ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি

সত্যজিৎ রায়

০১. ছেলেটি কে?

টেলিভিশনটা কিনে কোনও লাভ হল না মশাই বললেন লালমোহনবাবু। দেখার মতো কিসু থাকে না। রামায়ণ মহাভারত দুটোই দেখতে চেষ্টা করেছি। পাঁচ মিনিটের বেশি স্ট্যান্ড করা যায় না।

আপনি যে খেলাধুলোয় ইন্টারেস্টেড নন, বলল ফেলুদা। তা হলে দেখতেন মাঝে মাঝে বেশ ভাল প্রোগ্রাম থাকে। টেনিস, ক্রিকেট, ফুটবল-কেনোটাই বাদ নেই। যেমন দেশের খেলা, তেমনি বিদেশের খেলা।

তবে ওরা আমার একটা গল্প থেকে টিভি সিরিয়াল করতে চাচ্ছে।

বাঃ এ তো ভাল খবর।

ভাল মানে? প্রখর রুদ্র করবে এমন কোনও অ্যাকটর আছে বাংলাদেশে? অথচ ও দেশে দেখুন-সুপারম্যানের জন্য পর্যন্ত লোক পেয়ে গেল। মনে হয় একেবারে বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে?

আমাদের পাড়ায় কোনও বড় পুজো নেই। তবে একটু দূরেই আছে, সেখান থেকে মাঝে মাঝে লাউডস্পিকারে হিন্দি গান ভেসে আসছে! লালমোহনবাবু তার সঙ্গে গলা মেলাতে চেষ্টা করে পারছেন না। গানটা ভদ্রলোকের একেবারেই আসে না, যদিও বলেন ওঁর দাদামশাই নাকি খান ত্ৰিশেক ওস্তাদি গান রেকর্ড করেছিলেন।

চা এক প্রস্থ হয়ে গেছে, আরেকবার হবে কি না ভাবছি। এমন সময় বাইরে গাড়ি থামার শব্দ পেলাম। আর তার পরেই ডোরবেল।

দরজা খুলে দেখি এক লম্বা চওড়া ধবধবে ফরাসী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন।

এটা কি প্রদোষ মিত্রের বাড়ি?

আজ্ঞে হ্যাঁ–আসুন ভিতরে! ফেলুদা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।

ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। ধূতি, পাঞ্জাবি আর কাঁধে সাদা চাদর। পায়ে সাদা পাম্প শু। আভিজাত্য ফুটে বেরোচ্ছে সমস্ত শরীর থেকে।

বসুন, বলল ফেলুদা।

ভদ্রলোক একটা সোফায় বসে লালমোহনবাবুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিলেন। ইনি আমার বন্ধু লালমোহন গাঙ্গুলী, বলল ফেলুদা। লালমোহনবাবু একটা নমস্কার করলেন, কিন্তু ভদ্রলোক যেন সেটা দেখেও দেখলেন না। পায়ের উপর পা তুলে গিলে করা ধুতির কোঁচটাকে সযত্নে কোলের উপর রেখে বললেন, আপনার কথা আমায় বলে পাইকপাড়ার সাধন চক্রবর্তী।

ওঁর একটা তদন্তের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম, বলল ফেলুদা।

ভদ্রলোক আপনার সুখ্যাতি করলেন, তবে ডিটেল কিছু দেননি। আপনি ক’দিন ধরে করছেন। এ কাজ?

বছর দশেক হল।

সিসটেমটা দিশি না বিলিতি?

যে কেসে যেমনটা দরকার হয়। আর কী।

আই সি…

আপনার সমস্যাটা কী সেটা যদি বলেন…

সেটাকে সমস্যা বলা চলে কি না জানি না। সেটা আপনিই বিচার করবেন।

ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা খাম বার করলেন। তারপর তার থেকে সযত্নে একটা ছবি বার করে ফেলুদাকে দিলেন। আমি ফেলুদার কাঁধের উপর দিয়ে দেখলাম ফিকে হয়ে যাওয়া পুরনো একটা ফোটোগ্রাফ, তাতে রয়েছে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পরস্পরের কাঁধে হাত দিয়ে দুজন প্যান্ট-শার্ট পরা ছেলে। তাদের বয়স ষোলো-সতেরোর বেশি নয়।

এর মধ্যে কাউকে চিনছেন কি? ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন।

বাঁ দিকের জন তো আপনি, বলল ফেলুদা।

হ্যাঁ, ওই একজনকেই আমিও চিনতে পারছি।

অন্যটি আপনার বন্ধু অবশ্যই।

দেখে তো তাই মনে হয়, তবে ওর পরিচয় ধরতে পারিনি। ছবিটা আমি সম্প্রতি পেয়েছি। একটা দেরাজের কাগজপত্রের তলায় ছিল। আপনাকে আমি একটিমাত্র কাজ দিতে এসেছি। ভেবে দেখুন সেটা নেবেন কি না।

কী কাজ?

আমার সঙ্গে ওই ছেলেটি কে সেটা আমার জানা চাই। এর পরিচয় আপনাকে অনুসন্ধান করে উদঘাটন করতে হবে। ও কোথায় আছে কী করে, আমার সঙ্গে পরিচয় হল কবে, কী করে-সে সব আমার জানা চাই। সেটা করলেই আপনার কাজ শেষ! এর জন্য আপনার পুরো পারিশ্রমিক আমি দেব।

আমার আগে জানা দরকার আপনি নিজে কোনও খোঁজ করেছেন কি না।

ক্লাবে আমার স্কুল-কলেজের কয়েকজন সহপাঠী আছে, আমি তাদের দেখিয়েছি। তারা কেউ চিনতে পারেনি। আপনি লক্ষ্য করবেন। ছেলেটি বাঙালি কি না তাও বোঝা শক্ত।

চুলটা তো কালো, তবে চোখ দুটো যেন একটু কটা। আপনার সাহেব বন্ধু ছিল কখনও?

আমি ইংল্যান্ডে চার বছর স্কুলে আর এক বছর কলেজে পড়ি। বাবা ওখানে ডাক্তারি করতে গিয়েছিলেন। তারপর অবিশ্যি আমরা সবাই দেশে ফিরে আসি। ফিরে আসার আগে ইংল্যান্ডের কোনও কথা আমার মনে নেই, কারণ ওখানে থাকতে বাইসাইকল থেকে পড়ে গিয়ে আমার স্কাল ফ্র্যাকচার হয়ে যায়। তার ফলে পাঁচ-সাত বছরের স্মৃতি আমার মন থেকে লোপ পেয়ে গেছে।

কোন স্কুল আর কলেজে পড়েছিলেন সেটা মনে নেই?

বাবা বলেছিলেন। সে-ও অনেক বছর আগে। কলেজ বোধহয় কেমব্রিজ। স্কুলের নাম মনে নেই।

স্মৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য কোনও ওষুধ-টষুধ খাচ্ছেন না?

অ্যালোপ্যাথিক খেয়েছি! তাতে কোনও কাজ হয়নি। এখন একটা কবিরাজি ওষুধ খাচ্ছি।

ইংল্যান্ড থেকে ফিরে কী হয়?

সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হই। বাবাই সব ব্যবস্থা করে দেন, কারণ তখনও আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হইনি।

সেটা কোন বছর?

ফিফটি টু। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই।

হুঁ…।

ফেলুদা ছবিটা হাতে নিয়ে মিনিটখানেক ভাবল। তারপর প্রশ্ন করল, আপনার কি মনে হয় এই ছেলের সঙ্গে কোনও একটা বিশেষ ঘটনা জড়িয়ে আছে?

সেরকম মনে হয়েছে। এক-এক সময় আবছা আবছা স্মৃতি ফিরে আসে, আর তখন যেন একে দেখতে পাই। কিন্তু এর পরিচয় অজানাই থেকে যায়। অত্যন্ত অস্বস্তিকর ব্যাপার। যার সঙ্গে এত বন্ধুত্ব ছিল সে কে, সে এখন কোথায় আছে, কী করে, আমাকে মনে রেখেছে কি না, এ সব জানার জন্য প্রবল কৌতুহল হয়। কাজটা সহজ না বুঝতে পারছি, কিন্তু সেই কারণেই হয়তো আপনি ইন্টারেস্টেড হতে পারেন।

ঠিক আছে। কাজটা আমি নিচ্ছি। তবে এতে কত সময় লাগবে তা আমি বলতে পারছি না। আর ধরুন যদি বিলেত যেতে হয়?

তা হলে আপনার এবং আপনার অ্যাসিস্ট্যান্টের প্লেন ভাড়া আমি দেব, ওখানে হোটেলে থাকার খরচ আমি দেব, যে পাঁচশো ডলার আপনাদের প্রাপ্য তার টাকাটা আমি দেব। বুঝতেই পারছেন আমি এর পরিচয় পাবার জন্য কতটা আগ্রহী।

আপনার বাবা কি–?

মারা গেছেন বিলেত থেকে ফেরার পাঁচ বছরের মধ্যেই। মা-ও মারা গেছেন দশ বছর হল। আমার স্ত্রী বর্তমান। একটিই সন্তান আছে-আমার মেয়ে। সে বিয়ে করে দিল্লিতে রয়েছে। স্বামী আই. এ. এস; এই হল আমার কার্ড। এতে আমার নাম ঠিকানা ফোন নম্বর সবই পাবেন।

কার্ডটা দেখলাম। নাম-রঞ্জিন কে. মজুমদার; ঠিকানা-১৩ রোল্যান্ড রোড…।

ফেলুদা বলল, আমি আপনার সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ রাখব। কোনও প্রয়োজন হলে আশা করি আপনি আমাকে সাহায্য করবেন।

সম্ভব হলে নিশ্চয়ই করব।

ভদ্রলোক উঠে পড়ে বললেন, ছবিটা তা হলে আপনার কাছেই রইল।

হ্যাঁ। ওটার একটা কপি করে ওরিজিনালটা আপনাকে ফেরত দিয়ে দেব। ভাল কথা— আপনি কী করেন সেটা তো জানা হল না।

সরি। আমারই বলা উচিত ছিল। আমি চাৰ্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। বি, কম পাশ করি সেন্ট জেভিয়ার্স থেকেই। লী অ্যান্ড ওয়াটকিনস হচ্ছে আমার আপিসের নাম।

থ্যাঙ্ক ইউ।

আসি তা হলে। গুড ডে।

অভিনব মামলা, ভদ্রলোকের গাড়ি চলে যাবার পর বললেন লালমোহনবাবু।

সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, বলল ফেলুদা। এমন কেস আর পেয়েছি বলে তো মনে পড়ে না।

একবার ছবিটা দেখতে পারি কি?

ফেলুদা ছবিটা জটায়ুকে দিল। ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে সেটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, সাহেব না। ইন্ডিয়ান তা বোঝার কোনও উপায় নেই। এ কেস আপনি কীভাবে কনডাক্ট করবেন তা আমার মাথায় আসছে না।

আপনার মাথার প্রয়োজন নেই। ফেলুমিত্তিরের মাথায় এলেই হল।

 

ফেলুদার একজন চাৰ্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মক্কেল ছিল, নাম ধরণী মুখার্জি। ফেলুদা টেলিফোনে তার সঙ্গেই যোগাযোগ করল। ভদ্রলোক বললেন, রঞ্জন মজুমদারকে খুব ভাল করে চেনেন, কারণ দুজনেই স্যাটার্ডে ক্লাবের মেম্বার। রঞ্জনবাবু কীরকম লোক জিজ্ঞেস করাতে ধরণীবাবু বললেন যে, তিনি একটু চাপা ধরনের লোক, বিশেষ মিশুকে নন, বেশিরভাগ সময় ক্লাবে চুপচাপ একা বসে থাকেন। ড্রিংক করেন—তবে মাত্রাতিরিক্ত নয়। রঞ্জনবাবু যে ছেলেবেলায় কিছুকাল বিলেতে ছিলেন সে কথাও ধারণীবাবু জানেন, কিন্তু তার বাইরে আর কিছুই বিশেষ জানেন না।

১৯৫২-তে সেন্ট জেভিয়ার্সে ইন্টারমিডিয়েটে কে কে ছাত্র ছিল তার হদিস পেতে ফেলুদার বিশেষ বেগ পেতে হল না। সেই ছাত্রদের তালিকায় খুব ভাল করে চোখ বুলিয়ে ফেলুদা বলল, এর মধ্যে একজনের নাম চেনা চেনা মনে হচ্ছে। যদ্দুর মনে হয়। ভদ্রলোক হোমিওপ্যাথি করেন। বাড়ি ফিরে এসে বলল, তোপ্‌সে, ডাক্তার হীরেন বসাকের নামটা ডিরেক্টরিতে বার করে ভদ্রলোকের টেলিফোন নাম্বারটা আমায় দে তো।

আমি দু মিনিটে কাজটা সেরে দিলাম। ফেলুদা সেই নম্বরে ফোন করে একটা অ্যাপায়েন্টমেন্ট চাইল। ডাক্তার ফেলুদার নাম শুনেই হয়তো পরদিন সকালেই সময় দিয়ে দিলেন–সাড়ে এগারোটা।

কেস কেমন যাচ্ছে খবর নিতে পরদিন সকালে লালমোহনবাবু এসেছিলেন। আমরা তাঁর গাড়িতেই ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম।

ওয়েইটিং রুমে ভিড় দেখেই বোঝা যায় ডাক্তারের পসার ভাল। ডাক্তারের সহকারী আসুন, আসুন বলে ফেলুদাকে একেবারে আসল ঘরে নিয়ে গিয়ে ঢোকাল; পিছন পিছন অবশ্য আমরা দুজনও ঢুকলাম।

ডাক্তার বসাক ফেলুদাকে দেখে হাসিমুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

কী ব্যাপার? আপনার তো বড় একটা ব্যারাম-ট্যারাম হয় না।

ব্যারাম না, ফেলুদা হেসে বলল। একটা তদন্তের ব্যাপারে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে এসেছি।

কী প্রশ্ন।

আপনি কি সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্র ছিলেন?

হ্যাঁ, তা ছিলাম।

আমার আসল প্রশ্নটা হল—এই দুটি ছেলেকে কি চিনতে পারছেন?

ফেলুদা পকেট থেকে সেলোফেনে মোড়া ছবিটা বার করে ডাক্তার বসাকের হাতে দিল। এক দিনের মধ্যেই ছবিটার কপি করিয়ে নিয়ে আসল ছবিটা ফেলুদ রঞ্জনবাবুকে ফেরত দিয়ে এসেছে। ডাক্তার ভুরু কুঁচকে ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, এদের মধ্যে একজন তো মনে হয় আমাদের সঙ্গে পড়ত। রঞ্জন। হ্যাঁ, রঞ্জনই তো নাম।

আমি বিশেষ করে অন্যজনের সম্বন্ধে জানতে চাইছি।

ডাক্তার ছবিটা ফেরত দিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, অন্যটিকে কস্মিনকালেও দেখিনি আমি।

আপনাদের সঙ্গে সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়ত না?

ডেফিনিটলি না।

ফেলুদা ছবিটা আবার সেলোফেনে মুড়ে পকেটে রেখে দিল।

আপনি তা হলে বলছেন আপনার ক্লাসের অন্য ছেলেদের জিজ্ঞেস করেও খুব একটা লাভ নেই?

আমার তো মনে হয় বৃথা সময় নষ্ট।

তাও, আপনি একটা কাজ করে দিলে আমি খুব উপকৃত হব।

কী?

ফেলুদা পকেট থেকে সেন্ট জেভিয়ার্সের ছাত্রদের তালিকাটা বার করে ডাক্তার বসাককে দেখাল।

এর মধ্যে কারুর বর্তমান খবর জানেন?

আমি বুঝলাম ফেলুদা সহজে ছাড়ছে না।

ডাক্তার তালিকাটার উপর চোখ বুলিয়ে বললেন, একজনের খবর জানি। জ্যোতির্ময় সেন। ইনিও ডাক্তার, তবে অ্যালোপ্যাথ।

কোথায় থাকেন বলতে পারেন?

হেস্টিংস। ঠিকানাটাও আপনি টেলিফোনের বইয়েতেই পেয়ে যাবেন।

থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার।

গাড়িতে উঠে লালমোহনবাবু বললেন, স্কুল-কলেজের বাইরেও তো বন্ধু হয় মশাই। অ্যাট প্রেজেন্ট আমার যে কজন বন্ধু আছে তাদের কেউই আমার সহপাঠী ছিল না।

এটা ঠিকই বলেছেন, বলল ফেলুদা। আমার মনে হয় শেষ পর্যন্ত খবরের কাগজে ছবি দিয়ে এনকোয়ারি করতে হবে। তবে আগে এই হেস্টিংসের ডাক্তারকে একটু বাজিয়ে দেখা যাক।

জ্যোতির্ময় সেন আমাদের অ্যাপিয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন তিন দিন পরে, সকাল সাড়ে নটায়। ফেলুদার নাম শুনেছেন, যথেষ্ট সম্রামের সঙ্গে কথা বললেন, আর বললেন উনি দশটায় চেম্বারে যান, তার আগেই আমাদের সঙ্গে কাজটা সেরে নিতে চান। ফেলুদা বলল, আর এটাও জানিয়ে রাখি যে এর সঙ্গে ব্যারামের কোনও সম্পর্ক নেই; ব্যাপারটা আমার একটা তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

লালমোহনবাবুও অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথাটা জেনে নিয়েছিলেন; তাঁর গাড়িতেই আমরা শুক্রবার সকালে ঠিক সাড়ে নটায় হেস্টিংসে জ্যোতির্ময় সেনের বাড়ি পৌঁছে গেলাম।

এঁর পসার যে ভাল সেটা বাড়ি দেখেই বোঝা যায়। বেয়ারা এসে সেলাম ঠুকে আমাদের বসবার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বলল, ডাক্তারবাবু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসবেন।

লালমোহনবাবু গলা নামিয়ে ফেলুদাকে প্রশ্ন করলেন, আপনি কার বিষয় জানতে চাইবেন— রঞ্জন মজুমদার, না ছবির অন্য ছেলেটি?

ফেলুদা বলল, রঞ্জন মজুমদার লোকটাকে একটু ভাল করে জানা দরকার। এখন পর্যন্ত খুবই সামান্য জানি। তাঁর বন্ধুর বিষয় এই ডাক্তার কিছু বলতে পারবেন বলে মনে হয় না।

ফেলুদার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই জ্যোতির্ময়বাবু এসে গেলেন।

আপনি তো প্রদোষ মিত্র, বললেন ভদ্রলোক সোফায় বসে। অবিশ্যি ফেলুদা নামেই বেশি। প্ৰসিদ্ধ। ইনি তো তোপ্‌সে, বুঝতেই পারছি, আর ইনি নিশ্চয়ই জটায়ু। আপনার তদন্তের সব কাহিনী আমার বাড়ির ছেলে বুড়ো সবাই পড়ে, তাই আপনাকে একরকম আত্মীয় বলেই মনে হয়। বলুন, কী প্রয়োজন আপনার।

এই ছবির দুজনের একজনকেও চেনেন?

এ তো দেখছি রঞ্জন মজুমদার। পরিষ্কার মনে পড়ছে। এ চেহারা। এই দ্বিতীয় ছেলেটাকে চিনলাম না।

কলেজে আপনাদের ক্লাসে ছিল না?

উঁহু–তা হলে মনে থাকত।

তা হলে এই রঞ্জন মজুমদার সম্বন্ধে দু-একটা প্রশ্ন করব।

কলেজে রঞ্জন আমার ইন্টিমেট বন্ধু ছিল। আমরা দুজনে এক বেঞ্চে বসতাম, একসঙ্গে সিনেমা দেখতাম। ও আমার হয়ে প্রক্সি দিত, আমি ওর হয়ে দিতাম। অবিশ্যি এখন আর কোনও যোগাযোগ নেই।

কীরকম ছেলে ছিলেন তিনি? অর্থাৎ, মানুষ হিসেবে কীরকম?

জ্যোতির্ময় সেন ভুরু কুঁচকে একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, একটু খ্যাপাটে গোছের। অবিশ্যি সেটা আমি মাইন্ড করতাম না।

খ্যাপাটে কেন বলছেন?

কারণ ওই বয়সে অতি স্ট্রং ন্যাশনালিস্ট ফিলিং আমি কারুর মধ্যে দেখিনি! এটা মনে হয় ওর ঠাকুরদাদার কাছ থেকে পাওয়া। রঘুনাথ মজুমদার। ইয়াং বয়সে টেররিস্ট দলে ছিলেন, বোমা-টেমা তৈরি করতেন। রঞ্জনের বাবার মধ্যেও বোধহয় এ জিনিসটা ছিল। বিলোতে ডাক্তারি করতেন। কোন এক সাহেবের সঙ্গে বনেনি বলে আবার দেশে ফিরে আসেন।

বিলেতে থাকার সময় রঞ্জনবাবু তো ওখানকার স্কুলে পড়তেন।

তা পড়ত হয়তো, কিন্তু সে সম্বন্ধে ও নিজে কিছুই বলেনি। ওর তো ওখানে একটা বিশ্ৰী অ্যাক্সিডোন্ট হয়–সে বিষয় জানেন বোধহয়?

হ্যাঁ। উনি নিজেই বলেছিলেন।

তার ফলে ও পাঁচ-সাত বছরের ঘটনা একদম ভুলে যায়। অর্থাৎ বিলেতের সব ঘটনাই ওর মন থেকে লোপ পেয়ে যায়।

তা হলে ওখানে কার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল না-হয়েছিল সেটাও জানবার কোনও উপায় নেই?

না। যদি না ঘটনাচক্ৰে স্মৃতি আবার ফিরে আসে। তবে এটা বলে রাখি-রঞ্জন খুব সাধারণ ছেলে ছিল না। অসুখে ওর কী ক্ষতি করেছিল জানি না-বা ইংল্যান্ডের ছাত্র অবস্থা ওর কীরকমভাবে কেটেছে জানি না, কিন্তু ওর মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ব ছিল যেটা ওই বয়সেও বোঝা যেত।

পরদিন সকালে টেলিফোনে আপয়েন্টমেন্ট করে আমি আর ফেলুদ রঞ্জন মজুমদারের বাড়ি গেলাম। কদ্দূর এগোলেন? ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।

এই ছেলেটি যে কলকাতায় আপনার সহপাঠী ছিল না সেটা জানতে পেরেছি। এবার একটা স্টেপ নেব ভাবছি। যেটা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই এবং আপনার অনুমতি চাই।

কী স্টেপ?

এই ছবি থেকে অচেনা ছেলের ছবিটা খবরের কাগজে ছাপতে চাই—একটা বিজ্ঞাপনে। কলকাতা আর দিল্লির কাগজে দিলেই হবে।

ভদ্রলোক একটু ভেবে বললেন, আমার নামের কোনও উল্লেখ থাকবে না তো?

মোটেই না, বলল ফেলুদা। আমি শুধু জানতে চাই এই ছেলের পরিচয় কেউ জানে কি না। যদি জানে তা হলে আমার সঙ্গে যেন যোগাযোগ করে! আমার নাম-ঠিকানা থাকবে।

ঠিক আছে। আপনার ইনভেস্টিগেশনের জন্য যা যা করার দরকার সে তো আপনাকে করতেই হবে! আমার কোনও আপত্তি নেই।

 


লন্ডনে ফেলুদা

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top