমূর্ত না রেখে ক’রে তোলা হয় মূর্ত। ইউটোপিয়া বর্তমানে প্রচলিত কোনো সমাজের বিদুপাত্মক রূপ নয়, তাতে চিত্রিত হয় একটি সম্পূর্ণ সমাজ। অ্যান্টি-ইউটোপিয়া বা ডিস্টোপিয়ায় চিত্রিত হয় নিকৃষ্টতম সমাজ।

রোকেয়া তার নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে লিখেছেন ইউটোপিয়া ও ডিস্টোপিয়া দু-ই। রোকেয়ার ‘সৌরজগৎ’ সংলাপটিতে আভাস পাওয়া যায় ইউটোপিয়ার : ওই পরিবারে একটি মাত্র পুরুষ, আর সবাই নারী। ওই পরিবারে রয়েছে গৃহিণী ও নটি কন্যা, কোনো ছেলে নেই। সেখানে পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে এসেছে জাফর আলী। বিজ্ঞানের প্রতি রোকেয়ার আকর্ষণ ছিলো, ওই পরিবারের মেয়েরাও বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট; তাদের তিনজন ভর্তি হতে চায় ‘টেকনিকাল স্কুলে’।

রোকেয়াই বোধ হয় এ-অঞ্চলে প্রথম ভাষায় লিঙ্গবাদ ব্যাপারটি উপলব্ধি করেছিলেন। গওহর জাফরকে তিরষ্কার করে, ‘ইহা Womanishness (স্ত্রীভাবে)।’ নূরজাহাঁ এতে প্ৰবল আপত্তি জানিয়ে বলে : ‘Womanish’ শব্দে আমি আপত্তি করি! ভীরুতা’, ‘কাপুরুষতা’ বল না কেন’ (রোর, ১১৬)? পশ্চিমের নারীবাদীদের ভাষিক লিঙ্গবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনেক আগে রোকেয়া এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন; ভাষা থেকে মুছে দিয়েছিলেন। লিঙ্গবাদ। নূরজাহী প্রধান শিক্ষয়িত্রীর প্রশংসা ক’রে বলে, ‘উক্ত শিক্ষয়িত্রীটি অতিশয় ভদ্রলোক’ (রোর, ১১৭)।

ভাষা থেকে লিঙ্গবাদ কমছে, কিন্তু শিক্ষয়িত্রীকে ‘ভদ্রলোক’ বলার অবস্থা আজো আসে নি, তবে রোকেয়া ১৯০৫ সালেই ‘ভদ্রমহিলা’ বাদ দিয়ে ব্যবহার করেছিলেন ‘ভদ্রলোক’। শুধু লিঙ্গবাদ মুছে দিয়েই তিনি তৃপ্তি পান নি, তিনি শুরু করেছিলেন বিপরীত ধরনের লিঙ্গবাদ। ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ সারা সুলতানাকে বলে, আপনি অনেকটা ‘পুরুষভাবাপন্ন।’ রোকেয়া ‘পুরুষভাবাপন্ন’ শব্দের দেন নতুন অর্থ : ‘পুরুষের মত ভীরু ও লজ্জানম্র’ (রোর, ১৩৪)।

বিয়ের ভাষায় প্রকাশ পায় পুরুষের সক্রিয়তা আর নারীর নিষ্ক্রিয়তা; রোকেয়া ওই ভাষারীতিকেও উল্টে দিয়েছেন। ডেলিশিয়ার বিয়েকে তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘সচরাচর বলা হয়, ‘বর কন্যাকে বিবাহ করিল’, কিন্তু এ ক্ষেত্রে বলিতে হইবে, ‘কন্যা বরকে বিবাহ করিলেন। কেননা ডেলিশিয়াই মিঃ কারলীঅনের অন্নবস্ত্ৰ ইত্যাদি যোগাইবার ভার লাইলেন’ (রোর, ১৫৬)!

রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। পুরুষতন্ত্রের বদলে নারীতন্ত্র, পুরুষাধিপত্যের স্থলে নারী-আধিপত্য। তার ডিক্টোপিয়াধর্মী রূপকথাগুলোতে সমাজের দুরবস্থার জন্যে সম্পূর্ণরূপে দায়ী করেছেন তিনি পুরুষদের, যারা তার চোখে সমস্ত দোষের সমষ্টি। তারা অপদাৰ্থ, দায়িত্বহীন, অবিবেচক, মিথ্যাবাদী, এবং সমাজরাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্য। তার ‘জ্ঞানফল’-এ দেশটির নাম কনকদ্বীপ হ’লেও সেটি বসবাসের অযোগ্য: পুরুষেরা সেটি নষ্ট করেছে। রোকেয়া বাইবেলি স্বৰ্গচ্যুতির উপাখ্যানটি ব্যাখ্যা করেছেন নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, এবং ওই পতনই তার কাছে গ্ৰহণযোগ্য, নির্বোধের স্বৰ্গ গ্রহণযোগ্য নয়।

নারী যে আগে নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলো একে তিনি নিয়েছেন নারীর গৌরব হিশেবে, কেননা নারীরই রয়েছে জ্ঞানের প্রতি সহজাত আকর্ষণ : ‘ফল ভক্ষণ করিবামাত্র হাভার জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হইল।. এই সময় তথায় আদম গিয়া উপস্থিত হইলেন। হাভা তাঁহাকে স্বীয় হস্তস্থিত ফল খাইতে অনুরোধ করিলেন। পত্নীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে আদমেরও জ্ঞানোদয় হইল’ (রোর, ১৮০)।

রোকেয়ার বর্ণনায় আদম নির্বোধ পুরুষ, জ্ঞানের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই। ‘পত্নীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে’ কথাটি তাৎপর্যপূর্ণ; রোকেয়া বোঝাতে চান পুরুষ জ্ঞানী নারীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানে। আদম শুধু নির্বোধ, উচ্ছিষ্টভোজীই নয়, সে অমানিবকও; রোকেয়ার হাওয়া তার কন্যাদের বর দিয়ে দীর্ঘায়ু করেছে, কিন্তু আদম- ‘তাঁহার ইচ্ছাশক্তি তাদৃশ প্রবল না থাকায়’- পুত্রদের কোনো বক্স দেয় নি। ওই দ্বীপের পতন ঘটেছিলো পুরুষেরা ‘নারীর আহৃত জ্ঞানে নারীকেই বঞ্চিত করিয়ছিল’ (রোর, ১৮৮) ব’লে।

মুক্তিফল’ও আরেক অ্যান্টি-ইউটোপিয়া, ভোলাপুরেরও পতন ঘটে নারীকে অধিকারহীন ক’রে রাখার ফলে। সেখানে নারীর অধিকারের মাত্রা প্ৰকাশ পেয়েছে ভাই প্ৰবীণের উক্তিতে : ‘না বোন, তোমাকে কৈলাস পর্যন্ত যাইতে দিতে পারি না। তুমি আমার সহিত গল্প কর, উপন্যাস পাঠ কর, আমার সঙ্গে পারমার্থিক গান গাও-এই পর্যন্তই যথেষ্ট, ইহা অপেক্ষা অধিক স্বাধীনতা বা সমকক্ষতা দিতে পারি না’ (রোর, ২:১২)। নারীকে দেয়া হয়েছে গল্প করার. উপন্যাস পড়ার, আর ‘পারমার্থিক গান গাওয়ার স্বাধীনতা; ভোলাপুর যে ভারতবর্ষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই!

পুরুষের সৃষ্ট অ্যান্টি-ইউটোপিয়ার বর্ণনা রোকেয়াকে তৃপ্তি দিতে পারে নি, কেননা সেখানকার নষ্ট সমাজে নারীও অসুস্থ। তাই রোকেয়া পুরুষের সমাজকেই অস্বীকার ক’রে প্রতিষ্ঠা করেন তার নারীস্থান। রোকেয়ার পক্ষে অসম্ভব ছিলো Sultana’s Dream বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ না লেখা; কেননা নারীতন্ত্র বা নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত দেখা ছিলো তার জন্যে অনিবাৰ্য। এজন্যে তাকেই লিখতে হয় বাঙলা ভাষায় প্রথম ও শেষ ইউটোপিয়া; সম্ভবত কোনো এশীয় ভাষায়ও এটিই একমাত্র ইউটোপিয়া

পঁচিশ বছরের এক আমূল নারীবাদী তরুণীর নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ, যা কোমলমধুর। কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষমাহীন নির্মম। রোকেয়া ব্যাপকভাবে নারীস্থানেব সমাজজীবন উপস্থাপিত করেন নি, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করেছেন। পুরুষদের। পুরুষের ওই দেশে কী প্রয়োজন, তা তিনি বলেন নি; তবে প্রতিশোধগ্রহণের জন্যে পুরুষদের অত্যন্ত দরকার ছিলো সেখানে।

রোকেয়া পুরুষজাতিটিকেই বাদ দিতে পারতেন। ওই সমাজ থেকে, কিন্তু তিনি দেন নি; তিনি হয়তো মনে করেছেন সামাজিকভাবে পুরুষ দরকার, তবে তার চেয়ে বেশি দরকার পুরুষপীড়নের জন্যে। রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া; তিনি কোনো আদিম স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেন নি, সৃষ্টি করেছেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞাননির্ভর সমাজ, কেননা বিজ্ঞানই শুধু মুক্তি দিতে পারে নারীকে। রোকেয়া নারীর শারীরিক দুর্বলতা সম্পর্কে ছিলেন সচেতন, তাই কোনো আদিম আর্কেডিয়া তার কাজে আসতো না; তার দরকার ছিলো এমন শক্তি, যা শারীরিক শক্তিকে সহজেই পরাভূত করে।

বিজ্ঞান সে-শক্তি, তাই রোকেয়ার নারীস্থান বিজ্ঞাননির্ভর। রোকেয়ার নারীস্থান তাঁর স্বদেশের বিপরীত : ‘ভারতে পুরুষজাতি প্ৰভু,- তাহারা সমুদয় সুখ-সুবিধা ও প্ৰভুত্ব আপনাদের জন্য হস্তগত করিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর রূপ পিঞ্জরে রাখিয়াছে’ (রোর, ১৩৭)! তিনি তার নারীস্থান থেকে মুছে ফেলেছেন ভারতবর্ষের সমস্ত সামাজিক ব্যাধি। ‘সুলতানার স্বপ্ন রোকেয়ার নারীতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ের ও পুরুষতন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়ের কাহিনী।

যে-পুরুষতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই করেছেন রোকেয়া, তার সাথে কি তিনি কিছুটা সন্ধি করেছিলেন কখনো কখনো? পিতৃতন্ত্রের সাথে সন্ধির কিছুটা পরিচয় রয়েছে তাঁর রচনাবলিতে। পিতৃতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থাটির সাথে, সম্ভবত বাধ্য হয়ে, তিনি সন্ধি করেছেন মাঝেমাঝে; কিন্তু খুব বেশি ছাড় দেন নি সেটিকে। চব্বিশ বছর বয়সে তিনি প্ৰচণ্ড আক্রমণ করেছিলেন ধর্মকে, ওই আক্রমণের পরেও যে তিনি টিকে ছিলেন তার কারণ তখন পরিবেশ ছিলো ভিন্ন: আজ হ’লে রাস্তায় তার লাশ পাওয়া যেতো, বা তিনি নিন্দিত জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন নির্বাসনে।

তার ওপর নিশ্চয়ই পড়েছিলো মুসলমান পিতৃতন্ত্রের প্রবল চাপ। তিনি বুঝেছিলেন টিকে থাকতে হ’লে কিছুটা সন্ধি পাতিয়ে নিষ্ক্রিয় ক’রে দিতে হবে পিতৃতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থাটিকে। তিনি মাঝেমাঝে ধর্মকর্মের কথা বলেছেন, কিন্তু প্রথাগত ধর্মে তার অন্ধ আস্থা ছিলো না। তার নারীস্থানেও ধর্ম আছে : সেখানে ‘ধর্মবিধান’ হচ্ছে ‘প্রেম ও সত্য’, যা খুবই প্রথাবিরোধী। তিরিশোত্তর রোকেয়া ধর্মের কথা কিছু বলেছেন, এবং অবরোধবাসিনীদের ভয়াবহ জীবন আঁকার পাশাপাশি অবরোধের পক্ষেও বলেছেন কিছু কথা। শুনে স্তম্ভিত বোধ করি যখন অবরোধবাসিনীর রোকেয়া বলেন, ‘আমি অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হই নাই’ (অর্ধাঙ্গী’, রোর, ৩৫)!! নিশ্চয়ই বড়ো একটা চাপের মধ্যে পড়েছিলেন তিনি তখন।

পিতৃতন্ত্রের সাথে বেশ কিছুটা মিটমাটের উদাহরণ ‘বোরকা’ প্ৰবন্ধটি তিনি এতে যে শিকার হয়েছেন স্ববিরোধিতার, তা নিজেও বুঝেছেন; তাই আত্মসমর্থনের যে-চমৎকার প্রতিভা ছিলো তাঁর, তা তিনি প্রয়োগ করেছেন পুরোপুরি। তিনি বলেছেন, ‘তাহারা প্রায়ই আমাকে ‘বোরকা’ ছাড়িতে বলেন। বলি, উন্নতি জিনিসটা কি? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিরেই থাকে? যদি তাই হয় তবে বুঝিবে যে জেলেনী, চামারনী, কি ডুমুনী প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে’। (‘বোরকা’,রোর, ৫৬)? বোরকা জিনিশটি কুৎসিত, মধ্যযুগীয় পিতৃতন্ত্র এটি চাপিয়ে দিয়েছে নারীর ওপর, এটা তার বোঝার কথা; তবু তিনি এর পক্ষে কথা বলেছেন।

তিনি কি মনে করেছিলেন যে নারী উন্নতি করবে। বোরকার ভেতরে থেকেই? তা কি হবে না নারীর জন্যে চরম গ্লানিকর? অবরোধ প্রথার উদ্ভব ঘটে নারী সম্পর্কে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ইসলামি ধারণা থেকে যে নারী হচ্ছে ‘ফিৎনা’। ইসলামি বিশ্বাস হচ্ছে যে নারীর কাম প্রবল, তা নষ্ট ক’রে দিতে পারে সমাজশৃঙ্খলা; তাই নারীকে রুদ্ধ করে রাখতে হবে অবরোধে। ইসলামি ধারণায় নারী মানসিক শক্তিতে দুর্বল, সে নিজের কামকে বশে রাখতে পারে না; তাই নারীর কামের গ্রাস থেকে সমাজকে বাঁচানোর জন্যে নারীকে আটকে রাখতে হবে অবরোধে, তাকে ঢেকে দিতে হবে বোরকায়।

রোকেয়া বোরকা মেনে নিয়েছেন, খুব অবজ্ঞা করেছেন ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী’কে, কেননা তিনি চেয়েছেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীর কল্যাণ; এবং একটি কথা বুঝতে চান নি যে তাঁর অবজ্ঞার ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনীরা আসলেই অনেক উন্নতি করেছে অবরুদ্ধ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীদের থেকে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীরা যেখানে অপদাৰ্থ, ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী’রা সেখানে অনেক মুক্ত। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ত বিশ্বাস যে, অবরোধের সহিত উন্নতির বেশী বিরোধ নাই’ (রোর, ৫৭)। ‘বেশী বিরোধ নাই’ ব’লে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে অবরোধ ও উন্নতির মধ্যে বিরোধ রয়েছে, এবং তিনি বোরকার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ক্রমশ চ’লে গেছেন নিজেরই বিপক্ষে।

তিনি বলেছেন, ‘অবরোধ-প্ৰথা স্বাভাবিক নহে-নৈতিক।…মানুষের ‘অস্বাভাবিক’ সভ্যতার ফলেই অন্তঃপুরের সৃষ্টি’ (রোর, ৫৭)। ‘স্বাভাবিক’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন অসভ্যতাকে, আর ‘অস্বাভাবিক’ বলতে সভ্যতাকে; তিনি সভ্যতা ও অস্বাভাবিকতার পক্ষে, তাই অবরোধেরও পক্ষে। যদি তিনি মেনে নেন সভ্যতার সৃষ্টি অন্তঃপুরকে, তাহলে তাকে মেনে নিতে হয় অন্যান্য বিধানও।

তিনি নৈতিকতার কথা বলেছেন, এ-নৈতিকতা পুরুষতন্ত্রের নৈতিকতা; যে-পুরুষতািন্ত্ৰ মনে করে নারী ফিৎনা বা বিশৃঙ্খলা। রোকেয়৷ কি নিজেকে ফিৎনা ব’লে স্বীকার করবেন? রোকেয়ার পক্ষে স্বাভাবিক ছিলো পুরুমকে বোরকা পরানোর প্রস্তাব করা, যেমন করেছেন তিনি ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ, পুরুষকে ঢুকিয়েছেন। অবরোধে। তিনি বোরকার পক্ষে একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন (রোর, ৫৮) :

‘রেলওয়ে প্লাটফরমে দাঁড়াইয়া কোন সম্ভ্রান্ত মহিলাই ইচ্ছা করেন না যে, তাহার প্রতি দর্শকবৃন্দ আকৃষ্ট হয়। সুতরাং ঐরূপ কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকের ঘৃণা, উদ্রেক করিলে কোন ক্ষতি নাই।.. রেলওয়ে ভ্ৰমণকালে সাধারণের দৃষ্টি (Public Gaze) হইতে রক্ষা পাইবার জন্য ঘোমটা কিম্বা বোরকার দরকার হয়।’

যদি রেলস্টেশনে কোনো মহিলা দর্শক আকৃষ্ট করেন, তবে দোষটা কার? মহিলার, না লোলুপ দর্শকের? যে-অপরাধ পুরুষের, তার জন্যে শাস্তি পাবেন মহিলা? তিনি ‘কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকের ঘৃণা উদ্রেক ক’রে রক্ষা করবেন পর্দা? রোকেয়া অবরোধবাসিনীতে রেলস্টেশনে নারীর দুরবস্থার বেশ কয়েকটি শোচনীয় কাহিনী বলেছেন, আর তিনিই চাচ্ছেন নারী বোরকা পরে সেখানে পুরুষের মনে ঘৃণা জাগিয়ে আত্মরক্ষা করবে। তিনি অবরোধের পক্ষে দিয়েছেন সভ্যতার দোহাই : ‘সকল সভ্য জাতিদেরই কোন-না-কোন রূপ অবরোধ-প্ৰথা আছে (রোর, ৫৯)।

তিনি জানেন যে তথাকথিত সভ্যতা হরণ করেছে নারীর অধিকার, আর তিনি লড়াই করছেন ওই পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধেই। তিনি অবরোধের পক্ষে একটি ভুল যুক্তি দিয়েছেন : ‘আমরা যে এমন নিস্তেজ, সঙ্কীর্ণমনা ও ভীরু হইয়া পড়িয়াছি, ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই- শিক্ষার অভাবে হইয়াছে’ (রোর, ৬১)। অবরোধ ও শিক্ষা একসাথে চলতে পারে না; কাউকে মহাপণ্ডিত ক’রে যদি রেখে দেয়া হয়। অবরোধে, তাহলে সে তেজপূর্ণ, মহৎ সাহসী হবে না; ব্যর্থ হয়ে যাবে তার শিক্ষা; শিক্ষিত হওয়ার পরও সে থাকবে পুরুষের দাসী ও কামসামগ্ৰী। তবে রোকেয়া জানেন অবরোধ ক্ষতিকর; তিনি বলেছেন (রোরা, ৫৯-৬০) :

আমাদের অববোধ-প্রথাটা বেশী কঠোর হইযা পড়িষাছে … ঐ সকল কৃত্রিম পর্দা কম (Moderate ); কবিতে হইবে।  আমরা অন্যান্য পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব।…বোরকার আকৃতি অত্যন্ত মোটা (Coarse) হইয়া থাকে।  ইহাকে কিছু সুদর্শন করিতে হইবে।

তিনি অবরোধকে সুদৰ্শন করার প্রস্তাব করেছেন, চেয়েছেন মসৃণ অবরোধ; কিন্তু অবরোধ হচ্ছে অবরোধ, তা কোনো মসৃণতা জানে না। ‘বোরকা’ রচনাটিতে বিস্ময়করভাবে রোকেয়ার ওপর চেপে আছে আরব পিতৃতন্ত্র, এবং তিনি বিচ্যুত হয়েছেন নিজের স্বভাব থেকে। ধৰ্মকর্মের কথাও রোকেয়া বলেছেন পুরুষতন্ত্রের চাপে, কিন্তু ভালোভাবে চোখ দিলে দেখি যে ধর্মকে রোকেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ব’লে ভাবতেন না। ‘বঙ্গীয় নারী-শিক্ষা সমিতি : সভানেত্রীর অভিভাষণ’-এ (রোর, ২৮২) রোকেয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন :

‘মুসলমান বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কোরান শিক্ষাদান করা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন।  আপনারা কেহ মনে করিবেন না যে, প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কোরান শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি গোড়ামীর পবিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গোড়ামী হইতে বহু দূরে! প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়!’

তিনি বালিকাদের কোরান শেখাতে চেয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষার সাথে, কারণটিও বলে দিয়েছেন : ‘প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়’। তিনি ইসলামি পিতৃতন্ত্রের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন নি যে সব শিক্ষাই পাওয়া যায় ওই গ্রন্থে; তিনি বলেছেন প্ৰাথমিক শিক্ষার জন্যে ওই গ্রন্থটি উৎকৃষ্ট। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য।

পুরুষতন্ত্র নারীকে কয়েকটি ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করেছে; তার একটি গৃহিণীর ভূমিকা।  রোকেয়া নারীর প্রথাগক ভূমিকায় বিশ্বাসী ছিলেন না, কিন্তু গৃহিণীর ভূমিকাটি তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এটা তার একান্ত নিজের বিশ্বাস থেকে নয়, অন্যদেব বিশ্বাসকে তিনি দিয়েছিলেন স্বীকৃতি। তিনি প্রশ্ন করেছেন : ‘আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? বোধ হয় আপনারা সমস্বরে বলিবেন, ‘সুগৃহিণী হওয়া’ (সুগৃহিণী, রোর, ৪৫)।  রোকেয়া সুগৃহিণী হওয়াকে যে বড়ো কাজ বলে স্বীকার করেছেন, তা নয়; তবে তিনি মেনে নিয়েছেন পুরুষতন্ত্রের এ-বিধানটি।

বলেছেন, ‘পুরুষ বিদ্যালাভ করেন অন্ন উপার্জনের আশায়’, আর আমরা উচ্চশিক্ষা লাভ (অথবা Mental Culture) করিব কিসের জন্যে? আমি বলি, সুগৃহিণী হওয়ার নিমিত্তই সুশিক্ষা (Mental Culture) আবশ্যক’ (রোর, ৪৫-৪৬)। সুশিক্ষার উদ্দেশ্য সুগৃহিণী হওয়া? তাহলে কি সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে পড়ে না শিক্ষা? যে-কাজ অশিক্ষিত পরিচারিকা করতে পারে একটু যত্ন নিলে, বা চিরকাল ধরে ক’রে আসছে নিরক্ষর সুগৃহিণীরা, তার জন্যে সুশিক্ষা এক প্রচণ্ড অপচয়। রোকেয়া ঘরকন্নার ক্লান্তিকর কাজের যে-দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন :

‘গৃহ এবং গৃহসামগ্ৰী পরিষ্কার ও সুন্দররূপে সাজাইয়া রাখা, পরিমিত ব্যয়ে সুচারুরূপে গৃহস্থলী সম্পন্ন করা, রন্ধন ও পরিবেশন, সূচিকর্ম, পরিজনদিগকে যত্ন করা, সন্তানপালন করা’ (রোর, ৪৬), এবং সেগুলো সম্পন্ন করার যে-রীতি নির্দেশ করেছেন, তাতে সুগৃহিণী হয়ে ওঠে একটি শিক্ষিত দাসী, শিক্ষার শোচনীয় অপব্যয়। রোকেয়া নিশ্চয়ই উন্নত জাতের দাসী উৎপাদনের জন্যে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন নি। রোকেয়া সূর্যোত্তাপে রান্না’র স্বপ্ন দেখেছিলেন গৃহিণীকে ক্লান্তিকর ঘরকন্না থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যে, কিন্তু ‘সুগৃহিণীতে তিনি গৃহিণীর ওপর যে-ভার চাপিয়ে দেন তাতে খুব খুশি হবে পুরুষতন্ত্র। তারা তাদের স্ত্রীদের শিক্ষা দেয়ার জন্যে খুব ব্যগ্র হয়ে উঠবে, কিন্তু শুধু নষ্ট হয়ে যাবে রোকেয়ার নারীরা।

পুরুষতন্ত্রের সাথে, বাধ্য হয়ে, সামান্য সন্ধির কথা বাদ দিলে রোকেয়া হয়ে ওঠেন পৃথিবীর এক শ্ৰেষ্ঠ আমূল নারীবাদী, পিতৃ-ও পুরুষ-তন্ত্রকে যিনি ধারাবাহিক আক্রমণে বিপর্যস্ত করে গেছেন। কিন্তু বঙ্গীয় মুসলমান পুরুষতন্ত্র তাকেও নিষ্ক্রিয় ক’রে দিয়েছে, এবং তিনি যে-উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি ক’রে গেছেন, তাঁরা বহু দূরে স’রে গেছেন তার চেতনা থেকে। তার উত্তরাধিকারী নারীবাদ হয়েছেন ‘ভদ্রমহিলা’, স্বামীর শিক্ষিত দাসী ও প্রমোদসঙ্গিনী, সামাজিক সুবিধাভোগী, এবং তারা ব্যৰ্থ ক’রে দিয়েছেন রোকেয়াকে।

 


 নারী

শেয়ার করুন —
5 1 vote
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top