ভোলগা থেকে গঙ্গা

অনুবাদ

০২. দিবা

মধ্য ভোলগা তট ।। কাল : ৩৫০০ খৃষ্টপূর্ব

এক

‘‘দিবা! রোদ বড় কড়া, দ্যাখ তোর সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। আয়, এই শিলা খণ্ডের ওপর বসি।’’

‘‘বেশ তাই হোক, সুরশ্রবা-আ’’ এই বলে দিবা সুরশ্রবার সঙ্গে এক বিশাল পাইন গাছের ছায়ায় শিলা খণ্ডের ওপর বসল।

গ্রীষ্মকাল, সময় মধ্যহ্ন। হরিণের পেছনে এত ছুটোছুটির পর দিবার ললাটে অরুণাভ মুক্তার মত স্বেদবিন্দু ঝরবে—তাতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু এ স্থানটি এমনই যে ক্লান্তি দূর হতে মোটেই সময় লাগে না। পাহাড়ের নীচ থেকে মাথা পর্যন্ত শ্যামল আস্তরণে আচ্ছাদিত। বিশাল পাইন বৃক্ষ আপন শাখা ও সূচালো পত্রাবলী বিস্তার করে সূর্যকিরণের গতিরোধ করছে, নিচে স্থানে স্থানে বিচিত্র বনৌষধি, লতাগুল্ম ও নানাবিধ গাছ-গাছড়া পুষ্পসম্ভারে মুকুলিত হয়ে আছে।

ক্ষণকাল বিশ্রামের পর তরুণ-তরুণীর শ্রান্তি বিদূরিত হল। চারিদিকে রঙ বেরঙ-এর ফুল, অপূর্ব মধুর গন্ধ তাদের মন হরণ করছিল। তরুণ যুবকটি আপন ধনুর্বাণ ও পাথরের কুঠার শিলা খণ্ডের ওপর রাখল, ক্ষণকাল পরে পার্শ্বস্থিত কলকল শব্দ প্রবাহিত স্ফটিক স্বচ্ছ জলস্রোতের পাশে এসে সাদা বেগনী ও লাল রঙ-এর ফুল আহরণ করতে লাগল।

তরুণী আপন অস্ত্রাদি রেখে তার দীর্ঘ সোনালী চুলে হাত দিয়ে অনুভব করল যে চুলের গোড়া তখন ভিজে। একবার নীচের দিকে তাকিয়ে প্রবাহিতা ভোলগার প্রশান্ত রুপ দেখে নিল। পাখির কল গুঞ্জনে আকৃষ্ট হয়ে চোখ ফেরাতে গিয়ে দৃষ্টি আবদ্ধ হল পুষ্পচয়নরত তরুণের প্রতি। যুবকের চুলও সোনালী, তবু তরুণী তার নিজের কেশরাশির সঙ্গে তুলনা করতে চাইল না। সে জানত তার নিজের কেশদাম অনেক সুন্দর। তরুণের মুখমণ্ডল ঘণ পিঙ্গল বর্ণ গুম্ফ শুশ্রুতে ঢাকা, তার উপরে নাসিকা কপোল ও ললাটের অরুনিমা দেখা যাচ্ছিল। তরুণীর দৃষ্টি এবার পুরুষটির পুষ্ট রোমশ বাহুর ওপর পড়ল। তার মনে পড়ে গেল, একদিন সুরশ্রবা তার শক্ত হাত দিয়ে পাথরের কুঠারের ঘায়ে হিংস্র শূকরের কোমর ভেঙে দিয়েছিল।

সেদিন মনে হয়েছিল পুরুষের হাত কতই না কর্কশ ও কঠিন, আর আজ পুষ্পচয়নরত সেই বাহুকেই মনে হচ্ছে কেমন কোমল। তবে এ কথা ঠিকই যে, বাহুর শক্ত পেশী ও তার সঞ্চালনে স্ফীত মনিবন্ধের শিরা আজও সেই শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। একবার তরুণীর মনে হল, উঠে গিয়ে বাহু যুগলকে চুম্বন করে। হ্যাঁ, এই মূহুর্তে তা খুব প্রিয় মনে হচ্ছিল। এইবার যুবকের উরুদ্বয়ের দিকে দিবার নজর পড়ল।প্রতি পদক্ষেপে গতির তরঙ্গ লীলায়িত হচ্ছিল। একেবারেই চর্বিহীন পেশীবহুল উরু। শক্তিমান জঙ্ঘা এবং ক্ষীণ কটি দিবার কাছে অতি লোভনীয় মনে হচ্ছিল। সুর অনেকবারই দিবার ভালবাসা পাবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে—অবশ্য মুখে নয় ভাবে ভঙ্গিতে; নাচের কলা-কৌশল দেখিয়ে দিবাকে খুশী করার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু তার ‘জনের’ অন্য যুবকেরা যখন দিবার সঙ্গে নাচের সুযোগ পেয়েছে, যখন হয়ত দিবার অধর চু্ম্বনের অনুমতি পেয়েছে কিম্বা বহুবার হয়ত তাদের অঙ্কশায়িনী হয়েছে তখন হতভাগ্য সুর একটি চুম্বন, একটি আলিঙ্গন—এমন কি নৃত্যের সময় একবার হাতে হাত ধরবার সুযোগও পায়নি।সুর অঞ্জলি-ভরা ফুল নিয়ে দিবার দিকে এগিয়ে আসছিল। কি অপূর্বই না দেখাচ্ছিল। তার দিকে তাকিয়ে এখানে বসে আজ দিবার মনে ক্ষোভ জেগে উঠল। কেন সে এতদিন সুরের কথা ভাবেনি । অবশ্য এর জন্য দিবাকে দোষ দেয়া যায় না—অপরাধ যদি কারুর থাকে তা সুরের। তার মুখচোরা লজ্জা এতদিন তার মুখ ফোটাতে দেয়নি। সুর কাছে দিবা হাসিমুখে বলল,‘‘কি সুন্দর ফুলগুলো, কি সুমিষ্ট এ গন্ধ!’’

উপলখণ্ডের ওপর ফুলগুলো রেখে সুর বলল,‘‘তোমার ওই সোনালী চুলে এই ফুলগুলো গুঁজে দিলে তবেই এর সৌন্দর্য পরিপূর্ণ হবে।’’

‘‘আচ্ছা সূর! সত্যিই কি আমার জন্যে এই ফুলগুলি তুমি এনেছ?’’

‘‘হ্যা দিবা। এই ফুলগুলো দেখে তোমার মুখের দিকে তাকালাম—মনে পড়ল জলপরীদের কথা।’’

‘‘জলপরী?’’

‘‘হ্যাঁ! জলপরীরা খুবই ভালো। তারা খুশী হলে সমস্ত মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে—আর যদি রুষ্ট হয় প্রাণ নিতেও ছাড়ে না।’’

‘‘আমাকে কি ধরণের জলপরী মনো হয়, সুর!’’

‘‘রুদ্রাণী নয়।’’

‘‘কিন্তু, আমি তো তোমার ওপর কখনো সোহাগ দেইনি।’’ দিবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল।

ক্ষণকাল পরে সুরশ্রবা বলল, ‘‘না দিবা! তুমি আমার ওপর কখনও রুষ্টা হওনি।

তোমার মনে পড়ে কি আমাদের ছেলেবেলার কথা?’’

‘‘তখনো তুমি কিন্তু এমনি লাজুক ছিলে।’’

‘‘তবে ‍তুমি আমার ওপর কখনও বিরুপ হওনি?’

‘তখন আমি তোমাকে নিজে থেকেই তোমাকে চুমু খেতাম।’’

‘‘কিন্তু যখন আমার যৌবনের উন্মেষ হল, যখন সারা ‘জন’-এর তরুণকুল আমাকে পাবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠল সেই সময় থেকে আমি তোমার কথা ভুলে গেলাম।’’

‘‘তোমার কোনো দোষ ছিল না দিবা।’’

‘‘তবে দোষটা কার?’’

‘‘আমারই। আমাদের ‘জন’-এর ছেলেরা চুমু খেতে চাইলে তুমি তা দিয়েছ,তারা যখন তোমার প্রেমালিঙ্গন কামনা করেছে তাও দিয়েছ। আমাদের সুন্দর সবল যে কোন যুবক মৃগয়ায় শৌর্য কিংবা নাচে কুশলতা দেখেয়েছে—তুমি কখনো তাদের নিরাশ করনি।’’

‘‘কিন্তু সুর! তুমিও তো তাদেরই মতো—বরং তাদের চেয়েও কর্মঠ, ক্ষিপ্রগতি, সুগঠিত তোমার দেহ—আমি তোমার কামনাকে তো নিরাশ করেছি।’’

‘‘আমি তো কখনও কামনা প্রকাশ করিনি, দিবা!’

‘মুখে করনি বটে! মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা, তখন তুমি কিছুই প্রকাশ করতে না কিন্তু তোমার মনের কথা বুঝতে পারতাম। তারপর দিবা সুরকে ভুলে গেল।

দিবা কখনো সুরকে—দিন কখনও সূর্যকে ভুলে থাকতে পারে? না সুর! দিবা আর কখনো তোমাকে ভুলে থাকবে না।’’

‘‘ তা’হলে ছেলেবেলার সেই দিবা-সুর হয়ে উঠব আমরা আবার।’’

ছোট শিশুর মতো নগ্ন মনোরম মূর্তি পরিপূর্ণভাবে পরস্পরের অধরে অধর মিলিয়ে দিল। আর দিবা, সুরের তিসি ফুলের মতো নীল চোখ দুটোর ওপর তার দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে চুমু খেতে খেতে বলল ‘তুমি আমার আপন মায়ের ছেলে—আর আমি তোমাকেই ভুলে ছিলাম।’’

দিবার চোখ জলে ভরে উঠল। সুর দিবার গাল নিজের চোখের জলের ধারায় মুছিয়ে ‍দিয়ে বলল, ‘‘না তুমি তো আমায় কখনো বঞ্চিত করনি, দিবা। তুমি যখন বড় হয়ে উঠলে তোমার কণ্ঠস্বর, তোমার চোখ, তোমার সারা দেহে যখন পরিবর্তন দেখা দিল তখন আমি তোমার কাছ থেকে দুরে সরে গেলাম।’’

‘‘মনের দিক দিয়ে নিশ্চয়ই নয় সুর?’’

‘‘দিবা, সে কথা……’’

‘‘না, তোমাকে বলতেই হবে। ‍তুমি বল আর কখনও ‍তুমি আমায় দেখে লজ্জা পাবে না?’’

‘‘না, আর কখনো তোমার কাছে আমার লজ্জা-ভয় থাকবে না।……আচ্ছা, এবার আমি তোমার চুলে ফুলগুলো সাজিয়ে দিই?’’

সুর লম্বা গাছের ছাল থেকে আঁশ বার করে সেই সুতোয় লাল, সাদা, বেগুনি প্রভৃতি নানা রঙের ফুল নিয়ে একটি সুন্দর মালা গাঁথল। ‍দিবার চুলের রাশ একত্র করে তা পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিল। গরমের দিনে ভোলগার তীরবাসী তরুণ-তরুণীরা প্রায়ই জলে নেমে স্মান করত সাঁতার কাটত। তাই দিবার চুলে কোন জট ছিল না। সুর নিচের গাঁধা মালাটি দিবার চুলে তিন ভাঁজ করে, কটিবন্ধে মেঘলা জড়ানোর মতো করে দু‘পাশে সাজিয়ে দিয়ে একটা প্রান্ত তার কপালের ওপর ঝালরের মতো ঝুলিয়ে দিল—তার দু‘পাশে রইল দুটো রক্তবর্ণের আর মাঝখানে সাদা রঙ-এর ফুলের সারি।

দিবা তখনো সেই শিলাখণ্ডের ওপর বসেছিল, সূর একটু দুরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। কত সুন্দরই না দেখাচ্ছিল দিবাকে। আরও একটু পেছনে সরে এসে সূর দেখতে লাগল—আরও সুন্দর দেখাল দিবাকে। তবে দুরে চলে আসার জন্যে ফুলের আর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। ফিরে এসে সুর দিবার পাশে বসল, নিজের গালের সঙ্গে গাল মিলিয়ে দিল। দিবা সাথীর চোখে চুমু খেল আর নিজের ডান হাত সূরের কাঁধের ওপর রাখল। সূর তার বাঁ হাত দিয়ে দিবার কটিদেশ জড়িয়ে ধরে বলল,‘‘দিবা! এই ফুলগুলো আগের চেয়েও কিন্তু অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে।’’

‘‘ফুল না আমি?’’

সূরের মুখে কোনো উত্তর যোগাল না, ক্ষণকাল মৌন থেকে সে বলল, ‘‘আমি যখন তোমাকে দূর থেকে দেখছিলাম তখন তোমাকে কতই না সুন্দর দেখাচ্ছিল, তারপর আরও একটু দূর গেলাম—আরও অনেক বেশী সুন্দর লাগল।’’

‘‘আর যদি ভোলগা তট থেকে দূরে দেখতে—তা’হলে?’

‘‘না, না অতদূর থেকে নয়’’—এই কথা বলার সময় সূরের চোখে ‍দুশ্চিন্তার ঝলক নেমে এল। সে আবার বলল, ‘‘বেশী দূরে গেলে ফুলের গন্ধ পাওয়া যায় না, আর তোমার মুখটাও অস্পষ্ট হয়ে যায়।’’

‘‘তুমি তা’হলে কিভাবে আমাকে দেথতে চাও? দূর থেকে না কাছ থেকে?’’

‘‘কাছে থেকে। দিনের মধ্যেই সূর্য থাকে উজ্জ্বল—দিবার কাছে থাকবে সূর?’’

‘‘আচ্ছা, আজ তুমি আমার সঙ্গে নাচবে তো!’’

‘‘নিশ্চয়ই।’’

‘‘আজ সারাদিন আমার সঙ্গে থাকবে?

‘‘অবশ্যই।’’

‘‘সারারাত?’

‘‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’’

‘‘তাহলে আজ জন-এর কোন পুরুষকে কাছে থাকতে দেব না।’’—এই বলে দিবা সুরকে আলীঙ্গনাবদ্ধ করল।

এই সময় শিকারী তরুণ-তরুণীরা ফিরে এল। তাদের সাড়া পেয়েও এরা দুজনে আগের মতোই দৃঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে রইল।

নবাগতদের একজন বলল, কিরে দিবা! আজ তুই সুরকেই সাথী করে নিলি?’’

ওদের দিকে ফিরে তাকিয়ে দিবা বলল,‘‘হ্যাঁ, এই দেখ, সুর আমাকে ফুল দিয়ে সাজিয়েছে।’’

একটি তরুণী কলকণ্ঠে বলল, ‘‘সুর তুমি তো বেশ ফুল সাজাতে পার? আমার চুলও সাজিয়ে দাও না?’’

দিবা প্রতিবাদ করে বলল, ‘‘আজ নয়, আজ সুর আমার—আমার একার।’’

তরুণী বলল ‘‘বেশ কাল সুর আমার।’’

‘‘না, কালও সুর আমার থাকবে।’’

তরুণী এবার রাগত স্বরে বলল, ‘‘রোজ রোজ সুর তোমারই থাকে না-কি? এ ঠিক না, দিবা।’’

দিবা ‍নিজের ভুল বুঝতে পারল। বলল, ‘‘রোজ নয়, শুধু আজ আর কাল।’’

ক্রমে আরো শিকারী সেখানে এসে হাজির হল। একটা বিরাট কালো কুকুর এল তাদের সঙ্গে—আর এসেই সূরের পা চাটতে লাগল। সূরের মনে পড়ে গেল তার নিজের শিকার করা ভেড়াটার কথা। দিবার কানের কাছে ফিস্ ফিস্ করে কি বলে এক দৌড়ে চলে গেল।

 

দুই

কাঠের দেওয়াল এবং খড়ের ছাউনি দেওয়া এক বিশাল কুটির। পাথরের কুঠার ধারাল হলেও তাই দিয়ে ভারী কাঠের গুঁড়ি কাটা সম্ভব হয়নি। কুড়ালের ব্যবহার করলেও-বড় বড় কাঠ কাটার ব্যাপারে আগুনের সাহায্য নিতে হয়েছে। আর এত বড় কুটির? নিশা নাম্নী পুরাকালের কোনো স্ত্রীলোকের বংশধরদের নামেই নিশা-জনের উৎপত্তি। হ্যাঁ নিশা-জনের সমস্ত লোকজনই এখানে বাস করে।সমগ্র জন গোষ্ঠি এক ছাউনির নীচে বাস করে, একই সঙ্গে শিকার করে, ফল মধু সবই একত্রে আহরণ করে। সবাই একজনকে, কর্ত্রীকে মানে। গোষ্ঠী পরিচালিত হয় সমষ্টিগতভাবে—সমিতির দ্বারা। পরিচালনা—হ্যাঁ, এই পরিচালনায় জনের ব্যক্তি বিশেষের জীবনের কোনো ঘটনাই সমষ্টি জীবনের বাইরে ছিল না। শিকার, নাচ-প্রেম, গৃহ –নির্মাণ, চামড়ার গাত্রবাস তৈরী—সমস্ত কাজই জনসমিতির পরিচালনায় হত। আর এই সমস্ত কাজে জন-মাতাদের প্রাধান্যই ছিল প্রবল। নিশা জনে দেড়শ নরনারী বাস করে। তবে কি এরা একই পরিবারভুক্ত? এ অর্থে তাদের সবাইকে একটা পরিবার-ভুক্ত বলা চলে আবার অ্য অর্থে কয়েকটি পৃথক পরিবারের সমষ্টিও বলা চলে।

মাতার জীবনকালের তাদের কন্যাদের যে সন্তানাদি হয় তার দ্বারা আবার ছোট ছোট শাখা পরিবারের সৃষ্টি হয়। কারণ মাতার নামেই সন্তানরা পরিচিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, দিবার সন্তানরা দিবা-পুত্র বা দিবা-কন্যা বলেই পরিচিত। কিন্তু, খাদ্য মাংস বা ফল বা মধু যাই তারা সংগ্রহ করুক না কেন তা দিবা সন্তানদের ব্যক্তিগত নিজস্ব সম্পত্তি হবে না। জনের স্ত্রী পুরুষ সকলে একত্রে সম্পত্তি অর্থ্যাৎ খাদ্যবস্তু প্রভৃতি সংগ্রহ করে—আর সকলে মিলেই তা ভোগ করে। যদি কিছুই আহরণ করা সম্ভব না হয়, তবে একসঙ্গে সকলেই অনাহারে থাকবে। জন থেকে পৃথক করে ব্যক্তি বিশেষের কোনো বিশেষ অধিকার থাকে না। জনের বা গোষ্ঠীর আজ্ঞা এবং রীতিনীতি পালন করা তাদের কাছে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার মতোই সহজ বলে মনে হত।

এই কুটিরটাও তাদের অস্থায়ী বাসস্থান। কারণ যখন শিকার যোগ্য জীব এখান থেকে চলে যাবে, ফলমূলের অভাব ঘটবে তখন সারা গোষ্ঠীর মানুষেরা এ জায়গা ছেড়ে নতুন অঞ্চলে সরে যাবে। বহু যুগের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানে,কোথায় কথন শিকার পাওয়া যাবে। এখান থেকে চলে যাবার পর ছাউনি পড়ে যাবে কিন্তু কাঠের দেওয়াল কয়েক বছর পর্যন্ত টিকে থাকবে। নতুন জায়গায় গিয়ে এরা অনুরূপভাবে পরিত্যক্ত দেওয়ালের ওপর খড়ের ছাউনি দিয়ে নতুন ঘর বানাবে আর তারই একাংশে জিনিস –পত্র রাখা ও অপরাংশ রান্নার কাজে ব্যবহার করবে। এরা এখন হাতে-গড়া মাটির বাসন তৈরী করতে শিখেছে। কখনো বা কাঁচা মাংস খায়—আবার তাজা মাংস পুড়িয়েও খায়, তবে শুকনো মাংস সেঁকে খাওয়ার রীতি নেই—তা নিষিদ্ধ। ভোল্গার এই অংশে মধু পাওয়া যায় যথেষ্ট আর তার জন্যে মধুপায়ী ভাল্লুকের সাক্ষাৎও মিলত প্রচুর। নিশা গোষ্ঠী আহার এবং মদ্য পানের জন্য মধু সংগ্রহ করত।

মধুর সঙ্গীতের আওয়াজ আসছে, ঘরে গানের আসর বসেছে। নারী-পুরুষ সকলেই গলা ছেড়ে সজীব কণ্ঠে গান ধরেছে। চামড়া পিটিয়ে যখন গাত্রবস্ত্র তৈরী করত তা হত সেই কর্মরত মানুষের সঙ্গীত। তখনকার দিনে সমস্ত গোষ্ঠীর লোক কোনো কাজ শুধু যে সম্মিলিতভাবেই করত তা নয়, পরন্তু তা সম্পাদন করত মনোরঞ্জক ভঙ্গিমা সহকারে । তা ছিল সম্মিলিত কাজের একটি অঙ্গ। সঙ্গীতের মূর্ছনা কর্মের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু এই গান কর্মকালীন গান নয়। এখন বিশ্রামকালীন আনন্দের গান হচ্ছে। একবার নারীকণ্ঠের সুললিত সুর-লহরী শোনা যাচ্ছে—আবার শোনা যায় পুরুষ কণ্ঠের পুরুষ ও গম্ভীর সুর।

কুটিরের এক অংশে গোষ্ঠীর স্ত্রী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, একত্রে সমবেত হয়েছে। ছাউনির মাঝখানের ছাত কাটা আছে, আর তারই নিচে পাইন কাঠের আগুন জ্বলছে। স্ত্রী পুরুষ সুললিত তালে গান গাইছে, গানের পদে এই শব্দগুলো বোঝা যাচ্ছে—’’

‘‘অ-ন্ত-ন্ত-গ-লী-ই-এ-সো-অ-অ—’

মনে হচ্ছে এরা যেন আগুনের কাছে প্রার্থনা করছে। গোষ্ঠীর নেত্রী ও জন-সমিতির লোকেরা আগুনের মধ্যে মাংস, চর্বি, ফল ও মধু আহতি দিতে আরম্ভ করল। বর্তমানে জনের হাতে অনেক শিকার সঞ্চিত হয়েছে, প্রচুর ফল ও মধু আহরিত হয়েছে-আর এই ঋতুতে কেউ জানোয়ার বা শত্রুর দ্বারা নিহত হয়নি। তাই আজ জনের মানুষেরা পূর্ণিমার রাত্রে অগ্নি-দেবতার কাছে কৃতাঞ্জলিপুটে প্রার্থনা নিবেদন করছে। জনের নেত্রী এক পাত্র সোমরস আগুনে সমর্পণ করল এবং গোষ্ঠীর সবাই আগুনের চারপাশে ঘিরে দাঁড়াল। জন্মের সময় মানুষ যেমন উলঙ্গ হয়ে পৃথিবীতে আসে—এরা সেই জন্ম থেকে আজও নিরাবরণ, সেইভাবেই এখানে এসেছে। এখন শীতকাল নয়—গরমের সময়, মৃত পশুর চামড়ায় নিজের দেহ আবৃত করার দরকার মনে করে না।

কিন্তু, কি সুন্দর সুডৌল এদের শরীর্। কারও ভুঁড়ি গজায়নি, কারও শরীরে চর্বি জমে দেহ স্থুল হয়নি। একেই বলে দেহ সৌন্দর্য—সুন্দর স্বাস্থ্য! এদের সকলের মুখশ্রী একই ছাঁচের। আর, না-হবেই বা কেন? এরা সকলেই নিশা সন্তান—পিতা-পুত্র-ভাইদের দ্বারা জাত। সকলেই স্বাস্থ্যবান এবং বলিষ্ঠ। অস্বাস্থ্য এবং ক্ষীনকল ব্যক্তি বেঁচে থাকতে পারে না, এই প্রকৃতি ও শিশু জগতের শত্রুতার মধ্যে টিকে থাকা সম্ভব নয়। গোষ্ঠী কর্ত্রী উঠে কুটিরের বড় ঘরটায় গেল। অন্যান্য সকলে কুটিরের মাটিলেপা মেঝেতে এসে বসল।

চামড়ার থলির পর থলি ভতি হয়ে সোমরস আসতে লাগল। কারও কাছে চষক (পেয়ালা) মাটির পাত্র, কেউবা নিয়েছে ভাঁড়, কারও হাতে মাথার খুলি, আবার কেউ হয়ত জোগাড় করেছে গাছের পাতার ঠোঙ্গা। তরুণ-তরুণী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই পানাহারে মত্ত হল। সব দলে দলে পৃথক হয়ে বসে খাচ্ছিল। অবশ্য এটা সাধারণ রীতি নয়। বৃদ্ধদের মনে পড়ছিল, তাদের বয়সকালে তারা জীবনের আনন্দ কিভাবে উপভোগ করেছে। তারা জানে এখন তরুণ-তরুণীদের পালা, কোনো কোনো তরুণ-তরুণী অবশ্য বৃদ্ধদের মুখে মদের পাত্র তুলে ধরছিল, যারা জীবন সায়াহ্নে পৌছেছে, তাদের কাছে পৌছে দিচ্ছিল যৌবনের হাতছানি। ওই দেখুন দিবাকে। তাকে ঘিরে কত তরুণ-তরুণী বসে আছে। তার হাত আজ রিভুর কাঁধে। সূর বসেছে আজ দামার সঙ্গে।

পান-আহার, নৃত্যগীত এ সবের পর একই ঘরের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকারা অঙ্ক শয্যায় শয়ন করে রইল। সকালে উঠে কতক স্ত্রী-পুরুষ ঘরের কাজে লাগবে, কতক শিকারে বেরুবে, আর কিছু লোক যাবে ফল আহরণে। রক্তিম কপোল ছোট ছোট শিশুরা কেউ মায়ের কোলে, কেউ বিছানো চামড়ার ওপর শুয়ে রইল। আবার কেউ বা একটু বয়স্ক বালক বালিকার কোলে-কাঁধে চেপে ঘুরতে লাগল, কেউ কেউ ভোলগার বালুতটে লাফালাফি করে বেড়াতে লাগল।

নিশার যুগের তুলনায় এ যুগের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা অনেক বেশী শান্ত ও সন্তুষ্ট। গোষ্ঠী বা জন এখন আর একজন মায়ের অধীনে নয়। পরন্তু অনেক জীবিত মায়ের ছেলেমেয়ে এখন একত্রে এক গোষ্ঠীতে বা বৃহৎ পরিবারে সমবেত হয়েছে এবং এখানকার কর্ত্রী-মায়ের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ নয়—রাজত্ব একচ্ছত্র নয়। জন-সমিতি এখন দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা। তাই আর আর কোনো নিশার আপন কন্যাকে জলে ডুবিয়ে মারবার দরকার হয় না।

 

তিন

দিবা এখন চার পুত্র এবং পাঁচ কন্যার জননী, বয়স পঁয়তাল্লিশ। এখন সে নিশা-গোষ্ঠীর কর্ত্রী মায়ের পদে অধিষ্ঠিতা। গত 25 বছরে নিশা-গোষ্ঠীর লোক সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে গেছে । এই বাড়বাড়ন্তের জন্য সূর যখন দিবাকে চুমু খেয়ে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছে, দিবা জবাব দিয়েছে, ‘‘এ সবই অগ্নির দয়ায়—সূর্য দেবতার কৃপায়। অগ্নি ও সূর্য যারই সহায় হন, সে সেখানেই থাক—ভোল্‌গার স্রোতের মতোই তার ঘরে মধুর বন্যা বইবে; দলে দলে হরিণ আসবে বনে—তার আহার যোগাবার জন্যে।’’

নিশা জনের সমস্যাও বেড়েছে অনেক। আগে তারা যে সমস্ত জঙ্গলে আস্তানা গাড়ত এখন আর সেইরকম ছোট জঙ্গলে তাদের কুলোয় না। তাদের ‘জন-দম’ (যৌথ বাসগৃহ) গুলিই যে তিনগুণ বাড়াতে হয়েছে শুধু তাই নয়, মৃগয়া ক্ষেত্রের পরিধিও দরকার তিনগুণ। বর্তমানে তারা যে মৃগয়ায় ভূমির কাছে আস্তানা নিয়েছে, তার ওপারে ঊষা-জনের মৃগয়া ক্ষেত্র। উভয়ের সীমানার মাঝখানে ছিল একটি অনধিকৃত ভূমি। নিশা-গোষ্ঠীর লোকেরা সময়ে সময়ে শুধু যে অনধিকৃত ভূমিতে শিকার করত তা নয়—পরন্তু তারা ঊষা-গোষ্ঠীর মৃগয়া ভূমিতে কয়েকবার শিকার করতে গিয়েছে।

জন-সমিতি (গোষ্ঠীর মন্ত্রনা পরিষদ) দেখল যে এতে করে ঊষা-গোষ্ঠীর সঙ্গে নিশা পরিবারের সংঘর্ষ বেধে যেতে পারে, কিন্তু এর প্রতিকারের কোনো উপায় ছিল না। একদিন তো দিবা স্পষ্টভাবে ‘জন-সমিতিকে বলল, ‘‘ভগবান যখন আমাদের এতগুলি জীব দিয়েছেন তখন এইসব বন-জঙ্গলে তাদের খাদ্যও নিশ্চয় পূর্ণ থাকবে। এইসব মৃগয়া ক্ষেত্র ছাড়া এতগুলো মুখে আহার যোগানো সম্ভব নয়। এইসব জঙ্গলে যে সমস্ত ভাল্লুক, গরু, ভেড়া আছে তা কিছুই ছাড়া যায় না—যেমন ছেড়ে দিতে পারি না এই ভোল্‌গার মাছ।’’

ঊষা-গোষ্ঠী দেখল যে নিশা-জন অন্যায়ের পর অন্যায় করে চলেছে। একবার দু‘বার ঊষা-জনের জন সমিতি নিশা-গোষ্ঠীর জন-সমিতির সঙ্গে আলাপ আলোচনা করল, স্মরণ করিয়ে দিল, এই দুই জনের মধ্যে আবহমান কাল ধরে কোন সংঘর্ষ হয়নি; এ কথাও বলল যে প্রতিকার শীতের তারাই এখানে এসে থাকে। কিন্তু অনাহারে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে ‍যদি নিশা-গোষ্ঠীকে ন্যায়ের শপথ নিতে হয়—তা কি করে সম্ভব!

সকল আইন যখন বিফল তখন জঙ্গল আইনের আশ্রয় নিতে হয়। উভয় গোষ্ঠীই ভেতরে ভেতরে যুদ্ধের প্রস্তুতি চালাতে লাগল। একের খবর অপরের পাবার উপায় ছিল না। কারণ এই সময়ে জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ আপন-আপন গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। নিশা-জনের একটি দল একদিন পাশের বনে ঊষা-জনের মৃগয়া ভূমিতে শিকার করতে গেল।

ঊষা-গোষ্ঠীর লোকেরা লুকিয়ে বসেছিল, তারা আক্রমণ করল। নিশা-গোষ্ঠীর লোকেরা বীরত্বের সঙ্গে লড়ল কিন্তু তারা আগে থেকে প্রস্তুত হয়ে বেশী সংখ্যায় আসেনি। আপন দলের বহু মৃতকে ফেলে আহতদের সঙ্গে নিয়ে শিকারীর দল পালিয়ে এল। জন-মাতা সমস্ত শুনল, জন-সমিতি আলোচনা করল, তারপর সাধারণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হল। সমস্ত ঘটনা তাদের সামনে উপস্থিত করা হল। মৃত ও আহতদের ভাই ছেলেরা, মা-মেয়ে-বোনেরা রক্তাক্ত প্রতিহিংসার জন্য উত্তেজিত করতে লাগল। রক্তের প্রতিশোধ নিতে না পারা এবং জন-ধর্মের বিরোধিতা করা—কেউ বর্জন করতে পারত না। সমগ্র গোষ্ঠী সমবেতভাবে সিদ্ধান্ত নিল, মৃতদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে।

নাচের বাজনা ‍যুদ্ধের বাজনায় পরিবর্তিত হল। শিশু ও বৃদ্ধদের রক্ষার জন্য কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষকে রেখে বাকি সকলে যুদ্ধযাত্রা করল; ধনুক-পাষাণ-কুঠার, কাঠের বল্লম ও কাঠের মুদগর আর দেহরক্ষার জন্য কঠিন ও দৃঢ় চামড়ার বর্ম আবরণ। সামনে চলল বাদকেরা, প্রধনা হিসেবে সেই যুদ্ধের পরিচালিকা। বাজনার আওয়াজে দিগন্ত ধ্বনিত ও অনুরণিত হল, লোকের কোলাহলে বনভূমি মুখরিত হল, পশুপক্ষীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে এদিক সেদিক পালাতে শুরু করল।

একটু পরেই তারা অনধিকৃত বনভূমিতে এসে পৌছাল। কোনো সীমারেখা না থাকা সত্ত্বেও এই সমস্ত গোষ্ঠীর লোকেদের সীমান্ত সম্পর্কে ভালোভাবেই জ্ঞান ছিল এবং এ ব্যাপারে মিথ্যা বলতে পারত না। মিথ্যা তখন মানব-সমাজে অপরিচিত আর সে বিদ্যা আয়ত্ব তাদের পক্ষে কঠিন ছিল। অপর গোষ্ঠীর শিকারীরা আপন গোষ্ঠীতে গিয়ে খবর দিল, এবং ঊষা-জনের যোদ্ধারা হাতিয়ারে সুসজ্জিত হয়ে ময়দানে এল। ঊষা-গোষ্ঠী বস্তুত ন্যায় চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল, আপন মৃগয়া ক্ষেত্র রক্ষা করতে। আর আপন ভূমি রক্ষার জন্যই তাদের সংগ্রাম। কিন্তু নিশা-গোষ্ঠী এই ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে প্রস্তুত ছিল না।

উষা-গোষ্ঠীর মৃগয়া ক্ষেত্রে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হল। উভয় পক্ষ থেকেই পাথরের ফলাযুক্ত বাণ শন-শন করে বর্ষিত হতে লাগল, কুঠারের-কুঠার, বল্লমে-বল্লমে, মুদগরে-মুদগরে যুদ্ধ হতে থাকল, উভয় পক্ষের লোকই আহত হল। হাতিয়ার ভেঙে বা হাত থেকে পড়ে গেলে হাতে হাতে-দাঁতে বা মাটি কুড়িয়ে নেওয়া পাথরের সাহায্যে যুদ্ধ চলতে লাগল।

নিশা-গোষ্ঠীর জনসংখ্যা ঊষা-গোষ্ঠীর দ্বিগুণ, কাজেই ঊষা-গোষ্ঠীর পক্ষে জয়লাভ ছিল অসম্ভব। কিন্তু একটি বালকও জীবিত থাকা পর্যন্ত তাদের যুদ্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। এক প্রহর দিন অর্থ্যাৎ সূর্য ওঠার তিন ঘণ্টা পর যুদ্ধ শুরু হয়েছিল—ঊষা গোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশ লোক বনের মধ্যেই নিহত হল। গোষ্ঠী-যুদ্ধে আহত শত্রুকে ছেড়ে যাওয়া নিতান্ত অধর্মের কাজ। অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ ভোল্‌গা তটে তাদের শেষ শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে প্রাণ দিল। কয়েকজন জননী শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আবাসভূমি ছেড়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করল, কিন্তু তখন আর সময় ছিল না, প্রতিহিংসা-পরায়ণ শত্রুরা তাদের অনুসরণ করে ধরে ফেলল—স্তন্যপায়ী শিশুদের ধরে ধরে পাহাড়ের ওপর আছড়ে গুড়িয়ে দিল, বৃদ্ধ স্ত্রী-পুরুষদের গলায় পাথর বেঁধে ভোল্‌গার জলে ডুবিয়ে দিল।

তাদের বাসগৃহে রক্ষিত মাংস, ফল, মধু ও সুরা এবং অন্যান্য দ্রব্য সম্ভার বাইরে এনে অবশিষ্ট জীবিত শিশু ও স্ত্রী লোকদের ঘরে বন্ধ করে আগুন লাগিয়ে দিল। প্রজ্ব্বলিত অগ্নিশিখার লেলিহান আভার মধ্যে দাঁড়িয়ে জীবন্ত মানুষের আর্তনাদ বিজয়ী নিশা-গোষ্ঠীর লোকদের উল্লসিত করে তুলল। তারা অগ্নি দেবতাকে কৃতজ্ঞতা জানাল, শত্রুর সঞ্চিত মদ ও মাংসে দেবতা ও নিজেদের পরিতৃপ্ত করল।

দিবা খুবই উল্লসিত হয়ে উঠল। তিন তিনটি মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে আনা শিশুকে পাথরে আছড়ে মেরেছে। আজ পানাহারের পর শুরু হল নৃত্য। আগুনের সামনেই দিবা তার তরুণ ছেলে বাসুকে নিয়ে নাচতে শুরু করে দিল। নাচের তালে তালে দুই উলঙ্গ নরনারী পরস্পরকে আলিঙ্গন আর চুম্বন করতে লাগল—কখনও বা ছাড়াছাড়ি হয়ে নিজেদের নিজস্ব নাচের ভঙ্গিমা দেখাতে লাগল। সকলেই বুঝল আজ রাতে বাসুই হবে নেত্রী দিবার ক্রীড়া ও শয্যাসঙ্গী। বাসু তার জয়োন্মাত্তা মায়ের কামনাকে অবহেলা করতে চাইল না।

নিশা গোষ্ঠীর মৃগয়াভূমি এখন চারগুণ বেড়ে গেল আর শীতকালে তারা কোথায় থাকবে সে চিন্তাও দূর হল। তবু একটা দুশ্চিন্তা তাদের রয়ে গেল—ঊষা গোষ্ঠী জীবিত অবস্থায় যে ক্ষতি করতে পারেনি এখন মৃত্যুর পর প্রেতযোনি পেয়ে তাদের প্রতিশোধ নেবে। যে ঘরে জীবিতদের পোড়ানো হয়েছেল সেই ঘরটা ভূতের আড্ডা হল। নিশা-গোষ্টীর কেউ একা সেখান দিয়ে যেতে সাহস পায় না। বহুবার শিকারীরা না-কি দেখেছে শত শত উলঙ্গ নরনারী জ্বলন্ত আগুনের সামনে নাচছে। বাসভূমি পরিবর্তনের প্রয়োজনে যেদিন ওই পোড়াঘরের সামনে দিয়ে যেতে হয়েছে—সংখ্যায় তারা বেশী ছিল আর দিনের আলো ছিল বলে রক্ষে। দিবা তো কয়েকবারই দেখেছে যে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে দুগ্ধপোষ্য শিশু মাটি থেকে এসে তার হাত ধরে ঝুলছে—ভয়ে সে চিৎকার করে উঠেছে।

 

চার

দিবার বয়স এখন সত্তরের ওপর। এখন সে আর নিশা-জনের কর্ত্রী নয়—তবু গোষ্ঠী সকলেই তাকে সম্মান করে। তার বিশ বছরের নেতৃত্বে সে বংশের বৃদ্ধি এবং কল্যাণের জন্য অনেক কিছু করেছে। এই বিশ বছরে জনকে অপর গোষ্ঠীর সঙ্গে অনেকবার ‍যুদ্ধ করতে হয়েছে, তাতে ক্ষয়-ক্ষতি ও জনহানি হয়েছে। এখন তাদের দখলে পর্যাপ্ত মৃগয়াভূমি—তাতে কয়েক মাস স্বচ্ছন্দে চলে যায়। দিবার কাছে এ সবই ভগবানের কৃপা বলে মনে হয়। দিবার মনে ভয় এখনো কাটেনি—হাত ঝোলা মৃত স্তন্যপায়ী শিশুরা এখনো মাঝে মাঝে তার রাতের ঘুম ঘুচিয়ে দেয়।

শীতকাল এসে পড়েছে। ভোল্‌গার স্রোত জমাট হয়ে গেছে—তার ওপর কয়েক মাসের সঞ্চিত তুষার স্তুপের দিকে দূর থেকে তাকালে মনে হয় রৌপ্যচূর্ণের অথবা পেঁজা তুলোর আঁকাবাঁকা রেখা চলে গেছে। অপর দিকে বনভূমিতে হিমশীতল নির্জীবতা ও স্তব্ধতা বিরাজ করছে। নিশা-গোষ্ঠীর লোকসংখ্যা আরও বেড়েছে। তাই তাদের খাদ্যের প্রয়োজন বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে কাজ করার লোকও অনেক বেড়েছে—কাজের দিন তাদের খাদ্যভান্ডারে প্রভুত পরিমাণ খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। এমন কি শীতকালেও পোষা কুকুর নিয়ে নিশা পরিবারের ছেলেমেয়েরা শিকারে বেরুলে কিছু না কিছু পেয়েই থাকে।

শিকারের একটি নতুন উপায় তারা বার করেছে—হরিণ, গরু, বুনোঘোড়া নিজেদের খাবারের খোঁজে এ-বন ও বন-ঘুরে বেড়ায়। বনে থাকতে শিকারীরা লক্ষ্য করেছে যে মাটিতে বীজ পড়লে তাতে অঙ্কুর জন্মায়। তাই তারা ভিজে মাটির ওপরে ঘাসের বীজ ছড়াতে শুরু করল। ফলে সেখানে ঘাস জন্মাল, তৃণভোজী পশুরাও আসতে আরম্ভ করল—ক্রমে তারা একই অঞ্চলে বেশিদিন থাকতে লাগল।

একদিন ঋক্ষশ্রবার শিকারী কুকুরটা একটা খরগোশের পেছনে তাড়া করল—ঋক্ষশ্রবাও ছুটল তার পেছন পেছন। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল, তাই সে আপন চামড়ার আবরণটি খুলে কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে নিল। ইতিমধ্যে কুকুরটা কখন দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে। তুষারের ওপর পায়ের ছাপ পড়েছে—তাই পদচিহ্ন দেখা গেল। ঋক্ষ হাঁপাতে হাঁপাতে একটা গাছের গুঁড়িতে বিশ্রামের আশায় বসে পড়ল।

পূর্ণ বিশ্রামের আগেই কুকুরটার ডাক শুনতে পেয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে আবার দৌড়াতে লাগল। ক্রমেই সে শব্দটার কাছে এসে পড়ল; আরও কাছে এসে দেখতে পেল যে পাইন গাছে হেলান দিয়ে একটি অপূর্ব সুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। সাদা চামড়ার একটি পোষাক তার পরনে—সাদা শিরস্ত্রাণের নীচে আলুলায়িত কেশগুচ্ছগুলি দেখা যাচ্ছে। আর তার পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা খরগোশ। ঋক্ষ এসে পৌছালে কুকুরটা জোড়ে ডাক ছাড়তে ছাড়তে তার কাছে এল। ঋক্ষ মেয়েটির মুখের দিকে চাইল। মেয়েটি একটু হেসে জিজ্ঞাসা করল, ‘‘বন্ধু’’ এ কুকুরটি কি তোমার?’’

‘‘হ্যাঁ আমার! কিন্তু তোমাকে তো এর আগে কখনও দেখিনি!’’

‘‘আমি কুরু বংশের মেয়ে। এ এলাকাটা আমাদেরই।’’

‘‘কুরুবংশ!’’

কুরু-গোষ্ঠী শুনে ঋক্ষর মনে কিছুটা বিদ্বেষ জন্মাল। কুরুরা তাদের প্রতিবেশী এবং কয়েক বছর ধরে বিরোধ চলছে। বিরোধ কয়েকবার যুদ্ধের পর্যায়ে উঠেছে। কুরুরা অবশ্য ঊষা-গোষ্ঠীর চেয়ে বেশী বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। তারা বুঝেছিল যে, যুদ্ধে জেতবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই পালানোই শ্রেয় ও কার্যকরী বলে স্থির করেছে। অস্ত্রের জোরে রক্ষা না পেলেও—পালিয়ে বেঁচেছে। নিশা বংশের যোদ্ধারা প্রতিজ্ঞা নিয়েছিল, তারা কুরুবংশ ধ্বংশ করবে—কিন্তু এখনো সে প্রতিজ্ঞা পালিত হয়নি।

তরুণী বলল, ‘‘তোমার কুকুরটি এই খরগোশটা মেরেছে—এটা তুমি নিয়ে যাও।’’

‘‘কিন্তু কুরদের মৃগয়া ক্ষেত্রে মেরেছে।’’

‘‘হ্যাঁ তা মেরেছে। কিন্তু আমি কুকুরের মালিকের প্রতিক্ষায় ছিলাম।’’

‘‘প্রতীক্ষায়!’’

‘‘হ্যাঁ, মালিকের হাতে খরগোশটা দেব বলে।’’

কুরু-কুলের নাম শুনে ঋক্ষর মনে যে বিদ্বেষের সঞ্চার হয়েছিল তা সুন্দরীর নম্র আলাপে বিদারিত হল। প্রত্যুপকারের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বলল, ‘‘শুধু শিকার নয়, তুমি আমার কুকুরকে ফিরিয়ে দিয়েছ। এই কুকুর আমার খুব প্রিয়।’’

‘‘কুকুরটা সত্যিই অনেক সুন্দর।’’

‘‘সারা গোষ্ঠীর মাছে থাকলেও আমার ডাক শুনতে পেলে ছুটে আসে।’’

‘‘তার নাম?’’

‘‘শম্ভু!’’

‘‘তোমার নাম, বন্ধুবর?’’

‘‘ঋক্ষশ্রবা, রোচনা পুত্র!’’

‘‘রোচনা পুত্র? আমার মা’র নামও রোচনা ছিল। ঋক্ষ, খুব তাড়া না থাকলে একটু বস।’’

ধনুক ও পরিধান বরফের ওপর রেখে সুন্দরীর পায়ের কাছে বসতে বসতে ঋক্ষ বলল, ‘‘তোমার মা বেঁচে নেই?’’

‘‘না! নিশা-গোষ্ঠীর যুদ্ধে মারা গেছে। আমাকে খুব ভালবাসত।’’ বলতে বলতে তরুণীর চক্ষু আর্দ্র হয়ে এল।

ঋক্ষ নিজের হাতে তরুণীর অশ্রু মুছিয়ে দিয়ে বলল, ‘‘কি বিচ্ছিরি এই যুদ্ধ!’’

‘‘হ্যাঁ, কত প্রিয়জনের বিচ্ছেদ সইতে হয়।’’

‘‘কিন্তু, এখনো তো যুদ্ধ মিটছে না!’’

‘‘একের উচ্ছেদ ছাড়া কি করে থামবে?’’ তরুণী বলল, ‘‘শুনেছি নিশা-পুত্রেরা আবার আক্রমণ করবে। আমি ভাবছি ঋক্ষ তোমার মতোই ওরাও তো তরুণ!’’

‘‘তোমার মতো সুন্দরী মেয়েও তো কুরু-গোষ্ঠীতে আছে।’’

‘‘তবু আমাদের একে অন্যকে মারতে হবে ঋক্ষ, এ কোন ধারা?’’

ঋক্ষের মনে পড়ল তিন দিন পর তাদের গোষ্ঠী কুরুগণের ওপর আক্রমণ করবে। ঋক্ষ কিছু বলার আগেই তরুণী বলল, ‘‘কিন্তু আমরা আর যুদ্ধ করব না।’’

‘‘লড়বে না? কুরুরা আর যুদ্ধ করবে না!’’

‘‘ঠিকই। আর লড়বে না। আমাদের লোক এত কমে গেছে যে, আমাদের জেতার আর কোন আশাই নেই।’’

‘‘কুরুরা তবে কি করবে?’’

‘‘এই ভোল্‌গা তট ছেড়ে চলে যাবে। ভোল্‌গা মায়ের ধারা আমাদের কত প্রিয়। একে আর দেখতে পাব না—তাই আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এখানে বসে বসে এর সুপ্ত ধারাকে দেখছি।’’

‘‘তুমি তা‘হলে আর ভোল্‌গাকে দেখবে না?’’

‘‘সাঁতারও কাটতে পাব না। এই শান্ত জলস্রোতে সাঁতার কেটে কি আনন্দই না পেতাম’’—সুন্দরীর কপোলে চোখের জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল।

‘‘কত ক্রুর, কত নিষ্ঠুর এই যুদ্ধ!’’ উদাস স্বরে ঋক্ষ বলল।

‘‘কিন্তু এই ‘‘জন’’-এর ধর্ম!’’ রোচনা বলল।

‘‘আর এই বর্বর ধর্মও বটে!’’ ঋক্ষ জবাব দিল।


 ভোলগা থেকে গঙ্গা

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top