কেন আমি ধর্মবিশ্বাসী নই

বার্ট্রান্ড রাসেল

০২. ধার্মিক বুর্জোয়া এবং অধার্মিক সর্বহারা

[দ্বিতীয় খন্ড]

অভিসন্ধিজাত আলোচনা

পরবর্তী পদক্ষেপ আমাদের অভিসন্ধিজাত আলোচনায় (Argument from design) নিয়ে আসে। অভিসন্ধিজাত আলোচনা সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন: জগতের সবকিছুই এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে জগতে আমরা বেঁচে থাকার উপায় পেতে পারি এবং যদি এই জগৎ একটুখানি অন্যরকম হত তবে আমরা এখানে বেঁচে থাকার উপায় পেতাম না। এটাই অভিসন্ধিজাত বিষয়। বিষয়টি কখনও কখনও কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে ওঠে, উদাহরণস্বরূপ, এই বলে যুক্তি প্রদর্শন করা হয় যে গুলি করার সুবিধার জন্যই খরগোসের সাদা লেজ। আমি জানি না কিভাবে একটি খরগোস এই ধরনের ব্যাপারটি দেখবে।

এটা একটি ব্যঙ্গ-কাব্যের সহজ বিষয়। আপনারা সবাই ভলতেয়ারের সেই জনপ্রিয় উক্তিটির কথা জানেন যে নাকটি এমনভাবে গঠিত হয়েছে যাতে সেখানে চশমাটি ঠিক মতো বসে। অষ্টাদশ শতকে এই ধরনের ব্যঙ্গোক্তি সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে খুব একটা অসংগতিকর কথা হয়ে উঠতে পারেনি কেননা ডারউইনের সময় থেকে আমরা অনেকটা বুঝে গিয়েছিলাম যে কেন জীবন্ত সৃষ্টি তাদের পরিবেশের সঙ্গে নিজেদেরকে অভিযোজিত করে নেয়। এটা নয় যে তার পরিবেশটিকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেয় যেখানে তারা মানাতে পারবে, বরঞ্চ তারাই পরিবেশটির পক্ষে মানানসই হয়ে ওঠে এবং এটাকেই অভিযোজনের ভিত্তি বলা হয়ে থাকে।

এ সম্পর্কে অভিসন্ধির কোন প্রমাণ নেই। আপনি যখন নকসা বা অভিসন্ধিটিকে খতিয়ে দেখতে চাইবেন, তখন একটা আশ্চর্যজনক জিনিস আপনি দেখতে পাবেন যে মানুষ বিশ্বাস করে এই জগৎ ও তার অভ্যন্তরে সমগ্র বস্তু তাদের অপূর্ণতা সত্ত্বেও অবশ্যই এক অসাধারণ সৃষ্টি বা সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে। আমি বস্তুতই ব্যাপারটিকে বিশ্বাস করতে পারি না। আপনি কি এটা ভেবে দেখেছেন যে যদি আপনাকে সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ করে দেওয়া হয় এবং লক্ষ লক্ষ বছরের মধ্যে আপনাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় জগৎকে একটা পূর্ণতার সঙ্গে গঠন করার, তবে আপনি কু-ক্লুক্স-ক্ল্যান বা ফ্যাসিস্তদের থেকে ভালো কিছু তৈরি করে উঠতে পারবেন না?

এছাড়াও, যদি আপনি বিজ্ঞানের সাধারণ সূত্রগুলি গ্রহণ করেন তবে আপনাকে অবশ্যই ধরে নিতে হবে যে এই গ্রহটির উপর মানবজীবন ও সাধারণ জীবন একটি নির্দিষ্ট সময়ে অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে। সৌর-ব্যবস্থার ক্ষয়জাত এটি একটি বিশেষ পর্যায় মাত্র, উক্ত ব্যবস্থার ক্ষয়ের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আপনি উষ্ণতাকে একটি বিশেষ অবস্থায় পেলেন এবং যে উষ্ণতায় প্রোটোপ্লাজম সৃষ্টি সম্ভব হয়ে উঠল এবং সমগ্র সৌর-ব্যবস্থার আয়ুর উপর নির্ভর করে এখানে কিছুদিনের জন্য জীবনলীলার সূচনা হল (There is life for a short time in the life of the whole solar system) lontanist চাঁদে এমন কিছু দেখেন যা পৃথিবীতে হতে চলেছে, অর্থাৎ কিছুটা মৃত, ঠাণ্ডা এবং জীবনহীন।

আমাকে বলা হল যে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বিষণ্ণতামূলক এবং মানুষ আপনাদের বলবে যে যদি তারা এই ধরনের বিশ্বাস করে তবে তারা পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সামর্থ্য জোগাড় করে উঠতে পারবে না। এটা বিশ্বাস করবেন না, এটা একেবারেই বাজে কথা। এখন থেকে লক্ষ লক্ষ বছর পরে কি ঘটবে তা নিয়ে কেউ উদ্বিগ্ন নয়। এমনকি যদি তারা ভাবে যে তারা সত্যই ব্যাপারটাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন তবে তারা নিজেদেরকে বঞ্চিত করছে। তারা এমন কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন যা অনেকটা পরিমাণ পার্থিব অথবা ব্যাপারটি তাদের বদহজম হয়েছে।

কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর পরে পৃথিবীতে কি ঘটতে যাচ্ছে তা ভেবে অবশ্যই কেউ দুঃখকে উৎপাদন করবে না। যদিও এটা একটা বিষণ্ণতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি যে পৃথিবীতে জীবনলীলা একদিন শেষ হবে, অন্তত আমরা যেন এই সত্যটা বুঝতে পারি । যদিও কখনও কখনও মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে যে-সব জিনিসগুলি করে থাকে তা নিয়ে আমার অনুশোচনা হয় কেননা এগুলো কেবলমাত্র এক প্রকার সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়, তবে এই সান্ত্বনাগুলো আর যাই হক জীবনলীলাকে অন্তত দুর্বিসহ করে তোলে না।

 

পরমেশ্বরের স্বপক্ষে নৈতিক যুক্তি

এখন আমরা আর একটা স্তর এগিয়ে এলাম যে স্তরটিকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তি সংক্রান্ত অবতরণ (Intellectual descent) বলব, অর্থাৎ যে পথে ঈশ্বরবিশ্বাসী বা আস্তিকেরা তাদের যুক্তি প্রয়োগ করেছেন এবং আমরা এখন সেই বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনা করব যাকে বলা হয়ে থাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সপক্ষে তিনটি বিচারবুদ্ধি-সংক্রান্ত যুক্তি ছিল, যার সবগুলোই ইমানুয়েল কান্ট তার “Critioue for Pure Rason” গ্রন্থে গ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু যেই তিনি এই তিনটি যুক্তি গ্রহণ করলেন সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটি নতুন যুক্তি আবিষ্কার করে ফেললেন এবং সেই যুক্তিটি ছিল একটি নৈতিক যুক্তি যা তাকে সহজেই প্রভাবিত করে ফেলেছিল।

তিনি সাধারণ আর সব মানুষদের মতোই ছিলেন। কিন্তু বুদ্ধি-সংক্রান্ত ব্যাপারে তিনি ছিলেন সন্দেহবাদী, তবে নৈতিক বিষয় তিনি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতেন যে তিনি মাতৃচরণে পূর্ণভাবে সমর্পিত। এই ধরনের মনোভাব সম্পর্কে মন বিশ্লেষকরা যা জোর দিয়ে বলে থাকেন তা হল কিশোর বয়সে আমরা যে পরিবেশে (Association) বড় হই তা আমাদের জীবনে একটি গভীর প্রভাব ফেলে যা পরিণত বয়সের পরিবেশ ফেলতে পারে না।

আমার মতে কান্ট ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি নতুন নৈতিক যুক্তি আবিষ্কার করলেন যেটি বিভিন্নভাবে ঊনবিংশ শতকে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই যুক্তিটি বিভিন্ন ধরনের আকারবিশিষ্ট, এদের মধ্যে একটি হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব না থাকলে জগতে ভালো-মন্দ বলে কিছুই থাকত না। জগতে ভালো-মন্দের মধ্যে সত্যই কোন স্বতন্ত্রতা আছে কিনা, সে বিষয়ে এখনই কোন আলোচনা করতে আমি আগ্রহী নই। বর্তমানে আমি যে বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী তা হল, যদি আপনি ভালো-মন্দের স্বতন্ত্রতা স্বীকার করে নিতে চান তবে যে প্রশ্নের সম্মুখীন আপনি হবেন তা হল, ঈশ্বরের আদেশেই কি এই স্বতন্ত্রতা, নাকি তা নয়?

যদি এটা ঈশ্বরের আদেশ হয়ে থাকে তবে স্বীকার করে নিতে হয় যে ঈশ্বরের নিজের কাছে ভালো বা মন্দের মধ্যে কোনরকম স্বতন্ত্রতা নেই। তাই ঈশ্বর মঙ্গলময় এই কথাটির আর কোন অর্থই হয় না। এর পরেও যদি ধর্মবেত্তাদের মতো আপনি বলতে চান যে ঈশ্বর মঙ্গলময় তবে আপনি এ কথা বলতে চাইছেন যে ভালো-মন্দের এমন একটি অর্থ আছে যা ঈশ্বরের আদেশের উপর নির্ভর করে না, কেননা ঈশ্বরের আদেশ সর্বদাই ভালো, তা কখনই নিজের থেকে মন্দ হতে পারে না। এরপরে যদি আপনি একথা বলতে চান যে ভালো-মন্দ ব্যাপারটি এই ঈশ্বরের থেকে আসেনি কেননা ভালো-মন্দ ব্যাপারটি ঈশ্বরের পূর্ববর্তী হওয়ায় যুক্তিগত দিক দিয়ে তা ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে না।

এবার উক্ত যুক্তির উপর নির্ভর করে আপনি অবশ্যই বলতে পারেন যে এই ঈশ্বরের পূর্ববর্তী আর এক পরম ঈশ্বর আছেন যিনি এই জগতে প্রকৃত খ্রীস্টান অথবা এই জায়গায় কোন পরম ঈশ্বরকে না বসিয়ে কোন শয়তানকেও বসাতে পারেন। শেষোক্ত ঘটনাটিকে আমি অনেকটা বেশি বাস্তব বলে মনে করি। বস্তুত আমাদের পরিচিত এই জগৎটি কোন এক মুহূর্তে শয়তানের দ্বারা তৈরি যে মুহূর্তে ঈশ্বর কিছুই দেখছিলেন না। এতক্ষণে এই ব্যাপারটির সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট ভালোভাবে বুঝেছি এবং যা বুঝেছি তা অবশ্যই আমার দ্বারা খণ্ডিত হবে না।

 

অন্যায় প্রতিকারার্থে যুক্তি

শেষমেশ আমরা নৈতিক যুক্তি সম্পর্কে একটি কৌতূহলপূর্ণ দিক খুঁজে পাই, সেটা হল, তারা বলে থাকেন যে জগতে মঙ্গল প্রতিষ্ঠার জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্ব একান্তভাবে প্রয়োজন। আমরা জানি যে বিশ্বের এই অংশে অন্যায়ের রাজত্ব এবং প্রায়শই কঠিন সংগ্রাম ও কখনও শয়তানের অগ্রগতি। কেউ এটা ঠিক বুঝতে পারে না এর মধ্যে কোনটা বেশি বিরক্তিকর। কিন্তু যদি আপনারা এই বিশ্বে ন্যায় বস্তুটিকে লাভ করতে চান তবে ব্যাপারটি এমন দাঁড়াবে যে আপনারা বস্তুত আপনাদের ভবিষ্যৎ জীবনে পৃথিবীর ভারসাম্যমূলক উপশম চাইছেন। এই জন্যে ঈশ্বর বিশ্বাসীরা বলে থাকেন অবশ্যই ঈশ্বর আছেন।

ভবিষ্যতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যেই পৃথিবীতে স্বর্গ ও নরকের অস্তিত্ব একান্ত প্রয়োজন। এই যুক্তিটি বেশ কৌতূহলপূর্ণ। যদি ব্যাপারটিকে আপনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখেন তবে আপনি অবশ্যই বলতে বাধ্য হবেন, আমি কেবলমাত্র এই জগৎকেই চিনি, বিশ্বের অন্যান্য অংশ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। সম্ভাব্যতার তত্ত্বের উপর নির্ভর করে যতটা সম্ভব যুক্তি প্রদর্শন করে একজন একথা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবেন যে এই জগৎটি একটি সুন্দর নিদর্শন, যদি এখানে অন্যায় থাকে তবে বিশ্বের সর্বত্রই অন্যায়কে দেখা যাবে।

ব্যাপারটি অনেকটা এইরকম, যেমন ধরুন আপনি একটি কমলালেবুর বাক্স আনলেন, যার ঢাকনাটা খুলে আপনি দেখলেন যে উপরিভাগের কমলালেবুর সবগুলিই খারাপ, তখন আপনি এরকম যুক্তি দেখিয়ে বলতে পারেন না যে ভারসাম্যের নিয়মানুযায়ী নীচে অবশ্যই ভালো কমলালেবু আছে। আপনার বলা দরকার, সম্ভবত এই বাক্সের সব লেবুগুলিই খারাপ এবং একজন বৈজ্ঞানিক ব্যক্তি সমগ্র বিশ্ব সম্পর্কে এই ধরনের যুক্তি পোষণ করবেন। তিনি সম্ভবত বলবেন, এই জগতেই আমরা এত বেশি পরিমাণ অন্যায় দেখি যে তা দেখে মনে হয় না বিশ্বের কোন জায়গায় ন্যায় শাসন চলতে পারে এবং এই যুক্তিই যে নৈতিক যুক্তির উত্থাপন করে তা ভগবান বা অন্য ওইরকম কারুর অস্তিত্বকে স্বীকার করে না।

তবে এই ধরনের বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তিগুলি, যেগুলি নিয়ে আমি এতক্ষণ আলোচনা করেছি, সেগুলি জনসাধারণকে খুব একটা প্রভাবিত করে না। যা মানুষকে ঈশ্বরের বিশ্বাসের দিকে পরিচালিত করে তা অবশ্যই এই সব বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তিগুলি নয়। বেশিরভাগ মানুষ ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে এই জন্য যে তারা শিশু বয়স থেকে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে শেখে এবং এটাই হল প্রধান কারণ।

আমি মনে করি বাঁচবার ইচ্ছাটাই সব থেকে শক্তিশালী কারণ। এটা এমন এক ধরনের অনুভব যা মানুষকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মতো রক্ষণাবেক্ষণ করে। এই ধরনের অনুভবই মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে এমন মৌলিকভাবে প্রভাবিত করেছে যাতে সে ঈশ্বর বিশ্বাসী হতে বাধ্য হয়েছে।

 

খ্রীষ্টের চরিত্র

এখন আমি এমন একটি বিষয়ের উপর কথা বলতে চাই যে বিষয়টিকে নিয়ে যুক্তিবাদীরা ঠিক মতো আলোচনা করেন না বলে আমার প্রায়ই মনে হয় এবং তা হল– খ্ৰীষ্ট মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানী কিনা। এটা সাধারণত আগেই মেনে নেওয়া হয় যে আমরা ব্যাপারটিকে মেনে নেব কেননা ব্যাপারটা ওইরকম। কিন্তু ব্যাপারটিকে আমি নিজে এরকমভাবে মেনে নিই না। আমি মনে করি এমন অনেক বিষয় আছে যেখানে আমি খ্রীষ্টের সঙ্গে যতটা একমত হতে পারব ততটা একমত পেশাদার খ্ৰীষ্টানরাও হতে পারবে না।

আমি জানি না খ্রীষ্টের সঙ্গে আমি সমগ্র পথটা হাঁটতে পারব কিনা, কিন্তু যে-কোন পেশাদার খ্রীষ্টানের থেকে অনেক বেশি পথ আমি তার সঙ্গে যেতে পারব। আপনারা মনে রাখবেন যে তিনি বলেছিলেন, ‘অশুভকে প্রতিরোধ কোর না, কেউ যদি তোমার গালে আঘাত করে, বা গালটাও পেতে দিও। এটা কোন নতুন আদর্শ বা ধারণা নয়। খ্রীষ্টের জন্মের পাঁচ ছ’শ বছর আগে লাওৎসে এবং বুদ্ধ এই ধরনের আদর্শকে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এই ধরণের আদর্শ বস্তুত কোন খ্রীষ্টানই গ্রহণ করেন না।

উদাহরণ হিসেবে আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর (স্ট্যানলি বালডুইন) কথা বলতে পারি যিনি নিঃসন্দেহে একজন নৈতিক খ্রীষ্টান, কিন্তু তাই বলে আমি আপনাদের কারুকে এই উপদেশ দেব না যে যান, গিয়ে তার একটি গালে আঘাত করে আসুন। আমি মনে করি আপনি দেখতে পারেন যে মন্ত্রীমহাশয় এই ব্যাপারটিকে দৈহিক আঘাতরূপে ধরে নেবেন।

এখানে আর একটি দিক আছে যে দিকটিকে আমি দারুণ বলে মনে করি। আপনি মনে রাখবেন যে খ্ৰীষ্ট বলেছেন নিজেকে বিচার না করে অপরকে বিচার করতে যেও না। আমি মনে করি না এই ধরনের আদর্শ খ্রীষ্টান দেশগুলোর আইন আদালতে জনপ্রিয়রূপে দেখতে পাবেন। আমার সময়ে আমি অনেক বিচারকদের চিনতাম যারা গোঁড়া খ্রীষ্টান ছিলেন এবং তারা এটাই জানেন না যে তারা যে কাজ করতেন তা খ্রীষ্টীয় আদর্শের ঠিক বিপরীত। খ্রীষ্ট আরও বলেন, তাকে তাই দাও যা সে তোমার কাছে চাইছে এবং তাকে যা ধার দিয়েছো তা তার কাছ থেকে ফিরিয়ে নিও না। এটা একটা সুন্দর আদর্শ।

আপনাদের সভাপতি মহাশয় আপনাদের একথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে এখানে কোনরকমভাবে রাজনৈতিক কথা চলবে না, কিন্তু আমাকে শেষ সাধারণ নির্বাচনের কথা বলতেই হচ্ছে। এই নির্বাচনটি সংঘটিত হয়েছিল এই আশায় যে এই নির্বাচনে আপনারা তাদের যে ধার দিয়েছিলেন তা তারা ফিরিয়ে দেবে। তাহলেই দেখুন আপনাদের সংরক্ষণশীল দল (Conservative party) ও উদারনৈতিক দল (Liberal Party) এমন কিছু মানুষদের নিয়ে তৈরি যারা খ্রীষ্টীয় হয়েও খ্রীষ্টের শিক্ষাকে মানেন না, কেননা নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে দিয়েই তারা যা দিয়েছিল তার সবটাই জোর করেই ফিরিয়ে নিয়েছে।

খ্রীষ্টের আর একটি উপদেশের কথা আমি জানি যেটি আমার মতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার কিছু খ্রীষ্টান বন্ধুদের মধ্যে তাকে জনপ্রিয় রূপে দেখেনি। এই উপদেশে তিনি বলেছেন, যদি তুমি সঠিক হতে পার, তবে তোমার যা আছে তা নিয়ে যাও ও বিক্রি কর এবং দরিদ্রকে দাও।’ এটা সত্যই একটা সুন্দর নীতি কিন্তু এই নীতিটিকে খুব একটা অনুসরণ কেউ করে না। আমি মনে করি, এই সব নীতিগুলি নিঃসন্দেহে মঙ্গলজনক, যদিও এগুলি অনুসরণ করে জীবনে বাঁচা ব্যাপারটি খুব কষ্টকর। বেঁচে থাকবার জন্য আমি নিজের জীবনেও এই নীতিগুলি অনুসরণ করি না, কিন্তু এটা অবশ্যই বলব যে আমার ব্যাপারটা ঠিক খ্রীষ্টানদের মতন নয়।

 

খ্রীষ্টের শিক্ষার ভ্রান্তিসমূহ

এই নীতিগুলোকে অতি উত্তম বলে স্বীকার করে নিলেও, আমি এ কথা বিশ্বাস করতে পারি না যে একজন মানুষকে চরম জ্ঞানী বলা যেতে পারে কিংবা খ্রীষ্টের ঈশ্বরতত্ত্বকে চরম রূপে দেখানো যেতে পারে, যেরকমভাবে দেখানো হয়েছে। গসপেলে।

যদিও এখানে কে ঐতিহাসিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত তা দেখানো আমার কাজ নয়, তবুও এ কথা বলতেই হয় যে ঐতিহাসিক দিক দিয়ে খ্রীষ্টের অস্তিত্ব কোনদিন ছিল কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে এবং তিনি থেকে থাকলেও তার সম্বন্ধে কোন কিছুই জানি না, অতএব আমি এই ধরনের ঐতিহাসিক প্রশ্নের ধারে-কাছেও যেতে চাই না যা যথেষ্ট দুঃসাধ্য। আমি শুধু সেই খ্রীষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই যাকে গপেলে বর্ণনা করা হয়েছে। গসপেলের বর্ণনাগুলিকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করে কেউ একথা বলতে পারবে না যে সেখানে যা পাওয়া যায় সেগুলো খুব জ্ঞানদীপ্ত।

একটা জায়গায় অবশ্য সে ভাববে যে সেই সময় জীবিত সব মানুষদের মরবার আগে খ্রীষ্টের দ্বিতীয় আবির্ভাব ওইসব মানুষদের মধ্যে তাঁর সম্পর্কে এক গৌরবের মেঘমালার সৃষ্টি করেছিল। আমরা প্রচুর গ্রন্থ থেকে এই ঘটনার প্রমাণ পাই। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেন, “তোমরা ইজরায়েলের নগরীগুলোতে ততদিন পর্যন্ত যেতে পারনি যতদিন মানবের সন্তান না এসেছে। তারপর তিনি আরও বলেন, সেখানে এমন একটি অবস্থা দাঁড়ালো, যে-অবস্থা ততদিন পর্যন্ত মৃত্যুর স্বাদ নিতে পারেনি যতক্ষণ না মানবের সন্তান তার নিজের রাজত্বে ফিরে এসেছেন।

এইরকম উদাহরণ পাওয়া যায় যেখানে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে তিনি বিশ্বাস করতেন যে সেই সময়ের জীবিত মানুষদের জীবদ্দশাতেই তিনি দ্বিতীয়বার ফিরে আসবেন। খ্রীষ্টের তৎকালীন অনুগামীদের এই বিশ্বাসই ছিল এবং তার নৈতিক শিক্ষার এটাই ছিল মূলভিত্তি। যখন তিনি বলেন, “পরের দিনের জন্য কোন চিন্তা রেখো না এইরকম আরও কয়েকটি উদাহরণকে সামনে রেখে আমরা বলতে পারি, যে খ্ৰীষ্ট এই ধরনের কথাগুলো বলতে পেরেছিলেন এই কারণে, যে তিনি জানতেন তাঁর দ্বিতীয় আবির্ভাব খুব তাড়াতাড়ি ঘটতে চলেছে এবং এই কারণেই পার্থিব সব কারণগুলিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল।

বস্তুত, আমি কিছু খ্রীষ্টানদের চিনি যারা বিশ্বাস করে যে দ্বিতীয় আবির্ভাব আসন্ন ছিল। আমি এমন একজন ব্যক্তিকে চিনি যিনি তাঁর ধর্মসভাকে এই বলে শাসিয়ে ছিলেন যে খ্রীষ্টের দ্বিতীয় আবির্ভাব আসন্ন, কিন্তু সেই ধর্মসভায় উপস্থিত ব্যক্তিরা তাকে তার বাগানে বৃক্ষরোপণ করতে দেখে যথেষ্ট সান্ত্বনা পেয়েছিল। সেই যুগের খ্রীষ্টানরা এই ব্যাপারটিকে যথার্থই বিশ্বাস করত এবং তার ফলে তারা তাদের বাগানে বৃক্ষেরোপণ থেকে বিরত থাকত, কেননা তারা খ্রীষ্টের থেকে এই বিশ্বাস গ্রহণ করতে পেরেছিল যে তাঁর দ্বিতীয় আবির্ভাব আসন্ন। উক্ত প্রসঙ্গে এ কথা পরিষ্কার করে বলা যেতে পারে যে অন্যান্য মানুষদের মতোই তিনি যথেষ্ট জ্ঞানী ছিলেন না এবং তিনি কখনই পরম জ্ঞানী ছিলেন না।

 


কেন আমি ধর্মবিশ্বাসী নই

শেয়ার করুন —
0 0 votes
Post Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
মন্তব্য করুনx
()
x
Scroll to Top