নারী

হুমায়ুন আজাদ

৪৫. নারীদের নারীরা : নারীদের উপন্যাসে নারীভাবমূর্তি (পর্ব-২)

[দ্বিতীয় খন্ড]

মণি নতুন মূল্যবোধসম্পন্ন অভিনব নারী, তার বিচারও অভিনব; তা গভীর সত্যকে বের ক’রে আনে। রমানাথ আত্মপক্ষ সমর্থন ক’রে জানায় সে ইংরেজ নারীটিকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় নি, ওই নারীই তার প্রতি মোহগ্ৰস্ত হয়েছিলো; তাই সে কোনো অপরাধ করে নি। তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সাথে সায় দেয় প্রথাগত সবাই, কিন্তু মণি সায় দিতে পারে নি; সে বরং সহানুভূতি বোধ করেছে। প্রতারিত ইংরেজ নারীটির প্রতি : ‘তিনি যাহা বলিলেন, তাহাতে সেই ইংরাজ-ললনার উপরই বৰ্ত্তমান সমাজপ্রথার দোষ অধিক পৌছায়। … জানি না, এই বিবরণের জন্য সকলে সেই মুগ্ধা অভিযুক্তা রমণীকে কিরূপ দৃষ্টিতে দেখিতেছেন, আমার কিন্তু এ কথায় তাহার উপর বরঞ্চ মমতা হইল এবং অভিযোগীর উপর যে বড় শ্রদ্ধা বাড়িল-তাহাও নহে। ’

সে জানে বর্তমান সমাজপ্ৰথা যাকে অপরাধ মনে করে, তা আসলে অপরাধ নয়; আর যাকে অপরাধ মনে করে না, তাই আসলে অপরাধ। নারীর এক ছক হচ্ছে নারী ক্ষমাশীল, তার কাজ পুরুষকে ক্ষমা ক’রে দেবতার পংক্তিতে বসানো। মনি এর বিরোধী : ‘যেন ভালবাসিলে লোকে ন্যায়ান্যায় জ্ঞান পৰ্যন্ত হারাইয়া ফেলে, অন্যায়কে পূজা করাই যেন ভালবাসা! আমি তাঁহাকে যেরূপ ভাল লোক মনে করিয়া ভালবাসিয়াছিলাম-তিনি যে তাহা নহেন, সে যেন আমারি দোষী!’

মণি পুরুষের অত্যাচার ও নারীর অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত; যাহারা স্ত্রীলোকের আবদার সহ্য করিতে না পারিয়া খড়গহস্তে তাহার দমন করিয়া থাকেন, মুহূর্ত্তের জন্য যদি কেবল তাঁহারা দিব্যহৃদয় লাভ করিয়া অনুভব করিতে পারেন… তবে সংসারের রূপ এবং স্ত্রীলোকের ভাগ্য যে অনেকটা পরিবৰ্ত্তিত হইত, তাহাতে সন্দেহ নাই!’ সে জানে বিয়ে তাকে করতে হবে, তবে চায় এমন স্বামী, যা পিতৃতন্ত্র তখনো তৈরি করার কথা ভাবে নি; তার জন্ম হয়েছে শুধু মণির মতো নারীবাদীর ভাবনায়; ‘যাহাকে একবার স্বামী মনে করিয়াছি–তিনিই আমার স্বামী হইবেন। তাঁহাকে বিবাহ করিব-কিন্তু প্রতারণা করিব না; আমার মনের ভাব খুলিয়া বলিব, যদি ইহাতেও তিনি আমাকে বিবাহ করিতে চাহেন, আমি তাহারি। সমস্ত শুনিয়াও অবশ্যই তিনি আমাকে বিবাহ করিবেন, তাহার প্ৰেম অটল অচল, আমি যাহাই হই, তিনি দেবতা, তাহার প্রেমে তিনি পতিত–আমাকে উদ্ধার করিবেন। ’ প্রথাগত নারীর যে-বাসনার কোনো অধিকার নেই, মণি তা-ই দাবি করেছে।

মণির একটি সুবিধা হচ্ছে বিয়ে না হ’লেও সে দুৰ্দশায় থাকতো না, বিয়ে না হ’লে তার জীবন বিপন্ন হতো না; তবে তার অবস্থায় থেকেও অধিকাংশ তরুণীই ব্যারিস্টার রমানাথের গলায় মালা দিতে ব্যগ্র হতো, কেননা তারা পিতৃতন্ত্রের বাণীতে দীক্ষিত, এবং শারীরিক সুখের জন্যে তারা দ্বিধাহীনভাবে বিক্রি করতে পারে নিজেদের দেহ। রমানাথ যখন তাকে জানায় যে বিয়ে না হ’লে মণির অসুবিধা হবে, তখন সে প্রত্যাখ্যান করে রমানাথকে; বলে, ‘সুবিধার জন্য আমি বিবাহ করতে চাই নে–আপনার সুখ যখন এর উপর নির্ভর কচ্ছে না–তখন আমি অব্যাহতি প্রার্থনা করি। ’

পুরুষ তাকে দয়া ক’রে বিয়ে ক’রে উদ্ধার করবে, এমন উদ্ধার সে চায় না। মৃণালিনী যদিও জানে ‘সুপাত্রে ন্যস্ত হওয়াই কন্যাজীবনের চরম সৌভাগ্য, পরম সার্থকতা’, তবু সে বলতে রাজি হয় নি যে ‘আপনি ভাল বাসুন না বাসুন, তাতে কিছু আসে যায় না, আমার মঙ্গলের জন্যই আমি বিয়ে করতে প্ৰস্তুত। ’ রমানাথের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর যার সাথে সে প্রেমে, এবং শেষে বিয়েতে জড়িত হয়, সে-ডাক্তার বিনয়কুমার বিলেতের নারীদের প্রশংসা ক’রে বলেছে, ‘আমার সবচেয়ে ভাল লাগত। সে দেশের মেয়েদের স্বাধীনতা, আত্মনির্ভর ভাব। দিন দিন সে দেশে স্ত্রীলোকের কার্য্যক্ষেত্র বাড়ছে- এমন কি, পলিটিক্সে পর্যন্ত তাহারা হস্তক্ষেপ করেছে। ’

এটা মণিরও ভালো লাগে, সেও চায় নারীকে ঘর থেকে বাইরে যেতে দেখতে। স্মরণ করতে পারি যে কংগ্রেসের অধিবেশনে যে-বাঙালি নারী প্রথম অংশ নিয়েছিলেন, তিনি মণির স্রষ্টা বা মূলসত্তা স্বর্ণকুমারী দেবী। পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে এক সময় যে মণি তার বাবাকে চিঠি লেখে : ‘বাবা আমার বিবাহ করিতে ইচ্ছা নাই..আমি খুব ভাল করিয়া হৃদয় পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া বলিতেছি, বিবাহে আমার সুখ নাই। ’ এটা শুধু কথার কথা নয়, আসলে বিয়েতে নারীর কোনো সুখ নেই, যদিও বিয়ে করা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প সুখও নেই।

তবে তার পিতা তাকে দিয়েছে বাস্তবসম্মত পরামর্শ : ‘আমাদের দেশের যে রকম অবস্থা, অবিবাহিত স্ত্রীলোকের পক্ষেই বরঞ্চ এসব কাজে বাঁধা বিঘ্ন অধিক। ….. স্ত্রীলোকের ঐহিক, পারমার্থিক, সকল প্রকার মঙ্গলের জন্যই বিবাহ শ্ৰেষ্ঠ, প্রশস্ত পথ। ’ এবং সে মেনে নিয়েছে, ‘আমি মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে দুৰ্ব্বল বঙ্গনারী আজ্ঞাবাৰ্ত্তী দুহিতা। জীবন বিসর্জন দিতে পারি–কিন্তু ইহার পরে বিবাহ সম্বন্ধে দ্বিরুক্তি করা আমার পক্ষে অসম্ভব। ’

পরে সে রোমাঞ্চকরভাবে বিয়ে করেছে ডাক্তার বিনয়কুমারকে, এবং উপন্যাসের সুপরিকল্পিত প্লট অনুসারে দেখতে পেয়েছে তার প্রথম প্রেমই অনন্ত প্রেম, ডাক্তার বিনয়কুমারই তার বাল্যপ্রেমিক ছোটু। তবে মণি ভেঙে দিয়েছে কুমারীর প্রথাগত ভাবমূর্তি, সে স্বামীকে দেবতা ব’লে মনে করে নি, বিয়েতেই নারীজীবনের সার্থকতা ব’লে বিশ্বাস করে নি, এবং বিশ্বাস করে নি পিতৃতান্ত্রিক সতীত্বে।

শৈলবালা ঘোষজায়ার জন্ম-অপরাধী  নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এক অসামান্য, সম্ভবত বাঙলা ভাষায় অনন্য, উপন্যাস। নামকরণ থেকে শেষ পংক্তি পর্যন্ত এতে লিপিবদ্ধ হয়েছে পিতৃতন্ত্রের হাতে নারীর নিপীড়িত হওয়ার শোচনীয় উপাখ্যান। শৈলবালার আর কোনো বই আমি পড়ি নি, তিনি প্রথাগত না প্ৰথাবিরোধী ছিলেন তাও জানি না, জানি না। নারীমুক্তির বাণীতে তিনি দীক্ষিত ছিলেন কিনা, কিন্তু জন্ম-অপরাধীতে নারীজীবনের যে-মৰ্মস্পর্শ রূপ তিনি এঁকেছেন, তা এটিকে হয়তো বাঙলা ভাষায় লেখা শ্রেষ্ঠ নারীবাদী উপন্যাসে পরিণত করেছে।

তিনি বিদ্ৰোহ বা প্রতিবাদের রূপ আঁকেন নি, নারীমুক্তির কৃত্রিম কৌশল উদ্ভাবন করেন নি, যেমন করেছেন বেগম রোকেয়া ও শান্তা দেবী; তিনি লিখেছেন নারীর অবিরাম পীড়িত দণ্ডিত জীবনী। এ-পীড়িত রূপ কাজ করে কল্পিত বিদ্রোহী রূপের থেকে অনেক তীব্ৰ মৰ্মস্পর্শীভাবে। জন্ম-অপরাধী  নামটিই প্রগাঢ় তাৎপর্যপূর্ণ, তা নির্মমভাবে তুলে ধরে পিতৃতন্ত্রে নারীর অস্তিত্ত্বের বিভীষিকা। শৈলবালা উপস্থাপিত করেছেন পীড়ন আর পীড়নের রূপ, যেনো পিতৃতন্ত্র নারীর ওপর যতো পীড়ন করেছে তা একযোগে ভোগ করেছে তার নায়িকা অপেরা।

অপেরাকে তিনি ক’রে তুলেছেন পীড়িত নির্যাতিত সমগ্র বঙ্গনারীর আদিরূপ। তিনি ছক ভাঙেন নি, ছকের মধ্যে রেখেই পীড়নের মধ্য দিয়ে ভেঙে দিয়েছেন নারী-ছকটি। শৈলবালা ঘোষজায়ার নায়িকা অপেরার জন্ম-অপরাধ দুটি : প্ৰথম অপরাধ সে নারী, দ্বিতীয় অপরাধ সে দরিদ্র ঘরের অনাথ মেয়ে। তার বিয়ে হয়েছিলো প্রকৌশলী বিনোদলালের সাথে, তবে তার স্বামী এক হিংস্ৰ পাষণ্ড। অপেরা বিদ্রোহী নয়, সে পুরুষতন্ত্রের ছক মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে চেয়েছে; কিন্তু তাকে বাঁচতে দেয়া হয় নি।

তাই সে মনে দাগ কাটে প্রতিবাদীর থেকে অনেক বেশি, তার শোচনীয় জীবনই হয়ে ওঠে এক নিরন্তর নিঃশব্দ বিদ্রোহ।  ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ হইয়া সহস্র অপমান তিরস্কার সহিয়াও সে উদ্ধতভাবে কখনও প্রতিবাদ করিত না’; সে চেয়েছে শুধু একটু বেঁচে থাকতে। তার পিতামাতা নেই, তবে বোন ও ভগ্নিপতি তাকে স্নেহেই পালন করে, এবং প্রথাগতভাবে সৎপাত্রে দানও করে। কিন্তু বিয়ের পরই তার জীবন হয়ে ওঠে নরক। সে জীবন যাপন করেছে শুধু বাল্যকালে : ‘এক বছর বয়সে মা ও চার বছর বয়সে তাহার বাবা মারা গিয়াছেন। …একটুখানি জ্ঞান হইতেই বই শ্লেট বণীলে করিয়া গাড়ী চড়িয়া স্কুলে যাতায়াত-বছর বছর ফাষ্ট হইয়া ক্লাশে ওঠার তীব্র আনন্দ উত্তেজনা! এমন করিয়া কোন দিক দিয়া কয় বছর কাটিয়া যাইবার পর যখন থার্ড ক্লাশের সীমা ডিঙ্গাইয়া সেকেণ্ড ক্লাশে উঠিল, তখন হঠাৎ তাহার স্কুল যাওয়া বন্ধ হইল…. সূৰ্য্য-চন্দ্ৰ-যম-বরুণ-বাসবের সমকক্ষ শিক্ষিত বাঙ্গালী যুবকের পত্নীত্ব পদে সমারূঢ় হইয়া রাচিতে চলিয়া আসিল। ’

সে বইশ্লেট হাতে ইস্কুলে যেতো, বছর বছর শ্রেণীতে প্রথম হতো, পুরুষ হ’লে তার জীবন হতো সাফল্যে পরিপূর্ণ, কিন্তু তার অপরাধ সে নারী। তাই তার জীবন সম্পূর্ণ ব্যৰ্থ। শৈলবালা পাতায় পাতায় শ্লেষ করেছেন পুরুষ, ঈশ্বর, ধর্মকে–সমগ্র পুরুষতন্ত্রকে; কথায় কথায় ব্যবহার করেছেন পরিহাস সূচক বিস্ময়চিহ্ন, যেমন এখানে অপেরার বরটিকে পরিহাস করেছেন ‘সূৰ্য্য-চন্দ্ৰ-যম-বরুণ-বাসবের সমকক্ষ শিক্ষিত বাঙ্গালী’ যুবক বলে। বিয়ের পর সম্ভাবনাময় কিশোরীটির জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় তার জীবনই। তার জীবনের নাম পীড়ন।

পিতৃতন্ত্রে নারীর কোনো সম্মান নেই, অপেরারও কোনো সম্মান নেই শ্বশুরবাড়িতে : ‘অপেরা খুব ভাল করিয়াই জানে, এ বাড়িতে তাহার সম্মানের মূল্য কতটুকু!— অতএব নিম্বফল মনস্তাপ বিসর্জ্জন দিয়া সমস্ত অন্যায় অপমান নিঃশব্দে মাথায় তুলিয়া লইয়া, শ্ৰান্ত ক্লান্ত কুটুম্ব-সন্তানকে সাদর শিষ্টাচার জানাইয়া–শ্বশুরবাড়ীর সম্মান বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য একটা বিপদের দায় ঘাড়ে তুলিয়া লইতে হইবে। ’ শ্বশুরবাড়িতে তার সম্মান নেই, কিন্তু তার দায়িত্ব শ্বশুরবাড়ির সম্মান রাখা।

অপেরার স্বামী শিক্ষিত পাষণ্ড, ধর্ষকামী; তার কাজ অপেরারকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন করা; যেমন, ‘দূর হয়ে যাও–স্বেচ্ছাচারিণী স্ত্রীলোক!’–বলিয়া বিনোদ সক্রোধে অপেরার বা পাজরে সজোরে কনুইয়ের গুতা মারিলেন। অপেরা ছিটকাইয়া গিয়া মেঝের উপর পড়িল। ’ অপেরা এ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কী করতে পারে? সে প্রতিবাদ করবে? সে যে-প্ৰতিবাদ জানায়, তা পিতৃতন্ত্রের জন্মকাল থেকে জানিয়ে এসেছে নারী : মুহূর্তে তাহার শান্ত নম্র মুখমণ্ডলে দৃপ্ত-বিদ্রোহের বিদ্যুদগ্নি ঝলসিয়া উঠিল,–কিন্তু সে কেবল মুহূৰ্ত্তের জন্যই! পরক্ষণেই সংযত হইয়া নিঃশব্দে বাহিরে চলিয়া আসিল। ’

শৈলবালা নারীর অব্যক্ত বিদ্রোহের আবেগ সকাতর ভাষায় প্ৰকাশ করেছেন : ‘হায় গো বিধাতা, তোমার সুপবিত্র বিধানের নিকট সশ্রদ্ধ সম্মানে মাথা নোয়াইয়া হাসিমুখে যেখানে আত্মোৎসর্গ করিয়া চলাই নারীহািদয়ের স্বভাব-ধৰ্ম্ম-সেখানে কেনই যে এমন অস্বাভাবিক অধৰ্ম্মের উত্তেজনায় বৰ্ব্বর নৃশংসতা জাগিয়া ওঠে, সে প্রশ্নের উত্তর তুমিই জান নারায়ণ!’ বিনোদলাল আনন্দ পায় স্ত্রীনির্যাতনে; যেমন, ‘আমনি তিনি হঠাৎ বিছানা ছাড়িয়া লাফাইয়া পড়িয়া, চক্ষের নিমেষে মেঝে হইতে একপাটি পম্পী-সুতুলিয়া লইয়া, বিনা বাক্যে অপেরার কর্ণমূলে সশব্দে ফটাস করিয়া বসাইয়া দিলেন। ’

বিনোদলাল পাষণ্ড, কিন্তু সে পুরুষ ও সম্মানিত: তাই লেখক তার পাশবিকতা বর্ণনার সময়ও ব্যবহার করেছেন সম্মানসূচক ক্রিয়ারূপ ‘দিলেন’; অপেরার কোনো সম্মান নেই, তাই নির্যাতিত হয়ে সে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার জন্যে ক্রিয়ারূপ হচ্ছে সম্মানহীন ‘আসিল’।  অপেরার সবই অপরাধ; অপেরা বাপের বাড়ি গেছে, তাই তার স্বামীর কথা হচ্ছে, তার মত স্ত্রীর পাপের উপযুক্ত প্ৰায়শ্চিত্ত হচ্ছে, তাকে খুন করে ফেলা। ’

শুধু তার স্বামী নয়, তার শ্বশুরবাড়ির অন্য পুরুষেরাও সমান হিংস্ৰ: তার বটুঠাকুর বলে, ‘আমার পরিবার যদি ওরকম হত, তাহলে আমি তাকে লাথির ওপর লাথি, জুতোর ওপর জুতো, ঝাটার ওপর ঝাটা মারতাম!— লাঠির চোটে ভূত জব্দ, মেযেমানুষ তো কোন ছার! শাসন থাকলে মেয়েমানুষ কখনো অমন স্বেচ্ছাচারিণী হতে পারে!’ পুরুষের যে-হিংস্রতার ছবি এঁকেছেন শৈলবালা, তা পুরুষ সম্পর্কে তার মৌল ধারণার প্রকাশ; তিনি পুরুষকে দেখেছেন হিংস্র পশুরূপে। নারীপুরুষের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কও পশুবৃত্তি : ‘শুধু পশুবৃত্তির উত্তেজনায় যে ক্ষণিক আকর্ষণ, ক্ষণিক সম্মিলন-তাঁহাই কি দাম্পত্য ধৰ্ম্মের শ্ৰেষ্ঠ সার্থকতা? ধিক, এত বড় সাংঘাতিক প্ৰবঞ্চনা, এত বড় মৰ্ম্মান্তিক লাঞ্ছনা মানুষের জীবনে যে আর নাই!’

অপেরার সবই অপরাধ: সে কিছুটা লেখাপড়া জানে, এটা তার অপরাধ: সে একটু পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন থাকতে চায়, এও তার অপরাধ। তার স্বামী লেখাপড়া সম্পর্কে পোষে এমন শ্ৰদ্ধাবোধ : ‘মেয়ে মানুষের লেখাপড়া শেখা! দুচক্ষে যা দেখতে পারি নে, তাই জুটেছে ঘরে … জুতিয়ে আমি মুখ ছিঁড়ে দিতে পারি!’ সে বিশ্বাস করে, ‘যে মেয়ে মানুষ লেখাপড়া শিখেছে, তার কি ভদ্রস্থ আছে? সে ত বেশ্য!’

সে পরিষ্কারপরিচ্ছন্নও থাকতে পারবে না, কেননা তাও নারীর অপরাধ। শৈলবালা প্রশ্ন করেছেন, ‘হিন্দুসমাজের কোন শাস্ত্রের কোন খানে এক জায়গায় বুঝি লেখা আছে, এমনতর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ‘বাই’ যে মেয়েমানুষের থাকে, তাহারা নাকি নিতান্ত শীঘ্রই আধঃপাতে যায়!’। তার জীবনই অপরাধ, তাই তার প্রাপ্য নিরন্তর শাস্তি; কিন্তু নিরুপায় সে! হতভাগ্য বাংলা দেশের ভদ্ৰগৃহস্থ গৃহের, হতভাগিনী বধু সে!

গুরুজনের সম্মান লঙ্ঘনের অপরাধ-আশঙ্কা তাহার পায়ে পায়ে!–মিথ্যা সাক্ষ্য ও অন্যায় প্রমাণের জোরে, বিনা অপরাধে সহস্ৰ দণ্ড ভোগ করিতে হইলেও, নিজের নির্দেষিতা সম্বন্ধে কোন কৈফিয়ৎ তাহার মুখ ফুটিয়া উচ্চারণ করিবার অধিকার নাই,–তাহা হইলেই সৰ্ব্বনাশ! জাতিনাশের চেয়েও বেশী অপরাধের দায়ে তাকে পড়িতে হইবে! ইহাই আমাদের বাংলা দেশের ভদ্ৰগৃহস্থ গৃহের গাৰ্হস্থ্যবিধি! বাংলা দেশের অজ্ঞ বিজ্ঞ সকলেই একটা সুমহান মোটা নীতি শিখিয়াছে, –‘হলুদ জব্দ শিলে আর বউ জব্দ কীলে’। ’

অপেরার, সমস্ত নির্যাতিত নারীর মতোই, প্রতিবাদের অধিকার নেই; এমনকি অধিকার নেই। চোখের জলের; ‘কেহ আসিয়া দেখিয়া ফেলে, এই ভয়ে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছিয়া ফেলিল। ছিঃ, একি চপলতা করিতেছে? স্বামীর অসদ্ব্যবহার-ইহাই যে তাহার প্রাক্তন! এ কৰ্ম্মভোগ নারী-জীবনের কৰ্ত্তব্য বলিয়া শান্ত সহিষ্ণুভাবে বহন করিতে হইবে। ’ নারীজীবন পেয়েছে সে জীবনের বদলে পীড়ন উপভোগের জন্যে, তাই পীড়নভোগই তার পুণ্য। অপেরা মৰ্ম্মকামী নয়, পীড়িত হয়ে সে কোনো সুখ পায় না; অন্য সমস্ত নারীর মতো পীড়ন ভোগ করাই তার প্রতিবাদ।

তার ভেতরটা যখন গর্জন ক’য়ে ওঠে, তখনও তাকে থাকতে হয় নিঃশব্দ নারী; অপেরার স্তব্ধ-ব্যথাহত নারীত্ব দৃপ্ত-অভিমানে অন্তরের মধ্যে গৰ্জ্জিয়া উঠিল,-কিন্তু সেটা প্ৰকাশ করিবার অধিকাব্য তাহার নাই! তাহা হইলেই না কি-স্বামীর গুরু-সম্মানকে লঘু করিয়া দেওয়ার পাপে পড়িতে হইবে!’ পীড়ন সহ্য করতে একদিন সে রুপান্তরিত হয়ে যায় : ‘এখন কাদিয়া হাল্কা হইতে তাহার প্রবৃত্তি হয় না, লজ্জা করে রাগও হয়!’ এটা প্রতিবাদের বিপরীত রূপ, পীড়ন ভোগ করেই সে জানায় তার প্রতিবাদ।

শৈলবালা পুরুষকে দেখেছেন হিংস্র অমানবিক জন্তুরূপে, যাদের কাজ নারীপীড়ন :

‘সংসারের শক্তিমান, স্বাৰ্থপর, নিষ্ঠুর, দাম্ভিক, সুখ-সম্ভোগ-বিলাসী, মহার্যক্ত পুরুষগুলিব ফরমাস অনুসারে সৃষ্টিকে নিখুঁত সুন্দর রূপে গড়িয়া তোলা বিধাতার শক্তিতে কুলাইয়া উঠে নাই। কাজেই সে-হেন বিশিষ্টগুণ সম্পন্ন প্রবল শক্তিমান পুরুষেরা যখন তাঁহাদের ইচ্ছা অভিরুচির ক্রীতদাসী দুৰ্ব্বল প্রাণীগুলিকে, তাহাদের মত যথেচ্ছাচার সহিবার পক্ষে একান্ত অযোগ্য-অলস, নির্জীব, অথবা বিদ্রোহীভাবাপন্ন হইতে দেখেন, তখন তাহারা বিধাতার মুণ্ড ভোজনে উদ্যত হন!

স্বেচ্ছাচারী পুরুষ তাহারা–তাহারা কি বিধাতার স্বাধীনতা সহ্য করিতে পারেন? তাই তাহারা বিধির বিধান উল্টাইয়া দিবার জন্য অপরূপ বিধানের সৃষ্টি করেন! তাহাদের ফরমাসী মাপের অযোগ্য যে জন একান্ত নিরুপায় ভাবে তাঁহাদের করায়ত্ত হইয়া পড়ে—সেটাকে চাবকাইয়া দুরন্ত করিবার জন্য তাহাবা অমানুষিক শক্তিতে বন-মানুষী প্রতিভা দেখাইবার জন্য কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন। ’

পুরুষের প্রকৃতি সম্পর্কে এখানে শৈলবালা প্রকাশ করেছেন তীব্রতম ঘৃণা; পুরুষ স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী, যে-বিধাতার বিধানকেও বদলে দেয় নারীপীড়নের জন্যে। নারী কী ক’রে এর প্রতিবাদ করবে, যেখানে সব কিছুই নারীর বিপক্ষে? শৈলবালা এটা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

‘বাঙ্গালার পল্লীগৃহে অকাটমূর্খ ভদ্রনামের ইতর শ্রেণীর স্বামী-স্ত্রীর বিবাদে মারধোর গালমন্দের পর এমনই ভাবে বাড়ী হইতে খেদাইয়া দিবার প্রথা প্রচলিত আছে বটে, তবে সেটা–সে শ্রেণীর মূর্খ-ইতর স্বামীদেব পক্ষেও শোভনীয়-স্ত্রীদের পক্ষেও সহনীয়! স্বামীদের এই অত্যাচার সমর্থনাৰ্থে, কোন শাস্ত্ৰ হইতে নাকি সার-সঙ্কলন করিয়া, মূর্খে নয়, অনেক বিদ্বানেও নাকি প্রবল বিজ্ঞতা সহ যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন যে, স্বামী সহস্ৰ অন্যায় করুন কিন্তু স্ত্রী যদি তাহার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ করে, তবে পরজন্মে তাহাকে কুক্কুরীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিতে হইবে।

ইহার পর মুর্খ অধম, শাস্ত্ৰজ্ঞানহীন, তৃণাদপি তুচ্ছ নারী জাতি কোন সাহসে কথা কহিবে? পৃথিবীতে জন্মগ্রহণই যাহাদে্র একটা মহৎ অপরাধ বলিয়া গণ্য-সূতিকাগার হইতে মৃত্যুকামনাই যাহাদের আত্মীয় স্বজনের কৰ্ত্তব্য, সে-হেন ‘মেয়েগুলা’ যে দুনিয়ার বাজারে কোন স্পৰ্দ্ধায় বাঁচিয়া থাকে, ইহাই ত একটা ভয়ানক আশ্চর্য ব্যাপার!’

শৈলবালা আক্রমণ করেছেন সমগ্ৰ পিতৃতন্ত্রকে, পিতৃতন্ত্রের শাস্ত্ৰকে, যা নারীকে শুধু পীড়নের বিধান দিয়েই পরিতৃপ্ত নয়, পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকেও নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। বিধানে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অপেরার মনে জাগে প্রতিবাদ। তখন নিৰ্দয় শক্তিতে বজ্রনিষ্পেষণে অপেরার হাত টিপিয়া ধরিয়া কঠোর  ভ্রুভঙ্গী করিয়া রূঢ় স্বরে তিনি (স্বামী) বলিলেন, ‘দেখ, মেয়েমানুষের অতটা তেজ ভাল নয়।’ তখন :

‘অপেরার গ্রহদেবতা বিরূপ–কোথা হইতে দুষ্ট সব স্বতী আসিয়া তাহার স্কন্ধে চাপিয়া বসিলেন,–অপেরা ধৈৰ্য হারাইল –চির-অনাদৃতা চির-অবজ্ঞাতা স্ত্রীলোকের কতটা তেজ যে ভাল, অপেরা সে হিসাবে অঙ্কটা জানিয়া বুঝিয়া, বিজ্ঞতা প্রকাশের অবসর লইল না,–এইবার অকুষ্ঠিত দৃষ্টি তুলিয়া বুলিল–‘তেজ! একেও তোমরা তেজ বলবে? বেশ, তোমাদের বিচারই ভাল! কিন্তু রক্তে মাংসে গড়া মানুষ আমি, আমার মন পাথর দিয়ে গডা নয় সেটা মনে বেখো—’

অপেরা মুক্ত নারীর জীবন চায় নি, সে প্রথা মেনেই যাপন করতে চেয়েছে তার দণ্ডিত জীবন। সে বলেছে, ‘স্বামী তুমি তোমার স্থান আমার মাথার উপর, সে একবার নয় একশো বার আমি মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করছি। ’ তবে তারও যে সামান্য অধিকার আছে, তা সে জানাতে চেয়েছে; বলেছে স্ত্রী বলে আমারও কি-, কিন্তু বাক্য সে শেষ করতে পারে নি, জানাতে পারে নি তার কী আছে?

এক সময় পীড়ন তার সহ্য হয়ে যায়, আর অসহ্য হয়ে ওঠে। কৃত্রিম আদর : ‘লাথির উপর লাথি, জুতোর উপর জুতো, ঝাটার উপর ঝাটা, যার জন্যে প্রেস্ক্রিপশন ঠিক হয়ে আছে, তাকে শান্ত সহিষ্ণুভাবে তার ন্যায্য প্রাপ্যটা গ্রহণ করিতে দাও–মাঝে মাঝে খেয়াল মত এমন যথেচ্ছ অনুগ্রহ দেখিয়ে কেন তার মাথা খারাপ করে স্পৰ্দ্ধা বাড়াও?’-এতে তোমার কোন  গ্লানি বোধ না হতে পারে, কিন্তু দোহাই ধৰ্ম্ম সত্যি বলছি, ঝাটা লাথি সহ্য করবার জন্যে যার মন কঠিন ভাবে প্রস্তুত হয়েছে, এ আদর অনুগ্রহ তাঁর অসহ্য। ’

নারী যেমন পীড়নের শিকার হয়। পুরুষের তেমনি হয় পুরুষের সোহাগেরও শিকার; প্ৰেমহীন সোহাগ তার জন্যে শোচনীয়তম অপমান। পুরুষ সোহাগ করে নিজেকেই পরিতৃপ্ত করার জন্যে, নিজেরই প্ৰভূত্বকে ভিন্নভাবে নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্যে: তাতে নারীর কোনো সুখ নেই। নারী কি কোনো তেজ দেখাতে পারে, তার কি সে-অধিকার আছে? নেই।

বুকে যখন একটু প্ৰতিবাদের অগ্নিকণা জন্ম নেয়, তখন ‘অপেরার মনে হইল, সত্যই ত, মেয়েমানুষের এত তেজ, এ যে বাস্তবিকই একটা বিষম স্পৰ্দ্ধা!’ মেয়েমানুষ কী করবে? তার জন্যে রয়েছে আত্মদমন : ‘নিজের এই অস্বাভাবিক দুঃসাহসিকতার জন্য অপেরা মনে মনে ত্ৰাহি মধুসূদন জপিতে জপিতে আড়ষ্ট হইয়া পড়িয়া রহিল,… তাহার মন উষ্ণ উত্তেজনায় বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে,–সামান্য সংঘর্ষে এখনই হয়ত সে বজ্রপাত ঘটাইয়া বসিবে। প্ৰাণপণে আত্মদমন করিবার জন্য অপেরা আড়ষ্ট নিজীবের মত পড়িয়া রহিল। ’ ক্রীতদাসী ক্ষুব্ধ হ’তে পারে, তবে ক্ষোভ বিপন্ন করে তার জীবন, তাই নিজের ক্ষোভকে দমন করাই তাঁর বেঁচে থাকার পদ্ধতি।

মেয়েমানুষের অবস্থান কোথায় শৈলবালা তা বারবার নির্দেশ করেছেন :

‘[ক] গোটা দুই ধমক ও একটা পদাঘাতে যাহাকে কাবু করিয়া ফেলিতে পারা যায়, সে কি আবার মানুষ। বিশেষতঃ মেয়ে মানুষ ত জন্তু জানোয়ারের সামিল নগণ্য জীব –তবে সভ্য জগতে ওঃ, সে আলাদা কথা –আর আমাদের ঘরে এই সব ‘মাগী ছাগী’— উহাদের জীবন মূল্যহীন। উহাদে্র ধমনীতে যে তরল পদার্থটা প্রবাহিত হয়, সে ত রক্ত নয়,–অসাব পদার্থ, লাল জল মাত্র।

[খ] স্ত্রীলোকের ভাগ্য নিশ্চল জড় পদাৰ্থ!.. পুরুষ মানুষের চরিত্ৰ সহস্ৰ অসৎ কাযে, সহস্ৰ হীনতা, নীচতায়,–কখনও অপবিত্ৰ হইবার নয়, সোণর মাকড়ী বুঝি বাঁকা হইলে ক্ষতি আছে? কি স্পৰ্দ্ধা বে।  আর স্ত্রী চরিত্ৰ? সত্যযুগ হইতে প্রমাণ চলিয়া আসিতেছে,–দ্বিতীয় বাক্য নিম্প্রয়োজন! পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পৰ্যন্ত চরিত্রহীনতার জন্য যত লক্ষ কোটি অপরাধ ঘটিয়াছে, সে শুধু স্ত্রীজাতির একান্ত নিজস্ব কলঙ্ক! সে কলঙ্কের সহিত পুরুষ জাতির কোন পুৰুষেও তিলাৰ্দ্ধ সংস্রব নাই। বেশী কথা কি, ঐ কঠোর অপরাধী জাতিটার চরিত্র এমনই অবিশ্বাস্য ও মান এতই দুরভিসন্ধিপূর্ণ যে, মৃত্যুর পরও উহাদের বিশ্বাস করা নিষেধ। দেহটা চিতার আগুনে ভস্মসাৎ হইয়া বাতাসে যখন ছাই উড়িয়া যাইবে, তখন নিৰ্ভয়!

[গ] যেহেতু বসুন্ধরার সৰ্ব্বোত্তম জীব পুরুষ-মানুষরা স্বতঃসিদ্ধ অথবা সোজা ভাষায় যাহাকে স্বেচ্ছাচারী বলা যায়, তাহাই। সুতরাং তাহারা ত কাহারও সুবিধা বা মঙ্গলের মুখ চাহিয়া নিজেদের উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতি ও মন্দ অভ্যাস সংশোধন করিতে বাধ্য নন,–তা, তাহাতে সৃষ্টি রসাতলেই যাক, আর সৃষ্টিকর্ত্তা কারাগারে, দ্বীপান্তরে যেখানে খুশী শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া থাকুন, কোন ক্ষতি নাই – কিন্তু বসুন্ধরার অধমাধ্যম জীব মেয়ে-জাতটার প্রত্যেক জনকে যে এক একটি স্বেচ্ছাচারীর ছন্দ মাত্রা প্রকরণ অনুসারে, ঠিক মাপা মিলাইয়া নির্দিষ্ট ছাঁচে স্বতন্ত্র ভাবে গড়িয়া উঠিতে হইবে, সে বিধান অবশ্য প্রতিপাল্য, বেচারা অপেরা চুপ করিয়া যতই সহিতে লাগিল, তাহার অন্তঃকরণ ততই বিদ্ৰোহী হইয়া উঠিতে লাগিল।

[ঘ] পুরুষ মানুষের চটি জুতার স্থানটা যেখানে, বিবাহিতা স্ত্রীর স্থান যে তাহার ঢের নীচে….

[ঙ] স্বামীর সহিত সদ্ভাব না থাকিলে, স্বামী অত্যাচার-পরায়ণ নিষ্ঠুর নির্দয় হইলে, স্ত্রী পৃথক হইবে? ওমা, একি অসম্ভব কথা … যে দেশে নারীর স্থান বুট, ঘোরতোলা, পাম্পসু, প্রভৃতি দামী জুতার নীচে নয়,–একেবারে সব চেয়ে অধম চটিজুতাব নীচে বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়াছে, যে সমাজে নারীর জন্মগ্রহণ মহা অপরাধ–বাঁচিয়া থাকার ত কথাই নাই; সে দেশের সে সমাজের কোনও নারী যদি অত্যাচারী স্বামীর উৎপীড়নের হাত এড়াইয়া স্বচ্ছন্দ শান্তিতে সৎভাবে জীবনটা কাটাইবার জন্য, সাহস করিয়া পৃথক হইয়া যায়, তবে সে দুঃসাহসের দণ্ডের পরিমাণ কতখানি?

আক্রমণ, শ্লেষ, বিদ্রুপ, বৰ্ণনার মধ্য দিয়ে পুরুষের পাশবিকতা ও নারীর শোচনীয় শৈলবালা তুলে ধরেছেন সমগ্ৰ পীড়িত নারীর যন্ত্রণার রূপ। পুরুষ তাঁর চোখে নৃশংস দানবী। লৈঙ্গিক রাজনীতির চরম রূপটি চিত্রিত করেছেন শৈলবালা; দেখিয়েছেন। পুরুষের স্বৈরাচারের ফলে নারীর অবস্থা শোচনীয় হ’তে পারে কতোখানি। তিনি দেখিয়েছেন নারী-পুরুষ, স্ত্রী-স্বামীর মধ্যে রয়েছে এক অনাদি বিরোধ, যার শিকার নারী। নারী এ-বিরোধ সৃষ্টি করে নি, পুরুষই নিজের স্বেচ্ছাচারিতায় নারীকে শত্ৰু -ক’রে তুলেছে; পুরুষপ্ৰজাতির সাথে নারীর জীবনযাপন এক অসম্ভব পীড়াদায়ক ব্যাপার।

স্বামী কি নারীর সুখ? শৈলবালা লিখেছেন, ‘স্বামীর দিকে চাহিয়া হঠাৎ অপেরার মনে হইল, ইনিই যত অনিষ্টের মূল। ’ এক অপেরার অনুভবের মধ্য দিয়ে তিনি নির্দেশ করেছেন সমস্ত নারীর জীবনের অনিষ্টের মূলটি। অপেরা পীড়নের প্রতিবাদও করতে পারে না, পীড়নে পীড়নে সে শিশুর মতো অসহায় হয়ে ওঠে : ‘অভিমানী শিশু যেমন তুচ্ছ ছুতা অবলম্বন করিয়া সৰ্ব্বদাই কান্দিবার জন্য ব্যাকুল হয়-অপেরার বুকের ভিতর তেমনই একটা অর্থহীন ব্যাকুলতার আবেগ ঠেলিয়া উঠিল। ’ পিতৃতন্ত্র নারীকে শিশুই মনে করে, যে-নারী শিশু হ’তে চায় না। তাকে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পরিণত করে অবোধ অসহায় শিশুতে।

শৈলবালা শুধু অপেরার স্বামীকে নয়, প্রায় সব পুরুষই দেখেছেন অমানুষরূপে; এক চিকিৎসকের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে : ‘তাহার উপর তিনি নিষ্ঠাবান জ্ঞানাভিমানী পুরুষ, পৃথিবীতে মেয়েমানুষদের বাঁচিয়া থাকাটা অত্যন্ত ঘৃণা ও লজ্জার বিষয় বলিয়া তাহার জ্ঞানচক্ষুতে প্রতিভাত হইত’। পুরুষ এতো অমানুষ যে স্ত্রীকে খুন করার পর তার স্বামী বক্তৃতা দেয় : ‘ আজ কলকার মেয়েরা যে ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম ভুলিয়া, হিন্দু স্ত্রীর কৰ্ত্তব্য ভুলিয়া, ঘোরতর অহিন্দু আচার অবলম্বন করিয়া, অসদুপায়ে বিষ খাইয়া, গলায় দড়ি দিয়া, জলে ডুবিয়া ও কেরোসিন তৈলে পুড়িয়া মরিতেছে, তৎসম্বন্ধে উদ্দীপনাপূর্ণ ভাষায় বিস্তর নিন্দাবাদ করিতেছেন!’

নারী কী কী উপায়ে পুরুষের হাত থেকে নিজেকে উদ্ধার করছে, তার তালিকাটি তিনি উপস্থিত করেছেন এখানে। পুরুষের কবল থেকে নারীর নিজেকে উদ্ধারের উপায় আত্মহত্যা; অপেরা জানে, ‘এই চির পরাধীন জীবনের অবস্থা!— এদের স্বচ্ছন্দভাবে নিঃশ্বাস ফেলবার অধিকার পর্য্যন্ত নেই…. এরা জন্মেছে শুধু সংসারের সকলের অসন্তোষ বিরক্তির জ্বলায় উৎপীড়িত হয়ে,–আত্মগ্লানির ধিক্কারে আত্মহত্যা করতো!’ অপেরা বলেছে, ‘আমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যে আমায় যথার্থ ভালবাসে, সে যেন আমার মৃত্যুর প্রার্থনাই করে!’

জন্ম-অপরাধী অপেরার এ-প্রার্থনা যে পূর্ণ হবে, তাতে সন্দেহের কারণ নেই; উপন্যাসের শেষে সে ঢ’লে পড়ে অপমৃত্যুর কোলে। মৃত্যুই তার মুক্তি, মৃত্যুই তার চরম বিদ্রোহ : ‘অপেরা নিরুত্তর!–আজ সে তাঁহার (স্বামীর) শাসন বাধ্যতার আইনের কবল চিরদিনের মত এড়াইয়া নিৰ্ভয়ে অবাধ্য হইয়া দাড়াইয়াছে! আজ সে আর উত্তর দিবে না!’

জীবন অপেরাকে যে-অধিকার দেয় নি, মৃত্যু দিয়েছে তাকে সে-অধিকার : পুরুষের অবাধ্য হওয়ার স্বাধীনতা। শৈলবালা এঁকেছেন পুরুষের নারীপীড়নের রূপটি, অপেরাকে ক’রে তুলেছেন সমস্ত নিপীড়িত বাঙালি নারীর আদিরূপ। নারী কোনো অপরাধ না ক’রেও যে পুরুষতন্ত্রের কাছে অপরাধী, জন্মদণ্ডিত, এর বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনের আয়োজন না করেও শুধু একটি নারীর শোচনীয় জীবন চিত্ৰিত ক’রে শৈলবালা জানিয়েছেন প্রবল প্রতিবাদ; এবং রচিত হয়েছে একটি অসাধারণ নারীবাদী উপন্যাস।

অনুরূপা দেবী হিন্দু বিধানে দীক্ষিত প্রথাগত ঔপন্যাসিক; মন্ত্রশক্তি (১৯১৫) লিখেছেন তিনি বেদমন্ত্রের মহাশক্তি প্রমাণের জন্যে; কিন্তু তার উপন্যাসেও নারীপুরুষের বিরোধ স্পষ্ট। তিনি তাঁর নায়িকা বাণীকে শেষে পুরুষের পায়েই সঁপে দিয়েছেন, তবে এঁকেছেন নারীপুরুষের দীর্ঘ লৈঙ্গিক রাজনীতি বা বিরোধের চিত্র। তাঁর মন্ত্রশক্তিও  নারীকেন্দ্ৰিক; তার নায়িকা রাধারাণী বা বাণীর বিয়ে ও স্বামীর সাথে অপসম্পর্ক এর বিষয়।

রাজনগরের জমিদার হরিবল্লাভের বংশে এক বড়ো সমস্যা দেখা দেয় পুত্ৰ রমাবল্লাভের ঘরে কোনো সন্তান জন্ম না নেয়ায়। তবে হরিবল্লভ বাবু সুদীর্ঘ জীবনের মধ্যে পৌত্ৰমুখ সন্দর্শনের আশায় হতাশপ্ৰায় হইয়া তাহার বিপুল ধনৈশ্বৰ্য্য পরমার্থে উৎসর্গের কল্পনা করিয়া এই মন্দির নিৰ্ম্মাণে মনোযোগী হইয়াছেন, এমন সময় পুত্রবধু কৃষ্ণপ্ৰিয়া একটি পুষ্পকোরকতুল্য সন্তান প্রসব করিলেন। শিশুটি পুত্ৰ সন্তান নহে, কন্যা সন্তান। তথাপি এই ‘হাপুত্রের ঘরে তাহার আদরের সীমা রহিল না। ’

একটি পুত্র জন্ম নিলে যা হতো স্বর্গীয় আনন্দ, কন্যার জন্মের ফলে তা হয়ে ওঠে মহাসংকট। অনুরূপা জানিয়েছেন, এবং বিবরণও দিয়েছেন যে মেয়েটিকে হরিবল্লভ থেকে রমাবল্লভ অসীম আদর করে, কিন্তু মেয়েটির জীবনে ওই আদর নিরর্থক! হরিবল্লভ আদর করেও বাণীর জীবনকে ধ্বংস ক’রে যেতে দ্বিধা করে নি। রমাবল্লভ সন্তানের-পুত্রের-আশায় আরেকটি, বা অনেক বিয়ে করতে পারতো, তবে ‘পিতার বিরাগভাজন হইয়াও কেবল এই হতভাগিনীর মুখ চাহিয়াই গৃহে পুনৰ্ব্বার সৌভাগ্যবতী নববধূ আনয়ন করেন নাই। ’

এই শুধু কারণ নয়; অনুরূপা আরেকটি নবী বধু আনতে দেন নি, কেননা তিনি এ-‘হতভাগিনীর থেকে অনেক বেশি হতভাগিনী’ আরেকজনের কাহিনী বলতে চেয়েছেন।  অনুরূপা প্রথাগত বিধানের প্রতিপক্ষ নন; তিনি জানেন ‘পতিব্ৰতা হিন্দুরমণী নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে বড় করিয়া দেখিতে জানেন না। ’ রামাবল্লাভের স্ত্রী ‘অনেক অনুনয় অনুরোধেও স্বামীকে পুনৰ্ব্বিবাহে সম্মত করাইতে পারেন নাই। ’ পুরুষকে একটু দেবতা করেই এগিয়েছেন অনুরূপা।

বিয়ে মায়ের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি না করলেও কন্যার জীবনকে নষ্ট ক’রে দেয়। সমস্যা যোগ্য পাত্রের অভাব; ন-বছর বয়স থেকেই বাণীকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়, কিন্তু তেরো বছর বয়সেও তা সম্ভব হয় নি। পিতৃতন্ত্র নারীর বিয়ের আবশ্যিক বিধান দিয়েছে, এবং পিতৃতন্ত্রের এক বড়ো পুরোহিত হরিবল্লভ স্নেহ করা সত্ত্বেও পিতৃতন্ত্রের স্বার্থে পৌত্রীর জীবন নষ্ট ক’রে যেতে দ্বিধা করে নি।

পিতৃতন্ত্র হরিবল্লাভের হাতে লিখিয়ে নেয় নারীপীড়নের একটি উইল : ‘যদি পঞ্চদশ বৎসর বয়সের মধ্যে তাহার পৌত্রী রাধারানী কোন সমশ্রেণীর সমান ঘরে কুলীন সন্তানের সহিত বিবাহিতা হয়, তবেই সে অথবা তাহার সন্তান সন্ততিগণ দেবসেবা ব্যতিরেকে আয়ের সমুদয় উপস্বত্ব পুরুষানুক্ৰমে ভোগদখল করিতে পরিবে।  কিন্তু যদি তাহা না হয়–অর্থাৎ অসমান ঘরে বিবাহ হয় অথবা উক্ত সময়মধ্যে বিবাহ না হয়, তাহা হইলে রাধারানীর পঞ্চদশ বৎসর পূর্ণ হওয়ার পর দিবস প্রাতঃকালেই তাঁহার সুদূর কটুম্বপুত্ৰ মৃগাঙ্কমোহন সম্পূর্ণ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হইবেন।

রামাবল্লভ যাবজ্জীবন সহস্র মুদ্রা মাসহারা পাইবেন মাত্র, এই পৈতৃক গৃহে সেইদিন হইতে তাহার কোনই অধিকার থাকিবে না। ’ এমন একটি নিষ্ঠুর উইল করতে তার হাত কাপে নি, অথচ সে খুব ভালোবাসতো তার নাতনীকে; বাণী যদি নাতী হতো, হতো পাষণ্ড, তাহলেও সে এমন উইল করতে পারতে না। বোঝা যাচ্ছে কোনো মেয়েকে স্নেহ করা আসলে তাকে উপহাস করা। নাতনীর কোনো মূল্য নেই, স্নেহেরও মূল্য নেই; মূল্যবান হচ্ছে পিতৃতন্ত্রের বিধান। জমিদার তার প্ৰিয় নাতনীকে বনবাসে পাঠিয়ে নিদ্বিধায় সম্পত্তি উইল ক’রে গেছে এক কুটুমপুত্রের নামে, যাকে সে কখনো আদর করে নি, কাছেও পায় নি, এমনকি পছন্দও করে না।

তাই দেখতে পাই পিতৃতন্ত্রের পুরোহিতদের কাছে স্নেহের পাত্রীর থেকে অনেক প্রিয় হচ্ছে পুত্র, তা তার নিজের হোক বা যারই হোক। বাণীর জীবনকে পিতৃতন্ত্রের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সে পরলোক চ’লে যায়। অল্প বয়সে বিয়ে না হওয়ায় বাণী অবশ্য এমন কিছু সুখ ভোগ করেছে, যার সুযোগ হিন্দু মেয়েরা পায় না : ‘কুমারী জীবনের যে সুখাস্বাদে হিন্দু বালিকারা চিরবঞ্চিতা, সেই অনুপমেয় শান্তির আস্বাদ গ্ৰহণে সে নিজেকে চরিতার্থ মনে করিতেছিল। ’


 নারী

শেয়ার করুন —
5 1 vote
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top