মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ

০১. জীবনের উদ্ভবের সম্ভাব্য ধারণাগুলো

চারিদিকে শান্ত বাতি ভিজে গন্ধ-মৃদু কলরব;
খেয়া নৌকাগুলাে এসে লেগেছে চরের খুব কাছে;
পৃথিবীর এই সব গল্প বেঁচে রবে চিরকাল;
এশিরিয়া ধুলাে আজ ব্যাবিলন ছাই হয়ে আছে।

জীবনানন্দ দাশ

জীববিদ্যার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল – ‘কিভাবে, কখন আর কোথায় প্রথম প্রাণের উৎপত্তি হল?’। এ প্রশ্নগুলাে জীববিজ্ঞানের চিরন্তন এবং মৌলিক প্রশ্ন। এ প্রশ্নের সমাধান করতে গিয়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, প্রাণিবিজ্ঞানী, রসায়ন বিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী সবাই বরাবর হিমসিম খেয়েছেন। এমন কি ডারউইন নিজেও একসময় বলেছিলেনঃ

“বর্তমানকালে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে ভাববার মত বাজে কাজ আর কিছুই নেই, তার চেয়ে বরং বস্তুর উৎপত্তি নিয়ে ভাবা যেতে পারে’ (It is mere rubbish thinking at present of the origin of life; one might as well think about the origin of matter).

এর কারণ হল জীবনের উৎপত্তিসূচক প্রশ্নগুলাে শুনতে যত সহজ সরল শােনায়, এ গুলাের সমাধান কিন্তু এত সােজা নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্তর্নিহিত নানা জটিলতা। তারপরেও মানুষের অনুসন্ধিৎসু মন বসে থাকে নি। আজানাকে জানবার আগ্রহে উত্তর খুঁজে নিতে চেয়েছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু জীবনের ‘গােলােকধাঁধা’র সমাধান তাে এত সহজ নয় যে ‘জলবৎ তরলং’ এর সমাধান পেয়ে যাবে, যদিও মানুষ কিন্তু প্রতিনিয়তই আশাবাদী। এ প্রসঙ্গে জেডি বার্ণলের উক্তিটি স্মর্তব্যঃ

Life is beginning to cease to be a mystery and becoming practically a cryptogram, a puzzle, a code that can be broken, a working model that sooner or later can be made.

বার্নাল এ উক্তিটি করেছিলেন ১৯৬৭ সালে; এর পর কয়েক দশক পার হয়ে গেছে। তারপরও জীবনের সঠিক সংজ্ঞা আর উৎপত্তির ইতিহাস সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে কি? আসলে জীবনের উৎপত্তিকে বুঝতে হলে জড় জগতে আর জীবজগতে বিবর্তনকে খুব ভালভাবে বােঝা ছাড়া গতি নেই। জড় জগতে বিবর্তন বলতে আমি মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং তার ধারাবাহিক ক্রমবিকাশকে বুঝাচ্ছি।

আজ থেকে মােটামুটি সাড়ে চারশ কোটি বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল। কিভাবে মহাবিস্ফোরণ থেকে শুরু করে প্রাথমিক কনিকার উৎপত্তি, তারপর ধীরে ধীরে এক সময় শক্তির প্রাধান্য অতিক্রম করে শুরু হল পদার্থের প্রাধান্য, সেই থেকে শুরু করে তারামন্ডল, কোয়েসার, ছায়াপথ, সূর্য, সৌরজগৎ, সবকিছু পার হয়ে কিভাবে অবশেষে আমাদের এ পৃথিবীর জন্ম হল তার একটি পর্যায়ক্রমিক ধারণা প্রথম গ্রন্থকার তার ‘আলাে হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ বইটিতে (অঙ্কুর প্রকাশনী; ২০০৫, ২০০৬) দিতে চেষ্টা করেছে। উক্ত বইটিকে জড়জগতে বিবর্তনের একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ হিসেবেও ধরা যেতে পারে। তবে জড়জগতে বিবর্তনই কিন্তু সবটুকু নয়। প্রাণের উৎপত্তি আর জীবজগতে বিবর্তনের ইতিহাসটা না তুলে ধরলে গল্পটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। বাস্তবে বিবর্তন যে অনুক্রমে ঘটেছে তা হল :

জড় জগতে বিবর্তন –> প্রাণের উৎপত্তি –> প্রজাতির উৎপত্তি -> মানুষের উৎপত্তি

তবে এ বইটিতে আমাদের আলােচনা মূলতঃ প্রাণের উৎপত্তির বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে।

সেই সাড়ে চারশ কোটি বছর আগেকার পৃথিবী কিন্তু কোন দিক দিয়েই আজকের পৃথিবীর মত ছিল না। তখন পৃথিবীতে কোন প্রাণ ছিল না। পৃথিবী ছিল প্রচন্ড উত্তপ্ত, আর আকাশ আর পৃথিবী পরিপূর্ণ ছিল বিষাক্ত গ্যাসে। তারপর একসময় অনেককিছুর বদল হল, পৃথিবীও একসময় বারিধারায় শীতল হল। এমনি এক পরিস্থিতিতে এককোষী জীবের উদ্ভব ঘটল।

তবে ঠিক কোন মহেন্দ্রক্ষণে এককোষী জীবের উৎপত্তি আর তারপর সেই আনন্দধারা ক্রমাগত বহুকোষে ছড়িয়ে দিয়ে সবুজ গাছপালাকে আন্দোলিত করেছে, কিংবা পাখির কূজনে পৃথিবীর আকাশ-বাতাস ভরিয়ে তুলেছে তা আর আজ হলফ করে বলা যবে না। এ পৃথিবীতে জীবনের প্রথম আবির্ভাব সম্পর্কে অনেক অনুকল্প আছে। এগুলােকে মােটামুটি পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায় (আখতারুজ্জামান, ১৯৯৮) :

১) অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা : জীবনের আবির্ভাব হয়েছে অতিপ্রাকৃতিক (Supernatural) ও অজ্ঞেয় ঘটনা হিসেবে।

২) সৃষ্টিবাদ : বিশেষ লক্ষ্যে বা উদ্দেশ্যে, বিরাট কোন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জীবনের সৃষ্টি করা হয়েছিল। এর নাম সৃষ্টিবাদ বা বিশেষ সৃষ্টি তত্ত্ব (Theory of special creation)

৩) স্বতঃজননবাদ : স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ময়লা-আবর্জনা থেকে প্রাণের সৃষ্টি হয়। এধারণাকে বলে স্বতঃজনন তত্ত্ব (Theory of spontaneous generation)।

৪) বহির্জগতে উৎপত্তি : এ ধারণা অনুযায়ী জীবন পৃথিবীর বহিস্থঃ (Extra terrestrial) পরিবেশ থেকে। ধারনা করা হয় পৃথিবীর বহির্জগতে কোথাও না কোথাও প্রাণ চিরকালই ছিল, আর সেখান থেকেই পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে।

৫) জৈব রাসায়নিক তত্ত্ব : রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আদিম পরিবেশে অজৈব (জড়) বস্তু হতে পৃথিবীতেই জীবনের উৎপত্তি হয়েছে। এই তত্ত্বের নাম জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি তত্ত্ব (Chemical theory of origin of life)। এ তত্ত্বের অপর একটি নাম অজীবজনি (Abiogenesis)।

প্রথমােক্ত দুটি অনুকল্প বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না। এই তত্ত্ব দুটি আসলে মনে করে বিশাল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঈশ্বর পৃথিবীতে একসময় প্রাণ সৃষ্টি করেন। কিন্তু এই তত্ত্বগুলাের কোন অবরােহ বা অনুসিদ্ধান্ত নেই, কিংবা থাকলেও তা পরীক্ষা, নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ দ্বারা যাচাই করা যায় না। তবে ৭ দিনে বিশ্ব সৃষ্টির বাইবেলীয় সৃষ্টিবাদের যে ব্যাখ্যা ফাদার সুয়ারেজ দিয়েছেন বা সৃষ্টি মুহূর্তের তারিখ হিসেবে আর্চ বিশপ উশার যা বলেছেন (সকাল ৯-৩০, মঙ্গলবার, ২০০৪ খ্রীঃ পূ) তাকে বিজ্ঞান সঠিক মনে করে না। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ফসিলাদি পর্যবেক্ষণ করে এবং অন্যান্য পরীক্ষার সাহায্যে তাঁদের ধারণার অসারতা প্রমাণিত হয়। আর তাছাড়া বিজ্ঞান অজ্ঞেয়বাদী নয়। বিজ্ঞান খুব কঠোরভাবেই বস্তুবাদী।

প্রাণের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে তা প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতেই বিজ্ঞান জানতে চায়। আধুনিক বিজ্ঞান জন্ম নিয়েছে যাদের হাত দিয়ে তারা মধ্যযুগীয় ভাববাদ আর অজ্ঞেয়বাদের তীব্র বিরােধী ছিলেন। বেকন, দেকার্ত, নিউটন, গ্যালিলিও, কেপলার মিলে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের সংস্কৃতি গড়েছেন, যন্ত্রসভ্যতার দার্শনিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। পরে বিকশিত হয়েছে রসায়নবিদ্যা আর তার সাথে সাথে জীববিদ্যা


 মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top
১ম অধ্যায়

২য় অধ্যায়

৩য় অধ্যায়

৪র্থ অধ্যায়

৫ম অধ্যায়

৬ষ্ঠ অধ্যায়

৭ম অধ্যায়

৮ম অধ্যায়

৯ম অধ্যায়

গ্রন্থ আলোচনা/সমালোচনা